Home অনুবাদ লুই বুনুয়েল / কবিতা ও চলচ্চিত্র অবচেতনার এপিঠ-ওপিঠ / রাজিয়া সুলতানা অনূদিত

লুই বুনুয়েল / কবিতা ও চলচ্চিত্র অবচেতনার এপিঠ-ওপিঠ / রাজিয়া সুলতানা অনূদিত

প্রকাশঃ December 11, 2016

লুই বুনুয়েল / কবিতা ও চলচ্চিত্র অবচেতনার এপিঠ-ওপিঠ / রাজিয়া সুলতানা অনূদিত
0
0

লুই বুনুয়েল / কবিতা ও চলচ্চিত্র অবচেতনার এপিঠ-ওপিঠ / রাজিয়া সুলতানা অনূদিত

অক্তাভিও পাস একবার বলেছিলেন, “শৃঙ্খলিত মানুষ যদি শুধু চোখ বুঁজে থাকতে পারে, তাহলে পৃথিবী বিস্ফোরিত হবে।” এই কথাটাকে আমি অন্যভাবে প্রকাশ করতে গিয়ে বলবো, চলচ্চিত্রের শাদা পর্দায় যদি সত্যিকারের আলোর প্রতিফলন ঘটতো, তাহলে পৃথিবীতে আগুন জ্বলে উঠতো। কিন্তু এখন আমরা নিশ্চিত ঘুমাতে পারি, কারণ চলচ্চিত্রের সত্যিকারের আলোকে সযত্নে আফিম খাইয়ে শেকল পরিয়ে রাখা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী অন্য কোনো শিল্পে – তার সুপ্ত সম্ভাবনা আর প্রাপ্তির মধ্যে এতটা ব্যবধান নেই। চলচ্চিত্র মূর্ত মানুষ ও বস্তুপৃথিবীকে পর্দায় উপস্থাপিত করে দর্শকদের উপর সরাসরি প্রতিঘাত সৃষ্টি করে। আমরা বিষয়টা এভাবে বলতে পারি, প্রেক্ষাগৃহের নৈঃশব্দ্য আর আলো-আঁধার দর্শকদের মানসিক অবস্থাকে পালটে দেয়, বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এসব কারণে অন্য যে কোনো মানবিক প্রকাশ-মাধ্যমের তুলনায় চলচ্চিত্র দর্শকদেরকে আরও সক্রিয়ভাবে আলোড়িত করতে পারে। আবার তা দর্শকদেরকে বোকাও বানাতে পারে। বর্তমানে চলচ্চিত্র-সৃষ্টির বিপুল সংখ্যা দেখে মনে হয়, এই দিকটাকেই দুর্ভাগ্যবশত ওইসব চলচ্চিত্র আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে। আমাদের প্রেক্ষাগৃহগুলির পর্দা প্রতিদিন এক নৈতিক এবং বুদ্ধিগত শূন্যতার মধ্যে দৃশ্যকল্পের মিছিল দেখিয়ে চলেছে, আর এই যে শূন্যতা তার মধ্যে চলচ্চিত্রের প্রসারও ঘটছে।

চলচ্চিত্র আসলে উপন্যাস বা নাটক অনুকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে – মাধ্যম হিসেবে যেগুলি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়-আশয়কে ঠিক ঠিক প্রকাশ করতে পারে না, মাধ্যম হিসেবে দুর্বল। বমি না আসা অব্দি এসব চলচ্চিত্র বারবার সেই একই গল্পগুলোকে চালিয়ে যাচ্ছে, উনিশশতকে যা ক্লান্তিকর হয়ে পড়েছিল। এসব সত্ত্বেও দেখা গেল, ওই একই বিষয়আশয় আধুনিক উপন্যাসে উপজীব্য হচ্ছে আর তার অভিঘাত এসে পড়ছে ওই উপন্যাসগুলোকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্রে।

যেসব উপন্যাসের উপর নির্ভর করে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এইসব সিনেমা নির্মিত হয়, সেসব গ্রন্থ একজন রুচিবোধসম্পন্ন পাঠক পাঠ করবার সময় নিঃসন্দেহে ছুঁড়ে ফেলে দেবেন। কিন্তু সেই একই ব্যক্তি অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে আরাম করে বসে ওই গ্রন্থের উপর নির্মিত ছবি দেখার সময় আলো আর গতির নেশায় মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েন। চলচ্চিত্রে দেখা মানুষের মুখের ছবি আর দৃশ্যের দ্রুত পরিবর্তনে আকৃষ্ট হন আর মুভিটাকে ঠিকই গ্রহণ করে ফেলেন। মুভিটা কতটা বাসি বা জীর্ণ হয়ে গেছে, তাতে তার কিছু আসে যায় না। অথচ সাহিত্য হিসেবে পড়তে গেলে তিনি এই গল্প নিয়ে লেখা বইটাকেই ছুঁড়ে ফেলে দিতেন।

চলচ্চিত্রের এই ঘুম-পাড়ানিয়া প্রতিবেশে দর্শক তার বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা, হারিয়ে ফেলেন। চলচ্চিত্র যেন এই ক্ষমতা আর দৃঢ়তাকে চুরি করে নেয়। আমি একটা বাস্তব দৃষ্টান্ত দিচ্ছি – যেমন রহস্যধর্মী চলচ্চিত্রের কথাই ধরুন। এর গল্পের কাঠামোটি যথার্থই আছে, পরিচালকও চমৎকার, অভিনেতা-অভিনেত্রীরা অসাধারণ, প্রযোজনাটিও মৌলিক। কিন্তু এই প্রতিভার ব্যবহার, নানা পদ্ধতির প্রয়োগ, চলচ্চিত্র নির্মাণের জটিল স্তরগুলো অতিক্রম করে যাওয়া হলো এমন একটা গল্পে যার বিষয়আশয় নির্বুদ্ধিতায় ভরা আর নৈতিকতার দিক থেকে অনেক নীচু, রুচিহীন। আমার এসব ক্ষেত্রে ‘ওপাস ১১’ নামের সেই অসাধারণ যন্ত্রটার কথা মনে পড়ে যায়। এটি বিশাল একটা যন্ত্র, তৈরি করা হয়েছে উন্নতমানের ইস্পাত দিয়ে, যন্ত্রটির আছে হাজার খানেক জটিল গিয়ার, টিউব, গ্যাসের চাপ মাপার যন্ত্র, ভারোত্তলক যন্ত্র। যেন একটা ঘড়ি যার সব কিছুই নিখুঁত, সূক্ষ্ণভাবে নির্মিত, আকারে মহাসাগরের জাহাজের মতো। কিন্তু এর একমাত্র কাজ হলো শুধু ছাপ মারা।

যে-কোনো শিল্পের একান্ত প্রয়োজনীয় উপাদান হচ্ছে রহস্যময়তা আর চলচ্চিত্রে সাধারণত এর অভাব থাকে। লেখক, পরিচালক ও প্রযোজকেরা আমাদের মানসিক শান্তিতে বিঘ্ন না ঘটাবার জন্য সযতনে চলচ্চিত্রের পর্দার জানালাটিকে মুক্তির সুবাতাস বয়ে আনা কবিতার জগতকে বন্ধ করে দেন। তারা পর্দায় এমনসব বিষয়কে প্রতিফলিত করেন যা আমাদের প্রাত্যহিক

জীবনের পরিণতিকে তুলে ধরে। দর্শক পছন্দ করেন, এমন বিষয় বা নাটকই বার বার দেখানো হয় যাতে আমরা আমাদের দৈনিন্দিন জীবনের গ্লানি ও একঘেয়েমিকে ভুলে থাকতে পারি। তাদের প্রয়াস অবশ্য প্রচলিত নৈতিকতা, সরাকরি নিয়ন্ত্রণ ও ধর্মের দ্বারা অনুপ্রাণিত থাকে। এছাড়া ওই মুভিগুলোর ওপর তথাকথিত সুরুচি, নির্দোষ কৌতুক আর ভোঁতা গদ্যের ‘প্রয়োজনীয়’ বাস্তবতার ছাপ মেরে দেওয়া হয়।

ভালো মুভি দেখতে আগ্রহী যে-কোনো দর্শক বড় বাজেটের ব্যয়বহুল প্রয়োজনা বা যেসব প্রযোজনা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে, খুব কমই দেখতে আগ্রহী হবেন। যে মানুষটি বর্তমানের এই পৃথিবীতে বেঁচে আছেন, আমার মতে, কোনো ব্যক্তিক কাহিনি বা নাটক সেইভাবে তাকে উৎসাহিত করতে পারে না। আসলে দর্শক যদি চলচ্চিত্রের পর্দায় উপস্থাপিত চরিত্রের আনন্দ, বেদনা ও যন্ত্রণার অংশীদার হয়ে ওঠেন, তার একমাত্র কারণ তিনি সেই চরিত্রটির মধ্যে সমগ্র সমাজ আর সেই সমাজের প্রসারিত রূপ হিসেবে নিজের আনন্দ বেদনা ও যন্ত্রণাকে প্রতিফলিত দেখতে পান।

বেকারত্ব, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, যুদ্ধের ভয় ইত্যাদি আজকের দিনের সব মানুষকে তাড়িত করে আর দর্শকও এর দ্বারা প্রভাবিত হন। কিন্তু অমুক সাহেব, পরিবারে যিনি স্ত্রীকে নিয়ে সুখী নন, খুঁজে ফেরে একজন বান্ধবী যে তাকে কিছুটা আনন্দ দেবে, এবং পরে তিনি স্ত্রীর কাছে ফিরে যাবেন, এরকম সরল গপ্প নীতিশিক্ষার জন্য ভালো, আত্মোন্নতিরও সহায়ক, কিন্তু চলচ্চিত্রের প্রতি আমাদের বীতস্পৃহ করে তোলে। কারণ জীবন এত সরল নয়, বরং অনেক জটিল।

চলচ্চিত্রের যে মূল কথা, মাঝে মাঝে অপ্রত্যাশিতভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ে একটি নিষ্প্রভ চলচ্চিত্র – স্লাপস্টিক কমেডি অথবা স্থূল আবেগপ্রবণ মুভি থেকে। চলচ্চিত্রকার মান রে একবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন : “আমাদের জীবনে যেসব নিম্নমানের চলচ্চিত্র আমি দেখেছি যা আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়, তার মধ্যেও পাঁচ মিনিটের মতো এমন কিছু থাকে যা বিস্ময়কর। দেখা যাবে সর্বশ্রেষ্ঠ বা সর্বপ্রশংসিত কোনো মুভিতে মাত্র ওই পাঁচ মিনিটই উজ্জ্বল কিছু পাওয়া যায়, যার জন্যে কষ্ট স্বীকার করে দর্শক।” একথার তাৎপর্য় হচ্ছে, ভালো বা মন্দ – সব ধরনের মুভিতেই পরিচালকের ক্ষমতা ও ইচ্ছা-অনিচ্ছার ঊর্ধ্বে চলচ্চিত্রের অন্তর্গত যে সত্য, যে কবিত্ব লুকিয়ে থাকে, স্বাভাবিকভাবেই সেইসব অনুষঙ্গ প্রকাশ করার জন্যে ব্যাকুল থাকে আর তা প্রকাশ করে ফেলে। এটাই হচ্ছে চলচ্চিত্রের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বা অন্তর্নিহিত কবিত্বশক্তি।

একজন উদারনৈতিক মানুষের কাছে চলচ্চিত্র একটি আশ্চর্য কিন্তু বিপজ্জনক অস্ত্র। চিন্তা, অনুভূতি ও প্রবৃত্তির জগতকে প্রকাশ করবার এটি সর্বোত্তম মাধ্যম। চলচ্চিত্রের চিত্রকল্প বা ইমেজগুলোর সৃজনশীল ব্যবহার এমন যে মানবিক সমস্ত প্রকাশ পদ্ধতির মধ্যে এর সঙ্গে মানুষের ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা মনের ক্রিয়াপদ্ধতি মিলে যায়। একটি মুভি আসলে স্বপ্নের অনিচ্ছাকৃত অনুসৃতির মতো। ফরাসি লেখক জাক ব্রুনিয়াস বলেছেন, প্রেক্ষাগৃহে অন্ধকার যেভাবে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে, তা যেন ঘুমানোর আগে মানুষের চোখ বন্ধ করে থাকার মতো। তারপর মানুষের ঘুমানোর সময় যেমন হয়, চলচ্চিত্রের পর্দাতেও তেমনি অবচেতনে নৈশযাত্রা শুরু হয়। চলচ্চিত্রে ‘ফেডিং’ প্রক্রিয়ার মধ্যে, স্বপ্নে যেমনটা ঘটে, ঠিক তেমনিভাবে বাকপ্রতিমাগুলো আসে আর মিলিয়ে যায়। চলচ্চিত্রে সময় ও স্থান নমনীয় থাকে, ইচ্ছামতো এই দুটি অনুষঙ্গকে পেছনে ও সামনের দিকে সম্প্রসারিত করা যায়। ফলে সময়ের ক্রম এবং সময়ের ব্যাপ্তি বাস্তবের মতো থাকে না। সময়ের আবর্তনের দিকটি স্থায়ী হতে পারে কয়েক মিনিট মাত্র অথবা কয়েক শতাব্দী ব্যাপী বিস্তৃত। ধীরগতি (স্লো মোশান) থেকে দ্রুতগতি অথবা এর বিপরীত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সময়ের অভিঘাতকে তীব্র করে তোলা যায়।

চলচ্চিত্র, মনে হয়, আবিষ্কৃত হয়েছে অবচেতনার জীবনকে প্রকাশ করবার জন্যে। এর গভীরে প্রবিষ্ট হয়ে আছে কবিতা। তবু চলচ্চিত্রকে খুব কমই এভাবে ব্যবহার করা হয়। আধুনিক চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ধারার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ধারাটি হচ্ছে নিও-রিয়্যালিজম বা নব্য-বাস্তববাদ। নিও-রিয়্যালিস্ট চলচ্চিত্রগুলো দর্শকদের কাছে যেসব মুহূর্ত উপস্থাপন করে তা যেন মনে হয় বাস্তব জীবন থেকে নেওয়া। বাস্তব মানুষের চিত্রায়ন। এইসব মুভির চরিত্রগুলো বাস্তব মানুষের মতোই হাঁটে এবং এই ধরনের মুভিতে থাকে বাস্তবে দেখা প্রাকৃতিক ও অভ্যন্তরীণ দৃশ্যাবলির হুবহু চিত্রায়ন। তবে সাধারণভাবে নব্য-বাস্তববাদ যথাযথ এবং তাৎপর্যপূর্ণ এমন কিছু উপস্থাপন করেনি যাতে চলচ্চিত্রের সত্যিকার প্রাণসত্তা উজ্জীবিত হয়। অবশ্য এর মধ্যেও কিছু ব্যতিক্রম আছে, যেমন ফেলিনির ‘বাইসাইকল থীভস’। চলচ্চিত্রে প্রাণসত্তা বলতে আসলে আমি বুঝি যা রহস্যময় ও কল্পনাঋদ্ধ (ফ্যান্টাসটিক)।

কোনো মুভির অন্তর্গত পরিস্থিতি, চরিত্রগুলোর মনোগত অভিপ্রায় যা চরিত্রগুলোকে চালিত করে এবং প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, এমনকি এর গল্পের কাঠামোকে যদি কোনো রক্ষণশীল ও আবেগসর্বস্ব সাহিত্যের ছকে ফেলা হয়, তাহলে সেই মুভিতে উপস্থাপিত দৃশ্যের ভূমিকাটা কী হবে – এমন একটা প্রশ্ন উঠতে পারে। প্রত্যুত্তরে বলবো, সাধারণভাবে নব্য-বাস্তববাদ থেকে নয়, সুনির্দিষ্টভাবে বললে বাই সাইকল থীভসের চিত্রনাট্যকার জাভাত্তিনির কাছ থেকে মহত্তম অবদানটি পাওয়া যেতে পারে। জাভাত্তিনি তার চিত্রনাট্যে দৈনন্দিন তুচ্ছতাকে গভীর নাটকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল করে তুলেছেন। নব্য-বাস্তববাদী চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে একটা চিত্তাকর্ষক চলচ্চিত্র হচ্ছে ‘উমবের্তো ডি’। এই ছবিতে একটা মেয়ে এমন কিছু দৈনন্দিন কাজ করে যাচ্ছে যা দেখাতে দশ মিনিটের একটা রিল খরচ করা হয়েছে। কিছুকাল আগেও এরকম বিষয়কে কেউ চলচ্চিত্রায়িত করার উপযুক্ত মনে করেননি। আমরা দেখি মেয়েটি রান্নাঘরে যায়, আগুন জ্বালায়, রান্না করার এবং খাবার পরিবেশনের পাত্র নেয়, দেয়ালের ওপর হেঁটে যাওয়া কতকগুলো পিঁপড়ের উপর পানি ছুঁড়ে মারে এবং একজন বয়স্ক মানুষের গায়ের তাপমাত্রা দেখে। পুরা পরিস্থিতিটি তুচ্ছ হওয়া সত্ত্বেও আমরা কিন্তু আগ্রহের সঙ্গে, এমনকি উত্তেজনার সঙ্গে তার গতিবিধি লক্ষ্য করি।

চলচ্চিত্র-ভাষার উৎকর্ষ সাধনের জন্য নব্য-বাস্তববাদ অবশ্যেই কিছু নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কিন্তু এর বেশি কিছু নয়। নব্য-বাস্তববাদী বাস্তবতা অসম্পূর্ণ, গতানুগতিক, সর্বোপরি যুক্তি-নির্ভর। কবিতা ও রহস্যময়তা – এগুলো স্বাভাবিক বাস্তবতাকে পূর্ণ করে, এর বিস্তার ঘটায়, কিন্তু নব্য-বাস্তববাদী চলচ্চিত্রে তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। নব্য-বাস্তববাদ ব্যাঙ্গধর্মী কল্পনাটককে কল্পকাহিনি এবং অদ্ভুত রসের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে।

আঁদ্রে ব্রেতোঁ বলেছেন, কল্পকাহিনির সবচেয়ে প্রশংসনীয় ব্যাপার হচ্ছে, এর আসলে কোনো অস্তিত্বই নেই, সবকিছুই বাস্তব।” কয়েক মাস আগে আমি জাভাত্তিনির সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তাকে বললাম, নব্য-বাস্তববাদের প্রতি আমার কোনো সহানুভূতি নেই। তখন আমরা একসঙ্গে আহার করছিলাম। দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রথমেই মনে এলো একগ্লাস মদের কথা। আমি বললাম, একজন নব্য-বাস্তববাদীর কাছে একটা গ্লাস, গ্লাসই। আমরা দেখি, তাড়াতাড়ি গ্লাসটিকে রান্নাঘরে নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে পরিচারিকা সেটিকে পরিস্কার করবে অথবা ভেঙে ফেলতেও পারে, এ জন্যে সে তিরস্কৃত হতে পারে আবার নাও হতে পারে, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এই একই গ্লাস বিভিন্ন মানুষের দৃষ্টিতে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। কেননা প্রত্যেক মানুষই গ্লাসটিকে কমবেশি নিজের অনুভূতি মিশিয়ে দেখবে, গ্লাসটি বাস্তবে যেমন আছে সেইভাবে দেখবে না। ভিন্ন ভিন্ন মানুষ যেভাবে তার ইচ্ছা অথবা যেমন তার মানসিক অবস্থান, গ্লাসটিকে সেইভাবে দেখতে চাইবে। আমি সেই ধরনের চলচ্চিত্রের জন্য লড়াই করছি যা আমাকে এই ধরনের গ্লাস দেখাবে। এভাবেই আমি যে ধরনের চলচ্চিত্র চাই সেই ধরনের চলচ্চিত্র বাস্তবকে সম্পূর্ণভাবে দেখাবে, বিভিন্ন জিনিস ও মানুষ সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতার প্রসার ঘটাবে। আমার চোখে উন্মুক্ত করবে অচেনা বিস্ময়কর জগতের সবকিছু, যা আমি কোনো পত্রিকায় বা পথে-ঘাটে পাব না।

আমি এতক্ষণ যা বললাম সেজন্য মনে করবেন না যে আমি শুধু কল্পনাপ্রবণ রহস্যময় চলচ্চিত্রের পক্ষে। অথবা মনে করবেন না আমি সেই ধরনের চলচ্চিত্রের পক্ষে যা দৈনন্দিন বাস্তবতাকে এড়িয়ে চলে বা তাকে অবজ্ঞা করতে চায় আর কেবলি স্বপ্নের অবচেতনার মায়ালোকে আমাদের নিমজ্জিত রাখতে চায়।

কিছুদিন আগে আমি আমার মূল কথাগুলোকে স্পষ্ট করে বলেছি। বলেছি, আমি সেই চলচ্চিত্রকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই যা আধুনিক মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলোকে প্রকাশ করে। আমি তাই স্পষ্ট করে বলতে চাই, মানুষকে আমি বিচ্ছিন্ন করে ভাবি না। কোনো একজন মানুষকে এককভাবে নয়, অন্যান্য নানা মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে বিচার করে দেখতে চাই। আমার এই কথার স্বপক্ষে আমি বরং ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের একটা উক্তি ব্যবহার করি। যে-উক্তিটি আমি মান্য করি। একজন ঔপন্যাসিকের ভূমিকা কী হওয়া উচিত সেই প্রসঙ্গে এঙ্গেলস বলেছিলেন : “একজন ঔপন্যাসিক যদি তাঁর রচনায় প্রামাণ্য সামাজিক সম্পর্কগুলোর নিখুঁত চিত্রায়ণের মাধ্যমে সেইসব সম্পর্কগুলোর প্রকৃতি সম্পর্কে জীর্ণ-প্রচলিত ধারণাগুলোকে ধ্বংস করতে পারেন, যদি বুর্জোয়া জগতের মিথ্যা প্রবঞ্চনাময় আশাবাদকে চূর্ণ করতে পারেন, যদি পারেন চলতি অবস্থার স্থায়িত্ব সম্পর্কে পাঠকের মনে দুর্বার প্রশ্ন তুলতে, পাঠক তাঁর লেখা পড়ে যে প্রশ্নগুলো ভাবতে বাধ্য হবে – তাহলে শুধু তাহলেই সেই ঔপন্যাসিক শিল্পের পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হবে। তাতে তিনি যদি সমস্যার সমাধান নাও দিতে পারেন, বা কোনো নির্দিষ্ট পক্ষ নাও গ্রহণ করতে পারেন, তবু তার বিরুদ্ধে বলবার কিছু থাকবে না।”

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close