Home কবিতা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন >> নির্বাচিত ৩টি কবিতা / জয় গোস্বামী এবং পিনাকেশ সরকারের প্রবন্ধ

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন >> নির্বাচিত ৩টি কবিতা / জয় গোস্বামী এবং পিনাকেশ সরকারের প্রবন্ধ

প্রকাশঃ November 25, 2017

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন >> নির্বাচিত ৩টি কবিতা / জয় গোস্বামী এবং পিনাকেশ সরকারের প্রবন্ধ
0
0

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন >> নির্বাচিত ৩টি কবিতা / জয় গোস্বামী এবং পিনাকেশ সরকারের প্রবন্ধ

 

[সম্পাদকীয় নোট : গতকাল ২৫ নভেম্বর ছিল কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন। পঞ্চাশের দশকের এই কবি বাংলা কবিতায় যে নতুন স্বর ও শৈলীর পরিচয় দিয়ে পাঠকপ্রিয় হয়েছিলেন, তাঁর প্রতি তীরন্দাজ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছে। এই উপলক্ষে আমরা শক্তির তিনটি বাছাই কবিতা আর দুটি প্রবন্ধ প্রকাশ করছি। এর একটি লিখেছেন কবি জয় গোস্বামী আরেকটি প্রাবন্ধিক পিনাকেশ সরকার।]

শক্তি চট্টোপাধ্যায়-এর তিনটি কবিতা
কবি কাহিনী

মন্দে ডোবা লোক, কবি।
মাথা ভাসছে পিপের ওপর।
পিপেটি সমুদ্রযাত্রী—
যাও, ওকে পরাও টোপর।

টোপরে পতাকা উড়ছে,
তাকে ঘিরে গাঙচিলও ওড়ে
ঠোঁটে সদ্য ধরা মাছ। কৌতুহলী হতে গিয়ে
ঠোঁট ফসকে জলে এসে পড়ে

ফসকে পড়া শব্দ ধরে
মদ থেকে ভেসে ওঠে লোক।
পিপেদ্বীপ। তার ওপর সে বসে কবিতা লিখছে…
হে সমুদ্র, এই দৃশ্য ফ্রিজ করা হোক!
শক্তি

শেষ বয়সের লেখা বহুদিন শেষ হয়ে গেছে।

তারপরও কবি আরও বেঁচে ছিল দশ-বারো বছর।
সন্তান-কবিরা তাই বলে।
এসব শুনেও আমি খুলি সব শেষের পুস্তক।
খুলে দেখি, সারল্য, শিখরমাত্র জেগে আছে
চাঁদের আলোয়-
জলের তলায় যাওয়া মূল পাহাড়ের
কালো ভারী অবয়ব ক্রমশ তলিয়ে গেছে।
আরও বেশি অন্ধকার জলে…

 

কক্সবাজারে সন্ধ্যা

 

চাকমার পাহাড়ি বস্তি, বুদ্ধমন্দিরের চূড়া ছুঁয়ে
ডাকহরকরা চাঁদ মেঘের পল্লীর ঘরে ঘরে
শুভেচ্ছা জানাতে যায়, কেঁদে ফেরে ঘণ্টার রোদন
চারদিকে। বাঁশের ঘরে ফালা ফালা দোচোয়ানি চাঁদ
পূর্ণিমার বৌদ্ধ চাঁদ, চাকমার মুখশ্রীমাখা চাঁদ!
নতুন নির্মিত বাড়ি সমুদ্রের জলে ঝুঁকে আছে।
প্রতিষ্ঠাবেষ্টিত ঝাউ, কাজুবাদামের গাছ, বালু
গোটাদিন তেতেপুড়ে, শ্রীতলে নিষ্ক্রান্ত হবে বলে
বাতাসের ভিক্ষাপ্রার্থী! জল সরে গেছে বহুদূর।
নীলাভ মসলিন নিয়ে বহুদূরে বঙ্গোপসাগর
আজ, এই সন্ধ্যাবেলা।
ব্ল্যাকডক মধ্যিখানে নিয়ে দুই কবির কৈশোর
দুটি রাঙা পদচ্ছাপ মেলানোর তদবিরে ব্যাকুল
ব্যর্থ আলোচনা করে, গানের সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ে,
বর্ণমালা নিয়ে লোফালুফি করে তীরে!
রুপচাঁদা জালে পড়ে, খোলামকুচির মতো খেদ
রীভীন কাঁকড়ার স্তূপ সংঘ ভেঙে ছড়ায় মাদুরে
একা একা। উপকূলে।
বুদ্ধপূর্ণিমার চাঁদ কক্সবাজারের কনে-দেখা
আলোয় বিভ্রান্ত আজ। অধিকন্তু, ভরসন্ধেবেলা!
জয় গোস্বামীর প্রবন্ধ >> শব্দের ভিতর দিয়ে দেখা
সেই শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে আমি কখনও দেখিনি যিনি মধ্যরাত্রে কলকাতা শাসন করতেন। দেখিনি তাঁর বিখ্যাত অজস্র মাতলামির একটিও ঘটনা। দেখিনি ফুটপাতে তাঁর শুয়ে পড়া, বা শুয়ে আকাশে তাকানো। শুনেছি, কীভাবে তৃতীয় প্রহর রাত্রে, লাল দোতলা বাস, তাঁর কবিতার প্লাতেরোর মতন, শক্তিকে পৌঁছে দিতে এসেছিল বাড়ির দরজায়। কিন্তু যথেচ্ছাচারের কাছে কীভাবে নিজেকে সঁপেছিলেন শক্তি, তা কখনও চাক্ষুষ করিনি। এবং করিনি যে, তা জেনে, এক অগ্রজ খেদ করেছিলেন, এঃ, তবে তো তুমি শক্তিকে কিছুই চেনো না, শহরে বসে সুন্দরবনের গল্প শুনে কি বাঘকে চেনা যায়?

ঠিক, চিনিনি কিছুই। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার সামান্য মুখোমুখি জানাশোনা সকালের অফিস চত্বরে। দু’বার জন্মদিনের বিকেলে, তাঁর গৃহে। যখন তিনি একফোঁটাও পান করে নেই। যখন তাঁর সহাস্য সহৃদয় স্নেহশীলতার মধ্যে— গতরাত্রের বা গতজীবনের উদ্দাম তোলপাড়ের সেই সব বিখ্যাত চিহ্ন উপস্থিত নয়। সে হল এক আশীর্বাদ, আমার কাছে, যে এই এলোমেলো জীবনযাপনের মধ্যে দিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে দেখলাম না। আমি তাঁকে দেখলাম শব্দের ভিতর দিয়ে। কেননা, লিখিত শব্দই, লেখকের, প্রথম ও শেষ পরিচয় । এই প্রথম ও শেষের মাঝখানে যত ঘটনা ঘটে, তারা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে কুৎসা বা কীর্তিগাথা রূপে। একসময় কিংবদন্তিতে রূপান্তরিত হয়, আরও পুরোনাে হলে, সেই কিংবদন্তি উড়ে যায় ধুলোয়; এই রৌদ্র, হাওয়া, এই নিশ্চিন্ত পাগল ধুলোবালি। শুধু এই লেখা বা ধুলোবালি ছড়িয়ে পড়ে আমার বা যে কোনও পাঠকের জীবনের বাহিরে ভিতরে।

আমি বার বার নীরব রইলাম—
শক্তিকে খালসিটোলায় যে না দেখেছে সে শক্তিকে বুঝবে কি করে, এ কথার সামনে আমি বার বার নীরব রইলাম। শক্তির মৃত্যুর ঠিক পরে, সন্ধ্যার শ্মশান থেকে পরবর্তী দিনগুলোতে আমি বার বার শুনলাম, পঙক্তির মুহুর্মুহু উচ্চারণ অনুরাগীদের শোকাকুল কণ্ঠে— যে কাব্যস্মরণ কিছুদিনের মধ্যেই ঘুরে যাচ্ছে কবিতা ছেড়ে শক্তির আরও অনেক উদ্ভট, আজব, অপ্রত্যাশিত মুশকিলে পড়ার ও মুশকিলে ফেলার জবরদস্ত কাহিনীতে। পানোন্মত্ত কাহিনীতে। সেই অনুরাগীদের সত্য হাহাকার ও শোক, শেষ পর্যায়ে মদের গেলাসে আবার আর একবার ডুবে যাওয়া থেকে নিজেদের ওঠাতে পারছে না। যেমন আজও এই কবিসম্মেলনমুখর কলকাতা শহরের শতকরা ৮০ ভাগ কাব্যপাঠ উৎসব শেষ হয় পানশালায় পৌঁছে বা ব্যক্তিগত পানশালা রচনা করে। যদিও, এ কথা সত্য, সেইসব পানোৎসব বাংলা কাব্যে আর একটিও শক্তি চট্টোপাধ্যায় উপহার দিতে পারে না।
এমনকী, মৃত্যুর পরে তাঁর সম্বন্ধে লিখিত আলোচনাতেও, দু’তিনটি মাত্র শ্রদ্ধেয় ব্যতিক্রম ছাড়া, প্রায়ই লম্বা ছায়া ফেলে রাখে শক্তির জীবনকথা। যে জীবন কথার অতি-উত্থাপন, শক্তির কবিতাকে শুধুই শক্তির ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে মত্ততার সঙ্গে বাহিরের আপাত  বিশৃঙ্খলার সঙ্গে জুড়ে দিতে চায়। পাঠকের নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে তার সঙ্গে যুক্ত হতে যেন বাধা দেয়। দূরে ঠেলে রাখে। সংকেতের দূরগামিতা হ্রাস করে। কবিতার অর্থ ক্ষীণতর হয়। কেননা শক্তির কবিতা চিরকাল প্রবলভাবে সংকেত করেছে। বাচ্যার্থের গণ্ডি থেকে বারংবার শব্দকে উৎক্ষেপ করেছে সীমাহীনতায়। মুক্তি দিয়েছে, স্বাধীন করেছে তার অর্থকে। যে কোনও পাঠকের জন্য স্বাধীন। তোমার জীবন অভিজ্ঞতা দিয়েই তুমি ধরতে পারবে শক্তির কবিতাকে, তার জন্য শক্তির মতো জীবন-যাপনের দরকার হবে না। শক্তির কবিতা শুধু আজকের দিনের জন্য নয়, যে কোনও দিনের জন্য। সাময়িক প্রসঙ্গের উত্তেজনা ফুরোলে, শক্তির কবিতার গভীরতা কমে না।
বহুদিন ধরে কবিতার মধ্যে—
সেইখানেই মহৎ কবি সংকেত করার ক্ষমতাকে বহুদিন ধরে কবিতার মধ্যে সঞ্চিত করে রাখতে পারেন বলেই তিনি বড়ো। দিন, কাল, জীবন এবং বয়স পাল্টে গেলেও তাঁর কবিতা নতুন নতুন অর্থ উদঘাটন করে তার পাঠকের কাছে। এজন্যই শক্তি শুধুমাত্র চমৎকার, শুধুমাত্র দুৰ্দান্ত বা শুধুমাত্র বেপরোয়া ভাঙাগড়ার ছন্দরত্নাকর নন। এ পরিচয় তাঁর অনেক দিন চলেছে।
এ পরিচয়ের কিছু বাস্তব কারণও আছে। একজন মানুষকে তুমি চোখের সামনে দেখছি। কাছ থেকে দেখছ, তার হাঁটাচলা, কথা বলা, সম্পর্ক গড়া, সম্পর্ক ভাঙা, তার ভালো ব্যবহার, খারাপ ব্যবহার, সবই তোমাদের মধ্যে ছাপ ফেলছে। সেই প্রভাব সম্পূর্ণ সরিয়ে ফেলে, মনকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বাইরে এনে কবিতাটা পড়তে পারবে, তা না-হতেও পারে। না-হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। মুখে তুমি যতই নিরপেক্ষ বা নৈর্ব্যক্তিক বলে দাবি করো নিজেকে, কিন্তু তোমারও কী একটা অহং নেই? আছেই তো। কারও ভালো ব্যবহার বা খারাপ ব্যবহার তোমার অহংকে তুষ্ট বা আহত করবে না, একী হয়, কবিতাটি পড়বার সময় সেই তুষ্ট বা আহত অহং তার প্রভাব বিস্তার করবে তোমার ওপর, তোমার মতামত চলাফেরা করবে, সেই অনুযায়ী। তুমি তার কবিতাকে শিরোধাৰ্য করবে বা উড়িয়ে দেবে সেই প্রভাবে। সেই জন্যই জীবৎকাল পার হওয়ার পর একজন কবির ঠিক পরিচয় পাওয়া যায়। যখন এই সব ঝড় ক্ষীণ।
শক্তির ক্ষেত্রেও এই রকম হয়েছিল। বেপরোয়া স্পষ্টবাক শক্তি লিখেছিলেন, এত কবি কেন? তারপর ঝড় উঠেছিল চারিদিকে। শক্তি তখন ক্লান্ত, কিছু অবসন্ন। কিন্তু গণ্য করেননি। সেই ঝড়কে। নিজের মনের কথা বলেছেন তার পরেও, স্পষ্ট করেই। এ কথা সবারই জানা যে, মনের কথা বলবে বলেই একজন লেখক লিখতে আসে। কিন্তু কিছুদিন পরেই সেই লেখক ভাবতে থাকে, আমি যদি মনের কথা বলি, তাতে অন্য কেউ মনঃক্ষুন্ন হবে না তো, এইখানেই লেখক স্বাধীনতা হারায়। এবং কাউকে না রাগিয়ে নির্বিরোধী কথা বলার অভ্যাস রপ্ত কর নেয়।
শক্তি সেই অভ্যাস করলেন না, আবারও লিখে দিলেন, নতুন কবিদের কেউ তাঁর কাছে এলে শক্তি তাঁদের বলেন, শেক্সপীয়রের সনেট অনুবাদ করে এনে দেখাও। পরে তোমার নিজের কবিতা দেখব। সে কথা শুনে যারা চলে যায় তারা আর ফিরে আসে না। এই মর্মে দুঃখ করলেন শক্তি।

তাঁর মৃত্যুর আট বছর পরে একটি ফাল্গুন দুপুরে, আমি অবাক হয়ে দেখলাম এক হিন্দিভাষী মানুষকে; যার ব্যাগে খাত ভর্তি শক্তির কবিতা। দেবনাগরী স্ক্রিপ্টে, প্রথমে লেখা আছে বাংলা কবিতাটি। তারপর ইংরেজি তর্জমা, শেষে হিন্দি অনুবাদ। বললাম, অনুবাদের বই বার করবেন বুঝি, তিনি বললেন, না তো! শক্তিকে বুঝতে চাই, তাই দুটি ভাষায় অনুবাদ করে করে পড়ছি। এই মানুষটি, বসন্ত রুংতা, শক্তিকে সেভাবে চিনতেন না।

বাঙালি তরুণ কবিরা অবশ্য শক্তির শেক্সপিয়র অনুবাদের হােমটাস্ক পেয়ে অভিমান করেছিলেন। উঠেছিল না-না করার ঘূর্ণি। আবার তা মিলিয়েও গিয়েছিল ভালোবাসাতেই।

ভালোবাসলেই অভিমান সম্ভব, ঠিক। তবু অভিমানের আলো আঁধারে তুমি হয়তো, খেয়াল করে দ্যাখোনি যে, কবি অনেক সময়ই ছদ্মবেশ ধরে ঘুরে বেড়ায় হারুন-অল-রশিদের মতোই। মাতালের ছদ্মবেশে রাস্তায় পড়ে ঘুমোয়। জঙ্গলে পালায়। নিজেই একটা হইচই হয়ে যে কোনও হল্লাগুল্লার মধ্যে লুকিয়ে পড়ে। তুমি তাকে ধরতে পারো না। এতসব কাণ্ডকারখানার আড়ালে সে আসলে লুকিয়ে রাখে নিজের অন্তঃসার কবিত্বটুকু। ওইটে হারালেই যে তার সব গেল।
সেই সমাজে আমরা রয়েছি এখন, যে সমাজে সবচেয়ে দ্রুত ক্ষয় হয় অন্তঃসারের। দ্রুত স্বীকৃতি, পুরস্কারের উষ্ণীষ, সভামঞ্চের পুষ্পস্তবক, সংবর্ধনার শাল-আলোয়ান উপর্যুপরি জমতে জমতে ঢেকে ফেলতে থাকে, মেরে ফেলতে থাকে ভেতরের বালকটিকে। কবিত্বকে পেতে পেতে এমনই অভ্যাস হয় যে মনে হয় আমি এর যোগ্য। নিজের সম্পর্কে ভুল বিশ্বাস তৈরি হয়, না পেলে ক্ষোভ হয়। ভুল ক্ষোভ।
পাগল যেমন তার পাগলামিটুকু—
দীর্ঘদিন ধরে শান্ত এক পাগল থাকে উন্মাদ আশ্রমে। তার ঘরে একটা জল রাখার কুঁজো, গেলাস। তার ঘরে চেয়ার আর খাট একটা। অনেক দিন তাকে বাড়ি থেকে দেখতে আসে না কেউ। একদিন হাসপাতালের কর্মী চেয়ারটি একটু মেরামতের জন্য ঘর থেকে বার করতে যেতেই হিংস্র ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল সেই শান্ত উন্মাদ। কারণ কী?
সাংঘাতিক সেই কারণ। যে ডাক্তার বন্ধুর কাছে শুনছিলাম এই গল্প তিনি বললেন, জলের কুঁজো, খাট আর চেয়ারকে সে নিজের প্রপাটি ভাবতে শুরু করেছে এতদিনে। তাই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। সে ভুলে গেছে ওগুলো হাসপাতালের সম্পত্তি।
ওই পাগল যেমন তার পাগলামিটুকু নিয়ে এসেছে উন্মাদ আশ্রমে, এই সমাজে কবিরও আছে তাঁর কবিত্বটুকু। পুরস্কার আর পুষ্পস্তবক সভামঞ্চ আর মালা,- ওই জলের কুঁজো আর চেয়ারের মতোই, সমাজের সম্পত্তি। কবি তাকে নিজের সম্পত্তি ভাববেন কেন? কবি তো আর পাগল নন।
শক্তি ভাবেননি, সারাজীবন তাঁর কবিতা সৌন্দর্য়ের উপাসনা করেছে। জীবনের স্বাভাবিক সব অপরাহ্নবেলা মেনে নিয়েছে। ক্ষয়, অবসানের মধ্যে দিয়ে গেছে। কিন্তু নিঃস্ব হয়নি কখনও। আপাত সরল কবিতাগুলি যাওয়ার পথে কত গোপন মীড় খোঁচ, কত নিভৃত সুরবিস্তার রেখে গেছে। যে ভাবে জানকী বনপথে ফেলতে ফেলতে গেছেন তাঁর অলংকার। কেউ এসে পথ চিনে নেবে বলে। সেই রকমই শক্তির শেষজীবনের কবিতায় বিকেলের শেষ আলো এসে পড়েছিল। আমরা দেখিনি। পুরিয়া ধানেশ্ৰীর স্নান, সুদূর, আকােশরঙ তাঁর শেষ বইগুলিতে ছড়িয়ে রইল। আজ তাঁর জন্মদিন আমাদের সেই আকাশ চিনে নিতে আর কত দেরি?
[শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ৭১তম জন্মদিন উপলক্ষে লেখা]

 

পিনাকেশ সরকারের প্রবন্ধ >> শুদ্ধ সীমা থেকে যাত্রা : শক্তি চট্টোপাধ্যায়

 

ভালোবাসা কথা বলো হক না সে ছাঁচের মতন / নিষ্ঠুর, নঞর্থ কথা বলে আমার ভিতরে বৃষ্টির মতন কথা, বিদ্যুতের, শিকড়ের কথা—” এই মিনতি যার, তিনি আমাদের সময়ের সবচেয়ে শক্তিমান কবিদের একজন : শক্তি চট্টোপাধ্যায়। দেখতে দেখতে শক্তিও পঞ্চাশ ছুঁলেন। কিন্তু বয়স, প্রাজ্ঞতা, হিসেব; আগুপিছু বিবেচনা—কিছুই শক্তিকে স্পর্শ করতে পারে নি। এখনকার কবিদের মধ্যে শক্তি বোধহয় সবচেয়ে বহুপ্রসূ তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ (অনুবাদগুলি বাদ দিলে) কুড়ি বা তার কাছাকাছি। শুধু প্রভূত লেখার দ্বারাও হয়তো এক ধরনের অনায়াস স্বচ্ছন্দস্বভাব তৈরি হয়ে যেতে পারে একজন কবির। যার ফলে এমনকি হেলাফেলা করে লেখা শক্তির বেশ কিছু কবিতার (শক্তির ভাষায় ‘পদ্যের’) মধ্যেও আমরা টের পাই তার অমোঘ ক্ষমতার। আপাতভাবে সরল অবিন্যস্ত শব্দগুচ্ছের নিরীহ ঝাঁপি ভেদ করে তাই হঠাৎ হঠাৎ আমাদের ছোবল দিয়ে যায় শক্তির কবিতার কোন কোন প্রতিমা, টুকরো কোন শব্দবন্ধ কিংবা হয়ত আস্ত কোন লিরিক। আমাদের বশ মানিয়ে ফেলে নিমেষেই, আচ্ছন্ন করতে উদ্যত হয়। শক্তির কবিতা আমাদের তাই সতত উন্মুখ করে রাখে, আচমকা অভিভবের কিনারে টেনে আনে। সেই ১৯৬১-র গোড়া ঘেঁষে বেরিয়েছিল শক্তির প্রথম বই ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য।’ তারপর থেকে আজ পর্যন্ত অব্যাহত গতিতে লিখে চলেছেন শক্তি। কখনও চৌদ্দ মাত্রার বাঁধা পয়ারে, কখনও বা খোলামেলা দীর্ঘতর অক্ষরবৃত্তে, মাত্রাবৃত্তে, কখনও-বা হালকা ছড়ার ছাঁদে ছন্দকে ইচ্ছেমত খেলাতে জানেন শক্তি, দু-একটা সামান্য মোচড়ে শব্দের ভেতর থেকে কুরে আনেন নতুন আয়তন। বিশেষ করে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার কথ্য ভাষার চালকে যেভাবে তিনি তার কবিতার মধ্যে প্রয়োগ করেন, তা বিস্ময়কর। যেমন—গলার কাছটা ধরলি মন লয় জোব্বারের মা, কণ্ঠ শুনলি মনে লয় শানপুকুরের পেলানি গা’র গন্ধে আঙা পথের দাগ一 (আলো জ্বালাতে পারলে/ হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান)
কখনও গোটা কবিতায়, কখনও খণ্ড খণ্ড শব্দে শক্তি ভরে দেন আবেষ্টনীর এক নিবিড় আবেশ, অনেকটা জীবনানন্দের ধরনে তার মধ্যে একদিকে যেমন আছে বাল্যস্মৃতির মগ্ন রোমন্থন, বাংলাদেশের একান্ত সহজ মমতামাখা জীবনের রূপমায়া, অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত রহস্য-দুৰ্গম বনজঙ্গল পাখিপাখালির ডাকবাংলো গিরিদরী প্রান্তরের হাতছানি। আসলে শক্তি দুৰ্মরভাবেই রোম্যান্টিক। একবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন : আমার রক্তের মধ্যেই একটা গণ্ডগোল আছে। সেটা আমার ছন্নছাড়া ভাবটা। ছন্নছাড়া জীবনটা আমার খুব ভাল লাগে।… এক-এক সময় মনে হয় পরনের কাপড়টাকে মাথায় বেঁধে বেরিয়ে যাই।” এই বেরিয়ে পড়ার উদ্দেশ্যহীন ভ্রমণের ছবি তাই বারবার আসে তার কবিতায়। কখনও তাঁর পিছনে থাকে কিছু কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা, কখনও বা বিশুদ্ধ জল্পনা। এখানেও হয়ত জীবনানন্দের সঙ্গে একটা মিল লক্ষ করা যায় শক্তির। জীবনানন্দের পথ হাঁটার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া যায় শক্তির এইসব উচ্চারণ : ‘জানালার কাছে বসে মনে হয়। পৃথিবীতে শুধু / এসেছি জাহাজে ভেসে যাবো বলে / কোনদিকে নয়’ কিংবা ‘কলকাতার মৌলালিতে পাইপের ভেতর অমন মুমুক্ষু দেখেছি। আমি অনেক / বৃষ্টির দিনে দেখেছি সঞ্চরমাণ ট্রাম স্টিমারের মতো কালরাতে এমন অন্ধকার গ্রীসদেশে ঘুরেছি আমি অনেক।’
শক্তির কবিতায় রোমান্টিকতার তীব্র আবেশজড়িমা একসময় খুবই সাড়া জাগিয়েছিল। ধর্মে আছো জিরাফেও আছো-র স্বপ্নবিধুর লিরিক আমাদের বুকে একদা বেজে উঠেছিল উতরোল জলতরঙ্গের মতো। বস্তুত কবিতা যখন ক্রমশই বক্তৃতায় বিবৃতিতে ক্ষয়ে-পুড়ে ঝিমিয়ে আসছিল, শক্তি তখন সন্দেহাতীতভাবে বাংলা কবিতায় ফিরিয়ে এনেছিলেন ব্যক্তিগত স্বরসুধা। আমাদের মনে দাগ কেটেছিল শক্তির এই বিশ্বাস : ‘তোমার নয় কুটকচাল, টানাপোড়েন, সর্বজনীন মৌতাত, রাধেশ্যাম/ যাত্রী তুমি—পথে-বিপথে সবেতেই তোমার টান থাকবে এই তো চাই ।’
কবিতার অন্তঃসারকে সেদিন ছেঁকে এনেছিলেন শঙ্খ-অলোকরঞ্জন শক্তি-সুনীল তাঁদের নিজ নিজ ভঙ্গিতে, স্বাতন্ত্র্যে।
শক্তির মধ্যে যে বৈশিষ্ট্য প্রথমাবধি চোখে পড়ে, তা হল জীবনের সঙ্গে তার সোনালি গাঁটছড়া বেঁধে নির্লিপ্তভাবে থাকা, উত্তাল প্রেম ও গেরুয়া বিবিক্তি এই দুই বিপ্ৰতীপ প্রবণতা শক্তির কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছে এক বিচিত্র দ্বৈধ। চতুর্দশপদী কবিতাবলীর অনেকগুলি সনেটে কিংবা ‘সোনার মাছি খুন করেছি’র একাধিক কবিতায় আমরা স্বাদ পেয়েছি ভালবাসার উষ্ণ মদিরাঘন উচ্চারণের : ‘আমি মুক্তি মানে বুঝি / তোমার বুকের পরে বসে-থাকা, গায়ে থাবা গুঁজি / তোমারে জাগাতে যেন কুমোরের মতন গম্বুজে।’ তারই পাশাপাশি-শুনতে পেয়েছি কবির ঈষৎ নিরাসক্ত মনের কথা : ‘কে তুই মাছি দুঃখদায়ক/ আমাকে বাঁধনে বেঁধে ফেলে রেখেছিস। তোর কোটরে/ হেঁটোয় কাঁটা—ওপরে কাটা, এই কি দীর্ঘ জীবনযাপন?’ কিংবা সাম্প্রতিক কালে : ‘যে কোনো দিকেই যেন ভেসে যাওয়া চলে / যাবার সন্ন্যাসে।’ বয়স বাড়ার জন্যই কিনা জানিনা, শক্তির ইদানীন্তন কিছু কিছু কবিতায় মাঝেমাঝে শুনতে পাচ্ছি ক্লান্তির সুর, ভারবহনের অবসাদ। বিশেষত ‘যেতে পারি কিন্তু কোন যাবো’ এবং ‘কোথাকার তরবারি কোথায় রেখেছো’-র অনেক কবিতায় এই বিষণ্নতার ছোঁয়া লেগেছে। যখন তিনি বলেন : ‘গভীর গাছের নিচে বসে থাকি যেন শুকনো পাতা’ বা ‘শেষের দিনেও ওড়ে প্রীতিপ্ৰদ ছাই’ কিংবা ‘বন্ধু ও শক্রকে ছেড়ে শুয়ে থাকতে হবে / একা একা কোনরূপ আসক্তিব্যতীত / হিরন্ময় আলো আসবে তোমাকে জানাতে অভ্যর্থনা’, তখন একটু ভাবতে হয়। হয়ত এটা বয়সেরই ধর্ম। পঞ্চাশের কবিদের মধ্যে অনেকেরই কবিতায় ক্রমশ ভয় করছে এই শঙ্কা, ছেড়ে যাওয়ার জন্য গোপন প্রস্তুতি, পিছুটান। শক্তির কবিতাতেও অনিবার্যভাবেই হানা দিয়েছে সেই ছায়ামূর্তি। তাকে আমরা ফিরে ফিরেই দেখতে পাচ্ছি তাঁর হালের কবিতায়। তবে যেটা বলার কথা, শক্তি কিছুতেই রাজি নন সহজ সমর্পণে। তার স্পষ্ট কথা : ‘ভাবছি, ঘুরে দাঁড়ালেই ভাল।’
এই চ্যালেঞ্জ, ক্লান্তি-হতাশা বা যাকে তিনি বলেন ‘হলুদ অসুখ’ তার বিরুদ্ধে এই রুখে দাঁড়ানোর মনোভাব, শক্তির কবিতায় নিয়ে আসে ভিন্নতর এক স্বাদ। ফলে আমরা পেয়ে যাই জীবনের এক অন্য মানে, বেঁচে থাকার দীঘল সবুজ প্রতিশ্রুতি। তার চোখ দিয়ে আমরা দেখতে পাই অজস্র দৃশ্যের সৌন্দর্য, খণ্ড খণ্ড অনেক ছবি। দেখতে পাই পাতার করাতে চাঁদ ছিন্নভিন্ন, টের পাই ‘সবুজ বাদার গন্ধ ঝাপটা মারে নাকে’, ‘জন্মভূমি— কথাটার মধ্যে এক আশ্চর্য মাদুর বিছানো আছে?’, শুনতে পাই ‘রাতের কল্লোল শুধু বলে যায়—“আমি স্বেচ্ছাচারী।” জীবনানন্দের পরে এত চিত্রল কবিতা আর কজন লিখেছেন শক্তির মতো?
কোথায় শক্তির কবিতার জোর? নিঃসন্দেহে কবিতার আঙ্গিক নির্মাণে। কবিতার ভাষাকে অনায়াসে ভাঙচুর করতে পারেন। তিনি, অবলীলায় খেলনায় পরিণত করতে পারেন ছন্দকে। হয়ত সেই অতি স্বাচ্ছন্দ্য কখনও কখনও ঝুঁকে পড়ে চতুরালির দিকে, চমকপ্ৰদ শব্দব্যুহের কারুকৃতির ফাঁদে ধরা পড়েন তিনি। অনেকদিন আগেই তিনি বলেছিলেন : ‘শব্দ শুধুই শব্দ এবং শব্দ মানেই সাশ্রু কুমীর।’ আরও : ‘শব্দ হাতে পেলেই আমি খরচা করে ফেলি৷’ সম্প্রতি লিখেছেন : ‘শব্দেরা নিজস্ব একটি শহর গড়েছে।’ এবং অর্বাচীন এ-শহরে ক্ষণজন্মা প্ৰাণ করে ধু ধু।’ এই শব্দপ্রেম শক্তির অক্ষয় তুণ, আবার কোথাও কোথাও তা তার কবিতার পক্ষে মারাত্মক। জীবনের সত্য থেকে কবিতার সত্য তখন বড় বেশি দূরে সরে যাবার আশঙ্কা দেখা দেয়। তিনি একবার লিখেছিলেন : ‘কবিতার সত্যে আমি একঝলক মিথ্যের বাতাস / লাগাই, কী পালটে যায় কবিতার সত্য একদিনে।’ কিন্তু প্রশ্ন হল, শব্দ থেকে সত্য যদি এতটাই দূরে সরে যায় যাতে তাকে আর প্রসঙ্গের সঙ্গে অভিন্নভাবে জড়ান বলে চেনাই যায় না, তবে কবিতায় তার উপযোগ কতটুকু? শক্তির কবিতাচৰ্চার এদিকটা ভাবার মতো।
তবে তাঁর মতো এমন বর্ণাঢ্য কবিব্যক্তিত্ব আমাদের সময়ে দুর্লভ। জীবনের বিচিত্র প্রসঙ্গে তার সাবলীল আসাযাওয়া। বহির্ভ্রমণ আর অন্তর্ভ্রমণ দুয়ের অবিরল ছবি আলো করে থাকে তার কবিতা। প্রেমিকার চোখের বিশেষণও, তার কাছে, ‘পর্যটনপ্রিয়’ হয়ে দেখা দেয়। সর্বোপরি এক বালকোচিত সারল্য শক্তির সমস্ত অভিজ্ঞতাকে অপরূপ সজীব করে তোলে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতায় তিনি বিস্মিত কৌতূহলে বলেছিলেন : ‘সবার বয়স হয় আমার বালক-বয়স বাড়ে না কেন’, বলেছিলেন : ‘প্রাচীন বয়সে দুঃখশোক সইবো না আমি গাইতে চাই না।’ এখনও তাঁর কবিতায় ঘুরে ঘুরে আসে এই অমল শৈশব, স্মৃতি থেকে বর্তমান জুড়ে ধারাবাহিক; ‘কৃপা করে কাছে আসে বাল্যকাল স্মৃতির মতন / আমলকিতলা নিয়ে কাছে আসে স্মৃতির মতন / আলতামাখ্যা পদচ্ছাপ নিয়ে আসে দূরস্থিত শোকে৷’ তার মনে হয় ‘আসলে কেউ বড় হয় না, বড়র মত দেখায়।’ এই সহজ অকৃত্রিম স্ফুরণ শক্তির কবিতায় আমরা যেভাবে পাই, সেভাবে অন্য কোথাও নয়। ভালবাসা- মানুষ নারী গাছপালা নদী অরণ্য চাঁদসমেত সমগ্র বিশ্বভুবনকে ভালবাসাই শক্তির কবিতাকে দিয়েছে এক অনন্য মাহাত্ম্য। সন্দেহ কি এই কবির গলাতেই আমরা শুনব এই সরল উচ্চারণ : ‘বাঁচতে চাই, বেঁচে থাকতে চাই / শুধু বাঁচা, অহরহ মৃত্যুর ওলোটপালটের মধ্যে বেঁচে থাকতে চাই, শুধু বাঁচতে চাই।’ কিন্তু কেমন সেই বাঁচার ধরনটা? ‘বুকে হেঁটে বাঁচার লালসা’ বা ইঁদুরের মতো এই নিচু হয়ে বাঁচার লালসা তিনি শেষ করে দিতে চান। বাঁচতে চান পরিপূর্ণভাবে; ‘সুখ ও সমগ্ৰভুক আমি।’ তিনি চান পরিপূর্ণ স্বাধীনতা বা ‘উন্মুক্তি’ : ‘ইচ্ছে করে জীবনের জামাকাপড়ের মতন যন্ত্রণাগুলোকে / একে একে সমুদ্রের ভেতর খুলে রেখে আসি।’ যখন এই নকল পোশাকহীন ছদ্মবেশশূন্য শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের চকিতে দেখা মেলে কবিতার কাঠামোর ভেতর, তখনই মনে হয় এই কবি আমাদের সত্তা ব্যেপে আছেন, আছেন আমাদের স্মৃতি স্বপ্ন সম্ভাবনার অনন্ত সৈকত জুড়ে। [১৯৮৪]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close