Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ শব্দবাজি > ছোটগল্প >> সাদিয়া সুলতানা

শব্দবাজি > ছোটগল্প >> সাদিয়া সুলতানা

প্রকাশঃ June 28, 2017

শব্দবাজি > ছোটগল্প >> সাদিয়া সুলতানা
0
0

শব্দবাজি

.

একটা বাক্য হারানোর ক্ষোভে আমি পাগলের মত চিৎকার করতে থাকি। চিৎকার করতে করতে আমি প্রিয় শব্দভাণ্ডার থেকে খাস বাংলা গালি খুঁজতে থাকি। আমার মুখ থেকে থুতু ছিটে বের হতে থাকে। আমার ফোলা ফোলা চোখ দুটি রাগে বন্ধ হয়ে আসে। এমনকি আমার মাথার দু’পাশের শিরা দপদপ করতে থাকে। প্রিয় শীত কম্বলের ওম ছেড়ে ল্যাপটপে হাত ছোঁয়াতেই রিমি প্রশ্ন করেছিল, জিনির বার্থডেতে যাবে না? এই একটি বাক্য বুলেটের মত আমার নিচ্ছিদ্র মস্তিস্কে ঢুকে আমার করোটিতে ঘাপটি মেরে থাকা স্নিগ্ধ বাক্যটিকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছিল। রিমি নিরাপদ দূরত্বে না থাকলে আমি নিশ্চিত ওর গালে চড় মেরে বসতাম। চড়ের ঘাটতি আমি তাই আমার বাক্যবানে পুষিয়ে নিলাম। রিমির স্থির মুখটি দেখে আমি বুঝলাম ও একটুও দুমড়ে-মুচড়ে যায়নি।

অথচ বিয়ের দুদিন পর প্রথম যেদিন রিমি আমাকে একইভাবে বাক্যহারা করেছিল, আমি ওকে খুব ভালভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম, আমার লেখা হারিয়ে যাওয়ার শাস্তি কি হতে পারে। পরিচিত আমার মুখে অপরিচিত গালিগালাজ শুনে রিমি আথালিপাথালি কেঁদেছিল। অন্ধরাতের শরীরী মাদকতায় রিমিকে আমি নিশ্চিন্ত করেছিলাম, এই ভুলটুকু ও না করলে আমি বেশ ভাল মানুষ, ভাল স্বামী এবং ভাল লেখক। আমার যশ খ্যাতি, বইয়ের মোটাতাজা রয়েলটি এসবের জন্য এই চার বছরে রিমির চোখে আমি সমীহও দেখেছি। তবু আজকের মত ভুল ও প্রায়ই করে। আহ্ তখন সে কী যন্ত্রণা আমার! লিখতে না পারার কষ্ট বা রাইটার্স ব্লকও আমাকে এমন আক্রমণ করে না যতটা করে এই বাক্য হারানোর ক্ষোভ। একটা বাক্য সাজিয়ে ল্যাপটপ মেলে ধরতেই আমার আঙুলগুলো রেসের ঘোড়ার মত ছুটতে শুরু করে। সুতন্বী এম যে ফন্টে বাক্যগুলো তরতর করে এগিয়ে যায়। গল্প এগুতে এগুতে একসময় আমাকে ক্লান্ত করে ফুরিয়ে যায়।

রিমির আচমকা প্রশ্নে আজ আমার গোটা একটা গল্প হারিয়ে গেল! অপাত্রে মুখ খরচ করে ক্লান্ত আমি আবার বিছানায় যাই। খুব যন্ত্রণা করছে তো রিমি! এই তো গতকাল রাতের ঘটনা। মাথার ভেতর একটা প্লট ঘুরছে আর আমি প্রথম লাইনটাকে ধরার চেষ্টা করছি। অভিনব প্লট, মেথরপট্টির কলপাড়ের সামনে একটা মানুষের জটলা তৈরি হবে আর সেই জটলাটা কি বা কাকে ঘিরে তা বুঝতে বুঝতে পাঠক গল্পের শেষ বাক্যে চলে যাবে। আমি ভাবছি আর ভাসছি। আর ঠিক সেই মুহূর্তে রিমি আমার কানের কাছে বিষবাক্য ঢেলে দিল, ‘তোমার বান্ধবী হানি চারবার ফোন দিয়েছিল, অবশ্য পাঁচ মিনিটে চারবার।’ বাক্য হারানোর রাতের বেলার শোধটা আমি অন্যভাবে নিয়েছিলাম যেটা মনে পড়তেই আমার খুব আত্মতৃপ্তি লাগে। সেই সাথে আজ গোটা বিকেল আর সন্ধ্যেটা মাটি হবার ক্ষতে প্রলেপও লাগে। আমি কী এক প্রশান্তিতে ঘুমাবার চেষ্টা করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে যাই।

ঘুম ভাঙতেই টের পাই, কানের কাছে মশার ভনভনানি। আমি হাত ঝাড়তেই পেট ফোলা দু-তিনটে মশা পা লেঙচে কম্বলের গায়ে পড়ে। এই সাত তলার ফ্লাটে শালারা ঠিক কি করে যেন উড়ে উড়ে চলে আসে। নাকি মানুষের সাথে সাথে পতঙ্গকুলও আমার পিছু লেগেছে? তলপেটের চাপে বিছানার আরাম ছাড়তে হয়। কলের পানি নয় যেন বরফকুচি!  হাতে পায়ে সেঁধিয়ে যাচ্ছে। কোনোরকম জলবিয়োগ করে আমি আবার কম্বলের ভেতর ঢুকে পড়ি।

ঠিক তখনি আমার চোখ যায় রিমির দিকে। রিমি ড্রেসিং টেবিলের সামনের রাখা টুলে বসে এমনভাবে চুল আঁচড়াচ্ছে যেনো খানিকক্ষণ আগে কিছুই হয়নি। রিমির সাথে আমার বয়সের পার্থক্য একটু বেশি। কিন্তু রিমির বয়সও নেহায়েত কম নয়। বিয়ের সময় ও জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদে চাকরি করতো। চাকরিজীবী মেয়েদের তো আর বয়স লুকাবার উপায় থাকে না, তবু রিমির বাবা বিয়ের আগে কথা পাকাপাকির সময় বার বার বলার চেষ্টা করছিল তার মেয়ের জন্ম আটাশির বন্যার পরের বছর। বছর সাতেক হবে তখন তরু আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। একসময় আমার জন্য নিঃসঙ্গতার চেয়ে শরীরের ক্লান্তি কাটানো বেশি জরুরি ছিল। তাই রিমিকে বিয়েটা করে ফেলেছিলাম। তবে মিথ্যে বলবো না, রিমিকে প্রথম দেখাতেই আমার মাথায় বিশাল এক গল্প এসেছিল। আদিবাসীদের মতো চাপা নাক-চোখ চাপা হলেও শরীরের গড়নটা যেন নিখুঁত ছিল ওর। ছিল বলছি কেন, আছেও।

রিমি ভ্রুক্ষেপহীন চুল আচড়াচ্ছে। রিমির চেহারার গাম্ভীর্যের কপটতায় আমি বেশ বুঝতে পারি, মনে মনে রিমি ষড়যন্ত্র করছে। ও কিছুতেই চায় না যে আমি লিখতে পারি। তা না হলে গত সাত দিনে ওর কারণে আমি আটটি গল্প হারিয়ে ফেলেছি আর রিমি কিনা সব বুঝে ও নির্লিপ্ত রয়েছে! রিমির চুলে বিনুনি করা শেষ। আমার দিকে একবারও না তাকিয়ে‘খেতে এসো’ বলে রিমি চটুল পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

রিমির সাথে এখন আমার খাবার টেবিলেই যা একটু আধটু কথাবার্তা হয়। কিন্তু আজ যা ঘটে গেছে তাতে আমার কথা বলা বা শোনার রুচি নেই। শোধ তুলতে আমি কি করবো সেটা মনে মনে স্থির করে ফেলেছি। আমি রিমির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। শিকারীর দৃষ্টির তীক্ষ্মতায় আমার চোখ ওর শরীর এফোঁড় ওফোঁড় করে বেরিয়ে যায়। আমি হাত বাড়িয়ে তরকারির বাটি কাছে আনি। নতুন আলু, টমেটো, ধনেপাতার মাখা ঝোলে বোয়াল মাছের পেটির প্রিয় অংশটি তুলে নেই। আমার খুব ইচ্ছে করে তরকারির বাটিটা হাতে তুলে আমি ওর মাথায় উপুড় করে দেই। কিন্তু এবেলা বেতাল কিছু করলে হবে না। মাথায় দারুণ সব থিম। বাজে চিন্তা বাদ দিয়ে কিভাবে প্রতিশোধপর্ব সমাপ্ত করবো তার ছক কষতে কষতে আমি নিশ্চিন্ত মনে মাছ-ভাতের লোকমা মুখে তুলতে থাকি।

.

যতক্ষণ পেরেছি ছোরাটা আমি রিমির বুকে চালিয়েছি। একবার ছোরাটা রিমির সফেদ তুলতুলে বুকের মাঝখানে গেঁথে গেলে আবার দু’হাতে টেনে তুলে চপাচপ ছোরা চালিয়ে গেছি। রিমি যেভাবে নিপুণ হাতে শসা, টমেটো, বর্ণিল ক্যাপসিকামের সালাদ চপ করে, অনেকটা সেইরকম। প্রথমবার আঘাতের পর পরই রিমি আমাকে আর কোনো বাঁধা দেয়নি। হয়তো প্রথম আঘাতেই রিমির মৃত্যু ঘটেছিল। কিন্তু রিমিকে ছোরা দিয়ে কেচে কেচে রক্তের বন্যায় বিছানা ভাসালেও আমার কেন যেন আশ মিটছিল না। কি যেন একটা ভর করেছিল আমার শরীরে। তাই হয়তো রিমির পাঁচ ফিটের শরীরটাকে বাগে আনতে আমার পাঁচ মিনিটও লাগেনি। শেষবার আমি ছোরাটা রিমির বুকে ক্রুশের মত গেঁথে দিয়েছি।

রিমির শরীরের যে-কোনো গতিই মোহময় সুন্দর। ওর পরনের আকাশনীল রাতপোশাক লাল রক্তে ভিজে কালচে নীল হয়ে গেছে। রক্তের ছিটায় গোলাপি বিছানাটাও এখন বেশ নকশাদার লাগছে। আলুথালু চুলের রিমির দু’হাত মাথার দু’পাশে ছড়ানো আর বাম হাঁটু ভাঁজ হয়ে আছে। বাম পা দিয়ে ও বেশ কয়বার লাথি মারার চেষ্টা করেছিল, এখন সেই পা খানা কেমন নিথর পড়ে আছে। আধবোজা চোখ জোড়া আর কষ্টে বিবর্ণ মুখটি দেখে আমি আর বিভ্রান্ত হই না। তবু আমার চোখ কেমন করে। রিমিকে শেষবারের মত দেখে নিয়ে আমি কম্বলটা আলতো করে ওর বুক অবধি টেনে দেই। আহ্ কী ভারহীন লাগছে! আরেকটু কুপিয়ে নেবো নাকি?

এই শরীরটাকে কতই না ভালবাসতো রিমি। আমিও ভালবাসতাম। তবু আমাদের আট বছরের দাম্পত্য জীবনে রিমির শরীর-মনে কখন যে ক্লান্তি এসে ভর করেছে আমি বুঝিনি। রিমিই বরং আমাকে বুঝতে দেয়নি। আমি ঠিক নিশ্চিত নই ঠিক এই মুহূর্তে আমার কি করা উচিত। তবু আমি ওয়ারড্রোবের ড্রয়ারটা খুললাম। আমি জানি বাসায় খুব বেশি টাকা নেই। ডেবিট-ক্রেডিট কার্ডের কারণে ক্যাশ নিয়ে চলার অভ্যাস আমার নেই। এই ড্রয়ারে রিমিই টাকা রাখে। নাহ্ খুব বেশি টাকা নেই। হাজার দশেক। গত পরশু দিনই এই টাকাটা আমি রিমিকে শাড়ি কেনার জন্য দিয়েছি। রিমি শাড়ি কেনেনি। তবু ড্রয়ারে নতুন দুটি শাড়ি দেখতে পাচ্ছি। এই শাড়ি দু’টি আমি কখনো রিমিকে পরতে দেখিনি।

পেছন থেকে আচমকা নায়লা এসে ডাকল, বাবা কী করছো? ঠিক তক্ষুণি আমি সম্বিত ফিরে পেলাম। আমি একঝটকায় নায়লাকে পাঁজাকোলে করে নিলাম যাতে রিমিকে ও দেখতে না পায়।

নায়লা আমার বুকে মুখ ঘষে বলে, বাবা রোজকার মত আজও তোমরা ঝগড়া করছো? রাতে মামণি ভাত খায়নি আর মামণি কিন্তু বলেছে, মামণি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে। আমাকেও সাথে নিবে না। আমাকে নিরুত্তর দেখে নায়লা আবার প্রশ্ন করে, বাবাই, মামণি কোথায় যাবে?

আমি নায়লাকে বলতে পারছি না, রিমি চলে গেছে। নায়লার চুলে নাক ডুবিয়ে আমি বলি, মামণি যে আজ দুপুরে তোমাকে খেতে দিতে ভুলে গিয়েছিল তাও তুমি মায়ের কথা ভাবছো? নায়লা ঠোঁট টিপে হাসে, বারে তাতে তো মজাই হয়েছে আমি পুরো এক প্যাকেট ডরিও বিস্কুট খেয়ে নিয়েছি। মামণি তো ফোনে কথা বলছিল। মামণি ফোনে কথা বললে আমি ডাকি না, ডাকলে মামণি কিন্তু খুব রেগে যায়!

আমি নায়লাকে ওর ঘরের বিছানায় শুইয়ে দেই। নায়লার পড়ার টেবিলের মিকি মাউসের ঘড়িতে একটা বেজে পনের মিনিট। তরুকে এখনো ফোনে পাওয়া যাবে। তরুকে বলতে হবে এক্ষুণি যেন বাসায় চলে আসে। ওর বাসা বনানী আর আমার বাসা বাড্ডা। তরুর নিজের গাড়ি আছে। বেশিক্ষণ লাগবে না ওর আসতে। আমি যদি এই মাঝরাতেও ফোন করে তরুকে বলি, বোনডি নায়লার জ্বর, ফুপীমাকে দেখতে চাচ্ছে তবে তরু আর দ্বিতীয় প্রশ্ন করবে না। এরপর তরুর কাছে নায়লাকে রেখে আমাকে চলে যেতে হবে। যে কয়দিন পালিয়ে বাঁচা যায়, বেঁচে দেখি।

আমি রিমির সাথে বাঁচতে চেয়েছিলাম। রিমিও হয়তো বাঁচতে চেয়েছিল। কিন্তু আমার সাথে না। রিমি একটা সম্পর্কের টানে আমার সাথে বাঁধন আলগা করেছিল। সত্যি মিথ্যে যাচাই করার জন্য আমি কোনো গোয়েন্দাগিরি করিনি। আমি রিমির শরীরের অন্য শরীরের গন্ধ পেতাম। আমি পুরো দুইটা বছর সেই গন্ধ শুঁকেছি আর আজকের এই দিনটার জন্য পরিকল্পনা করেছি। রিমিকে আমার কোনো সুযোগ দিতে ইচ্ছে হয়নি।’

ঠিক এই পর্যন্ত লিখে আমার ভেতরের জ্বালা জুড়োয়। আমার লেখার টেবিলের চমৎকার টেবিল ল্যাম্পটি চোখ সহনীয় আলো দেয়। আলোর সাথে সাথে ল্যাম্পটির অনিন্দ্য সুন্দর গড়ন ঘরটিতে বাড়তি শোভা দিয়েছে। রিমি আমাকে এই টেবিল ল্যাম্পটি উপহার দিয়েছিল। আহ্ আজ যেন এই আলোর সার্থক ব্যবহার হলো!  রিমির দেয়া উপহারের আলোতে মনিটরে রিমি নামক চরিত্রের ব্যবচ্ছেদ করতে করতে আমি গল্পের প্লট হারানোর শোক ভুললাম। আপাতত লেখায় বিরতি।

ঈশ্বরপ্রদত্ত শব্দবাজির অসাধারণ ক্ষমতা প্রয়োগের আত্মতৃপ্তিতে আমি এখন লেখা বন্ধ করে রিমি নামক চরিত্রটাকে কতোটা কদর্য করতে পারি সেই ভাবনাতে মন দেই।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close