Home পঠন-পাঠন শরীফ আতিক-উজ-জামান >> কেমন করে লেখা হলো ‘দহনকথা’

শরীফ আতিক-উজ-জামান >> কেমন করে লেখা হলো ‘দহনকথা’

প্রকাশঃ January 20, 2018

শরীফ আতিক-উজ-জামান >> কেমন করে লেখা হলো ‘দহনকথা’
0
0

শরীফ আতিক-উজ-জামান > কেমন করে লেখা হলো ‘দহনকথা’ >> আমার বই আমার কথা

 

[সম্পাদকীয় নোট : আসন্ন বইমেলাতেই প্রকাশিত হতে চলেছে শরীফ আতিক-উজ-জামানের প্রথম উপন্যাস দহনকথা। এই উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে কীরকম প্রস্তুতি নিয়েছিলেন লেখক, কেমন করে লেখা হলো এটি, তারই অন্তরঙ্গ বিবরণ পাওয়া যাবে এই লেখায়।]

১৯৯৩ সালের নভেম্বর মাস। সবে খুলনার সরকারি ব্রজলাল কলেজে যোগদান করেছি, কিন্তু থিতু হতে পারছি না। জন্মস্থান নড়াইল প্রচ- আবেগে টানছে। দোদুল্যমানতায় কেটে গেল প্রায় ৬ মাস। তারপর হঠাৎই বদলি হয়ে যোগদান করলাম নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে। লেখালেখিটা ততদিনে আবেগের প্রাথমিক স্তর কাটিয়ে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। দিনের নির্ধারিত পৃষ্ঠা কয়টি লিখতে না পারলে অস্বস্তি হয়। লেখার প্রতি ভালোবাসা, ভালো লাগা ও নিজস্ব এক দায়িত্ববোধ একসাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। বেশিরভাগ লেখকের মতো আমার লেখালেখিটা কবিতা দিয়ে শুরু হয়নি। কবিতা আমার কাছ ঘেঁষেনি, এখনো ঘেঁষেনা, উঁকি দিয়ে চলে যায়। আমিও তাকে খুব ধরার চেষ্টা করি না। দূরবর্তী প্রেয়সীর মতো মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকি। তাকে কাছে টানতে না পারা আমার এক ধরনের অক্ষমতাই হয়ত, কিন্তু তা নিয়ে আমার কোনো মনস্তাপ নেই, কারণ সাহিত্যের সব শাখায়ই একজন সমান পারদর্শী হয়ে উঠবেন এমন নয়, তার খুব প্রয়োজনও নেই। তখন মৌলিক গল্প ও প্রবন্ধ রচনার পাশাপাশি ইয়োরোপ-আমেরিকা-আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ অনুবাদ করে চলেছি।

এরই মাঝে ১৯৪৬ সালের কৃষক আন্দোলন নিয়ে গবেষণাধর্মী কাজ করার আগ্রহ তৈরি হলো। এই আগ্রহ উস্কে দিয়েছিলেন নড়াইল অঞ্চলের তেভাগা আন্দোলনের প্রাণপুরুষদের একজন কমরেড নূরজালালের জামাতা প্রয়াত কমরেড আব্দুর রাজ্জাক। তিনি আমাকে তাঁর শ্বশুরের নিজেহাতে লেখা একটি ডায়েরির সন্ধান দেন যা তখন নড়াইলের একজন সাংবাদিকের জিম্মায় ছিল। আমি তক্ষুণি সেটা উদ্ধারের প্রচেষ্টা চালাই, কিন্তু দীর্ঘ ৬ মাসেও সফল না হলে আব্দুর রাজ্জাক সাহেবই সেটা উদ্ধার করে আমার হাতে দেন। ডায়েরিটা পড়ে তেভাগা আন্দোলন ও নূরজালাল সম্পর্কিত বহু অজানা তথ্য সংগ্রহ করে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ রচনা করি, কিন্তু ৬-৭ মাস ধরে ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েও কোনো জাতীয় দৈনিকে লেখাটি প্রকাশ করতে ব্যর্থ হই। বিষয়টি কোনো সম্পাদক মহোদয়ের মনযোগ কাড়তে পারেনি। শেষমেশ মাসিক ’সমাজ চেতনা’র সম্পাদক অধ্যাপক মেসবাহ কামাল লেখাটি তার পত্রিকায় দুই কিস্তিতে প্রকাশ করেন এবং ডায়েরিটা গ্রন্থাকারে প্রকাশের পরামর্শ দেন। কিন্তু এই ধরনের গ্রন্থ প্রকাশের আর্থিক ঝুঁকি কেউ নিতে চান না। তাই প্রকাশক পেতে সমস্যা হচ্ছিল। এই সময়ে আবার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমেদ কামাল। তারই অনুরোধে ১৯৯৫ সালে ‘গণপ্রকাশনী’ বইটি প্রকাশ করে ‘কৃষকনেতা নূরজালালের স্মৃতিকথা’ নামে।

এই গ্রন্থের সম্পাদনার কাজটি করতে গিয়ে আমি তেভাগা আন্দোলন নিয়ে রচিত শিল্প ও সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী হই এবং এক সময়ে এ বিষয় নিয়ে গবেষণা করার তাড়না অনুভব করি, কিন্তু পর্যাপ্ত বইপত্রের অভাবে কাজটি কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছিল না। প্রথমে কাজ শুরু করেছিলাম ছোটগল্প নিয়ে এবং তা নিয়ে রচিত প্রবন্ধ ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’র জার্নলে প্রকাশিত হয়। এরপরে কাজ শুরু করেছিলাম ‘গান ও কবিতা’ নিয়ে। এ সম্পর্কিত লেখাটি ছেপেছিলেন স্বনামখ্যাত অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন তাঁর ‘উলুখাগড়া’য়। কিন্তু সমস্যায় পড়েছিলাম উপন্যাস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে। এ সম্পর্কিত প্রথম উপন্যাস আব্দুল্লাহ রসুলের ‘আবাদ’ আমি কোনোভাবেই জোগাড় করতে পারিনি। কলকাতার কলেজ স্ট্রিট, কমিউনিস্ট নেতা মনসুর হাবিবুল্লাহ’র বর্ধমানের পৈতৃক বাড়ির লাইব্রেরিতে খোঁজ নিয়ে হতাশ হয়েছি। সবচেয়ে বিস্মিত হয়েছি কলকাতার আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের কমরেড মোজাফফর আহমদ লাইব্রেরিতে গিয়ে। সিঁড়ি ভেঙে ৫ তলায় উঠে বইটার খোঁজ করতে লাইব্রেরিয়ান যা বললেন তাতে আমার মুখে কোনো ভাষা জোগালো না, ‘এ রকম কোনো রাইটারের নাম আগে ছুনেচি বলেতো মনে পড়চে না, দাদা।’ বললাম, “কেন, ওঁর ‘কৃষক সভার ইতিহাস’ তো বিখ্যাত বই, ওটা নিশ্চয় আছে।” ভদ্রলোক বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলেন, ‘কিছক ছবার ইতিহাছ, না দাদা, ও বইও নেই।’ এর সাথে কথা বলা বৃথা মনে করে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে এলাম। একে একে সম্প্রতি প্রয়াত সাহিত্যিক তরুণ সান্যাল ও  সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের কাছে খোঁজ করেও হতাশ হলাম। একই সমস্যায় পড়েছিলাম শিশির দাসের ‘শৃংখলিত মৃত্তিকা’ ও সাবিত্রি রায়ের ‘পাকা ধানের গান’ নিয়ে। পরবর্তী সময়ে ‘পাকা ধানের গান’ পুনঃমুদ্রিত হওয়ায় জোগাড় করতে সক্ষম হই, তবে তাও খুব সহজে নয়। কলকাতায় আমার পরম সুহৃদ বরিশালের রতন বসু মজুমদার বইটি জোগাড় করে বেঙ্গলের ‘শেকড়ে ফেরা’ প্রদর্শনীতে অংশ নিতে আসা প্রয়াত চিত্রশিল্পী বিজন চৌধুরীর হাত দিয়ে আমার বরাবরে পাঠান। এভাবেই জোগাড় হয়েছে গ্রন্থাদি। আরো কাজ করেছি তেভাগার নাটক-চলচ্চিত্র-চিত্রকলা নিয়ে। এই গবেষণাকর্মটি ‘শিল্প ও সাহিত্যে তেভাগা আন্দোলন’ শিরোনামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ‘ঐতিহ্য’ থেকে ২০০৯ সালে। তেভাগা নিয়ে কাজ করতে গিয়েই দেশভাগের বিষয়টি মাথায় আসে, কারণ এই আন্দোলন শেষমেশ সফল না হওয়ার পিছনে দেশভাগ ছিল একটি বড় কারণ। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে আন্দোলন গতি হারায়। বিভ্রান্ত নেতাদের অনেকেই দেশ ত্যাগ করেন। সব মিলিয়ে আন্দোলন একসময় স্তিমিত হয়ে পড়ে।

উল্লেখিত কাজগুলো করার সময়ই তেভাগা ও দেশভাগের পটভূমিতে একটি উপন্যাস লেখার চিন্তা মাথায় আসে। মাঝে এই বিষয় নিয়ে একাধিক ছোটগল্প লিখেছি, কিন্তু উপন্যাসের কাজটা খুব দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছিলাম না।  ইতিহাসের সাথে যে জনপদকে বেছে নেওয়া হয়েছে সেখানকার মানুষের যাাপিত জীবনের মিথ, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ভাষা, আচার-আচরণের খুঁটিনাটি নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য জড়ো করে রাখার কাজটি আগে থেকেই চলছিল। ৪০-৪৫ পৃষ্ঠার মতো আরো ৭-৮ বছর আগেই লেখা হয়েছিল। বাকিটা শেষ হলো গত এপ্রিলে। নভেম্বরেই ‘ধ্রুবপদ’ বইটি প্রকাশ করেছে। উপন্যাসটিতে ২টা অংশ আছে। প্রথম অংশ কৃষক আন্দোলন নিয়ে যার উপ-শিরোনাম ‘নিজ খোলানে ধান তোল’ আর পরের অংশ দেশভাগ সম্পর্কিত যার উপ-শিরোনাম ‘ভাজ্য-ভাজক-ভাগফল’। এখানে ব্যবহৃত গান-কবিতা-ছড়ার কিছু কিছু সংগৃহীত, কিছু কিছু স্বরচিত। ওই জনপদের মানুষের মাঝে প্রচলিত ও জনপ্রিয় বিষয়গুলো তুলে আনা হয়েছে বস্তুনিষ্ঠতা ও ইতিহাসের খাতিরে। চরিত্ররা বাস্তব, কিন্তু সাহিত্যের প্রয়োজনে কল্পনার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এখানে পাঠক ইতিহাসের অনেক অজানা বিষয়ের সাথে পরিচিত হবেন নানা চরিত্রের মাঝ দিয়ে। আবার এক শ্রেণির মতলববাজ মানুষের নেতিবাচক মনস্তত্ত্ব, আরেকশ্রেণির মানুষের ইতিবাচক সহৃদয়তা, সম্প্রীতি ও বৈচিত্র্য ধারণের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা, অপরাজনীতির বাতাবরণ ভেঙে ফেলে সামনে এগোনোর জন্য সৎ নেতৃত্বের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার, মানুষের কল্যাণ কামনায় নিজস্বার্থ বিসর্জন দেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতির শৈল্পিক প্রকাশ রয়েছে এই উপন্যাসে। একটি নির্মোহ জায়গা থেকে সবকিছুকে দেখার প্রচেষ্টা রয়েছে এখানে। পাঠকও তদ্রুপ একটি নিরপেক্ষ স্থান থেকে এই রচনাকে বিচার করবেন এমনই প্রত্যাশা।

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close