Home চলচ্চিত্র শর্বাণী দত্ত >> ‘ডুব’ : লক্ষহীন গল্পের বিভ্রান্ত বায়োপিক

শর্বাণী দত্ত >> ‘ডুব’ : লক্ষহীন গল্পের বিভ্রান্ত বায়োপিক

প্রকাশঃ November 9, 2017

শর্বাণী দত্ত >> ‘ডুব’ : লক্ষহীন গল্পের বিভ্রান্ত বায়োপিক
0
0

শর্বাণী দত্ত >> ‘ডুব’ : লক্ষহীন গল্পের বিভ্রান্ত বায়োপিক
সিনেমার যে প্রথানুগ সংজ্ঞা, তাতে ‘ডুব’কে আমার সেভাবে সিনেমাই মনে হয়নি। তবু হাইপোথেটিকালি সিনেমা ধরেই এগোনো যাক। মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী নির্মিত ‘ডুব’-এর প্রথম দৃশ্য- একটি কলেজের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। তাতে চারিদিকে উৎসব উৎসব ভাব। হৈচৈ করে একটু পর শুরু হতে চলা পুনর্মিলনের মহড়া চলছে; এর মধ্যে আমরা পরিচিত হই সাবেরী (তিশা) এবং নিতুর (পার্নো) সঙ্গে। এই অংশের দৃশ্যায়ন প্রায় নিখুঁত। বহু বছর পর অনেক বন্ধু আবার মিলিত হচ্ছে, আর এ দুজন মানুষের মধ্যেকার দূরত্ব কোনো পুনর্মিলনের বাহানায়ও ঘুচছে না। বেশ সহজবোধ্য মেটাফোর বলা চলে। ক্যামেরার ভালো কাজ এই প্রথম দৃশ্য থেকেই বেশ নজর কেড়ে নেয়।

এরপর এক নিমেষে গল্পকথকের ইচ্ছেয় আমরা ফিরে যাই বছর খানেক আগে। যেখানে এক কন্যা (তিশা) অক্লান্ত চেষ্টা করছে তার বাবা (ইরফান) আর মায়ের (রোকেয়া প্রাচী) সুরহীন দাম্পত্যে একটু বাগেশ্রী বাজিয়ে দিতে। রাঙামাটির ঝর্ণা, পাহাড়তলিতে আমরা দেখতে পাই দুটো মানুষকে, যারা কোনো একসময় ভালোবেসেছিল- একে অপরকে আর নিজেদেরকেও। আজ কোনো কারণে সেই ভালোবাসা অকুলান ঠেকছে। তারা বলতে- জাভেদ হাসান (ইরফান) এবং মায়া (রোকেয়া)। জাভেদ হাসান এখানটায় বলেন, “একটা সময় আসে যখন আমরা শুধু সাথে থাকতে হবে বলেই থেকে যাই।” আবার এই একই ব্যক্তি বছর কুড়ি আগের নিজেদের ছেলেমানুষি ভালোবাসার সময়গুলোর কথা মনে করলেন, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সেই ভালোবাসা, যেটা আজ তন্নতন্ন করে খুঁজতে হচ্ছে, খুঁজতে খুঁজতে শহর ছেড়ে পাহাড় আর ঝর্ণার কাছেও আশ্রয় নিতে হয়েছে। তবু বোধহয় খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেটা বোঝা গেলো যখন জাভেদ বললেন “Those were the happiest days of my life”, মায়া “They’ll come back” না বলে “তার মানে এখন আমাদের মধ্যে আর কিছু বাকি নেই এটাই বোঝাতে চাইছো তো?” বলে উঠলেন, তখন। এই দৃশ্যটাতেও বেশ ভালো ক্যামেরার কাজ হয়েছে। ল্যান্ডস্কেপের কাজ খুব ভালো।

সে যাই হোক। মায়ার ওরকম ভীষণ আনরোমান্টিক কথার মধ্য দিয়ে তার চিরাচরিত ন্যাগিং ঘ্যানঘেনে স্ত্রী-চরিত্র বোঝানো হয়েছে কি? সম্ভবত। তবে এখানে মুশকিল হয়ে গেছে এই যে, ফারুকী হয়তো ভেবে বসেছেন দু’জন অসামান্য অভিনয়শিল্পী মাত্রেই তারা সিনেমার চরিত্রকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করে নেবেন। এবং সেটা নিশ্চয়ই কারণ যে ফারুকী দৃশ্য নির্মাণে যতটা মনোযোগ দিয়েছেন তার অর্ধেক মনোযোগও চরিত্র নির্মাণে দেননি। তাই দুজন অত্যন্ত ভালো শিল্পীকে দিয়েও তিনি জাভেদ আর মায়াকে তাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ইরফান খান যতবারই ইংরেজিতে ডায়ালগ বলার বা নৈঃশব্দ্যের ভাষায় কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন, ততবারই যেন নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছেন, জড়তার প্রস্তর ভেঙে বেরিয়ে নিজের তেজ ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু যতবারই বেচারাকে দিয়ে বাংলা বলানো হয়েছে (তাও আবার যে সে বাংলা নয়), ততবারই আমার মনে হয়েছে ‘ডুব’ সিনেমার গল্পে প্রথিতযশা চলচ্চিত্রকার জাভেদ চরিত্রটি আসলেই ঢাকাবাসী তো? নাকি বহুদিনের কোনো প্রবাসী বাঙালি? ফলে যতবার আমার মন চাইছিল, ‘নাহ এবার একটু একে জাভেদ বলেই ভাবি’ ততবার ইরফানের বাংলায় সেই চিন্তায় ছেদ ঘটে গেছে। আর মায়া চরিত্রে রোকেয়া প্রাচী মার্কেটে অত্যন্ত ভালো চলা ঐতিহ্যবাহী ঢাকাইয়া ভাষা “করতেসি বলতেসি যাইতেসি”তে সকল ঢাকাবাসী যে আদৌ অভ্যস্ত হবে তেমন কিন্তু কেউ মাথার দিব্যি দেয়নি।

রোকেয়া প্রাচীর অভিনয় ছোটবেলা থেকে দেখি। এমনকি পর্দার বাইরেও উনাকে কোনোদিন বিশুদ্ধ বাংলা ছাড়া অন্য কোনো আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে দেখিনি। মায়া চরিত্রটি বড় কষ্ট করে একটা মিথ্যে স্বরায়নে কথা বলার চেষ্টা করে যাছিল, তাও বারবার তার ভেতরকার বিশুদ্ধ ভাষা বেরিয়ে আসছিল যেটা মানুষকে মায়া চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হতে দেয়নি। আমি ঠিক নিশ্চিত নই যে একটা সিনেমায় সকলকে একই ধরনের আঞ্চলিকতায় কথা বলতে হবে (তাও আবার যখন সিনেমাটি একেবারেই শহুরে পটভূমিতে তৈরি) এমন কোনো দাসখত ফারুকীকে কেউ লিখে দিয়েছেন কিনা। রোকেয়া যদি তার স্বাভাবিক স্বরাঘাতে ডায়ালগ বলতে পারতেন, আমরা একজন মহিলার একটা খুব দৃষ্টিনন্দন পরিবর্তন এবং পরিশীলন দেখার সুযোগ পেতাম। দর্শকের কাছে সেটা নতুন প্রণোদনা হতে পারতো। এই কথায় পরে আসছি।

সিনেমার শুরুর দিকে একটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ সময় ধরে ফারুকী আমাদের দেখিয়েছেন জাভেদ আর মায়ার প্রথম জীবনের যৌবনোদয় প্রেম। তাদের বিয়ের দৃশ্যটি দেখানোর প্রয়োজন ছিল না এমনটা বলবো না। প্রয়োজন নিশ্চয়ই ছিল। কারণ জাভেদ এবং তার স্ত্রীর মধ্যেকার এই অন্তরপথের ব্যবধান কি চিরকালই ছিল নাকি দীর্ঘ সময়ের বিরক্তিকর দাম্পত্যের প্রসাদ- এটা দর্শকদের জানানো প্রয়োজন ছিল। সেদিক থেকে দেখতে গেলে পরিচালক কিছুটা সফলও বটে। তবু আক্ষেপ এখানে যে ফারুকী তাদের প্রথম জীবনের প্রেম দেখাতে সিনেমার এতগুলো মিনিট দিতে গিয়ে আমাদের বিরক্তির কারণ হয়েছেন এবং সিনেমার মূল গল্পটাকে বিক্ষিপ্ত করে ফেলেছেন। ঐ অংশটুকু খুব অল্প সময়ের মধ্যে দেখানো গেলেই ভালো হতো।

মায়ার বাবা চরিত্রে পুলিশ অফিসারের দুর্বল অভিনয় অহেতুক সিনেমার গতিকে মন্থর করে দিয়েছে, আলসে ঘুমপ্রিয় বাঙালিকে সিনেমা হলে ঘুমোনোর রসদ যুগিয়েছে। সেই সময়টুকু এই অপ্রয়োজনীয় চরিত্রগুলোর বিস্তার না দেখিয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলো নির্মাণে মনোযোগ দিলে আমরা চরিত্রগুলোকে আরো আপন ভাবতে পারতাম। প্রধান চরিত্রগুলি আরও গল্পের অংশ হয়ে উঠতে পারতো। আমি অবশ্য মনোযোগী দর্শক। এরপরে আস্তে আস্তে আমরা ‘ইয়াং’, ‘বোল্ড’ খামখেয়ালি নিতুকে দেখতে পাই। নিতু চরিত্রটি নির্মাণে ফারুকী অতি মুনশিয়ানা দেখাতে গিয়েই বোধহয় বিভ্রান্তিতে পড়ে গেছেন। সিনেমার পরিচালককে হতে হয় আসলে একজন গল্পকথক। তিনি আমাদের গল্প বলেন। চরিত্রগুলোর ভেতর প্রাণ প্রতিষ্ঠাও তাই তার কাজ। না হলে গল্পটি জমে না। কিন্তু নিতুকে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে ফারুকী একেবারেই নিরপেক্ষ ছিলেন না। নিতুর মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করার চাইতে নিতুকে দর্শকের কাছে বিরক্তিকর, প্রগলভ করে দেখানোই যেন তার লক্ষ্য হয়ে ওঠে। সে মিডিয়ার কাছে নিজেকে বান্ধবী সাবেরীর বাবা জাভেদ হাসানের ‘বিশেষ বন্ধু’ হিসেবে পরিচয় দেয়, লুকিয়ে জাভেদ হাসানের শুটিং হাউজে চলে আসে। গোটা রাত সেখানে কাটায়- কাউন্টার সিগারেটে মেতে ওঠে। শেয়ার করা সিগারেটের ধোঁয়ায় জাভেদ হাসান এবং তার মেয়ের বন্ধু নিতুর মধ্যে বাড়তে থাকা নৈকট্য, গল্প কিছুটা স্পষ্ট হয়। কিন্তু মজার ব্যাপার এই যে, জাভেদ হাসান মিডিয়ার কাছে এই বন্ধুত্ব নিয়ে প্রকাশ্যে আসতে চান না। তিনি তার স্ত্রীর পৌনঃপুনিক সন্দেহ আর প্রশ্নের মুখে বারবার নিতুর প্রতি তার আকর্ষণের কথা অস্বীকার করে চলেন। কেন তিনি সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন না? কারণ কি এই যে জাভেদ হাসান আদৌ জানেন না তিনি কি চান? তার মন তখন আশ্রয়হীন, উদ্ভ্রান্ত, বিভ্রান্ত। তার মন আর নিজের অধীনে নেই। এমনকি অন্য কারো অধীনেও নেই। তিনি এমন সময় কাটাচ্ছিলেন যখন তার জীবনে যা ঘটছে, যা তিনি নিজেই করছেন, তাও তার ইচ্ছেমত হচ্ছে না। এটা একটা একইসঙ্গে করুণ ও আশ্চর্য সময়। আরো জীবন্ত করে এই সময়টা দেখানো যেতো। এখানেই দর্শক হিসেবে খটকা লাগে। জাভেদের চরিত্রটা এখানে অস্পষ্ট হয়ে থাকে। বেশ ঝাপসা। এখানে অবশ্য বেশকিছু দৃশ্য পরিচালক দেখিয়েছেন। অন্তঃসারশূন্য বোবা ইমারতে ঢেকে যাওয়া ঢাকা শহরের অযাচিত নাগরিক দৃশ্য। বেশকিছু লং টেক শট, যা দেখতে ভালো লেগেছে। স্বামীর বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক আঁচ করতে থাকা এক গৃহিণী, যার সামনে তার এতদিনের চেনা নিশ্চিত নিরাপদ সংসার নামক দেয়ালটা আস্তে আস্তে ভেঙে পড়ছে, তার কিছু করার নেই… শুধু অপেক্ষা করতে পারেন, স্বামীর ফেরার। ওদিকে জাভেদ হাসানের কলেজ পড়ুয়া মেয়ে তিশা অভিনয়ে যথেষ্ট জায়গা পেয়ে যায়। দৃশ্যধারণও সুন্দর। সে তার বাবা-মায়ের আসন্ন বিচ্ছেদ নিয়ে ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠেছে। কখনো তার অস্থিরতা রাগ হয়ে তার মায়েরই ওপর এসে পড়ছে। মাকে বড্ড নির্ভরশীল নতমুখী মনে হচ্ছে- আবার কখনো তার নিজের কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকছে যে তারই ছেলেবেলার খেলার সঙ্গী তার বাবাকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করছে। সে নিজেই এর একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। নিতু তার সাথে আজীবন প্রতিযোগিতা করে এসেছে। ব্যক্তি জাভেদ হাসানের কাছের মানুষ হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতায় জেতার জন্যই সে জাভেদ হাসানকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। “ও তোমার মেয়ে হইতে পারে নাই তাই বউ হইতে চাইতেসে।”

ছোট্ট সাবেরী আর নিতুর একটা পুতুলখেলার দৃশ্য আছে। শিশু নিতু সেখানে বলছে, “তোর বাবা সবসময় তোকে নিয়ে সিনেমা বানায় কেনো?… আমার বাবাকে বলবো, আমার বাবাও আমাকে নিয়ে সিনেমা বানাবে।” এই দৃশ্যটা দিয়ে নিতুর আশৈশব সংকীর্ণ মানসিকতা দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে হলো। একটি সিনেমার এরকম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে এত হালকা পথ নিতে হলো কেন কে জানে। তবে এখানে একটা কথা না বললে একদম অন্যায় হয়ে যাবে যে পুরো সিনেমায় যতগুলো মানব-সম্পর্ক দেখানো হয়েছে, তার মধ্যে জাভেদ-সাবেরীর পিতা-কন্যার সম্পর্কটির মতো আর কোনো সম্পর্কে এতটা প্রাণ প্রতিষ্ঠা পায়নি। এই একটি সম্পর্ক অকৃত্রিম অভ্রান্ত স্নেহের সম্পর্ক হিসেবে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে।

এভাবে অত্যন্ত ধীরগতিতে চলতে থাকা ‘ডুব’-এ হঠাৎই জাভেদ হাসান আর নিতুর বিয়ের খবর আমাদের কাছে আসে। এই পুরো সিনেমাটিতে অসংখ্য দৃশ্য আছে যেগুলোয় ফারুকী এবং ক্যামেরাম্যানের নির্মাণশৈলী প্রশংসার দাবি রাখে। ল্যান্ডস্কেপ এবং লং টেকগুলো অবশ্যই বলার মতো ভালো। কিন্তু এই খণ্ড খণ্ড দৃশ্য এক হয়ে ঠিক যেন কোনো গল্প হয়ে উঠতে পারেনি! এই বিচ্ছিন্নতা কি সিনেমার কোনো নতুন ভাষা নাকি পরিচালকের ব্যর্থতা, সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

সে যাই হোক, জাভেদ ও তার কন্যার বন্ধু নিতু বিয়ে করে নেয়। সাবেরী তার বাবার নতুন বাড়িতে এসে তার স্বাভাবিক রাগ, দুঃখ দেখিয়ে যায়। কিন্তু এখানে দর্শকের কাছে এই বিয়ের সংবাদটি না গল্পের ছন্দে আসে, না আসে বিস্ময় হিসেবে। এটা নিঃসন্দেহে পরিচালনার ত্রুটি। সিনেমায় জাভেদ হাসানের মনস্তত্ত্বও পরিচালক খুব নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেননি। যদিও প্রচেষ্টাটুকু টের পাওয়া যায়, ইরফান খানকে আরো অনেক সফলভাবে জাভেদ বানানো যেত। তবে আর যাই হোক জাভেদ চরিত্রটি অন্তত নিতু, মায়া- এই দুটো চরিত্রের মতো নির্মাণাধীন চরিত্র হয়ে থাকেনি। সেও কম কি! নিতু জাভেদ ব্যক্তি মানুষটি ছাড়া বাকি সকলের সাথে কেমন তা জানার আমাদের সুযোগ হয় না। অথচ নিতুকে চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে জাভেদ ছাড়া অন্য সকলের প্রতি নিতুর অভিগমন জানাটা প্রয়োজন ছিল।

শুধু এই জাভেদ ব্যক্তি মানুষটির ব্যাপার আসলেই কি সে এমন দুর্বিনীত, উদ্ধত ও ঈর্ষান্বিত, নাকি সকলের সাথেই এমনভাবে যুক্ত? আবার তার সাথে জাভেদের অপ্রতিসম সম্পর্কটি কখন কি করে কোথায় শুরু হলো এসবও জানা যায় না। নিতু এক জায়গায় বলছেন, “এমন একজনের জন্য বাড়িঘর সব ছেড়ে আসছি যে সারাদিন নিজের মেয়ের জন্য কাঁদে। তাও আবার সেই মেয়ে যে আমারে ঘেন্না করে”- তা এই সম্পর্কটির ক্ষেত্রে জাভেদের ত্যাগ আমরা দেখেছি, নিতুকে কি কি ছাড়তে হয়েছে সেদিকে একটু আলো ফেললে কি ভালো হতো না? অনেকটা অন্ধকার হাতড়ে বেড়ানোর মতো। যদি ফারুকী ইচ্ছে করেই এমনটা করে থাকেন দর্শকের ভেতরে না জানার অতৃপ্তি রেখে দেবেন ভেবে, তাহলে তার এটাও জানা প্রয়োজন যে এরকম অতৃপ্তির স্বাদ এই ধরনের সিনেমায় ঠিক ভালো কোনো নিরীক্ষা নয়।

নিতু তার স্বামীকে নিয়ে খানিক অনিশ্চিত। তার স্বামীর আগের পক্ষের সন্তানদের প্রতি পিতৃবৎ আচরণ তাকে অসহিষ্ণু করে তোলে। “এটা আমার বাড়ি, আমার বাড়ি” বলে আগের গিন্নির পছন্দ করা ঘরের ডিজাইনও সে অত্যন্ত দায়িত্ব মনে করে পালটে নেয়। ওদিকে কুহকিনী হিসেবে তার নামও হয়ে গেছে। টকশোর যে দৃশ্যটি দেখানো হয় তাতে অনুষ্ঠান সঞ্চালক এবং পার্নোর অভিনয় এতটাই শিশুসুলভ ন্যাকামো মনে হয়েছে যে আমি ভাবছিলাম এমন টকশো দেখিয়ে ফারুকী বাংলাদেশের সচরাচর টকশোগুলোর একটা ধারণা দিতে চাইলেন নাকি! এই সিনেমায় নিতু, মায়া চরিত্র দুটি যেমন পুরোপুরি নির্মিতই হয়নি তেমনি নিতুর সঙ্গে জাভেদ হাসানের সম্পর্কের ইতিবৃত্তটা চতুর্ভুজধর্মী না অন্য কিছু, বোঝা গেল না। নিতু মুড়িঘণ্ট রান্না করেছে শুনে জাভেদ একবার তাকে কাছে টেনে নেয় (!), আরেকবার ছবি থেকে স্ত্রীকে ক্রপ করে দেয়ায় স্ত্রীর অসম্মান হয়েছে বলে ভক্তের সাথে তার ক্ষুব্ধ কথোপকথনে তার স্নেহ খানিক টের পাওয়া যায়। অতটুকুতে এই সম্পর্কটি কতটা প্রতিষ্ঠিত হয় বা আদৌ হয় কিনা সেটা সিনেমা দেখলেই বোঝা যায়।

আরো একটি অহেতুক দীর্ঘ দৃশ্য হলো- জাভেদ হাসানের ভক্তটিকে জোর করে বাড়ি থেকে বার করে দেয়ার দৃশ্য। একে তো দৃশ্যটির প্রয়োজনই ছিল না, তার ওপর অতখানি দীর্ঘ। আর এই ছোট ছোট চরিত্রগুলোতে যারাই অভিনয় করেছেন তারা এত অযত্ন নিয়ে করেছেন যে মনে হচ্ছিল মশকরা করে শুটিং করা হচ্ছে। ছোট ছোট এই চরিত্রগুলো মোটেই তুচ্ছ নয়। একটা সিনেমায় কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলো আশপাশের গ্রহ চরিত্রগুলো দিয়ে প্রভাবিত হয়। ‘ডুব’ সিনেমায় আগাগোড়াই সেই দিকটিকে অবহেলা করা হয়েছে। আবার এদিকে কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোও ভালো করে ফুটিয়ে তোলা হয়নি। কেউ-ই শতভাগ নিজের চরিত্রে ঢুকতে পারেননি। কারণ নির্মাতা কোনো চরিত্র নির্মাণে সেই প্রয়োজনীয় সময়টুকুই দেননি। অথচ এ সিনেমার কাস্টিং অনেকটা বেছে বেছে হীরে তোলার মতো করা হয়েছে।

জাভেদ হাসান ও মায়ার আরেকটি ছোট ছেলে আছে। দ্বিতীয় বিয়ের পর তার সাথে জাভেদ হাসানের সলজ্জ ও স্নেহপূর্ণ ইন্টারেকশনের দৃশ্যটি ভালো লেগেছে। তবু একথা আবার বলতে বাধ্য হচ্ছি, সিনেমাটির প্রায় পুরোটা জুড়ে এক দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যে যাওয়ার কোনো প্রবাহ নেই। দৃশ্যগুলি প্রায় বিচ্ছিন্ন ও ছন্দহীন. যেন কতকগুলো পারস্পরিক সংযোগহীন দৃশ্যকে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এই সিনেমায় আরো একটা ব্যাপার আমার মনে হয়েছে- গল্পকথক, নিতু এবং মায়ার মধ্যে একটা তুলনামূলক বাহ্যিকতা দেখানোর চেষ্টা করেছেন পরিচালক। সেটা একেবারে মনস্তাত্ত্বিক তুলনা নয়, পুরোটাই অত্যন্ত সুপারফিশিয়াল। বহিরাঙ্গের তুলনা। মায়াকে দেখানো হয়েছে একজন খুব সাধারণ, স্বামীর ওপর মানসিক আর্থিক সবভাবে নির্ভরশীল মহিলা কিভাবে একটা ঘটনা প্রবাহে নিজের ভেতর অন্য একটা সত্তাকে আবিষ্কার করে। এই নতুন মায়াটি অনেক বেশি পরিশীলিত, অভিজ্ঞতালব্ধ, আগুনে পুড়ে যিনি সোনা হয়েছেন। হয়ে উঠেছেন স্বাধীন, স্বাবলম্বী এবং স্বাধীনচেতা। এই সময় মা এবং মেয়ের মধ্যে আরো গভীর হয়ে ওঠা আশ্বাস ও বন্ধুতা দেখেও ভালো লাগে। কিন্তু। নিতু আর মায়ার মধ্যে এমন মোটাদাগে তুলনা করাটা, আগে-পিছের কোনো মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ছাড়াই, কিছুটা বোকা বোকা লাগে। তুলনাটা আরো অনেক বেশি গুপ্ত আর সৃজনশীল হতে পারতো। এভাবে সিনেমাটির বিলম্বিত ঘটনাপ্রবাহ আর বিচ্ছিন্নতা কখনোই দর্শককে সম্পূর্ণরূপে এতে বিলীন হতে দেয় না। একটা দূরত্ব থেকেই যায়।
অন্ধকারের ওপারে আলোক স্বর্গ। জাভেদ হাসান জীবনের একটা ডিলিউশনের ঢেউয়ে ভেসে গেছেন। হয়তো ডুবে গেছেন। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর মধ্য দিয়েই তিনি সেই সব ভ্রান্তি, অপমান, বিচ্ছেদ-ব্যথার ঊর্ধ্বে চলে যান। এখানেও; কিভাবে তার মৃত্যু হলো তা অব্যক্ত। বাস্তবের কোনো মৃত্যুর ঘটনা কি তাকে জাভেদের মৃত্যুর ঘটনাকে ঝাপসা করে তোলার ব্যাপারে প্রভাবিত করেছিল? ফোনে জাভেদের মৃত্যু সংবাদ শুনে মায়া ও সাবেরীর ভাবলেশহীন থাকা এবং পরে দুজনারই নিভৃতে কান্না- এই দৃশ্যগুলো অভিনয়ের গুণে খুবই জীবন্ত মনে হয়। রোকেয়া প্রাচী নতুন শাড়ি পরে বলছেন- “এই জাভেদকে আমি ভালোবাসি। এখন তুমি আর কারোর অধীনে নেই। এই স্বাধীন মানুষটিই জাভেদ!” মৃত্যুকে রোমান্স করার এই সুন্দর সুযোগটুকু ফারুকী ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছেন বলে তাকে ধন্যবাদ।

লাশ বয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটাতে অবশ্য আরো কিছু লোক দেখানো উচিত ছিল। নিতু চরিত্রে পার্নো মিত্র অভিনয় কোনো দৃশ্যেই বিশেষ সুবিধের মনে হয়নি। তার ব্যাপারে পরিচালকের কৃপণতা চোখে পড়েছে। তবে শেষ দৃশ্যে তিনিও মন্দ করেননি। তবে কাঁদতে কাঁদতে এত বছর পর বাবার লাশকে বাবা বলে ডাকার সময় সাবেরীর যে অবর্ণনীয় কষ্টটা তিশা এঁকেছে তার অভিনয়ে, এককথায় তা অপূর্ব। সেদিক থেকে পার্নোর অভিনয় তেমন চোখেই লাগেনি। পরিচালক তাকে ‘খল’ চরিত্র করে তুলেছেন। অভিনয়ের তেমন সুযোগই সে পায়নি। আর এই গোটা সিনেমার সবচেয়ে চমৎকার ও একইসঙ্গে করুণ দৃশ্যটি- জাভেদের আত্মার শান্তি কামনা করে জাভেদের সকল ভুল কাজের জন্য ক্ষমা চেয়ে “আমিন” বলা হচ্ছে; জাভেদ ও নিতুর সদ্য হাঁটতে শেখা একেবারে দুগ্ধপোষ্য শিশুটি বাবার জানাজায় দোয়া করতে আসা বিশাল ভিড়ের সঙ্গে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে তাদেরই সুরে সুর মিলিয়ে বলে ওঠে ”আমিন”।

‘ডুব’ ঠিক অতলান্তিক গভীরতার ডুব নয়। কিছু দৃশ্যায়ন, ক্যামেরার কাজ খুব ভালো হয়েছে কোনো সন্দেহ নেই। সোজা কথায় সিনেমাটোগ্রাফি মনে রাখার মতোই। কিন্তু কোনো একটি চরিত্র নির্মাণে পরিচালক নিজের চিন্তাকে সঁপে দিয়ে অবয়ব দিতে পারলেন না। তাই কোনো চরিত্রই ডানা মেলে দর্শকের আকাশে ওড়ার সুযোগ পায়নি। মনে গেঁথে থাকলো না। অনেক কিছু উপলব্ধি করাই যেন বাকি থেকে গেল। সিনেমার নির্মাণশৈলী বিবেচনা করলে খুব দারুণ কিছু অংশ যেমন আছে, তেমনি আছে গল্পের না-এগোনোর শ্লথ আবর্তন। খণ্ড খণ্ড দৃশ্যের মধ্যে সাযুজ্যের অভাব রীতিমতো মন খারাপ দেয়। গল্প বলার যে ভাষা পরিচালক বেছে নিয়েছেন তা বাংলা সিনেমায় তো বটেই এশিয়ার সিনেমাগুলোতে বিরল। কিন্তু এই সিনেমাটিতে ইউরোপীয় সিনেমার নৈঃশব্দ্য আর অব্যক্ত ভাষা যে টনিকের মতো কাজ করেছে, এমনও নয়। নৈঃশব্দ্য সবচেয়ে সুন্দর ভাষা, সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই ভাষার অদৃশ্য বর্ণমালা উপলব্ধি করানোর মতো হৃদয় আর সৃষ্টিশীল প্রতিভা থাকা দরকার। যদি ‘ডুব’ ফারুকীর একটি নিরীক্ষামূলক প্রজেক্ট হয়, তবে আমি বলবো, “গভীরে যাও, আরো গভীরে যাও।” এভাবে বিক্ষিপ্ত বিভ্রম নয়, গহনস্পর্শী গল্পের চলচ্চিত্রায়ন তাঁর কাছে প্রত্যাশা করি।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close