Home আত্মজীবনী শাপলা সপর্যিতা > উল্লাসে উদ্‌যাপনে লেখালেখির জীবন আমার >> জন্মদিন

শাপলা সপর্যিতা > উল্লাসে উদ্‌যাপনে লেখালেখির জীবন আমার >> জন্মদিন

প্রকাশঃ October 6, 2018

শাপলা সপর্যিতা > উল্লাসে উদ্‌যাপনে লেখালেখির জীবন আমার >> জন্মদিন
0
0

শাপলা সপর্যিতা > উল্লাসে উদ্‌যাপনে লেখালেখির জীবন আমার >> জন্মদিন

 

“অপবাদের সকল বোঝা মাথায় নিয়ে দুই কন্যার হাত ধরে এসে দাঁড়াই নীল আকাশের নিচে। কপর্দকহীন শূন্য একা। সম্বল একটি বেসরকারি চাকরি। লিখিতে শুরু করি আরও জোশে। আরও রোষে। রাগ দুঃখ অভিমান লিখি। সকাল বিকেল অফিস। কাজের ফাঁকে লিখি। সন্ধ্যেতে টিউশন। মধ্যরাত অবধি ছাত্র-পড়ানো। রান্না, সন্তান লালনপালনে পরাক্রান্ত স্ত্রী যদি পরগামী হয়, তবে লেখক হবে কখন! আমি লিখবোই।”

কোনো এক বিস্তৃত গভীর অন্ধকার ঘন রাত্রির গর্ভে নাম না জানা কোনো পাহাড়ের কোলে ঝর্ণা বয়েছিল হয়তো সেদিন। আর সুরমা নদীর বুকে আলো জ্বেলে দিয়েছিলেন আমার মা। সেই ছিল আমার জন্মক্ষণ। সেই পাহাড়ের রূপ, সেই নদীর সম্পদ আমার দেখা হয়নি কোনোদিন। আমি দেখেছি কেবল এক লালামাই পাহাড়। তার খাঁড়ি পথ বেয়ে উঠে গেছি কোথায় না কোথায়। বনফুলে ভরে গেছে আমার ছোট্ট শরীর। আজও তারই বুনোগন্ধে মাতাল আমার মন। ওই পাহাড়ের উঁচু টিলায় একাকী একজন মানুষের নৈঃসঙ্গ্য ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে আমার পুরোটা কিশোর বেলা। চলার পথে, রাতভর ঝরে-পড়া শিউলির বুকের লাল ক্ষত আগুন জ্বেলেছিল আমার ছোট্ট বুকে সেই প্রদোষে। অতঃপর এই পাহাড় ডিঙিয়ে সেই পাহাড়। সুরমা পেরিয়ে ব্রক্ষ্মপুত্রের নিবিড় জলে ফুটে উঠেছিল আরও এক গভীর বেদনার জলকুসুম।

নিজের জন্মদিন কিংবা জন্মক্ষণকে স্মরণ করবার যে কঠিন আর ব্যাপক দায়িত্ব থাকে তার বিপরীতে আজ সারাদিন কেবলই আমার প্রাণের ঠাকুরের এই গানটি বেজে উঠছে মনে… “হে নূতন দেখা দিক আরবার জন্মেরও প্রথম শুভক্ষণ…।”

বেজে চলেছে দিনে-দিনে, মাসে আর বছরে-বছরে এতকাল, গোপনে আড়ালে বেড়ে ওঠা একটি নতুন ভ্রূণের যাতনা নিয়ে। তবু প্রণাম জানাই সেই বেদনার রক্তপাতকে। প্রণাম এই শুভক্ষণে সেই ক্ষরণের প্রবাহকে। এই ক্ষরণ আর এই রক্তপাতকে অবলম্বন করেই আরও এক জন্ম আজ একই যাপনের মাঝখানে। কে জানে তার স্বরূপ! কে লিখবে এর ইতিহাস!

গভীর এক অন্ধকারে তলিয়ে গেছিল আমার সব বই। আমি সংসার স্বামী সন্তান করে-করে পার করে দিলাম ষোলটি বছর। খুলে দিলাম গলার হার। হাতের বালা। জলাঞ্জলি দিলাম ক্যারিয়ার। ভেঙে গেল আমার প্রথম প্রদোষে গাঁটছড়া বাঁধা কবিতার ঘর। স্টেজ মাইক্রোফোন রিহার্সেল কত কত দূরে। শেষ পেনিটুকু বিলিয়ে দিয়ে নিঃশেষ আমি যখন, যখন ভাবছি কী করে শেষ করে দেয়া যায় সব। ভেঙে দেয়া যায় এই অচলায়তন। খুঁজছি বিষের কৌটা। জ্বলছি আগুনে। চোখের সামনে পুড়ে যাচ্ছে কন্যার মুখ। তারপর একদিন জেগে উঠি কী দারুণ রোষে। রক্তে লুকিয়ে থাকা সৃষ্টির শেষবিন্দু কেমন যেন লাফিয়ে ওঠে। অনাচারে অনাচারে আরক্ত আমি আর কিছুই ভাবতে পারিনা। ছুঁড়ে ফেলে দেই বিষের কৌটা। হ্যাঁ আমাকে বাঁচতেই হবে। আর কারো জন্য না হোক কন্যাদের জন্য। তখনই খুব করে জড়িয়ে ধরি তারে। লিখতে শুরু করি আবার। শেষ লেখা প্রকাশ হয়েছিল ১৯৯৭ সালে মুক্তকন্ঠের খোলা জানালায়। তারপর আর নেই কিছু। নয় কিছু আর। এত বেলাশেষে যখন লিখতে শুরু করলাম, কী দারুণ শান্ত হয়ে এলো মন। স্থির নিশ্চল হলো সব। পরম প্রশান্তিময় সব তখন। কিন্তু এ সমাজ এ রাষ্ট্র এ সংসার বড় বেশি ক্রুয়েল। বড় বেশি আস্ফালন এখানে প্রভুদের। ভৃত্য এখানে স্ত্রী। বেশ্যা এখানে নারী। সহধর্মিনী এখানে শুধুই সজ্জাসঙ্গিনী। শিক্ষিত স্ত্রী এখানে শুধুই সংসারের চাকা সচল রাখবার যন্ত্রের বেশি কিছু নয়। যত লিখি তত আমি বহুগামী। যত লিখি ততই আমি সংসারে আস্থাহীন। যত লেখা প্রকাশ হয় ততই আমি সম্পাদকের শয্যাসঙ্গিনী। এ সমাজ এই বলে। নারীর পথচলা দুরূহ। সাথে যদি রয় সন্তান, সে-তো দুর্বহও বটে। তারও পর যদি তাকে থামানো না যায় তবে তো সে বেশ্যা ছাড়া আর কিছুই হতে পারেনা। নারী যদি খুলে ফেলে লাগাম তবে পুরুষের সর্বশেষ অস্ত্র হলো তারে কলঙ্কিনী করে দেয়া। এই হলো এই সমাজে পুরুষের রূপ। স্বামীর খুলে-পড়া মুখোশের আড়াল।

যখন একজন নারীকে কোনোভাবেই পর্যুদস্ত করা না যায়, কোনোভাবেই বশে না রাখা যায় তার মেধা, তখনই তার পিঠে লাগিয়ে দেয়া হয় এইসব লালকালির সিল। আমি তখন আরো একাগ্র নিবিষ্ট নির্বিকার। অপবাদের সকল বোঝা মাথায় নিয়ে দুই কন্যার হাত ধরে এসে দাঁড়াই নীল আকাশের নিচে। কপর্দকহীন শূন্য একা। সম্বল একটি বেসরকারি চাকরি। লিখিতে শুরু করি আরও জোশে। আরও রোষে। রাগ দুঃখ অভিমান লিখি। সকাল বিকেল অফিস। কাজের ফাঁকে লিখি। সন্ধ্যেতে টিউশন। মধ্যরাত অবধি ছাত্র-পড়ানো। রান্না, সন্তান লালনপালনে পরাক্রান্ত স্ত্রী যদি পরগামী হয়, তবে লেখক হবে কখন! আমি লিখবোই। ষোলটি বছর আমি ভুলে যেতে চাই। আর তারই নেশার দ্রব্য হয়ে ওঠে তখন আমার লেখা। লিখেছি কবিতা লিখেছি গল্প লিখছি মুক্তগদ্য লিখছি উপন্যাস। লিখছি অসংখ্য আগাছা। হয়তো একদিন সব আগাছার পর জন্ম নেবে কোনো এক বটবৃক্ষ। লিখেই চলেছি। পিঠে বয়ে চলেছি সিলমোহর… তবু থামিনি আর।

গত চার চারটি বছর এমন যায়নি আমার যেদিন লিখিনি অন্তত ১০০০ শব্দ। আর এইভাবে আর এক জন্ম আমার। এই জন্মের নাগাল যখন আর পাওয়া গেল না, তখন আসে বিচ্ছেদের চিঠি। ডিভোর্স লেটার আসেনা আমার ঠিকানায়। গত হয়ে যায় তিন মাসের মিউচুয়ালেরও ডেট। জানতেও পারিনি। কাজি আর লইয়ারের মাধ্যমে আইনসিদ্ধ হয়ে যায় আমার বিচ্ছেদ। আমি হেসে উঠি। আমি জেগে উঠি। আমি বেঁচে উঠি। দু-ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে চোখে আমার বন্ধ্যা ষোলটি বছরের কথা ভেবে। তবু আমাকে কাঁদাতে পারবার সুখে আনন্দের জোয়ারে ভেসে যায় এ বিশ্ব। আমি নতুন জন্মকে বরণ করে নেই সেই বিষাদের অরুণ আলোয়। কেন জানিনা লেখা পড়তে থাকে মানুষ। কলকাতা থেকে যখন প্রকাশক অরুণাভ আমার পাণ্ডুলিপি নিতে আসে তখন আমি তাকে ‍চিনিনা। প্রথম পরিচয়ে প্রশ্ন করি :
– তুমি আমাকে চিনলে কী করে? আমাকে পেলে কোথায়?
ও বলল :
– আমি আপনার লেখা ‘নারী’ পড়েছি।

তারপর আত্মজা পারবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয় ‍উপন্যাস- ‘টাইমমেশিন’। বেহুলা বাংলার কর্ণধার চন্দন চৌধুরী আমাকে একটি কিশোর উপন্যাস লিখে দেবার জন্য বললে সেটাও ফেলতে পারিনা। নিজেকে যাচাই করতে ইচ্ছে হয় খুব। যা ইচ্ছে তাইতো বেশ লিখতে পারি। দেখিনা এ-ও পারি কি না। প্রকাশ হয় টাপুর টুপুর প্রকাশনী থেকে হরর উপন্যাস ‘গুপ্তহত্যা অতঃপর।’ এভাবেই এক নতুন আমি। মানুষ ভালোবাসতেও থাকে লেখার সাথে লেখকেও। অজস্র অজানা অচেনা মানুষের ভালোবাসা পরম পাওয়ার মতো কেবল আমাকে জড়িয়ে রাখে এই লেখক-জন্মে নতুন জীবনে। যাপনে প্রত্যন্তে কেবল এক নেশা। মাতালের মতো লিখি। হৃদয় চিরে চিরে লিখি। সত্যের দীপ জ্বালিয়ে লিখি। কেউ কেউ বলে ’কেবল ‘আমি’র কথা কেন লেখ?’ তারা জানেনা এই আমি আর কেউ নই। এই আমি সকল। সকল নারী। সকল মানুষ। যে বুঝতে পারে সে বার বার লেখা চায়। এ কারণেই গত দু-বছর ধরে একটানা লিখে চলেছি সমাত্মজীবনী, নারী। ছাত্রজীবনের বন্ধুরা বলে :
– এই সময়ে আত্মজীবনী লিখছ? কি আছে এতে?

বিদগ্ধ পাঠক তারা আমার। আমার তবু কোনো স্বপ্ন নেই। আমি কেউ নই। আমি কিছ্ছু নই। আমি লেখক। যে বাঁচতে চেয়েছিল একদিন দারুণ ঝড়ে। মৃত্যুর কবল থেকে বেঁচে গেছে সে যে লেখার জোরে। তারে আমি কেবল জড়িয়ে রাখতে চাই, ভরিয়ে রাখতে চাই। লেখক হিসেবে তাই আমি কোনোদিন নিজের দাম হাকিনি। লিখে চলেছি একের পর এক ধারাবাহিকও। চার-চারটে বছর ধরে লিখতে থাকার পর আজ খানিকটা ক্লান্ত করে, অস্থির করে একই সাথে লিখতে থাকা ভিন্ন ধরনের তিনটি ভিন্ন ধারাবাহিক, এই। তবু এ-জন্ম আমার উল্লাসের। এ-জন্ম আমার উদযাপন। এ আমার লেখক জীবন।

সব জন্ম প্রকাশের যোগ্য নয়। আবার কোনো কোনো জন্ম চিৎকারে ফুৎকারে জানান দেয়ার। আমার দুই জন্মই জানানোর প্রকাশের আনন্দের। প্রথম জন্মের ক্ষণ জন্মদাতার ইতিহাসে লেখা থাকে সবার। কিন্তু আমি খুঁজি আমার নবজন্মের তিথি। নাম ঠিকানা তারিখ বছর যার অনস্তিত্ব। জানি একজীবনে শেষ হবেনা এর খোঁজ। তাই বার বার জন্মের অভিলাষ। যদি কোনোদিন খুঁজে পাই তারে নিজের কোনো এক লেখায় – কবিতায় গল্পে কিংবা উপন্যাসের কোনো একপাতায় জানিয়ে যাব সকলেরে, জ্বালবো প্রদীপ সেদিন নিজেরই আত্মার পরম সম্পদে।

আর, এত ঝড় প্রলয় ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ যে সময়ের ভ্রূণ তাকে বহন করে চলেছিল যুগেরও বেশি সময় ধরে তাকেই পরম বলে মানি আজ। জানি শুভক্ষণ বলে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close