Home কবিতা শামসুর রাহমান > তিনি ছিলেন তরুণের প্রতিযোগী >> মৃত্যুদিন

শামসুর রাহমান > তিনি ছিলেন তরুণের প্রতিযোগী >> মৃত্যুদিন

প্রকাশঃ July 10, 2018

শামসুর রাহমান > তিনি ছিলেন তরুণের প্রতিযোগী >> মৃত্যুদিন
0
0

শামসুর রাহমান > তিনি ছিলেন তরুণের প্রতিযোগী >> মৃত্যুদিন

 

[সম্পাদকীয় নোট : আজ ১০ জুলাই। ১৯৮৫ সালের এই দিনে মৃত্যুবরণ করেন গত শতকের চল্লিশের দশকের এই শীর্ষকবি। তাঁর মৃত্যুর দিনটিকে স্মরণ করে প্রকাশিত হলো শামসুর রাহমানের এই লেখাটি। শামসুর রাহমান এটি লিখেছিলেন ১৯৮৫ সালে আহসান হাবীবের মৃত্যুর পর। প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক বাংলার রবিবাসরীয় সাহিত্য বিভাগে। এই লেখার কভারে যে দুর্লভ ছবিটি ব্যবহৃত হয়েছে সেটি প্রকাশিত হয়েছিল সাহিত্য পত্রিকা ‘পুবালী’তে, আষাঢ়-শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৭৩ সনের ৫ম বর্ষ ১০ম সংখ্যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিতা পড়তে এসেছিলেন আহসান হাবীবসহ আরও কয়েকজন।]

 

আমরা যারা সাহিত্য চর্চা করি, সংস্কৃতি নিয়ে উৎসাহী, তারা আজ শোকার্ত। কেননা আমাদের সাহিত্যক্ষেত্র থেকে এমন এক ব্যক্তিত্ব বিদায় নিয়েছেন যাকে আমরা শ্রদ্ধা করতাম, ভালবাসতাম। শোকের মুহূর্তে নীরবতা অবলম্বনই বাঞ্ছনীয়, বাচালতা মৃত্যুর পবিত্রতাকে ক্ষুণ্ন করে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কলম পেষাই যাদের পেশা, তাদের পক্ষে নীরব থাকা মুশকিল। শোকসভায় তাদের মুখ খুলতে হয়, পত্রপত্রিকার ক্ষুধা মেটানোর জন্য ছেটাতে হয় তাৎক্ষণিক কালী। ফলে, তারা যথার্থ শোক পালনের অবকাশ থেকে বঞ্চিত হন। যারা শোকসভার আয়োজন করেন, সংবাদপত্রে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেন তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। বরং তাদের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞ থাকাই উচিত। কোন বিখ্যাত ব্যক্তির তিরোধানে একেবারে চুপচাপ থাকাটাও অসৌজন্যের নামান্তর। এই আচরণ নিঃসন্দেহে চিহ্নিত হবে বিসদৃশ ও অসমীচীন হিসেবে। শোক উদ্‌যাপনও মৃতের কাছে এক ধরনের দায়বদ্ধতা। এই পবিত্র দায় না মেটানো পর্যন্ত মুক্তি নেই।

তাই এই মুহূর্তে আহসান হাবীবের মৃত্যুতে যত বেদনার্ত ও শোকার্ত হই না কেন, আমার পক্ষে লেখনি চালনা যত দুরূহই হোক, তাঁর বিষয়ে কিছু লিখতেই হবে। আমার মনের ভেতর বহু স্মৃতি ভিড় করে আসছে, এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সব। এখন গুছিয়ে কিছু লেখা প্রায় অসম্ভব। এই মুহূর্তে আমার চোখের সামনে সবকিছু ছাপিয়ে ভেসে উঠছে চশমার আড়াল থেকে তাঁর তাকানো, চেয়ারে বসে থাকার ভঙ্গি, দু আঙুলের ফাঁকে সিগারেট ধরার ধরন, তাঁর সুন্দর হাসি, হাতের হঠাৎ নড়া, টুকরো কথা। যাঁকে আমরা ভালবাসি, অন্তরঙ্গভাবে চিনি, তিনি যত বড়ই হন, যত বিখ্যাত হন, তাঁর প্রস্থানের অব্যবহিত পরে কোন বিরাট ঘটনা কিংবা মহৎ বাণী আমাদের মনে পড়ে না; মনে পড়ে সামান্য খুঁটিনাটি কথা, আপাতদৃষ্টিতে সেগুলোর তেমন কোনো মূল্য হয়তো নেই। সেই প্রিয়জনের চোখের চাওয়া কিংবা চা খাওয়ার ভঙ্গি মনে পড়লেই বুক হু হু করে ওঠে, ছলছলিয়ে ওঠে চোখ।

মনে পড়ে আহসান হাবীবকে প্রথম দেখেছিলাম এক দুপুরে তখনকার ঢাকার একমাত্র বইপাড়া বাংলাবাজারে। ১৯৪৯ কিংবা ১৯৫০ সালের কথা। তিনি নওরোজ কিতাবিস্তানে বসে কী যেন লিখছিলেন। কবিতা? না, তাঁকে যতটা জেনেছি তাতে মনে হয় না তিনি কোন বইয়ের দোকানে বসে কয়েকজন লোকের কৌতূহলী দৃষ্টির সামনে কবিতা লিখবেন। হয়তো দ্রুত কোনো চিঠি লিখছিলেন কিংবা অন্য কিছু। সেদিন তাঁকে দূর থেকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। মাথাভর্তি কালো চুল, পাকা গমের মতো গায়ের রঙ; রীতিমত সুদর্শন। আমি নওরোজ কিতাবিস্তানে ঢুকিনি, রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম। ভেতরে ঢুকে কবির সঙ্গে আলাপ করবো, এই সাহসটুকু সঞ্চয় করতে পারিনি। এর আগে তাঁকে দেখিনি, তাঁর কোনো ছবিও আমার চোখে পড়েনি। সেদিন দুপুরে যদি বাংলাবাজারে আমি একা যেতাম তাহলে আহসান হাবীবকে চিনতে পারতাম না। ভাগ্যবলে, আমার সঙ্গে কেউ একজন ছিলেন সেদিন। কে ছিলেন মনে পড়ছে না। তিনি বললেন, “ওই যে বসে বসে লিখছেন, তিনি আহসান হাবীব।। সদ্য কলকাতা থেকে এসেছেন।” আচ্ছা, মনে মনে উচ্চারণ করলাম, ইনিই আহসান হাবীব, ‘রাত্রিশেষ’-এর কবি। মনে গুঞ্জরিত হলো,  “ঝরাপালকের ভস্মস্তূপে তবু বাঁধলাম নীড়”। পঙক্তিটি  যদিও জীবনানন্দীয়, তবু এর দোলা ভালো লেগেছিল। তবে আমার বিবেচনায় আহসান হাবীবের রাত্রিশেষ-এর কাশ্মীরি মেয়েটি সেই বইয়ের উজ্জ্বলতম কবিতা। “কাশ্মীরি মেয়েটির তনু গোলগাল / কাশ্মীরি মেয়েটির ঘাগড়াটা লাল- এই পঙক্তি দুটি প্রায়ই আওড়াতে সেকালে।

সেদিন সাহস করে আহসান হাবীবের সঙ্গে দেখা করিনি, কিন্তু পরে তাঁরই ডাকে দুরু দুরু বুকে হাজির হয়েছিলাম কবি-নিবাসে। তখন তিনি পুরোনো ঢাকায় থাকতেন, সাতরওজার কাছে। আমার লেখা তাঁর ভালো লাগে একথা জানানোর জন্যই তিনি ডেকেছিলেন। তাঁর এই স্নেহার্দ্র ঔদার্য শুধু আমার বেলাতেই নয়, আরো অনেকের ক্ষেত্রেই বর্ষিত হয়েছে।

এখনকার তরুণ লেখকগণ আমার সঙ্গে এ ব্যাপারে একমত হবেন যে আহসান হাবীব লেখার ভালো-মন্দ বিচারে বরাবরই একজন কঠোর সমালোচকের ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর বিচার যে সবসময় যথার্থ হয়েছে, একথা বলি না, তবে তাঁর বিচার-বিশ্লেষণে সততার কোনো অভাব ছিল না। যে লেখকের মধ্যে তিনি শৈল্পিক গুণাবলীর পরিচয় পেয়েছেন তাঁর লেখা প্রকাশ করেছেন নির্দ্বিধায়, আনন্দিত চিত্তে, আর যাকে মনে হয়েছে নির্গুণ, তাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন অকুণ্ঠ নিস্পৃহতায়।। এতে অনেকেই কূপিত হয়েছেন, বিষোদ্গার করেছেন তার বিরুদ্ধে। কিন্তু তাতে তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। একজন সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে অনমনীয়ভাবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

এখানে একটি ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। আমি অন্তত পঞ্চাশের দশকের একজন তরুণের কথা জানি যার কবিতা সম্পর্কে সেকালে আহসান হাবীব ‘মোহাম্মদী’তে কিছু উৎসাহ-জাগানিয়া মন্তব্য করেছিলেন। তিনি ১৯৫০ সালে প্রকাশিত একটি কাব্য সংকলন সম্পর্কে একটি নাতিদীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন সেই সাহিত্যপত্রে। সংকলন গ্রন্থটিতে উল্লিখিত তরুণের কতিপয় কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। আহসান হাবীব সেসব কবিতা তেমন পছন্দ করেননি, কিন্তু সেই তরুণ কবির সংকলন বহির্ভূত কিছু কবিতার প্রশংসা করেছিলেন। আহসান হাবীবের প্রশংসা তরুণ কবির পক্ষে ছিল খুবই উদ্দীপক এবং উপকারী। আবার এই একই তরুণ কবি, যার তখন বেশ নাম-ডাক হয়েছে, একবার ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেহাদের সাহিত্য বিভাগ থেকে হতাশ হয়ে ফিরে আসে। আহসান হাবীব তখন ইত্তেহাদের সাহিত্য সম্পাদক। তিনি তরুণ কবির একটি কবিতা ছাপতে রাজি হননি, অথচ তিনি নিজেই তার কাছ থেকে কবিতা চেয়েছিলেন। কবিতাটি আহসান হাবীবের পছন্দ হয়নি, একথা তিনি সরাসরি তাকে জানিয়েছিলেন। তরুণ কবির যশ কিংবা প্রতিষ্ঠার কথা আমলে আনেননি। ঘটনাটি উল্লেখ করলাম এজন্য যে এতে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে আহসান হাবীবের একটি বৈশিষ্ট্য পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। তিনি সেই তরুণ কবির লেখার অনুরক্ত পাঠক হওয়া সত্ত্বেও তার কাছে যে-কবিতা অগ্রাহ্য মনে হয়েছে, তা বাতিল করতে এতটুকু দ্বিধা করেননি।

একসময় আহসান হাবীবের কাছে খুবই যেতাম তাঁর মাহুতটুলির বাসায়। আমার পরম সৌভাগ্য, পরে তাঁর সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলাম। তাঁর সঙ্গে যে খুব বেশি কথা হতো একথা বলা যাবে না। টুকরো টুকরো কথা, এলোমেলো নানা প্রসঙ্গ, কখনো কখনো চুপ করে বসে থাকা। কোনো কোনো মানুষ আছেন যাঁদের সান্নিধ্যে আসতে পারাই আনন্দের ব্যাপার। কথা বলবার দরকার নেই। তিনি সামনে বসে আছেন, সিগারেট টানছেন, দৃষ্টি ছড়িয়ে দিয়েছেন জানালার বাইরে কিংবা চায়ের পেয়ালা বাড়িয়ে দিচ্ছেন- এ সবই যথেষ্ট। আহসান হাবীব ছিলেন এই ধরনের একজন মানুষ। তাঁর সঙ্গে কিছু সময় কাটাতে ভালো লাগতো আমার। সাহিত্যক্ষেত্রে দেশে-বিদেশে কী হচ্ছে তা জানার একটা প্রবল আগ্রহ তার মধ্যে লক্ষ্য করেছি। কোনো কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি তিনি হাসিল করেননি সত্য, কিন্তু বই কিনতে এবং পড়তে ভালোবাসতেন। কী সাহিত্যচর্চা, কী জীবনচর্চা উভয় ক্ষেত্রেই তিনি একটি রুচিস্নিগ্ধ মনের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি তর্ক করতেন কিন্তু সে তর্কে ঝাঁঝ থাকত না। মতান্তরকে সহজে মনান্তরে রূপান্তরিত হতে দিতেন না। আহসান হাবীবের কবিতার মতোই তাঁর কণ্ঠস্বর কখনো চড়তো না।

তিনি ছিলেন আধুনিকতা, প্রগতি ও কল্যাণের স্বপক্ষে। যা কিছু সুন্দর তার প্রতি ছিল তাঁর দুর্মর আকর্ষণ। ভালো কাপড়-চোপড় পরতে পছন্দ করতেন, কম খেতেন, তবে সুখাদ্যের প্রতি ঝোঁক ছিল। সবসময় ছিমছাম থাকতে ভালোবাসতেন। কবির দারিদ্র, দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে কেউ বিদ্রুপ করবে, হাসি-মস্করা করবে, অথবা করুণা করবে, এটা তিনি কখনো বরদাশত করতে পারতেন না। এই একটি ব্যাপারে কেউ বিরূপ কোনো মন্তব্য করলে তিনি তাঁর পাল্টা জবাব দিতেন দৃঢ়কণ্ঠে। আত্মমর্যাদাকে ধুলোয় গড়াতে দিতেন না কস্মিনকালেও। তিনি মানুষকে শ্রদ্ধা করতেন বলেই এ ব্যাপারে এমন অনমনীয় ছিলেন। একজন মানুষ অন্য মানুষকে শ্রদ্ধা করবে, ঘৃণা করবে না; ভালবাসবে, করুণা করবে না।

আহসান হাবীব ছিলেন প্রকৃতই মানবতাবাদী। তাঁর এই পরিচয় বিধৃত রয়েছে তাঁর রচনাবলীতে। কিসে মানুষের কল্যাণ হবে, জনজীবন ঝলমলিয়ে উঠবে সম্পদের ঝলকে, তা তাঁকে ভাবাতো সব সময়। এই পরিবর্তমান বিশ্বের যা কিছু ভালো, যা কিছু কল্যাণকর, তাতেই রয়েছে মানুষের উত্তরাধিকার; এই বিশ্বাস ছিল তাঁর দৃঢ়মূল।

কিন্তু একবার তাঁর একটি বিশেষ ভূমিকা আমার কাছে অনুমোদনযোগ্য মনে হয়নি। আমি খুব চটে গিয়েছিলাম। আমার উষ্মা লুকাতে কোনরকম চেষ্টা করিনি, বরং খবরের কাগজের পাতায় প্রকাশ করে ফেলেছিলাম। তিনি এমন একটি বিবৃতিতে সই দিয়েছিলেন যাতে তাঁর সায় থাকার কথা নয়। যা হোক, আমার আচরণ কর্কশ ও রূঢ় হওয়া সত্বেও আহসান হাবীব আমার প্রতি বিরূপ হননি। আমার সঙ্গে তাঁর বাক্যালাপ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, পরে যখন তর্কের তুফান থেমে গেল, উত্তেজনা কমে গেল, তখন তাঁর কাছে গেলাম খোলা মনে, মার্জনা চাইলাম। সেদিন তাঁর চোখ ছলছলিয়ে উঠেছিল; তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। এরকমই ছিলেন আহসান হাবীব।

সবচেয়ে বড় কথা, তিনি ছিলেন তারুণ্যের অনুরাগী। বার্ধক্য ক্রমান্বয়ে দখল করে ফেলছিল তাঁকে, কিন্তু একজন তরুণকে তিনি লালন করছিলেন নিজের ভেতর। তাঁর মন ছিল তরতাজা যে-কোনো তরুণেরই মতো। বুঝি তাই, শেষের দিকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন শক্তিশালী তরুণ কবিদের প্রতিযোগী, প্রতিদ্বন্দ্বী।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close