Home ছোটগল্প শামীম আজাদ >> হঅ >> ছোটগল্প

শামীম আজাদ >> হঅ >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ October 14, 2017

শামীম আজাদ >> হঅ >> ছোটগল্প
0
0

শামীম আজাদ >> হঅ >> ছোটগল্প

ম্যান… এ্যাত্ত ভোরে, এই পাগলা ঝড় আর বৃষ্টির মধ্যে তুই কি করে এলি? সাইকেলে?

হ।

তোর টেক্সট পেয়েই বুঝেছিলাম। তোরা চিকনগুনিয়ার ভয়ে ঢাকা ছাড়বি। কিন্তু সিলেটেই চলে আসবি ভাবিনি। ধরা পড়লে কি হতো?

ক!

তুই ক ব্যাটা! হাসতে হাসতে এই কথা বলে এ্যাবেনা তার গোলাপি স্কেচার্স ট্রেইনার্স জোড়ার মাথা দিয়ে দোলনার নিচের মাটিতে এক ধাক্কা দিয়ে উড়ে উঠে যায় আকাশে। শুধাত সাইকেলে হেলান দিয়ে মুগ্ধ চোখে গোলাপি কুয়াশার ওঠানামা দেখে আর সতর্ক চোখ রাখে বর্ধিত বারান্দার গেটে। যেখানে গোলাপিগুচ্ছ নিয়ে মাধবীলতা ফিরোজা ফ্যান্স বেয়ে উঠে গেছে ঢেউ টিনের দোচালায়।

দোলনায় তখন শিমূল ও জলপাই গাছ নিংড়ে একটু কাতুকুতু আলো এসে পড়েছে। এ্যাবেনার দুগ্ধমধু রং সোনালি হয়ে উঠেছে। ওর দৃষ্টি দূরে টিলার নিচে চা বাগানের মায়েরা শিশু কোলে হাড়ি মাথায় অত সকালেই যেখানে ঝর্ণার জল আনতে চলেছে। কাল ওর মা-বাবার শোবার ঘরের এসিটা মেরামত করা হয়েছে- আজ শনিবার সকালে তারা নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ ঘুমাবে।

সকাল বেলা এদিকটায় কেউ আসে না তাই বাঁচা গেছে। গাট্টাগুট্টা সালামত লম্বা চুলের কিন্তু দেখতে ভদ্রসন্তান এবং ঢাকার আপার নাম বলাতে মেইন লোহার গেটটা খুলে দিয়েছে। এ বাড়ির হাউন্ড ও ওই নেটের ভেতরে থাকে। কারণ বাংলোর ভেতরে ঐ নেট লাগানো লোহার জালির ভেতর চারদিকে স্কোয়ার করে কোরিডোর আর ঠিক মধ্যস্থানে জড়াজড়ি করে থাকে ঘরগুলো। সে ঘরগুলোর বাইন্ডারি পাহারা দেয়। সকালে রিচার্ডের দরজায় কুঁই কুঁই করে তাকে ওঠায়। তারপর ওরা মর্নিং ওয়াকে যায়। যে কোন সময় ওর বাপীর বেরিয়ে আসার আশংকা অমূলক না। কিন্তু এভাবে হঠাৎ শুধাতকে পেয়ে এ্যাবেনার দোলনা দিগন্তে উড়তে থাকে। উড়তে উড়তে সে মনে মনে বলে।

‘শুধাত তোর জন্য ভয়ে এখন আমার গলা সাহারা, হাত পা এ্যান্টার্ক্টিকা। জানিস না আমার বাপীটা একটা আইরিশ ব্লাডের টেরোর? টেনিস, সাঁতার এসব করা শরীর। তুইতো মাত্র এক ষোল বছরের ন্যড়াব্যাড়া নাটক! থ্যাঙ্ক গড তবু আম্মুটা নাইস। ঠিক তোর মা’র মত। কিন্তু দেখ আমাদের দুজনের বাপই কিন্তু খতর্‌নাক। তোরটা বিগ ব্রাদার। আর আমারটা সাদা হয়েও মেয়ের জন্য এভ্রিথিং রাইট করবে বলে ফিফ্‌টিজের বাংলা কালচার, সো স্যাড।

শুধাত তখন সুপার এক্সাইটেড। কাল রাতের প্লেনে সিলেট এসেই ভাবছিলো কখন এখানে আসবে। কখন সকাল হবে। দরগাহ্‌ মহল্লা থেকে বেশ দূরে এই খাদিম। কিন্তু ভাবতেই পারেনা কত দ্রুত সে চলে এসেছে। আর এখন এক এক বর্ণ দিয়ে তার উত্তর দিয়ে ওর রাজকন্যার সঙ্গে প্রেমোবুলি খেলছে। এ্যাবেনার ক’ এর উত্তরে সে বলে

ল।

ল’ যাই? কোথায় যাবো? এক্ষুনি কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। তুই ভাগ। নেমে যা সাইকেল নিয়ে। চলে যা জল কামান, আমার আতর লোবান।

ন!

ওরে আমার ভগবানখোদাগড! তুই কি জানিস না আমার কাছে তুই একটা মাল্টিফেরিয়াস মাউন্টেন! তোরে কোথায় লুকাবো? আর ন, মানে কি ইংলিশ নো?

[২]

সক্কাল বেলা এসব যখন হচ্ছে আমি তখন গেস্ট রুমে। একটু একটু ঠাণ্ডা পড়েছে। বিলেতের সামারের মতই। আর এজন্যই এ সময়টাতেই আমি দেশের কাজগুলো করি। গিজার অন করেছি গরম জলে স্নান করবার জন্য। রাত জেগে লিখি বলে সোমা ইলেক্ট্রিক কেটলিতে জল ভরে মির্জাপুর চা ব্যাগ ও চায়না চা কাপ রেখে দেয়। আমি চা খেতে খেতেই কুকু্রের ভেউ, মানুষের ধস্তাধ্বস্তি ও এ্যাবেনার ড্যাডি ড্যাডি চিৎকার শুনে বেরিয়ে কিছু বোঝার আগেই দেখি ক্লাইমেক্স শেষ। তখন সোমা রিচার্ডকে দেখিয়ে বল্ল, স্যরি হি গট এ্যা বিট ক্যারিড এ্যাওয়ে। দেখি শুধাতের সাইকেলের এক চাকা খোলা, এ্যাবেনা এক হাতে এক চোখ ঢাকা, সোমার রাতের জামায় দিনের ঘাস আর রিচার্ডের মুখ লাল। শুধাত দাঁড়ানো যেনো সেই এক ভাঙাচোরা সাইকেল। সালামত মন দিয়ে সাইকেলের চাকা লাগাচ্ছে। সোমা ও রিচার্ড নেটের ভেতর চলে গেলে দেখি শুধাত নত্মুখে সাইকেল ঠেলে গেটের বাইরের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। তার চুল আলোতে চিকচিক্‌ করছে।

মনে হল শুধাতের চুল কবি অপরাহ্ন সুসমিতোর মত। বলবেন আমি বিলেতে থাকি বলছি ক্যানাডায় থাকা এক লেখকের চুল নিয়ে কথা। কেন এবং আমি কি তাকে বাস্তবে দেখেছি? প্রথম কেনোটার কারণ হল এই যে এই টিনেজারদের কথা বার্তাগুলো অনেকটা তার ফেইসবুক লেখার মত। আর ওকে দেখিনি তবে ফেইসবুকে ওর প্রফাইল পিক দেখেছি। একশতভাগ বিদেশী সিল্ক। বুঝলাম এ তাহলে সেই ছেলে! যার চুল দেখে প্রেমে পড়েছে এ্যাবেনা।

আমি গত পরশু এসে পৌঁছবার পর পরই প্রথম চান্সে আমাকে একা পেয়ে তার সব বলেছে এ্যাবেনা।

গতরাতে মোবাইল টিপে টিপে সে শুধাতের ছবি দেখাতেই আমি বলি, আরে ওর চুলতো স্যামসনের মতো, অপরাহ্নর মতো। তো তুইকি ওর ডিলায়লা?

ডিলায়লাতো অনেক সুন্দর করে গল্প করতে পারতো রাইটার নানী! তবে আমি খুব উদ্ভট বাংলা শব্দ পারি। শুধাত ও। আমরা দুজন অনেক মজা করে প্রেমাবুলি করি। বুলিং না কিন্তু।

এ্যাই তোমরা কি এই এক শব্দ দিয়ে কথা বলার আইডিয়াটা ফেস বুক থেকে পেয়েছো? অপরাহ্ন সুসমিতো নামে ফেইস এক কবি ঠিক তোমাদের মতো অদ্ভুত সব ডায়লগ লেখে।

আরে নাহ্। আমরা আমরাই বলি। একই ভাষায় একরকম স্বরে ক্লিশে ভাব ভঙ্গিতে কথা বলা খুবই বোরিং। প্রতিটি প্রেমের আলাদা ভাষা হওয়া উচিত। একটি প্রেমের  একটি ডেটে প্রতিটি লাইনও ভিন্ন হতে হয়।

বাব্বা! বলে কি! দারুণ লাগছিলো এই পনেরো বছর বয়সী কিশোরীগন্ধার কথা শুনতে। আমি স্বাদ পাচ্ছিলাম একইসঙ্গে আইস্ক্রিম, কফি, মধু ও সরভাজা, বিবিখানার। এ-যে আমার মতো ভাষা কারবারিকেও তাক লাগিয়ে দিচ্ছে! ব্রজবুলির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। হিয়ার পরশ লাগি হিয়ার ক্রন্দনের বদলে হিউমার। বাহ্। মধ্যযুগে ছিল ব্রজবুলি আর ওদের আছে প্রেমোবুলি!

এ্যাবেনা কথা বলছে রাতের জামার নেক্লাইনের লেসে হাত ঘসে ঘষে। তাকিয়ে দেখি এ্যাবেনার চোখের উপরে তার পিতার ঘুষির দাগটা প্রচ্ছন্ন। ওখানে বাগানের এ্যালোভেরা আঠা চকচক্‌ করছে। কিন্তু সেটা ব্যাপারই না। ওর চোখজোড়া যেন জলন্ত ডায়েরির পাতায় গেঁথে আছে। সে পেছনের পাতা পড়ে বলে যেতে থাকে, একদিন আমি তাকে বলেছিলাম আমার নামটা আমার একদম পছন্দ না। তোর নামটা কি সুন্দর – শুধাত।

বেশ, তোকে ছোট করে এ্যা বলে ডাকব।

তালে আমি করবো ভ্যা… এ্যা এ্যা। ইয়ার্কি? সুজাতাকে সু বলে ডাকার মত– সুজাতা হয়ে যাবে জুতো। প্রত্যেক দিন একেকটা নতুন নামে ডাকবি আমায়। সাইকেলে আসার সময়ে একটা চিরকুটে তার একটা নাম লিখে নিয়ে এসে আমার হাতে দিবি। এই দেখো, বলে এ্যাবেনা তার হাতের মুঠো থেকে খুলে ধরে। ভেতরে একটি চিরকূট। তাতে অভ্র ফন্টে বাংলায়  প্রিন্ট ‘লীলাবতী’।

আমি বললাম ভারী সুন্দর। এ্যাবেনা তখন চোখের কোনে আঘাতের ওপর গভীর মমতায় লীলাবতী লেখা চিরকূটটা বুলাতে থাকে যেনো পাখির পালক। অস্পষ্ট স্বরে বলে, মানুষ চলে গেলে তার পালক ফেলে যায়। ওর চোখজোড়ায় সাম্পান মাঝির গান। সেখানে পিতার উপর রাজ্যের অভিমান। আমি ভাবি নালন্দায় পড়ার জন্যকি এই অসম্ভব বাংলা ও ইংরাজির সংমিশ্রণ!

ততক্ষণে সারা বাড়ি শান্ত হয়ে এসেছে। পুরো দিন গেছে। হাউন্ডের হাউলামিও স্তব্ধ। গেটকিপার সালামত ও পেইন কিলার খেয়ে ঘুমোচ্ছে। শুধু দোলনাটা শিকল ছিঁড়ে মাটিতে পড়ে আছে। শিকলের গায়ের কষের মত গলে গলে পড়া শিশির শুকিয়ে গেছে। হয়তো অকস্মাৎ ছিট্কে পড়া তক্তার নিচে এ্যারেস্টেড হয়ে মেটে পোকারা কাল থেকে কাঁত্রাচ্ছে! দু’একটা মরেও গেছে হয়তো। আমার বুকে মাথা দিয়ে এ্যাবেনাকি কাঁদছে? না। হাতে তার মোবাইল।

এই যে মেয়েটি এ্যাবেনা, সে আসলে এক যুদ্ধশিশুর কন্যা। যুদ্ধের তিন বছর পর এক জার্মান দম্পতি তা্র মাকে জার্মানিতে নিয়ে যান। এ্যাবেনার মা’র নামটাও মনে নেই। সে বড় হয়েছে হ্যানোভারে। প্রথম থেকেই নিজের রং দেখে জেনেছে সে তার সাদা বাবা-মা তার নয়। তবে তাতে ওদেশে সমস্যা হয় না। তার ও হয়নি। এসব কেইসে একটা কোন ‘খুঁত’ থেকে যায়। সেটা হল ছোট্ট কিছু না কিছু তাদের মনে স্থায়ীভাবে থেকে যায়। আর বড় হবার সাথে সাথে তা ক্ষুদ্র থেকে দীর্ঘ হয়ে প্রায় তাকেই গিলে খায়। যদি না তার দিকে লক্ষ্য রাখা হয়।

তো এ্যাবেনার মা’র একটা ইস্যু ছিলো। একটাই। বেশ ছোটখাটো। যে-কোনভাবে খাকি রং দেখলেই নিজে নিজে কথা বলতো, আমার কিছু একটা করতে হবে। আমার কিছু একটা করতে হবে আমার বাচ্চার জন্য। তখন সে নিজেই এক বাচ্চা। প্রথমে সবাই অত পাত্তা দেয়নি হেসেছে। কিন্তু তারপর দেখা গেল ঘুরে ঘুরে বার বার যেখানে সেখানে সে তা বলে বেড়াচ্ছে। এবং একসময় বলার নিমিত্তেই মরিয়া হয়ে উঠছে। তো হ্যানোভারে এই ব্যাপারে তার বিষয়টা ক্রমশ সবাই জেনে গেছিলো। কারণে অকারণে সে যে একাত্তরের যুদ্ধশিশু সেটাও সে বলে বেড়াতো। আর বলতো আমার বাচ্চাকে আমি বাংলাদেশে দিয়ে দেবো।

তবে আজকের গল্পের বিষয় ওরা না। আজকের বিষয় শুধাত আর এ্যাবেনা। আর ওদের টিন এজ কথাবার্তা। এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন যে এ্যাবেনা সেই বাংলাদেশী- জার্মান যুদ্ধনারীর কন্যা। প্রথম থেকে ওর নামটা শুনে আপনাদের অদ্ভুত লাগার কথা। এর কোন অর্থও নেই। কিন্তু শব্দটা বাংলাদেশী ও না। তো জার্মানিতে তার মায়ের কোন থেরাপিই বাকি থাকেনি। সেখানে বাংলাদেশী এ্যাক্টিভিস্ট দম্পতি ঝাকড়া চুলের শরাফ ও আর্কেটাইপ বড় টিপ দেয়া লিপির সঙ্গে কথা বলে ওর জার্মান বাবা ও মা বেচারাকে নিয়ে গেছেন বার্গেন বেঞ্জেলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ও জুইশদের কষ্ট যে বাংলাদেশীদের চেয়ে কোন অংশে কম ছিলো না সেটা বুঝাবার জন্য। কিন্তু আঠারো বছর হবার পর বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত যুবক পেলেই পাগল হয়ে যেত। কেবলি প্রেমে পড়ে যেতো। ২৮ বছরে সত্যিই সেরকম এক ঘটনায় সে অন্তঃস্বত্তা হয়ে যায়। তারপর থেকে ওই এক কথা বলে বলে মানসিক রোগীই হয়ে পড়ে। ওর শিশুকন্যা এ্যাবেনাকে আর তার কাছে রাখা যায়নি। কিন্তু বাচ্চা সরিয়ে ফস্টার প্যারেন্টদের কাছে থেকে দেখাতে নিয়ে এলে বিকারগ্রস্তের মতো মুখে তার ঐ এক কথা, আমার বাচ্চাকে আমি বাংলাদেশে দিয়ে দাও। আর তখনই আমি বিলেত থেকেই ওদের জীবনে জুটলাম। এক নম্বর কারণ, আমি সিলেটি। দুই, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কার্যক্রম বিজয়ফুল নিয়ে একাত্তরের গল্প বলে বেড়াচ্ছি। তিন, ওভাবেই হ্যানোভার থেকে এ্যাবেনার কথা শুনেছি। চার, দেশে, সিলেটে এসেছিলাম।

এখানেই সোমা হক নামের এক স্মার্ট দারুণ উদযোগী মহিলা একাত্তরের গল্প শুনে এমন উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠেন যে তিনি এক বিলেতি জুইশ- ইংলিশ দম্পতির কথা বলতে শুরু করেন। ডিনারের সময় তার সঙ্গে পরিচিত হই। অবাক হয়ে উপলব্ধি করি বাংলাদেশে এখনকার বাঙালি মেয়েরা কি না করছে! আমরা বিলেতে বসে তার কণামাত্র জানি। সোমা রীতিমত এক বিশাল ব্যবসায়ী। আমাদের দেশের ভ্রমণব্যবসা আর আগের মত নেই। তার একটি রিসোর্ট গাজীপুর ঢাকা এবং আরেকটি সিলেটে। বিদেশী মানুষদের নিয়ে তিনি সুন্দরবন এ্যাক্টিভিটি ট্রিপ করান। জাফলং, বিছানাকান্দি ট্রিপ করান। তার বেশিভাগ ক্লায়েন্ট বিলেতের। কিন্তু সব চেয়ে সাহসী যে ব্যাপার তা হল তিনি অবিবাহিতা মাতা হওয়া সত্ত্বেও শিশু দত্তক নিতে চান। মাত্র ব্যারিস্টার তানিয়া আমীরের জন্য অনেক ব্যয়ে এ মামলা জিতেছেন। কোনদিন বিয়ে করবেন কিনা জানেন না।

এদিকে লিপি ও শরাফ এ্যাবেনার জন্য একজন বাংলাদেশী মা খুঁজছে। যাকে সে মেয়ের জার্মান নানা নানী্র শর্তানুযায়ী পুরো বাঙালি করে বড় করবে। সোমার খবরটা আমিই দেই। দত্তক নেবার পর মেয়ে কোলে করেই রিচার্ডের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। রিচার্ড জুইশ ব্রিটিশ। সেই হল ঐ দম্পতি যারা একাত্তরের পর পর আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থায় কলকাতা শরণার্থী শিবিরে কাজ করতে এলে তার জন্ম হয়। সে কাহিনি আরেকদিন বলতে হবে। এখন এ্যাবেনা শুধাতের গল্পটা বলি।

আমি এ্যাবেনার ব্লিচ-করা চুলে কে আদর করে করে বলি, তো সেদিন ধস্তাধস্তি, সাইকেলের চাকা খোলা, দোলনা থেকে তোমাকে ছাড়িয়ে আনার আগে পর্যন্ত তোমরা আর কি কি বললে?

তোমাকে কোন বর্ণ পর্যন্ত বলেছি?

ন, পর্যন্ত!

এদিকে ততক্ষণে বাপীর বদমায়েশ হাউন্ড গিয়ে তার দরজায় নখ ঘষে তাকে তুলতে চাচ্ছে। আমিতো নেটের গেট খোলা রেখে বাইরে এসেছি। জানি শুধাতরা এখানে। আমরা না হয় এসেছি তোমার টক-এর ব্যবস্থা করতে। আর তুমিতো এলে মাত্র পরশু। থ্যাঙ্ক গড রাইটার নানী যদি তুমি গ্রান্ড সুলতানে তোমার স্পন্সরদের ব্যবস্থা মতো থাকতে তাহলে আমি তোমাকে শুধাতকে দেখাতেই পারতাম না। বলে কি এ্যাবেনা!

হ্যাঁ, আর সে মার ও খেতো না। এখন ওর গুন্ডা বাপ কেইস করবে মনে হচ্ছে। ওদের দল পাওয়ারে না? দলের নামে দুষ্টুরা কাউকে লেলিয়ে দিতে পারে। এখন আমাদের উপায় নেই। আমীর খান আর জুহি চাওলার সেই ব্যাকডেটেড কেয়াকত সে কেয়ামত ফিল্মটার স্ক্রিপ্ট ফলো করতে হবে। ইট ইজ ফাইন উইথ আস। মধ্যে থেকে তুমি ‘দি মার্ডার শি রোট’ এর মতো আমাদের কাহিনী লেখার সুযোগ পাবে।

বুঝুন এই হল আমাদের এসব টিনেজারদের অবস্থা! কত যে বদলে গেছে বাংলাদেশের সমাজ। আমি তাদের পারিবারিক সদস্যের মত হলেও সদ্য ঘটে যাওয়া এ ব্যাপারটায় আমার কিছু করার নেই বলে দুপুরে প্রায় চুপচাপ খাওয়া সম্পন্ন করলাম। সন্ধ্যা হল। দেখলাম রিচার্ড মোবাইল নিয়ে  আমড়া ও জলপাই গাছের নিচে হাঁটাহাঁটি করছে। সোমা  পেছন পেছন হাঁটছে।

ছেলেটার সাইকেলের চাকা না খুল্লেই হতো। আর ছেলেকে ঘুষি দিতে গিয়ে নিজের মেয়েরই চোখের উপর আঘাত দিয়ে ফেলে এখন রিচার্ড মরেই যাচ্ছে। বুঝলাম সে এখন আত্মসমর্পন করার ছূঁতো খুঁজছে। আমিও সময় পেলে বুঝিয়ে বলতে পারি। বর্তমান টিন-এজ প্রেম লাইলী মজনু আর রোমিও জুলিয়েট মার্কা প্রাণঘাতি হতে পারে না।

আমার ঘরের এদিকটা একেবারে এত শান্ত যে মাঝে মাঝে হাউন্ডের হাঁক ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। কাজেই ন’ বা নো’র পর আমরা এগুলাম। এ্যাবেনা বলেছিলো

বল্লাম শুধাত ধরলাম এটা তোর ইংলিশ ‘নো’। তা’লে আমার উত্তর হল, ইয়েস। তোকে অকারণেই আজ আনফ্রেন্ড করবো।

জানিস ফেইসবুক আনফ্রেন্ড করলে কতজন খুন হয়? এই মুহূর্তে শুধু এ কারণে ৪০ লক্ষ মৃত মানুষের এ্যাকাউন্ট কিভাবে বন্ধ করা যায় তা নিয়ে জুকার মামু ভাবছেন।

তারেও ব্লক করবো।

ফেসবুকে মার্ক জুকারবার্গকে কখনোই ব্লক করা যায় না। সে মহা দামী।

তুই দেখি তার চেয়েও দামী।

না আমি সস্তা কাঁচ কিন্ত আমায় কাটতে লাগে হীরে।

তা হীরেটা কে?

এক মেঘবালিকা।

বালিকা! বালিকা! তাহলে তো তোকে হেল্প করতে হয়। শোন, একটা কবিতা বলছি, তোর মেঘবালিকাকে শোনাস।

‘আমি কেবল সস্তা কাঁচ, কাটতে লাগে হীরে, মেঘবালিকা, তুমি কি সেই? যে কাটছো আমার ধীরে!’

আমি বললাম তারপর? তখনো তাহলে রিচার্ড সোমা উঠেনি? শোননা ক্লাইমেক্স পর্যন্ত। নানী আমি তখন বলল্লাম

তা’লে আমিই রেখে দেবো তোকে আমার কলিজায় আমার অন্তরায়।

তা’লে তোর বাপী করবে হায় হায়। বলে সে হাসে।

হাসলা ক্যান?

রাখ ঘ্যান ঘ্যান… বুঝলে রাইটার নানী এই শুরু করেদিলাম টার্নিং পয়েন্ট। যে পারে মোড় ঘোরাবে। আর যে ঠেকবে সে অন্যকে দেবে চৌদ্দটা চুমু।

কেনো চৌদ্দটা কেনো?

কারণ চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন্স ডে!

বাহ্‌। আর যদি কথার চাল চলতেই থাকে চলতেই থাকে তবে তোমরা থামবে কখন?

যখন এক্সটার্নাল এ্যাফেয়ার ইন্টারফেয়ার করবে।

মাই গড এ্যাবেনা! তোমরা একটা বিপদ হবে জেনেও…

হ্যাঁ আমরা আঠা হয়ে থাকি। এটাইতো ক্লান্ডস্টাইন লভের ফান। গোপন বলেইতো মাইরে ও মজা আছে। ফুল অব সুপার এক্সাইমেন্ট। আর বাকিটাতো জানোইতো কি হল- এখন কে জানে এখানে কি হবে আর দরগা মহল্লায় কি?

আমি আমার লেখার রিয়েল মেটিরিয়েল পেয়ে যাচ্ছি বলে ওর পিঠে আদর করতে থাকি।

তো এখন কি হবে এ্যাবেনা তোদের প্রেমের এই বহিরাগত আক্রমণে?

যা হবার তাই হবে। মাইর খেয়ে প্রেম থাকলে থাকবে নয় থাকবেনা। ফুড়ুৎ! বলে সে মোবাইলে ইন্সট্রোগ্রামে তার লেটেস্ট ছবি পাঠাতে থাকে। এবার খয়েরি রঙের পরম্পরা। সোমার খয়েরি ব্যাগ এবং আমার খয়েরি জুতার সঙ্গে কফি, সেলফি তোলা ওর চোখের খয়েরি দাগ এবং চৌকো করে কাটা কিছু খয়েরি ব্রাউনি। এক রহস্যাবৃত হাসি চেপে সে সবগুলো আমাকে দেখিয়ে বলে, রাইটার নানী এখনই এগুলো পোস্ট করবো। ইজ নট ইট ফানি?

তোমার খারাপ লাগছে না শুধাতের জন্য? আমার অবাক লাগলো।

লাগছেতো… লাগবেতো… লাগেতো…

তা’লে?

তা’লে আবার কি। আই এ্যাম জাস্ট কামিং ফ্রম দেয়ার হাউজ। সালামত ভাই নিয়ে গেছে। গিয়ে দেখি ওর বাবার রাগ করে ওদের ট্রি হাউসে উঠে আছে সেই থেকে। কিচ্ছু খায়নি সারাদিন। আমি গাছ বেয়ে উঠে তাকে এই চৌদ্দটা ব্রাউনি ও চৌদ্দটা চুমু দিয়ে এসেছি!

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close