Home চলচ্চিত্র শাহানাজ পারভীন জোনাকি > বুনুয়েলের ‘দ্যাট অবস্কিউর অবজেক্ট অব ডিজায়ার’ : প্রেম ও কামনার দ্বৈরথ >> চলচ্চিত্র

শাহানাজ পারভীন জোনাকি > বুনুয়েলের ‘দ্যাট অবস্কিউর অবজেক্ট অব ডিজায়ার’ : প্রেম ও কামনার দ্বৈরথ >> চলচ্চিত্র

প্রকাশঃ April 15, 2018

শাহানাজ পারভীন জোনাকি > বুনুয়েলের ‘দ্যাট অবস্কিউর অবজেক্ট অব ডিজায়ার’ : প্রেম ও কামনার দ্বৈরথ >> চলচ্চিত্র
0
0

শাহানাজ পারভীন জোনাকি > বুনুয়েলের ‘দ্যাট অবস্কিউর অবজেক্ট অব ডিজায়ার’ : প্রেম ও কামনার দ্বৈরথ >> চলচ্চিত্র

 

“কঞ্চিতা বুর্জোয়া আধিপত্যের পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর দেহের উপর পুরুষের দখলবাজিকেও নাকচ করে, একারণে কঞ্চিতা চরিত্রটি আমার ভীষণ পছন্দের। আমার মনে হয়েছে একজন পুরুষের জীবনে নারীর জায়গাটি যে শুধু বিছানাকেন্দ্রিক নয়, বরং আরো বিস্তৃত – বুনুয়েলের সিনেমাটি এই ধারণারও বাহক।”

লুইস বুনুয়েলের সিনেমা আমাদের মনে করিয়ে দেয় সালভাদর দালির চিত্রকর্ম বা ফ্রয়েডের লিবিডো তত্ত্বকে। বহুকাল ধরে বুনুয়েলের চরিত্ররা সেলুলয়েডের পর্দায় সময়ের কাঠামো ভেঙে এনেছে পরাবাস্তবতা আর লড়াই করে গেছে অন্তর্নিহিত যৌনকামনার সাথে, যাকে কোথাও কোথাও পারভারশন বা বিকৃত যৌনকামনা বলেও আখ্যায়িত করা যয়। এর পাশাপাশি এসব সিনেমায় এসেছে স্পেনের সমষ্টিগত মনস্তত্ত্বের রিপ্রেজেন্টেশন। বুনুয়েলের সিনেমাগুলো তাঁকে সত্যিই সাহসী ও বুদ্ধিদীপ্ত পরিচালকদের কাতারে ফেলবে। লুইস বুনুয়েলের শেষ সিনেমা দ্যাট অবসকিউর অবজেক্ট অব ডিজায়ারকে কফিনে শেষ পেরেকের সাথে তুলনা করা চলে। সিনেমার নামটি কামনার অ্যাবসারডিজমকেই যেন সরাসরি প্রশ্ন করে, যা বুনুয়েল তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বারবার উলটে-পালটে দেখেছেন। সিনেমার সমালোচনা লিখতে যে দক্ষতা বা পড়াশুনো দরকার তা এই লেখকের, মানে আমার নেই। এই লেখাটিকে তাই বড়জোর ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া বলা চলে। লেখাটিকে বুনুয়েলের সিনেমার প্রতি ভালোবাসা আর তাঁর কাজের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস হিসেবে গণ্য করলেই খুশি হবো।

১৯৭৭ সালে বুনুয়েলের বয়স যখন আশির কোঠায়, তখন তিনি “দ্যাট অবসকিউর অবজেক্ট অব ডিজায়ার” সিনেমাটি বানান। সিনেমাটি ফরাসি লেখক পিয়েরে লুইসের দ্যা উইমেন অ্যান্ড দ্যা পাপেট উপন্যাসের অনুসরণে তৈরি। কৌতূহলের বিষয় হচ্ছে এই উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে বুনুয়েলের আগেও চারজন নির্মাতা সিনেমা করেছিলেন। সিনেমার প্রধান চরিত্র দুটো হচ্ছে মধ্য-বয়স্ক বুর্জোয়া-বিপত্নীক ম্যাথিউ এবং সুন্দরী তরুণী কনচিতা। ম্যাথিউ চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফারনেন্দো রে, যাঁকে বুনুয়েলের সিনেমার এক পরিচিত মুখ বলা চলে এবং কনচিতা চরিত্রে অভিনয় করেছেন দুজন অভিনেত্রী। ফরাসি তরুণী ক্যারোল আর স্প্যানিশ তরুণী মলিনা। সিনেমা শুরু হয় ম্যাথিউর জবানিতে যখন তারই কামরার সহযাত্রীরা রেলস্টেশনে এক তরুণীর শরীরে ম্যাথিউর পানি ঢেলে দেওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করে।

পুরো সিনেমাটি আবর্তিত হয় কঞ্চিতাকে ভোগ করার জন্য মাথিউয়ের হাজারো চেষ্টা এবং কঞ্চিতার নিজস্ব সতীত্বের ধারণাকে ঘিরে। ম্যাথিউ এখানে প্রতিনিধিত্ব করেছে মাঝবয়েসী বুর্জোয়া শ্রেণির যৌন-আকাঙ্ক্ষাকে, বাড়িতে কাজ করতে আসা লোকদের যারা নিজেদের আকাঙ্ক্ষা মেটানোর বস্তু মনে করেন। কঞ্চিতার প্রতি ম্যাথিউয়ের প্রথম অ্যাপ্রোচ ছিল এমনটাই, তবে ধীরে ধীরে আমরা দেখি ম্যাথিউ কঞ্চিতাতে মানসিকভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে কঞ্চিতার যৌনতা সম্পর্কিত নিজস্ব ধ্যান-ধারণাকে ম্যাথিউর বিপরীত বলা চলে। রক্ষণশীল মায়ের কাছে বড় হওয়া কঞ্চিতা ‘কুমারীত্ব’ নিয়ে অবসেস্‌ড এবং সম্পর্কের মধ্যে ‘লাভ মেকিং’-এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত।

ম্যাথিউর বুর্জোয়া চরিত্রটি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন কঞ্চিতাকে সে অর্থের বিনিময়ে পেতে চায়। কঞ্চিতা আর তার মায়ের বাড়িতে নানা উপহার নিয়ে যাওয়ার পেছনে কঞ্চিতাকে ভোগ করতে চাওয়ার সুপ্ত বাসনাই কাজ করেছে। ম্যাথিউকে ভালোবাসলেও কঞ্চিতা ঘৃণা করতো তার এই বুর্জোয়া অবস্থানকে এবং আমরা চরিত্রটির মধ্যে একধরনের জটিল নির্মলতা দেখতে পাই যখন সে ম্যাথিউর বাড়িতে থাকার প্রস্তাব গ্রহণ না করে পালিয়ে যায়। ম্যাথিউকে লেখা ছোট্ট চিঠিতে সে জানায়, “আমি নিজেকে তোমার কাছে সঁপে দিতাম, কিন্তু তুমি আমাকে কিনতে চাইলে। তাই চলে গেলাম।” সত্যি অদ্ভুত এই কঞ্চিতা। নিজেকে শুধু সে নিজেই পারে দিতে, নিজের দেহের মালিক শুধু সে নিজেই।

সিনেমার একটি অংশে ম্যাথিউকে কঞ্চিতার উপর জোর খাটাতে দেখা যায়- সোজা বাংলায় যাকে ধর্ষণ করার প্রবৃত্তি বলা চলে। কঞ্চিতার অন্তর্বাসের শত-বিনুনী ম্যাথিউ খুলতে ব্যর্থ হয় এবং কান্নায় ভেঙে পড়ে। এই অংশটি ম্যাথিউর প্রতি ঘৃণার পাশাপাশি তার প্রতি দর্শকদর একধরনের মমত্ববোধও তৈরি হয়, কারণ বিপত্নীক ম্যাথিউর কুমারীকে পাবার যৌনাকাঙ্ক্ষাকে সহজেই সম্পর্কিত করা যায়। তাই ম্যাথিউ পুরোপুরি ভিলেন হয়ে উঠতে পারেনি সিনেমাটি জুড়ে। অন্যদিকে কঞ্চিতার বুর্জোয়া শ্রেণির প্রতি অবিশ্বাস থেকেই সে মনে করে যে ম্যাথিউ যা চায় তা পাবার পর কঞ্চিতার দিকে তার আর আগ্রহ থাকবে না। সম্পর্কের এক নতুন ডাইমেনশন তৈরি হয় তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কে না জড়িয়ে।

ম্যাথিউ আর কঞ্চিতার জটিল সম্পর্কের বাতাবরণের পাশাপাশি আমরা এই সিনেমাতে দেখি প্যারালালি স্পেনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডেরও খণ্ডচিত্র। যৌনতার অ্যাবসারডিজমের সাথে পলিটিক্যাল কনশাসনেসের অদ্ভুত মিশেল বলা যায় একে। এমনই বিক্ষিপ্ত ঘটনার মধ্যে দিয়েই ম্যাথিউ আর কঞ্চিতার পুনরায় মুখোমুখি হবার সুযোগ ঘটে। সিনেমাটি জুড়ে ম্যাথিউ আর কঞ্চিতার মধ্যে আকর্ষণ আর বিকর্ষণের চড়াই-উতরাই দেখি আমরা। কঞ্চিতা চরিত্রটি দুজন অভিনেত্রী করাতে এর দুর্বোধ্যতা আরো গভীরতর হয়, সেই সাথে মাল্টিপল পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারেরও যেন আভাস পাওয়া যায়। যদিও দুজন অভিনেত্রীকে দিয়ে অভিনয় করানোটা বুনুয়েলের আগে থেকে ঠিক করা ছিল না।

সিনেমাটি দেখে বার বার মনে হচ্ছিল নারীদের শরীরের রয়েছে নিজস্ব এক জগত আর সেই জগতে সম্পর্ক স্থাপন করতে গিয়ে তাদের প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে। এই সিনেমা আমাকে ভাবাচ্ছিল যৌনতা ও ভালোবাসার মধ্যেকার সম্পর্ক নিয়ে। এই দুটোর গতিপথ কী ইন্টাররিলেটেড নাকি বিচ্ছিন্ন? কঞ্চিতার বার বার ম্যাথিউকে ফিরিয়ে দেয়াটা আমাকে ভাবিয়েছে কঞ্চিতার যৌনতার ধরন বা ভাবনাটি নিয়ে। সিনেমা জুড়ে কঞ্চিতা চরিত্রটির রহস্যময় কাজকর্ম ছাড়াও এক অদ্ভুত জীবনবোধ রয়েছে। তাই একদল মাতালের সামনে নগ্ন নৃত্য করতে কঞ্চিতা রাজি হলেও ম্যাথিউর কামনার সঙ্গী হতে সে প্রতিবাদ জানায়। পুরুষের মৌল যে শারীরিক ও যৌনাকাঙ্ক্ষা ম্যাথিউর মতো বেশিরভাগ পুরুষ বয়ে বেড়ায়, তাকে গুঁড়িয়ে দেয় কঞ্চিতা।

“সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারীর শরীরে পুরুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা যদি হয় সম্পর্কের গভীরতার প্যারামিটার- তবে তা নিয়ে ভাবা জরুরি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে শারীরিক ক্রিয়াকলাপে নারীর “না” পুরুষের জন্য অপমানজনক বা অবিশ্বাসী আচরণ বলে গণ্য হয়। অমূলক এই মিথটি বরং নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী চর্চাকেই খর্ব করে।”

কঞ্চিতা বুর্জোয়া আধিপত্যের পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর দেহের উপর পুরুষের দখলবাজিকেও নাকচ করে, একারণে কঞ্চিতা চরিত্রটি আমার ভীষণ পছন্দের। আমার মনে হয়েছে একজন পুরুষের জীবনে নারীর জায়গাটি যে শুধু বিছানাকেন্দ্রিক নয়, বরং আরো বিস্তৃত – বুনুয়েলের সিনেমাটি এই ধারণারও বাহক। আর তা যেন আরো পাকাপোক্ত হয় যখন ম্যাথিউ শারীরিক সম্পর্কে না জড়িয়েও কঞ্চিতার সঙ্গ আশা করে, এটি যেন পুরুষতান্ত্রিক যৌনতারই পরাজয় বা রূপান্তর-প্রক্রিয়া। তবে আমার মতে যৌনতার সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক সত্যিই জটিল, তবু ভালোবাসায় যৌনতার স্থান ততটাও ইনসিগনিফিকেন্ট নয়, যতটা কঞ্চিতা মনে করে।

তবে প্রশ্ন আসতে পারে যৌনতা ইনসিগনিফিকেন্ট মনে না করলেও, ম্যাথিউকে কঞ্চিতার ফিরিয়ে দেওয়াটা সমর্থন করা- আমার অবস্থানকে কন্ট্রাডিকটরি বলে মনে হবে হয়তো। কিন্তু আমার এই ভাবনার পেছনে, আমি আবারও বলবো, ম্যাথিউয়ের বুর্জোয়া অবস্থান এবং সম্পূর্ণ পুরুষতান্ত্রিক ফিমেল ডোমিনেটিং যৌনতার চর্চার কথা। এবং তা পুরোপুরি আদিমও বটে। সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারীর শরীরে পুরুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা যদি হয় সম্পর্কের গভীরতার প্যারামিটার- তবে তা নিয়ে ভাবা জরুরি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে শারীরিক ক্রিয়াকলাপে নারীর “না” পুরুষের জন্য অপমানজনক বা অবিশ্বাসী আচরণ বলে গণ্য হয়। অমূলক এই মিথটি বরং নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী চর্চাকেই খর্ব করে। নারীকে জয় করা যদি তার দেহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে বা ব্যাপ্তি পায়, তাহলে কঞ্চিতার অবস্থান সেই মিথের দেয়ালেই আঘাত করে। যৌনতার এই অ্যাবসারডিজম সিনেমায় শেষ অবধি থেকে গেছে। শেষ দৃশ্যে রক্তাক্ত কাপড়ে সেলাই করতে থাকা রমণীর দৃশ্যটি আমার কাছে এই অ্যাবসারডিজমেরই চিহ্ন বলে মনে হয়েছে।

সিনেমা বাস্তব-অবাস্তবের মিশেল হলেও, সিনেমার লক্ষ্য হচ্ছে এর বিমিশ্রণের মধ্যে সত্যকে তুলে ধরা বা দর্শকদের মনন ও দৃশ্যকল্পের সীমার মধ্যে নিয়ে আসা। সিনেমা যদি না ভাবায় তবে সেই সিনেমার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। বুনুয়েলের সিনেমা আমাকে ভাবায় এবং এখনো ভাবাচ্ছে। আমি জানি এই সিনেমার আরেক প্রান্তর হয়তো আমার জন্য উন্মুক্ত হবে যখন আবার আমি সিনেমাটি দেখবো। আব্বাস কিয়ারোস্তামি বলতেন, সিনেমা হওয়া উচিত কবিতার মতন, বিভিন্ন অবস্থায় কবিতা যেমন বিভিন্ন অর্থ নিয়ে হাজির হয়, সিনেমাও তেমনি। বুনুয়েলের সিনেমা নিয়ে আমার এই ভাবনার গাড়ি তাই হয়তো চলতে থাকবে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close