Home গদ্যসমগ্র উপন্যাস শাহীন আখতার > হানিমুন >> পাণ্ডুলিপি থেকে

শাহীন আখতার > হানিমুন >> পাণ্ডুলিপি থেকে

প্রকাশঃ February 5, 2018

শাহীন আখতার > হানিমুন >> পাণ্ডুলিপি থেকে
0
0

শাহীন আখতার > হানিমুন >> পাণ্ডুলিপি থেকে

হাশমত বানুর বিয়ের শাড়িটা ছিল লাল টুকটুকে জরিদার পার্সিয়ান সঙ্গে পায়ের পাতাতক পার্সিয়ান বডিস। নীহার বানুর ভাগ্যে জোটে মুর্শিদাবাদী সিল্ক মেরুন কালারের। সঙ্গের পাতাসবুজ  শেমিজটা দেখে মামাতো-খালাতো বোনেরা হেসেই খুন। বাহির বাড়িতে ঝগড়া  বেধে যায়। ‘শাদির বাজার মুদিদোকানে সারলে অয়!’ বিয়েবাড়ির কোলাহল ছাপিয়ে দেউড়ির ওপাশ থেকে নীহার বানুর মেজো মামুর বাজখাঁই গলার জোর ঝাপটা লাগে অন্দরের দেয়ালে। ‘টাকা কম থাকাটা কসুর কিছু না। মানুষের রুচি থাকন চাই। কারে খেশ করছেন তালুকদার ভাইসাব!’

নারায়ণগঞ্জের পাটের আড়তদার নীহার বানুর মেজো মামু। যিনি পকেট থেকে টাকা গুণে কখনো বাজার করতেন না। হাতে যা উঠত তাই দিয়ে জিনিসপত্রের দাম মিটাতেন।

তখন বিয়ের পাটিতে বসে নীহার বানু হাপুন নয়নে কাঁদতে কাঁদতে ভাবেন, লোকটার টাকা নাই জানেন, তা বলে রুচিও থাকবে না! নাকি টাকাই রুচির পরিমাপক! হয়তো সব দোষ তাঁর ভাগ্যের। তা না হলে ডাক্তার হওয়ার মাঝপথে কেউ যুদ্ধে যায়? লোকটার কি তর সইলো না, তা-ও গেল আবার যুদ্ধ বাধার আগে! আর হাশমত বানুকে দেখো, চাকরিতে যোগ দেয়ার পরের বছরই ওর স্বামীর বড় দারোগা হওয়ার কথা? হলো তো। দেশভাগে কত লোকের কপাল পুড়ল আর হাশমতের স্বামীর খুলল কপাল। তখন হিন্দু পুলিশ-দারোগা, জজ-ব্যারিস্টার অপশন নিয়ে ওপারে চলে যাচ্ছে তো শয়ে শয়ে পদ খালি। সেই ফুরসতে হাশমতের হবু স্বামী ছোট দারোগা থেকে এক লাফে বড় দারোগা। অনতিবিলম্বে হাজি চানের রূপবতী কন্যার সঙ্গে বিয়ের সন্মন্ধ। সে টাকার গরম দেখাবে না তো কে দেখাবে? হাশমত বানুর বিয়ের শাড়িটা সোনা-রূপার জরির কিংখাপের হলেও অবাক হওয়ার কিছু ছিল না।

তখনো ভিসা-পাসপোর্টের চল হয় নাই। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় ভাটা পড়লে ট্রেনের টিকিট কেটে হাশমত বানু হানিমুনে যায় আগ্রা-দিল্লি। মাস কাবার করে ফিরে যখন, হাশমতের দেমাগে মাটিতে পা পড়ে না। মুখেও সারাক্ষণ দেওয়ানি আম, দেওয়ানি খাস, লালকেল্লা, মমতাজমহল-সম্রাট শাহজাহান। আর মহাসমারোহে সুটকেস খুলে উপহার বিলানোর সময় নীহার বানুর ভাগে পড়ে শুধু এসেন্স দেলখোস। উপহার উপহারই, তবু বুকটা ব্যথায় টনটন করে নীহার বানুর। ইচ্ছা হয় হাশমতকে বলে, ‘হানিমুন থেকে ফিরে আমার দেবার পালা আসবে যখন, তখন তুলনা করে দেইখ্য বোন, আমি কেমন দরাজ দিলের আর তুমি কী। ছিঃ আরেকটু হাতখোলা হইলে তুমি গরিব হইয়্যা যাইতা!’

কিন্তু নীহার বানুর বিয়ের পর বছর গড়ায় বাপের বাড়ি-শ্বশুরবাড়ি করে, কিছুতেই হানিমুনের কথাটা ভাসাতে পারে না। স্বামীর নাই রোজগারপাতি। পায়ে হেঁটে দিনমান রোগী দেখে বেড়ায়। ইনাম জোটে সিজনের ফলমূল, তরিতরকারি। টাকাপয়সা কদাচিৎ।

বিয়ের পরের বছর পাট বেচার টাকা হাতে এলে স্বামীর সঙ্গে সিলেটগামী মেইল ট্রেনে উঠে বসেন নীহার বানু। তিনি একে মনে মনে হানিমুন ভাবলেও, আসলে এ সফরের উদ্দেশ্য ছিল হজরত শাহজালালের দরগায় জোড়া কবুতর ওড়ানোর শাশুড়ির তরফে মানত পূরণ। মানতের ছাই রঙা কবুতর জোড়া মুফতে পাওয়া। ঘরের চালের খোপে বাচ্চা ফোটার পর সায়মা খাতুন তক্কে তক্কে ছিলেন। ওড়ার আগেই বাচ্চা দুটি খাঁচায় পুরে দানা-পানি দিয়ে বড় করেছেন। সেই কবুতরের খাঁচার আংটা ধরে ট্রেনে ওঠেন নীহার বানু। মনে আনন্দ নাই। তাঁর কত দিনের শখ বিয়ের পর হাশমত বানুর মতো আগ্রা যাবার! চাঁদনি রাতে তাজের মার্বেলের সিঁড়িতে দাঁড়াবেন স্বামীর হাত ধরে। জ্যোৎস্নালোকে চকচকে সাইপ্রেস বৃক্ষ, রঙিন ফোয়ারা, পানির নহর, শ্বেতপাথরে নানা বর্ণের মিনার কারুকাজ। স্বামীটা তার বেরসিক  –  ভাবছিলেন নীহার বানু, না হলে তাজের সৌন্দর্য্য দেখা বাদ দিয়ে কেউ শ্যাওলা-পড়া গজার মাছ বা বুড়া কাছিম দেখতে যায়! সত্যিকারে মানুষ তখন শাহজালালের মাজার শরিফ জিয়ারত করে পুণ্যাত্মা কাছিম, গজার মাছেদের হাতে তুলে খাওয়াতেই শুধু সিলেট যেত। আর তাতেও আপত্তি ছিল নীহার বানুর।

নীহার বানুর আব্বাজান ওহাবিদের মতো পির-ফকিরি, কবর-মাজার জিয়ারত অপছন্দ করতেন। বলতেন এসব শেরেক, বিদ্আত। অথচ মমতাজ মহলের কবরে গড়া শ্বেতপাথরের ইমারতটির প্রতি তাঁর ছিল অসম্ভব দিলের টান। যুবাকালে একবার তাজমহল দেখতে গিয়ে এর ছোট্ট রেপ্লিকা কাঁচের বাক্সে ভরে বাড়ি বয়ে আনেন। সেটি তাঁর বিছানার ঘা ঘেঁষে মাথার কাছের কুলঙ্গিতে শোভা পেত। আগ্রা-দিল্লি হিন্দুস্তানের ভাগে পড়লে হাজি চান রেগেমেগে কাঁচে ঘেরা খেলনা-তাজ এক আছাড়ে দু টুকরা করে ফেলেন। হাতের কাছে কায়দামতো পেলে মাউন্ডব্যাটনের মাথাটাই হয়তো গুঁড়িয়ে দিতেন। প্যাটেল-নেহেরুকেও ছেড়ে কথা কইতেন না। ভাঙচুর শেষে তিনি জিন্নাহ টুপি মাথায় চাপিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে, গাবের আঠা দিয়ে ভাঙা তাজ জুড়তে বসে তাঁর দুই কন্যা নীহার বানু আর হাশমত বানু।

‘এই গাধারা, এ দিয়া জুড়বি পাত্থর!’ তাদের কলেজ পড়ুয়া মামাত ভাই ঘরে ঢুকে তো তাজ্জব। ‘বেলের আঠায় পাকিস্তান-হিন্দুস্তান জোড়া লাগলেও, তাজমহল জুড়ব না রে, জোড়া বেক্কল।’

দুবোন তখন একেবারে কচি বয়সেরও নয়। নীহার বানু পনের, হাশমত বানু সতের। এর বছর দুই পর তো নীহার বানুর শাদিই হয়ে যায় দশ বছরের বড় মোয়াজ্জেম হকের সঙ্গে। তার বছর খানেক পর তাঁদের সিলেট বেড়াতে যাওয়া।

বাড়ি থাকতেই নীহার বানু স্বামীকে বলেন, তিনি শাহজালালের দরগায় যাবেন না। মানত-টানতে তার বিশ্বাস নাই। মোয়াজ্জেম হক মাথা নেড়ে সায় দিলেও মনটা তাঁর বিষন্ন হয়েই থাকে। আরও খারাপ লাগে যখন দেখেন কল্পনার রেলগাড়ি আর বাস্তবের রেলগাড়িতে দুস্তর ফারাক। থার্ডক্লাসে কাঠের সিট। ভিড়বাট্টা। অতিরিক্ত গরমে কালো বোরকাটা গায়ে রাখতেই কষ্ট হচ্ছিল। গাড়ির হুইসেল বেজে উঠতে তিনি বোরকা খুলে স্বামীর হাতে গছিয়ে দেন। ধাক্কাধাক্কি করে দুসারি আসনের মাঝখান দিয়ে পথ করে এগিয়ে যান। পায়ের কাছে কবুতরের খাঁচা থুয়ে দখল নেন জানালার ধারের কাঙ্খিত আসনটির। আর যাই হোক ট্রেনের দুলুনিটা হয়তো ভালোই লেগেছিল, তাই ঘুমিয়েও পড়েন সঙ্গে সঙ্গে।

সেবার সিলেটের এক ডাকবাংলোতে উঠেছিলেন দুজন। টিনের চাল। আর মুষলধারে বৃষ্টি। দিন থাকতেই নিশাচর কীট-পতঙ্গের অসম্ভব কোলাহল। মাজার জিয়ারতের চাড় নাই মোয়াজ্জেম হকের। জানালার ধারে বসে দিনমান বৃষ্টি দেখেন। খাটের তলায় ডানা-ঝাপটায় ক্ষুধার্ত কবুতর। বিদেশ-বিভুঁইয়ে শস্য-দানা পাবেন কোথায় নীহার বানু? ধরাধরি করতে ডাকবাংলোর এক বেয়ারা মুঠো খানেক চাল ভাঁড়ার থেকে এনে দেয়। তৃতীয় দিন বৃষ্টি ধরলে রিকশা চেপে দরগায় রওনা দেন দুজন। নীহার বানুর বুকটা ধড়ফড় করছিল। আব্বাজানের অবাধ্য হওয়া জীবনে এই প্রথম। খোদা যদি মাফ করেন। বিয়ের পর তো কন্যার পাপ-পূণ্যের ভাগিদার স্বামী। গোনাহ হলে স্বামীরই হবে। মোয়াজ্জেম হক সিঁড়ি বেয়ে টিলার ওপর হুজুরে পাকের রওজা শরিফে উঠে গেলে তিনি কবুতরের খাঁচা হাতে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকেন। গজার মাছের পুকুরটা কোন দিকে কে জানে। চাতালটা নানাজাতের মেয়েলোকে ভর্তি। হযরত শাহজালালের রওজায় যাবার তাদের ইজাজত নাই। অবশ্য যে ধর্মেরই পুরুষ হোক, তার যাতায়াত অবাধ। সিঁধুর পরা এক মহিলা সিঁড়িতে কপাল ঠুকতে থাকলে নীহার বানু এক ঝটকায় নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। ধর্মের নামে এ কেমন অধর্ম – পাথরে কপাল ঠোকে! মহিলার চোখের জলও সেদিন তাঁর মন গলাতে পারে নাই। এর প্রায় বাইশ বছর পর সেই সিঁড়িতেই কপাল ঠুকে কাঁদতে আসেন নীহার বানু। তখন তাঁর মরহুম আব্বাজানের চেহারাটা মনে পড়ে নাই। ভেজা চোখের পর্দায় সেই মহিলার কম্পিত মুখ, অশ্রুঝরা ফোলা চোখ, কালো পাথরের সিঁড়িতে সিঁধুর আর চোখের জলে মেশানো আবছা গোলাপী দাগটা ভেসে উঠেছিল। সে হয়তো ছিল তাঁর মতোই এক দুঃখী মা, যার পুত্র ক্যান্সার-আক্রান্ত, মৃত্যুশয্যায়।

সেদিন মোয়াজ্জেম হক কাগজে মোড়া বাতাসা হাতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলে নীহার বানু কবুতরের খাঁচাটা নিঃশব্দে এগিয়ে দেন। শানের চাতালের এক কোণে লোহার জালিঘেরা একটা বর্গাকৃতির জায়গায় ভিড় করে দাঁড়িয়ে অগুন্তি মানুষ। নীহার বানু ভাবেন, ওখানে বুঝি ডুগডুগি বাজিয়ে বানর নাচানো হচ্ছে বা সাপের খেলা দেখাচ্ছে কোনো দুর্ধর্ষ সাপুড়ে। ভিড় ঠেলে কাছে যেতে ভুল ভাঙলো। জালির ঘেরের ভেতর হাঁটুসমান দানায় খানকয়েক কবুতর। আর শত শত কবুতর পাশের দালানের কার্নিশে খুনসুটি করছে। মোয়াজ্জেম হক নিজহাতে খাঁচার কবুতর দুটি ছেড়ে দিতে নীহার বানুর বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। স্বামী তো আত্মভোলা, উদাসী মানুষ। কবুতর জোড়াই ছিল এ সফরে তাঁর একান্ত সঙ্গী। ভেবেছিলেন, ছাড়া পাওয়া মাত্র উড়ে যাবে। কিন্তু এরা তো জন্মাবধি খাঁচা-বন্দী। তাই উড়তে শেখেনি। শস্য-দানায় গোলাপী পা ডুবিয়ে বসে হাঁফাচ্ছিল। পরমুহূর্তে অন্য কবুতরদের দেখাদেখি ডানা নেড়ে খাবার খেতে শুরু করলে স্বামী-স্ত্রী গজার মাছের পুকুরের দিকে পা বাড়ান। এমন খোলা জায়গায় বেপর্দা ঘোরাঘুরি –  শুরুতে অস্বস্তি হলেও শেষমেশ নীহার বানুর ভালোই লাগছিল। হাতে বাতাসার তবারুক থাকা সত্ত্বেও মোয়াজ্জেম হক সেদিন টাকা ভাঙ্গিয়ে চিনির কদমাও কিনে দিয়েছিলেন। কেমন মেলা মেলা ভাব। ফেরার পথে জালি-ঘেরা জায়গাটায় কবুতর জোড়া আর শনাক্ত করতে পারেননি নীহার বানু। ছাইবর্ণের সমুদ্রে ওরা হারিয়ে গিয়েছিল।

মাজার থেকে ফিরে আবার সেই ডাকবাংলো। মোয়াজ্জেম হক বাড়ি ফেরার নাম করেন না। জানালার ধারে বসে বৃষ্টি দেখেন। খাবার-দাবার যেমন-তেমন, সকাল-বিকাল সিলেটের সুগন্ধি চা। রুমে বসে থেকে নীহার বানুর অস্থির লাগলে শহর প্রান্তের চা-বাগান ঘুরে আসেন একদিন। আরেকদিন যান ডাক-গাড়িতে করে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত তামাবিল। এক বেলার পথ। রাস্তার দু’ধারে গভীর অরণ্য, জলাভূমি আর বড় বড় নলখাগড়ার বন। কখনো কখনো ছোট ছোট সুবিন্যস্ত টিলা। ছাড়া ছাড়া ঘরবসতি। ডুবন্ত খেতখামারে কাদাগোলা গলা পানি, বৃষ্টিভেজা ঘনসবুজ গাছের পাতা, ভিজে কালচে হয়ে যাওয়া গাছ, গাছে গাছে দাড়ির মতো ঝুলন্ত শ্যাওলা। কার্তিকের শেষ, তবু সময়-অসময় ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। তাঁদের গাঁয়ের ভাষায় যাকে বলে আশ্বিন-কার্তিকের আইত্যান-কাইত্যান। মোয়াজ্জেম হক বলেন, এখান থেকে খুব কাছেই চেরাপুঞ্জি, যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়। ডাকগাড়ি তামাবিলের কাছাকাছি চলে আসতে চারদিকে পানি আর পাথর, বড় বড় বোল্ডার বা গন্ডশিলা। নীহার বানু এত বড় পাথরের চাংড়া জিন্দেগিতে দেখেন নাই। আদতে তিনি পাথরই দেখেন নাই। দাঁড়িপাল্লার এক সেরী বা পাঁচ সেরী বাটকারাই তাঁর দেখা পাথর। ‘এ সমস্ত গন্ডশিলা আসে, ’মোয়াজ্জেম হক বলেন, ‘মেঘালয়ের পাহাড় থেকে খরস্রোতা নদীতে ভাসতে ভাসতে।’

গাড়ির চালক ইঞ্জিন বন্ধ করতে এক সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে অসংখ্য ঝিঁঝির ডাক আর পাহাড়ি ঝর্ণার কলতান। তাঁরা যেখানে নামেন, ওখানে নামেই সীমান্ত চৌকি। তখনো পাসপোর্ট-ভিসা চালু হয় নাই। জনমনিষ্যিহীন কর্দমাক্ত পথে খানিক দূর হেঁটে গেলে পাথর আকীর্ণ স্বচ্ছজলের পিয়াইন নদী। সামনেই আকাশ সমান উঁচু পাহাড়সারি। নীহার বানুর বুকটা কেঁপে ওঠে। পানির দেশের মানুষ তিনি, ত্বরায় পাহাড় থেকে চোখ নামিয়ে পায়ের জুতা খুলে তরতরিয়ে নদীর দিকে এগিয়ে যান। পেছন থেকে মোয়াজ্জেম হকের গলা শোনা যায়। তিনি হাঁক ছেড়ে বউকে জানাচ্ছেন, সামনের এই পাহাড়গুলি পেরিয়ে গেলে পাইনবনের কোলে শিলং শহর।

‘একবার গেলে হয় না!’ নীহার বানু আবদার করলে তিনি সংক্ষেপে বলেন, ‘না, অনেক দূর।’

‘একবার কয় কাছে, আবার কয় অনেক দূর –  মাথামুBg বুঝি না কিছু।’ বলে নীহার বানু পিয়াইন নদীর খরস্রোতে ভেসে আসা গোল মসৃণ পাথরে বসে খাড়ু পানিতে পা ডুবিয়ে দেন। পাথরে হোঁচট খেয়ে তেড়ে আসা নদীর পানি শাড়ি ভিজিয়ে দিলে তিনি পুলকিত হয়ে স্বামীর ইন্তেজার করেন। খানিক পর পাজামা গুটিয়ে পানিতে নেমে আসেন মোয়াজ্জেম হক। দৃষ্টি তাঁর দূরের পাহাড়ে। নীহার বানু পানিতে পা নাচাতে নাচাতে ছোট ছোট জলজ প্রাণী, রঙিন মাছ দেখার জন্য ডাকেন মোয়াজ্জেম হককে। লোকটা হঠাৎ হঠাৎ এমন দূরের হয়ে যায়! মনে হয় অচিন পুরুষ। বউ পাশে থুয়ে কার কথা ভাবে সে?

সেই রাতে স্বামীর মুখে নীরদচন্দ্র সেনের কথা প্রথম শোনেন নীহার বানু। সে আর কতটুকু? নিশিপাখির ডাক বা নির্ঘুম রাতের প্রলাপের মতোই তাঁর মনে হয়েছিল কথাগুলি। আজাদ হিন্দ ফৌজের তখন ভাঙ্গা মন, রুগ্ন অনাহারক্লিষ্ট শরীর, মাথার ওপর শত্রুর বোমারু বিমান, বানের জলে ভেসে যাওয়া পথঘাট। যত এগোচ্ছেন, চারপাশের মুমূর্ষের গোঙানি যেন বেড়েই চলেছে। ‘ও মা মা, মোরে ফেলি না যাইচ।’ দক্ষিণাঞ্চলের অচেনা এক বাঙালির ভয়ার্ত চিৎকার এখনো কানে বাজে মোয়াজ্জেম হকের, তিনি যার চেহারা দেখেননি। তারপর চিন্দুইন উপত্যকা। পা টেনে টেনে পাহাড়ের বাঁক ঘুরে গিরিসঙ্কটে নামছেন, তখনই পেছনে গুলির শব্দ।

গুলির শব্দটা যে নীরুর হাতের পিস্তলের, খোদানাখাস্তা –  নীহার বানু স্বামীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, তিনি তা জানলেন কী করে? পাহাড় ডিঙ্গিয়ে ফিরে তো যাননি?

মাথা নেড়ে সায় দেন মোয়াজ্জেম হক। অশ্রু আড়াল করতে হারিকেনের সলতেটা কমিয়ে বিছানায় ফিরে আসেন। নীহার বানুর মনে হয়, ছেলে বেঁচে আছে কি মরে গেছে, এতদিনে নিশ্চয় জেনে গেছেন নীরুর বৃদ্ধ বাবা-মা। তাঁদের কি উচিত নয়, সেই দুর্ভাগা পিতা-মাতার সঙ্গে একবার দেখা করে আসা? তা নীহার বানু মুখ ফুটে বললে মোয়াজ্জেম হকের সংক্ষিপ্ত জবাব – পরের বার।

পরে নীরুর সম্পর্কে অসংখ্য রাত জেগে আরও অনেক কথা হলেও, ‘পরের বার’ তাঁদের জীবনে আর আসেনি।

পরদিন সিলেটের ডাকবাংলোতে ঘুম ভেঙে নীহার বানুর মনে হয়েছিল, পুরোটাই দুঃস্বপ্ন। তাঁরা অম্বরখানা বাজার থেকে বেতের ঝুড়িভর্তি কমলালেবু আর শীতল পাটি কিনে বাড়ি ফেরার মেইল ট্রেন ধরেন।

উৎস

প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত শাহীন আখতারের অসুখী উপন্যাসের ২৫তম অধ্যায় এটি। উপন্যাসটি একুশের গ্রন্থমেলায় পাওয়া যাচ্ছে।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close