Home আফ্রিকা অমনিবাস শিবব্রত নন্দি দুলাল > মন পবনের নাও >> বিষয় আফ্রিকার শিল্পকলা

শিবব্রত নন্দি দুলাল > মন পবনের নাও >> বিষয় আফ্রিকার শিল্পকলা

প্রকাশঃ February 19, 2018

শিবব্রত নন্দি দুলাল > মন পবনের নাও >> বিষয় আফ্রিকার শিল্পকলা
0
0

শিবব্রত নন্দি দুলাল > মন পবনের নাও >> বিষয় আফ্রিকার শিল্পকলা

 

শুনছিলাম অনুজ বাচিক শিল্পী সমরেশ দাসের ভরাট কন্ঠে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আফ্রিকা। আজ আবার শুনলাম ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়ের একই আবৃত্তি। দুজনের সুরের বাঁধন প্রায় এক, ভরাট এবং তরঙ্গায়িত।

উদ্‌ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে
স্রষ্টা যখন নিজের প্রতি অসন্তোষে
নতুন সৃষ্টিকে বারবার করছিলেন বিধ্বস্ত,
তাঁর সেই অধৈর্যে ঘন-ঘন মাথা-নাড়ার দিনে
রুদ্র সমুদ্রের বাহু
প্রাচী ধরিত্রীর বুকের থেকে
ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমাকে, আফ্রিকা,
বাঁধলে তোমাকে বনস্পতির নিবিড় পাহারায়
কৃপণ আলোর অন্তঃপুরে।

এই সেই আফ্রিকা, যেখানে মিশে আছে কালো মানুষের সংগ্রাম, যেখানে সুর্যের আলো বারবার বাঁধা পায় কঠিন নৈরাজ্যের অন্ধকারে, যেখানে মুক্ত বাতাস আর জ্যোৎস্নার আলো থমকে দাঁড়ায় গভীর দীর্ঘস্বাসে। এসব নিয়েই গুএলফের স্টোনরোড মলে কফির আড্ডায় কথা হচ্ছিল ঢাকা চারুকলার একসময়ের তুখোর ছাত্র অনুজ হুমায়ুন কবির বাহারের সাথে। যে মহাদেশের কত কথা কথিত, কত কথা অকথিত, আমরা কি তার খবর রাখি?
চুয়ান্নটি দেশ নিয়ে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশ আফ্রিকা। জনসংখ্যার বিচারেও তা দ্বিতীয়। আলজেরিয়া এবং নাইজেরিয়া হচ্ছে যথাক্রমে আফ্রিকার বৃহত্তম রাষ্ট্র এবং জনবহুল দেশ। আফ্রিকাকে বলা হয় মানব ইতিহাসের শৈশব-ভূমি। সে-ও প্রায় ২০০,০০০ বছর আগের কথা। ১৩৫,০০০ বছর আগেও মাহাদেশটি ছিল একটি উর্বর ভূমি, আবহাওয়া ছিল বাংলাদেশের মতোই নাতিশীতোষ্ণ। তারপর এলো এক বিভিষিকাময় খরার তাণ্ডব। মানুষ দিশাহারা হয়ে যে যেখানে পারে সেখানেই চলে গেলো। মালাও হ্রদের গভীরতা ১৯৬৮ ফুট কমে গেলো। তখন সেখানে না ছিল জীবনের স্পন্দন, না ছিল জীবিকার অবলম্বন। এই খরা বিস্তৃত ছিলো আরো ৭০,০০০ বছর। চলছিল দুর্ভিক্ষ। এতসব প্রতিকুলতার মাঝেও টিকে ছিল অল্পকিছু জীবন। তারপর একদিন আবার বৃষ্টি এলো, শ্যামল হলো রুক্ষ মাটি, আবার তাঁরা ফসল ফলালো, গাইলো জীবনের গান, পাথরের গা ভরে উঠলো স্বাপ্নিক চিত্রমালায়।

 
আফ্রিকান চারুকলার ইতিহাস
আধুনিক মানুষের উৎপত্তি (Homo Sapiens) হয়েছিল আফ্রিকা থেকে। তাই আফ্রিকাতেই সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশী এবং মহৎ পাথরচিত্র। প্রায় ২৪-২৭ হাজার বছর আগে নামিবিয়াতে আবিষ্কৃত হয় বিশ্বের প্রথম আদিম চিত্রমালা। অনেকে মনে করেন আফ্রিকান পাথর চিত্রের বয়স ৫০,০০০ বছরের অধিক।

খ্রিস্টপুর্ব ৬৫০০ সনের পাথরের উপর জিরাফ খোদাই চিত্র (Giraffe engraving, Niger) নাইজারের সাহারায় আবিষ্কৃত হয়েছে। সেখানে কিছু বাঁকানো কর্ম এবং জিরাফের ছবি দেখা যায়, যা আর বর্তমান নেই।

আলজেরিয়াতে আদি আফ্রিকার পাথরচিত্র এবং নাইজারে আবিষ্কৃত খ্রিস্টপুর্ব ৩০০০ বছর আগের ফিগার-চিত্র ইতিহাসে মানুষের আদি চিত্রকলার পরিচয় বহন করে।

মানব জাতির আবির্ভাব এবং চিত্রকলার ইতিহাস প্রায় সমসাময়িক। পাথরের গুহায় খোদাই, নক্শাকাটা এবং পেইন্টিং দিয়ে আফ্রিকান চারুকলার যাত্রা শুরু হয়। ওই চিত্রকর্মগুলোই পরিচয় বহন করছে আফ্রিকার ওই সময়ের মানুষের দেহের গড়ন, রীতি এবং প্রথা। দক্ষিণ আফ্রিকায় পাথরের গায়ের চিত্র এবং নাসারিয়াসের খোলস দিয়ে তৈরি জপমালার গহনা আবিষ্কৃত হয়েছে ৭৫ হাজার বছর আগেই। প্রায় ২৭ হাজার বছর পূর্বের পাথরচিত্র আবিষ্কৃত হয়েছে নামিবিয়ায়। দক্ষিণ আফ্রিকার ড্রাকেন্সবার্ড পর্বতমালায় এধরনের প্রায় দশ হাজার চিত্র পাওয়া গেছে। নাইজারের সাহারা অঞ্চলের পাথরের বাঁকানো শিল্পকর্ম ৬ হাজার বছরের পুরানো। নাইজেরিয়ার নক নৃগোষ্ঠী খ্রিস্টপূর্ব পাঁচশো বছর আগেই মাটি দিয়ে তৈরি করেছিলেন টেরাকোটা ভাস্কর্য। ভাস্কর্যগুলো ছিল ভারসাম্যহীন উদ্ভট প্রকৃতির। দশম শতকে সাব-সাহারা আফ্রিকায় ব্রোঞ্জের মুখোশ তৈরি এবং টেরাকোটা শিল্প তৈরি হয়েছিল। পরে পশ্চিম আফ্রিকায় ধনিক শ্রেণির জন্য হাতির দাঁত এবং মূল্যবান পাথর ব্যবহৃত হতে থাকে। তেরোশো-ষোলশো শতকের মাঝে চিত্রকলায় পরিবেশের বিষয়টি চলে এসেছিল। এর আগের বেশ কিছু আদি চিত্রকলা ধংসপ্রাপ্ত হয়। আদিম আফ্রিকানরা পেইন্টিং এবং পাথরের গায়ে মানুষের মুখের কারভিং ছাড়াও প্রচুর ভাস্কর্য নির্মাণ করেছিলেন। তাঁরা টেরাকোটা, কাঠ, চামড়া এবং তন্তুবস্ত্র দিয়ে মানুষ এবং প্রাণীর প্রতিকৃতি আঁকতেন। বৈচিত্রময় প্রকৃতি, যাযাবর শিকারি জীবন এবং বাঁচার সংগ্রামকে ঘিরে কেন্দ্রীভূত হয়েছে তাঁদের নিজস্ব চিন্তা। মিশরের পিরামিড তৈরি করা হয়েছিল ৪ হাজার বছর পূর্বে, যা তেরশো সনে লিংকন ক্যাথিড্রাল নির্মাণ না হওয়া অব্দি পৃথিবীর উচ্চতম স্থাপত্য ছিল।

 
চিত্ররীতি
মানুষ, জীবজন্তু, প্রকৃতি, অজানা ভৈতিক চিন্তা আফ্রিকান চারুকলার বিষয়বস্তু। ঐতিহ্যগতভাবে সেখানে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে ভাস্কর্য, কাঠের কাজ, মুখোশ, পেইন্টিং, স্থাপত্য, নৃত্যকলা, সঙ্গীত এবং দৃশ্যমান চিত্রকলা। তাঁদের সংস্কৃতে মিশে আছে আদি আফ্রিকান, অভিবাসী আফ্রো-আমেরিকান, ক্যারিবীয়সহ আফ্রিকা মহাদেশের জনগোষ্ঠী। উত্তর–পশ্চিম আফ্রিকার রক্ষনশীল মুসলিম রীতি, পূর্ব-আফ্রিকার খ্রিস্টীয় উদারতাবাদ এবং আদি আফ্রিকার সংরক্ষণবাদী চিরায়ত সংস্কৃতি একসাথে দীর্ঘদিন মিলেমিশে তৈরি করেছে ঐতিহ্যগত পরিবেশ। ফলে আঞ্চলিক এবং ধর্মীয় ভিন্নতা সত্ত্বেও বৈচিত্র্যের দিক থেকে তা হয়ে উঠেছে একটি সর্বননীন ঐক্যের সহনশীল মহাদেশ। এ বৈশিষ্ট্য উত্তর আমেরিকা ও ভূমধ্যসাগরীয় চিত্রকলা থেকে আলাদা এবং স্বাধীন। অনগ্রসর এবং স্থবির অর্থনৈতিক কাঠামোতে যেখানে মানুষকে মূল্যবান সময় কাটাতে হয় প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম এবং জীবিকার জন্য, সেখানে সচল নন্দনতাত্বিক থিমে সহজেই এসে যায় অন্ধ অলৌকিকতার উপর বিশ্বাস।
পেইন্টিং সামগ্রীর দুর্মূল্য, বিদেশ নির্ভরতা, অস্থিতিশীল বাজার, অচলায়তনে বন্দি চারুকলা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান এই মহাদেশের কারুশিল্পে এনেছে স্থবিরতা। এই অবস্থাটি এশিয়া, ইউরোপ অথবা আমেরিকা থেকে একেবারেই ভিন্ন। কারুশিল্পে সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয় সহজলভ্য, স্থানীয়, কমদামী উপকরণ। প্রাকৃতিক উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হয় পোড়ামাটি, পাথর, গাছের ছাল, কাঠ, প্রাকৃতিক তৈলের নির্জাস, রঞ্জক, সোনা, টেক্সটাইল, পশুপাখির চামড়া ও পালক, যেমন এই ধরনের নানান উপকরণ।
তারপরও বলবো, গঠনরীতি এবং প্রকাশভিন্নতা বা অভিন্নতার মধুর দ্বন্দ্ব থাকলেও তা বহমান থেকেছে আপন স্বকীয়তা নিয়েই। পশ্চিম আফ্রিকার নাইজার ও কঙ্গো নদীর অববাহিকার মাটির কাজ, বেনিন অঞ্চলের পিতলের ভাস্কর্য এবং টেরাকোটা, পৌরাণিকতার আলোকে পূর্ব-পুরুষদের আত্মাকে প্রতিফলিত করে তৈরি কাঠের মুখোশ আফ্রিকান ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ। সারা পৃথিবীর ধনিক শ্রেণির মতোই এখানকার ধনীরাও ক্ষমতা ও দাম্ভিকতার প্রতীক হিসাবে সোনার ভাস্কর্য উপভোগ ও পছন্দ করেন। প্রায় পাঁচশো বছর আগে মান্ডে সম্প্রদায় তাঁদের কারুকাজে হৃৎপিণ্ডের আকারে প্রতীকী মাথার খুলির ব্যবহার, পূর্ব আফ্রিকায় তিঙ্গাদের পেইন্টিং, মাকন্ডিদের ভাস্কর্য এবং বস্ত্র-কারুশিল্প, জিম্বাবুইয়ান ও সেনেগালের কাঠের ফার্নিচার আন্তর্জাতিক মহলেও সমাদৃত হয়েছে। এই সমস্ত শিল্পে মানুষ এবং জীবজন্তুর উপস্থিতি দৃশ্যমান। এই ধরনের একটি কাঠের কারুকাজ খচিত শিল্প আমার গণ-অরণ্যেও আছে। এটি আমাকে দিয়েছিলেন কাজী সাফায়েতুল হক মিন্টু ভাই।

 
আফ্রিকান কারুশিল্পে বিষয়ভিত্তিক উপাদান
দারিদ্র্য, খরা, দুর্ভিক্ষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অপ্রতুল শিক্ষা, উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানের অভাব, পৃষ্ঠপোষকতাহীনতা এবং ক্ষমতালোভী শাসক শ্রেণির অবাধ লুণ্ঠনের মাঝেও টিকে আছে পৃথিবীর আদিমতম অঞ্চলের কারুশিল্প। বৈপরীত্যের গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে তাঁর বিষয়ভিত্তিক উপাদান, যুক্ত হয়েছে তাদের শিল্পকর্মে : (১) পশ্চিম আফ্রিকার শিল্পিসুলভ সৃজনশীলতা এবং ভাবমুলক ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ; (২) আইভরি কোস্টের মানব-চিত্র (Human Figure); (৩) মিশরের দৃশ্যমান বিমূর্ততা (Visual abstractions); (৪) ত্রিমাত্রিকতার (3-dimensional) গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্য (Sculpture); (৫) চিত্রের উপযোগিতাবাদকে গুরুত্ব দিয়ে সম্পাদনযোগ্য কারুশিল্প (Performing arts); (৬) সেনেগালের অরৈখিক স্কেলিং (Nonlinear scaling)-এর মাধ্যমে ফ্রাক্টেল জ্যামিতির dynamic symmetry-এর সুত্র; (৭) দৃশ্যমান চিত্রকলা ও স্থাপত্য।

 
সমসাময়িক চারুকলা
আফ্রিকাকে বলা হয় সমসাময়িক চারুকলার এক উদীয়মান অঞ্চল। পৃথিবীর উন্নত এবং আধা-উন্নত দেশগুলোর তুলনায় খুব কম সংখ্যক আফ্রিকান শিল্পী আমাদের কাছে পরিচিত। এর কারণ তথ্যের অভাব, তাঁদের নৈপুণ্যকে অবজ্ঞা করার অভিপ্রায় এবং সম্প্রসারণবাদী জাত্যাভিমানের থাবা। এর মাঝেও অমিত সম্ভাবনা নিয়ে বেড়িয়ে এসেছেন ফাথি হাসান, ইরমা স্টার্ন, সিরিল ফ্রাদান, ওয়াল্টার বাত্তিস, এল আনাতসুই, মারলিন ডুমাস, উইলিয়াম কেন্ডরিজ, কারেল নেল, লুবাইনা হিমিদ, হেনরি তায়ালির মতো মহৎ শিল্পীরা।
কিছুকিছু জাম্বিয়ান শিল্পীর অদম্য আকাঙ্ক্ষার কাছে অবলীলায় ধরা দিয়েছে বিস্ময়কর শিল্পচেতনা। তাঁরা চিত্রকর্মে স্থানীয় উপাদান- যেমন পাটের বস্তা, গাড়ির রং, এমনকি বিছানার ছেঁড়া চাদরকে ক্যানভাস হিসাবে ব্যবহার করেন। জাম্বিয়ান চারুকলায় পথিকৃত শিল্পী হচ্ছেন লেশওয়ে ট্রাস্ট। এর প্রতিষ্ঠাতা সিনথিয়া জুকাস। ১৯৮০-র দশকে তিনি বিদেশ গিয়ে আধুনিক চিত্রকলার উপর জ্ঞান অর্জন করে কিছু কাঁচামাল নিয়ে আসেন। ১৯৮৬ সনে তিনি স্থানীয় চিত্রকরদের সংগঠিত করে লিচি ট্রাস্ট-এর মাধ্যমে তাঁদের উদ্ভুদ্ধ করতে শুরু করেন। একাত্তর পূর্ববর্তী বাংলাদেশের মতো জাম্বিয়াতেও চিত্রশিল্পের তেমন শক্ত উদ্যোক্তা ছিল না। সত্তরের দশকে হেনরি তায়ালির ‘ডেসটিনি’ (১৯৭৫-৮০) নামক ধাতব দ্রব্যের উপর কাজ জাম্বিয়ার চিত্রশিল্পের ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করে। কিন্তু এই দুই বিখ্যাত শিল্পী এবং স্টারি মাওবা কখনো তাঁদের চিত্রকলা ভাল মূল্যে বিক্রি করতে পারেননি। কারণ চিত্রকলার মতো নন্দনশিল্পে মানুষের যে পরিমাণ আগ্রহ এবং রোজগার থাকার কথা, তা অধিকাংশ জাম্বিয়ানের ছিলনা।
কেনিয়ার সমকালীন চিত্রকলা শুরু হয়েছিল ১৯৫০-এর দশকে মাকিরি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে। সেখানে ছিলেন নামী দুই চিত্রশিল্পী এলিমো নিয়াউ এবং এলিজাবেথ কারুগা। ১৯৭০-এর দিকে কেনিয়াত্তা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেড়িয়ে এলেন আরো কিছু সৃজনকর্মী যারা তাঁদের ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে চাইলেন রংতুলির আঁচরে। তাঁরা ব্যবহার করলেন তেল রং, এক্রাইলিক এবং জলরং। কেনিয়াতে বিমূর্ত চিত্রকলা জনপ্রিয় নয়। সেখানে মানবচিত্রের উপর প্রাধান্য বেশি দেয়া হয়। প্রাথমিকভাবে মার্টিনের মতো শিল্পী কিউবিজম এবং আফ্রিকান বিমূর্ততার সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। বর্তমানে সেখানে সিসাল গাছের বাস্কেট, হাতির লোমের ব্রেসলেট, মাসাইদের জপমালা, বাদ্যযন্ত্র, ভাস্কর্য, কাঠের বাঁকানো কাজ, মুখোশ, বাটিক প্রিন্টসহ বিভিন্ন কারুশিল্প বর্তমান।
অন্যদিকে গ্যাবনের চারুশিল্পে বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে মুখোশ, বেতের বাস্কেট, কার্ভিং এবং ভাস্কর্য। এদেরকে বলা হয় ফেং চিত্রকলা।

টিংগা টিংগা চিত্রকলা তাঞ্জানিয়ায় এক বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। কুঁড়ে ঘরের দেয়ালে চিত্র আঁকা ছিল একটি চিরায়ত সংস্কৃতি। কিন্তু ১৯৬৮ এডোয়ার্ড সেইড কাঠের উপর এনামেল পেইন্ট দিয়ে এঁকে নতুনত্ব এনেছিলেন। তবে ১৯৫০-এর সময়কাল থেকে ম্যাকান্ডি ঘরানার বিমূর্ত ধরনের মুখোশ ও ভাস্কর্য এখনো আফ্রিকার চিত্রকলার প্রতিনিধিত্ব করছে। চিত্রকলার উপর নিয়মিত দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনী একমাত্র সেনেগালের রাজধানী ডাকার এবং দক্ষিণ আফ্রিকার জোহান্সবার্গেই অনুষ্ঠিত হয়। ডাকার এবং জোহান্সবার্গের আর্ট গ্যালারি কালো আফ্রিকার সামনে আলোকবর্তিকা। আধুনিক চিত্রকরদের শিল্পকর্মের একটি লাভজনক বাজার সৃষ্টি এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
চিত্রশিল্পে বাস্তবতার প্রকাশ ঘটার শুরুর কাল হচ্ছে উনিশ শতকের মাঝামাঝি। তখন ইউরোবা জনগোষ্ঠী পাথর, ব্রোঞ্জ এবং মাটির উপর অধিকতর বাস্তব চিত্রের অবতারণা করলেন। এভাবেই আফ্রিকান চিত্রকলা তাঁর বিবর্তনের পথে সামিল হতে থাকে। তাঁদের সেই অভিযাত্রায় ভাস্কর্য, পেইন্টিং, এমনকি নৃত্যকলায় যুক্ত হতে থাকে নবতর পদ্ধতি। যেখানে ধারাবাহিক রূপান্তর ঘটতে থাকে চারুকলায়।

 
পশ্চিমা শিল্পরীতির উপর প্রভাব
উনিশ-বিশ শতকে উপনেবেশিক শাসনের সময় পশ্চিমারা আফ্রিকান চারুকলাকে ‘আদিম’ চারুকলা হিসাবে চিহ্নিত করে। এই বিষয়টিকে এমনভাবে বলা হতো যে কালো আফ্রিকা হচ্ছে একটি উপেক্ষা, অনুগ্রহ এবং করুণার মহাদেশ। অনুন্নত শিল্প, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, দুর্বল অর্থনীতি এবং সুশাসনের অভাব মহাদেশটিকে তুলে ধরেছিল একটি অনুন্নত অন্ধকারাচ্ছন্ন দারিদ্র্যের প্রতীক। বিংশ শতকে পাশ্চাত্যে আফ্রিকান কারুশিল্প বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করে। বিশেষ করে কাঠ বা মাটির মুখোশের বিষয়টি বিশশতক থেকে পশ্চিমা শহর ও বাড়িগুলোতে আভিজাত্যের প্রতীক হিসাবে স্থান পায়।
বিংশ শতকের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ডেরাইন, পিকাসো, মাতিস, গঁগা এবং মোদিগলিয়ানি প্যারিসের ট্রোকাডেরো জাদুঘরে আফ্রিকান কারুশিল্পের সংগ্রহ দেখে বিস্মিত হন। তাঁরা আবিষ্কার করেন আফ্রিকান চিত্রকলার সম্পূর্ণতা, ভারসাম্য এবং আদিমতার অমিত সৌন্দর্য। তাঁরা অবিভুত হন এর নৈপুণ্যে। ফলে শুরু হয় দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের পালা। তাঁরা আফ্রিকান কারুশিল্পকে দেখলেন একটি শক্তিশালী সাজানো চিত্রকলার মাধ্যম হিসাবে, যেখানে মিশে আছে কালো মানুষের আবেগ, অনুভূতি, প্রকৃতি, প্রেম, সংগ্রাম, কল্পনা, বিশ্বাস এবং মুল্যবোধ।
এরই ধারাবাহিকতায় পিকাসো সৃষ্টি করলেন ডগন নৃগোষ্ঠীর মুখোশের থিমে সাড়া জাগানো পেইন্টিং Les Demoiselles d’Avignon (১৯০৭); মোদিগলিয়ানি বানালেন আইভরি কোস্টের কাঠের ভাস্কর এবং মাতিস তৈরি করলেন তাত বস্ত্রের উপর কারুকাজ। তাঁরা তাঁদের শিল্পরীতিতে পরিবর্তন আনলেন। পরিবর্তন এলো স্থাপত্য রীতিতেও। বিখ্যাত স্থাপত্যবিদ আন্তোনিও, লে করবুরি, এরিকার এবং অস্কার নেমেয়ার ভবনের গঠন ও চূড়ার স্থাপত্যে যোগ করলেন বিজ্ঞানসম্মত আফ্রিকান ঐতিহ্য। পাশ্চাত্যের আগ্রহ এভাবেই ধীরে ধীরে প্রসারিত হলো, প্রভাবিত করলো প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের অসংখ্য অকথিত চারুশিল্পকে। ১৯০৭ সনে কিউবিজম রীতিতে পিকাসো আঁকেন তৈলচিত্র- Les Demoiselles d’Avignon। এতে ডান দিকের দুই প্রতিকৃতিতে আফ্রিকান মুখোশের আদল দেয়া হয়েছে।

 
প্রাচ্যের উপর প্রভাব
আফ্রিকান চিত্রকলার শৈশব কেটেছিল গুহার পাথরের গায়ে। তারপর এক-এক করে এসেছে তার অসংখ্য অবয়ব। হাজার হাজার বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষদের চিন্তা এবং আঙ্গিক আজ অনুপ্রাণিত ও প্রভাবিত করছে বাংলাদেশের ধামরাই, পশ্চিম বাঙলার কৃষ্ণনগর, থাইল্যান্ডের ব্যাংককসহ অনেক এলাকার কুমার শিল্পীদের। আমি এখনো নয়াদিল্লি, কলকাতা, ঢাকা, টরেন্টো, লন্ডন, প্যারির জনবহুল অঞ্চলে আগ্রহ নিয়ে আবিষ্কার করার চেষ্টা করি সেইসব অনন্য শিল্পকর্ম। ঐতিহ্যগত কারুশিল্প হয়তো আফ্রিকান শিল্পীদের ভাত-কাপড়ের ব্যবস্থা করতে পারেনি, দূর করতে পারেনি তাঁদের দারিদ্র্য; কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশেই তাঁদের থিম নিয়ে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য শিল্পী, উপস্থাপন করছে অপূর্ব সব শিল্পসম্ভার এবং ব্যবস্থা করছেন নিজেদের রুটি-রোজগার। এর প্রভাবেই আমিও আমার শহর থেকে কিনেছি কলাপাতার চিত্র।

 
শেষকথা

দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাব-সাহারা আফ্রিকা ১৮৪০-পরবর্তী সময়ে ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনে চলে যায়। উদ্ভট জাত্যাভিমানি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং তাঁদের পদলেহী শাসকদের বিরামহীন উপেক্ষা-অবজ্ঞা-লাঞ্ছনা-নির্যাতনে ধ্বংস হয়ে যায় হাজার বছরের লালিত ঐতিহ্যগত আফ্রিকান সংস্কৃতি। মিশনারিদের তথাকথিত জ্ঞানের আলো দান প্রক্রিয়ার স্কুলগুলোতে নিষিদ্ধ হয় আফ্রিকান নিজস্ব ভাষাও। লুণ্ঠিত ঐতিহ্যের উপর দাঁড়িয়ে তাথৈ তাথৈ নৃত্য করে লোলুপ ভ্রমণবিলাসী, দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ী এবং দখলদার মিশনারিরা। অবশেষে একদিন ঔপনিবেশিকতার গর্ভ থেকে জন্ম নেয় আধুনিক চিত্রকলা। এর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন কিছু প্রগতিশীল বিদেশী শিল্পী এবং প্রতিষ্ঠান। আজ থাবো মবেকি, মলেফি আসানতি‘র মতো আধুনিক শিল্পীরা স্বপ্ন দেখছেন একটি আফ্রিকীয় রেনেসাঁসের। তাঁরা জাতিগত আফ্রিকানদের নিয়ে গড়ে তুলতে চাচ্ছেন একটি সর্বজনীন ‘আফ্রো-কেন্দ্রিকতা’র (Afrocentrism) মঞ্চ। আমি গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি এই বিস্ফোরণের, এই উত্থানের।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close