Home ছোটগল্প শিল্পী নাজনীন > জলজ-জীবন >> ছোটগল্প

শিল্পী নাজনীন > জলজ-জীবন >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ March 17, 2018

শিল্পী নাজনীন > জলজ-জীবন >> ছোটগল্প
0
0

শিল্পী নাজনীন > জলজ-জীবন >> ছোটগল্প

 

সামনের বিল্ডিয়ের তিনতলা থেকে প্রতিদিনের মতোই পর্দার আড়াল চিরে চাপা কান্নার আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে। আওয়াজটা থামিয়ে দিতে পর্দার আড়ালে মাঝেমাঝে একটা মদ্যপ গর্জন শোনা যায়। যেন শহরের বেবুশ্যেপনায়ও সপাং করে ঘা বসিয়ে দেয় গর্জনটা, অকস্মাৎ। মাতাল, জড়ানো কণ্ঠে শাসন করে, চোপ হারামজাদি! একদম চোপ!

 

অন্ধকারটা ঘন লাগে খুব। মশককুলের ব্যস্ততাও ইদানীং চোখে পড়ার মতো। দিন নেই, রাত নেই, বিরামহীন গাইছে। মোনা বিরক্তভাবে নুয়ে পড়া ছোপ ছোপ জমাট অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। এখানে ওখানে টুকরো টুকরো আলো নিয়ে ঝুলে আছে শতচ্ছিন্ন সন্ধ্যেটা। স্ট্রিট লাইটগুলোর অধিকাংশই অন্ধ, মাঝেমাঝে দুয়েকটা ক্ষীণদৃষ্টিতে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সন্ধ্যের চোখে। কতকগুলো আবার একচোখে হলুদ জণ্ডিস নিয়ে সঙ হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। বোঝাতে চাইছে কি শহরের বুকেও জমে যাচ্ছে অমন যকৃত পচিয়ে দেওয়া রোগ? ভেতরে ভেতরে ক্ষইয়ে দিচ্ছে আলোর মেরুদণ্ড?

অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস গড়িয়ে যায় হাওয়ায়। বেশ গরম পড়েছে আজ। সামনের বিল্ডিংটার নিচের দিকের ফ্ল্যাটগুলো এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। পাশের একতলাটাও। ওটা সম্ভবত মেসবাড়ি। একদঙ্গল কমবয়সি ছেলেকে দেখা যায় সন্ধ্যের পরপর হুল্লোড় করতে, মাঝেমাঝে তাস পেটায় ছেলেগুলো, অনেক রাত অব্দি। সস্তা জীবন, সস্তার জীবন। ছেলেগুলোকে দেখলে বহুকাল আগে মরে যাওয়া একটা বোধ করুণ সুর তুলে বেজে উঠতে চায়, বুকের মধ্যে জমা সময়ের পলিটাকে সরিয়ে দিয়ে জেগে উঠতে চায় এক পুরনো ক্ষত। স্মৃতি সতত সুখের, সতত বেদনার! কোথায় যেন পড়েছিল মোনা কথাটা, কোথায়? মনে পড়ে না। তীব্র শব্দে বেজে ওঠা গাড়ির হর্ন সজোড়ে আঘাত করে চৈতন্যের কপাটে। ভেঙে দেয় ধ্যান। মেসবাড়িটাতে তখন মোমের আলোয় তাসের আড্ডা জমে ওঠে। সামনের বিল্ডিয়ের তিনতলা থেকে প্রতিদিনের মতোই পর্দার আড়াল চিরে চাপা কান্নার আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে। আওয়াজটা থামিয়ে দিতে পর্দার আড়ালে মাঝেমাঝে একটা মদ্যপ গর্জন শোনা যায়। যেন শহরের বেবুশ্যেপনায়ও সপাং করে ঘা বসিয়ে দেয় গর্জনটা, অকস্মাৎ। মাতাল, জড়ানো কণ্ঠে শাসন করে, চোপ হারামজাদি! একদম চোপ!

যাকে উদ্দেশ্য করে গর্জন, তার চাপা কান্নার সুর আরেকটু তীব্র হয়ে ওঠে, শহর হারামজাদি তাতে কান দেয় না। সে তেমনি গাড়ির হর্নের শব্দ আর নাগরিক কোলাহল বুকে নিয়ে শতচ্ছিন্ন অন্ধকারের চাদরে গা জড়িয়ে নির্লজ্জ, বেহায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। চোখে ছোপ ছোপ আলোর পিচুটি হয়ে ঝুলে থাকে দুয়েকটা স্ট্রিটলাইট। বারান্দার গ্রিলে হেলান দিয়ে চোখ কুঁচকে শহরের দিকে তাকিয়ে থাকে মোনা। শহরটা কি তারই মতো? বাইরে ভীষণ চটকদার, মনোহর, কিন্তু ভেতরে ভেতরে উপচে পড়ছে নর্দমার বমনোদ্রেককারী সারাৎসার!

একটা ছড়ানো ছাদ ছিল, বড়। সূর্য কাত হয়ে পশ্চিমের গায়ে হেলান দিলে একটুকরো বিকেল নামত তাতে। একটুকরো সুখ। মোনারা তখন দুদ্দাড় সিঁড়ি ভাঙত। উঠে যেত ছাদে। নারকেল গাছটা তখনও ছাদের সাথে লম্বা হওয়ার প্রতিযোগিতায় হারে নি, ছাদ ছাড়িয়ে তখনও উদ্ধত ভঙ্গিতে সে মাথায় কয়েককাঁদি ডাব আর নারকেল নিয়ে হাওয়ায় পাতা  ওড়াত পতপত। মাথা দোলাত দারুণ ফুর্তিতে। মোনারা তখন ছাদে হুল্লোড় জুড়ে দিত, বিছিয়ে দিত দূরন্ত কৈশোর। মোনার তিনতলার রুমটা তখন গোধূলির আলো মেখে রাঙা হয়ে উঠত। সোনালি-রঙ জানালার কপাটে, গ্রিলে, গোধূলির রঙ ঝিকিয়ে উঠত দারুণ বিভায়। সামনের একতলার ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলেটা তখন রেকর্ডপ্লেয়ারে হাই ভল্যুমে বাজিয়ে দিত, তোমার চুল বাঁধা দেখতে দেখতে ভাঙল মনের আয়না…

তারপর দূরবীন হাতে উঠে যেত একতলার ছাদে। ঘাড় উঁচু করে একদৃষ্টে দূরবীনে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকত মোনাদের ছাদ বরাবর। ওই বয়সে অমন স্তুতি কে না চায়! মাঝে-মাঝে টুকরো হাসি ছুঁড়ে দিত মোনা, এক-আধটু কটাক্ষ। তাতেই গলে যেত ছেলেটা। মোনার দাক্ষিণ্যে তাতেই সাতরাজার ধন পাবার হাসি ফুটত মুখে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে রাত জেগে জানালা খুলে তাকিয়ে থাকত মোনার জানালা বরাবর। জানালার পাশে পড়ার টেবিল ছিল দুজনেরই। পথ চলতে টুকরো কথাও হতো, ক্বচিৎ, কদাচিৎ। তেমন সুযোগ খুব বেশি ছিল না অবশ্য, সাহসও।

ছাদে উঠলে মোনাদের হুটোপুটিতে পাশের মেসবাড়িটাও জেগে উঠত। ছেলেগুলো হুড়মুড়িয়ে উঠে যেত একতলা বাড়িটার ছাদে। তৃষ্ণার্ত চেয়ে থাকত অনেকগুলো চাতক চোখ। একজন ছিল, চোখে চোখ। কথা হতো ওভাবেই। হৃদয়ে হৃদয়? হয় নি। মা-বাবা খাঁচা খুঁজছিলেন। পেলেন। পেলেন তো। মাহমুদ বিসিএস ক্যাডার। পুলিশ। কত সম্মান মোনার! কত সুখ! সরকারি বাড়ি, গাড়ি, বডিগার্ড! আর কী চাই!

বুকের ভেতর থেকে একমুঠো কার্বন-ডাই-অক্সাইড বের হয়ে যায় ধীরে। শীতল একটুকরো হাওয়া নেমেছে এখন। এসিটা নষ্ট। আইপিএসটাও। বিদ্যুৎ নাই সেই সন্ধ্যে থেকে। মাহমুদ আজ ফিরবে না। প্রতিদিন ফেরেও না। সরকারি কোয়াটারে ডেইজিকে নিয়ে থাকে সে। নতুন কেনা এই ফ্ল্যাটটায় মোনা জোর করেই উঠেছে প্রায়। মাহমুদ প্রথমে বাধা দিতে চেয়েছিল। পরে হয়তো ডেইজির ইশারাতেই চুপ করে গেছে। নিঃসন্তান মোনা চায় নি মাহমুদের সংসারে উটকো ঝামেলা হয়ে ঝুলে থাকতে। সে কি ভালবাসে মাহমুদকে? প্রশ্নটা নিজেই নিজেকে অনেকবার করেছে মোনা। তারপর নিজের প্রতি নিজেই কুঁকড়ে গেছে ঘৃণায়। সে কেন ছেড়ে যায় নি মাহমুদকে? যে মাহমুদ তাকে উপেক্ষায়, অপমানে দগ্ধে দিল এমন, কেন সে এখনও আঁকড়ে আছে সেই মাহমুদের ছায়া? তবে কি মাহমুদকে সে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, ব্যবহার করছে নিরাপত্তার বর্ম হিসেবে? কিন্তু কেন? কিসের অভাব তার? সে নিজে উচ্চশিক্ষিত, উঁচু পদে চাকরি করছে একটি বিদেশী এনজিওতে। বছরে বেশ কটা ট্যুর থাকে তার দেশের বাইরে। মোটা টাকা মাইনে পায়। নারী অধিকার নিয়ে উচ্চকিত একটি কণ্ঠ সে। তাকে দেখে উদ্দীপিত হয় কত নিপীড়িত মেয়ে। তাহলে তার ভেতরে কেন এমন ঘুণ বাসা বাঁধে! সে কেন পরিণত হয় ভেতরে ভেতরে এমন উঁইঢিবিতে! ঘেন্নায় কুঁকড়ে ওঠে মোনা। লোভ! নিরাপত্তার, সাচ্ছন্দ্যের, সামাজিক মর্যাদার! মাহমুদকে ছেড়ে যাওয়া মানে তার ছায়া থেকে, নিরাপত্তার বলয় থেকে সরে যাওয়া, তার সামাজিক মর্যাদাকে ডেইজির কাছে সম্পূর্ণরূপে হ্যান্ডওভার করা! ঈর্ষা খোঁচা মারে বুকে! না! সে ডেইজিকে অত স্বস্তিতে থাকতে দেবে না। ডেইজির চোখের সামনে সে বিষফোঁড়া হয়ে ঝুলে থাকবে, কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকবে তার গলায়। মাহমুদকে সে অত সহজে মুক্তি দেবে না। নিজে জ্বলবে তা-ও সই, তবু মাহমুদের নিরাপত্তার উষ্ণতাটুকু বড় প্রিয় তার, ঘৃণা তোলা থাক মাহমুদের জন্য, নিজের জন্যও। সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল, কথাটা এতটা সত্যি হবে তার জীবনে, কে জানত!

সামনের বিল্ডিংটার আড়াল থেকে একফালি চাঁদ কেমন কালচে, কমলা, রহস্যময় মুখ বের করে দেয়। মোনা আস্তে বসে পড়ে আরামকেদারায় হেলান দিয়ে। ফুলনের রেখে যাওয়া বোতলটা সাবধানে খুলে গ্লাসে জল আর হুইস্কি অন্ধকারেই ঢালে আন্দাজমতো। বরফকেস থেকে দু টুকরো বরফ নিয়ে ছেড়ে দেয় উপরে। ফিকে অন্ধকারে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে থাকে ভাসমান টুকরো দুটোর দিকে। সাদা টুকরো দুটো জলে আধেক শরীর ডুবিয়ে ভাসে। ছোট হতে হতে মিলিয়ে যায় ধীরে। মিশে যায় জলের সাথে, কোনো চিহ্ন না রেখে। মোনা আয়েশি চুমুকে টেনে নেয় ঠাণ্ডা, সামান্য তিতকুটে খানিকটা হুইস্কি। একটু ঠাণ্ডা, সাথে খুসখুসে কাশি। হুইস্কিটা কাজে দেবে এসময়।

কয়েল জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে ফুলন। তবু মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ লাগে। বিদ্যুৎ আসলেই নেটে বসতে হবে। অনেকগুলো কাজ জমে গেছে অফিসের। নারীদিবস উপলক্ষে বিশেষ সেমিনার আছে অফিসে। সেমিনার পেপারটা রেডি করতে হবে। কীভাবে করবে ভাবছিল আনমনে, এমন সময় নিচে, গাড়ির আওয়াজ আসে। গ্যারেজে গাড়ি তুলছে কেউ। তিনতলার বউটার চাপা কান্না থেমে গেছে। তার মদ্যপ স্বামী সম্ভবত ঘুমিয়েছে, উঁচু স্বরে নাকডাকার আওয়াজ আসছে। লাগোয়া বিল্ডিং, বারান্দায় বসলে টুকরো কথা, সামান্য শব্দও শোনা যায়। নিচে, একতলা মেসবাড়িটার মোম নিভে গেছে। অন্ধকারে গুলতানি মারছে ছেলেগুলো। সারাদিন কাজ সেরে সন্ধ্যেয় ঘরে ফিরে অনেক রাত অব্দি আড্ডা দেয় তারা ছুটির আগের দিনের রাতগুলোতে। আজও তেমন। অন্যমনে ওদিকে একটু তাকিয়ে থাকে মোনা। ছেলেটা ছাদে ওঠে নি আজ। কেন? বেশিরভাগ দিনই রাতে অন্তত একবার হলেও ছাদে ওঠে ছেলেটা। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে এদিকে। কী দেখে কে জানে! মোনার মনের মধ্যে কেমন একটা ভাললাগার কষ্ট কিলবিল করে ওঠে তখন। বহু বছর আগের একটা ছাদ মনে পড়ে, অনেকগুলো বিকেল ফুটে ওঠে ফুল হয়ে, অনেকগুলো রাত। এমন অন্ধকার, ফিকে জোছনা রাতে ছাদে জানালায় রহস্যমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত কিশোরী মোনা। উল্টো দিকের একতলা বাড়িটার জানালায়, কখনওবা ছাদে, ছেলেটাও দাঁড়িয়ে থাকত ছায়ামূর্তি হয়ে। অন্ধকারে, কেউই স্পষ্ট দেখতে পেত না কাউকে। তবু কত কী যে দেখা হত! নীরবে বলা হতো কত না বলা কথা। সময়গুলো চলে যায়। তবু বুকের মধ্যে কেমন হিংস্র আঁচড় বসিয়ে যায় যে! মোছে না আঁচড়ের দাগ। ঘোঁচে না বেদনার ক্ষত। বাবা কত যে ভালবাসতেন তাকে! মা-ও! তবু তারা একবারও জানতে চান নি কী চায় মোনা, কীসে তার সুখ। বিসিএস ক্যাডার মাহমুদ সুপাত্র। তাতেই মোনার সুখ, নিশ্চিত ধরে নিয়েছিলেন তারা। মোনা কোনোদিন অভিযোগ করে নি। অভিমান, ক্ষোভ, রাগ, ঘৃণা সব নিজের মধ্যে রেখে সে চোখ বুঁজে মেনে নিয়েছিল মাহমুদকে। বাবা-মা পরে কি বুঝেছিলেন তাদের ভুল? মোনা জানে না। জানতে চায়ও নি কোনোদিন। যে বাবা-মা নিজের সন্তানকে বলি দিয়ে দেন সুপাত্রের লোভের বেদীতে, সে বাবা-মা’র ভালবাসায় আস্থা নেই তার। আস্থা নিজের ওপরেও নেই। আস্থার ভিতটা মজবুত হতে দেন নি বাবা-মা। লতাগাছ লাগিয়েছিলেন তারা, টবে। শেকড় বাড়তে দেন নি, সূর্যালোক পড়তে দেন নি। ফ্যাকাসে লতা মহীরুহ চিনবার আগেই মাহমুদ নামক বৃক্ষ(?) যোগাড় করে তাতে পেঁচিয়ে দিয়েছিলেন লতাকে, মোনাকে। মোনার বিবর্ণ, মরে যাওয়া মনে আর রোদ পড়ে নি কোনোদিন। বেড়ে ওঠে নি আস্থার, আত্মবিশ্বাসের সবুজ ডগা। তবু সে কৃতজ্ঞ। মাহমুদের কাছে। মাহমুদ নিজের স্ট্যাটাস ঠিক রাখতেই পড়াশোনাটা চালিয়ে নিতে উৎসাহ দিয়েছিল মোনাকে, সাহায্য করেছিল চাকরি পেতেও। কিংবা, সে সত্যিই চেয়েছিল মোনা স্বনির্ভতার স্বাদটুকু পাক। মোনা স্বনির্ভর! কিন্তু ভিতটা কেন এত নড়বড়ে তার! মাহমুদের স্ত্রী-পুত্রময় সুখী সংসারে সে কেন এখনও আটকে থাকতে চায়! তারচে’ ফুলন শক্ত। নিজেই গাছ সে। বৃক্ষ।

অফিসের একটা প্রোগ্রাম ছিল সেদিন। শহর থেকে বহুদূরে। গ্রামে। তৃণমূল নারীদের সবিশেষ অবস্থা তুলে ধরাই উদ্দেশ্য ছিল। মোনা মোটিভেশনাল বক্তব্য দিচ্ছিল। জ্বালাময়ী বক্তৃতায় ফুলে উঠছিল তার কণ্ঠার শিরা-উপশিরা, উপস্থিত নিপীড়িত, নির্যাতিত নারীদের চোখে জ্বলে উঠছিল আলো, দ্রোহের, প্রতিরোধের!

-জেগে ওঠ নারী! গড়ে তোলো প্রতিরোধ! গেঁথে নাও মনে, মননে- মানুষ তুমি আগে, নারী তারপরে। লৈঙ্গিক বৈষম্য ছুঁড়ে ফেলো, মাত্র একটা ক্রোমোজমের যে ব্যবধান, তাতে কেউ তোমাকে শাসন করার ক্ষমতা রাখে না! এ বিশ্ব তোমার! পুরুষ বা নারী নয়, মানুষ গড়ে তোলো, হয়ে ওঠ মানবিক মানুষ!

অনেকগুলো মুগ্ধ চোখ ঘুরছিল মোনার লাল হয়ে ওঠা, ঘামজমা মুখে। জ্বলে উঠছিল ফ্লাসলাইট। গ্রামের খেটে খাওয়া নির্যাতিত নারীদের চোখে মোনা তখন ঈশ্বরী, দেবী। তার ফর্সা, রঙকরা মুখ তখন মুক্তির বাণীতে ঝলমল। ঝুলনও সেখানে ছিল। প্রোগ্রাম সেরে যখন গাড়িতে ওঠার তোড়জোড় চলছিল, ক্লান্ত, অবসন্ন মোনা তখন স্টেজ থেকে নেমে একপাশে বসে মোবাইল টিপছিল। মাহমুদ দু দিন হলো ফোন রিসিভ করে না, ফোনও দেয় না। দিন দুয়েক আগে মিটিং চলাকালে ফোন দিয়েছিল মাহমুদ। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নি মোনা। সম্ভব হয় নি। মিটিং শেষে তাকে ফোন দিয়ে, মিটিং এ ছিল, এটুকু বোঝাতেই গলদঘর্ম হতে হলো। মাহমুদ কিছুতেই বিশ্বাস করে নি। তাকে বোঝাতে ফোনে প্রায় কাকুতি-মিনতিরত মোনাকে দেখে তখন কে বলবে এই একটু আগেই তার কথায় উজ্জীবিত হয়েছে এক ঘরভর্তি নিপীড়িত, নির্যাতিত মেয়ে! সে এই একটু আগেই দেবী ছিল তাদের চোখে, ছিল স্বপ্ন ফেরি করা এক স্বর্গদূত! এখন যদি মেয়েগুলো দেখত তাকে, কতটা হতাশ হতো তারা? কতটা স্বপ্নভাঙার কষ্ট পুড়িয়ে দিত তাদের সরল বিশ্বাস? আপন মনেই ভাবছিল মোনা। মুখোশ-মানুষগুলোর মুখোশ বড় অশোভনভাবে খুলে পড়ে মাঝে-মাঝে। কেউ কেউ তা দেখে মজা পায়। যেমন তার বস। ইফতেখার আহমেদ। ফোনে যখন কথা বলছিল মোনা, তিনি তখন পাশে বসে মুচকি হাসছিলেন। ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি। মোনার ফোন শেষ হতেই ফোনে স্ত্রীকে নির্দেশ দিলেন রাতে বাসায় ফিরে কী কী খাবেন তিনি সে-সব রান্নার। অথচ, তার স্ত্রীটি তারচে’ ঢের বেশি ভাল চাকরি করছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে! গা জ্বলে গেল মোনার। মুখ বুজে সে সহ্য করল অপমানটা। চুপ করে অন্যমনস্ক হবার ভান করল অগত্যা।

মাহমুদ এখন আর চায় না মোনা এমন হুটহাট ট্যুরে যাক, দেশের ভেতরে বা বাইরে। কিন্তু কেন? সে নিজে সন্তানের দোহাই দিয়ে ডেইজিকে বিয়ে করে ঘরে তুলেছে, মোনার চোখের সামনেই সংসার করছে জমিয়ে। তাহলে কেন মোনার সামান্য এই চাকরিটা নিয়ে এত আপত্তি তার? সন্দেহ? অবিশ্বাস? কিন্তু কিসের? যে নিজে বহুগামী, সে কেন বাধা দিতে চায় মোনার স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকারটুকুতেও? একটি মাত্র ক্রোমোজমের বাহাদুরী! হাহাহা! পাগলের মতো শব্দ করে হেসে ওঠে মোনা। আর তখনই কণ্ঠটা কানে আসে। কুণ্ঠিত, দ্বিধাগ্রস্ত একটি নারীকণ্ঠ বেজে ওঠে সুরে।

– ম্যাডাম, ইকটু কতা কবের চাচ্চিলাম!

ছায়ানামা বিকেলের আড়াল ভেঙে সামনে এসে দাঁড়ায় মেয়েটি। মোনা দেখে। ত্রিশের বেশি নয়। পেটানো শরীর। খাড়া নাক। শ্যামা। চোখ মুখে লেগে থাকা কাঠিন্য নজরে পড়ে প্রথমেই। মোনা নড়েচড়ে বসে। এ নতুন নয়। অনেকেই আসে। কথাও বলে। চটকে সবাই ভোলে। ভেতরে চোখ পড়ে খুব কম মানুষের।

কী কথা? কে তুমি? স্তিমিত, নিরুত্তাপ কণ্ঠ মোনার।

– আমাক এটা কাম দেবেন ম্যাডাম? আমার এটা কাম দরকার। আপনের কতাগুনু খুপ বালো লাগেচে। আমার জবর বিপদ আপা। দেন না এটা কাম!

মোনা বিরক্ত হয়। এই এক বিপদ। গ্রামের দিকে প্রোগ্রামে এলেই এমন বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। মানুষগুলো বড় সরল। বোকা।

কী বিপদ? কী হয়েছে? শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন করে মোনা। উত্তর আশা করে না, প্রয়োজনও নেই। কিন্তু মেয়েটা মোনার শীতল ব্যবহারে দমে না। স্টেজে মোনার দ্রোহজাগানো বাক্যরাশিতে তখনও উজ্জীবিত, উদ্দীপ্ত সে। মেয়েটা এগিয়ে আসে আরেকটু। কণ্ঠ নামিয়ে বলে, আপা, আমার নাম ফুলন। আমার খুপ বিপদ। এটা কাম দেবেন আমাক? আপনের সাতে নেবেন আমাক?

এবার একটু মন দিয়ে দেখে মোনা মেয়েটাকে। কী ভেবে বলে, কী কাজ করবে তুমি? কী ধরনের কাজ চাও?

আমি বাসাবাড়ির কাম করবের পারবনে আপা। আপনের সাতে আমাক নেন। আপনের বাসার সপ কাম আমি করবনে।

একটু ভাবে মোনা। একটু হিসেব করে। তারপর বলে, আজ যেতে পারবে? এখন? আমার বাসায় থাকবে, আমার সাথে।

সাথে সাথেই রাজি হয়ে যায় ফুলন। গাড়িতে ফুলনকে পাশে বসিয়ে তার কথা শোনে মোনা। একই গল্প। নতুনত্ব কিছু নেই। অশিক্ষিত, গরীব মেয়ে। অল্পবয়সে বিয়ে। সন্তান। স্বামীর অত্যাচার। যৌতুক চাই তার। ফুলন বাপের বাড়িতে ফিরতে চেয়ে ঠাঁই মেলে নি। বাপ, মা, ভাই, কেউ ফিরিয়ে নেবে না তাকে। বিয়ে দিয়েছে, দায় শেষ। লতা জড়িয়ে দিয়েছে বৃক্ষে। বৃক্ষ করুক যা খুশি। লতার দায়িত্ব তাকে জড়িয়ে রাখা। ওটাই নিয়তি। ফুলন নিয়তি মানে নি। সন্তানকে নিঃসন্তান এক দম্পতির জিম্মায় রেখে বেরিয়ে পড়েছে পথে। হাওয়া নেবে, জল। গাছ হবে, বৃক্ষ। নিজেই সে ছায়া হবে সন্তানের, অন্যের। অনেক হয়েছে, আর নয়। ফুলনের পাশে বসে নিজের ভেতর তীব্র ভাঙন কি টের পায় মোনা? বুকের মধ্যে ফেনিয়ে ওঠে কি ঘৃণার ঢেউ, আছড়ে পড়ে নিজেরই ওপর! ফুলন অশিক্ষিত। কোনো শিক্ষা নেই তার, নেই কোনো উচ্চতর বোধ। তবু নিজের প্রতি যে আত্মবিশ্বাস আছে তার, আছে যে আত্মসম্মানবোধ, মোনার নিজের মধ্যে তা কোথায়! স্বামীর লাথি-ঝাঁটাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, তার নিরাপত্তার উষ্ণতাটুকু অগ্রাহ্য করার যে সাহস ফুলন দেখিয়েছে তা মোনার কেন নেই? মোটিভেশনাল স্পিচ যদি কারও দেওয়ার অধিকার থাকে, তবে তা ফুলনেরই থাকা উচিত, মোনাকে দেওয়ার! ফুলনের পাশে বসে মনে মনে কুঁকড়ে যায় মোনা। ফুলন যখন বুঝে যাবে মোনার ভেতরটা আসলে ফাঁপা, অন্তঃসারশূন্য এক মেকি মানুষ সে, মেয়েটা সেদিন কী বলবে কে জানে!

বিদ্যুৎ আসে। বেডসুইচ জ্বেলে বিছানায় ল্যাপটপ নিয়ে বসে যায় মোনা। সেমিনার পেপারটা রেডি করতে হবে। মোটিভেশনার স্পিচ রাখতে হবে। নারীদিবসে সচেতন করতে হবে সব শ্রেণির মানুষকে।

লতা নয় বৃক্ষ হতে হবে নারী! ছড়িয়ে দাও এ মন্ত্র সবার ঘরে। প্রতিরোধ শুরু কর নিজের ঘরে। নিজের মনে আলো জ্বেলে নাও আগে, ছড়িয়ে দাও সে আলোকশিখা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে!

–লাইন কটা লিখে ভারি চা-তেষ্টা পায় মোনার। ফুলন ঘুমিয়েছে। তাকে কি ডাকবে মোনা? পায়ে পায়ে ফুলনের রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। আধভেজানো দরজার ওপাশ থেকে ফুলনের মৃদু নাকডাকার আওয়াজ আসে। সরে দাঁড়ায় মোনা। সন্তর্পণে, পা টিপে কিচেনে ঢোকে। ফুলন ঘুমুচ্ছে। ঘুমোক মেয়েটা। কিছু বৃক্ষ বেড়ে উঠুক অগোচরে। একদিন ফুল, ফলে বেড়ে উঠবে পৃথিবী আবার। শেষ হবে মোনাদের কচুরীপানার জলজ জীবন। চাপা কান্না নয়, উচ্ছ্বল হাসিতে ভরে উঠবে বাতাসের কান। মোনারা শেকড় ছড়াবে মৃত্তিকার গভীরে। বিদ্বেষ-বৈষম্য নয়, ভালবাসার বৃক্ষে সেদিন মানুষ ফলবে শুধু। একটিমাত্র ক্রোমোজমের ভিন্নতা ছাড়া অধিকারগত সব বৈষম্য দূর হবে।

চায়ের কেটলিতে ফুটতে থাকা বুদ্বুদের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো ভাবতে থাকে মোনা। নিজের ভেতর যে অন্ধকার, সেটা আড়াল ক’রে আলো জ্বালার স্বপ্নে বিভোর হয়। চায়ের কাপ হাতে বেডরুমে এসে বসে আবার। জানালা গ’লে একমুঠো জোছনা তখন ভীষণ কৌতুকে লুটিয়ে পড়ে মোনার প্রায়ান্ধকার বিছানায়। মোনার মুখোশটা সরিয়ে দিতেই হয়তো, ফর্সা মুখে লাফিয়ে পড়ে ছোট্ট একটুকরো জোছনা। জেগে ওঠে মুখোশের আড়ালে অসহায় এক নারীর মুখ। জলভেজা, ফ্যাকাশে। সূর্যালোক পড়ে নি তাতে কোনোদিন। সে মুখে সূর্যের তৃষ্ণা, আলোর অতৃপ্তি…

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close