Home কবিতা শুভাশিস সিনহা / ১০টি নতুন কবিতা ও কবিতাভাবনা এবং আঞ্জুমানআরা আনছারীর পাঠ-প্রতিক্রিয়া
0

শুভাশিস সিনহা / ১০টি নতুন কবিতা ও কবিতাভাবনা এবং আঞ্জুমানআরা আনছারীর পাঠ-প্রতিক্রিয়া

প্রকাশঃ December 10, 2016

শুভাশিস সিনহা / ১০টি নতুন কবিতা ও কবিতাভাবনা এবং আঞ্জুমানআরা আনছারীর পাঠ-প্রতিক্রিয়া
0
0

শুভাশিস সিনহা / ১০টি নতুন কবিতা

তরী
এই ঢেউগুলো শব্দময়, ধ্বনিতে ধ্বনিতে বাঁধে জোট, তুমি
গ্রন্থি খুলে বেঁধে নিও তরী, জলের ফণায় নাচ, রুপা-রুপা
ঝিলিক-রূপসী বৈঠাঁচড়ে কেবলি গোঙায়, শোনা যাবে রাতে
যখন নিরালা সমুদ্রের থেকে মুছে যাবে রব, ডুবুরির
নাকে মুখে ঢুকে যাওয়া অতল মুক্তোর দানা, অধীর আহ্লাদ
কার কাছে খুঁজে মরো ঠাঁই-হীনা কালের সাম্পান জলভারা
কেটেছে নিষ্ঠুর বেডে পরশনসুতো, হাতে যত যদি ছেদ
কিলবিল করে, ভাষা দিগন্তবিস্তৃত কারাগারে ধুঁকে মরে

ঢেউ তবু শব্দে জাগে অচল জলের পিঠে তাথই তাথই
বৈঠা তাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ফেরে অতলান্ত বেদনার গতি ছেনে
ত্রাসের ছুরিতে, মরো বেপথু নাবিক, নাভিতে নোঙর ফেলে
দরিয়ার, দুগ্ধহীনা মাতৃরূপিনীরা সাদা পাল তুলে দিল
অসহ নৌকায়, হাড়-পাঁজরে তৈয়ার, তার বান্ধনে প্রণয়
উড়ে যাচ্ছে, ভেসে যাচ্ছে, ঢেউয়ে ঢেউয়ে জেগে উঠছে ভাষা, নিরাকার

ডুবিনী
যদি তুমি জলে ডুবো, এত যে হাওয়ার গান বেজেছে পরানে
সুরের কুমার কাঁদে অট্টালিকা ‘পরে, নিচে আহত পথিক
ফিরে চায়, ঘাসের ওপরে ধূলি, পদছাপ, সুবজ স্খলন
কতো আয়োজন, হল্লা করে মরে মরে বাঁচা, কে তার রচিবে
লীলানাট, কার কন্ঠে দেহভঙ্গিমায় পাবে রূপ রূপকথা
এখনো রক্তের স্রোতে ভেসে চলে অবিরাম বাসনাকুসুম
পাপড়িবিছানো ক্লেদমজ্জায়, চেতনে, অবচেতনার খেদে
নিও না নিও না শত অনুনয়, অশ্রুভার, কাঙাল রাত্তির

যদি তুমি ডুবে যাও, ভাসাবে স্বপনপদ্ম কোন জলাধারে
দীঘিনদীহাওড়সাগর চুপচাপ, একা মৈথুন বিভোর
তোমারই তরলে কিবা গরলে ডুবেছে প্রেম আকাঙ্ক্ষা শরীর
হৃদয়রতন ঘাটে ঠেকেছে রাঙিলা পায়ে, তোমার সতীন
কানা কলসি কোমরে নিয়ে নিত্য ফেরে ঘাটে ঘাট, তুমি শুধু
জ্বালিয়ে মারবে বলে হিংসাগুনে, এত কিছু, ডোবোনাকো, ভাসো!

যাত্রা
ভোর হলো, নামো অবসাদ, ঘুমের শ্যাওলা মুছে, ঘোরে লাল
রোদ, ছায়া বোনে ছলনায় দূরে গাছের তলায় যেন তুমি
ধীরে যাবে বগলে লুকিয়ে ঘাম, বুকে তাপ, বিছাবে শয়ন
তোমার প্রাণের জন এসে পিঠে রেখে হাত দোলাবে খোয়াব
গহননয়নে, তুমি আলগোছে প’লে প’লে জড়াবে, ছড়াবে
আকুল ব্যাকুল পরশন, নিদানের হিম-চুমু গ’লে পাওয়া
মধু, ওমশ্বাস, জাগর নিশীথ, চাঁদোয়া আকাশ, মেঘমায়া
হারানো রঙিন অভিমান, রঙচটা ঠোঁট, পুরনো আঁচিল

নাই হলো পরিণয়, অগণন প্রজনন, খোঁজা হয়ে দিন
গুজরান, আলুথালু পুরুষাপুরুষ রমণী অ-রমণীয়
সংবেদনের ঘোর, তবু হলো ভোর, ছুঁয়ে যাবে রোদ
শীতল চেতনা, রাতে খেয়ে গেছে কালচাঁদ, বুকে ক্ষত এঁকে
কলংক রটিয়ে গোপন, নখে নখে শত বানানো জবাব
অবসাদ, দেহ থেকে নাভি থেকে যোনি থেকে প্রকাশো প্রসারো…

শঙ্খিনী
ছিলে কৃষ্ণগহ্বরে, শঙ্খিনীর নাচ দেখে এলে, ভাসে গান
তাও ধরে বাহুতে বলেছ ফেরো, আমি আছি, যতেক প্রভেদ
কেটে কুটে ছোট্ট করি, আহা রে গণিত, শেখো, ম ম কলতান
কেবলি কুহরে ঢুকে স্নায়ুসখাদের ধরে হাত, পালিয়েছ
এ বনে নিরন্ন বাঘ, হরিণীরা লোলুপের ধোঁয়াশাদর্পণ
ভেঙেচুরে সিথিঁ কাটে শূন্যপথ, পায়ে বনান্তের শেষ
রেখা পাড়ি দিয়ে, তীরে বেঁধা যৌবনের সব শাঁস, হাড্ডিমাঁস
আঙুলে কব্জিতে লেগে যাওয়া, ঘোরে, দেখো নতমুখ শিকারিরা

ছিলে তীরবিদ্ধ হতচকিতের শিহরণে, এলে সোজা পায়ে
দাঁড়ালে স্পর্ধার উঁচু চূড়া ছুঁয়ে, একা, কেউ নেবে স্পৃহা, কেউ
আকাক্সক্ষার শুভ্র বকুলের দল, পায়রার উড়ান, সাধঘূর্ণি
কেবলি আহ্লাদে পাওয়া বিষাক্ত দুধের ধার, ক্ষতনীল স্তন
আঙুলের ডগা থেকে বিচ্ছুৃারিত বারুদ, আগ্রাসনের হাসি
তোমাকে দোলাবে শূন্যে, রঞ্জনে ও নিরজনে, শঙ্খউড্ডয়নে।

বন
ভেবেছি বনের মাঝখানে গাছ হয়ে ছলে ভানে ঝড়ে জলে
শীতল-শীতল শিহরণে নিজের ভেতর থেকে কোনো এক
পরশন টের পাওয়া যাবে, ছুঁতে গিয়ে আঙুলে অনুভূতির
মরা-ভাষা পাঠে ভুল করে ভয়ে-ডরে পালানোর প্রেমরাত
ভরিয়ে রেখেছে দেহ, মনের কোটরে পুরে রাখা পাখি, গান
শেখে নি কখনো, শুধু সুর পেলে বাতাসে বাতাসে ঠোঁটে তার
যাতনার শিস, পাখায় পাখায় মেলে দেয়া রোদ, দিন শেষে
নাছোড় স্মৃতির মতো লেগে থাকে, টেনে তোলো, যেয়ো না অতলে

ভেবেছি বনের মাঝে ভালো থাকে মন, গাছ হয়ে, পাতাগুলো
আলগোছে ঝরে যাওয়া দিন-আয়ু-ভোলানো চোখের পানি, তবু
ফিরে ফিরে আসে শিকারি, দাপটে গুলি ছোড়ে, ভ’রে বোবারাত
নিনাদে নিনাদ, নূপুর পায়ের থেকে খসে গেলে কার নাচ
থেমে থাকে বাসনার পলকে পলকে, হাতে সব ধ’রে আসে
ছায়া রোদ সবুজ রুপালি মায়া, রাঙা মুখ, নভোনীল প্রেম।

পলাতকা
কুসুম তুমি খোলস ভেঙে
বেরিয়ে এলে তবে
উঠব মেতে রক্তে রঙে
ঘ্রাণের উৎসবে।

গন্ধবতী বাতাস সখি
শ্বাসের দোর খুলে
পালিয়ে যাবে ধ্বনিতে তালে
মাত্রা-লয়ে ভুলে।

এখন ঘন কৃষ্ণকায়
আকাশ বিবসন,
মেঠেল দুধ, ক্লেদজ ফল
অম্ল পরশন।

কুসুম তবু বাকল ছিঁড়ে
অকস্মাৎ এসে
ছিন্নমূল পত্রে ওড়ো
বাওকুড়ানি দেশে।

নবান্ন
একটু নিদান র’য়ে যাবে বলে এই নবান্ন
কাস্তের দাঁতে ভুলে গিয়েছিল জোছনা ছড়াতে,
পলির ভেতর কাঁকড়াটিকেও পুষে রেখেছিল
ঝিনুকভোলানো ঘাটে রাত্তিরে কলসি ভরাতে।

কলসি দোলানো কোমরে একটি রূপার ঝিলিক
খই হয়ে ফোটা তাওয়ায় তাওয়ায় ভাঙা সংসার,
এখানে নৃত্য ওখানে পাঁচালি, শ্রুতি-উন্মুখ
এক বসন্ত বৃন্তচ্যুত একেলা দোহার।

একটি শালিক খুটে গিয়েছিল রক্তাভ ধান
অস্তের পাড়ে বুনে দেয় ঠোঁটে ভুল আস্বাদ,
হাতে হাত রাখা অন্তরঙ্গ বিচ্ছেদকাল
কুহেলি-মাতানো পাড়ায় পাড়ায় শ্লেষ, অপবাদ।

একটু নিদান, সামান্য আড়ি, কপালের ভাঁজ
চোখের তারায় দুইটি উনুন তবুও জ্বলছে,
এই নবান্ন হাঁড়িতে হাঁড়িতে বর্ষামাতম
হাওয়ায় হাওয়ায় শস্যকুমারী পদ্য বলছে।

শ্লোক
এ নীল চেয়েছিল আকাশ-ক্যানভাস
হৃদয় তুলি হোক তবে,
জংলা অরণ্য বাঁধুক কেশপাশ
জলজ নিশি-উৎসবে।

এত যে বিপন্ন দেখা ও আনদেখা
মধ্যিখানে ঘন মেঘ,
ইশারা-নঞর্থ আলতো হাওয়ারেখা
তোমার ছল-উদ্বেগ।

রাস্তা ভাঙাচোরা, দু’পাশে মায়াবীথি
সিঁদুরে রাঙা সিঁথি নারী,
গোধূলি সায়াহ্ন রক্তলাল তিথি
আয়ুতে এলো-আহাজারি।

এ কাল ক্ষয়িষ্ণু ন্যুব্জ মোমশিখা
হাতের তালুপোড়া রাত,
স্বেচ্ছা-পরাজিত হাস্য-জয়টিকা
না-মানা শ্লোকে প্রণিপাত।

ফেরারি
আকাশে কিছু মেঘ রঙে ও নকশায়
তবুও ছায়া বোনে দেখি,
ফেরারি পথিকের ঠিকানা থেমে যায়
সহসা বসে পড়ে একি!

সহসা সে-পথিক ঘরের পথ ভুলে
মেঘের মুখ দ্যাখে ঘোরে,
কেন যে হাওয়া বয়, কেন যে দুটো পাতা
ঝরেছে ভাষাহীন সুরে।

বেজেছে সঙ্গীত পাতার সেতারেই
শোনে কি কান পতে শোনে না,
আকাশে তবু মেঘ রঙে ও নকশায়
বোনে কি গাঢ় ছায়া বোনে না।

তাতে কি আসে যায় ফেরারি পথিকের
প্রতীকী এইসব অজানা,
সে শুধু জেনে নেয় ঘরের পথ দূরে
এখনো মনে তার দোটানা।

পদাবলী
এ কী হলো আজ সই গো আমার
আনমুখ দর্পণে,
হৃৎধাওন্ত পাগলা ঘোড়ার
পশমের পরশনে।

জলের কম্প্রভাষার আদরে
প্রেমশিশু এক কাঁদে,
আমি সই ভুলি দ্বারখানা খুলি
মাতব বিসম্বাদে।

নয়নে আমার উন্নয়নার
দৃষ্টির চোরাচুরি,
দৃশ্যবাজারে পলক বিকোই
নাকছাবি দুল চূড়ি।

এ কী হলো আজ চরণে আমার
রক্তকুসুমরেখা,
জনমকাননকুঞ্জ ভোলানো
মরণমধুপ একা।

শুভাশিস সিনহা / কবিতাভাবনা

“It was at that age that came in search of me.” PABLO NERUDA

পাবলো নেরুদা বলেছিলেন। আসলেই। কবিতাই তো আমাকে খুঁজে নিয়েছে! আর কবিতা যখন আপনাকে লিখতে শুরু করবে, তখন আপনি চাইলেও না চাইলেও কবিতার এই তৎপরতা চলবে। কিন্তু এই ভূত বা এই দৈব কী করে একদিন আপনার ওপর ভর করল, তার কারণ সূত্র নির্ণয় করা বোধ হয় কঠিনই।
আাইনস্টাইন তো বলেই দিয়েছেন, মানুষের ব্রেইনের কোনো কোনো জায়গায় তার প্রবণতা বা ক্রিয়েটিভ একটিভিটির ইশারা থাকে। এখন থাকলেই তো হয় না। তাকে সেই কারবার ঠিকমতো করাবার জন্য পরিবেশ তৈরি করতে হয় এবং পেতেও হয়। নিজেকেও উজাড় করে দিতে হয়। জীবনে হাতছানির তো অভাব নেই। এই রঙের দুনিয়ায় সাদা-কালোর কবিতার সংসারে যে ঘর করবে, সেই ঘরের সুখ তারই মিলবে। নইলে কবিতা তাকে ফাঁকি দেবে, তাকে গাইতে হবে, ‘সই কেমনে ধরিব হিয়া, আমার বধুয়া আনবাড়ি যায় আমারই আঙিনা দিয়া।’
কবিতা, আমি আমার মতো করে লিখি, অন্যরা তাদের মতো করে লেখেন। এটুকু বলতে পারি, আমি আমার দৃশ্যমান চলমান ঘটমান ছোট পরিপার্শ্বে, একদমই নিজের ইন্দ্রিয়ের চারপাশের এলাকায় চোখ রাখি। সেখান থেকে কল্পনা করি আর মাটির ওপর দাঁড়াই। আকাশ মাটি জল হাওয়া ছাড়া মানুষের আর কী আছে? এই এতটুকুতে একের পর এক কল্পনা বিস্তার করে যাওয়ায় আমার ক্লান্তি নেই। নিজের চেনা জগৎটাকেই বারবার ভালোবেসে নতুন নতুন করে দেখি।
কবির নিজের আবেগের একটা শুদ্ধতা আর সততার বোধ হয় দরকার আছে। নেরুদা যেমন বলেছিলেন, ‘তুমি আমার কবিতার কী বুঝবে, যদি তুমি আমার রক্তের স্বাদ না পাও!’
কবি তার কবিতাটাই লেখে। এটা মহা কোনো কর্ম নয়। অন্য অনেকে অনেক কিছু করে, সে কবিতা লেখে। এটা নিয়ে সে তো রাজনীতি করবে না, ইলেকশনেও দাঁড়াবে না। সুতরাং পাঠকের এত পছন্দের হওয়ার লোভ তার থাকার কথা নয়।
সুতরাং নিজের মতো করে তার ভেতর বাহিরের জগৎটাকে সুন্দর করে, আদরে, মমতায় লিখে যাওয়াটাই শেষ কথা।
আমিও কবিতায় তা-ই করে যাই। নিজের চেনা জগৎটাকেই বারবার ভালোবেসে নতুন নতুন করে দেখি।
শুভাশিস সিনহার কবিতা / আঞ্জুমানআরা আনছারীর পাঠ-প্রতিক্রিয়া
অনুভূতি, বোধ ও শব্দের সম্মিলনে সৃষ্টি হয় কবিতা। কবি শুভাশিস সিনহার কবিতায় যেমন পাই একান্ত অনুভূতি, সমকালীন সমাজ ও জীবনের ছবি, তেমনি পাই এক সুনিপুণ শিল্পীকে- যিনি শুধু কবিতা শোনান না, কবিতাকে করে তোলেন শিল্পরূপময়। কবি যেন তাঁর অন্তরের অনুভূতিগুলোকে নানা কোণ থেকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখছেন। তবে এই দেখার একটা বিশেষত্ব হলো- কথাগুলো কেবল নিজের হয়েই থাকেনি, এর সাথে গেঁথে দিয়েছেন মানবিক অনুষঙ্গকে। ‘তরী’ কবিতায় কবি যেন সমকালের শোষণ-বঞ্চনার গ্রন্থি খুলে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
সমকালীন সমাজের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক সংকট, মূল্যবোধের অবক্ষয়, অস্থিতিশীলতা তাঁকে যেন স্তব্ধ করে দিয়েছে। তাঁর ভাষা তখন ‘দিগন্তবিস্তৃত কারাগারে ধুঁকে মরে।’ ‘হাড়-পাঁজরে’র তৈরি নৌকায় করে কবি যেন তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে যাত্রা করতে চান। জীর্ণ, ক্লেদাক্ত সময়খণ্ডে দাঁড়িয়েও তিনি স্বপ্ন দেখেন সুন্দর পৃথিবীর। তাঁর কণ্ঠে তাই বেজে ওঠে আশার বাণী- ‘এখনো রক্তের স্রোতে ভেসে চলে অবিরাম বাসনাকুসুম/ পাপড়ি বিছানো ক্লেদমজ্জায়’ (ডুবিনী)।
কবি বলতে চেয়েছেন, আত্মমৈথুনে বিভোর হয়ে যেমন প্রকৃত সুখ পাওয়া যায় না তেমনি স্বেচ্ছাচার করে উন্নয়নের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করা যায় না। আবার ‘যাত্রা’ কবিতায় কবি বোঝাতে চান যে পরিণয়হীন সম্পর্কের ফসল কখনো উর্বর হতে পারে না। তাই সেখানে দিনগুজরান হয়ে ওঠে খোজা, অনুর্বর অর্থাৎ সেখানে উন্নয়ন অসম্ভব। ‘ফেরারি’ কবিতায় কবি দিগ্ভ্রান্ত পথিকের মধ্য দিয়ে যেন দেশ ও জাতির কর্ণধারের দিশেহারা রূপটি এঁকেছেন। এখানে যাত্রাপথে আকাশে মেঘ দেখে পথিক থেমে যায়। ঘরের পথ তার অনেক দূরে, সেখানে ফিরবে কিনা, এই দোটানা তৈরি হয় তার মনে। কবি এই পথিকের মধ্য দিয়ে যেন দেখাতে চান- সমাজের কর্ণধারেরা অস্থিতিশীল এই অবক্ষয় দেখে দ্বিধাগ্রস্ত, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে যেতে পারবেন বলে সংশয়কাতর। একইভাবে ‘শ্লোক’ কবিতায়ও কবি বিপন্ন, বিপর্যস্ত, ক্ষয়িষ্ণু সমাজের চিত্র এঁকেছেন। কবি আক্ষেপের সুরে বলেন- ‘এ কাল ক্ষয়িষ্ণু ন্যুব্জ মোমশিখা/ হাতের তালুপোড়া রাত,/ স্বেচ্ছা-পরাজিত হাস্য-জয়টিকা/ না-মানা শ্লোকে প্রণিপাত।’ ‘শঙ্খিনী’ কবিতায় তিনি দেখিয়েছেন আগ্রাসনের ভয়াল থাবা কীভাবে সভ্যতাকে শূন্যে ঝুলিয়ে রাখে। প্রকৃতির সবুজ কান্তি মানুষের মনে শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। বনের ভিতরের অনাবিল শান্ত-সমাহিত রূপ দেখে সুভাশিস বলে ওঠেন- ‘ভেবেছি বনের মাঝে ভালো থাকে মন, গাছ হয়ে, পাতাগুলো/ আলগোছে ঝরে যাওয়া দিন-আয়ু-ভোলানো চোখের পানি।’ কিন্তু এই সৌন্দর্যকে স্থায়ী হতে দেয় না স্বার্থান্বেষী মহলের আগ্রাসী থাবা। শিকারীবেশে তারা বনে প্রবেশ করে- ‘গুলি ছোঁড়ে, ভ’রে বোবারাত নিনাদে নিদান।’
‘পলাতকা’ কবিতার সেই পলাতকা যখন খোলস ভেঙে বেরিয়ে এসেছে তখন কবি তার সাথে ঘ্রাণের উৎসবে মেতে উঠতে চান। উন্মত্ত গন্ধবতী বাতাস তাল-লয় ভুলে যেন শ্বাসের দরজা খুলে পালিয়ে যেতে চায়। এমন সময় সেই পলাতকা শিকড়চ্যূত হয়ে বাওকুড়ানির দেশে উড়ে গেছে। এভাবেই কবি কখনো নিজের অন্তরের কথাকে ভাষারূপ দেন আবার কখনো সমকালীন সমাজের বিচিত্র রূপকে মূর্ত করে তোলেন কবিতার শরীরে। কবিতাগুলো তখনই হয়ে ওঠে ক্রান্তিকালের স্বরলিপি। কোনো সন্দেহ নেই, সহজ-সরল ও গভীর ভাষাভঙ্গি এবং সাবলীল উপস্থাপনা কবিতাগুলোকে করে তুলেছে শিল্পরূপময়। সমকালের কবিতার ভাষায় তিনি কবিতা নির্মাণ করেন। পাঠকের বোধ ও অনুভবকে তাই সহজেই ছুঁয়ে দিতে পারেন তিনি। ব্যক্তিমানসকে অতিক্রম করে কবিতাগুলি হয়ে উঠেছে সর্বজনীন। শুভাশিসের কবিতার এটাই বিশিষ্টতা।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close