Home কবিতা শ্যামল সিংহ > নির্বাচিত গুচ্ছকবিতা >> আলোচনা : মেঘ অদিতি
0

শ্যামল সিংহ > নির্বাচিত গুচ্ছকবিতা >> আলোচনা : মেঘ অদিতি

প্রকাশঃ August 18, 2017

শ্যামল সিংহ > নির্বাচিত গুচ্ছকবিতা >> আলোচনা : মেঘ অদিতি
0
0

শ্যামল সিংহ > গুচ্ছকবিতা 

রেজারেকশন

ভূতের রাতে আপেল জয় করে যুবতীকে

ঈশ্বরের রাতে আপেল জয় করে যুবতীকে

 

ভূত আপেল ও ঈশ্বর

আলো ও জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে

চলে গেছে গাছে

 

যুবতী দেখছে

লাল রুমাল খুলে দিচ্ছে পৃথিবী

যুবতী দেখছে

হলুদ রুমাল পড়ে আছে

যুবতীর

পায়ের কাছে

 

ঘুঙুর

সিংহের পিঠের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঝড়

কবিতায় ঘুরছে মেরি-গো-রাউন্ড

 

কেউ আঁকেনি কলঘর

ঘরের দেওয়ালে মাছ এঁকে

সবাই চলে গেছে

নদীতে সাঁতার কাটতে

 

মাছের বুকের ভেতর থেকে

ঘুঙুর গড়িয়ে পড়ছে

 

ঠিকানাবিহীন চিঠি

গাছ মুছে দিয়েছে

আমার যৌবন

আমি অনেক বছরের পুরনো

ঠিকানাবিহীন এক চিঠি

 

আমার প্রেমিকাকে

আমি বুঝিয়েছিলাম

ইংরেজ কবিরা

চুল ও গোলাপ ফুলের প্রতি

বেশ মনোযোগী

 

পোড়োবাড়ি

কানের পাশে মেঘ ডাকছে

লবণের কাছে ঋণী আছি

 

মনে পড়ছে

স্লেটের দুপারে আত্মীয়স্বজনদের কথা

মাথায় টুপি পরে

কেন লোক এগিয়ে আসছে

আমার দিকে

 

লোকটির পা থেকে ছড়িয়ে পড়ছে

পোড়োবাড়ির গন্ধ

 

দস্তানা

জিভ দিয়ে গাছ চাটে করিডোরের অশ্রু

আপাদমস্তক বৃষ্টিপাতে লাফাতে থাকে

কলম ও তুলো

আমি কিভাবে হেঁটে যাবো জ্যামিতি-বক্সের দিকে

আমাদের জাতীয়সংগীতে ঢুকে গেছে এখন

আততায়ীর দস্তানা

 

চশমা উৎসব

জটিল জলস্রোত খুলে দেখেছি কাব্যগ্রন্থ

ভোজালির পাশে শুয়ে আছে রোদ

আমার রাত পোহালো শারদ-প্রাতে…

বোঝা গেল পাতার স্প্রিং-প্রবণতা

পরদার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে যাবতীয় চশমা

 

আমরা চশমা-উৎসবে যাবো

 

স্বরলিপি

আমার হাতের শেষে গর্ত

আমার পায়ের শেষে গর্ত

 

স্কুলবাড়িতে বরাবরই ছিলো কুয়াশা

কোটের ভেতর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে কোট

আমার ওপরে

 

মাছের কাঁটায় বিঁধে আছে টুথব্রাশ

কফিনের মধ্যে ডুকরে উঠছে স্বরলিপি

 

ঘোড়া সিরিজ-১

ঘোড়া ছুটলেই স্বপ্ন শুরু

ঘোড়া টপকে গেছে স্বপ্ন-১

টপকে গেছে স্বপ্ন-২

স্বপ্ন-৩ য়ে ঘোড়া ঘাস খাচ্ছে

 

বিশাল মাঠে দাঁড়িয়ে আছে

শাদা একলা বাড়ি

ঘোড়া ঘাস ফেলে বাড়ি খাচ্ছে

পরদা জুড়ে নাচছে বৃষ্টির কঙ্কাল

উলের দিকে ছুটে যাচ্ছো তুমি

 

এলোমেলো পংক্তিগুলি সাজাতে সাজাতে উধাও ঘোড়া

 

চড়ুইভাতি

ঘোড়ার পিঠে দুলছে সবুজ বন

আকাশের তারা টিপে টিপে কে নেমে আসছে

 

হাঁস বলছে শুধু গল্পের কথা

মুরগী বলছে যুদ্ধের কথা

 

চাঁদ ফাঁক ক’রে আমরা দেখছি

চড়ুইভাতি আর কতো দূর

 

টুপি

জিভে ছোট হয়ে আসছে দিন

অক্ষরের ফাঁকে খুনির মতো

আমি বসে আছি চুপচাপ

 

সমুদ্রকে সাজাতে হবে ঠিকঠাক

কামরাঙা পার হয়ে গেলে, তিব্বতী ভালোবাসায়

আমরা উড়িয়ে দেবো টুপি

 

ভাঙা

যে কোনো কথাবার্তায় চলে আসে থমথমে কুয়ো

উল্টো ক’রে জামা পরার মতো সব কিছু মনে হয়

মন খারাপ হলে লাট্টুর মতো পাক খেতে খেতে

ফিরে আসে ফাঁকা মাঠ

ঘরের মধ্যে জ্বলছে ধু-ধু রেলস্টেশন

চিরুনির শেষে ভেঙে যাচ্ছে গ্রাম

 

চার্লি

তারপর শুরু হ’ল সেই গল্প

রাতের ঠোঁটে হেঁটে যাচ্ছেন চ্যাপলিন

সিন্দুক থেকে ভেসে আসছে হাততালি

ঘরে নাচছে ফুলদানি

পাতায় পাতায় যতখানি গিয়েছিলাম

ঠিক ততখানি ফিরে এসেছি সুতোয় সুতোয়

 

আলোচনা

সেতুর কাছে আমি রেখেছি পাটিগণিতের প্রস্তাব

পলাশের জটিলতায় খাছি রাস্তার ভুলভাল

দুধের কাছ থেকে মাইল মাইল দূরে আছি

 

পেরেক নিয়ে তো তেমন আলোচনা হল না কোনোদিন

 

লাল অক্ষর

মনে পড়ছে লাল সোয়েটার

 

সোয়েটারের শরীর জুড়ে ছিল

একটি মেয়ের অজস্র লাল চুমু

সোয়েটার উড়তে উড়তে পার হয়ে গেছে

নদী নালা পাহাড় পর্বত

 

হু হু করে শীত বাড়ছে

ভাঙা দাঁতের মতো পড়ে আছে লাল অক্ষর

 

লোকটি

ময়না গড়ছে আয়না

শালিখ আয়না ভাঙছে

 

জাহাজের ছায়ায় ছায়ায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে লোকটি

 

ফৌজিদের জুতো

কান্না থামাতে গিয়ে

খরগোশের মুখ নিয়ে

গল্প লিখছি

তুলার ভিতর থেকে উড়ে যাচ্ছে

মেঘ

মাটি ফেটে বেরিয়ে পড়ছে

ফৌজিদের জুতো

 

রান্নাঘর

উটের পিঠে চেপে এক ভিখারি

রোদ বিলি করে বেড়ায় শহরে

সে কারো কাছে ঋণী নয়

সে আগুনের স্তন পান করে

উপমা হিসেবে ব্যবহার করে মগ্ন কুয়ো

রুটি বেলতে বেলতে যুবতীর হাত থেকে

উড়ে গেছে বেলুনচাকি

 

মিলিটারির মতো মার্চ করতে করতে

পর পর চলে গেছে গ্লাস

আপেলের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ছে বেড়াল

বেড়ালের ছায়ায় ভাসছে রান্নাঘর

 

নেশা

মাঝরাতে লোকটি বাড়ি ফিরলো

তখন আকাশ থেকে মদ পড়ছে

তখন গাছ ফেটে মদ পড়ছে

তখন মাটি ফেটে মদ পড়ছে

দূর থেকে উড়ে এলো কুলো

কুলোয় চেপে উড়ে এলো পরী

লোকটি পরীকে জড়িয়ে ধরলো

পরীর পা ফেটে রক্ত পড়ছে

লোকটি মদের অনুবাদ করলো

রক্ত

 

রক্ত নিয়ে লোকটি ঢুকলো ঘরের ভেতর

 

আলোচনা

মৌনতার ছায়া উজানে : শ্যামল সিংহের কবিতা > মেঘ অদিতি

তখন রাত।

থেকে থেকে বর্ণমালার ঢঙে জোনাকের জ্বলে ওঠা এপাশ ওপাশ। আর অন্ধকারের ভায়োলিনে বেজে চলা গোথিক সুর।

অন্ধকার। জোনাক।

জোনাক। অন্ধকার।

হঠাৎ ঝলকে গেল বিদ্যুৎ। আঁধার চিরে তার রেখায় মিশে থাকল প্রবল হাতছানি।তারপর আবার আঁধার। আবার বিদ্যুৎ। আর হাতছানিগুলোর চক্রাকার ঘূর্ণনে নির্জন বুকের ভেতর ঘন হয়ে আসা অনুভবে ঠিক তখনই, পরপর স্পার্ক।

গল্পটা শুরু হয়ে গেল…

মৌনতার ছায়া উজানে গল্পের ছল ধরে এগিয়ে আসছে কবিতা। হাত ধরাধরি করে ওদের হেঁটে চলে যাবার মধ্যে এক একটা ছবি থাকছে আর কিছু সঙ্কেত যা তাদের আবার অর্থময় করে তুলছে। অবাক পঙক্তির ভেতর তখন হাওয়া হরিণের নির্মাণ, যাপনের তীব্র অসহায়তা আর তার পরতে পরতে জমে ওঠা আভাস, পলেস্তারা খসে পড়া দেয়াল থেকে দেয়ালে তারা এক একটা ছায়া ফেলছে। ঠোঁট তখন কত কী বলে যাচ্ছে অথচ ধ্বনিতে রূপান্তরের আগেই সব ফুরিয়ে যাচ্ছে। পাতায় গিয়ে সুতোয় ফিরে আসার ভেতর থাকছে মিস্টিক ঝুলন পথের কীপ ব্যালেন্সের এক অদ্ভুত খেলা যারা ফুটে উঠছে মন খারাপের কান্নায়। শুরু হওয়া গল্প তখন বাক্যের বিচ্ছিন্নতার পথ থেকে স্টেটমেন্টে নেচে উঠেছে প্রবল আর ইমেজারির ভেতর দিয়ে ব্যথাগুলো খুব ঝিকিয়ে উঠেই কবিতা। আহা কবিতা!

তারপর শুরু হলো সেই গল্প

রাতের ঠোঁটে হেঁটে যাচ্ছেন চ্যাপলিন

সিন্দুক থেকে ভেসে আসছে হাততালি

ঘরে নাচছে ফুলদানি

পাতায় পাতায় যতখানি গিয়েছিলাম

ঠিক ততখানি ফিরে এসেছি সুতোয় সুতোয়

(চার্লি)

এভাবেই আচমকা, পরিচয় হয়ে গেল কবি শ্যামল সিংহ-র রহস্যে জড়ানো অবাক সব কবিতার সাথে। কলরবের সম্পূর্ণ বাইরে থেকে নির্জনের এক একটা কবিতা যার শরীরে মেদের লেশমাত্র নেই অথচ ভেতরে রয়েছে ঐশ্বর্য সম্ভার। সামান্য নজরে দেখতে তাদের অণুকবিতার মতো দেখায়। মনে হয় তুলোর মতো, মেঘ মেঘ কটন ক্যান্ডির মতো যেন মুখে ফেললেই মিলিয়ে যাবে এতটাই হালকা অথচ গভীরে যাও.. দেখো কী ভীষণ তীব্র তার দ্যোতনা! প্রত্যেকেই যেন আশ্চর্য এক একটা ম্যাজিকবাড়ি যেখানে প্রথমবারের পর্যবেক্ষণে মনে হয়, কিছু শব্দ পরপর জুড়ে ভেঙে ছড়িয়ে দেওয়া, কিছু বাক্য অর্থহীনতার দিকে গড়ানো, শব্দের রিপিটেশন আর কিছু স্পেসের খেলা এই তো! কিন্তু আরেকবার দেখলে? আরও একবার? পরপর আরও ক’বার? কবিতাগুলো নিয়ে আরও অনেকটা সময় দিলে…তখন কিন্তু নির্মাণ কৌশলের বিস্ময় কাটাতেই সময় লেগে যায় অনেক আর তারপর দেখা মেলে সেইসব যাদুর, সেই স্ফুলিঙ্গের। যেখানে শব্দ বা বাক্যের রিপিটেশনের ভেতর দিয়ে কবিতার স্বকীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্পেসগুলোতে ফুটে ওঠে ভিন্ন ব্যঞ্জনা। এভাবে শব্দ থেকে শব্দে, পঙক্তি থেকে পঙক্তিতে এগোলেই কবিতাগুলো তাই পাঠক স্নায়ুতে সৌরঝড় তোলে আর সেই এগোনোর পথে তারা তখন যথাযথ মনোনিবেশ দাবী করে। শ্যামল দার কবিতাগুলো সেভাবেই যেন এবার আমার কানেকানে বলে, সময় সামান্যই নেবো, তবু যেটুকু সময় আমি নেবো তার জন্য প্রস্তুত হও। সংযোগের জন্য প্রথমে নিজেকে বিচ্ছিন্ন কর অন্য সবকিছু থেকে। তারপর মৌন হও, হও মগ্ন। কবিতার শরীরলগ্ন হতে হতে ঢুকে পড়ো উপলব্ধির জগতে, কেন না তুমি পাঠক.. তোমার দৃষ্টি পড়ুক সেখানে, যেখানে থেকে শুরু হয় অন্তহীন জাগরণ। এবার তাঁর কবিতাগুলোর আপাত নির্লিপ্ত চেহারা আর চারপাশের চেনা শব্দগুলোর উপস্থিতি নিয়ে প্রথমবারের ভ্রূ-কুঁচকে রাখা আমার তাকানোটির কথা ভেবে কবিতাগুলো মুচকি হাসে। আড়ালে তখন, অদৃশ্যে তখন, আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন কবি শ্যামল সিংহ। শ্যামল দা, আপনার ঠোঁটের কোণেও এক অদৃশ্য হাসি তখন কৌণিক প্রশ্রয় পেয়ে যায়। আর আপনি তখন অবোধ এই পাঠকের স্পর্ধা ক্ষমা করছেন। করছেন তো?

গভীর এক অ-সুখের নাম কি জীবন? রাতের দহনে পুড়তে থাকা মোমশিখা তার নাম কি জীবন? জীবন কি এক মন খারাপের নাম! ‘যে কোনো কথাবার্তায় চলে আসে থমথমে কুয়ো / উল্টো করে জামা পরার মতো সব কিছু মনে হয়’। শ্যামল দা, আপনার কবিতা ছুঁয়ে এই আমি দেখছি, কী ভয়ঙ্কর সব বাস্তবতাকে আপনি অবলীলায় কবিতায় বিছিয়ে রেখেছেন। ছড়ানোর মাঝেই জুড়ে দিচ্ছেন ছবি শব্দবন্ধে আর তাদের শরীর থেকে উঠছে অসংখ্য বুদবুদ। বোধের বুদবুদ। চেতনার ভিসুয়ালাইজেশন। ‘অক্ষরের ফাঁকে খুনির মতো / আমি বসে আছি চুপচাপ’ ভেতরজমিন কাঁপন ধরানো উপলব্ধির এই ভাষা, এই কি কবিতা! ‘আমাদের পাশাপাশি গড়ায় পাথর/ দেয়াল ও পেরেকের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলি/ কথা বলি উটের ছায়া নিয়ে’.. দেয়াল, পেরেক, পাশাপাশি গড়ানো পাথর আর উটের ছায়া। কী অদ্ভুত! এভাবেও এইসব বিষণ্ণতার, শূন্যতার, অ-সুখের ছবি এঁকে ফেলা যায়? আর তারপর, ‘সারা শরীরে ঝম্‌ঝম্‌বৃষ্টি নিয়ে/ যুবতীরা চলে আসে আমাদের গল্পে’.. কোন গল্প? পরাজয়ের গল্প, একাকিত্বের গল্প! নিজেকে যেখান থেকে সাময়িক মুক্তি দিতে ভোলাতে হয় যৌনতার গল্পে! ছোট্ট পাখির শরীরের মতো এই কবিতাগুলোর মাঝে শ্যামল দা আপনি এভাবেই রেখেছেন অর্থময় সঙ্কেত। খুলে দিয়েছেন অসীমের দিকে যাত্রার সে তোরণ।

এবার ধরা যাক, আয়োনিত পার্টিকেল ধারা নেমে আসছে চৌম্বকমণ্ডলে এখন। কী হবে! আর্কের ঢঙে সে ছেয়ে নেবে তো দিগন্ত রঙিন আভায়! সেই তো মেরুজ্যোতি! উদিচী উষা, অবাচি উষা? ধরা যাক, তার দিকে চেয়ে বিস্ময়ে জেগে উঠছে প্রাণ এখন আর ঠিক সে সময়েই কঠিন ছোবলের মতো কানে ভেসে এল, মা বলছে ‘চুপ’, বাবা বলছে ‘চুপ করো’ তখন সেই আকস্মিকের ধাক্কায় বিস্মিত প্রাণ ফিরে যাচ্ছে আরেক বিস্ময়ের কাছে, ফিরে যাচ্ছে অসহায়তার কাছে, ফিরে যাচ্ছে অন্য এক জেগে ওঠার কাছে। অরোরার আলো যতটুকু ছেয়েছে মনের আকাশ ঠিক ততখানিই বৈপরীত্যের এই জাগরণ। এখানে কান পাতলে শোনা যায় তাই বাবার ‘চুপ করো’তে পাক খেয়ে উঠে আসছে রক্তক্ষরণ, মা’র ‘চুপ’ থেকে বেরিয়ে আসছে বেদনার স্রোতধারা অনর্গল। পোড় খাওয়া আর আপোষ করতে করতে হেরে যাওয়া বাবার কন্ঠে তখন ‘চুপ করো’, মা’র কন্ঠে ‘চুপ’ এক ঝটকায় আমাকে সমাজের ওই ছেঁড়াফাটা ছবিগুলোর দিকে ফেরায়। তারা ধরা শিশুটি তখন ধীরে ধীরে রাত হয়ে যাচ্ছে। স্তব্ধতা আর যন্ত্রণায় জোর ধাক্কা দিয়ে  ‘রাত’ তখন একা আর নিঃস্ব করে দিতে শুরু করে। পঙক্তির রিপিটেশনের সাথে অসহায়তা প্রথম পঙক্তি থেকে পরের পঙক্তিতে এসে যত যন্ত্রণা ছড়ায়, ডার্ক টোনের বিস্তার দিয়ে শ্যামল দা তখন আমার দিগন্তে ততই ছড়াতে থাকেন অরোরার আলো।

আকাশের তারা ধরে শিশুটি বলল

‘মা খিদে পেয়েছে, খেতে দাও’

নদীর ভেতর থেকে শিশুটির মা বলল

‘চুপ’

আকাশের তারা ধরে শিশুটি আবার বলল

‘মা খিদে পেয়েছে, খেতে দাও’

নদীর ভেতর থেকে শিশুটির বাবা বলল

‘চুপ করো’

শিশুটি ধীরে ধীরে রাত হয়ে গেল

(আকাশের তারা)

এবার একটা শূন্য আঁকা যাক। আঁকলাম। কেবল চকখড়িতে একটানে আঁকা একটা শূন্য। কী দাঁড়াল? এইমাত্র আঁকা শূন্য, তার তো এখন অস্তিত্ব আছে কিন্তু সেই শূন্যের অর্থ কি কেবলই শূন্য? না, শূন্য মোটেই অর্থহীন কোনো সংখ্যা নয়। শূন্যের মতো শক্তিশালী সংখ্যাই আর নেই! শূন্য ক্ষমতা রাখে ধ্বংসের। ক্ষমতা রাখে নির্মাণের। ‘নেই’ মানে শূন্য কিন্তু সেই নেই এর ভেতরই আছে কিছু হয়ে ওঠার অমোঘ মন্ত্রটি। যা এখন প্রবল অন্ধকার, মুহূর্ত কেবল, সেখানেই জ্বলে আলো। শূন্য নিজে সেই স্রষ্টা যে না থাকার ভেতর রাখে সীমাহীনতার সূত্র। শূন্য তাই অসীম।

এবার তবে শ্যামল দার সেই কবিতাটার দিকে একবার ফেরা যাক যে কবিতাটার জন্য আমি আমার কলম তোলার দুঃসাহসটি দেখিয়েছি। যে কবিতাটার জন্য ঐহিক পত্রিকার সম্পাদক তমাল রায় আমার সবরকমের অপারগতার ওপর রেখেছেন তাঁর বরাভয় মুদ্রা, সেই কবিতাটি একবার আবার পড়া যাক।

শূন্য থেকে শুরু করলে

প্রজাপতি ধরা যায়

শূন্য থেকে শুরু করলে

চাঁদের অনুবাদ করা যায়

 

নইলে প্রচ্ছদহীন হয়ে পড়ে বই

না, এবার আর আমি দুঃসাহস দেখাব না। চার লাইনের পর স্পেস রেখে পঞ্চম লাইনে এসে আমি আর কবিতা নিয়ে খুলতে বসব না সুতো, ওই স্পেসটুকুর মাঝে লুকিয়ে থাকা কথাগুলোর ব্যঞ্জনা নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করব না শুধু সাহস করব কবিতাগুলো আরও নিবিড় অনুশীলনের। প্রথা ভেঙে বেরিয়ে আসা শ্যামল সিংহ-র কবিতাগুলোর অতি সাঙ্কেতিক অনুভূতির অভিষঙ্গে ছড়িয়ে রাখা সুক্ষ্ণ আলোককণাগুলোকে ছুঁতে চাইব বারবার।

শব্দ থেকে শব্দ যেখানে গড়ে দেয় অন্য পৃথিবী, অনুভূতিতে যে তোলে অসংখ্য ঢেউ, যে কবিতা নির্দিষ্ট সময় নয় বরং মহাকালের বর্ষণ, শূন্য থেকে শুরু হোক আজ যাত্রা আমার সেই অসীমে।

শ্যামল সিংহ > সীমান্তের ওপারের একজন উল্লেখযোগ্য অকালপ্রয়াত কবি। জন্ম পশ্চিম বাংলায়, ১৯৪৯ সালে, আর মৃত্যু ২০০৩। গত শতকের সত্তর-আশির দশক জুড়ে তিনি কবিতা লিখলেও প্রথম বই ‘চাঁদ ও খোঁড়া বেলুনওয়ালা’ প্রকাশিত হয় ১৯৯১ সালে। পরে বেরয় আরও দুটি- ‘সূর্যাস্ত আঁকা নিষেধ’ আর ‘জেগে উঠছেন বাঘাযতীন’। আজীবন কলকাতা থেকে বহুদূরে বসবাস- জলপাইগুড়িতে। শ্যামল সিংহের গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত কবিতা নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘নির্বাচিত শ্যামল সিংহ।’ শ্যামলের কবিতা একেবারেই অন্যরকম, কথা বলবার ভঙ্গি আর স্বরটা একেবারেই নিজস্ব। সেই বইয়েরই নির্বাচিত কিছু কবিতা পড়ুন তীরন্দাজে।

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close