Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ সং অফ সিক্স পেন্স [উপন্যাস] >> সাগুফতা শারমীন তানিয়া

সং অফ সিক্স পেন্স [উপন্যাস] >> সাগুফতা শারমীন তানিয়া

প্রকাশঃ June 20, 2017

সং অফ সিক্স পেন্স [উপন্যাস] >>  সাগুফতা শারমীন তানিয়া
0
1

সং অফ সিক্স পেন্স

কেঁদেও পাবেনা তাকে বর্ষার অজস্র জলধারে

 

ঐ ঘরে কি আছে?

জটিলেশ্বর-হেমন্ত-শ্যামল মিত্র-মান্না দে…একেবারে জড়িয়ে মড়িয়ে।

ঐ ঘরে কি আছে?

পোস্টার জুড়ে জয়া প্রদা…অর্ধনীমিলিত চোখ, শ্রীদেবীর কি সব সোনালী ঝালর-ঝালর কাঁচুলিমোড়া উজ্জ্বল বুক।

ঐ ঘরে কি আছে?

ব্যবহৃত শার্টের-শেভিং ক্রীমের-সিগারেটের প্যাকেটের রাংতার এবং জাম্বাকের গন্ধ থমকে আছে।

ঐ ঘরে পলাশ আছে। এসেছে গতকাল রাতে। মাইগ্রেনের ব্যথায় শুয়ে আছে।

আগামীকাল চলে যাবে।

আগামীকাল আমার পরীক্ষা। নবকুমার আত্মোপকারী ছিল কি ছিল না, এই নিয়ে জেরবার হচ্ছি। সয় বলো?

সয়না।

‘পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছো?’ কপালকুন্ডলা আমার পড়া।

 

সন্ধ্যায় একপশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়ে এখন খুব বাতাস দিচ্ছে। এইসব বৃষ্টিবাদলের পরপরই চোরাপায়ে চলে আসবে শীত।

কূলগাছের পাতায় ছেয়ে যাবে আঙিনা।

আম্মা সুতি কাপড়ে মুখ বেঁধে বড় বড় বৈয়মে আস্ত লেবুর জারক বানিয়ে রোদে দিবেন। মরশুমি সর্দিগর্মি চলে যাবার জন্যে আমরা জারক খাবো, আনারসপাতার গোড়ার দিকের রস খাবো, বাসকপাতার রস খাবো।

শীত আমার ভালো লাগে।

শীতের ছুটিতে পলাশ আসে। রাতে আমাদের আঙিনায় লাইট জ্বালিয়ে পোস্ট গেঁড়ে ব্যাডমিন্টন খেলা হয়।

আর সকাল ফুরোতেই ক্যারম।বোরিক পাউডার না থাকলে লুকিয়ে আম্মার ট্যালকম পাউডার ঢেলে…

ছোটমামা, ছোড়দা, পলাশ, কখনো আব্বার বদলে বহ্নি সুলতানাও জুটে যায়। (বহ্নি সুলতানার গল্প পরে করবো।)

 

এখন ঐ ঘরে পলাশ। কি একটা গান বাজাচ্ছে ছোটমামা- ঘুম ঘুম গলায় দু’জন স্প্যানীশ মহিলা গাইছেন Dreaming…Hoping…Praying…Waiting…

আমিও। আমিও।

ঘোড়ার ডিমের নবকুমার…পড়া হলে বাঁচি।

 

আটটার সংবাদ শেষ হলো। রওশন এরশাদের আজকের জামদানি শাড়িটা নিয়ে ওঘরে তুমুল চলছে। বড়ভাবী একটা টালিখাতায় প্রতিদিনের খবরে দেখা শাড়ির বিবরণ লিখে রাখেন।

আম্মা খেতে ডাকতে এসে প্রথমে উঁকি দিয়ে দেখলেন আমি কি পড়ছি, ‘নন্টে-ফন্টে’ না ‘কাল যমুনার বিয়ে’। তারপর মাথায় ঠোনা মেরে বললেন- “এসো, খেতে এসে উদ্ধার করো”।

এইসব অকারণ রূঢ় ব্যবহারে আমার কান্না পায়। কিন্তু এঁরা এসব করবেনই।

আম্মা-আব্বা-বড়দা-ছোড়দা-বহ্নি সুলতানা।

 

ঘর থেকে বের হতে হতে শুনি- পলাশ আবৃত্তি করছে-

 

“ভালোবাসিয়াছি আমি অস্তচাঁদ- ক্লান্ত শেষপ্রহরের শশী।

অঘোর ঘুমের ঘোরে ঢলে কালো নদী- ঢেউয়ের কলসী,

নিঝ্‌ঝুম বিছানার ’পরে।

মেঘ বৌ’র খোঁপাখসা জ্যোৎস্না ফুল চুপে চুপে ঝরে,-

চেয়ে থাকি চোখ তুলে…

 

বাইরের বারান্দায় এসে দেখি- সত্যিই মেঘ বৌ’র খোঁপাখসা জ্যোৎস্না ফুল চুপে চুপে ঝরে। কি উথাল পাথাল জোছনা।

আমার হাতের উপর, আমার শাদা ফ্রকের ছোট ছোট ঢেউয়ের উপর, আমার হনুর উপর, আমার কপালে…

(সামনের অন্ধকারে ছোড়দা সিগারেটের শেষটা ছুঁড়ে দিয়ে পলাশকে বললো-“তোর না কবিতার ক্যাসেট বের করার কথা? ”)

পরী হয়ে যেতে খুব ইচ্ছে করে হঠাৎ।

মস্ত দুখানা শুভ্র ডানা…তার থেকে চিকমিক করে খসছে পালক। চাঁদের কুমড়োফালির ওপর বসে…ফুরফুরে শাদা কাপড় মেলে…চুলে জড়িয়ে সবুজ চিকচিকে তারা…

আমার ঘেঁটি ধরে নিয়ে আসে ছোড়দা- খাবার ঘরে।

 

পরীরা কি খায়?

হলুদবিহীন শাদা সুরুয়া? বনফুল লিখেছিলেন- ‘চরু’ নামের একরকম পরমান্ন। বিভূতিবাবু লিখেছেন পদ্মবীজের ক্ষীর। দূর। দূর। খাবার টেবিলে পেঁপে ভাজি, ডিমসেদ্ধ আর ডাল।

 

পলাশ বসেছে আমার মুখোমুখি চেয়ারে। ওর পাতের সামনে আলাদা করে ছোট একটা বাটিতে মাংস।

উফ্‌ এখন এইসব খাবার কদর্য ভঙ্গীতে চিবাতে হবে, গিলতে হবে ক্যোঁত করে…এম্নিতেই আমার চেহারা খারাপ। খাওয়ার মতো একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার কেন যে মানুষ জনসমক্ষে করে জানিনা ছাই।

 

পলাশ কিন্তু নির্বিকার। প্রবল বেগে ভাত মেখে খেতে খেতে মাংসের বাটিটা এঁটোহাতের পিঠ দিয়ে একটু ঠেলে দেয় আমার দিকে- “এই তুই আমার থেকে একটা মাংস খা। পরীক্ষার সময় ভালমন্দ খেতে হয়।”

মরে গেলেও আমি ওর বরাদ্দ থেকে মাংস তুলতে পারবোনা। আমি কোনোমতে দ্রুত ভাতটুকু শেষ করি- সরু সরু দেখা যায় এমন করে আঙুল তুলে আলতো চেটে নিয়ে বলি- “ আমার খাওয়া শেষ!”

পলাশ দিব্যি হাঁসের মাংসের হাড় চুষছে…

একটু খারাপ লাগে আমার-

কোমল নদ্‌নদে ভালমানুষমতন শাদা হাঁসটা-

হাঁস খাওয়া পলাশকে মানায়না। (এই না সে মেঘবৌয়ের খোঁপা দেখছিল চোখ তুলে?)

 

এর আগেও এমন হয়েছে। পলাশরা সুন্দরবন গিয়ে হরিণের মাংস খেয়েছিল। খড় দিয়ে সেদ্ধ করে সে পানিটা ফেলে দিয়ে হরিণের নোনাগন্ধ কি করে ছাড়ায়, এই গল্প বিতং করে শুনিয়েছে সে, এই খাওয়ার ঘরেই। যে কবিতা পড়ে সে কেন হরিণের মাংস খাবে? কেন চেয়ে চেয়ে মটমটিয়ে কবুতরের মাংসের হাড় খাবে?নদ্‌নদে ভালমানুষমতন শাদা হাঁস খাবে?

 

দুঃখ পুষে ডাইনিং টেবিল থেকে উঠে আসি। রাত দশটার পর পড়ার চাপটা ফিকে হয়ে আসে।

অথচ রাত দশটার পর আমার টেলিভিশন দেখা বারণ। পলাশ-ছোড়দা-বড়দা মিলে ‘নর্থ এন্ড সাউথ’ দেখছে।

কালকের স্কুলের বইপত্র গুছাই।

বহ্নি সুলতানা খেতে বসেছে আম্মার সাথে।পাফ্‌ দেয়া কাঁধ আর কামিজের হাতা নেমে এসেছে কনুইয়ের নিচে এক বিঘত, জর্জেটের চুনরী ওড়না- সামনের চুল জাঁকিয়ে তুলে কানের লতি পর্যন্ত ছাঁটা। আমি ওর মতোন সবার খাওয়ার পরে আম্মার সাথে মুখোমুখি বসে ভাত মাখতে মাখতে…মাঝে মাঝে অনুচ্চ স্বরে হেসে উঠতে উঠতে…

বড় হবার সব অনায়াস মুদ্রাগুলি কি সুন্দর মানিয়ে যায় ওকে। (বোরোলীনের বিজ্ঞাপনের নতুন মেয়েটার সাথে ওর মিল আছে।)

 

বহ্নি সুলতানাকে সব মানায়।

ও ঠিক ফর্সা নয়, ঈষৎ তামাটে…নতুন মেহগ্নি পল্লবের মতো। জামপাতার মতো দীঘল চোখে মৌচাকের লাল-মোমের মতো চোখের মনি। ওর চুলগুলিও ঠিক কালো নয়…ঘাড়ের নিচ থেকে নামতে নামতে দারুচিনি রঙ হয়ে পিঠ ছেয়ে ফেলেছে। চোখ খুব বড় নয়, নাক খুব টিকোলো নয়- একটা গজদাঁত অবশ্য ওর আছে। অথচ সবটুকু মিলে কোথায় যেন সে আর শিরীন সুলতানা হয়ে নেই…হয়ে গেছে রাজেন্দ্রানী। মিশরকুমারী। (তার চোখের ওপর পাতায় ল্যাপিস্‌ লাজুলী গুঁড়ো আর নিচের পাতায় ম্যালাকাইটের গুঁড়ো। নীল-সবুজ জলঝাঁঝি…)

এমনকি বহ্নি সুলতানাকে দেখায় আকারের চেয়ে দীর্ঘ।

ও যেন ঠিক আমাদের নয়।

ওর ভালো নাম ছিল শিরীন সুলতানা। ডাকনাম বহ্নি। ম্যাট্রিকের সময় ও নাম পালটে করে নেয় বহ্নি সুলতানা। শুনলেও গা জ্বলে যায়।

 

আমার নাম রেবেকা সুলতানা। আমার সম্পর্কে প্রথম এবং শেষ কথা হচ্ছে আমি দেখতে ভাল নই। একদম নয়।

আরো অনেক হাবিজাবি কথা আছে আমার সম্পর্কে।

যেমন- আমার প্রিয় রঙ শাপলা-নীল।

আমার প্রিয় লেখক বারবার বদলায়।

আর আমি প্রায়ই কল্পনায় একটা দৃশ্য দেখি। মফস্বলের একটা বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে আছি। সাইকেলে চেপে অনেক রাজ্যের ধুলো মাথায় পলাশ ফিরছে সেই বাড়িটায়। এসব কেউ জানেনা। এমনকি আমার বন্ধু শারমীন, যে আমাকে রাকু ডাকে- সেও নয়।

 

শারমীন আর আমি ইস্কুলে সবসময় একসাথে থাকি।আমরা দু’জন একসাথে টিফিন খাই। একই গাছের তলায় বসে গল্প করি। (বগলের তলায় সরুসরু চুল গজিয়ে ওঠা নিয়ে ব্যক্তিগত অস্বস্তির গল্প আমরা আর কারো সাথে করিনা।) আর মাথার ওপর চেয়ে দেখি প্রকান্ড মেঘশিরীষ গাছ- তাতে কচি সবুজ পাতা…এই রেইনট্রীগুলির মর্মরের শব্দে আমরা দু’জনই মনে মনে বলি- আমি একা। আমি একা।’

 

শারমীন আমার চেয়ে লম্বা। সরল নাক। ঈষৎ পুরু ঠোঁট। আর একঢাল চুল। শারমীন শ্যামলা আর লাজুক। (শারমীনের গল্পও পরে করবো)

 

এখন ওঘরে পলাশ। ওঘরে ‘নর্থ এন্ড সাউথ’ চলছে। কার্স্টী অ্যালীর কর্সেট থেকে উদ্গত বুকের রেখা নিয়ে হৈহৈ চলছে।

আগামীকাল যখন আমি আর শারমীন স্কুলের দেবদারুগাছের তলায় বসে সিঙাড়ার আলু আর আলু-মতন জিনিস ফেলে দিচ্ছি- তখন সুবর্ণ এক্সপ্রেসে করে পলাশ চলে যাচ্ছে।

 

বহ্নি সুলতানা, একলা

রেবেকা লুকিয়ে লুকিয়ে সবসময় আমাকে খেয়াল করে। মুগ্ধ হয়, ঈর্ষাপীড়িত হয়- তবু আমাকে লুকিয়ে দেখা সে ছাড়তে পারেনা। কি অয়শ্চৌম্বক ক্ষমতা আমার আছে, আমি তো বলতে পারবোনা। শুধু রেবেকা নয়, আরো অনেকে আমাকে চেয়ে দেখে। ছোটবেলা থেকেই তাই। আমার দিকে প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকায়। আমাকে জায়গা ছেড়ে দেয়। টেবিলের তলা দিয়ে আমার পায়ের উপর পা তুলে দিয়ে চাপ দেয়। আর কিছু না হোক, আমার মাথায় হাত রাখে-পিঠে পিছলে নামতে থাকে-অন্তর্বাসের হুকে গিয়ে স্থির হয়।

লোকের এইসব কাজে আমি হাসি। কারণ এইসব আমাকে একদম স্পর্শ করেনা। মৃত্যুসংবাদও আমাকে কাঁদাতে পারেনি- কেবল একটা জ্বর-জ্বর ঘোর লাগে আমার। চোখে আঁচল চেপে বসে থাকি। কেউ বুঝতেও পারেনা- শিরীন কাঁদছেনা।

লোকে আসলে সত্যিকার সৌন্দর্য সহসা চিনতে পারেনা। চিনতে পারলে লোকে মুগ্ধ হয়ে আমাকে নয়, রেবেকাকেই দেখতো।

রেবেকার স্বভাবে সংবরণ নেই, সংবরণ ওকে দারুন কষ্ট দেয়। ও একদিন উচ্ছাস ভরে বলে ফেলেছিল- “দ্যাখো দ্যাখো আকাশটা কেমন ময়নাপাখির ডিমের মতো সবুজ!” সূর্যাস্তের আকাশ কখনো সবুজ হয়? চেয়ে দেখি সারা আকাশ জুড়ে আসন্ন রাতের আভাস কেমন ঘনিয়ে এসেছে, সেটা সত্যিই আবছা সবুজ।

আমরা সবাই জানি রেবেকা একদিন খুব অসাধারণ কিছু হবে। কিন্তু কেউ সেটা রেবেকাকে জানতে দেইনা। বরং রেবেকা জানে এবাড়িতে কেউ তাকে ভালবাসেনা। আমাদের সহজ সাবলীল গার্হস্থ্যে সে বড়ই বেখাপ্পা।

আমি হয়তো সুখীই হতাম- আমার চোখেও যদি সন্ধ্যার আকাশটা ময়নার ডিমের মতো সবুজ লাগতো। লাগেনা। সন্ধ্যা মানেই পড়তে বসা। নোট্‌স্‌ এর মার্জিনে বলপয়েন্টে ফুল-গুল্ম-লতা আঁকা আর পড়া মুখস্ত করা।সন্ধ্যা মানেই রাতের হাতরুটি করবার খামি গড়া। তারপর রাতের খাওয়া। তারপর আবার পড়তে বসা। আমার যা যা ভালো লাগে- ম্যাথ্‌স্‌, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রী… তার কিছুই রেবেকার ভালো লাগেনা। ওর ভালো লাগে সাহিত্য, ভূগোল, ইতিহাস। আর পলাশ। যা যা রেবেকার জন্য ক্ষতিকর, তার সবই ওর ভালো লাগে।

ওর খুব জানা দরকার ওকে আমরা খুব ভালবাসি। ওর জানা দরকার ওর ঐ উন্মনা ভঙ্গীতে পড়ার বই মেলে বসে থাকার সময় ওকে গ্যাব্রিয়েল রসেটীর আঁকা একটা ছবির মতো দেখায়, পলাশ আমাকে দেখিয়েছে ছবিটা।দীর্ঘগ্রীব মেয়ের ছবি।

ও জানেনা। জানাবে কে?

আমার সাথে আমার ভাইবোনদের কারো খুব সদ্ভাব নেই। কেন আমি জানি। কলোনির বাড়িতে থাকি, আমাদের মা অসুস্থ থাকলে প্রায়ই ঐ ঝুলকালিমাখা রান্নাঘরে আমাকে সারাদিন রাঁধতে হয়। বড়দার দুটো বাচ্চা- নুপূর আর বাবলুকে ইস্কুল থেকে আনানেওয়া করতে হয়। তবু আমার সবকিছুতে কোথায় যেন একটা রানী-রানী ভাব আছে। এটা একদম ছোটবেলা থেকেই আছে। জল-কাচা ওড়নামুড়ি দিয়ে কলোনীর বাগান থেকে মেহেদীপাতা তুলছি, কেউ আমার মুখ দেখলে বুঝতে পারতোনা আমার মা ভেতরঘরে ছোটশিশুটিকে স্তন্যদান করতে করতে মেঝেয় পা ছড়িয়ে মুখ হাঁ করে ঘুমোচ্ছে। চুলে জড়িয়ে গেছে রাতের পোড়া কয়েলের ছাই।

এই রানীর মর্যাদায় মোড়া রূপ- এ আমার দাদীর উপহার। আমার এই দাদী আমাদের মাকে কখনো গ্রহণ করেননি। তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মানার্থে আমার ভাইবোনরা আমাকে ভালবাসেনা।

দাদীর কাছে কয়েকবার গেছিলাম আমি, ভাইবোনদের মধ্যে শুধু আমিই তাঁর কাছে ফিরে ফিরে যেতাম।ফিনফিনে শাদা জমিনের শাড়িতে রূপালী আঁশপাড়, শনের নুড়ির মতো শাদা হয়ে এসেছে মাথা, হাতে মাইকেল মধুসূদন দত্তের বই- বীরাঙ্গনা কাব্য।

তিনি আমাকে ভালবাসতেন।সেই ভালবাসা আমার বড় গর্বের বস্তু। এমন এক খেলনা, যা আমার আর কোন ভাইবোন পায়নি।

 

চঞ্চল চুলবুল পাখনায় নির্ভর

আমাকে খুশী করে দিয়ে, অবাক করে দিয়ে…

পলাশ থেকে গেছে। সকালের ট্রেনে চলে যায়নি।

স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখি, পলাশ বারান্দায় বসে বসে পুরনো ঘড়িটার অ্যালার্ম ঠিক করছে।

আমি টের পাচ্ছি একটা লাল পাথরের ঠিকরানো আলো চমকাচ্ছে আমার চোখে-মুখে। সেটা মুছতেই যেন দীর্ঘক্ষণ গোসল করলাম।

যতক্ষণ না আম্মা টিনের দরজায় দুম্‌দাম ধাক্কা দিতে লাগলেন।

পলাশরা আগেই খেয়ে নিয়েছে। খুব ভালো। আমার জন্যে ঢেঁড়শ ভাজি-নলামাছের ঝোল ইত্যাদি রাবিশ পড়ে আছে টেবিলে।

খেয়ে উঠে যেই পলাশের কাছে গিয়ে বসবো ভাবছি- বহ্নি সুলতানা এসে হুকুম করলো- ঘুমাতে যাও!”

মাঝে মাঝে মনে হয় মানুষের চোখ দিয়ে সত্যিই কেন আগুন ঠিকরে বের হয়না? তাহলে আমি হয়তো বহ্নি সুলতানাকে ভস্ম করে দিতাম। ‘কুইন অফ শেবা’ আমাকে বলে গেলেন- ঘুমাতে যাও!

 

নিজে দাঁড়িয়ে রইলো বারান্দার থাম জড়িয়ে। হনিসাক্‌ল্‌ এর জংলী হয়ে ওঠা লতাগাছা পেছনে রেখে।বহ্নি সুলতানা পরে আছে একটা পেস্তাসবুজ শাড়ি। তীর্যক রোদ এসে ওর এলোমেলো ছাঁটা চুলগুলিকে এলাচরং করে দিয়েছে।

পলাশ আর ও কী যেন বলছে।

বহ্নি সুলতানা ঠোঁট চেপে আছে। অসম্ভব উত্তেজনায় ওর এমন হয়।

 

আমাকে এখন ঘুমাতে হবে।

আমি জানি দুপুর-দুপুর…আগুন-আগুন একটা বিছানা আমার জন্যে অপেক্ষা করে আছে।

আমি জানি কিছুতেই আমার ঘুম হবেনা।

 

বহ্নি সুলতানা

 

পলাশ অসম্ভব রেগে আছে-

আমার নিস্পৃহ ভঙ্গীটা ওকে আরো খোঁচাচ্ছে। ও প্রায় কাঁপতে কাঁপতে বল্লো- “আমি জানতে পারি তোমার সিদ্ধান্ত কেন বদলালো? আমার দোষটা কোথায়?”

পলাশকে কী বলবো?বলবো আমার সিদ্ধান্ত বদলায়নি, কারণ আমি সিদ্ধান্ত নেই-ই নি। বরং দিনের বেলাকার শাদা আলোয় ওকে একটু স্পষ্ট করে দেখা যাক। কেননা ওকে আমি সবচেয়ে বেশি দেখেছি রাতের বেলা।সবাই ঘুমোবার পর। পলাশ তখন ক্যাডেট কলেজে পড়তো, ছুটি পেলেই আসতো আমাদের বাড়িতে। গ্রীষ্মের দুপুর শুয়েবসে পাটিতে গড়িয়ে কাটাতো, নিমাইয়ের ‘মেমসাহেব’ পড়তো, ক্যারম খেলতো আমার ইয়ার্ডলী পাউডার ঢেলে।

কেন যেতাম আমি রাত্রিবেলা ওর ঘরে? খুঁটিয়ে দেখি তো দিনের শাদা আলোয়- যে আলোতে সকল বর্ণ উপস্থিত- বে-নী-আ-স-হ-ক-লা। শ্যামলা মুখ-প্রশস্ত কপাল-শক্ত চোয়াল-ঠোঁট একটু পুরু- আর দীর্ঘ গড়ন। নাক-মুখ-চোখ স্বাভাবিক, একদম বিশেষত্বহীন।কেন যেতাম ওর ঘরে? পলাশ তো তার নতুন পড়া টিন্টাজেল দূর্গ এবং রাজা আর্থারের উপাখ্যান বলতোনা। কোনো তত্ত্ব আলোচনা করতামনাতো আমরা। একটি শব্দও নয়।

পলাশ আমাকে ক্ষীপ্র হাতে টেনে নিত। আর আমরা চুমু খেতাম। দীর্ঘ, দীর্ঘ চুমু, পিনপতননিস্তব্ধতায়। আর কিছুর সাহস ছিলনা আমাদের। কখনো কখনো আমার বুক স্পর্শ করতো পলাশ। ফিসফিস করে বলতো সে আমাকে ভালবাসে।

আমি তো পলাশকে ভালবাসতামনা। কেন যেতাম? ওর ঐ অসম্ভব আক্রমণ আমার ভাল লাগতো। আমার নতুন লাগতো। মিনমিনে স্তুতি শুনতে শুনতে ক্লান্ত ছিলাম তো আমি। মর্ষকামিতা? হতেও পারে!

পলাশ আবার কিছু বলতে যাচ্ছিল। আমি হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এবার সোজা হয়ে পলাশের দিকে তাকিয়ে বললাম- “আমার জবাব হচ্ছে- না।তোমাকে আমার চাইনা। ব্যাস। আর কিছু বলার নেই আমার।”

পলাশ গুম হয়ে বসে রইলো। ওর হাতে পুরনো টেবিলঘড়িটা, বারান্দার পরিত্যক্ত টেবিলে নাট-বল্টু খুলে রাখা। ঠিক সেই সময় গুড়ুম করে আমার একটা শব্দ মনে পড়লো- সেক্স অ্যাপীল…পলাশের চেহারায় অসম্ভব একটা যৌন টান আছে। সহসা উচ্চারিত হয়না সেটা। কিন্তু সেই আবেদনটা স্থির-নিশ্চিত। ওর হাঁটাচলা-ক্ষেপামি-রাগ-উজ্জ্বল হাসি…এর সবকিছুতেই ঐ ব্যাপারটা একটা আঁচ রেখে গেছে। আমার গাধা বোন রেবেকা সুলতানা এর নিরুপায় শিকার।

পলাশ মাথা তুললো। অপমানিত পৌরুষের একটা গন্‌গনে ছবি। অদ্ভুত সুপুরুষ দেখাচ্ছে তাকে।–“শিরীন, আমি তোমাকে এমন শাস্তি দেব যে জীবনে ভুলবেনা।”

যথেষ্ট হয়েছে। আমি ধীরেসুস্থে ওর সামনে থেকে হেঁটে চলে আসি। দুপুরের উত্তাল পাখার তলায় রেবেকা ঘুমোচ্ছে। শাদা-নীল পোল্‌কা ডটের জামা।

ওর মাথার কাছে চুপচাপ বসে থাকি। ওর চোখের কোণে শুকনো দাগ- চোখের পানির। আমার প্রচন্ড মাথা ধরেছে। কপালের দু’ধারে দপ্‌দপ্‌ করছে।

 

আমি যার বিলাস যমুনা

এখন নিবিড় হেমন্তকাল। আমাদের পশ্চিমের বারান্দায় রাতে দাঁড়ালে কী ভাল লাগে!

শুক্লপক্ষের চাঁদ তার রজত পাখনা মেলেছে বিশাল আকাশে। বরই গাছের পাতা ঝরে গেছে। দূর থেকে ঠান্ডা বাতাস আসে।

তাতে কুয়াশার ঘ্রাণ, কুয়াশার গন্ধটা সদ্য মাড়াই করা আখের মতো- তাজা কিন্তু ভারী। কলোনির মসজিদে এশার আজান দিয়ে থেমে গেল।

কাদের বাড়িতে ভিসিআর চলছে। মাধুরীর নতুন সিনেমার গান। প্রায়ই বাজছে পুরির দোকানে-ভিডিও ক্লাবে, নামতার মতো। এক দো তিন চার পাঁচ ছে সাত আট নও…

ছোটমামা জয়াপ্রদার চওড়াপাড় কাতান শাড়ি পরা ছবি ফেলে দিয়ে মাধুরীর পোস্টার সেঁটেছে দেয়ালে, রঙিন-কাপড়ে গেরো দিয়ে বুক বাঁধা। ছবিটা আমার অসহ্য লাগে। মুখটা অবোধ বালিকার, অথচ শরীর যুবতীর। পলাশ আর ছোড়দা হাসাহাসি করছিল- “ইনোসেন্সের সাথে লাম্পট্যের কী কক্‌টেল দেখেছিস ইশ্‌তি”? (ইশ্‌তি ছোড়দার নাম।) ছোড়দা হাসতে হাসতে কি জবাব দিল ঠিক বুঝতে পারলামনা।

পলাশ বহুদিন আসেনা…রাতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কালো আকাশে খন্ডমেঘ উড়ে যেতে দেখি- মনে হয় এই ঘূর্ণায়মান আকাশের তলে আমি এমন একলা! সেই যে আমাকে বারো বছর বয়সে ভোররাতে আম্মা তুলে দিয়ে বলেছিলেন- “এখন থেকে খুব সতর্ক থাকবে…কোনো পুরুষমানুষ ছুঁলেই পেটে বাচ্চা হবে!” তখন আমি হঠাৎ করেই একলা হয়ে গেলাম- আব্বা না, ছোটমামা না…ছোড়দা না…শুধু অসহনীয় বহ্নি সুলতানা। আর তুলা ঠাসা নেটে মোড়া সফ্‌টেক্স।

সেই একলা থাকার শুরু।

এই নিশুত রাতের জল-জল জ্যোৎস্নায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমার খুব ইচ্ছা করে, কেউ আমাকে জড়িয়ে ধরুক। সে আলিঙ্গন গভীর আর বিপুল।

সেই আলিঙ্গনের ভেতর আমার পনের বছর বয়স, আমার বেয়াড়া বেড়ে ওঠা শরীর- আমার বিতৃষ্ণাময় একাকীত্ব আর আয়নার অসুন্দর মুখ…এই সব কিছুর জায়গা হয়! (আম্মাকে জড়িয়ে দেখেছি, ছাড়িয়ে দেয় তৎক্ষনাৎ।)

আমি…একটু আলিঙ্গন অনুভব করতে চাই।

যেন আমার সামনে অন্ধকার-কঠিন ম্যাট্রিক পরীক্ষা নেই (গর্জনশীল চল্লিশা)।

যেন আমার সামনে দাঁত-নখ মেলে তাকিয়ে নেই লগারিদম আর ত্রিকোণমিতি।

আমি আর সে। ভেসে চলেছি রাতের নদীতে। নৌকার ছৈ এর দেয়ালে টাঙান হ্যারিকেন। নৌকার বাইরে নদীর ফিসফাস…আকাশ জুড়ে ভীরু তারা। শালুক আর নীল শাপলার জল কেটে আমরা চলেছি অজানা গাঁয়ে।যে গ্রামে ছোট্ট পোস্টাফিস- জিয়ল গাছের বেড়া ঘেরা…অন্ধকার টিমটিমে ছৈ এর ভেতর সে আমাকে জড়িয়ে ধরতেই…কী প্রকান্ড সেই আলিঙ্গন!

আমি এই আকাশের সামনে বোবা বারান্দায়…অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দেখতে চেষ্টা করি- সেই মুখ- বিষন্ন একফালি মুখ।

কে ও?

সে কি পলাশ? নাকি অন্যকেউ?

আমার স্বপনপারের মিতা আমায় তার মুখ দেখায়না।

 

বহ্নি সুলতানা

ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর থেকে অনেক বিয়ের প্রস্তাব আসছে আমার। এসব আনবার জন্যে রয়েছে অক্লান্ত ছোটমামা আর খালা। ছোটমামা আর আমার বয়েসের তফাত বেশি না। এই একটি পুরুষমানুষ আমার ভাল লাগে। মনটা সুরেলা, তার ব্যস্ত থাকা-ভবিষ্যতচিন্তা করতে গিয়ে হাই তুলতে তুলতে তুড়ি দেয়া-হাত ধুয়ে এসে ভাত মাখতে বসে যাওয়া এই সব স্বাভাবিক ভঙ্গীই আমার এত ভাল লাগে। আমার মনে হয় এইরকম একটা লোকের সাথে আমার বিয়ে হলে খুব ভাল হতো! ভিড়ের একজন। পয়সা থাকলে যে ফুল না কিনে সিঙ্গাড়া কিনবে সঙ্গিনীর জন্যে।

ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর রেবেকা একটু গা ছেড়ে দিয়েছে, একটু মেদ মাখিয়ে দিয়েছে তাকে কেউ। তাক এখন দেখায় বেশ পুরন্ত- বয়েসের উজ্জ্বলতায় চিকচিক করছে মুখ-চোখ।সারাদিন গান শোনে।‘মুকুতা যেমন শুকতির বুকে তেমনি আমাতে তুমি…’

আম্মা বলে– “রেবু প্রেম করে নাতো শিরীন? এত গান শুনে ক্যান্‌?” ব্যস্ত হাতে নাড়া দেয় রেবেকার ডায়েরীতে। ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ে যায়- ঝাউপাতা-শুকনো ফুলের পাপড়ি-পেপারকাটিং এইসব। রেবেকা এইসব দুর্বৃত্তসুলভ অভিভাবকত্বের সামনে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। রাতে বিছানায় শুয়ে কাঁদে।কান্নার শব্দ আমি শুনতে পাই। ঝাপসা, দিশেহারা। আমার বিব্রত লাগে, না শোনার ভান করে পড়ে থাকি।

কলোনির জানালা দিয়ে বড় সবুজ দীঘি দেখা যায়। তার চারদিকে ঝোপঝাড়, নিবিড় গন্ধ। ফেলে দেয়া আনাজপাতির খোসা-ভাঙা বালতি-ব্যবহৃত প্যাড-মরা বিড়াল। জানালা দিয়ে রাতের আকাশ আর অন্য কলোনীর সারি সারি আলো দেখতে দেখতে মনে মনে ভাবি- খুব একটা অতিসচ্ছল ঘরে যেন আমার বিয়ে হয় খোদা! যেখানে দু’বোনের ঠাসাঠাসি নেই, যেখানে কলের পানি আসবার জন্যে অবিরাম অপেক্ষা নেই। যেবাড়িতে মেয়েরা শখের অর্গান বাজায় আর ম্যাগাজিন পড়ে। যেবাড়িতে পুষিবেড়ালকে মেডিকেটেড শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করানো হয়, সপ্তাহে একদিন। যেবাড়িতে ঘরগুলির দেয়াল ওয়ালপেপারে আবৃত, ওয়ালপেপারে বটানিক্যাল প্রিন্টস।

একদিন বিকেলবেলা, যখন ছোড়দা বাড়ি নেই- তখন ছোড়দার খোঁজে একটা ছেলে এলো আমাদের বাড়িতে। উজ্জ্বল বাদামী তরুন। পরিচ্ছন্ন সবল মুখ। ছেলেটা একটু বসলো, আমাদের দিনের আলো না ঢোকা বৈঠকখানায় বসে গল্প করলো আমার সঙ্গে। নুপুর আর বাবলুকে গাল টিপে আদর করলো। বড়দা এসে একফাঁকে টুকটাক কুশল সেরে ঢুকে গেল ঘরের ভিতর। রান্নাঘরে এন্তার ভাজাভুজির শব্দ উঠছে।এইবার আমি বুঝে গেলাম- এই হচ্ছে আমার বটানিক্যাল প্রিন্ট্‌স্‌ মোড়া ঘর, এই আমার কলের জল-অফুরান চৌবাচ্চা!

ছেলেটার নাম নাদিম। চা আনবার সময় ভেতরে এসে চুলে একটু চিরুনী চালালাম। তোমাকে আমার পছন্দ নাও হতে পারে নাদিম, তাই বলে তুমি আমাকে অপছন্দ করে যাবে- তা তো আমি হতে দিতে পারিনা! ভাগ্যিস বিকেলে পরিপাটি থাকবার অভ্যাস আমার ছিল। আয়নায় শিরীনের পরনে বাসন্তী শাড়ি, তাতে পুরোনো জরিপাড় শাড়ির পাড়টুকু সেলাই করে বসানো, মেরুন বুটিদার ব্লাউজ। কপালে সূক্ষ্ণ কালো টিপ। বাহ! এতেই শিরীন সুলতানা তুমি নতুন পাতা মেলে দিয়েছো চৌদিকে।

চা দিলাম। পরিষ্কার-সপ্রতিভ এই ছেলেটিকে আমার তখন বেশ ভালো লাগছে। এই মানুষটা আমার মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছে!

সন্ধ্যার পরপরই নাদিমের বাসা থেকে ফোন এলো। মেয়েকে ছেলের পছন্দ হয়েছে, অতএব তাঁরা একমাসের মধ্যে বিয়েটা সেরে ফেলতে চান।ছেলেটাকে মেয়ের পছন্দ হয়েছে কি না এইটা কারও মাথায় এলোনা। বাড়িতে একটা উৎসবের আমেজ চলে এলো। রেবেকা পড়ার টেবিল ছেড়ে চড়ুইয়ের মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। ছোটমামা বিসমিল্লা খাঁ চাপিয়ে দিয়েছে ক্যাসেট প্লেয়ারে।আমার বেশ মজাই লাগছে। কিন্তু যার সাথে বিয়ে হবে- তাকে নিয়ে এমন কিছু রোমাঞ্চ হচ্ছেনা কেন?

আচ্ছা, কোনো সমস্যা নেই তো আমার? আমার স্বামী কি বিয়ের পর আমাকে অতিশীতল হিসেবে আবিষ্কার করবে? তার কি মনে হবে স্টীল-লাইফ আঁকবার জন্যে পাশাপাশি দু’খানা ঘটিবাটির মত আমাদের শুইয়ে রাখা হয়েছে?

রাত দশটার সময় পলাশ এলো। পথশ্রমে ক্লান্ত। ক্ষুধার্ত। চিটাগাং আর্ট কলেজে একটা ছেলে মারা গেছে। তাই অনির্দিষ্টকালের জন্যে বন্ধ হয়ে গেছে আর্ট কলেজ। গোসল করে খেতে বসলো পলাশ। গরম ভাতে আঙুল দিয়েই সে শুনলো আমার বিয়ের খবর। স্মিতমুখেই শুনলো। মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে একবার জিজ্ঞেস করলো-“শিরীন আর পড়বেনা?” আম্মা বললেন- -“শিরীনরে ওরাই পড়াবে।ছেলে খুব কোয়ালিফায়েড। বড় ভাই দুইজনের দুইটাই পি.এইচ.ডি., বাপ হাড্ডির ডাক্তার।” আমি ভেবেছিলাম এইখানে পলাশ একঝলক আমার দিকে তাকিয়ে খুঁজবে কিছু, যন্ত্রনা-বিদ্ধ মুখে।কিন্তু তার কিছুই হলোনা, পলাশ লুব্ধ মুখে ভাত খেতে লাগলো, লুব্ধ মুখে আমার বিয়ের ফিরিস্তি শুনতে লাগলো।

খাওয়াদাওয়া শেষে সবাই টিভির সামনে। বিটিভি ‘ABBA in Switzerland’ দেখাচ্ছে। পিয়ানিস্টটা তার অনবদ্য সোনালী ঈগলের মতো চুল ঝাঁকাচ্ছে। রেবেকা বোধহয় জীবনে প্রথম পলাশের পাশে বসতে পেরেছে, চিকচিক করছে তার মুখ-চোখ। আল্লা আমার বোনটা এত বোকা কেন?

রেবেকা সাধারণত দশটার পর টিভি দেখতে পায়না। হয় আর একটু পড়ে নয় ঘুমোতে যায়, বিশেষ উপলক্ষ্যগুলি ছাড়া। লাইভ- এইডের কনসার্ট দেখেছিল সে আমাদের সাথে রাত জেগে। সন্ধ্যাবেলা মাঝেমাঝে ‘ব্রিং দেম ব্যাক অ্যালাইভ’ নয় ‘টেইল অভ গোলডেন মাংকি’। আর মুভি অফ্‌ দ্য উইকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওপর কোনো ছবি হলে ওকে দেখতে দেয়া হয়।

কিছু একটা হতে যাচ্ছে , যা ঠিক স্বাভাবিক নয়।কেন মনে হচ্ছে আমার? পলাশ আমার দিকে একবারও তাকাচ্ছেনা। যেন আমি এ ঘরেই নেই। পলাশের তীক্ষ্ণ-লুব্ধ-উজ্জ্বল চোখ একবারও আমার ওপর পড়ছেনা।

 

তারারাও যত আলোকবর্ষদূরে…আরও দূরে

সেই দেয়ালটা আমার মনে পড়ে- যাতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পলাশ আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল।

যেন উজ্জ্বল আলোর বলয়ের ভেতর দাঁড়িয়ে ছিল সে- এইজন্যেই কি অপেক্ষায় ছিল আমার ষোল বছর বয়স?

একমুহুর্তে ডাক দিল আমার স্বপনপারের নদী-ছৈ-হ্যারিকেন…

আমি একটা উল্কার মতো ঝাঁপ দিলাম।

 

পলাশ আর আমি কোন হোটেলে পরোটা-ডাল খেয়েছিলাম?

ক’টার ট্রেনের টিকেট কেটেছিলাম?

মনে নেই, কিচ্ছু মনে নেই।

আমার মনে আছে- ‘খাসমহল’ নামের সেই অসমাপ্ত বাড়িটার দিকে অনন্তকাল ধরে আমি আসছি। আঙিনায় একটা মস্ত কালোজাম গাছ। একপাশে ডালিয়া ফুল লাগানো যত্ন করে। শরীকি পুরানো বাড়ি, তার একদিকের ভাঙা ছাদে উঠে গেছে দুরন্ত বাগানবিলাস- তার ফুল গোলাপী-কমলা মিশানো।

আর সেই ফুল-লতা-পাতার মাঝে দাঁড়িয়ে মরিচফুলের মতো বিষন্ন একটা মেয়ে। তার নাম সুরমা। ও ওর নাম বলতো সুরোমা।

সুরমার বর ছিল শাহীন। সারাদিন টিউশানি করতো সাইকেলে ঘুরে ঘুরে।

আর বাকী সময় বাগান করতো। কবুতরের খোপ সাফ করতো।

পাপিয়া নামে সুরমার এক বোন ছিল। তার কাজ ছিল চাপকল থেকে পানি তোলা আর সারাদিন পায়রা ওড়ানোর শব্দ করে হাসা…

প্রথম যেদিন আমি এসে দাঁড়ালাম ওদের তকতকে দাওয়ায়, আমার ভয়-ভয় করছিল।‘মোরা বিধাতার মত নির্ভয় মোরা প্রকৃতির মত সচ্ছল’ ইত্যাদি প্রেরণাদায়ক সংগীত, (যা সকাল থেকেই বাজছিল আমার রক্তে)নিভে এসেছে ততক্ষণে।

আমি তখনো জানিনা ঐ আঙিনায় রৌদ্রে বসে আমি পড়বো কমলকুমার মজুমদার-“যে তুমি দু’টি অব্যক্তকে একই দেহে- যে দেহে সূক্ষ্ণতা, আলো পায়, ধারন কর। এক হৃদয়ে অন্য জরায়ূতে। তুমি সেই লীলাসহচরী।”

ঐ খাপরাছাওয়া ছাদের ঘরের নীল ভোররাতে আমি স্থির চোখে চেয়ে থাকবো কালো কড়িকাঠে। ঐখানে আমি আবিষ্কার করবো জীবনের এক অন্যূন সত্যকে- পলাশ আমার শরীরে প্রবিষ্ট হতে না পেরে অন্ধকারে করজোড়ে ক্ষমা চাইবে।

 

দুধমাখা ভাত কাকে খায়, ওরে রেবু

-“মাথার উপ্‌রে বাপমায়ের ছায়া নাই দেইখা কত আদর করছে পলাশরে তর মায়, ঈদের জামাটা তর বাপে কিনা দিসে, আর সেই এমন কামডা করতে পারলো! কয়না বলে- যম-জামাই-ভাইগনা তিন হয়না আপনা…”

এইসব শুনতে আমার আর ভাল লাগেনা। মাথার ওপর শোঁ-শোঁ শব্দে পাখা ঘুরছে।নানীজান জানালার গরাদে কপাল ঠেকিয়ে বাইরে চেয়ে আছেন। বাইরে উদাস দুপুর। চৈত্রমাসের দুপুর। নিমগাছের মগডালে একটা তৃষ্ণার্ত কাক। তার টাগ্‌রা কমলা।

“…বহ্নি তোকে না আমার বেকী থ্যাচারের মতো লাগে…টম সয়্যার পড়ে আমার তোর কথা যা মনে হয়েছে!” সহজ-সপ্রতিভ পলাশ, ক্যাডেট কলেজে পিটি-প্যারেড করে কি যে কালো হয়েছে…

আমি কি ছাই বেকী থ্যাচার, ধনীর দুলালী…লেসের ফ্রক পরা ফুটফুটে মেয়ে! ছোটবোন পালিয়েছে বলে আমার বিয়েটা ভেঙে গেছে।

“ডাকবাক্সে ধু ধু শীত জমে ওঠে বিদায়ী জ্যোৎস্নায়

বৃক্ষের কোটর থেকে শেষবার পনেরো দিনের মতো

উড়ে যায় বাদামের পাতার আড়ালে গোল চাঁদ

চারিদিকে ভেঙে যাওয়া ভুল অন্ধকারে যেন তারপর

মনে পড়ে যায় তার…” মনে পড়ে যায় ছোড়দার, রেবেকা নেই। আবৃত্তি ফুরায়, শ্রান্ত ছোড়দা ঘাম-চটচটে শরীর নিয়ে খালি গায়ে মেঝেয় শুয়ে থাকে। অপরিসর রান্নাঘরে ঘোলা আলোয় আম্মা বসে বসে ডাল বাছেন। রেবেকার প্রিয় ইলিশমাছ আব্বা আর আনেননা বাজার থেকে।

চিলডাকা দুপুরে আমি জানালার পাশে বসে এলোমেলো হাতে পুরনো চিঠি খুলি। পলাশ লিখেছে- “আমার নলিটুনি, আমার পানকৌড়ি, আমার ত্যালঘাউরা পাখি…”এত ঐশ্বর্যময় এ চিঠিগুলি আমার আগে কখনো লাগেনি!

রেবেকা চলে যাবার পর ক’টা দিন জীবনে প্রথমবারের মতো আমি একাঘরে থাকতে পেরেছিলাম। গভীর রাতে আলো জ্বালিয়ে আয়নায় দাঁড়িয়ে থাকতাম আমি। পারা চটে যাওয়া হীন- আয়নায় কবেকার এক রাজকন্যা- তার চোখ রেবেকা বলতো তুতেন-খামেনের মতো দীঘল আর আয়ত। গলিত ব্রোঞ্জে গড়ানো তার স্তন। ভেষজ তেলের মতো স্থির-ভারী আর তামাটে তার নগ্ন শরীরের রঙ। আশ্চর্য, তখন আমি একবার পলাশকে একবার নাদিমকে দাঁতে দাঁত ঘষে বলতাম- “তোমরা জানোনা তোমরা কি হারালে!”

ভাগ্যিস নানীজান এসেছেন এখন ছানি কাটাতে। আমার উন্মত্ত রাত্রিগুলির অবসান হয়েছে। পলাশ ত্যালঘাউরা পাখি কি?” পলাশ আমার চুলে নাক ঘষে মেতে উঠতে উঠতে বলতো- একটা সবুজ পাখি”।

সবুজ পাখি সবুজ আকাশকে নিয়ে পালিয়েছে। হয়তো তারা সুখেই আছে।

 

কিন্তু শান্তি পাবেনা, পাবেনা পাবেনা

 

সুরমা চৌকীতে বসে বসে ভোমরকাঁটা দিয়ে ফুলস্কেপ কাগজ সেলাই করে খাতা বানাচ্ছে।

ফাল্গুন-চৈত্রমাসের বেলা। আমার চোখ টানছে ঘুমে।

বাতাসে রাজ্যের কুটো-হলদেপাতা-শিরীষের শটী। মেছো গন্ধ- পাপিয়া খালের মাছের ঝোল বসিয়েছে গ্যাঁদালপাতা দিয়ে। বাদামগাছতলায় ঝরা পাতার পুরু কমলা গালিচা।

তন্দ্রার পর্দার ভেতর দিয়ে আমি আর একটা আমিকে দেখতে পাই, মনোজ বসুর ‘খেলাঘর’ কিংবা বিমল করের ‘বালিকা-বধু’ পড়তে পড়তে বিভোর, প্রাণের ভেতর প্রথম খেলাঘর বেঁধেছে। তার থেকে এই আমি কত দূরে!

আমি পড়েছিলাম বিয়ে-পরবর্তী একটা প্রবল ঘুর্ণি তৈরী হয় পুরুষরক্তে, সেই জন্মান্ধ টান- সেই মনোরম ঝড়…কিছুই যে দেখতে পেলামনা!

আমার মনে হয় অনন্তকাল ধরে আমি বিবাহিত, কিংবা বিবাহিত অবস্থায় আমার জন্ম হয়েছে। যেন বা আমার নারীজন্ম শুরু হবার আগেই শেষ হয়েছে, আমি ক্লীব-বস্তু কোনো।

কিংবা যেন আমি বিপত্নীকের স্ত্রী…

আমার চতুর্পাশ যে পদধ্বনিতে ভরে উঠছে, সে নারী আমার বড় পরিচিত।

আমার বোন।

বহ্নি সুলতানা।

 

এই আবিষ্কারের মতো যন্ত্রণাময় আর কিছু আমি এজীবনে ভোগ করিনি।

নিজের প্রতি ঘৃণা আমাকে এমন আফিমগ্রস্ত রাখে যে পলাশের স্কেচবুকে সুরমার নগ্নদেহের ছবি আমাকে স্পর্শ করেনা।

 

মাঝে মাঝে আমি তাকিয়ে দেখি পলাশের দিকে।

‘গা-খানি তার শাওনমাসের যেমন তমাল তরু’।

কবে পরম বন্ধুর মত আমার পিঠে একটা হাত রাখবে? কবে মুগ্ধ আতুরের মত ভালবাসবে? যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি সেখান থেকে কোনো রাস্তা পুতুলঘরের কাঁচের মালা-রেশমসুতা-চুমকীর দিকে যায়না।

 

মাঝে মাঝে আমি তাকিয়ে দেখি পলাশের দিকে।

ওর কালো কালো আঙুল কতো কতো কালো কালো রাতে নেড়েচেড়ে দেখেছে আমার বোনের শরীর।

‘কে দেখেছে/কে দেখেছে/ দাদা দেখেছে।

দাদার হাতে কলম ছিল ছুঁড়ে মেরেছে’

কেউ দেখেনি ওদের।

পলাশ নিজেই বলেছে আমাকে, অকপটে।

আমিও শুনেছি- অকাতরে।

পরম সত্যবাদী তো সত্য বলে ভারমুক্ত হয়েছে।

সত্যশ্রোতার ভার নামাবে কে?

 

বহ্নি সুলতানা এখন কি করছে? এতদিনে হয়তো তার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। আয়নায় উদাস দাঁড়িয়ে সে হয়তো এখন হাতে সুগন্ধী বাম্‌ লাগাচ্ছে। রোজমেরী আর ল্যাভেন্ডার।বিকেলের চায়ে পরিবেশন করছে বাটারমিল্ক স্কোন্‌স।

আমি জানি তাকে এ-সবই খুব মানাচ্ছে।

তাকে সব মানায়!

 

বহ্নি সুলতানা

হাসপাতালে রেবেকার শিয়রে বসে থাকতে থাকতে আমার জীবনে প্রথমবারের মত মনে হতো- আমার বুক ফেটে অনর্গল কান্না ছুটে আসছে। কিন্তু আমাকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে সেই কান্না শেষ পর্যন্ত আসতোনা। স্থির হাতে আমি খোসা ছাড়িয়ে ফল কাটতাম। ইন্টার্ন ডাক্তারদের কাছে ওর কুশল পুঁছতাম। আর মাঝে মাঝে ওর শীর্ন নিরক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। কি ঘটেছিল যে ও সুইসাইড করতে গেল?

ও যখন জেগে থাকতো, চুপচাপ শুয়ে থাকতো। ছোটমামা-আম্মা-ছোড়দা-বড়দা-ভাবী…সবার সাথে টুকটাক কথা বলতো। আমার সঙ্গে ছাড়া।ঐ টুকু কথা বলতেও তার কষ্ট হতো, লজ্জাও হতো আমি জানি।

এই সুবৃহৎ পারিবারিক বিপর্যয়ে সবাই আমরা ভাব করতাম- কিছু হয়নি। যেন রেবেকা একটি দীর্ঘ বনভোজন শেষে আমাদের মধ্যে ফিরে এসেছে।

সেরে উঠে রেবেকা সবার সাথে বাড়ি ফিরে এলো। আব্বা কখনো হাসপাতালে যাননি রেবেকাকে দেখতে। কিন্তু যেদিন রেবেকা বাড়ি এলো- চুপিচুপি আব্বা বাজার থেকে একটা গোল-ইলিশ নিয়ে আসলেন।রাতে খেতে বসে ইলিশমাছের সুবাসে সজল বিস্ময়ে রেবেকা আব্বার দিকে তাকালো। একমুহুর্ত। রেবেকা তীরের মতো ছুটে গেল আব্বার বুকে। তারপর দুজনে সেকী কান্না।

এবাড়িটা কি সেই বাড়িটা? যেখানে চৌকাঠে সেই দশ বছর বয়স থেকে রেবেকা আর আমার দৈর্ঘের দাগ কাটা? যেখানে পার্ল-ক্রীম মেখে মুখ ফুলে যাবার পর বড়ভাবী আর রেবেকা ধুন্দুমার বকা খেয়েছিল? যেখানে বসার ঘরের কার্পেটে গড়িয়ে আমি আর ভাবী ইলিয়াস কাঞ্চন-চম্পার ‘ভেজা-চোখ’ নিয়ে গল্প করতাম- রেবেকা ব্যগ্র হয়ে শুনতো।

রেবেকা এখানে সন্তর্পণে হাঁটে, ফিকে হাসে। চমকে চমকে ওঠে প্রায়ই।ম্যাট্রিকের রেজাল্ট বেরুলো।রেবেকা উনিশতম হয়েছে।ওর ছবি উঠলো পত্রিকায়। নানীজান খুব খুশী-“কোরান-শরীফে আছে- আলাইহা তিস্‌ আ তু আশার…উহার উপরে উনিশ, খুব ফজীলতের সংখ্যা।”

রেবেকার বিয়ে নিয়ে একদিন পারিবারিক সালিশ বসলো। সেদিন সন্ধ্যায় রেবেকাকে পাঠিয়ে দেয়া হলো শারমীনদের বাড়িতে। সে কী বুঝলো কে জানে। কেবল তার ষোলবছরের আশ্চর্য যন্ত্রণাবিদ্ধ উজ্জ্বল মুখটার দিকে তাকাতে পারলামনা আমি। যে ‘রেলওয়ে চিল্ড্রেন’এর রঙীন মলাটে মুখ ডুবিয়ে কৈশোর পার করছিল, তার জীবনে এমন আঘাতের কী প্রয়োজন ছিল?

 

চড়ুইপাখি বারোটা/ডিম পেড়েছে তেরটা/ একটা ডিম নষ্ট/ চড়ুইপাখির কষ্ট…

অনেক বছর পরে যখন আমি দালির ছবি দেখি, তখন আমার মনে হয়েছিল- ওরকম গলে গলে বীভৎসভাবে ঝরে পড়া সময় আমিও অনুভব করেছি- আমাদের আব্বা যখন মারা যান।

আমার আর পলাশের বিয়েটা বৈধ কিনা…মুসলিম বিবাহ আইন কি বলে- এসব নিয়ে তখন প্রতিদিন জোর তর্কাতর্কি চলছে বাসায়। সবে কলেজে ভর্তি হয়েছি আমি। এই যখন চলছে তখন একরাতে আব্বা মারা যান।

হঠাৎ করেই।

হঠাৎ করেই প্রকান্ড আকাশ আর জ্বলন্ত সূর্যের নীচে আমরা একদম নগ্ন হয়ে পড়ি।

আমি তখন রৌদ্রে বসে ক্ষতস্থান লেহনরত তৃণভোজীর মতো। অনেকটা দৌড়োবার পর অবসন্ন।

ঠিক সেই সময় আমি পড়ছিলাম ‘লিটল্‌ উইমেন’। চার সহোদরার গল্প। চার পাঁপড়ির রঙ্গন।

কি পরিপূর্ণ বিশ্বাসের সাথে- আগ্রহের সাথে তারা জীবনকে গ্রহণ করে। জীবনযুদ্ধে রত হয়।

এইসব পড়ি আর অপাঙ্গে বহ্নি সুলতানাকে দেখি।

 

আব্বা মারা যাবার ঠিক কিছুক্ষণ আগে সংজ্ঞা ফিরে পেয়েছিলেন। মাত্র কয়েকমূহুর্তের জন্যে। কাতরভাবে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানোর চেষ্টা করছিলেন আমার দিকে। বারবার।

আব্বার মৃত্যু আম্মা মেনে নিতে পারেননি। আসলে আব্বাকে নিয়ে আম্মার একটা নিজস্ব পৃথিবী ছিল। আমরা সেখানকার বাসিন্দা ছিলামনা।

বিকেলে গা ধুয়ে চুল বেঁধে নিজের বোনা রঙীন স্টোল গায়ে দিয়ে আম্মা প্রায়ই পাড়ার ‘শ্যামলী’ স্টুডিওতে আব্বার সাথে ছবি তুলতে যেতেন। বিয়ের দাওয়াতেও সেজেগুজে শুধু দু’জন বেরিয়ে যেতেন। আমাদের নিতেননা। হাসপাতালের উৎকট ফিনাইলের গন্ধের ভেতর হতভম্ব হয়ে বসে আম্মা দেখলেন- তাঁর অন্তরঙ্গ বিকেল তাঁরই চোখের সামনে দিয়ে জীবনের মতো চলে গেল।

 

সামনে দাঁড়িয়ে মূর্তিমান আমি। বাবার মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ। আম্মা একটা তীক্ষ্ণ চীৎকার করে ছুটে এসে আমার গলা টিপে ধরলেন।

সেই একবারই, শোকের উৎকট প্রকাশ।

আম্মা আমার সাথে এরপর আর কোনদিন কথা বলেননাই।

 

বড়দা নুপুর আর বাবলুকে ভাল স্কুলে পড়াবার জন্যে ধানমন্ডী চলে গেলেন। বড়দার সঙ্গে আমি যেতে চেয়েছিলাম। নুপুর এবং বাবলুকে যথেষ্ট ভালবাসিনা বলে বড়দা আমার দায়িত্ব নিতে রাজি হলেননা। (নুপুরের ভালোনাম যে ‘তাজমানা’ আর বাবলুর নাম যে ‘মারজান’-তাই-ইতো আমার মনে থাকেনা।)

তাজমানা আর মারজানের ছোট খালা তাদের খুব ভালবাসে। তাই সে বড়দার বাসায় থেকে লালমাটিয়া মহিলা কলেজে পড়তে শুরু করলো।(বাবার বোন পিসী, ভাতকাপড়ে পুষি/ মায়ের বোন মাসী, কাদায়জলে খুশী…?)

 

আমরা কলোনীর বাসা ছেড়ে জিগাতলা এলাম। সংসার চালাতো বহ্নি সুলতানা আর ছোড়দা।

বহ্নি সুলতানা একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াতো।

দাদীর দিয়ে যাওয়া নরম রঙা লক্ষ্ণৌর চিকন কাজের শাড়ি…

ব্যাগ থেকে ছোট্ট কৌটো বের করে খুলে খাচ্ছে দ্যুতিময় পিপারমেন্টের দানা।

দীঘল পায়ে পাতলা চটি।

অজস্র বর্তুলঠোঁট-ঘুমঘুম চোখ-গুরুশ্রোণি নারীর ভেতর একেবারে বলাকার পাখা মেলে ঘুরতো সে।

 

সন্ধ্যায় বাচ্চারা পড়তে আসতো তার বাসায়।

ফুটফুটে মেয়েরা। ‘ক্ষীর-ননী-চিনি আর ভালো যাহা দুনিয়ায়/ তাই দিয়ে মেয়েগুলি তৈরী।’

 

মা আমার সাথে কথা বলেনা। আমি বহ্নি সুলতানার সাথে কথা বলিনা। আমাদের দুজনের কারো সাথে ছোড়দা কথা বলবার ফুরসত পায়না। অদ্ভুত বাড়ি!

ক্রমেই আমার মায়ামুকুর হয়ে ওঠে শারমীন। আমার যাদুআয়না। আমরা আলিঙ্গনের পুরাতন মুদ্রাকে পুনরাবিষ্কার করি।

 

বহ্নি সুলতানা

ঢাকা শহর ছেয়ে দেবদারু আর মেহগনি গাছ বসন্তোৎসব করছে। মিরপুর রোড।রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল। ধানমন্ডী ১১ নম্বর। নীলক্ষেত। তাদের চকচকে মাথায় নতুন পিঙ্গল পল্লব।স্কুল থেকে ফিরবার সময় আমি প্রায়ই হেঁটে বাড়ি ফিরি। চারিদিকে এত রঙ। এত ঝলমলে দুপুর।

একসময় এমনি দুপুরে বাড়ি ফিরে দেখতাম পলাশ এসেছে।সবে গোসল করে টাটকিনী মাছের ঝোল দিয়ে ভাত মাখছে। সামনে ল্যুভ মিউজিয়াম দেখছে এমন ভঙ্গীতে বসে আছে রেবেকা। পলাশ শান্ত চোখ তুলে আমার বাড়ি ফেরা দেখতো। তারপর আবারও রেবেকার সাথে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আলাপ জুড়ে দিতো। আপাত নিস্তরঙ্গ সেই দুপুর আমাদের দু’জনকে সবার আড়ালে তরঙ্গায়িত করতো। জানতাম ঊর্মিল রাত আসছে।

সেসব যেন কবেকার কথা। পলাশকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। রেবেকার বিয়েটা একটা অমীমাংসিত বিষয় হয়ে আছে।

ইত্যবসরে রেবেকা কলেজে পড়ছে। কলেজের অনেকেই জানেনা রেবেকা বিবাহিত। ‘অনেকেই’ না, বোধহয় কেউই জানেনা। রেবেকা এমনকি শারমীনকেও কিছু বলেনি।ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরপরই রেবেকা পালিয়ে গেছিল। রেজাল্টের আগেই ফিরে এসেছে। মাঝের সময়টা- সবাই জানে সে মামাবাড়িতে ছিল।

কলেজের একঝাঁক প্রজাপতির মতো মেয়ে। তার ভেতর রেবেকা। গোপনে বয়ে চলেছে কি বিপুল বিষাদ! পুরনো মোটাসোটা রেবেকাকে মোমের মতো পুড়িয়ে পুড়িয়ে কে যেন এমন প্রখর বিষাদপ্রতিমা করে গড়েছে। এলোমেলো করে ছাঁটা চুল, আত্মমগ্ন-অনতি উজ্জ্বল মুখ রেবেকা, সে ছিল চির-উদাসীন। অথচ এখন সে ফিকে হলদে দোপাট্টা পরলে সঙ্গে পরে নীলচে-কাঁচের চুড়ি। একরঙা তাঁতের শাড়ি পরলে বাঁধনি প্রিন্টের ব্লাউজ। একটু ভাবনা থাকে তার সাজে, যা আগে কখনো ছিলনা। যৌবনের একটা নিজস্ব ঔজ্জ্বল্য আছে। উত্তাপও আছে।তার শিখায় সকলি উজ্জ্বল হয়।

রেবেকার কি পলাশকে মনে পড়ে? নিশ্চয় পড়ে। এবং সেটা লোকচক্ষুর অন্তরালে। রাতে। একই ঘরে নিস্পন্দ পড়ে থেকে- আমি টের পাই রেবেকা কাঁদছে। ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে। কখনো চুপচাপ সব কাপড়চোপড় খুলে ফেলে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকে। শরীর শারীরিক স্মৃতি ভোলেনা। মন ভুলতে চাইলেও না।

মানুষের শরীরের চেয়ে মানুষখেকো আর কোন প্রাণী আছে নাকি?

পলাশ কি ওকে সব বলেছে? বলেছে নিশ্চয়ই। ওর ব্যবহারেই তো আমি টের পাই। আমাকে শাস্তি দেবার জন্যেই বলেছে পলাশ। স-ব।

তারপরও রাত্রির অন্তহীন প্রহরে রেবেকা কাকে মনে করে? অনুভব করে, অভাববোধ করে। কাকে?

রাতগুলি থেকে আমি পালাতে চাই। আমি চাই অনন্ত সৌরদিবস। একই নির্জনতায় ধুঁকেধুঁকে একই পুরুষকে স্মরণ করবার ব্যভিচার থেকে আমি আর রেবেকা দু’জনই (হয়তো!)পালাতে চাই।

 

তুলে আনি আহা অনুভূতিময় ঝিনুক আমার ঝিনুক

ক্যান্টিনের অজস্র দিকমুখী শব্দের ভেতর আমি আর শারমীন মুখোমুখি বসে আছি। আজকাল খুব টাই-ডাই চলছে! আর্টস এর মেয়েরা ঝলমল করছে কড়া হলদে-গোলাপি-বোতল সবুজ-মরচে রঙা মেরুনে।

স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার পতন উপলক্ষে ক’দিন খুব ছুটি ছিল। চতুর্দিকে মুক্তিপিয়াসী উন্মাদ মানুষ। বাংলাদেশের পতাকা পতপতিয়ে ছুটে যাচ্ছে মোটরবাইক…ম্যাগাজিনগুলি মিষ্টির দোকানের মাছির মতো ব্যস্ত এরশাদের হেরেমচারিনীদের নিয়ে…

সামনে আমাদের পরীক্ষা। শারমীন খুব বিচলিত, ওর শ্যামলা মুখে ঘন রঙ। উদয়ন কালকে ওদের বাড়ির সিঁড়িতে লুকিয়েছিল। কাল ছিল শারমীনের জন্মদিন। হলিক্রস কলেজের মেয়েরা দীর্ঘসময় ধরে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস করে। শারমীন কলেজ থেকে ফিরেছে সন্ধ্যার মুখে।

শেষ বিকেলের চম্পাফুলি আলোয় সিঁড়ির অন্ধকারে উদয়ন ওর হাতে চুমু খেয়েছে। শারমীন খুব উত্তেজিত কারণ এর পর থেকে ওর হাতঘড়িটা বন্ধ হয়ে আছে।

(ওর বন্ধ ঘড়িটার ডায়ালের দিকে তাকিয়ে আমার মনে পড়লো, ক্লাস ফাইভের আগে আমাদের ঘড়ি পরা নিষেধ ছিল স্কুলে, এক বেনী/এক ঝুঁটি করা নিষেধ ছিল…কেন?)

আমি খুব হেঁহেঁ করছি। কারণ প্রথম চুম্বনের উত্তেজনা…এইসব আসলে আমার কাছে হাস্যকর রকমের শিশুতোষ লাগছে।

ক্যান্টিনের এককোণে বসন্তোৎসবের রিহার্সাল চলছে।‘খেলবে গরু/চরবে রাখাল’ গেয়ে কারা যেন হো-হো করে হেসে উঠলো।শারমীন উঠে গেল।

ভিড়ের ভেতর কোমল পানীয়ের বোতলে ঘাড় গুঁজে আমি মনে মনে বলি- আমার খুব বড় হবার ইচ্ছে ছিল। পলাশ তোমাকে ধন্যবাদ, তুমি আমার বয়স অনেক বাড়িয়ে দিয়েছো।

কেবল দু’মাসে কারও বয়স এতটা বেড়েছে বলে আমার জানা নেই।

কোনদিন হয়তো আমার আবার নরম নওল-হলুদ প্রজাপতি হতে ইচ্ছে করবে। স্বপ্নের ফেনায় মৎসকুমারীর মত হিল্লোল তুলে-বুকের ঝিনুক খুলে দিয়ে থর্‌থর্‌ স্নান করতে ইচ্ছে হবে!আমাকে ‘পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যা’ ভেবে নেবে কেউ। হয়তো কোনোদিন!(তারপর দেখবে আমার পা নেই, লেজ আছে! হাঃহাঃহাঃ হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের মৎস্যকুমারীর মতো)

আপাতত আমি শৈবাল ঢাকা প্রাচীন পাথর।

স্থাবর।

শারমীন হাসতে হাসতে এসে বলে- তুই ‘দে লো সখী দে’ গানটা পারিস?”

-সুমাইয়া তো এই গানটা তিনদিন ধরেই শিখাচ্ছে।”

-বিম্বাধরে হাসি নাহি ধরে…এইটা আফিয়া গেয়েছে ‘ডিম্বাধারে হাসি নাহি ধরে’ আর সুমাইয়া তো ফায়ার, কার ডিম্বাধারে হাসি নাহি ধরে?”

 

গোসল করবার সময় মাঝেমাঝে ইচ্ছে হয় চিৎকার করে কাঁদি। এই অবিরল জলের ধারায় আমার ঐদু’মাসের অসহ স্মৃতি ধুয়ে যেতে পারেনা!

বাথরুমের বাইরে পৃথিবী আগের মতোই ঘুরছে। ছোটমামা মাধুরীর পোস্টার ফেলে দিয়ে কবুতর-কাঁধে ভাগ্যশ্রীর পোস্টার লাগাচ্ছে (যত টাটকা, তত মাখতে মজা!)।

আম্মা দুধ জ্বাল দিয়ে কাওনের ক্ষীর বানাচ্ছেন।

বহ্নি সুলতানা রূপালী পিপারমেন্টের দানা চিবোতে চিবোতে খাতা কাটছে।

তার মাঝে আমি বেরিয়ে এসেছি-সদ্যস্নাত, রক্তিম।

আমার মনের মিতা হয়ে উদাস চোখে শিশুগাছের মাথার দিকে চেয়ে আছে সিস্টার নীতা রোজারিও, কলেজের পুরনো লাইব্রেরীর জানালায় দাঁড়িয়ে।

আমি আর শারমীন অদলবদল করে খুব বই পড়ছি।সত্যজিত রায় থেকে লীলা মজুমদার। মৈত্রেয়ী দেবী আর মহাশ্বেতা দেবী।অদ্বৈত মল্লবর্মণ।মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।

শার্লট ব্রন্টি আর এমিলি ব্রন্টি। জেন অস্টেন। ভিক্টর হিউগোর সরল বাংলা অনুবাদ।

আমাদের হাড়মজ্জায় ছেয়ে যাচ্ছে বিশ্বসংসারের অপার আনন্দের হাট। এই বাড়ন্ত জীবন আমার ভাল লাগছে।

শরীর।শরীর। তোমার মন নাই কুসুম? রেবেকা?

আমি কি আর যীশু না হাবিজাবি

ওদের মতো সব সহিষ্ণু?

অগনন তারা জ্বলে খরার আকাশে।তারায় ভরা চৈত্রমাসের রাতে।

‘আমি কান পেতে রই’।

কলেজ থেকে ফিরে প্রতিদিন চিঠির বাক্সে খোঁজ করি। যেন আমার চিঠি আসবার কথা। তারপর বাসীগন্ধ মোজা-খাদীমের ক্যানভাস জুতার সাথেসাথে ইচ্ছেটাকে খুলে ফেলি।

 

বহ্নি সুলতানা

-“আপনার নামে হেড-অফিসে কমপ্লেন গেছে- আপনি খুব রুড আর খুব মিসবিহেইভ করেন”।

আমি স্থির দৃষ্টিতে মিসেস ফারিয়া আলী রহমানের দিকে চেয়ে থাকি।

-“এরা তো নেহাত বাচ্চা তাইনা? এদের সাথে বাচ্চার মতোই ট্রিট করতে হবে…” ফারিয়া সন্তর্পনে স্তন চুলকে তাঁর বৎসল শরীর এলিয়ে দিয়ে বলেন।

তের-চৌদ্দ-পনেরর বেয়াড়া বেড়ে ওঠা বাচ্চারা আমার চোখে ভাসে। তাদের আঠালো দৃষ্টি- কামুক শরীর আর স্ল্যামবুকে লেখা অকথ্য খিস্তি। তাদের স্কুলের বাথরুমে সেক্স করতে গিয়ে ধরা পড়া। তাদের প্যাডেড্‌ ব্রা। বুলেট ব্রা। পানির ফ্লাস্কে বীয়র।

-“আমরা যেভাবে বাংলা মিডিয়মের টীচারদের অশেষ প্রিচিং শুনে বড় হয়েছি, সেভাবে এরা বড় হবেনা মিস সুলতানা। এদের স্নেহ করে, আদর করে ভালবেসে শেখাতে হবে।”

গনগনে মাথায় ক্লাসে ফিরে আসি। একত্রিশটা অনিচ্ছুক পড়ুয়াকে পড়াতে, হোমওয়ার্ক দিতে, ক্লাসওয়ার্ক দিতে। আমার ভেতর আমার দাদীজানের দুরন্ত রাগ রক্ত হয়ে দপ্‌দপ্‌ করতে থাকে।

বাড়ি ফিরে ডাইনিং টেবিলে মাথা চেপে বসে থাকি। মাথার উপর পাখা ঘুরছে। এইসময়টা মুখে-চোখে পানি দিয়ে কিছু খেয়ে আধঘন্টা জিরিয়ে নেই আমি। মাথা তুলতে ইচ্ছাই হচ্ছেনা। ঠক্‌ করে গ্লাস রাখলো কে আমার সামনে! হিম্‌কনা মাখা লাল তরমুজের শাঁস…রেবেকা শরবতের গ্লাসটা রেখে চলে যাচ্ছে।তার অপসৃয়মান শরীরের দিকে তাকিয়ে আমার ভেতর থেকে সাপের মতো হিসহিসে তৃষ্ণাময় কি একটা বস্তু বেরিয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরতে চায়।

পারেনা। আমি তো শিরীন সুলতানা। মৃত্যুসংবাদও যাকে কাঁদাতে পারেনা।

 

শিশিরপ্রতিম শূণ্যতা সবখানে

“নীল আকাশে খইক্ষেতের সোনালি ফুলের মতো অজস্র তারা,

শিরীষ বনের সবুজ রোমশ নীড়ে

সোনার ডিমের মতো

ফাল্গুনের চাঁদ…”

সন্ধ্যার ছাদে দাঁড়িয়েছিলাম আমি। অল্প অল্প কুয়াশার ভিতর ফোঁটা ফোঁটা জলের মতো ঝাপসা রঙ- কমলা-মেঠো-গোলাপী-ধুমল-জোনাকী নীল।

অন্ধকার নেমে আসছিল দ্রুত। স্বচ্ছশির পালকের মতো মেঘ।

সেই সন্ধ্যাবেলা। আমি কখনো ভুলবোনা।

সেই যে আমার প্রথম সুরজিতকে দেখা।

একটা অতিকায় টব নিয়ে ছাদে উঠে এলো। নতুন ভাড়াটিয়া ওরা- আমাদের মুখোমুখি ফ্ল্যাটে।

 

সন্ধ্যার নিবিড় আলোয় নাতিদীর্ঘ-হালকা-পাতলা সুরজিত গোলাপফুলের টব নিয়ে উঠে এলো। নাকের ওপর চশমার পুরু পরকলা। কাঁচের ব্যবধান ছাপিয়ে আমার মনে হলো- ওর চোখজোড়া দূর বাতিঘরের মতো! কেন মনে হলো?

সুরজিত ময়লা শাদা রুমালে কপাল মুছলো। চশমা মুছলো। তারপর চলে গেল।

 

আমার একরকম চিনচিনে কষ্ট হলো। তার পরপরই একটা বিহ্বলতার অনুভূতি। নীচে নেমে এসে দেখি- শবে বরাতের তোড়জোড় চলছে।

বাতাসে একটা উৎসব।ঘি-তেজপাতার ঘ্রাণ। দিস্তা-দিস্তা রুটি করছে শেফালির মা। আম্মা আগরবাতি জ্বালিয়েছেন একগোছা।

বহ্নি সুলতানা ক্লান্ত হয়ে শুয়ে আছে, একটু পরে উঠে নামাজ পড়া শুরু করবে।আজকাল ওর দিকে চেয়ে দেখি, ওর কপাল জীর্ণ হতে শুরু করেছে।

শেফালির মা ট্রে সাজিয়ে দিল।

ওপর তলা। নিচ তলা। পাশের ফ্ল্যাট। হাতরুটি আর ছোলার ডালের হালুয়া আর মোহনভোগ।

সুরজিতদের বাড়িতে দুধ-নারিকেলের-বাসীকাপড়ের একটা গন্ধ থমকে ছিল। রামকৃষ্ণদেব আর সারদামায়ের ছবি টাঙানো।

হৃষ্টপুষ্ট এক সিঁদুরের টিপ পরা মহিলা বেরিয়ে এলেন- “বি ফ্ল্যাটের না গো? তোমরা কয় বোন জানি?”…টুকটাক আলাপ। মুখভর্তি জর্দাপান আর একগাল হাসি। সুরজিত আর বের হয়ে আসেনি।

ভোররাতে একটা স্বপ্ন দেখলাম আমি- সুরজিত একটা ছোট্ট চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ডাকছে- রেবা! রেবা! (আমাকেই নিশ্চয়।) ঐ তো আমি দরজায় দেখা দিলাম। মিতুলের বেতনবই দাও রেবা! মিতুল কে?

ঘুম ভেঙে দেখি খুব লজ্জা লাগছে। কেন জানিনা। জোনাকীর ঠান্ডা আগুনের মতো কী একটা নিরুত্তাপ আলো লাগছে আমার গায়ে।

সেই যে আমি প্রথম সুরজিতকে দেখেছিলাম, সন্ধ্যার আকাশের মতো সোনালী শ্যামবর্ণ, ভাবমগ্ন-তন্ময় চোখ- আমার এতো শান্তি শান্তি লেগেছিল!

আশ্চর্য এই যে ওকে আরেকবার দেখবার আগে কয়েকবার আমি স্বপ্নগুলি দেখতে লাগলাম। স্বপ্নে আমার লেসের পর্দা টাঙান জানালা-দরজা, আমার দুইটি বাচ্চা- মিতুল আর টুটুল (কি অসহ্য ন্যাকা নাম!)। স্বপ্নের সুরজিতের কিন্তু খুব রাগ। রেবা! রেবা!(মার্লন ব্রান্ডোর ‘আ স্ট্রীটকার নেম্‌ড ডিজায়ার’ এর সেই স্টেলা, স্টেলা চিৎকারের মতন? পরে আমার মনে হয়েছে সিনেমাটা দেখবার সময়!)

এইসব ক্রনিক স্বপ্নের জন্যে আমার সুরজিতকে দেখলেই পরে অস্বস্তি লাগতো, সহজ হতে সময় লাগতো।

বহ্নি সুলতানা

ল্যাভেন্ডার আর অলিভ ঝাপসা ছাপা শিফন, তাতে প্রখর হরফে লেখা শরীর। অক্ষরগুলি স্পষ্ট আর হাতছানিকর। নরম তোষামুদে রঙের লিপস্টিক।কানদুটোতে ঝিকমিক করছে জলপাইরঙা-রোদ জমানো পাথর।

রেবেকাকে এতো সুন্দর কবে দেখেছি?

ছোড়দা জিজ্ঞেস করলো- “কৈ যাস তুই?”

-“শারমীনদের বাসায়। আজকে থাকবো।”

আর কোনো প্রশ্ন নেই। আম্মা ছোড়দার বিকেলের নাস্তা বেলা-বিস্কুট আর চা ঠেলে দেন। রেবেকাকে কিছুই জিজ্ঞেস করেননা। আমি আমার ঘর থেকে রেবেকাকে ডাকি। রেবেকা এসে দাঁড়ায়। ওর কপালে একটা ফিকে বেগুনি পাথরের টিপ পরিয়ে দিই। ও একটু অবাক হয়।

-“শীত পড়ছে, তুই একটা শাল নিয়ে যা।” চুলে শেষবার চিরুনি চালাচ্ছে রেবেকা, আম্মা চলে গেছেন নামাজ পড়তে, কলিংবেল বাজলো। ছোড়দা দরজা খুলে দিতেই শব্দ পেলাম- প্রথমে কথা বলবার-তারপর কিল-ঘুষি-ধস্তাধস্তির। দৌড়ে গিয়ে দেখি পলাশ। এলোমেলো চুলদাড়ি। ঠোঁটের কোন কেটে রক্ত বের হচ্ছে। ছোড়দা তখনো মুষ্টি পাকিয়ে মুখ লাল করে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি প্রথমে এতো অবাক হয়ে গেছিলাম যে- নড়তে পারছিলামনা। পলাশ তার গভীর-শ্যামল মুখ তুলে বললো- রেবেকা কোথায়?”

-“তা দিয়ে তোর কি শুয়োরের বাচ্চা?”

ছায়ার মতো আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে রেবেকা, কখন যে! আমি সংবিত ফিরে পেলাম। কঠিন গলায় বললাম- “আমার নাবালিকা বোনকে তুমি অনেক ভুগিয়েছো পলাশ। এই বিয়ে আমরা মানিনা।” বললাম-“তুমি কেন এসেছো এখানে? এতদিন পর তোমার রেবেকার কথা মনে হয়েছে?”

পলাশ খুব অবাক হয়ে-ক্লান্ত হয়ে-সুদূর হয়ে আমার দিকে তাকালো। যেন আমি এসিরীয় কীলকলিপি, দুর্বোধ্য-পুরাতন চিহ্ন। বাহ! আমি রেবেকার ভাষায় ভাবতে শিখেছি!

ছোড়দা খেঁকিয়ে উঠলো- তুই শুনতে পাসনা?”

পলাশ কি একটা বলবার চেষ্টা করলো। এমন সময় রেবেকা এসে দাঁড়ালো- “তুমি ভেতরে আসো।” একটা অসম্ভব ভয় এবং ক্রোধে আমি কাঁপতে থাকি।

 

আমরা দু’জনে বেগুনী আকাশে/ সোনালি ডানার শঙ্খচিল

সেদিন আমাদের বসবার ঘরে আমি আর পলাশ নিঃশব্দমুখে বসে ছিলাম।একটা মামুলি কুশল প্রশ্নও পলাশের মুখে জোগায়নি।

আমি ছিলাম মিশ্র অনুভবের পাতাবাহার।

প্রথম আমার মনে পড়লো মুগ্ধ বালিকার চোখের নায়ককে। ‘ধানের কঠিন খোসা-খড়-হিম-শুকনো সব পাপড়ির মাঝে সেই মেয়ে/ইতস্ততঃ বসে আছে’… ছোড়দার ঘরে শুতো পলাশ- ঘরের ভিতরে ডোরাকাটা মশারি-স্যান্ডোগেঞ্জী আর মশার কয়েলের ভিতরে থমকে থাকতো ওর গায়ের গন্ধ। ফিস্‌ফিস্‌ করতেন জর্জ মাইকেল।

আঙিনায় রৌদ্রে-আমলকির ছায়ায় আমার চুলে নাক ঘষছে পলাশ, খাসমহলের সেই রোদ ইলিবিলি কাটা ঘরটা! আর স্বপ্নের দেশ থেকে কে ডাকে রাগতস্বরে- রেবা! রেবা!

এতসব চলচ্চিত্রের ধাক্কায় বিহ্বল আমি চেয়ে দেখি- বিবর্ণ-ধুলিধূসর পলাশকে। একে আমি জিনে নিয়েছিলাম বহ্নি সুলতানার কাছ থেকে! এত্তো ছোট বিজয়!

পলাশ কিছুই বলছেনা।

আমি হাসছিনা, আমার মুখভঙ্গীও প্রসন্ন নয়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কুটিপাটি হচ্ছে আমার হৃদয়, ঝনঝনিয়ে হাসতে হাসতে। কি না, মিতুল আর টুটুল!

আমি যদি প্রশ্ন করতাম, পলাশের জন্যে সহজ হোত। কোনো প্রশ্নই করলামনা। পলাশ মাথা নিচু করে বসেই রইলো। ওর নত মাথার দিকে চেয়ে মনে হলো- ঘৃণার শক্তিও ভালবাসার মতই, প্রবল!

আমি তাহলে ঘৃণার জোরে টিকে আছি!

সেদিন রাতে আমি খুব শান্তি করে ঘুমালাম। মশারীর নীলচে নিভৃতিতে নীল-মাছের মতো একঝলক ডুব দিয়ে-

(এইরকম আর একবার হয়েছিল। খুব মেঘ করে বৃষ্টি হয়েছিল সেদিন, আমি আটকা পড়েছিলাম সুরজিতের মেসে। শিলাবৃষ্টির ভিতর, বাসী-বিছানার চিটচিটে গন্ধের ভেতর আমি ওর হাত ধরে বসেছিলাম। সুরজিত ঘামছিল। কারেন্ট ছিলনা। সেদিনও খুব শান্তি লেগেছিল আমার। কিন্তু সে অনেক পরের কথা।)

সেসময় আমি উইদারিং হাইট্‌স্‌ পড়ছি।হিথক্লীফ্‌- চুপচাপ-নির্বাকপ্রায়-গোঁয়ার-বুকের ভেতর লাভার মতো গরগরে আগ্নেয় প্রেম- প্রেয়সীর মৃত্যুর রাতে তার শোবার ঘরের জানালার নিচে ঐ দাঁড়িয়ে থাকা- তাকে স্থানু পেয়ে কাঁধের কাছে নেমে এসেছে কাঠবেড়ালি-চুলে জমেছে শিশির।

জগতে প্রেম বলে একটা জন্মাদপি পুরাতন-মৃত্যুঞ্জয়ী বস্তু আছে- এই বোধ আমার একটু একটু করে ফিরে আসছিল।

মাঝেমাঝে ছাদে যেতাম। সন্ধ্যাদেবী আকাশে ছড়িয়েছে অন্তহীন ঐশ্বর্য। সুরজিত গোলাপের টবের পরিচর্যায় রত।চশমার পেছনে দূরবর্তী চোখ। কিংবা এন্তার ডাক্তারীর পড়া মুখস্ত করছে পায়চারি করে।কার্নিশে রাখা এক কাপ চা। একদিন জিজ্ঞেস করলো- “জীবনানন্দ দাশ তোমার খুব প্রিয়?”

-খুব।”

-“তোমাকে নিয়ে জীবনানন্দ দাশের একটা কবিতার লাইন আছে জানো? জেগে থাকো যদি তুমি অন্ধকারে-সেজোনাকো ব্যথার রেবেকা…”

আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। আমার তীক্ষ্ণ-মুগ্ধ চোখের সামনে সুরজিত অস্বস্তিবোধ করে-শরীরের ভর এক পা থেকে আরেক পায়ে সরিয়ে নিয়ে বলে- “তোমার পরীক্ষা সামনে? খুব পড়তেছো?”

-খুব কৈ। পড়তে বসলেই আমার ঘুম পায়। কেমিস্ট্রী সেকেন্ড পার্ট আমারে ডুবাবে।”

-এত ঘুম পাইলে জগতটার মজাই নিতে পারবানা। কতো বিউটিফুল নভেল আছে- কতো মহৎ সিনেমা আছে- সব দেখতে হবেনা এক জীবনে?”

এত দৃষ্টিক্ষুধা যে লোকের, তার নাকে ঝুলছে পুরু চশমা। চশমার কাঁচ কুয়ার মতো গভীর হয়ে নেমে গেছে ভেতরে। অনেক নীচে চিকচিক করছে চোখ।

-আপনার পাওয়ার কতো?”

-শুনলে ভিরমি খাবা। অনেক। চশমা ছাড়া প্রায় অন্ধ!”

-মেডিক্যালের পড়া অনেক টাফ্‌? খালি তো দেখি মুখস্ত করেন!”

-তাও তো মনে থাকেনা। তোমার ভর্তির টার্গেট কি? মেডিক্যাল না বুয়েট?”

-জানিনা। আমি কবিতা পড়তে চাই।বাঁধাকপি চাষ করতে চাই। আর জিলাপি বানানো শিখতে চাই। মুখে বললাম না।ভিরমি খাবে! হাসলাম শুধু।

 

বহ্নি সুলতানা

“আন্তঃনগর মহাসড়ক যখন ঝমঝমিয়ে ভৈরব ব্রীজে উঠে পড়েছে- তখন আমার পাশে পলাশ ঘুমাচ্ছে। ব্রীজের নীচে নদী, নদীতে চর, চরে দীর্ঘ ঘাস। ধঞ্চেফুল। আকাশ ভরা সকালের গভীর আলো।”

ট্রেনের জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে কী ভেবেছিল আমার নবপরিণীতা বোন? হয়তো কোনো শুভদিনের প্রার্থনা।রেবেকা তার ডায়েরীতে লিখেছে

“লালমাটির পাহাড় শুরু হবার ঠিক আগে আগে একটা বিশাল ধানক্ষেত, নাড়া পোড়ানো শেষ প্রায়, দূরে দূরে স্তূপাকার খড়ের পালান। এত বিপুল- এত শূণ্য- এত হেমন্তের রঙে আঁকা মাঠ আমি কখনো দেখিনি। আমার খুব শীত লাগতে লাগলো, খুব কান্না পেলো। আমি পলাশকে একটু ধাক্কা দিলাম। পলাশ জাগলোনা।”

এইখানে আমার দাদীর কথা মনে পড়লো। আমার দাদী বলতেন- ফুলবাগান মালির হাতে পড়লো নাকি কাঠুরিয়ার হাতে…সেইটাই দেখবার বিষয়।’কার উদ্ধৃতি দিয়ে বলতেন তা আজ আর আমার মনে নেই। আমার চোখে ভাসে তাঁর রূপালী মাথা, সোনার গয়না তাঁকে একরকম ধাতব সম্ভ্রম দিতো। মনে হতো, এ যেন তাঁর প্রাকৃতিক অনুষঙ্গ।

আজ সাত-ই পৌষ।সকালে খবরের কাগজে দেখেছি। আজ আমার গায়ে আমার দাদীর গহনা- বিছাহার-ঠোকা কঙ্কণ-নাকছাবি-মুক্তার কান, বড়ভাবী সেগুলি অ্যান্টিক পলিশ্‌ দিয়ে এনেছে।বড়ভাবী-আমার বলাকা হলে স্মিতা পাতিলের ‘দর্দ কা রিশ্‌তা’ দেখার সঙ্গী আমাকে পার্লারে নিয়ে গিয়ে উপর্যুপরি সাজিয়ে এনেছে।(রেবেকা একসময় বলতো- আমি মিশরকুমারী)) এবং সত্যিই আমাকে নীলনদের পাড়ের তাম্রাভ সুন্দরীর মতো দেখাচ্ছে।

প্রায় অসভ্য রকমের বড় পাথরের আংটি আমার আঙুলে খোঁচাচ্ছে। গথিক চার্চের রোজ-উইন্ডোর মতো বড় আর কারুকার্যময়। এটা বিয়ের আংটি।আজ সকালেও আমি অলস কৌচে বসে লুকিয়ে রেবেকার রোজনামচা পড়েছি।একত্রিশটা খাতার রচনা দেখেছি।অথচ সন্ধ্যাবেলা হঠাৎ করেই আমার আক্‌দ্‌ হয়ে গেল।আমার সাথে যার বিয়ে হলো-(বিয়েই তো!) তার নাম ইউসুফ জহির।বিয়ে পড়ানোর পর রেবেকার বন্ধুরা তাকে একবার নিয়ে এসেছিল ভেতরে। আয়না ধরেছিল সামনে। ধোয়ামোছা ঝকঝকে আয়নায় আমি যখন তার মুখ আবছা দেখতে পেলাম, বহুকাল পর আমার নাদিমের কথা মনে পড়লো।

অল্পবয়েসের মাধুর্যে ভরা স্বপ্নিল যুবকের মুখ!

তাতে একপোঁচ লালচে লজ্জা।

একপোঁচ নীলচে কুন্ঠা।

আমার চোখ এমন ঝাপসা হয়ে এলো- আমি ইউসুফের মুখ দেখতে পেলামনা।

নাদিমের জন্যে এই আকুলতার কোনো মানে নেই। আড়চোখে দেখলাম, ভাঁজ করা হাত- নীরক্ত রকমের ফর্সা, সোনালী লোম, কবজিতে টিসোট্‌ ঘড়ি। গোল পরিচ্ছন্ন ডায়াল।কাছ ঘেঁষে বসেছে বলে ভাল পারফিউমের গন্ধ পাচ্ছি।

এরপর যা হয়।

ইউসুফের বন্ধুরা ঠেলতে লাগলো- সে থেকে যাক। মেয়েপক্ষের তাতে ঘোর আপত্তি।শেষ অব্দি জিতলো অবশ্য মেয়েরাই। ইউসুফ গলা নামিয়ে ছোট্ট করে বললো- আবার দেখা হবে।” রেবেকা সাথে সাথে বললো- ভেঁপু বাজান।” কোন ফাজিল ছেলে যেন গলা তুলে বললো- ছেলে রাখলানা। তোমাদের ওহুদ পর্বতের সমান গুনাহ্‌ হইবো!”

 

ইউসুফ জহির চলে গেল। কেন যেন মনে হলো- এই যাত্রায় বেঁচে গেলাম আমি। অন্তবিহীন রাত্রি আমার সঙ্গী হতে চায়…খাওয়ার ঘরে অবিশ্রাম আলাপ চলছে।ছেলে কেমন। ছেলের আত্মীয়স্বজন কেমন। দেনমোহর ধার্য করার সময় কে ছোটলোকি করেছে। ছেলে থাকে ইংল্যান্ডে। একসপ্তাহের জন্যে এসেছে। বিয়ে করে চলে যাবে। মাসকয়েক পর আবার আসবে। আমাকে তুলে নিয়ে যাবে তখন।

 

বেসিনে তাবৎ প্রসাধন ধুয়ে ফেলতে ফেলতে আমার মনে হলো- আমি বহ্নি সুলতানা।ফিজিক্স স্যারের নামে একাডেমিক কাউন্সিলে গিয়ে সটান নালিশ করে এসেছিলাম। দুইশো জন মেয়ের একজনও তা পারেনি। আমি দৌড়ে গিয়ে ছুটন্ত বাসে উঠে পড়ি। কাঁচাবাজার করি।ঢাকার রাস্তায় আমি এক বাসকন্ডাক্টরকে ঠাস করে চড় দিয়েছিলাম বগলের তলায় হাত ঢুকিয়ে দিয়েছিল বলে। এই আমার এক সন্ধ্যার নোটিশে বিয়ে হয়ে গেল একটা লোকের সাথে যাকে আমি আগে কখনো দেখিইনি। যার হাতের লেখা চিনিনা। মানালো?

 

রেবেকার বন্ধু শারমীন আজকে থাকবে আমাদের বাড়িতে। ফোন বাজলেই ছুটে যাচ্ছে ধরতে। শারমীন বলে- আপা দেখবেন একটু পরই ইউসুফভাই ফোন করবে…সাহেব বলবে যেতে/ পানসুপারি খেতে/পানের আগায় মরিচবাটা/ইস্পিরিং এর ছবি আঁটা…

 

যার নাম রেনুবালা / তার গলায় মুক্তার মাল

বহ্নি সুলতানাকে ইউসুফ জহির নামের সেই লোকটা সেরাতে ফোন করেনি। তার পরদিনও না। বহ্নি সুলতানা আমি জানি, কৌতুহল-মেশা আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেছে। মুখে হলুদের আভা। মেঘের ছায়ার মত চুল।গায়ে গতরাত্রে পাওয়া গহীন নীল শাড়ি।

ইস্কুল করতে করতে ও কবে অতো রোগা হয়ে গেছিল, অথচ মুখটুকু ভরাট-মিষ্টি। গজদাঁত আছে বলে আর থুতনীতে কলমের খোঁচার মতো ছোট্ট এতটুকু টোল আছে বলে- ওকে হাসলে তখনো সজীব দেখাতো। সৌন্দর্যের সল্‌তেয় আগুন ধরে নিভুনিভু একটুকরো মোম জ্বলতো। মাথা গুঁজে অজৈব রসায়ন পড়তে পড়তে তাকিয়ে দেখতাম…

ছোটবেলায় একমাত্র দাদীজান ছাড়া বহ্নি সুলতানাকে কেউ ভালবাসতোনা। মনে আছে দাদীজানের মোগলটুলির সেই বাড়ি।

বাঁধানো চবুতরায় রোদ পোহাচ্ছেন দাদীজান, পিঠে মেলে দেয়া রূপালী চুল। গভীর অভিজাত খাটো গলায় ডাকলেন- বহ্নি!’

অল্পবয়েসের শিরীন সুলতানা এসে দাঁড়ালো। সদ্যস্নাত সেই নিরুপম রূপসীর সামনে সে পড়ে শোনালো-“একথা জানিতে তুমি ভারত-ঈশ্বর শাজাহান/কালস্রোতে ভেসে যায় জীবন যৌবন ধনমান…” আমরা হাভাতের মতো দূর থেকে দেখতাম- ঐশ্বর্যময়ী শিরীন সুলতানাকে জড়িয়ে ধরে মস্তক-আঘ্রাণ করছেন- মিহিন জরিপাড় শাদা শাড়ি চমকাচ্ছে উদ্ভাসিত রৌদ্রে। তীব্র অসূয়া নিয়ে চেয়ে আছি আমি আর ছোড়দা।

নিজের অপরিসীম প্রতাপান্বিত শাশুড়ির ছায়া দেখতে পেতেন বলেই কিনা জানিনা- আম্মা বহ্নি সুলতানাকে ঘাঁটাতেন না কখনো। ও বড় হয়েছে একরকম নির্বাক স্বতন্ত্রতার সাথে। লোকে ওকে নির্বিবাদে মেনে এসেছে।

তিনদিন গেল। ইউসুফ জহির ফোন করেনা। আম্মা বিমর্ষমুখে বসে থাকেন।ছোটমামা ছটফট করেন।

সেদিন জুম্মাবার- আমাদের বাসা থেকে মসজিদ খুব কাছে। ইমাম সাহেব খুতবা পড়ছেন। (নারীদিগকে চৌকাঠের নিকটে পুরুষের পাশে দাঁড়ায় পর্‌সাব করতে দ্যান্‌, কার পর্‌সাব বাহিরে যাইবে? পুরুষের। অতএব বাইরে যাওয়ার হক্ব কার? বলেন?)

ছোড়দা বাড়িতে বলে আম্মা ভালমন্দ রান্না বসিয়েছেন। কাঁচাকাঁঠাল দিয়ে গরুর মাংস। আমি বসে বসে ক্যালকুলাস করছি। ফোনটা এলো। খুব সংক্ষিপ্ত করে- খুব সানুনয় সুরে ইউসুফ জহিরের মা জানালেন- ইউসুফ কালরাতের ফ্লাইটে লন্ডন চলে গেছে, ব্যবসার ভাগিদারের সাথে কীসব ঝামেলা হয়েছে- তার ওখানে না গেলেই নয়।

আম্মা ফোন রাখলেন। বহ্নি সুলতানা প্রশান্তমুখে খাতা কাটতে লাগলো।

একঘন্টা পর ঘরে ঢুকে দেখি বইয়ের আলমারির কাঁচে মাথা ঠেকিয়ে বহ্নি সুলতানা ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে।

প্রবল আঘাতে চূর্ণ হয়ে যাওয়া মানুষের কান্না।

জীবনে কোনোদিন আমি তাকে কাঁদতে দেখিনি।(ওর পরিণত মন তখনি কি কোনো অশুভ সংকেত পেয়েছিল)

আর আমি? না বিদ্বেষজাত সুখ, না সমবেদনা- কিছুই বোধ করছিনা কেন? কবে আমি এমন শিলীভুত হয়ে গেলাম? সেজোনাকো ব্যথার রেবেকা।

বড়দার বিয়ের সময় আমি কত ছোট?

আমার মনে আছে- পলাশ কি একটা বেফাঁস কথা বলে শাহ্‌রীন আপার কাছে দমাদ্দম মার খাচ্ছে।বহ্নি সুলতানার বন্ধু শাহ্‌রীন আপা। বহ্নি সুলতানার হাতও শান্ত হয়ে নেই।

পলাশ চেঁচিয়ে যাচ্ছে- হাড় ক’খানা খুলে নিসনা ভাই। মাফ করে দে। এখনো ভাত খাইনাই-মায়ের ছেলে!”

বড়দা সটান রান্নাঘরে।–কি আক্কেল তোমার আম্মা! পলাশ সারাদিন কিছু খায়নাই।”

অপ্রস্তুত আম্মা ভেজা হাত কোমরের দু’পাশে মুছছেন, সঙ্গে কী দিব? শুঁটকী মাছ আছে শুধু। চ্যাপা শুঁটকী।”

-বোকার মত কথা বোলনা আম্মা, পলাশ শুঁটকী খায়না তুমি জানোনা? ডিম ভেজে দাওনা।”

-ডিম তো নাই।টাকা দেই তুই এনে দে…”

একহালি ডিম কিনে বিয়ের বর যখন ফিরছে- ততক্ষণে পলাশের জ্বর এসে গেছে। জ্বর গায়ে ফুলশয্যার খাট সাজাচ্ছে। একটু পর হাল ছেড়ে ধরাশায়ী।

-শিরীন জ্বর কতো রে? পলাশ বরযাত্রী যাইতে পারবে?”

বহ্নি সুলতানা বলার আগেই পলাশ মেঝেয় শুয়ে-শুয়েই দু’দিকে মাথা নাড়ছে।

বহ্নি সুলতানা থার্মোমিটার ঝাড়তে ঝাড়তে গজগজ করতে করতে চলে গেল- একশো তিন! খেলো আরো পানিকাদা গুলে রঙ খেলো।”

রেবেকা সুলতানা ঘর ফাঁকা হতেই তার ঠান্ডা মোলায়েম হাতটা পলাশের কপালে ছোঁয়ালো-তারপর ধীরে ধীরে গরম কপালে হাতটা অর্পণ করে দিলো। বড়দা চলে গেছে শেরওয়ানি পরতে, ফুল থই-থই ঘর।

একসময় চোখ খুললো পলাশ। জ্বরের জন্যে কিনা কে জানে- তার কাঁচের মতো চোখে জলের পর্দা চিকচিক করছে- তুই সেজেছিস কি আশ্চর্য।” রেবেকা সুলতানা তার খোঁপার মেটেলাল ঝিনুকমালা-তার দরজিরদোকানগন্ধী ব্লাউজের ভিতরে সেঁটে বসা অন্তর্বাস-তার ময়ুরকন্ঠী নীলচে সবুজ সিল্কের শাড়ির খসখস নিয়ে বিষম বিপর্যস্ত।

-আমার খাওয়া হয়নি রেবেকা। ভাত দিতে বল্‌না।”

-জ্বরের সময় ভাত খাবে?”

পলাশ জবাব দিলনা, চোখ বুঁজে ফেললো।

কি জানি নতুন ভারী সিল্কের শাড়ির নতুন নারীত্ব রেবেকাকে নিয়ে যায় কলোনীর মুখোমুখি ফ্ল্যাটে। যেখানে মুখরা এবং কর্মপটু ফ্লোরাভাবী আলমারি হাট করে খুলে পাক দিয়ে দিয়ে শাড়ি খুলছে-শাড়ি পরছে। রেবেকা ইতস্ততঃ করে বলে- ভাবী রাতে রুটি হবেনা ভাইয়ের?” ফ্লোরাভাবীর বর পেটরোগা মানুষ। বাইরের তেল-চপচপে খানা হজম করতে পারেনা বলে সে নিয়মরক্ষার খাতিরে বিয়েতে যায়, ফিরে এসে বাড়ির রুটি-তরকারি গেলে।বরাবরই।

ফ্লোরা তেতো মুখে বলে- কখন রুটি বেলুম আর কখনই বা রেডি হমু? আমাশার রুগীর সেবায় জীবন গেল আমার।”

-আমি রুটিটা বানিয়ে দিয়ে যাই?”

-নে গা। উপরের তাকে ডানোর টিনে আটা আছে। নতুন শাড়ি আটা মাইখা নষ্ট করিসনা। খালাম্মা আষ্টোশো টাকা দিয়া কিনসে কিন্তু।”

ফ্লোরার বরের তিনখানা হাতরুটি রেখে, দুইখানা হাতরুটি সেঁকে ফিরে রেবেকা দেখে পলাশ রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ভাত খাচ্ছে। ওর চট্‌ করে চোখে পানি এসে যায় বলে ঘুরে অন্যদিকে চলে যাচ্ছিল। পলাশ ডাকলো- শোন্‌ রেবেকা, এটা কি মাছ দিয়ে গেল শিরীন?কাঁটায় কাঁটায় খচিত?”

মজা পাওয়া মুখ। সরল হাসি।–রুটি কার রে? কে খাবে?”

-আমাদের মুরগী।” রেগে চলে যায় রেবেকা সুলতানা।

আমার স্পষ্ট মনে আছে। তার মজ্জায় মজ্জায় প্রেম এসে চঞ্চল ঝুমঝুমি বাজিয়ে বলছে- এসেছি। এসেছি। অপ্রস্তুত বালিকা সেই সঙ্গীত বোঝেনাই। কিসের এতো যন্ত্রণা। কিসের এমন সুর।

সে তো ছিল চির উদাসীন। বড়দার বিয়ের ছয়মাস পরই যখন নুপুর-বাবলু জন্মালো, পৌর্ণমাসী যমজ শিশু, তার মনে কোনও প্রশ্ন জাগেনি, সে ছিল এতই মূঢ়।

এই আমি রেবেকা, এখন আর মূঢ় নই।

বহ্নি সুলতানা

কথা ছিল ইউসুফ জহির দুইমাস পরে আসবে। দুইমাস পরে শুনলাম ছয়মাস। ছোটমামা একদিন দেখি চিৎকার করছে- ভদ্রলোকের মুখোশ পরা বেঈমানের দল। নিশ্চয়ই বড় কোনো গন্ডগোল আছে! বড় আপা শিরীনরে ছাড়ায়া নেও। আমারে শতেক্‌ ঘা জুতার বাড়ি দেও, আমি এই সম্বন্ধ আনছিলাম!”

শ্রাবণ মাস। আকাশ ভাঙা বৃষ্টি।ছোড়দা গান বাজাচ্ছে- নিবিড় মেঘের ছায়ায় মন দিয়েছি মেলে।’ আম্মা মাষকলাইয়ের ডালের খিচুড়ি রাঁধছেন।রেবেকা স্তব্ধ হয়ে বারান্দায় বসে আছে। আমি বসে আছি জানালায়। দু’টো পেপারওয়েট দিয়ে আমাদের দুইবোনের জীবন কে যেন চাপা দিয়ে দিয়েছে।সুরজিতের মা মলিনাকাকিমা আসলেন, প্রায়ই আসেন। কিসের মলিনা? ঝলমল করে চলেছেন সারাদিন- “আরে তোমার কাকাবাবুরে আমি দেখছি বিয়ের দশ বচ্ছর পরে।” কাকিমার গায়ে ধূপ-ঘি-নারিকেল-চটকানো কাপডের মিশ্র গন্ধ। হাতাকাটা জামা ফুঁড়ে বের হওয়া বাহুতে ঘামাচি, কপালে ঘাম-তেলে ছড়িয়ে যাওয়া সিঁদুরফোঁটা। সব মিলিয়ে নিজের প্রতি ঘোর অযত্ন। তবু কী ঘোরে যে মেতে থাকেন। কী যে ভালবাসেন সংসার করতে।এই আমসত্ত্ব দিচ্ছেন তো এই উল বুনছেন, মুখভর্তি পান নিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছেন সিনেমাপত্রিকা।

সুরজিত- তাঁর ছেলে কিন্তু মোটেই তাঁর মতো ছিলনা। একটু বিমর্ষ- চিন্তিত- একটু মুখচোরাও। দেখতাম কাঁসার থালায় ভাত খেতে বসেছে। গায়ে দো-ফেরতা দেয়া জলগামছা। রোদে পোড়া শ্যামলা মুখ, কিন্তু আদুর গায়ের রঙ- একেবারে স্বর্ণকাঁসা। (কাকীমা আমাকে চিনিয়েছেন, কোনটা স্বর্ণকাঁসা, কোনটা খাগড়াই কাঁসা।)

আমি শিরীন সুলতানা, কোনো চপলতা যাকে মানায়না।সেই আমি ওদের খাওয়ার টেবিলে চট করে বসে যেতাম- কাকিমা, এই পটল-পোস্ত আর আছে, আমিও ভাত খাবো।” পটল-পোস্ত, নয় সোনামুগের ডাল, নয়তো দই-মাছ।ওঁদের বাড়িতে গেলেই আমি খেতে বসে যেতাম। অবেলায় কাকিমা হারমোনিয়মে গলা সাধছেন। নজরুলগীতি। পিয়া গেছে কবে পরদেশ। কি সুর। আমার মনটা মুচড়ে ওঠে। সুরজিত হয়তো মান্নাদে’র গান বাজাচ্ছে। তুম বিন জীবন কেয়সা জীবন। সিনেমাটা আমি দেখেছি।জয়া ভাদুড়ি আকুল হয়ে কাঁদছে- প্রিয় মানুষের বিচ্ছেদ শুধু কল্পনা করেই কিশোরীর কান্না।

কান্না আমার আসেনা।কিন্তু কী যেন একটা ধূ ধূ খালি লাগা আছে। আমি রেবেকা হলে বেশ ভাল হতো। ওর মনের অবস্থা বাতলে দেবার জন্যে জীবনানন্দ দাশ থেকে আবুল হাসান- কত লোক ওর পাশে। আমার ধারেকাছে কেউ নেই সিদ্দীকা কবীর আর বেলা দে ছাড়া। এই যে আমার মনে হচ্ছে উৎসবের রাজদুয়ারে আমি বহুক্ষণ একা দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে যাচ্ছি, কেউ ভেতরে আহ্বান করে নিলনা- এই গভীর অপমানের ভাষারূপ কি?

সুরজিত খুব সিনেমার পোকা, হৃষিকেশ মুখার্জি থেকে বিমল রায়- ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্টেন্ট’ থেকে ‘তের নম্বর ফেকু ওস্তাগর লেন’… তার খিদে অপরিমিত। সিনেমা আর সাহিত্যের স্বর্ণযূগের খবর সে জানে।ঝালের নাড়ু কিনে খেয়েছে, সুকুমার রায় থেকে যতীন্দ্রমোহন বাগচী বন্দে আলি মিয়া হয়ে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ঝিকিমিকি দেখা যায় সোনালি নদীর… পর্যন্ত সে শৈশবে ভ্রমণ করেছে। ইতিহাস পড়েছে। ভূগোল নিয়ে রোমান্টিক আগ্রহ আছে। এমন ছেলে রেবেকাকে টানবেনা, হতেই পারেনা। টানে। আমি টের পাই, টানছে।। এও টের পাই, রেবেকা বুঝতে পারছেনা ওর ভালো লাগছে ছেলেটাকে।

আমার এতো ভাবনা কি?

শতেক ভাবনা।

নরম সুগন্ধী অনুভূতিগুলির ভেতর যখন শাঁসজল ঘন হয়ে আসবে, আঁটি গড়ে উঠবে ভেতরে-যখন বাইরে রঙ ধরবে- তখন হামলে পড়বার জন্যে একশো আটটা ধর্ম-সমাজ-সংস্কারের বালাই নেই?

এত পুরাতন যুদ্ধ যুঝবার শক্তি আছে রেবেকার?

 

আর একটা গহীন যুদ্ধ আছে তো! এখনো আছে।

সুরজিত, মুগ্ধ রাখালবালক অপার বিস্ময়ের সোনার আপেল যার হাতে তুলে দেয়- হঠাৎ হঠাৎ তার নিমগ্ন চোখ তুলে, সে দেবী রেবেকা নয়। ও আমার আল্লা সেটা রেবেকা নয়।

 

নুরু পুষি আয়েশা শফি সবাই এসেছে

ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার আগে দিয়ে আমার আর শারমীনের কিছু নতুন বন্ধু হলো। নৌফেল, ইমরোজ, অনিন্দিতা।এদের মধ্যে কেউ গান গায়, কেউ ছবি আঁকে, কেউ বিশ্ব-রাজনীতি পড়ে।

আমি অনেক নিরেট হয়ে গেছি। এইসব পরিচয়-এইসব স্বচ্ছ নবীন রোমাঞ্চ আমাকে একটুও দোলা দেয়না।আশ্চর্য এই যে, কেমন কেমন করে আমি বহ্নি সুলতানার মতন আর বহ্নি সুলতানা আমার মতন হয়ে যাচ্ছে।

তুষারের রাজধানীতে আছড়ে পড়ছে সূর্য। খরগতিতে বরফ গলছে বহ্নি সুলতানার দেশে।এরপর শৈবাল-গাছ-মুকুল-প্রজাপতি!

ছোড়দার ঘর থেকে শোনা যায় আবৃত্তি- ছোড়দার সাথে সাথে আমিও টের পাই- ঐ চর জাগছে/বনহাঁস ডিম তার শেওলায় ঢাকছে…বহ্নি সুলতানার দেশে।

সূর্যাস্তের আকাশ সবুজ না ফিরোজা না কোবাল্ট একথা আমি নিশ্চয় করে জানি যে, বহ্নি সুলতানা তা নিয়ে কোনোদিন মাথা ঘামায়নি।

পুরাতন দেয়ালে প্রথম বৃষ্টির ঝাপটা কতো কতো আশ্চর্যবোধক চিহ্ন ফুটিয়ে তোলে তা সে জানেইনা। তোমরা জানো?নৌফেল, ইমরোজ, অনিন্দিতা?

বহ্নি সুলতানা ভাবে, কেউ তার নিজস্ব বসন্তোৎসব বুঝতে পারছেনা। আশ্চর্য লোকে আমাকে কেন এতো অর্বাচীন ধরে নেয়, জানিনা।

ছোড়দার সাথে থিয়েটারের একটা মেয়ে আজকাল আমাদের বাড়িতে প্রায়ই আসে। তার নাম রওনক নাসের। সুজি ভাজবার শব্দ শুনলেই বুঝি রওনক এসেছে। আম্মা একটু পরে বহ্নি সুলতানাকে নাক কুঁচকে বলবেন- কি ছাতার মেয়ে! ইশতিরে তুই তুই করে কথা বলে।রেবুরে বল্‌ নাস্তা নিয়া যাইতে…”

আমি ঘরের কোনো এক কোণে নষ্ট দেয়ালঘড়ির মতো নিস্পন্দ হয়ে আম্মার দিকে তাকাই। চোখ দিয়ে-কপাল দিয়ে-নীরবতা দিয়ে বলতে চেষ্টা করি, আম্মা আমার সাথে কথা বলো। আমি তোমার আদরনীয়া। কল্যানীয়াসু। তোমার কোলপোঁছা সন্তান। না হয় একটা বিরাট ভুল করেছিলাম। তার কি কোনো ক্ষমা নেই। এই তো আমি পড়ছি। পরীক্ষা দিচ্ছি। নামাজ পড়ছি। গুরুজনদের সামনে পায়ের উপর পা তুলে বসছিনা।তুমি খুশী হচ্ছোনা কেন আম্মা?

আম্মার নির্বিকারত্ব আমার মাথায় একটা গোত্তা মেরে বলে- তুই যা। তুই সারাজীবন ভুলের পর ভুল করবি।

আমি আরো বলার চেষ্টা করি মনে মনে। বলি- আম্মা ছোটবেলার ছবিগুলি দেখো। সুরজিতদা আমার নাম দিয়েছে ‘ঞ্চ’, সব ছবিতে যুক্তাক্ষরের মত তোমার কোলে আমি কিনা!

আম্মা নিঃশব্দে বলে- তাইলে এইবার সুরজিতের সাথে ভাইগা যা!

আম্মার গনগনে দৃষ্টি থেকে পর্দার আড়ালে লুকাতে গিয়ে দেখি- ম্লানমুখী জেন এয়ার লুকিয়ে আছে। তুমি এখানে?শার্লট ব্রন্টি দাঁড় করিয়ে রেখে বেমালুম ভুলে গেছিল?

শারমীন-উদয়ন-নৌফেল-ইমরোজ-অনিন্দিতা…তোমরা গল্প করো। একঘন্টায় টি.এস.সি.র একশো পঁয়তাল্লিশটা ঘাসের শীষ্‌ ছেঁড়ো। মাঠের পারের বেঞ্চিতে বসে চে কে নিয়ে তর্ক করো, গোল্ডেন এরার নায়কদের নিয়ে আলাপ করো, পাহাড় না সমুদ্র…কার কোনটা প্রিয়।আমি চিৎকার করে বলি-সমভূমি। সমভূমি। আমার কোনো নাটকীয়তাহীন-আজন্ম নিস্তরঙ্গ সমভূমি চাই। ধান কিংবা কলাইশাক লাগানো ক্ষেত, গৃহস্থের।

সুরজিত অবিরাম পড়ে। শঙ্খ থেকে শাঁখা, শঙ্খ স্ত্রীচিহ্নের মত দেখতে, অতএব প্রচুর প্রজননের অভীপ্সা থেকে শাঁখা পরার রীতি। কড়ি কেন মুদ্রা…কেন আদিকালে এত মূল্যবান ছিল? সেও যোনিচিহ্নাকার বলে। মাতৃতান্ত্রিক সমাজের অর্ঘ্য- স্ত্রীশক্তির পায়ে।

আর সুরজিত নেহরু-শ্যামাপ্রসাদ-আম্বেদকর নিয়ে জেরবার হয়।

আমি ওর সাথে মিলে পড়ি। পূজাবার্ষিকী।

সুরজিতের চেহারা আমাকে আকর্ষণ করেনা। ওর বেঁটেখাটো হাত দেখলে, ওর ঘামে মলিন শার্টের কলার দেখলে আমার ভালো লাগেনা।

কিন্তু ওর উপস্থিতির একটা মাধুর্য আছে। কৌতুকে উৎসুক আর ভাবে বিমর্ষ চোখ।

কাকিমা বাড়ি না থাকলেই ও ফশ্‌ করে একটা সিগারেট ধরায়। চোখ সরু করে গল্প শুরু করে।রাইগার মর্টিস থেকে বৈদিক যূগে চলে যায়।আবার ফিরে এসে নেতাজির গুষ্টির পিন্ডি দেয়। আর আছে কবেকার ইমরান-জহির আব্বাস-রবি শাস্ত্রী…গাওস্করের সাথে যে ব্র্যাডম্যানের কোনোকালেই তুলনা চলেনা এইসব।

আর আমি টের পাই উঁচু গাছ থেকে পুরুষ বার্ড অফ প্যারাডাইস পাখি মাথা নিচে পা উপরে দিয়ে ঝুলছে- নিজের সব রঙীন পালক দেখাবার জন্যে- এর পর গোলাপী ডিম আর এক মৌসুমের ভালবাসাবাসি।

আমি টের পাই পলাশকে যেমন দুষ্ট ভাইরাসের মতন আমার কাছ থেকে সরিয়ে রাখবার একটা নিঃশব্দ ষড়যন্ত্র ছিল, সুরজিতের বেলায় তা নেই।

সেটা কি সুরজিতের স্বভাবগুণে? নাকি হিন্দু বলে তাকে সন্দেহজনকের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে?

হেসে ফেলি আমি।

বাঙালি মুসলমানের দর্শনে অনেক মজার মজার স্ববিরোধিতা আছে।

আচ্ছা, নিজের দিকেই তাকাই না কেন? যে দূরত্বে পলাশ বসলে আমি ভেতরে ভেতরে ভস্ম হতে থাকতাম- সে একই দূরত্বে আমি আর সুরজিতদা বসে ফেলুদা পড়ি। কিছু হয়না কেন?

আমার মন কি নারীর মন হবারও আগে মুসলমানের মন?

আগেই গোলদাগ দিয়ে সুরজিতকে আলাদা করে রেখেছে?

অত্যন্ত আদর করে মলিনা কাকিমা আমাদের আপ্যায়ন করেন। বহ্নি সুলতানা ওদের বাড়িতে গেলেই খেতে বসে যায়। এই বহ্নি সুলতানাকে আমি চিনিনা। এবং ঈর্ষাও করিনা। এ আমার ক্ষুরধার ভগিনী নয়। একটি সুসমতল গাড়ল।

(সে একবারও খেয়াল করেনি মলিনা কাকিমা কখনো আমাদের বাড়িতে ভাত খাননা। এড়িয়ে চলেন।)

আর সুরজিতের প্রায়-সৌরভময় উপস্থিতি, বুদ্ধির আবেদন ওর খুব ভালো লাগে- এও বুঝতে পারি।যদিও বহ্নি সুলতানা নিজে তত সাহিত্যানুরাগী নয়- পরিনত মানুষের সঙ্গ সে চিনতে পারে।

আহারে- ওর চোস্ত ইংরেজী বলিয়ে- ঝকমকে স্বামীটা আর এলোনা। সে তো বলে গিয়েছিল- আবার দেখা হবে?

আক্‌দের ছবি ঠাসা অ্যালবামে আমাদের দরিদ্র ঘরে বহ্নি সুলতানার পাশে দেবজ্যোতি নিয়ে বসে আছে ইউসুফ জহির। একটু বিব্রত- একটু রক্তশূণ্য মুখ- কিন্তু কী সুন্দর!

সাতপাঁচ ভেবে একদিন মনে মনে বহ্নি সুলতানাকে বললাম- আচ্ছা, সুরজিতকে তুই নে।” (মনে মনে ওকে আমি তুমি করে বলিনা, তুই বলি।)

তার ঠিক ক’দিন পর সুরজিত খালি ঘরে নির্বাপিত সিগারেট ফেলে দিতে দিতে বলেছিল- বুঝলে, ডাক্তার স্বামী পাওয়া বড় দুর্ভাগ্যের, তোমরা যাকে ভাবো স্তন-মধুসূদনের পীণোন্নতপয়োধরাম্‌, তা তার কাছে চর্বির গোলা!”

 

বহ্নি সুলতানা

“প্রিয় শিরীন,

অনেকবার ভেবেছি আপনার কাছে আমার ক্ষমা চাইবার আছে। কলম আর ওঠেনা। প্রবঞ্চকের অনেক কিছু বলার থাকে সবসময়।কিন্তু সে যাই বলুক, তাতে দোষ ক্ষয় হয়না।

খুব কম বয়েসে আমি এখানে আসি। এবং নিজের আরেকটি রূপ আবিষ্কার করি। গত দশ বছর ধরে আমি আইরীশ এক যুবকের সাথে বাস করি। বসবাস, সকল অর্থে। নারী আমাকে আকর্ষণ করেনা। প্যাট, আমার পার্টনার করে। আমরা একরকম সহযোদ্ধার চোখে পৃথিবীটাকে দেখি। একে অন্যকে ছাড়া তীব্র অসহায়ত্ব বোধ করি।

এইখানে প্রশ্ন আসে- তাহলে এগল্পে আপনি এলেন কোথা থেকে? আমার মুমূর্ষু মা। আমাকে বিয়েতে বাধ্য করেন। আমি জানি শিরীন, এইখান থেকে চিঠিটা হাস্যকর ঠেকতে পারে। মা একটি সমান্তরাল সত্য।এ সত্যকে ভাঙবার সাহস বা হৃদয়হীনতা আমি এখনো অর্জন করিনি।ফলাফল আপনার অজানা নয়।কিন্তু বিয়ের রাত থেকেই আমার মধ্যে গভীর আতংক কাজ করতে থাকে। প্যাট্রিক ফার্ণানের সাথে কাটানো দশটা বছর আমাকে যেন খেতে আসে। আমি পালিয়ে আসি, আবার প্যাটের কাছে।

মা আমাকে ক্ষমা করেননি, তিনি মারা গেছেন। আপনিও হয়তো ক্ষমা করবেননা। প্যাটও করেনি। সে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।

শিরীন, আমার মনে হয় আপনি এখনো অপেক্ষা করে আছেন।এমন এক মহাদেশে যেখানে বিয়ে-ঘটিত বিপর্যয় মানুষের কাছ থেকে সর্বোচ্চ মূল্য আদায় করে নেয়। আপনার এই বিপর্যয়ের ক্যাটালিস্ট আমি, আমি কেন যেন সেই দায় ভুলতে পারিনা। আমি আগামী ডিসেম্বর মাসে ফিরবো। আমি পাষন্ড নই, আমি শুধু অন্যরকম।আপনি আমাকে ত্যাগ করতে পারেন অথবা আমার সঙ্গে চলে আসতে পারেন।আমি নিজেকে বদলাতে চেষ্টা করবো। জানিনা কতটুকু সফল হবো।আমরা বন্ধু হতে পারি। কিংবা হয়তো আরো কিছু, কে জানে। আর আপনিও সামাজিক চোখরাঙানি থেকে দূরে আসতে পারলেন।বাকী আপনার ইচ্ছা।

 

ইউসুফ জহির

 

চিঠিটা আমি প্রায়ই পড়ি। একটু জড়ানো হাতের লেখা। সাবলীল ইংরেজীতে কত দুরূহ কথা অনায়াস সহজতায় লেখা। আব্বা আমাদের গ্রামার পড়াতেন। বলতেন- ইংরেজীর শেষ কথা হচ্ছে- অ্যাপ্রোপ্রিয়েট প্রেপোজিশন। বেঁচে থাকলে আব্বা হয়তো দেখতেন তাঁর বড় জামাতা কোথাও প্রেপোজিশন ভুল করেনি।

প্রথমদিকে চিঠিটা আমাকে দগ্ধ করতো। মনে হতো এ আমার আগাগোড়া অস্তিত্বের প্রতি অপমান, সর্বৈব অপমান। বুকের ভেতর আগুনে পুড়তো চেরাই করা শুকনো কাঠ- কী যে তার শব্দ।

কিছুদিন পরে বুকের শব্দ মরে এলো।বাইরের শব্দ ঢুকতে লাগলো কান দিয়ে। রেবেকা বাথরুমের টিনের দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে বলছে- ছোড়দা সব পানি শেষ করোনা। আগামী চব্বিশ ঘন্টা সাপ্লাই বন্ধ!” পাশের বাড়িতে মা তার ছেলেকে পেটাচ্ছে গুম্‌গুম্‌। চৈত্রমাসে গুড়ের জিনিস খাইলে কির্‌মি বাড়ে জানস্‌না?” আম্মা গজগজ করতে করতে শাড়িতে দেবার জন্য এরারুট জ্বাল দিচ্ছেন- ছুটা বুয়া আজকেও আসলোনা। এই নিয়া তিন দিন।”

এই শব্দাবলীর ভেতর আমি ডুবে ছিলাম আবাল্য। আমার ভালো লাগেনি। আমার ভালো লাগেনা রেবেকার সাথে এই দীর্ঘ নৈঃশব্দ্য, এই অসহ্য সাজা। এখান থেকে পালাবার জন্যে যেকোনো মুক্তিকে আমি স্বাগত জানিয়েছি। যেকোনো মুচলেকায় করেছি সই।মুক্তি পাইনি। নাদিম না ইউসুফ নাকি অন্য কেউ…ব্যক্তি আমার কাছে জরুরী ছিলনা, জরুরী ছিল পরিবর্তন।

পরবাস একটা বিপুল পরিবর্তন হতে পারে। ইউসুফকে ছেড়ে আর কাউকে বিয়ে করলে কি এমন সুখ আসবে আমার জীবনে? ‘দ্বিতীয় বিয়ে’, ‘তালাকপ্রাপ্তা’, ‘শর্ট ডিভোর্স’ এইসব শব্দ একলা রাতে আমাকেও ‘খেতে আসে’। কি অদ্ভুত এই দৈত্যাকার শব্দগুলি। অফিসঘর থেকে স্কুল-গেট সর্বত্র তাড়া করে- কত সাংঘাতিক সব অপরাধকে মানতে শিখিয়ে দেয়। কি সুন্দর কথা, আম্মু বলেছে তাই বিয়ে করেছি! আচ্ছা, সেই তো মুরগী ছিলবো আর গাজর কাটবো, তার আবার নাদিমই কি, ইউসুফই কি?

এইসব সাতপাঁচ ভেবে আমি, শিরীন সুলতানা, বিবাহিতা এবং মেডিক্যালি অদ্যাবধি কুমারী, ব্লু নাইটিঙ্গেল স্কুলের ল্যাংগুয়েজ এন্ড লিট্‌রেচার শিক্ষিকা একটি অত্যন্ত অনাধুনিক সিদ্ধান্ত নিলাম। গোপনে ইউসুফকে চিঠি লিখলাম। না, অ্যাপ্রোপ্রিয়েট প্রেপোজিশন আমারও ভুল হয়নি। ইউসুফের প্রথম চিঠির কথা কেউ জানলোনা। দ্বিতীয়টির কথা জানলো। দ্বিতীয়টি ধন্যবাদপূর্ণ এবং সানন্দ। আম্মার বিস্ফারিত-অনুজ্জ্বল-অশ্রুভরা চোখের সামনে চিঠি এবং চিঠির জবাব চলতে লাগলো।

অস্বীকার করবোনা লোকটা পন্ডিত। বিবেচক। একধরনের হিউমারের উত্তাপ তার চিঠিগুলি উষ্ণ করে রাখে।আমি শিরীন সুলতানা, নতুন কিছু শুরু করবার পক্ষে একান্ত অলস, স্রোতে ভাসিয়ে দিলাম নিজেকে। স্রোত নিয়ে যাবে কৈ, জলপ্রপাতে না সবুজ দ্বীপে!

কখনো বাঙালি মধ্যবিত্তের মন ‘সমকামিতা’ শব্দটাকে নেড়েচেড়ে দেখতে চায়। আমার মনে পড়ে যায় পলাশের সহাস্যে করা ক্যাডেট কলেজের নানান গল্প।বুদ্ধি বলে-চুপ।চুপ। হয়তো ওটা আরেকরকম চোখে জীবজগতকে দেখা। অন্য স্বরলিপির ভালবাসা।যার বুদ্ধি আর মন দুই-ই তার শত্রু, তাকে বাঁচায় কার সাধ্যি।

মনে মনে  রেবেকা সুলতানাকে প্রবোধ দিই- এইতো আর ক’টা দিন। মনে ভাবি ওকে গুছিয়ে ক’টা কথা বলে যাবো। আমাকে শাস্তি দিয়েছো বেশ করেছো রেবেকা। কিন্তু যে কর্মফল তুমি ভোগ করছো- সে কর্মটি তো তোমার…তারপর ভাবি- থাক! কৈশোরের শেষধাপে এসে করা ভুল যৌবনের সূর্য এসে খাক্‌ করে দিয়ে যাক। ওর ভালো হোক।

ডিসেম্বর যত এগিয়ে আসতে থাকে- আতঙ্কের ঢিমে আঁচটা উসকে উঠতে থাকে। লাফিয়ে লাফিয়ে কালি ফেলতে থাকে ডুমের গায়ে।রাতে শুয়ে এই ঘর- এই নিরুপায় মা- এই ভাইবোনের জন্যে মায়ায় আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। “আসন্ন শস্য আর আকুল মেঘের যেমন সম্বন্ধ”– কি অদ্ভুত সব লাইন আমার বোন তার ডায়েরীতে লেখে। আমি এখনো লুকিয়ে লুকিয়ে তার দিনপঞ্জী পড়ি।

 

জ্বলেছি সরলে আমি অফুরন্ত প্রাণ / শতশত ব্যথাপাকে নিরমিল কে এ বাতিদান

সেপ্টেম্বরের শেষাশেষি টানা কয় দিন তুমুল বৃষ্টি হলো। আলো আর হয়না। বিরতির সময় ইলশেগুঁড়ি। সেটুকুই বিরতি। যদি তাকে বিরতি বলে।

কাপড় শুকাচ্ছেনা। ঘরের ভেতরে রশি টাঙিয়ে ভেজা কাপড় মেলে দেয়া-ছত্রাকের মতো গন্ধ।

আমাদের বারান্দায় সবসময়ই পুরানো চেয়ারটেবিল ডাঁই করা থাকে- সেগুলি পচে যাচ্ছে ভিজে ভিজে।

সদরের সিড়ি অব্দি এসে থেমেছে যে পানি, কর্পোরেশনের কল্যানে তার রঙ ঘোর কালো।

সুরজিতরা চলে গেছে। চলে যাবার সময় আমার তেমন কিছু মনে হয়নি। মলিনাকাকিমা অনেকগুলো ফুলবড়ি দিয়ে গেছেন, বহ্নি সুলতানাকে তার প্রীতি উপহার।

খালি বাড়িতে চুনকাম করার সময় আমি উঁকি দিয়ে এলাম। কলিচুনের তরতাজা গন্ধ। ঢেকে যাচ্ছে দেয়ালে ধূপের দাগ-মশার নিধনচিহ্ন-বীজগণিতের সূত্র।

একদিন পর, সন্ধ্যাবেলা ছাদে বসে দেখি সময় আর কাটেনা। ‘স্টারি স্টারি নাইট’ শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়না। বিকেলের ছাদে পায়চারি করতে করতে কেউ মেডিকেলের পড়া মুখস্ত করেনা। মরাডালে পাপ্পা মিলান্‌ ফোটাবার জন্যে মাসের পর মাস টবের মাটি আর কম্পোস্ট মিলিয়ে অস্থির হয়না। আমি যে এত অভ্যস্ত হয়ে গেছিলাম- আমি তো নিজেই জানিনা। চতুর্দিকে হ্রদের স্থির বোবা জল… ‘দেখে দেখে চিত্ত মোর হয়েছে বিকল’

এই শূণ্যতা কবে সে তৈরী করে দিয়ে গেল। আর একটা ভুল করবার সংস্থান আছে তোমার জীবনে? রেবেকা সুলতানা?ভুল-ঠিক তো জানিনা। কোনোদিন জানিনাই।

শুধু মনে হচ্ছে কাক তাড়াতে তাড়াতে আমসী পাহারা দিতে দিতে একটা চশমাপরা ছেলে হীমাটোলজির পড়া করছে- এটা না দেখলে…

সুরজিত আমাকে একটা বই দিয়ে গেছিল- ‘গন্‌ উইথ দ্য উইন্ড’। আমি ক্ল্যাসিক পড়েছি সব গ্রেট স্টোরিজ ইন ইজি ইংলিশ সিরিজের। জোরালো ইংরেজী খুঁটিয়ে পড়তে গিয়ে আমি কোথায় চলে গেলাম! আজীবন চাঁদ লাগা প্রেমিকপুরুষের পেছনে হন্যে হয়ে ছুটে বেড়ানো স্কারলেট ও’হারা ত আমিই। জানিইনা যাকে চাই সে আদতে কেমন। মনে মনে স্কারলেট মায়ের প্রতি পৌত্তলিক- মায়ের মত মহিমময়ী হতে চায় সে। কিন্তু অন্য কোনো দিন। এখন সে প্রেমিকা, ভোগী এবং ভোগাসঙ্গলিপ্সু।

চোখের জলে হেসে-কেঁদে বই পড়ে উঠলাম। মুখ তুলে দেখি নৌফেল।

-সিনেমাটা দেখেছো রেবেকা?”

হাঃ সিনেমা। এখনো ছোড়দা ঘাড় গুঁজে কাজ করে যায়- যে শার্টটা তার পরনে সেটার রঙ না নীল- না ছাই- না ভ্যাপসা।

নৌফেল একদিন সিনেমাটা দেখালো ওর বাড়িতে। একেবারে হুড়মুড়িয়ে ক্লার্ক গেব্‌ল্‌ এর প্রেমে পড়ে গেলাম। পর্দা জুড়ে ঐ প্রমত্ত চুমু আমাকে কী যে ভারাতুর করে তুললো। সারাদিন একটা আশ্চর্য নিঃশ্বাসের মত জ্বালাময় বস্তু আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। আচ্ছা, কেউ নাকের উপর “ফ্র্যাংকলি মাই ডিয়ার আই ডোন্ট গিভ আ ড্যাম” বলে কুয়াশায় মিলিয়ে যাবার পরও তাহলে ভাবা যায় –“আফটার অল, টুমরো ইজ অ্যানাদার ডে”? জীবন তাহলে সেই সুযোগ দেয়?

ক্ষুধাপীড়িত স্কারলেট শপথ করেছিল- সে চুরি করবে- মিথ্যে বলবে- আর যা যা দরকার স-অ-ব, কেবল ক্ষুধার্ত হবেনা। আমিও সংকল্প করি- ক্ষুধার্ত হবোনা কখনো।

নৌফেল অতএব আমার খুব কাছ ঘেঁষে দাঁড়ায়, বলে- ফর হুম দ্য বেল টল্‌স্‌ দেখবে? গ্যারী কুপারের ছবি।” আমি একটুও সরে যাইনা।

ওর বাড়িতে যেতে যেতে আমার একটা কথা মনে হয়, আমি কি ভীষণভাবে ক্যাথরীন আর্নশ’। উদ্দাম জংলীপনা আমার চাই, আবার অতিসচ্ছলতার ঘোরও আমার কাটেনা। অথচ সচ্ছলদের বৈঠকী ন্যাকামিও রীতিমত অসহ্য।

একদিন যখন আমি পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যা হতে চাইবো- সেইদিন সুরজিতকে আমার চাই বলে- ‘ফজলে-রাব্বি হল’ শব্দগুলিকে গোলদাগ দিয়ে রাখি মনে মনে।

একদিন নৌফেল ঝলমলে একটা বিকেলবেলা কত কিছু বলে- আমাকে তার কতই না ভালো লাগে…মনে মনে বলি- “ফ্র্যাংকলি মাই ডিয়ার আই ডোন্ট গিভ আ ড্যাম”। সূর্যাস্তের আকাশ সবুজ না ফিরোজা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় একবার।

মুখে বলি- আজকে কোন সিনেমা দেখবো?” ফেলিনির আমারকর্ড। নিপ্‌ল্‌ সাক করার একটা বিশ্রী দৃশ্য আছে সেখানে।

 

বহ্নি সুলতানা

রেবেকা, এখানে এসে অব্দি আমি তোমার মত করে পৃথিবীকে দেখি। নিঃশব্দ-পরিপূর্ণ বিস্ময়ে। শিশুর চোখে। দি ভেইল রোডের বেরী গাছ- প্রাণবন্ত উজ্জ্বল লাল-গেরুয়া-হলুদ।কাঠের বেড়া ধরে সুইট-উইলিয়ামস আর মিকলমাসের ডেইজী। উত্তাপহীন বাড়িঘর, আর ঘনিয়ে থাকা কফির গন্ধ। এতো কফিও লোকে খায়!

সব তোমার চোখে দেখি।

কাঠের ঘর কেমন নিজেনিজেই সশব্দ আড়মোড়া ভাঙে। কুকিং অ্যাপ্‌ল্‌ আর পীয়র গাছ একা একা ফল ঝরিয়ে যায়- কেউ খায়না। কিরকির শব্দে পোকা ডাকে ঝোপ থেকে, ঝোপের ডগায় বেলকুঁড়ির মতো গোল গোল ফল।

জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে ইউসুফ আমাকে বার্মিংহ্যামে তার এক ফুপুর বাসায় নিয়ে গেছিল উইকএন্ডে। পথের দু’পাশে মাটিরই কত রঙ। শ্লেট, বার্ন্ট অ্যাম্বার, র’সিয়েনা, ক্রোম…সব তোমার শেখানো নাম রেবেকা।

আঙিনায় ভুলে ফেলে যাওয়া একটুকরো রুমালের মতো বাগান। পাথরে বাঁধাই চত্বরে কতরকম শৈবাল। এতো রঙ কিন্তু গন্ধ নেই। তাজা বাতাসের খিদে লাগা সুবাস শুধু।

ইউসুফ বাগান করতে ভালবাসে।অল্প এতটুকু জায়গায় দুই ধাপ সিঁড়ি নামিয়ে, মোরাম বিছিয়ে, অপুষ্পক আগাছার বেড় দিয়ে কি সুন্দর বাগান করেছে সে!

এখানে অভাব খুব আগন্তুক শব্দ।ফ্রীজারে ঠাসা হাজাররকমের খাদ্য। দই-ই কত রকমের।

বাথরুমে বোঝাই অজস্র টয়লেট্রিজ সামগ্রী।

শোবার ঘরে সেন্টেড জেল-ক্যান্ডেল কতো…চকচকে জেলের মোমের ভেতর কতো গোলাপকলি জমাট হয়ে আছে।জ্বালাতেই ঘর ভরে যায় গোলাপের গন্ধে। ওয়ালপেপারে অ্যান্টিক বটানিক্যাল প্রিন্টস্‌- (আহা বটানিক্যাল প্রিন্টস্‌)তাতে লিলিফুল জলরঙে আঁকা। বেডসাইড টেবিলে ইউসুফ আর একটি শ্বেতাঙ্গ যুবকের ছবি। ইউসুফ হয়তো সরাতে ভুলে গেছে।

রেবেকা আমার এখানে ভাললাগেনা।

কোথায় ভালো লাগতো আমার? পলাশের সঙ্গে খাসমহল নামের সেই বাড়িতে?যেখানে তোমরা উঠেছিলে? ন্‌নাহ! কখনো না! ভালবাসার জন্যে আমি খাপরা-ছাওয়া ঘরে কোনোদিন যেতে পারতামনা, আমি আমাদের লাল পোর্টল্যান্ড সিমেন্টের বাথরুম থেকে, আমাদের নালার পাশের অন্ধ গলি থেকে বের হতে চেয়েছি সবসময় । মনে মনে আমি তোমায় সেলাম জানাই রেবেকা, তোমার মনের জোর ছিল!

কিন্তু এই ভালবাসাহীন প্রাসাদেই বা কী করে থাকতে হয়?

ফাঁপানো মাফিনে সাজানো কফিশপের মতো মৃত পড়ে থাকি এ ঘরে।পিঁপড়াও হাঁটেনা। ইউসুফের ঘর থেকে মৃদু বাজনার আওয়াজ আসে সারাদিন সারারাত্রি। কখনো আমি চিনতে পারি বারবারা স্ট্রেইস্যান্ডের গান। অটামের রঙ মিলিয়ে আমি কোটা শাড়ি পরি, পাতলা উলের ব্লাউজ, আমার খোলা চুল মেঘের মতো ঢেকে ফেলে আমাকে- আমার বুকের ওপর বড় কালচে-লালপাথরের লকেট। আমি টের পাই আমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। একটু কাজল আর একটু লিপগ্লস, অফ্‌হোয়াইট সিল্ক-কোটার ওপর সোনালী সুতোর হাজার হাজার পাখির পালক।জরির সরু সরু টান দেয়া।

চেস্টনাট আর হ’থর্ণ দেখো, ব্লুবেরী আর ক্র্যানবেরী দেখো, উজ্জ্বল নীল শরতের আকাশ দেখো। শিরীন সুলতানাকে দেখো। তাকিয়ে না দেখলে শিরীন সুলতানা বাঁচে কি করে?

ইউসুফ তরতরে হাতে কতকিছু ফেলে দেয় ফ্রীজ থেকে, আমার মনে পড়ে আম্মার আঙুল, কী যত্ন করে ছাড়িয়ে রাখছেন সেদ্ধকাঁচকলার খোসা, একবেলার ভর্তা হবে বলে।ওর ফেলে দেয়া অনেক জিনিস ইমরান- ওর মামাতো ভাই নিয়ে যায়।ইমরান থাকে হোয়াইট চ্যাপেলে। সিলেটী রেস্টুরেন্ট। কাঁচাবাজারের তিতকরা আর সাতকরা। ছিটকাপড়ের জামার দোকান। পানের রসে রাঙা মুখের গৃহবধূরা। একঘরে ওরা চারজন- ইমরান-ফজলু-বাবর-সজল ভৌমিক।স্টুডেন্ট ভিসায় এসে আর পড়াশোনা করেনি। সেইন্সবেরীস-ম্যাকডোনাল্ডস-স্টারবাক্‌স্‌ এইসব নামকে দান করেছে দিনরাত্রি।কী পরিশ্রম বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা করে- তা এদের কায়িক শ্রম না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবেনা।

প্রথম আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। ইউসুফ এতো সচ্ছল- একা একখানা বাড়ি নিয়ে থাকে অথচ ইমরান অন্য একটা বাড়িতে কি কষ্ট করেই না থাকছে, আপন মামাতো ভাই! ইউসুফ ফেলে দিচ্ছে চকলেট মুজ, আর ইমরান খেয়ে চলেছে আলু, মুরগীতে আলু, টুনাতে আলু, মাছে আলু, আলুর ঝোল, আলু ভর্তা। সত্যিকার ‘দ্য পটেটো ইটার’ বলতে আমি এদেরই দেখলাম রেবেকা সুলতানা।

আমি প্রায়ই ইমরানদের বাসায় আসতাম, খালি হাতে না, বাজারসদাই করে। বাংলা গান বাজছে- মুক্তির মন্দির সোপানতলে…জানালা দরজা দুরন্ত শীতের বাতাসে খুলে দিয়ে রাঁধা হচ্ছে শুঁটকী, কাঁঠালবীচি দিয়ে। আমিও রাঁধতে লেগে যেতাম।কাঁচা আমের ডাল।শাপলার ডাঁটা।লাউয়ের হালুয়া।ইউসুফ জানতেও চায়না আমি কোথায় যাচ্ছি-কোথা থেকে আসছি। সে বাজনা শোনে দিনমান।‘ক্যাস্ট্রাটো’ কিশোরদের স্বর-উপযোগী বাজনা।

 

এখন তাহারা সুখে জলক্রীড়া করে

আবার একটা শীতকাল আসে।অনিন্দিতা কিংবা নৌফেল টি.এস.সি.তে কবিতা পড়ে, বেশ গলা কাঁপিয়ে।

আম্মা বাঁধাকপি-গাজর এইসব শীতের সবজির ফালি রৌদ্রে দেন ।রোদে শুকানো সবজি বৈয়মে ভরে রেখে দেয়া যায়। রাঁধবার বেশ কিছুক্ষণ আগে ভিজিয়ে রাখলেই বেশ তরতাজা হয়ে ওঠে। কবেকার পদ্ধতি। কবেকার আম্মা।

তারি সঙ্গে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান…

আম্মার দুইদিকে আমি আর বহ্নি সুলতানা। আম্মা পড়ে শোনাচ্ছেন বনফুলের ‘মায়াকানন’।

বৃষ্টির দিনে ঘর অন্ধকার করে দড়িতে দড়িতে ভেজা শাড়ি মেলে দেওয়া।

রাতের বারান্দায় হিহি করে হাসছে বহ্নি সুলতানা আর বড় ভাবী। বড় ভাবী যার জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হচ্ছে হাতাকাটা গেঞ্জি পরা টকটকে জাফর ইকবালের শুটিং দেখা। এক্কেবারে গরম দুধে এক চিমটি জাফরান দেয়া গায়ের রঙ।ববিতা যে কেন জাফর ইকবালকে বিয়ে করলোনা, এই নিয়ে ভাবীর খুব আফসোস ছিল। ‘সুখে থেক ও আমার নন্দিনী’ গানটা তো ববিতার দুঃখেই গাওয়া।

কবে যেন বহ্নি সুলতানাকে আমি শিরীন আপা ডাকতাম। ভুলেই গেছি।প্রবাসী বহ্নি সুলতানা প্রায়ই আমাদের শীতের কাপড় পাঠায়, চমৎকার রঙীন পুলোভার-মাফলার, বেবী পাউডার-সাবান-শ্যাম্পু আর চকোলেট। আম্মাকে চিঠি লেখে এমন যেন আম্মা ছোট্ট মেয়ে, জানো আম্মা এখানে একএকটা পেঁয়াজ একটা শালগমের মতো বড়!

আমি ওর বিদেশী জীবন দেখতে পাই।কাঠের কটেজ। আঙিনায় রূমালি বাগান। হুটোপুটি খেলে কাঠবেড়ালি। ঘড়ির কাঁটায় গাঁথা সময়ে ফেরত আসে ওর স্বামী। তার গায়ে নির্ঘাত শীত-শীত-সাদা ফুল-শিশিরজল আর সদ্যকাটা ঘাস মেশানো অদ্ভুত সুগন্ধ।

আমরা আছি সেরকমই। বৃষ্টির দিনে বাজার না হলেই ঘরে পেঁপেভাজি-ডিমসেদ্ধ আর ডাল। পেঁয়াজের সাইজ মার্বেলের গুলির মতো।

ছোড়দা আর রওনক পাশের ঘরে কত কী গল্প করে।

ভেজাগামছা গায়ে জড়িয়ে হেমন্তের পাগলা ফ্যান ছোড়দা বোঝাতে থাকে, হেমন্ত আর একটিও হবেনা। ‘এই রাত তোমার-আমার’ এই গানে ‘রাত’ কি ইরোটিকভাবে উচ্চারণ করেছে দেখেছো, পালকের মতো শিরশিরে। কিংবা ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা’ তে তৃষ্ণা শব্দটার উচ্চারণ শোনো একবার!

জ্ঞানগর্ভ আলোচনা একসময় নিভে আসে। কাঠের পার্টিশনের আড়ালে শোনা যায় কেবল ফিসফিস।।আর চেটেপুটে খাবার শব্দ। একসময় আর ফিসফিসও নয়। ওগো তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে। আমি বৃষ্টিহীন বৈশাখী দিন।

এই বাড়িটার সামনে একটা অতিকায় লিচুগাছ, রাতভর বাদুড়ের উৎপাত।

পাতাঝরা একটা কপিলা গাছ।

বের হয়ে গিয়ে ছোড়দা আমাদের জন্যে ডালপুরী নিয়ে আসে- পুরের ভেতর রেডিও স্ট্যাটিক-দিলীপকুমারের সিনেমার গান-তেলতেলে ঘাম-একটু আগের অর্গ্যাজম ভজ্‌ভজ্‌ করছে।

একদিন রওনক আর ছোড়দার বিয়ে হয়ে যায়।

বাড়িতেই বৌভাত। উঠানে ডেকোরেটরের তামার ডেকচি-কাঠপোড়া ধোঁয়ায় আমাদের চোখ জ্বলতে থাকে। বড়ভাবী হিসেব মেলাতে এসে দেখেন- রওনক আম্মার বিয়ের গালাঠাসা গোলাপবালা দুইটা পেয়েছে। বাড়ি মাথায় ওঠে। আবার কিছুক্ষণ পর রওনকের গায়ে হাত রেখে আফসোস করেন- শ্বশুড়বাড়ি থেকে তেমন কিছুই তো পাইলানা…

বড়ভাবী একসময় আমার খুব বন্ধু ছিলেন।

পেছনের বারান্দায় আমি আর বড়ভাবী হাসতে হাসতে মরে যাচ্ছি- নাকি দাদীজান একটা সিনেমাতে মালা সিন্‌হার সখী হয়েছিলেন, সিনেমার নাম ‘অনেকদিনের আশা’। ‘অনেকদিনের আশা’র পরপরই তাঁর আব্বা ঘাড় ধরে দাদাজানের সাথে বিয়ে দিয়ে দেন। আমরা হো-হো করে হাসছি। বড়ভাবী প্রায় পড়ে যাচ্ছেন হাসতে হাসতে, আঁচলের আড়ালে বুকের দুধ খেতে অসুবিধা হওয়ায় বিষম কান্না করছে বাবলু। আমি আড়চোখে দেখি দীর্ঘ খয়েরী স্তন- বড়ভাবী বলেন- বিয়া হোক-বাচ্চা হোক দেখবনে এই ওলকপির মতন বুক কই থাকে…হিহিহিহি… ছোড়দা পরীক্ষার পড়া ছেড়ে এসে লাল লাল চোখ করে বলছে- তোমরা কি শুরু করলা, আমারে পড়তে দিবানা?”

শারমীন ইন্টারমিডিয়েটের একবছর পরে ইন্ডিয়া চলে গেছে পড়তে। মুখোমুখি বারান্দায় উদয়নের সাথে ওর প্রেম ভেঙে গেছে কবে। উদয়ন এখন যার সাথে প্রেম করছে (আহঃ প্রেম এখন ক্রিয়াপদ) তার নাম প্রিমুলা। ঠিক কী কারণে শারমীনের সঙ্গে ওর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল- তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। উদয়নকে আমার ভালো লাগতো।

পূজার ছুটিতে এসেছিল শারমীন। এসে দেখে উদয়নের বাড়ি ঝলমল করছে টুনিবাল্বের আলোতে। কার বিয়ে? না উদয়নের। আজকে মেয়ের গায়ে হলুদ।

আমি সেদিন শারমীনদের বাসায় থাকতে এসেছি। রাতের শুনশান বাতাসে দোল খাচ্ছে হলুদ টুনির ঝালর।আমি আর শারমীন বারান্দায়। আমার একটু খারাপই লাগছে-যেন প্রেমটা আমার সঙ্গেই ছিল।

শারমীন কিন্তু নির্বিকার। ওর একঢাল চুল কেটে ফেলেছে।ওর রুমমেট রাজপ্রীত মহল বলে একটা মেয়ে, রাজপ্রীত আর শারমীন সিগারেট খায় একসাথে, গাঁজাও খায়।শারমীন আস্তে করে বলে- আমার ধারনা ছিল, সেক্সের পরে পৃথিবী বদলে যায়, আসলে শুধু একটা টাল খাবি, একটু ভোঁ-ভোঁ করবে মাথা…

উদয়ন বাড়িতেই ছিল, বাসার সবাই মেয়ের বাড়িতে গেছে হলুদ দিতে।আমাদের দেখে সে ফোন করলো। শারমীন উঠে গিয়ে ফোন ধরলো, টুকটাক কুশল জিজ্ঞাসা।

আমার কেন কষ্ট হতে থাকে? পৃথিবীময় যত অমীমাংসিত প্রেম- তার যন্ত্রণা আমাকে কেন বেঁধে? কেন আমি শুনশান রাতের বাতাসে আঁচড়াই আর জন্মাদপি পুরাতন-মৃত্যুঞ্জয়ী প্রেম এইসব যাচ্ছেতাই খুঁজতে থাকি। কেন খুব আশাপ্রদ একটা কিছুর মতো ‘ফজলে রাব্বি হল’এর শ্যামলা একটা লোক আমার চোখে ভাসে?

 

বহ্নি সুলতানা

একদিন সকালে প্যাট্রিক ফার্ণানের মা এসে হাজির। গল্‌ওয়ে থেকে। ইসাই ওঁকে দেখে আনন্দে অধীর। আমি আনন্দিত হবো কিনা, বুঝতে পারছিলামনা। মিসেস ফার্ণান আমার কাছে ইসাইয়ের ভয়ানক অতীতের প্রত্যক্ষ অংশ। এদিকে ভদ্রমহিলার নিবিড় প্রশ্রয়মাখা হাসি আমার দেখামাত্র ভাল লেগে গেছে। ইসাইয়ের সেদিন কাজ ছিল, সে কাজে চলে গেল। মিসেস ফার্ণান উজ্জ্বল সবুজ চোখ ভরে হাসছিলেন- উনি অনুরোধ করলেন ওঁকে আইরীন ডাকার জন্যে। আমি একটু দ্বিধার সাথে প্যাটের কুশল জিজ্ঞেস করলাম, শুনলাম কয়েকবছর হয় প্যাটের সঙ্গে ওঁর দেখা হয়নি। সে এখন নিউ-ইয়র্ক থাকে। তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে।

সারাদিন এই উচ্ছল মহিলা ব্যস্ত রইলেন। আমার ঘরদোর-বাগান ওঁর খুব ভাললেগেছে বুঝলাম। যাই দেখেন, একটু শ্বাস টেনে মৃদুস্বরে বলেন-ওয়ান্ডারফুল!

ক্র্যাব-অ্যাপল্‌ গাছটা দেখে মুগ্ধচোখে বললেন- এই গাছটা লাগিয়েছিল আমার প্যাট্‌। খুব টক ফল, পাখিদের প্রিয়।”

-তুমি অ্যাপল্‌ জ্যাম তোয়ের করোনা? ইসাই তো আমার হাতের জ্যাম খুব ভালবাসে। ক্র্যাব অ্যাপলের খোসা ছাড়াতে হয়না। বাতাসে ঝরে যাওয়া অ্যাপল্‌ও দিব্যি জ্যামে ব্যবহার করতে পারো, কেবল গুঁতো খাওয়া কালচে দিকগুলি কেটেকুটে নিও। এল্ডারবেরী খুব ভাল চলে অ্যাপল্‌জ্যামের সঙ্গে।”

অ্যাপল্‌জ্যামের জন্যে মরে যাচ্ছি- এরকম ভাব করে শুনলাম। সুপারস্টোরে যা একটি মুদ্রায় কেনা যায়, তার জন্যে এত ঝকমারি দরকার কি আমার?

আইরীন চায়ের কাপ নিয়ে বারান্দায় বসলেন- বিশ্বযুদ্ধের সময় ওঁর মা কেমন করে ব্যাঙের ছাতা শুকিয়ে রাখতেন শীতকালীন স্যুপের জন্যে- সেটাও মরিয়া হয়ে শুনলাম। প্যাটের সব বয়ফ্রেন্ডের মধ্যে ইসাই-ই যে তাঁর সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে কাছের এইটা বারবার বললেন।

এদেশে পশ্চিমারা আমাদের দুই-তিনটা প্রশ্ন করে। যেমন- তোমার ভাইবোনরা কি বাবা-মায়ের সাথে থাকে? যেমন- তুমি কি অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ করেছো? আর জিজ্ঞেস করে- তোমার দেশে কি স্টারবাক্‌স্‌ আছে? আইরীন সেসবের কিছুই জিজ্ঞেস করলেননা।একবার বললেন- আমার সাথে কথা বলতে পেরে তাঁর খুব ভালো লাগছে।

আইরীন দুপুরবেলা রাঁধলেন ভেড়ার মাংসের সুরুয়া, আলু আর গাজর দিয়ে। শুনলাম এর নাম আইরীশ স্টু।

স্যালাডের পাতা যোগাড় করতে বাগানে নেমে এলেন।

-দ্যাখো, এই যে হলদে ফুল, এর নাম ড্যানডেল্যায়ন। এর নবীন পাতা স্যালাড হিসেবে চমৎকার। তারপর এই যে গাজরের কচি পাতা, মূলোর পাতা, ওলকপির পাতা…সব চলে স্যালাডে।” তথাস্তু।

খাওয়াদাওয়ার পর আইরীন একটু ঘুমাতে গেলেন। বেচারীর বয়স হয়েছে অনেক। আমি তার শিয়রের কাছটায় চেয়ারটা টেনে নিয়ে উল বুনতে লাগলাম, আম্মা আমাকে বোনার কাজের নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলেন, অবেলায় কাঁটা নিয়ে বসলে সময়ও কাটে, কাজও হয়।

একবার উনি চোখ খুলে বললেন- আমরা খুব গরীব ছিলাম। সরকারী হাসপাতালের রান্নাঘরে কড়াই নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। ওদের বড় বড় রোস্টিং প্যানের গা চেঁছে তেল-চর্বির কাঁই তুলে আনতাম, রুটিতে মেখে খাবার জন্যে। কি সুন্দর দিনগুলি- কেমন ঝকঝকে রোদ্দুর আর সদর দরজার সামনে সিঁড়িতে বসে আমরা মটরশুঁটির খোসা ছাড়াতাম। আমার মা সারাবছর আমাদের জামা-জুতো-মোজা মেরামত করতেন চৌকাঠে বসে।”

আমি ওঁর পায়ের ওপর কম্বল টেনে দিয়ে বের হয়ে আসি। আমার জানালায় ধূসর শহর, আকাশ বিবর্ণ মেঘে ঢাকা। পাপপূন্যের ভ্রুক্ষেপহীণ-পিতৃহীণ-মাতৃহীণ-সন্তানহীণ মানুষের স্রোত চলেছে উর্ধ্বশ্বাস…আয়ূর মতো দীর্ঘ রাজপথ ধরে। এর ভিতরে কোথায় আমি? বাবুরাম সাপুড়ের সেই সাপটার মতো। ফোঁসফাঁস করিনা। ঢুঁসঢাস মারিনা।

বসে থাকতে থাকতে আমার চোখ লেগে এলো। এর ভেতর কখন মিসেস আইরীন ফার্ণান তাঁর চিঠি লিখলেন, কখন গুনে গুনে তাঁর স্লিপিং পীলগুলি খেলেন, কখন গভীর শান্তির সাথে মৃত্যুর বাড়িয়ে দেয়া হাতে নিজের হাত রাখলেন- যেহাতের মুঠিতে মার্বেলের মতো উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে আছে অনেক প্রিয় নাম- প্যাট্রিক, ব্রায়ান, ফিয়োনা…হয়তো ইসাই ও…

চিঠিটা ইসাইয়ের উদ্দেশে লেখা-

“প্রিয়তম ইসাই,

প্রথমেই ক্ষমাপ্রার্থনা করছি তোমাকে যে অসম্ভব বিপর্যস্ত অবস্থায় ফেলবো তার জন্যে। আসলে আমি অনেক ভেবেচিন্তে তারপর এই সিদ্ধান্তে এসেছি।

যখন তরুন ছিলাম- তখন ভাবতাম পিটার আর আমি হাসতে হাসতে জীবন পার করে দেব- যেন এটা জীবন নয়, দু’ধারে চেরীফুল ফোটা এপ্রিলের বুলেভার্দ। পিটার মদ্যপে পরিণত হবার পর আমার সেই জীবনের স্বপ্ন ফুরিয়ে যায়। একদিন তিনটি ছোট ছোট শিশুকে নিয়ে বের হয়ে আসি। এরপর শুরু হয় কঠোর জীবনসংগ্রাম। তুমি তো জানো গোঁড়া ক্যাথলিকদের বিয়ে আদতে হয় একবারই। অতএব বিয়ে আমি আর করিনি। বিবাহবিচ্ছেদও নয়। তুমি তো জানো ইসাই, ছেলেপুলেদের নিয়ে কী কষ্টই না আমি করেছি। বেকারভাতা-চ্যারিটি শপের কাপড়-আত্মীয়দের দানের শার্টের ফাটা কলার বারবার সেলাই করা, শনিবার সন্ধ্যায় কসাইখানা বন্ধ করার সময় মা এনে দিতেন মাংসের ছাঁট কিংবা উদ্বৃত্ত সসেজ কী পর্ক-চপ। আমার ছেলেমেয়েরা কেবল রবিবারে মাংস খেতে পেত।

একসময় ছানাদের ডানায় জোর হলো- উড়তে শিখে গেল তারা। একেকজন একেক মহাদেশে। শেষ কবে আমি একসঙ্গে আমার সন্তানদের দেখেছি আমার মনে নেই। ক্রীসমাসের সময় ঝলমলে গাছের নীচে তাদের গ্রিটিংস কার্ড সাজিয়ে রাখি আমি। একাই রঙীন কাগজের শিকলি বানাই। একজনের পরিবেশন হয় মতন করে ভালমন্দ রাঁধি। বছরের অন্যসময়গুলিতে প্রবল একাকীত্বে ফায়ার ব্রিগেডে ফোন করে জ্বালাতন করি, কলসেন্টার থেকে কেউ ফোন করলে আর ফোন ছাড়তে চাইনা। এরকমই চলছিল।

একমাস আগে আমি খবর পেয়েছি পিটার মারা গেছে। দুইযূগেরও বেশী সময় ধরে আমরা একে অপরকে দেখিনা। প্রস্তরীভূত ঘৃণাও কিছু কম জমেনি। তাহলে পিটারের মৃত্যুতে আমি বিচলিত হবো কেন? কেন ভয়ে দিশেহারা হয়ে যাব এই খবর শুনে যে তিনদিন পর দরজা ভেঙে পিটারের শবদেহ যখন বের করা হয়েছে তখন তার মুখখানা ইঁদুরের ভুক্তাবশেষ।

ইসাই, মৃত্যু নিয়ে আমার রোমান্টিকতার সীমা নেই। আমি লিলি ফুল চাই, সুগন্ধী চাই, মোমের আলো চাই, আমার প্রিয় মানুষের চোখের জল অপনোদন করতে গিয়ে চাপা অস্ফুট দীর্ঘশ্বাস চাই। শাদা অর্গ্যাঞ্জার ফ্রক পরে যে চিরযুবতী চেরীফুলের বুলেভার্দ ধরে দৌড়ে যাবে- পৌঁছে যাবে মৃত্যুর বাগানে- তার চোখমুখ ইঁদুরে খেয়ে ফেললে কি মানায়? আমি গত একমাস ইঁদুরের ভয়ে ঘুমোতে পারিনা।

আমার পার্সে আমার তাবত সঞ্চয় সঙ্গে করে এনেছি ইসাই, তুমি আমার খ্রীস্টিয় সৎকার কোরো। আমার জন্যে আন্তরিক দীর্ঘশ্বাস ফেলো-মোম জ্বালিও-ফুল দিও। তুমি এবং তোমার পরমাসুন্দরী স্ত্রী আমার অনন্ত আশীর্বাদ জেনো।

একান্তই তোমাদের মা। তোমার, প্যাটের, ব্রায়ানের, ফিয়োনার।

 

খাবার টেবিলে ঢাকনা দিয়ে রাখা আছে ইউসুফের ভাগের ভেড়ার মাংস-গাজর-আলু। একজন মৃতা নারীর শেষ রান্না, অপার স্নেহের আর আকুল বিশ্বাসের স্পর্শ।বাকী সময়টা আমি কি করে কাটিয়েছি আমি জানিনা। চেয়ারে বসে। বিমূঢ়।ভয়ে জড়। যেন আমি এখানে নেই। কখনো ছিলামনা। যেন এখুনি হাতে একটা বই মুড়ে আমার কিশোরী বোন এসে ঘোষনা করবে- সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন বাঙালি মাংস রাঁধতে পারেনা। মাংসের গন্ধ নষ্ট করে ফেলে।” আমি দেখতে পেলাম রেবেকা ওর নীল-শাদা পোলকা ডটের ফ্রকটা পরেছে, ফ্যানের বাতাসে ফুলে ফুলে উঠছে ফ্রকটা।

সূর্যাস্তের আলো আকাশে থাকবে দীর্ঘক্ষণ। রো-হাউসগুলির সারি সারি পশ্চিমমুখী জানালা সোনার ঢালের মত ঝকমক করছে। আমার বাগানের সব নাসপাতির ছিনে পড়া চামড়ায় রৌদ্র রেখে যাচ্ছে তার শেষ চিহ্ন। এর ভেতরই একসময় আমি শব্দ পাই ইউসুফ বাড়ি ফিরেছে। আমি দৌড়াতে শুরু করি, ক্লান্ত ঢোলা টাই-চাবির শব্দ-পেট্রলের গন্ধের দিকে।আমি জেনে গেছি এত এত মুহুর্ত আমরা শুধু নষ্ট করি, শুধু প্রশ্ন করি, শুধু সন্দেহ-বিশ্লেষণ…জীবন তো কেবল মরিয়া হয়ে ভালবাসবার সময়, যেন আজকের পরে আর দিন নেই!

 

অ্যান্ড জীল কে’ম টাম্বলিং আফটার

নৌফেলের ঘরের বারান্দায় চীনা-বাঁশের ঝাড়, চমৎকার বেতের টবে।

আমরা যারা চে গুয়েভারার মৃত্যুতে অপরাধী বোধ করি, যারা সিলভিয়া প্ল্যাথের নামটা অন্ততঃ শুনেছি- তাদের মধ্যে কেবল নৌফেলের কামরাতেই এয়ারকুলার আছে।

প্রায় নিঃশব্দে চলতে চলতে দুরন্ত জৈষ্ঠ্যের দুপুরকে সে যন্ত্রটা আধো আধো আশ্বিনের বিকেল বানিয়ে ফেলে। কাঁচের দরজার বাইরে ঝিরঝির করে চীনাবাঁশ পাতা। আমি দু’হাতে আঁকড়ে হান্টার-বীফ্‌ এর পুরু স্যান্ডউইচে কামড় দিই। নৌফেল আমার নীল চপ্পলের যেখানটায় রঙ চটে গেছে, সেখানে দৃষ্টি স্থির করে শুনিয়ে যায়- সাবরিনার পরিবার আর ওর পরিবারের মধ্যে আন্তঃপারিবারিক আদানপ্রদানের গল্প।

এই গল্প আমি ঢের শুনেছি। আমার আমোদও হয়না, বিরক্তও লাগেনা। কারণ গল্প শেষ হবার আগেই আমি স্যান্ডউইচটা শেষ করবো। গল্প শেষ হবার পরপরই নৌফেল আমাকে খানিকটা আদর করবে। যেন আমাকে কষ্ট দেবার অনুতাপ সেটা…

যদিও, আমি অনুতাপ বোধ করিনা। নৌফেলের ঘরে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত এই শুনশান দুপুর, শরীরময় একধরনের উত্তেজনা-পরবর্তী অবসাদ আর পরিপাকরত প্রাক-উত্তেজনা সুখাদ্য আমার ভেতর কোনোরকম অনুতাপ তৈরী হতে দেয়না।

দহনকাল শুরু হয় যখন আমি রিকশায় বাড়ি ফিরি, দুপুরের কান জ্বালা করা বাতাস ফিসফিস করে- ভালবাসা?ভালবাসা? গভীর রাত্রে উত্তরের ঘরে কেশে ওঠে ছোড়দা কি ঘুমের মধ্যে কথা বলে ওঠে, আমার ঘুম ভেঙে যায়- একটা আশ্চর্যের অনুভূতি কাজ করে আমার মধ্যে- আচ্ছা, আমি কখনো ভালবাসবোনা? ধরো, লোকে যেমন করে ভালবাসে…তারপর ভালবাসা ফেরতও পায়, সেইরকম কিছু।

নৌফেলের ঘরটা বায়ূশূণ্য বেল্‌জার, আমাদের যূগলশরীরের ঘন্টাধ্বনি তার কাঁচের দেয়ালের বাইরে ছিটকে যায়না।

ঐঘরটাতেই নৌফেল প্রথম আমার বিয়ের গল্প শুনেছিল। আশেপাশে বড়ভাবী না থাকলে নুপুর-বাবলু যেমন জুলজুল চোখে টিভিতে হনুমানের মৈথুনক্রিয়া দেখতো, ঠিক সেইরকম চোখ করে। এরপর প্রথমবারের মত শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল আমাদের। আশ্চর্য এই যে, এটা মিলনাত্মক কোনো প্রস্তাবনা ছিলনা। নৌফেলকে আমি আমার অতীতের গল্প বলেছিলাম, কারণ ও আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল (যেন আমার অতীতই একমাত্র বাধা ওকে বিয়ে করার পথে।) যা ভেবেছিলাম, ঘাবড়ে গেছিল সে। একটু স্বস্তিও কি বোধ করেছিল? জানিনা। কারণ জানতে চাইনা।

হয়তো এখন নৌফেল জনান্তিকে হালকা বোধ করে এই ভেবে যে, আমার কৌমার্যহরণের দায় সে বইছেনা। একটা সিগ্রেট ধরায় (মৃদু তামাক) এবং ভুরভুর করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সাবরিনার গল্প করে আমার কাছে। হয়তো নিজের মত করে আরামও পায়  এই ভেবে যে- সাবরিনাকে সে কখনো ‘পায়খানা’ বা ‘বাঞ্চোত’ ইত্যাকার শব্দ উচ্চারণ করতে শোনেনি।শুনেছে আমার মুখে। নৌফেলকে যে চেনে, সে জানে এটা তাকে প্রায় শারীরিক আঘাত করার শামিল।আমি বুঝিনা- অন্যলোককে বাঞ্চোত বললে নৌফেল এত কাতর হয় কেন।

নৌফেল আর সাবরিনার বিয়ের পোশাক ডিজাইন করবেন ডিজাইনার অমিতি পারভীন। অত্যন্ত পরিতোষের সঙ্গে জানায় নৌফেল। ওর বিয়ের পাগড়ীর ‘শর্‌প্যাঁচ’ (ঐ একরকম গয়না আর কি) ডিজাইন করেছেন আবরার মাকসুদ।

আমি বুঝতে পারিনা নৌফেলের মাথায় লোরকা-নেরুদা-অমিতি-আবরার সব একসাথে কি করে জায়গা হয়? বিপ্লবী হবার স্বপ্ন-গ্রামে স্কুল গড়ার ইচ্ছা-থিসিস্‌-ইলিনয় ইউনিভার্সিটি-আবরার মাকসুদ এর কয়েনপার্ল সিলেকশন-স্থায়ী শীতার্ত ঘরে স্থায়ী জেসমীনের ঝিমঝিম সুবাস…সব একসাথে…নাহ! নৌফেল আমার চেয়েও বেচারী, ওর অবস্থা ‘ভজঘট’ কম নয়!

‘ভজঘট’ শব্দটা বলতেন আব্বা। একটা ছবি দেখিয়ে। আম্মা বিয়ের আসরে কনে সেজে বসে আছেন, অতিথিদের সারিতে আব্বা বোরহানি খাচ্ছেন। আমরা ছবিটা দেখে কত না অবাক হয়েছি।

আসলে আম্মার বিয়ে হয়েছিল মনিমুল হক বলে এক ভদ্রলোকের সাথে। বিদ্বান ছেলে, বাবার সুতার ব্যবসা আছে পুরান ঢাকায়, বকশীবাজারের ছয় সন্তানের পিতার কন্যা হিসেবে আম্মার জন্যে অভাবনীয় সম্বন্ধ।আম্মা কিছুই বলতে পারলেননা, বিয়ে হয়ে গেল।

বিয়ের রাতে আম্মা মনিমুল হক সাহেবকে কাঁদতে কাঁদতে সব বললেন। আব্বা সেসময় থাকতেন বাদামতলীর একটা মেস্‌এ, ‘এঁড়েগেঁড়ে’ (এটা আমার দাদীজানের ব্যবহৃত শব্দ) মেস্‌ নয়, কূলীন মুসলমান যুবকদের মেস্‌।সেরাতেই হক সাহেব আব্বাকে খুঁজে বের করলেন।

বিবাহবিচ্ছেদ এবং পুনর্বিবাহের ব্যবস্থা হলো। মনিমুল হক তাঁর সাময়িক-স্ত্রীকে বড়ভাইয়ের মতো দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিলেন।কেলেঙ্কারীর ঘটনা পুরানঢাকার গলির জন্যে। আব্বা-আম্মার জন্যে পুরানা-পল্টনে একটা বাসা খুঁজে দিলেন উনি। যে বাসায় পরে আমাদের বড়ভাইয়ার জন্ম হয়। এইভাবে একটা ‘এঁড়েগেঁড়ে’ মেয়ে দাদীজানের বিশুদ্ধ রক্তের ধারা নষ্ট করে ফেললো! ভজঘট অবস্থা।

মনিমুল হক সাহেব কিন্তু আমাদের বাড়িতে আসতেন। ছোটবেলায় আমরা উনাকে ডাকতাম মনিমামা। উনার মাকে ডাকতাম ‘মনিদাদি’। ভদ্রমহিলা আঘাত পেয়েছিলেন খুব, পরে সামলে উঠেছিলেন অবশ্য, ছেলের মহত্ত্বে নিরালায় গর্বিতও হয়েছেন নিশ্চয়, নৈলে আমাদের এত আদর করতেন কেন?

মনিমামা আর বিয়ে করেননি। প্রতি সপ্তাহে ছুটির দিনে আমাদের বাসায় আসতেন, আব্বার সাথে মাছ-টাছ কিনতে বাজারে যেতেন, ভাইয়ার হোমটাস্ক করাতেন। আম্মা উনার সামনে আসতে অস্বস্তিবোধ করতেন।কিন্তু মনিমামার ঐসব বালাই ছিলনা।

প্রথমবার (মনিমুল মামার বাসায় থাকা অবস্থায়) আম্মা রান্না করে খাইয়েছিলেন ইলিশ-চিতই। নানার কাছে আম্মা ফিরতে পারেননাই- নানাজান বিষ খাবেন ঘোষনা দিয়েছিলেন। অতএব নিরুপায় আম্মা মনিমামার বাসাতেই ছিলেন। মনিদাদি আম্মাকে খুব ভালবাসতেন।

মনিমামা আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসলেই ইলিশ চিতই খেতে চাইতেন। বোধহয় অপরিসর রান্নাঘরে সদ্যবিবাহিতা তরুনী স্ত্রীর রান্না করে খাওয়ানোর স্মৃতি তিনি ভুলতে পারতেননা। ইলিশ মাছ কিনে আনতেন। মশলামাখা মাছ পিঠার ছাঁচে পিঠার সাথে চেপে বসিয়ে পিঠার ভাপে রান্না করা- ঐ হচ্ছে ইলিশ চিতই। গাঁওগেরামের এঁড়েগেঁড়ে লোকের কাছে দারুন সুখাদ্য।

একসময় মনিমামার আসা বন্ধ হলো। আমার ক্ষুরধার ভগিনী সকলের সামনে তাঁকে বলে দিল- আপনাকে যেন আর কখনো এই বাড়িতে না দেখি।”

আশ্চর্য, আব্বা-আম্মা কেউ বহ্নি সুলতানার কথার পিঠে কিছু বললেননা। মনিমামা চলে গেলেন, আমার দেখা সবচেয়ে আধুনিক মানুষ। আমার প্রিয় দাদি, আমার একমাত্র দাদি ‘মনিদাদি’ও আর আসলেননা।

চিন্তা করে দেখলে, আমাদের জীবন থেকে কত কিছু যে বহ্নি সুলতানা কেড়ে নিয়েছে…এহ! দরদ! শীতের কাপড়, পাউডার, শ্যাম্পু…কত কী পাঠানো হচ্ছে।

বহ্নি সুলতানা

ইমরান আর আমি চাঁদরাতে ঈদের রান্না করছিলাম। দেদার আয়োজন।আমি পোলাওয়ের চাল ভিজিয়েছি। ইমরান সিংকের পাশে দাঁড়িয়ে বরফের হাঁস কাটছিল। বেজায় কষ্ট।সজল ভৌমিক একটার পর একটা সলিল চৌধুরীর হিট গান বাজাচ্ছে। বাকীরা বেগার খাটছে শপ্‌এ। ইমরানকে সবাই ইমি ডাকে। ইউসুফকে ডাকে ইসাই। সবাই বলতে আমার শ্বশুরকূলের লোকেরা। তো ইমরান জিজ্ঞেস করলো- ইসাই তোমাকে ঈদে কি দিল শিরীন?”

-একটা স্কার্ফ। পাতাগোনিয়ান স্কার্ফ। উল আর সিল্কে বোনা।”

-আমার বউ হলে তোমাকে আমি আজকে রাতে কিছুতেই বাড়ি থেকে বের হতে দিতামনা।”

-তোমার হাঁস পিস্‌ করতে আর কতক্ষণ লাগবে?”

-আর দুই মিনিট। চর্বি ফেলবানা শিরীন, আমরা চর্বি খাই।”

হাঁস চড়িয়ে একটু বসলাম। ইমরান বসলো আমার পাশে।

-ইসাই তোমাকে কেমন ভালোবাসে শিরীন?”

-এ আবার কেমন কথা ইমি? বেশ ভালোবাসে।”

-শিরীন তুমি যে কাকে ঠকাচ্ছো তুমি জানোনা। ইসাই যে গে’, সেটা আমি স্কুললাইফ থেকে জানি।”

আমি শিরীন সুলতানা, বেমচকা কখনো ভেঙে পড়িনা, আমি টেলিভিশনের স্ক্রীনে চোখ রেখে বসে থাকলাম। ইমরান একটুও না দমে আবার বললো- শিরীন, তুমি কি জানো এইড্‌স্‌ এর নাম ছিল গে’ প্লেগ, শুধু সমকামীদের এই রোগ হইতো!”

এই গল্প অনেক আগের মা দেবযানি, তখনো এলটন জন তার সমকামী মিতার সিভিল পার্টনার হয়নি। তখনো লন্ডন তোলপাড় করে মুক্তি পায়নি ‘ব্রোক্‌ব্যাক্‌ মাউন্টেন্’। পুরুষের প্রতি পুরুষের ভালোবাসার নিজস্ব সংবেদ উচ্চারিত হলে তখনো আমার প্রচন্ড প্রতিক্রিয়া হতো।

আমি আগুন-চোখে ইমরানের দিকে তাকাই- যেন ভস্ম করে ফেলতে পারি ওকে ওর ঐ ঘামের গন্ধ-হাতের বড় বড় নখ-ট্রেইনার-সোয়েটশার্ট সমেত। আমি বহ্নি সুলতানা, আমার দাদীজানের রক্ত আমার গায়ে টগবগ করে ফুটতে থাকে। উনুনে টগবগ করে সেদ্ধ হতে থাকে নির্বিকার হাঁস।আমি আর আসবোনা এখানে, এ আমি নিশ্চিত করে জানি।

সেরাতে বাড়ি ফিরে আমার অসম্ভব কষ্ট হতে থাকে। আমাকে কে যেন অসম্ভব অপমান করেছে, আমি তার কোনো বিবরণ জানিনা।চলতে চলতে এদেশে বহুলোকে আবিষ্কার করে যে তারা সমকামী, আমার প্রিয় অভিনেতা জেরেমী ব্রেট্‌ যেমন! বুঝবার আগে তারা নারীসঙ্গ করে, সন্তানের মুখ দেখে। পর্দার মন্টগোমারি ক্লিফট্‌-মার্লন ব্রান্ডো-রক্‌ হাডসন্‌কে দেখবার সময় আমি কি কখনো ভেবেছি যে আমার জীবনে সমকামিতার মুখোমুখি হতে হবে?জীবনযাপনের স্বাভাবিক অন্বেষণগুলিতে আমাকে মানুষ ঠেলে ঠেলে যে সত্যের মুখোমুখি হতে চাইনা, তার সামনেই দাঁড় করিয়ে দেবে?

ইউসুফের ঘরে আবছা আলো। গান বাজছে। খুব বিষন্ন তার সুর।আমি এই গায়কের নাম জানি। রয় অর্বিসন, ইউসুফের খুব প্রিয় গায়ক। ইসাই জেগে আছে আমি জানি। ‘নারী আমাকে আকর্ষণ করেনা’ জেগে আছে। আমি ওর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকলাম, আমি জানি- ও আমাকে দেখলে সসম্মানে উঠে দাঁড়াবে। নিত্যশুভার্থীর হাসি হাসবে এবং জানতে চাইবে কোনো সমস্যা হচ্ছেনাতো! (যেন ইউসুফ ‘সমাধান’ করে!) আমি যদি বলি- ইসাই, আমার ছোটবেলার ঈদের গল্প শোনো, সে ঠিক ধৈর্য সহকারে শুনবে (ধৈর্য আর মনোযোগ কি এক নাকি?)

হ্যালো শিরীন। তুমি এখনো ঘুমাওনি?” ইউসুফ আমার সামনে দাঁড়িয়ে। স্যাভানাহ্‌ রঙের শার্ট আর ট্রাউজার পরনে, যে রঙগুলি ও ঘুরেফিরে পরে।পানসে সবুজ, হালকা বাদামী, নীলচে খয়েরী। আমি ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। ওর ফিকে চোখের মনি, ফিনফিনে ঠোঁট আর অবারিত কপাল মিলে ওর চেহারা আমি এখনো স্পষ্ট করে চিনিনা। সত্যি চিনিনা। আমার মুখ থেকে নিঃসাড়ে ঝরলো- আমি তোমার ঘরে ঘুমাতে চাই।” ইসাই কি অবাক হলো? জানিনা। আমি নিজে প্রচন্ড অবাক হলাম।

বিছানায় ল্যাভেন্ডারের অপার খোশামুদে সুবাস। ইউসুফ আমার চারপাশে দ্যুভে গুঁজে দিল। আমি অসম্ভব বিস্ময়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি- ঘরের ভেতর বিষন্ন বাজনা নিরবধি। ইউসুফ আমার কানের পেছনের ওডিকোলনের হাল্কা গন্ধ পেল। ওর কাঁচের চোখ আমার দিকে স্থির। আঙুল বিলি কাটছে আমার চুলে। তারপর পিঠে-কোমরে-মেরুদন্ডের নিচে- ঘুরে এসে পেটে-নাভিতে- আঙুলগুলি কোথাও স্থির হয়ে একটু ভেবে নিয়ে আবার বিলি কেটে চলেছে আমার শরীরে, নিঃশব্দ সরীসৃপের মতো। খুব সহজভাবে ওর মুখ নেমে এলো আমার মুখে- বিষাদময় যুবকের একফালি মুখ- ওর মাড়ি আর চোয়ালের গড়ন অন্যরকম…চুমু খেতে গিয়ে আমার মনে হলো-খুব সহজভাবে আমি ইসাইয়ের বুকের ভেতর ঢুকে গেলাম। শীতকালের সন্ধ্যার মত গন্ধ ওর বুকে। চুমুতে ভিজে ওঠা মুখ তুলে আমি জিজ্ঞেস করি- ইসাই তুমি কি আমাকে দেখতে চাও?…শিরীন আই ওয়ান্ট য়ু টু ফীল কমফর্টেবল অ্যাবাউট ইট, তুমি রীতিমত কাঁপছো…ইসাই তুমি কি আমাকে দেখতে চাও?…শিরীন তুমি কথা বোলনা চোখ বন্ধ করো…ভীরু বাজিয়ের মতো ইসাই স্পর্শ করে আমার শরীর, পেয়ালার মতো তুলে নেয় স্তন। আদরের হাতে ছোঁয় আমার পাখির ডানার মতো কাঁধ, বাহুমূলের রোম, নিম্নস্তনের গভীর রেখা…পায়ের ডিম- ওর আঙুল আবার বিলি কাটতে থাকে আমার সারা শরীরে, ক্রমাগত, আমি চোখ বুঁজে টের পাই…কি যেন বিন্দুর মতো অনন্ত পরিক্রমা করে যাচ্ছে আমার সারা শরীরে- আহ, আমি কাতরে উঠি, আমার শরীর ঢেউয়ের উপর উঠে নাচতে থাকে, আরো উপরে, আরো উপরে তুলে দেয় কেউ- আমার পা শিরশির করে এত উপরে-একটা আনন্দ বেলুনের মতো ফুলতে থাকে- একটা আনন্দ বেলুনের মতো ফটাশ করে আমার মুখে ফেটে যায়, আরো উপরে ছুঁড়ে দিয়ে কেউ আমাকে লুফে নেয়, এরপর ঝট্‌ করে আমাকে উপুড় করে দেয়। যন্ত্রণায় শিউরে উঠি আমি, কিন্তু আমার শরীর বেয়ে অনন্ত প্রদক্ষিণ করে যাওয়া উজ্জ্বল বিন্দু আমাকে আর কিছু বুঝতে দেয়না।

আমার ঘুম ভাঙলো দাদীজানের ঘরে। টানটান লেসের পর্দা উপচে সকালের আলো আসছে।কবুতরের স্বগতোক্তিতে ভরে আছে ঘর।আর আছে চিরচেনা সবেদার পায়েসের গভীর সুঘ্রাণ। দাদীজান উঁকি দিলেন। পরিষ্কার বার-সাবানে কাচা শাদা শাড়ির আধা-ঘোমটা।– কি রে, ঈদ করবিনা?” দাদীজানের চোখ কি নিবিড়।আব্বা গর্ব করতেন, আমার মেয়েরা আমার মায়ের চোখ পেয়েছে!

ঈদ করবার জন্যে আমি উঠে বসি। ঘর গুছাই। কফির জল বসাই। কিচেনের দেরাজে অজস্র জ্যাম- রুবার্ব, ব্ল্যাকবেরী, অ্যাপল-চীজ…চকচকে চোখে বোতলগুলি তাকিয়ে আছে।প্যাট্রিক ফার্ণানের মা নিয়মিত আয়ার্ল্যান্ড থেকে ইসাইকে নিজহাতে তৈরী জ্যাম পাঠাতেন।

কিচেন গার্ডেনে পরিচ্ছন্ন সারিতে বোনা রানার বীন্‌, ব্রড বীন্‌, বাঁধাকপি, বেগুনি ব্রকলী- ইউসুফ প্রাতরাশ সারতে সারতে আমাকে চেনায়। আমার বাগানের খুব শখ ছিল। আমি বিপুল উজ্জ্বল চোখে ইউরোপে আমার প্রথম মিত্রকে দেখতে থাকি। এই বাগানে পরে আমিই গজিয়েছি মূলা-লেটুস-পার্সলিপাতা। কাঠের বালতিতে ব্যাসিল আর মিন্ট। রোজমেরী আর থাইম।ইউসুফের জন্যে আলু। আইরিশদের আলু-প্রীতি সে খুব রপ্ত করেছিল।

রোদ-ঝকঝকে সেই ঈদের দিনের সকাল আমার খুব মনে আছে। সবুজের সমারোহে দাঁড়িয়ে আমি নিশ্চুপ পর্যবেক্ষণ করছিলাম আমার জীবন। যতদূর চোখ যায়, আনন্দ করার কিচ্ছু নেই। একটা পাতলা সুতোর মতো পুলসেরাত, তার ওপর ভর করে হেঁটে যাওয়া। নীচে কত আগুনের কুমীর! যতক্ষণ না পড়ে যাচ্ছি, ততক্ষণ জীবিত আছি। আমার মন বলে, বুদ্ধি বলে এমন কিছুই চোখে পড়ছেনা যাকে ভরসা করে হেসে ওঠা যায়। কিন্তু আমার শরীর বলে, আমার ঘুমভাঙা চোখ বলে- আমি আনন্দ করতে চাই।

মানুষের কত শক্তির উৎস তার হাত!আমি দুই হাত বাড়িয়ে গভীর প্রত্যয়ে ইসাইকে জড়িয়ে ধরি। আমি সুখী করবো এবং সুখী হবো। ইউসুফ প্রথমে খুব অবাক হয় এই উচ্ছ্বাসে। আলিঙ্গন অবশ্য তার কাছে কোনো অচর্চ্চিত মুদ্রা নয়। অতএব সেও স্বাভাবিকভাবে সাড়া দেয়। এবং স্বাভাবিকভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।

আমরা দুই বোন। চিরদিন ছিলাম প্রতিদ্বন্দী। নিঃশব্দ সেই শত্রুতার কোনো অবধি ছিলনা।কেন জানিনা- সেইসব শত্রুতা অর্থহীন মনে হয়। মনে হয় এই পরবাসে, এই অশেষ নির্জনতায় আমার ভেতরে একটু একটু করে রেবেকার সেই সূর্যাস্তের সবুজ আকাশ ফুটে উঠছে। রেবেকাকে চিঠি লিখি একদিন।একদিন সে চিঠির জবাবও আসে। রেবেকা পড়ছে তুর্গেনিভ আর গোর্কি। সমারসেট মমের ‘অফ হিউম্যান বন্ডেজ’। আমি রান্না করছি- আলুসেদ্ধ, রোস্টেড ল্যাম্ব আর পেঁয়াজের ক্যারামেল।কি অদ্ভুত, আমাদের প্রতিযোগিতা কিন্তু ফুরাচ্ছেনা।

মাস কয়েক পরের কথা।আম্মা এখানে মোবারকভাইকে (একসময় আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন) দিয়ে আমার জন্যে কুমড়াবড়ি পাঠিয়েছেন। অসুরের মতো কালো কই মাছ-শাদা ফুলকপি-সবুজ ঢেঁড়স-লাল টমেটোর ঝোল রাঁধলাম সারাবেলা দাঁড়িয়ে, ঝোলে ডুবছে আর ভাসছে বড়ি।নামাবার আগে পেঁয়াজকলি আর ধনেপাতা…ছোড়দা এই মাছ-তরকারী কি ভালই না বাসতো, আমি রান্নাঘরে ঢুকলেই ভালমন্দ খাওয়ার লোভে অস্থির হয়ে উঠতো সে। অবশ্য আমাদের রান্নাঘরে এত আয়োজন ছিলনা।

সন্ধ্যাবেলা ডীনারে বসে ইউসুফ আমার পাতের দিকে চেয়ে মত বদলে ফেললো, সে আমার ফিশ এন্ড ডাম্পলিং কারী খাবে। খা! আমি ওকে কইমাছের কাঁটা বেছে দিচ্ছিলাম, হঠাৎ  আমার একটা কাঁপুনি দিয়ে মনে হলো- আত্মীয়তার এই চর্চ্চাগুলি ওকে আমার আপন করবেনা। কেবল আমাকে মাথা কুটে মরার কষ্ট দেবে। সবচেয়ে ভয়াবহ কথা- গভীর বেদনার সাথে আমার মনে হচ্ছে- আমি ইউসুফকে ভালবাসছি। কবে কেমন করে জানিনা, ওর একটুকরো সবজিবাগানের সঙ্গে সঙ্গে ও-ও কেমন টুক করে আমার বুকের ভিতর ঢুকে গেছে।

ওর পোষা হ্যামস্টারগুলির মতন আমি একটা সাংঘাতিক যাতনার চাকার ভিতর আটকে গেছি।

রাজার সামনে দিব্যি পরিবেশিত হয়েছে সুমুখ-সুবোধ পাঈ, হঠাৎই পাঈয়ের ভেতর থেকে ঝপাঝপ বেরিয়ে পড়লো চব্বিশটা কালো পাখি…সে কী ডানার ঝাপট্‌ তাদের (নুপুরের নার্সারি রাইমস্‌ এর বইয়ে এরকম একটা ছবি ছিল না?)

 

এই আলো, এ বিকেল, এই বেচাকেনা / এই কাজ-প্রেম, রাঙা জীবনের দেনা

আমাদের মা মারা গেলেন ভোররাতে। আব্বার হাতঘড়ির নীল ডায়ালের মতো আকাশ, ঘরের ভেতরটা অসুস্থতার-মশার কয়েলের-গ্লুকোজ বিস্কুটের গন্ধে গুমোট।আমি ছিলাম শিয়রের কাছে। শেষরাতের স্বপ্ন-না মায়া-না মতিভ্রম আজানের শব্দ শুনে আমার এমন কান্না পেল।

আম্মার শিথানে হাত রাখলাম, যেখানে ঘুমন্ত রাজকন্যার সোনার কাঠি থাকে। সোনার কাঠি-রূপার কাঠি বদল হলো যেন, আম্মা চোখ মেললেন। চোয়াল একটু ফুলে আছে। আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম- আম্মা আমাকে মাফ করে দাও।”

আম্মার অসুস্থ-অনুজ্জ্বল-উদাস চোখ আমার উপর স্থির হলো। নীলচে অন্ধকারে আম্মা একটা শ্বাস ফেলে বললেন- আমার ফুলের মতো মেয়ে! কত বিদ্বান হবে (ভেবেছিলাম)!”

তারপর চোখ বন্ধ করলেন। একটু পরে ঘুমিয়ে গেলেন। কখন আম্মা মারা গেলেন আমি জানিনা। রূপবতী-বিদ্যাবতী মেয়েদের মা, মারা গেলেন নিতান্ত সর্দিজ্বরে।

মাথার কাছে বজ্রাহতের মত বসে থেকে ক্যালাইডোস্কোপের মতো আমি নিজের জীবন ঘোরাতে লাগলাম।সতর্ক মা-বিরূপ মা-অভিমানী মা। ভুল শাসন, ভুল তত্ত্বাবধান, ভুল প্রেম, ভুল বন্ধু, ভুল অর্থনৈতিক পংক্তি…একজীবনে আমি কতগুলি ভুল শোধরাতে পারি? কঠিন অনুশাসনের ভেতর থেকেও আব্বাকে আম্মাকে ভালবেসেছি তো, বহ্নি সুলতানা- তার গরিমাময় রূপ ভালবেসেছি! আমার ভাইয়েরা- তাদের গাব্রিয়েলা সাবাতিনির পোস্টার-ঘামের গন্ধ-বিছানায় উলটে রাখা মহাজাতকের রাশিফল…ভালবেসেছি। পলাশ পর্যন্ত সবই তো বিমুগ্ধ বিস্ময়ে ভালবেসেছি।তারপর থেকে অবশ্য বিপন্ন বিস্ময়ের শুরু। ভালবাসার হাতে একতরফা এত মার আমি খেয়েছি- আমার প্রেমের শক্তি ফুরিয়ে গেছে। কত আমার বয়স? এর মধ্যেই আমার হাতের মুঠো খালি, এরি মধ্যে ভালবাসা আবৃত্তি করার মতো জোর আমার গলায় নেই ?

জীবনটাকে একটা আস্ত পেঁয়াজের মত খুলতে খুলতে…খুলতে খুলতে…ঠিক কখন পেঁয়াজের ভেতরের ডিম্বাকার নীলাভ শাদা চাঁদ বের হয়ে আসবে ভাবতে ভাবতে…এদিকে আমি কেঁদেই চলেছি, আর আমার চতুর্দিকে বাদামী

পরিত্যক্ত খোসা কেবল…

আম্মা ঠিক আমাকে ভালবাসতেন কিনা- একথা ছোটবেলায় আমি কিছুতেই হলপ্‌ করে বলতে পারতামনা। ইস্কুলগেটের সামনে প্রচন্ড বৃষ্টিতে কালোছাতা মাথায় যে মধ্যবয়স্ক মহিলা দাঁড়িয়ে থাকতেন- তাঁর মুখে আমি ভালবাসা দেখতে পেতামনা, সেখানে শিলালিপির আখরে লেখা কর্তব্য, একরৈখিক অনুশাসন, প্রায় ভীতিপ্রদ নিষ্ঠা। মায়ের গোসলের সময় আমার এমন করে মনে হলো- ঐগুলি আমার অনিষ্টচিন্তায় কাতর মায়ের ভালবাসা, ঐগুলি বন্য সন্তানকে পোষ মানাবার দুর্নিবার চেষ্টা- ভাবনাটা এমন করে আমার মনে এলো- যে আমার মনে হলো ভাবনাটা যেন আমায় মারলো, আমার মুখ থেকে অস্ফুট গোঙানির শব্দ বেরিয়ে এলো।

কত সোনালি বিকেলবেলা- আহা আমরা বসে ক্যারম খেলছি, আম্মা বেলাবেলি গোসল সেরে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে এসে কেবল বসেছেন আমাদের পাশে, চুলে লতানো ভিজে গামছা।

-পড়াশোনা তো টঙে উঠছে তোমার।” আম্মা গজগজ করবে, আর আমি নাচুনেমনি পাখির মতো ঘুর্ণিপাক দিয়ে গেয়ে উঠবো- আম্মা ডালপুরি!” খেয়ালই নাই যে আম্মা সবে রান্নাঘরের কাজ এবেলার মতো শেষ করতে পেরেছেন।

স্কুলগেটের কদবেল-মাখার সামনে থেকে গাল টানতে টানতে ফিরিয়ে আনছেন আম্মা- সামনে বৃত্তিপরীক্ষা, এইসব খেয়ে পেট নষ্ট কর্‌ আর কি!”

এতসব ভালবাসার ফুলঝুরির ভেতর আমি তৃষ্ণার্ত হয়ে ঘুরতাম কেন? আমিই তো বারেবারে তাকে ব্যর্থ করেছি। আমি একবারও কি ভেবেছি- তাঁর সবচেয়ে মেধাবী মেয়েটা যখন বাড়ি ছেড়ে পালালো, তখন তাঁর কেমন লেগেছে? আমি তো শুধু ছিলাম নিজেকে কেন্দ্র করে পরিক্রমণরত। আমার গায়ে তো ততক্ষণ আগুনের হলকা লাগেনাই যতক্ষণ না…

আম্মার শাড়িগুলি ভাঁজ করি। যেন পুরানো দিনের গন্ধ নিই। কদমফুল বেনারসী- তার জরিগুলি পিঁজে গেছে। কয়েকটা মাড়-চটকানো সুতি-জামদানি (সম্ভবতঃ দাদীজানের পরিত্যক্ত শাড়ি) আর আটপৌরে প্রিন্টের শাড়ি। রূচিহীন জর্জেট। সস্তা ব্লাউজগুলি যত্ন করে দর্জিদোকানের লেস কি সরুপাড় জরি বসানো। একটা লম্বা লম্বা কলকা দেয়া কালো শাল। আব্বা আনিয়ে দিয়েছিলেন, আব্বার এক সহকর্মী সিমলা গিয়েছিলেন তখন।

আম্মা কি সুন্দরী ছিলেন? জানিনা। নিজের বুড়ো-আঙুল চোখের কাছে নিয়ে এলে যেমন আউট-অফ-ফোকাস হয়ে যায়, ব্যাপারটা তেমনি ঝাপসা। অত কাছের লোকের সৌন্দর্যবিচার করা যায়না। যায়না নাকি? তাহলে পলাশ কি করে আঙুল দিয়ে আমার গায়ে কিসব আঁকতে আঁকতে বলতো- রেবেকা, শিরীনকে দেখতে রানীর মতন, সাম্রাজ্য জ্বালানো রানীর মতন।” আহা, আমি তাকে বিয়ে করেছিলাম, প্রণয়ের সর্বোচ্চ সিলমোহর!কেন আমাকে অন্তর্বাস পরা অবস্থায় ঘরের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে রাখতো। কেন প্রতিরাত্রে লিপস্টিক মাখতে বলতো, পারফিউম মাখতে বলতো- তারপর ঘুমিয়ে যেত? বারবনিতার মতো বোধ করতাম আমি। একদিন আমরা বিছানায়- বাইরের রাস্তায় কারা যেন হৈহৈ করে দৌড়ে গেল চোর-চোর-চোর! পলাশ ‘যাহ শালা!’ বলে আমার শরীরের ওপর থেকে পড়ে গেল। আর হলোনা। দাঁতে দাঁত পিষলো সে- ব্যাটাছেলের কনসেন্ট্রেশন ধরে রাখবার মুরোদ যদি ছটাকখানেকও তোমার থাকতো!” আমার চোখ ভর্তি অপমান আর শরীরময় আগুন ‘মুরোদ’ শব্দটাই কুড়িয়ে-ধার মুড়ে-গোল পিন্ডাকার করে ওর সামনে পরিবেশন করলো। নিঃশব্দে।নিজের ওপরই যেন ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে ঠাস করে একটা চড় মারলো পলাশ।

আচ্ছা হরিণ মা যেমন নিজের ছোট্ট-রুমালি লেজে হরিণশিশুর বিপদের আভাস পায়- আমার আম্মা কি চরাচরব্যাপী ছড়িয়ে পড়া ঐ চড়ের শব্দ পেয়েছিলেন সেরাতে?পেয়েছিলে আম্মা? তাই কি অত রাগে আর আমার সঙ্গে কথাই বল্লেনা এজীবনে?

বাহ রে, অন্যায়ও আমার প্রতি, শাস্তিপ্রাপ্তাও কিনা আমি!

 

বহ্নি সুলতানা

আম্মা মারা যাবার খবর পেয়ে বাংলাদেশে এলাম। বড়ভাবী আর রওনক আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেক কান্নাকাটি করলো। আমি কবরের পাশে একটা টগর গাছ লাগালাম। সারা বিকাল মিলাদের পর বিলি করবার নিমকি-রসগোল্লা প্যাকেট করলাম বাঁশকাগজের ঠোঙায়।

আস্তে আস্তে ভিড় কাটতে লাগলো। আমি অবাক হয়ে দেখলাম রেবেকা পুরো ব্যাপারটাতেই ঝিম মেরে রইলো। এমনকি রেবেকা কার কাছে থাকবে এই প্রশ্ন উঠবামাত্র বড়ভাবী যখন হাত নেড়ে ওর সামনেই বললেন- রেবুরে আমি রাখতে পারবোনা। কবে কার সাথে আবার ভাইগা যাবে নয়তো বিষ খাবে- এই ঝঞ্ঝাট আমি পোহাতে পারবোনা। ছেলেমেয়ের সংসার আমার।” তখনো সে সাড়া দিলনা। চুপচাপ মাথা এলিয়ে চোখ বুঁজে ঘরের এককোণে বসে রইলো। রওনকও চুপচাপ, একটা জলকাচা সুতি জামদানি পরেছে সে, নাকের ছোট্ট পাথর আর ঘামতেলের সরু রেখা ঝিলঝিল করছে। চিনতে পারলাম- মায়ের শাড়ি।

আমি  ঠিক বুঝে পেলামনা এইসব শিখন্ডী ভাইদের কি করে আমরা আশৈশব ভালবেসেছি। আপ্রাণ।ছেঁড়া ছেঁড়া গল্প মনে পড়ে আমার। আমাদের বেঁটে বেঁটে কলোনীর বাড়ি- চৈত্রের বাতাসে পতপত করছে কলাঝাড়ের পাতা। আম্মা লজ্জাবশত অন্তর্বাস শুকাতে দিতেন সায়া কিংবা শেমিজের তলায় ঢেকে। যেন ওটা ভেজা কাপড় নয়- জনসমক্ষে বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে প্রায় দৃশ্যমান স্তন। আমাকেও আম্মা তাই শিখিয়েছিলেন। স্যাঁতানো গন্ধভরা ব্রা রেবেকা খুব ঘেন্না করতো। ওর থার্টি-ফোর-বী ব্রা বাতাসে হিল্লোল তুলে দুলতো। মুচকি হেসে কলোনীর ডিগডিগে ভাবীরা আম্মাকে বলতো- রেবুর শরীরের খুব বাড়, না খালাম্মা?” আড়ালে ঠাসঠাস মার খেত সে। তারপর আবার সব ভুলে সে হিহি করতো বারান্দায়।…বড়ভাবী ও আল্লা কি করেছে জানো, ‘আকাশ এত মেঘলা’তে একজায়গায় আছে ‘দুবাহু বাড়াতে’ সেইখানে গেয়েছে ‘গুবাগুবা রাতে’…”-আমরা সবাই হাসতাম, সত্যিই আমাদের মাথায় গেঁথে গেল- ‘মেঘের ছায়াতে/চেয়েছি হারাতে/গুবাগুবা রাতে/তোমারি সাথে…’

আমি প্রায় অব্যক্ত গলায় বললাম- তাহলে রেবেকা যাবে কৈ? এইশহরে ওর কে আছে?”

-বোনের জন্য অত মায়া থাকলে বিলাত নিয়া যাও। লিখাও। পড়াও। বিয়া দাও।”

-আমি তো চাইলেই এখনি রেবুকে নিতে পারবোনা। সময় লাগবে। কাগজপত্র ঠিক করতে লাগবে। ততদিন ও কার কাছে থাকবে?”

ঘরের নৈঃশব্দ্যটা আমার কাছে অসহ্য লাগছিল, বড়ভাবীর কথা না রওনকের কথা-না-বলা কোনটা যে আমাকে বেশী কষ্ট দিচ্ছিল আমি বলতে পারবোনা। রেবেকা উঠে গেল ঘর ছেড়ে। গটগট করেনা,  আয়েশ করে, ধীরেসুস্থে। আমি ঢোঁক গিললাম। চোখের পানি আটকানোর জন্যে ঠোঁট কামড়ালাম ।তারপর আস্তে আস্তে বললাম- যার কাছেই থাকুক, ওর সমস্ত খরচ আমি পাঠাবো।” ঘরের ভেতর জমাট বেঁধে থাকা দই এর মতো নিঃস্তব্ধতা দুলে উঠলো। রওনক শাড়ির খুঁটে নাকের ঘাম মুছতে মুছতে বললো- তুমি আমাদের ভুল বুইঝোনা বু। আমরা কত কষ্ট করে চলি তা তো তুমি জানোনা। চাকরি, চাকরির পরে টিউশানি।তারপরও ঘরের চারকোণ মিলাইতে পারিনা।”

বাহঃ, কি সুন্দর এক্সপ্রেশান, ঘরের চারকোণ মিলাতে পারিনা। আমি আমার শিরদাঁড়ায় সরু বাতাসের স্রোত অনুভব করলাম। আমার রূপার কাজললতার মতো চোখ, আমার কপাল, আমার ঈষৎ ভাঙা গাল জুড়ে আমি উত্তাপ টের পেলাম, আমার চোখেমুখে পরম পরাক্রমশালী দাদীজান ফিরে আসছে। আমি রওনকের দিকে তাকিয়ে সোজা হয়ে বসে বললাম- রেবেকা আপাততঃ এইবাসায় আম্মার ঘরেই থাকবে। ওর খরচ এবং তোমাদের বাসাভাড়া পুরোটাই আমি দিব, যতদিন না সে আমার কাছে চলে আসছে।” রওনক টাকার কথা শুনে বাদলাদিনের মুড়ি হয়ে গেল- মিয়ানো আর স্যাঁতস্যাঁতে। বড়ভাবী বলতে চেষ্টা করলেন- রেবুর ভার্সিটি তো আমার বাসার কাছে ছিল।” আমি তাঁর দিকে তাকালামনা পর্যন্ত। আমার দাদীজান হলেও তাই করতেন, ‘এঁড়েগেঁড়ে’ লোকের দিকে তাকানো মানেও দৃষ্টির অপচয়।

উঠে এলাম। বারান্দায় পুরনো গোলাপফুলের টবে রেবেকা পানি দিচ্ছিল। অপাঙ্গে তাকিয়ে বললো- তুমি কি করে ভাবলে আমি তোমার সঙ্গে যাব? আমাকে তো কৈ জিজ্ঞেস করোনি। বোধহয় প্রয়োজন মনে হয়নি তোমার, তাইনা?”

রেবেকা দাদীজানকে ভয় পেতনা। অতএব আমাকেও ভয় পেলনা। তাতে কি?আমি বারান্দার কাপড় মেলবার তারে হাত রেখে শরীরটা ঝুলিয়ে দিলাম। একটু সময় নিয়ে বললাম- এটা ছাড়া তোমার অন্য যাকিছু অপ্‌শন্‌ আছে সেগুলি কি সম্মানজনক? যদি তা না হয়, তাহলে কিছুসময়ের জন্য এই ব্যবস্থা মেনে নিতে তোমার আপত্তি আছে কি? এই যে জিজ্ঞেস করলাম! এখনি জবাব দিতে হবে এমন কোনো তাড়া নেই। তুমি চিন্তা করে জবাব দিও।”

-বোনজামাইয়ের পয়সায় লালিতপালিত হওয়া খুব সম্মানজনক!”

-রেবেকা, ইউসুফ এসবের কিছু জানেনা, জানলেও তাতে সে আপত্তি করবেনা। আমার নিজের সঞ্চয় আছে। আমার দেনমোহরের টাকা আছে। আমি নিজে চাকরিতে ঢুকতে যাচ্ছি এমাসে। তুমি তোমার বোনের টাকা নিতে আপত্তি করবেনা নিশ্চয়ই।” ‘বোন’ শব্দটাই কতদিন পরে উচ্চারণ করলাম জানিনা।

-তোমার খুব আত্মপ্রসাদ লাগছে না শিরীন সুলতানা?কেমন দাদীজানের মতো টাকার দাপটে ছড়ি ঘোরাচ্ছো আর সবাই মিউমিউ করছে?” খুব পলকা হাতে রেবেকা আমার গায়ে সুঁই বিঁধিয়ে দেয়, অ্যাম্পুল ভর্তি বিষ।

আমি নিজেকে সংযত করি।

-রেবেকা, তুমি কখনো নিজেকে মায়া করোনি। নিজেকে সুযোগ দাওনি। জানতেও চাওনি তোমার ভেতর কতটা সম্ভাবনা। একবার নিজেকে বাড়বার সুযোগ দাও। আর তোমার অসহ্য লাগলে তখন অধমর্ণ হয়ে থেকনা। শোধবোধ করে দিও।”

রেবেকা চুপ করে গেল।ওর ভেতর চিরকৈশোর স্থির হয়ে আছে। না স্থির হয়ে নেই, ‘অধমর্ণ’ শব্দটাকে নেড়েচেড়ে দেখছে।

 

কিন্তু সবার চাইতে ভালো/ পাউরুটি আর ঝোলাগুড়

অল্পবয়েসে প্রচুর ফিকশন পড়ে আর পরবর্তীতে নৌফেলের কল্যানে প্রচুর সিনেমা দেখে আমার মন তৈরী হয়েছিল অন্যভাবে। প্রেম-গৃহত্যাগ-বিয়ে-বিবাহবিচ্ছে-পরকীয়া এইসবই আমি দেখতাম আর আমার মনে হতো এমন তো বইয়ের দুনিয়ায় আকছার ঘটছে, অনায়াসে ঘটছে, তো কি হয়েছে? আমার নিজের কৈশোরের সেই বাড়ি-থেকে-পালিয়ে বিয়ে নিয়েও হয়তো অবচেতনে আমার মনে হতো- এইসব তো বইয়ের দুনিয়ায় অবিরাম ঘটে! মানুষ তার শৈশবে-কৈশোরে কত না ভয়ানক দুর্ঘটনা নিয়ে বেড়ে উঠে ঠিকই পৌঁছে যাচ্ছে প্রিয়তম মানুষের কাছে। সামাজিক মন ভয়-অস্বস্তি-সংকোচে জবুথবু হলেও অন্তরালের আমি ভাবতাম- তো কি হয়েছে?

আম্মা মারা যাবার পরে যখন ভাবীরা কেউ আমাকে সঙ্গে রাখতে রাজি হচ্ছিলনা, তখন ঘটাং করে আমার মনে হলো পুরো ব্যাপারটা এত সহজ না- আমার অতীত আমার পিছু ছাড়বেনা! জন্মদাগ যেমন মৃত্যু পর্যন্ত, যুধিষ্ঠিরের কুকুর যেমন স্বর্গ পর্যন্ত।

বহ্নি সুলতানা অনেক বদলে গেছে। ওর চারিত্র ছিল এঁটেল মাটির মতো, এখন মনে হচ্ছে ও বেলে-দোআঁশ মাটি হয়ে গেছে। অর্থাৎ কিনা অল্প বয়েসের রেবেকা সুলতানা হয়ে গেছে। আচ্ছা, আমি কি বহ্নি সুলতানার মতো হয়ে যাচ্ছিনা দিনকে দিন?

যা বলছিলাম, অতীতকাল যেভাবে আমাদের দক্ষিণ-এশীয়দেরকে তরুন হায়েনার মতো নিস্ফলা তৃণভূমির ভেতর অনন্ত তাড়া করে বেড়ায়- এটা আমার কখনো পছন্দ হয়নি। আমি রেবেকা সুলতানা যে কিনা এক আত্মীয়সম্পর্কীত পুরুষের সাথে পালিয়ে গেছিলাম- এর চেয়ে অনেক প্রিয় পরিচয় আমার আছে। কিংবা বলা ভাল এর চেয়ে অনেক মৌলিক পরিচয় আমার আছে। কিন্তু বলে রাখা ভাল, এর চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিচয় আমার নেই, অন্ততঃ আমার এই ধনধান্যপুষ্প ভরা দেশে নেই। হবেওনা। অতএব বিদেশযাত্রার বিষয়ে আমার ভেতর একরকম উৎসাহই তৈরী হলো।

ভয়ও ছিল প্রবল। এই আমি চিনি আলোঝলমলে বায়তুল মোকাররম- ইস্টার্ণ প্লাজার চলন্ত সিঁড়ি- গাওসিয়ার একমাত্র অন্তর্বাসপরা এ.বি.সি. ব্রা এর বিজ্ঞাপন-ইউরোহাট আর বিগবাইট- নিউমার্কেটের কাটাকাপড়ের দোকান আর অতিগরবিনী বইয়ের দোকান ‘জিনাত’- নীলক্ষেতের কাঠের সংকীর্ণ বেঞ্চিতে বসে গরমাগরম সরিষার তেলে রাঁধা তেহারি। এইসব অসম্ভব চেনা চালচিত্রের বাইরে আমি কোত্থাও অভিনীত হইনি।

নৌফেলের বিছানায় শুয়ে শুয়ে পর্দার রিচার্ড বার্টনকে বিড়বিড় করে হুইটম্যানের I wish I could run away and live with animals বলতে দেখা আর টিউশনির টাকা পেলে বন্ধুরা মিলে ‘নীরব-হোটেল’ এর ভর্তা-ভাজি খেতে চলে যাওয়া- এইরকম হলো আমার অ্যাডভেঞ্চারের নমুনা। এই আমি বিদেশ যাব?আমার মনের অবস্থা রীতিমত ‘কোথা সে ছায়া সখী/ কোথা সে জল/কোথা সে বাঁধাঘাট/ অশথতল’। মনকে প্রবোধ দিই- ওখানে একএকটা পেঁয়াজ একটা শালগমের মতো বড়!ওখানে ঘাসের ভিতরই তিনরকমের ফুল- পয়সার মতো ডেইজী, হলদে চন্দ্রমল্লিকার মতো ড্যানডেলায়ন আর শনের নুটির মতন একরকম ফুল যার নাম জানিনা (যা যা এতদিন বহ্নি সুলতানার চিঠিতে পেয়েছি)।

আমি আর অনিন্দিতা একদিন বঙ্গবাজারে গিয়ে টুকিটাকি শীতের কাপড় কিনি। নিউমার্কেট থেকে একটা বড়সড় লাগেজ-ব্যাগ। আর এলিফ্যান্ট রোড থেকে নৌফেলের বিয়ের উপহার।

আন্তঃমহানগর মহাসড়কে বাসে চাপলে কি দারুন খুশীতে আমার বুকে চাপ চাপ ব্যথা হতো। আহা, জানালায় আদিগন্ত নাড়াপোড়া ফসলের মাঠ, টিঙটিঙে বেড়া, রক্তের ফোয়ারার মতো উদ্গত লালশাক। প্লেন টেক অফ্‌ করার পর আমার সেই ব্যথাটা হলোনা তো! কান বন্ধ হয়ে গেল। নিঃশ্বাস চেপে এলো। বমি পেল। আমি প্রাকৃত নারী, বদ্ধবাতাস উড়োজাহাজ আমার জন্যে নয়!

আমার মনে হতে লাগলো বিমানবন্দরের সারি সারি আলো জোনাকির মতো-স্বগতোক্তির মতো বিড়বিড় করছে একটা শূণ্য স্থানে। আমার মনে হতে লাগলো সুরজিত বিমানের গোলাকার জানালায় মুখ ঠেসে প্রায়ান্ধ চোখ ঠেসে প্রাণপনে আমাকে খুঁজছে। সুরজিত আর তার পাপ্পা মিলান। তার দেব সাহিত্য কুটীরের বইগুলি। পুরু কাঁচের আয়নায় আমি আঙুল রাখলাম।

হিথ্রোতে আমাকে নিতে এলো বহ্নি সুলতানাই। গাঢ় নীল জিন্স আর গভীর গলার শাদা লেসের টপ্‌ থেকে লাট্টুর মতো উদ্গত স্তনমন্ডলী। আমি তাকে চিনতেই পারছিলামনা।

রেডরুট ধরে গাড়ি চলছে। বহ্নি সুলতানার এলোমেলো চুলের রাশি পিছু হটিয়ে মস্ত একটা ঝুঁটি করা। গলায় একটা সরু চেইনে তিরতির করছে পাতলা ক্রুশচিহ্ন। আমার পথশ্রমে ক্লান্ত চোখে একরত্তি ঐ সোনাটুকু ঝলসাচ্ছিল। আমি চোখ মুদলাম। আমার মস্তিষ্ক সেকেন্ডের দশভাগের একভাগ সময় জুড়ে ধরে রাখলো একটা দৃশ্য- বহ্নি সুলতানা সামনে তাকিয়ে আছে, হাত স্টিয়ারিং হুইলে, ওর ঠোঁটের কোনায় মৃদু হাসি স্থির। দুপাশের জানালায় সাঁইসাঁই করে সরে যাচ্ছে অচেনা গাছপালা।

আমরা যতক্ষণে ফিরেছি, ততক্ষণে আমার ভগ্নিপতি ইউসুফ জহির বাড়ি ফিরেছে।কফির সুবাস আর দুর্বোধ্য অপেরার সুরের উপর ভাসছে কাঠের বাড়ি। লনে বড় বড় গোলাপি ছিটে দেয়া লিলি ফুল। কাঠের বেড়ার উপর একটা গোমরা বেড়াল বসে আছে।ইউসুফ ভান করলো সে বিশেষ অভিনিবেশ যোগে আমাকে লক্ষ্য করছে এই প্রথম।

দোতলায় যে ঘরে আমাকে থাকতে দেয়া হলো- সেঘরে খাটের পাশে রেডিয়েটর। বিছানায় কম্বলের নিচে একটা হট-ওয়াটার বটল। আমি শুয়ে পড়লাম, ঘুমে তলিয়ে যাবার আগে আমি মনে মনে ডায়েরি লিখলাম-

 

১।বিলেতি সরকার আগাছা ভালবাসে।

২।শর্টব্রেড বলে যে বিস্কুটটা খেলাম সেটা রীতিমত স্বর্গীয়।

৩।এই ঘরের কাঠের দেয়াল ছাপিয়ে স্ত্রী-পুরুষের সম্মিলিত শীৎকারধ্বনি শোনা যায়।

৪।কাল সকাল থেকে ধুমসে পড়াশোনা করতে হবে।

৫।লন্ডন শহর আমার জানালায় পাশাবতীর সাতবোন হয়ে ছড়া কাটছে-

‘যে জিনে সে মালা পায়,

হারিলে মোদের পেটে যায়!’

 

আম-জাম-কাঁঠাল-সুপারির চাপ চাপ নীলচে অন্ধকার, সজিনাগাছে পিড়িং পিড়িং করছে বাতাস আর দুইটা ভাতশালিক। পাশ ফিরতেই ঘোরের ভিতর বেদনার স্মৃতির মতো দ্রিম্‌ করে মনে পড়লো আমি তো বাংলাদেশে নাই। ঘুম পাতলা হয়ে আসবার পরে কি দ্রুতই না মানবমস্তিষ্ক বেদনাকে ফিরে পায়!

হাতঘড়িটা খুলে রেখেছিলাম বেডসাইড টেবিলে। সময় দেখলাম। তারিখও।আজকে নৌফেলের বিয়ে। আমার একটু কষ্ট হবার কথা কি? কষ্ট পাবার জন্যে মনের যে সুসংহতি প্রয়োজন তা হাতড়ে পাচ্ছিনা। কি সব মনে হচ্ছে- মনে হচ্ছে নৌফেলের বুকে-পেটে চঞ্চল আঙুল চালাতে চালাতে ওর স্ত্রী কি আবিষ্কার করবে ওর পেটের ভেতর ‘তোতাকাহিনী’র তোতার মতো শুকনো পুঁথি ‘গজগজ করিতে লাগিল’? অ্যালাবাস্টারের মতো মসৃণ পেট… তাতে নতুন চরের উদাস শরের মতো রোম…সাপের চলে যাওয়ার চিহ্নের মতো নীল শিরা-ধমনী… সে হেলেঞ্চার জলাশয়ে নাক ডুবিয়ে আমি অনেক জলহস্তীর মতো স্থাবর দুপুর কাটিয়েছি।

আচ্ছা, আমার কি খেয়েদেয়ে আর কোনো কাজ নাই, নৌফেলের উদর-সৌন্দর্য আলোচনা করে আমি একটা দিন শুরু করছি!

ইউসুফ গান বাজাচ্ছে ওর ঘরে। গলা বাড়িয়ে দিয়ে শুনলাম- গানের কথাগুলি এইরকম-

‘যদি আমি হই ছুতোর,

আর তুমি হও ভদ্দরনোকের মেয়ে,

করবে আমায় বিয়ে?

(নেবে কি আমার সন্তান?)’

-ইউসুফ এটা কার গান?”

ইউসুফ মুচকি হেসে জবাব দিল- জনী ক্যাশ।”

তারপর যোগ করলো- কেমন, চমৎকার না গলাটা?”

আমি মাথা নাড়লাম, ইউসুফের গলার আওয়াজও চমৎকার!চিনির আস্তর দেয়া ফুলকো বনরুটির মতো।

বহ্নি সুলতানা কাঠের পরিত্যক্ত বালতিতে কম্পোস্ট ঝুরো ঝুরো করে মাটি মিলিয়ে হার্ব লাগাচ্ছিল।ধুমসো বেড়ালটা আমাকে শুঁকে গেল।আমি অবাক বিস্ময়ে দেখলাম বহ্নি সুলতানাকে এই ছোট্ট বাগানে কী ভীষণ মানিয়ে গেছে। ঠিক যেভাবে তাকে আমাদের ঝুলকালিময় রান্নাঘরে মানাতো। যেমন অবলীলায় সে কচুরি ভাজতো, তেমনি করেই সে খরগোশের খাঁচা সাফ করছে-ঘাস নিড়াচ্ছে। তাকে একটুও বেমানান লাগছেনা।

কুমারখালির সুতি তোয়ালেতে ভেজা মাথা মুছতে মুছতে ইউসুফের ঘরে উঁকি দিই।ওয়াটারহাউজের ‘লেডি অফ শ্যালট্‌’ এর বিশাল একটা প্রিন্ট অন্ধকার দেয়ালে ঝলসে উঠলো। প্রিয়মানুষের ভালবাসা জোটেনি বলে বিষন্ন যুবতী জলের ধারে ভাসিয়েছে নৌকা- মোমদানির নিভন্ত মোম জানান দিচ্ছে তার আয়ূ আর বেশী বাকী নেই! অতুল বিষন্ন ছবি।(পরে আমার মনে হয়েছে দেয়ালে ঐ ছবিটা দেখা আমার ভাগ্যলেখা ছিল কি? দেখাবিন্তি?)

ইউসুফের ঘরটা কি সুন্দর! পরে শুনেছি দেয়ালের এই রঙটাকে বলে –Duck-egg Blue।

-তুমি প্রি-র‌্যাফায়ালাইটদের ছবি আর দেখেছো?”

দেখেছি, গম্ব্রিজের ‘স্টোরি অফ আর্ট’ আমাদের পাঠ্য ছিল।

-গ্যাব্রিয়েল রসেটি? ঐ যে হাঁসের মতো লম্বা গলার মেয়েরা? টেইট্‌ ব্রিটেইনে প্রি-র‌্যাফায়ালাইটদের অনেক ছবি্র সংগ্রহ আছে। তুমি একদিন যেয়ে দেখে এসো।”

যেয়ে দেখে এসো! পরে অবশ্য ইউসুফই নিয়ে গেছিল আমাকে। টেম্‌সের পাড়ে সারি সারি সরলগাছ।তাদের কদমফুলের মতো ফল, সুঁচ এ ভরা। ইউসুফ এর চোখে সুঁচ বিঁধেছিল। সরিয়ে দিয়েছিলাম। কাঁকন দিয়া কিনলাম দাসী/ দাসী হৈল রানী, রানী হৈলাম দাসী…অনেক হেঁটেছিলাম আমরা। রঁদ্যার তৈরী ক্যালে উপকূলের সেই বৃদ্ধদের মূর্তির সামনে এসে হাঁপিয়ে উঠে বলেছিলাম- আর না।” উজ্জ্বল নীল আকাশ-মিহিদানা রঙ রোদ-চোরা শীতের বাতাস- তিনশোবছর আগের রাস্তায় পাতা ওড়া নির্জনতা-সাইপ্রাসের নাচবার শব্দ- আমার মনে হলো এতোদিন ‘প্রেম-সমুদ্রের তীরে নুড়ি কুড়াইয়াছি মাত্র!’

এইবার সন্তর্পণ ইঁদুর এসে উলটে গেছে পাশার দান।

এইবার আলতো ধাক্কায় কেউ উলটে ফেলেছে নিভু নিভু মোমবাতি- গলগল করে মোম ঝরছে।

 

বহ্নি সুলতানা

সকালবেলা ইসাই আমাকে জাগিয়ে তুললো- শিরীন, প্যাট এসেছে লন্ডনে। হল্যান্ড-পার্কের কাছে একটা হোটেলে উঠেছে। আমি দেখা করতে যাচ্ছি।”

স্টেটমেন্ট। ফুলস্টপ দিয়ে যে সব সেন্টেন্স শেষ হয়। এখানে কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করছেনা।আমি খাটে স্তূপাকার কম্বলের উপর বসে রইলাম।ভোম্বল হয়ে। বাইরে মেঘলা দিন। ঝিরঝির বৃষ্টি।প্যাচপ্যাচে কাদা।পাতাঝরা ন্যাড়া গাছ। আমি কি জানতাম না এই দিন আসছে? জানতাম, শুধু ভেবেছিলাম- কি জানি কি ভেবেছিলাম।

রেবেকা ওর ঘর থেকে মুখ বাড়িয়ে খুব উৎসাহ নিয়ে কি যেন জিজ্ঞেস করলো- ইউসুফ উত্তর দিলনা। দুদ্দাড় করে নেমে গেল।

রেবেকার ঘরে গান বাজছে- এই বালুকাবেলায় আমি লিখেছিনু…একটি সে নাম আমি লিখেছিনু…’

“যাকে বলে desire, বাংলায় যা কামনা, সেটা পিলপিল করে পোকার মতো তোমার সারাগায়ে হেঁটে বেড়ায়।” রেবেকা লিখেছিল তার ডায়েরিতে। আসলেই বেড়ায় কিন্তু! পোকাগুলির কাঁচপোকার মতো নীল ডানা, আমার গায়ে পিলপিল করে ঘুরতে থাকে- যখন ইউসুফ মগ্ন হয়ে কাজ করে, কিংবা আদুল গায়ে রোদ মাখে সারাবেলা। গোলাপি আতর-মোমবাতির আলো-নীলচে দেয়ালের ঘরে শরীরের খেলা শেষে ইউসুফ অনেকক্ষণ আমাকে জড়িয়ে থেকে ওম্‌ এর সুরে ফিসফিস করে কথা বলে। আর আমার গায়ে পোকারা পিলপিল করে।সকালে আবার একটা ভয়ে কাঁচপোকা-শামাপোকা-ঘুরঘুরে পোকা সব মরে উলটে পড়ে থাকে আমার চারপাশে।আমি মৃত পোকামাকড় ঝাড়ু দিতে থাকি।

আমি শিরীন সুলতানা এইসব নিয়ে ভাববো- কখনো মনেই আসেনাই আমার। আমি তো মুরগী ছিলবো আর গাজর কাটবো! আমি বড়জোর জমানো টাকা গুনে রাখবো স্টীলের আলমারিতে, সুতির মশারি না টাঙিয়ে সেক্স করবোনা…

ওয়াক-ইন ক্লজেটের ভেতরে নির্জনতার দ্বীপে বসে থাকি। সারি সারি কাপড়। ভিতরে মানুষ নাই। স্ট্রেচ-লাইক্রা-অর্গ্যানিক কটন-খাকি-শোয়েড-লিনেন…নানান মুডের বাহক ভাঁজ ভাঁজ পড়ে আছে। বাইরে রেবেকা পাউরুটি টোস্টারে গুঁজে কিচেনের দরজা খুলে নেমে গেছে বাগানে- ঘাসের চপ্পল পরা পায়ে- রানার বীন্‌, ব্রড বীন্‌, বাঁধাকপি, বেগুনি ব্রকলী আমার প্রবাসের আত্মীয়রা… বিন্‌ এ ফেলে দিয়েছি ইউরিন টেস্টার, পজিটিভ এসেছে আমার…আমার খরগোশদের কানগুলি ঝোলা…তাদের খাবার দেবার কথা রেবেকাকে বলা হলোনা…আমার চোখের সামনে অজস্র কাপড় শরীরহীন অবয়বের মতো হেঁটে বেড়াতে লাগলো…ক্লজেটের ভিতরে সারাদিন বসে রইলাম। অন্তহীন টানেলের অপেক্ষায়। সুড়ঙ্গপথ ফুরাবে, বরফের দেশে? তার নাম নার্নিয়া?

আমি কার জন্যে অপেক্ষা করছি?কোন অসম্ভবের জন্যে? মলিনা কাকিমা এসে এঁটোহাতের উল্টোপিঠ দিয়ে টোকা দিয়ে ডাকবে- মা লক্ষ্ণী আমার, তোমার কাকাবাবু ভাতের পাত নিয়া বস্যা আছে, তোমার সাথে খাইবো বইলা…

আমি কি ভাবছি রেবেকা এসে ডাকবে- শিরীন আপা, বাইরে আসো। চলো কফি খাই দু’জনে।” আমি কি অপেক্ষা করছি রেবেকা তার নরমহাত আমার পিঠে রাখবে আর বলবে- আপা, আমাকে সবাই এত বোকা ভাবে কেন, কেন ভাবে আমি কিছুই বুঝিনা, কিছুই আঁচ করতে পারিনা? তুমিও কেন আমাকে এত বোকা ভাবো?”

দিন ফুরালো হয়তো, কাকলী শোনা গেল। তারপর রাত। আমি অপেক্ষা করছি- ইউসুফ এসে অন্যমনস্ক হাত ঘষতে ঘষতে বলবে- শিরীন আমি ভুল করেছি, তোমাকে বলেছিলাম আমি নতুন করে সব শুরু করবো। আমি ভুলে যাচ্ছিলাম সেই প্রতিজ্ঞার কথা!”

বাইরে এখন রাত না দিন? আমি জানিনা। কেউ আসেনি আমাকে খুঁজতে।

 

২০০৩-২০০৪, ২০০৯

নর্থ লন্ডন, ইউ কে

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. Your comment …একটি অসাধারণ উপন্যাস! একটানা পড়ে শেষ করতে এতটুকুও ক্লান্তি বোধ হল না। ঝরঝরে গদ্যে জীবনের গল্প ফুটে উঠেছে। কথাসাহিত্যিকের জন্য অফুরন্ত শুভ কামনা। অশেষ ধন্যবাদ তীরন্দাজকে এমন একটি উপন্যাস প্রকাশের জন্য।

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close