Home ভাষণ সত্যজিৎ রায় > শহিদ দিবস >> ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণ

সত্যজিৎ রায় > শহিদ দিবস >> ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণ

প্রকাশঃ May 2, 2018

সত্যজিৎ রায় > শহিদ দিবস >> ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণ
0
0

সত্যজিৎ রায় > শহিদ দিবস >> ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণ

 

[সম্পাদকীয় নোট : এটি একটি দুর্লভ ভাষণ। এই ভাষণটি সত্যজিৎ রায় দিয়েছিলেন ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পল্টনে ছাত্রলীগ আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। সেখানে তাঁকে সংবর্ধনাও দেওয়া হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম উদ্‌যাপিত একুশের ফেব্রুয়ারির ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠীর তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তবিবুল ইসলাম বাবু ভাষণটি রেকর্ড করেন, যা ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত অপ্রকাশিত ছিল। ১৯৮৬ সালের ৮ এপ্রিল এই ভাষণটি প্রথম প্রকাশ করে সাপ্তাহিক ‘সচিত্র সন্ধানী’। সঙ্গে ছিল ওই অনুষ্ঠানে ভাষণ দানরত সত্যজিতের ছবি। পরে তাঁর এই ভাষণটি সত্যজিৎ রায়ের ‘ছবি ও কথা’ (২০১০) ও ‘সত্যজিৎ রায় প্রবন্ধ সংগ্রহ’(২০১৫)-এ পুনঃমুদ্রিত হয়। এই লেখার কভারে ‘সচিত্র সন্ধানী’তে প্রকাশিত পল্টনের অনুষ্ঠানে ভাষণ দানরত সত্যজিতের ছবিটি সংযুক্ত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে পত্রিকাটি পাঠকদের জন্য যে তথ্য সংযুক্ত করেছিল, সেটিও কভারে যুক্ত করা হলো। বাংলাদেশ ও ভাষা-আন্দোলন সম্পর্কে সত্যজিৎ রায়ের একান্ত ভাবনা ও অনুভূতির কথা এই ভাষণটিতে রয়েছে বলে এটি তাঁর জন্মদিনে (২ মে) তীরন্দাজে পুনঃপ্রকাশ করা হলো।]

 

“গত বিশ বছরে অনেক জায়গায় অনেক দেশে অনেকবার নানাভাবে সম্মানিত হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কিন্তু আমি জোর গলায় আজকে এখানে দাঁড়িয়ে এই শহিদ দিবসের পুণ্য তিথিতে আমি বলতে পারি যে, আজকের যে সম্মান সে সম্মানের কাছে আগের সমস্ত সম্মান হার মেনে যায়। এর চেয়ে বড় সম্মান আমি কখনও পাইনি আর আমার মনে হয় না, আমি আর কখনও পাব। জয় বাংলা।”

বহুদিন থেকে শহিদ দিবসের কথা শুনে আসছি। একুশে ফেব্রুয়ারির কথা শুনে আসছি। কিন্তু এখানে এসে নিজের চোখে না দেখলে আমি বিশ্বাস করতে পারতাম না আপনারা বাংলা ভাষাকে কতখানি ভালবাসেন। বাংলাভাষা যখন বিপন্ন তাকে বাঁচানাের জন্য যে সংগ্রাম হয়েছিল, তাতে যাঁরা আত্মােৎসর্গ করেছেন তাঁদের যে কতখানি শ্রদ্ধা করেন আপনারা তাদের স্মৃতিকে, সেটা আমি আজকে এখানে এসে বুঝতে পারছি।

আমরা যারা পশ্চিমবঙ্গে থাকি, আমরাও বাংলা ভাষাকে ভালবাসি৷ এটা ঠিক যে, পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির মধ্যে আরও পাঁচ রকম সংস্কৃতির প্রভাব এসে পড়ে সেটাকে একটা পাঁচমিশালি ভাব এনে দিয়েছে। ইংরেজির প্রভাব আমরা এখনও পশ্চিমবঙ্গে সম্পূর্ণ কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তার একটা কারণ এই বােধহয় যে, পশ্চিমবঙ্গ হল ভারতবর্ষের একটা প্রাদেশিক অংশমাত্র। কিন্তু তাই বলে এই নয় যে, আমরা বাংলা ভাষাকে ভালবাসি না। বাংলা সাহিত্য, বাংলা গান, বাংলা চলচ্চিত্র, বাংলা থিয়েটার এসবই পশ্চিমবঙ্গে এখনও বেঁচে আছে, টিকে আছে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র এঁদের আমরা এখনও ভালবাসি।।

বহুবার বহু জায়গা থেকে অনুরােধ এসেছে যে, আমি বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা পরিত্যাগ করে অন্য দেশে, অন্য ভাষায় চিত্র রচনা করি। কিন্তু আমি সেই অনুরােধ বারবার প্রত্যাখ্যান করেছি। কারণ আমি জানি যে, আমার রক্তে যে ভাষা বইছে, সে ভাষা হল বাংলা ভাষা, আমি জানি যে সেই ভাষাকে বাদ দিয়ে অন্য ভাষায় কিছু করতে গেলে আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাবে, আমি কুলকিনারা পাব , শিল্পী হিসেবে আমি মনের জোর হারাব।

আমি ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি যে আমি আজ বিশ বছর ধরে বাংলা ছবি করছি। এর মধ্যে বহুবার বহু জায়গা থেকে অনুরােধ এসেছে যে, আমি বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা পরিত্যাগ করে অন্য দেশে, অন্য ভাষায় চিত্র রচনা করি। কিন্তু আমি সেই অনুরােধ বারবার প্রত্যাখ্যান করেছি। কারণ আমি জানি যে, আমার রক্তে যে ভাষা বইছে, সে ভাষা হল বাংলা ভাষা, আমি জানি যে সেই ভাষাকে বাদ দিয়ে অন্য ভাষায় কিছু করতে গেলে আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাবে, আমি কুলকিনারা পাব , শিল্পী হিসেবে আমি মনের জোর হারাব।

আমি ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি যে, পূর্ববঙ্গ নাকি আমার দেশ। আমার ঠাকুরদাদা উপেন্দ্রকিশাের রায়ের নাম হয়তাে আপনারা কেউ কেউ শুনেছেন। আমার তাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি; কিন্তু শিশুকাল থেকে আমি তাঁর রচিত ছেলেভুলানাে পূর্ববঙ্গের কাহিনি টুনটুনির বই পড়ে এসেছি, ভালবেসে এসেছি। তাঁর রচিত গানে আমি পূর্ববঙ্গের লােকসংগীতের আমেজ পেয়েছি। যদিও আমি এ দেশে আসিনি, আমার দেশে আমি কখনও আসিনি বা স্থায়ীভাবে আসিনি। এসব গান, এসব রূপকথা শুনলে আমার মনে হত যে, এ দেশের সঙ্গে আমার নাড়ির যােগ রয়েছে। যখন আমার পাঁচ কি ছয় বছর বয়স, তখন আমি একবার ঢাকা শহরে এসেছিলাম। দুই-তিন দিন মাত্র ছিলাম। আমার মামার বাড়ি ছিল ওয়ারিতে,  র‌্যাংকিন স্ট্রিটে। সে বাড়ি এখন আছে কি না জানি না। সে রাস্তা এখন আছে কি না জানি না। বাড়ির কথা কিছু মনে নেই। মনে আছে শুধু যে প্রচণ্ড বাঁদরের উপদ্রব। বাঁদর এখনও আছে কি না তাও আমি জানি না। তারপর মনে আছে পদ্মায় স্টিমারে আসছি। ভােরবেলায় ঘুম ভেঙে গেছে, মা আমাকে বাইরে ডেকে এনে দেখাচ্ছেন যে, পদ্মার ওপর সূর্যোদয় হয়েছে। আর দেখাচ্ছেন যে, পদ্মা ও মেঘনার জল যেখানে এসে মিশেছে সেখানে এক নদীর জলের রঙের কত তফাত। সেই থেকে বারবার মনে হয়েছে যে একবার নিজের দেশটা দেখে আসতে পারলে ভাল হত; কিন্তু সে আশা, বিশেষত দেশবিভাগের পর ক্রমেই দুরাশায় পরিণত হতে চলেছিল। হঠাৎ কিছুদিন আগে ইতিহাসের চাকা ঘুরে গেল, আমার কাছে আমার দেশের দরজা খুলে গেল এবং আজ শহিদ দিবসে এসে, আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে, ঢাকা শহরে এসে আমার স্বপ্ন অন্তত কিছুটা অংশে সফল হল। এবার আমি অনেক জরুরি কাজ রেখে চলে এসেছি। এবার আর বেশি দিন থাকা সম্ভব হচ্ছে না; কিন্তু আমার ইচ্ছা আছে, আমার আশা আছে যে অদূর ভবিষ্যতে আমি আবার এ দেশে ফিরে আসব। এ দেশটাকে ভাল করে দেখব। এ দেশের মানুষের সঙ্গে এমনভাবে জনসভায় নয়, সামনাসামনি, মুখােমুখি বসে কথা বলে তাদের সঙ্গে পরিচয় করব। এ আশা আমার আছে। আমি আর বিশেষ কিছু বলতে চাই না। সংগীতের অনুষ্ঠান রয়েছে, আপনারা যে আমার কাজের সঙ্গে পরিচিত বা আমার কাজ সম্পর্কে যে আপনাদের কৌতুহল আছে, সে খবর আমি এর আগেই পেয়েছি। কয়েক বছর আগে যখন ‘মহানগর’ ছবি এখানে দেখানাে হয়েছিল, তাতে এখানকার জনসাধারণ কী ধরনের আগ্রহ, কৌতুহল প্রকাশ করেছিলেন এবং তার ফলে কী ঘটনার উদ্ভব হয়েছিল, সে খবর আমার কানে যখন প্রথম পৌঁছায়, আমি সেকথা বিশ্বাস করিনি কিন্তু তারপর এখান থেকে বহু পরিচিত-অপরিচিত ব্যক্তি, বন্ধু আমাকে চিঠি লিখে খবরের কাগজের খবর কেটে পাঠিয়েছিলেন। ছবি কেটে পাঠিয়ে আমাকে জানিয়েছিলেন সে ঘটনার কথা। তখন বিশ্বাস হয়েছিল এবং বিস্ময়ে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি ভাবতে পারিনি যে এটা হতে পারে। একজন শিল্পী হিসেবে এর চেয়ে বড় সম্মান, এর থেকে গর্বের বিষয় আর কিছুই হতে পারে না।

গত বিশ বছরে অনেক জায়গায় অনেক দেশে অনেকবার নানাভাবে সম্মানিত হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কিন্তু আমি জোর গলায় আজকে এখানে দাঁড়িয়ে এই শহিদ দিবসের পুণ্য তিথিতে আমি বলতে পারি যে, আজকের যে সম্মান সে সম্মানের কাছে আগের সমস্ত সম্মান হার মেনে যায়। এর চেয়ে বড় সম্মান আমি কখনও পাইনি আর আমার মনে হয় না, আমি আর কখনও পাব। জয় বাংলা।

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close