Home কবিতা সন্তু দাস > কবিতাগুচ্ছ ও সেলিম মণ্ডলের সঙ্গে কথোপকথন >> কবিতা কল্পনালতা সিরিজ ১

সন্তু দাস > কবিতাগুচ্ছ ও সেলিম মণ্ডলের সঙ্গে কথোপকথন >> কবিতা কল্পনালতা সিরিজ ১

প্রকাশঃ July 15, 2018

সন্তু দাস > কবিতাগুচ্ছ ও সেলিম মণ্ডলের সঙ্গে কথোপকথন >> কবিতা কল্পনালতা সিরিজ ১
0
0

সন্তু দাস > কবিতাগুচ্ছ ও সেলিম মণ্ডলের সঙ্গে কথোপকথন >> কবিতা কল্পনালতা সিরিজ ১ 

 

[সম্পাদকীয় নোট : ‘কবিতা কল্পনালতা” শীর্ষক সিরিজের এটি প্রথম কবিতাগুচ্ছ ও সাক্ষাৎকার। প্রতিবেশী, অর্থাৎ ভারতের কিছু বাঙালি কবিকে বাংলাদেশের পাঠকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে তীরন্দাজে শুরু হলো এই সিরিজটি। সন্তু দাস প্রথম দশকের বাঙালি কবি । জীবনবোধের দিক থেকে গভীর হওয়ার কারণে তার কবিতা পাঠককে ভাবায়। কিন্তু তার কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আটপৌরে জীবনকে তিনি কবিতায় তুলে আনেন, জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ খুঁটিনাটি বিষয়আশয়ের ওপর ভর করে জীবনেরই গভীরে প্রবেশ করেন। তার বলবার ভাষাভঙ্গিটিও আলাদা, দেখবার চোখটিও স্বতন্ত্র। এখানে প্রথমে তার একগুচ্ছ কবিতা প্রকাশিত হলো, সেই সঙ্গে কবিতা নিয়ে সেলিম মণ্ডলের সাক্ষাৎকার।]

 

 

জন্ম-স্মৃতি

 

ছিল কামার্ত কুকুরের মতো রোদ-
আকাশের কোণে এক টুকরো মেঘ ছিল, কিংবা হয়তো ছিল না।
(আকাশের বিশালত্ব অসহ্য বলেই হয়তো এক টুকরো মেঘ খুঁজছি, এতদিন পরেও।
এক টুকরো মেঘ যা অচেতন মায়ের মুখে লেগে থাকা এক চিলতে হাসির সাথে তুলনীয়।)

কুয়োতলায় ডাঁই করে রাখা এঁটো বাসনের মধ্যে জন্মেছিলাম আমি,
সংসারে এসেছি ঠাকুদ্দার কাঁসার থালায় চড়ে।

এভাবেও মরে যাওয়া যায়

 

অবশেষে মৃত্যু এল বাড়িওয়ালার মতো

আমায় লুকিয়ে রেখে আলমারির ভিতর
তুমি বলে দিলে আমি বাড়ি নেই

আমি সত্যি-সত্যি বাড়ি নেই ভেবে
তুমি দীর্ঘ সময়ের জন্যে ঢুকে গেলে বাথরুমে,

 

 

বন্ধু

 

ভাল চাকরি আর সুন্দরী বউ রেখে বন্ধুরা সব পাগল হয়ে গেল রাতারাতি

আমি দড়ি, বেড়ি, শেকল জোগান দিয়ে গেলাম শুধু
আমি পাগলাগারদ আর শক-রুম চিনিয়ে দিলাম দূর থেকে

বন্ধুর মা, বোন, বউয়েরা আমার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিল
বলল- ‘তুমি একমাত্র ভরসা’
বলল-‘তুমি ঈশ্বর’

হেঃ হেঃ

ঈশ্বরে আমার বিশ্বাস নেই

আমি হেসে উঠি ঈশ্বরের কুটিল হাসি…

 

++
ঘুমের মধ্যে টের পেলাম
ঘুমঘোরে আমি গত রাতে
ছিঁড়ে ফেলেছি আমার সাধের লাল ঘুড়ি
না জানি কী দেখব আজ জেগে উঠে

শোকের দিন নীলাকাশকে শত্রুপক্ষের তাঁবু মনে হয়
বৃষ্টির শব্দ গুপ্তচরের ফিসফিস

ছিপ কাঁধে পৃথিবীর নির্জনতম পুকুরের দিকে হেঁটে যাওয়া
লোকটির দেখা পাব কি আজও?
শিস দিয়ে গাওয়ার মতো আড়ম্বরহীন গানের সুরটা
অন্তত আজ যেন আমার সঙ্গে-সঙ্গে থাকে।

++
গাছটি নেই
এই বোধ-ই গাছ
তার পাতাহীন ডালে পাখির পরিত্যক্ত বাসা
হাওয়ায় সেই বাসা থেকে একটি পরিত্যক্ত পালকের
দুলে দুলে না-পড়া আছে প্রকটভাবে
শূন্যতা এই গাছটির কাঠ দিয়ে তৈরি একটি দুষ্প্রাপ্য আসবাব

 

নদী

 

নদী মৃত। তাই নৌকা অপ্রাসঙ্গিক এখন
ততোধিক অপ্রাসঙ্গিক আমাদের সঞ্চিত দম, সন্তরণকৌশল
পরিত্যক্ত নদী- খাদে নামি, চলো খুঁজি
সুপ্রাচীন নোঙরখানি- আমাদের অকূলে পাড়ি
দড়ি-কলসি- আমাদের নদীমাতৃকতা
পাথরবাঁধা কংকাল- আমাদের নদীভীতি
নদী মৃত
অবদমিত অট্টহাসির মতো সেতু ঝুলে আছে শূন্যে
সুড়সুড়ি দিতে দিতে ফাজিল বাতাস বইছে তার বগলের নীচ দিয়ে

 

পিতা-পুত্র আর…

 


কিছু একটা আঁকড়ে উঠে এলাম ঘুমের অতল থেকে
কী? তা জানি না
দেখি- অন্ধকারে আমার পোয়াতি বউ
বসে আছে মেঝেতে, পা ছড়িয়ে
আমার কবিতার খাতা খাচ্ছে

বউ বলল- নড়ছে, দ্যাখো
আমি হাত রাখি ঢিপির ওপর
ইঁদুর মাটির ঢিপি
শ্বাসরুদ্ধ, অপেক্ষা করি
জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে ফসলশূন্য মাঠ
আমরা দুই আদিবাসী দম্পতি ইঁদুর শিকারে এসেছি

আমি জন্ম দিয়েছি এক পুত্রের
পুত্র জন্ম দিয়েছ এক পিতাকে
আমরা দু-জন মিলে জন্ম দিয়েছি এক নতুন ঈশ্বর
পিতা-পুত্র-ঈশ্বরের বয়স সমান

আমি আমার ছেলের জন্য কিনে এনেছি
প্যাঁ-পুঁ জুতোর ছলনাময় এক পথ

 

 

পাখি

 

রঙিন পালকের আড়ালে ঘুমিয়ে থাকে পাখি
জেগে উঠে মাথা তোলে দৃশ্যমান হয়
বন্দুকের পিছনে লুকিয়ে থাকা শিকারি জানে
মুখ ঢুকিয়ে নিলেই আবার অদৃশ্য হয়ে যাবে পাখি
বহুকৌণিক মাংসটুকরো ঘিরে
আমাদের গোলাকার দিকশূন্য খিদে
(খিদেই সংঘবদ্ধ করেছে আমাদের
আমার ডানদিকের সাথে অন্যের বাঁ-দিক
আমার বাঁ-দিকের সাথে অন্যের ডানদিক মিলিয়ে দিয়েছে)
মাংস নয়, আমরা সেই ক্ষণটিকে খাচ্ছি
যা পেলে পাখি অদৃশ্য হয়ে যেতে পারত।

 

ঝুঁকে দেখি

 

ঝুঁকে দেখি-
এ আমার বড়ো পুরোনো অভ্যেস
ছাদ থেকে ঝুঁকে দেখছি- পরিত্যক্ত বাগানের অব্যবহৃত অংশ
বৃদ্ধ মালি-ঘর, বাঁধানো কুয়োতলা, পিছল
খাট থেকে ঝুঁকে দেখছি- নদীর ঘোলাজল
ভাসমান পোড়াকাঠ, মাছেদের ফুৎকার
মাটিতে শুয়ে ঝুঁকে দেখছি- ধরাশায়ী পুরুষ এক
মরে গেছে নাকি?
এত উঁচু থেকে বুঝতে পারছি না

 

হাসি এসে পড়ে আছে

 

হাসি এসে পড়ে আছে রাস্তায়, আড়াআড়ি
তুমি লাফিয়ে ডিঙিয়ে যাচ্ছ, সন্তর্পণে- যেন নোংরা
মরা কুকুর-দেহ, জমে থাকা পুরোনো বৃষ্টির জল যেন
বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কতদিন ফিরেছ বাড়ি। গভীর রাতে, একা-
পেছন পেছন একটা কুকুর ছিল, ছিল না কি!
বাড়ির কাছাকাছি আসতেই যে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল

 

সন্তু দাস
জন্ম ৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৪; হুগলি, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। শিক্ষা স্নাতক। পেশা : চাকুরি।

প্রকাশিত বই :

অন্ধকার আমাদের ইতর ঈশ্বর [কবিতা, দাহপত্র, ২০১৩]
সাদা ও নির্জন [কবিতা, দাহপত্র, ২০১৫]
যতদূর অবিশ্বাস করা যায় [কবিতা, শুধু বিঘে দুই, ২০১৬]
কোনো অদৃশ্য নেই কবিতা, [আমি আর লীনা হেঁটে চলেছি, ২০১৭]

 

 

সাক্ষাৎকার >> কবি সন্তু দাসের সঙ্গে আলাপচারিতায় কবি সেলিম মণ্ডল

 

তোমার একটি কবিতা ‘ধর্ষণ’ প্রায়ই ফেসবুকে শেয়ার হয়। এই কবিতাটা অনেকের কাছেই সেভ করা আছে, কিন্তু এমন অনেকেই আছে যারা জানে না, এটি কার লেখা… ঠিক এমনভাবেই তোমার সঙ্গে পরিচয়… এই কবিতাটা এত জনপ্রিয় হবার কারণ বা কবিতাটা নিয়ে অন্য কোনো অভিজ্ঞতা থাকলে যদি কিছু বলো।
‘ধর্ষণ’ আমার দ্বিতীয় বই, মানে ‘সাদা ও নির্জন’-এর তৃতীয় কবিতা। একথা সত্যি যে, এই কবিতাটি ফেসবুকে বহুবার শেয়ার হয়েছে এবং হয়েই চলেছে। ফেসবুকে এত শেয়ার মানে যদি জনপ্রিয়তা হয় তাহলে একটা আশঙ্কা তো হয়ই। সেটা হল, এই কবিতাটি আমার দুর্বল কবিতা। বাংলা কবিতার ইতিহাস এর সাক্ষী, জনপ্রিয় কবিতা মানে দুর্বল। দুর্বল না-বলে লঘু বলাই ঠিক। ‘ধর্ষণ’ কবিতাটি এত লোকের ভালোলাগার কারণ হয়তো, কবিতার শেষ দুটি লাইনের চমক। নইলে কবিতার ভেতরে অন্ধকারে ঢাকা যে ভয়ঙ্কর দৃশ্যটি আছে, তার নাগাল পাওয়ার পর এটিকে পছন্দ করার আর কোনো কারণ নেই।
প্রথম বই ‘অন্ধকার আমাদের ইতর ঈশ্বর’-এর ঠিক দুই বছর পর মানে ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় ‘সাদা ও নির্জন’। প্রথমে বইটির নাম ভাবা হয়েছিল ‘স্বরভঙ্গের দিন’, এই নামে একটা বিভাগও রয়েছে বইটিতে। ধারাবাহিকভাবে আমার কবিতা যাঁরা পড়েছেন তাঁরা নিশ্চয় বুঝবেন, ‘স্বরভঙ্গের দিন’ নামটা কেন ভাবা হয়েছিল।
কবিতা লেখার ক্ষেত্রে নির্মাণকে কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়?
কবিতা হল ‘স্বয়মাগতা’। যেদিন কবিতা নিজে থেকে কবির কাছে আসা বন্ধ করে দেবে, সেদিন কবির মৃত্যু হবে। আমরা তো জীবিত কবির এরকম মৃতদেহ হামেশাই দেখতে পাচ্ছি আমাদের চারপাশে। কবিতা আমার কাছে আসে তার সম্পূর্ণ ভাব এবং অবয়ব নিয়েই। এখন কেউ যদি প্রশ্ন করে, কবিতা যদি তার সম্পূর্ণ অবয়ব নিয়েই আসে, তাহলে লেখার পর কাটাকুটি করি কেন। আসলে কাটাকুটি হল মাটি খুঁড়ে বহুদিনের জমে থাকা ময়লা সরিয়ে, পরিষ্কার করে, আসল মূর্তিকে বের করে আনার মতো। এখন এই কাটাকুটিকে তুই যদি বলিস নির্মাণ, তো নির্মাণ। এ-প্রসঙ্গে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের একটা বক্তব্য মনে পড়ে গেল। সন্দীপন বলতেন, পাথর কেটে যেটা বানানো হল মূর্তি আসলে সেটা নয়, প্রকৃত মূর্তি হল পাথরের সেই অংশগুলো, যেগুলোকে কেটে ছেঁটে ফেলে দেওয়া হয়েছে। একটি কবিতা তার আট-দশ লাইনে ধারণ করে থাকে অনন্ত কোনো ভাবনাকে, বোধকে। এটা সম্ভব হয় কারণ আমরা যা লিখি তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আমাদের অনেক না-লেখা এবং লিখে কেটে দেওয়া ভাবনার ইঙ্গিত। এই ইঙ্গিতই হল কবিতা।
বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কবিতা বড়ো বেশি মেকিং নির্ভর। এর পিছনে হাংরি বা শ্রুতি আন্দোলনের বিশেষ কোনো ভূমিকা আছে বলে মনে হয়? মেকিং কি কবিতার ক্ষতি করে?
হাংরি, শ্রুতি- আর যত আন্দোলন হয়েছে বাংলা সাহিত্যে, কোনো আন্দোলনই কবিতার অন্তরাত্মাকে ছুঁতে পেরেছে বলে আমার মনে হয় না, যেটুকু যা তা কবিতার শরীর পর্যন্তই সীমিত। কবিতা বরাবরই একাকী। এককচর্চা। আর মেকিং শব্দটা ঠিক কবিতার সঙ্গে যায় না। কবিতা বানানো যায় না। বানানো যায় না বলেই কবিতা লেখা শেখানো যায় না। কোনো স্কুল-কলেজ-ইউনিভারসিটি, কোনো প্রতিষ্ঠান, কাউকে কবিতা লেখা শেখাতে পারে না। একমাত্র নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (তাঁর ‘কবিতার ক্লাস’ বইয়ের ভূমিকায়) ছাড়া আর কেউ ‘কবিতা লেখা শেখানো যায়’ বলে দাবি করেছেন বলে আমার জানা নেই। যদিও শুনেছি, কবি জয় গোস্বামী ‘কবিতার ওয়ার্কশপ’ করেছেন বেশ কয়েক বছর। ব্যাপারটা খুব হাস্যকর আমার কাছে।
তোমার চারটি কাব্যগ্রন্থ ‘অন্ধকার আমাদের ইতর ঈশ্বর’, ‘সাদা ও নির্জন’, ‘যতদূর অবিশ্বাস করা যায়’ এবং ‘কোনো অদৃশ্য নেই’। কাব্যগ্রন্থগুলো এক ফর্মা থেকে আড়াই ফর্মার মধ্যে। এমন পাতলা পাতলা বই করার কি নির্দিষ্ট কোনো কারণ আছে? আজকাল নতুন লিখতে আসা ছেলেমেয়েরাও চার ফর্মার বই-ই প্রেফার করে। চার ফর্মার বইকেই পূর্ণাঙ্গ বই হিসেবে দাবি করে। এক্ষেত্রে তোমার কী মত?
হ্যাঁ, চার ফর্মার বইকে পূর্ণাঙ্গ বই হিসেবে ধরা হয়। আর পূর্ণাঙ্গ বই না হলে পুরস্কার-টুরস্কার পাওয়া যায় না, সে জন্যই হয়তো তরুণ কবিরা চার ফর্মার বই করতেই বেশি আগ্রহী। একটা চার ফর্মার বইয়ের যে বিস্তৃতি তা ধরবার মতো যোগ্যতা আমার এখনো হয়নি বলেই আমি মনে করি। বইমেলার আগে আগে একজন ফেসবুকের কবি আমাকে ইনবক্স করে জানিয়েছিল, এক ফর্মার বই কখনোই বই নয়। এক ফর্মার বই কেন বিক্রি হয়, এক ফর্মার বই কেন জনপ্রিয় হয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার সব বই ওই এক-দেড় ফর্মার বলেই হয়তো… হা হা হা… আমি খুব কম লিখি। ‘লিখি’ না বলে ‘লিখতে পারি’ বলাটাই ঠিক হবে।
তেমনভাবে পত্র-পত্রিকায় তোমার লেখা পাওয়া যায় না। প্রচুর পাঠক তাকিয়ে থাকে ‘সন্তু দাসের কবিতা’র জন্য। শুধু কি পেশাগত কারণে সময় হচ্ছে না? না কি ইচ্ছাকৃত কম লেখ? না অনেকগুলো দুর্বল লেখাকে হত্যা করে নতুন কোনো শক্তিশালী লেখার জন্মের জন্য অপেক্ষা কর।
আগেই বলেছি, আমি খুব কম লিখতে পারি। সেটা যে শুধু পেশাগত কারণে, তা নয়। আমার মধ্যে এক ধরনের কুঁড়েমিও কাজ করে। এরকম অনেকদিনই গেছে, মাথার মধ্যে একটা লেখা তৈরি হয়ে আছে, কিন্তু আজ লিখব, কাল লিখব করে দিনের পর দিন কেটে গেছে। পেশাগত কারণে যেটা হচ্ছে, সেটা হল পড়াশোনার সময় পাচ্ছি না। সে-কারণে খুব খারাপ লাগে সময় সময়। আমি দুর্বল লেখাকে হত্যা করার পক্ষপাতী নই। বরং আমি সেই দুর্বল লেখাটিকে একটু অতিরিক্ত মনোযোগ দিয়ে, স্নেহ আর শাসন দিয়ে সবল করে তোলার পক্ষপাতী। আমি আমার এইরকম দুর্বল লেখাকে ভাবনায় তুলে রাখি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর…
ডি.টি.পি করা শিখেছিলে তোমাদের পত্রিকার কাজের জন্য। পেশা হিসেবে এটাকে নেবে কখনো ভাবোনি। বার বার তুমি বলতে, এই কাজে লেখালেখির প্রচুর ক্ষতি হয়। শেষপর্যন্ত এটাকেই পেশা হিসেবে নিতে হল, এই প্রসঙ্গ নিয়ে যদি কিছু বলো।
আমি বরাবরই চেয়েছিলাম এমন একটি জীবিকা যার সঙ্গে লেখালেখির দূর-দূরন্তে কোনো সম্পর্ক নেই। সেই কারণেই ২০১১ থেকে নিজেদের পত্রিকা ‘দাহপত্র’র কাজ করা সত্ত্বেও এই কাজটিকে আমি আমার পেশা হিসেবে নিইনি। জীবনে বহুরকম কাজ আমি করেছি, দিনমজুর থেকে ঝলমলে কর্পোরেট সেন্টার… এই এতরকম কাজ, কাজের পরিবেশ আর সহকর্মীরা নানাভাবে আমার বেঁচে থাকাকে সমৃদ্ধ করেছে, আমার লেখলেখিকে সমৃদ্ধ করেছে। ডি.টি.পি.-র কাজের সমস্যা হল, সারাদিন যেসব লেখা টাইপ করতে হয়, তার বেশির ভাগই অপছন্দের। ফলে ভিতরে ভিতরে একটা চাপা কষ্ট হয়। তাছাড়া শব্দের প্রতি যে মুগ্ধতা, যে মায়া আছে, যে রহস্য কবিতার মধ্যে ধরতে চাই, দিনরাত শব্দকে যান্ত্রিকভাবে দেখতে আর ঘাঁটতে থাকলে তা নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। ফলে লেখার ক্ষতি হবেই।
নিজের লেখালেখির ক্ষেত্রে ছন্দ বা অন্যান্য ব্যাকরণগত দিককে কতটা তুমি প্রাধান্য দাও?
ছন্দ অবশ্যই জানা উচিত, কিন্তু জোর করে ছন্দে লেখার কোনো কারণ নেই বলেই আমার মনে হয়। আমি আগেই বলেছি, কবিতা কবির কাছে আসে তার সম্পূর্ণ অবয়ব নিয়েই… কবির কাজ হল কবিতাটি কী চাইছে সেটা বোঝা। কবিতাটি যদি মুক্ত ছন্দে চলতে চায়, তাহলে শুধু আমি ছন্দ জানি বলে কিংবা ছন্দে লিখতেই হবে বলে, তাকে জোর করে কোনো ছন্দে ঢালাই করার কি ঠিক হবে? ছন্দ, মাত্রা, অলংকার- এসব আমার কাছে কবিতার শরীরমাত্র, আর কবিতার আত্মা হল কবিতার ভাবনা। আমরা যে-ভাষায় কবিতা লিখতে বসেছি, তা একটি ব্যবহারিক ভাষামাত্র। আমাদের রোজকার দৈনন্দিন জীবনে বহুবার বহুভাবে ব্যবহৃত হতে হতে তার ধার ও ধারণক্ষমতা ক্রমশই কমে যাচ্ছে। এই ভাষা দিয়েই ধরতে হয় কবিতার মতো সুক্ষ্ম অনুভূতিকে… সেটা তো এমনিতেই খুব কঠিন একটা কাজ, তার ওপর যদি ছন্দ, মাত্রা, অলংকার, এইসব মাথায় রেখে লিখতে হয়, তাহলে কবিতা হবে না, পাতার পর পাতা ছন্দ লেখা হবে, আঙুলের কর গুনে গুনে মাত্রা লেখা হবে, অলংকার লেখা হবে।
তোমার বইগুলোতে দেখা যায় একটি বই থেকে অন্য বইয়ে যাওয়ার রাস্তাটা হয়তো একই, কিন্তু অনেকটা বাঁক নেয়। প্রতিটি বইয়ের ক্ষেত্রে এই বাঁক নেওয়াটা কতটা জরুরি বলে মনে হয়?
এই বাঁক নেওয়া জরুরি কি না জানি না। তবে আমার ক্ষেত্রে যেটা হয় বলি, আমার লেখালেখির পরিমাণ এতই কম যে একেক সময় মাসের পর মাস আমি কিছুই লিখি না। এই যেমন গত এক বছর আমি একটিও কবিতা লিখিনি। ফলে হয় কী, আমি যে লিখতে পারি এই আত্মবিশ্বাসটুকুও চলে যায়। ভুলেই যাই আমি আগে কী লিখতাম, কীভাবে লিখতাম। নতুন করে শুরু করি, একদম শুরু থেকে। তাই হয়তো লেখা পালটে পালটে যায়। এটা ভালো কি খারাপ সেটা তো সময় বলবে। কিন্তু আমার এটা বেশ ভালোই লাগে। আত্মবিশ্বাস লেখার ক্ষতিই করে। ভাস্কর চক্রবর্তী বলেছিলেন, জীবদ্দশায় কবি যদি তাঁর নিজস্ব কোনো শৈলী তৈরি করেন, তাঁরই দায়িত্ব সেটা ভেঙে দিয়ে যাওয়া (যদিও ভাস্কর চক্রবর্তী নিজে সারাজীবন একইরকমভাবে লিখে গেছেন)। আমার ক্ষেত্রে যেহেতু নিজস্ব কোনো শৈলী তৈরি হচ্ছে না, তাই ভেঙে দেওয়ার কোনো দায় আমার নেই, হা হা হা।
‘আমি আমার ছেলের জন্য কিনে এনেছি/প্যাঁ-পুঁ জুতোর ছলনাময় এক পথ’ বা ‘আমরা ঈশ্বরকে নেশার জন্য পয়সা দিই/মায়ের হাতের কচুরলতি দিই/গরমে তালপাতার প্রেম আর/শীতে ছেঁড়া কাঁথার ঘৃণা দিই’ বা ‘কুকুরের লালা আর গু ডিঙোতে ডিঙোতে/আমি বাড়ি ফিরি রোজ’… কঠিন বাস্তবতাকে তুমি কী অদ্ভুতভাবে ফুটিয়ে তুলতে পার!

জীবন আমাকে যা যা দেখিয়েছে, আমি ঠিক তা-ই লিখেছি। এর জন্য আমি আমার জীবনের কাছে কৃতজ্ঞ।
কবিতার ক্ষেত্রে এই টুকরো টুকরো চিত্রকল্প ঠিক কতটা জরুরি?
কবিতার ক্ষেত্র টুকরো চিত্রকল্পের প্রয়োজন আছে কি না, জানি না। তবে এই ‘টুকরো’ বা ‘খণ্ড’-ই আমাদের ভবিতব্য। একটা টুকরো সময়ের মধ্যে আমাদের জন্ম, বাঁচা, লাফালাফি-ছোটাছুটি করা, আমিত্ব জাহির করা, প্রেম-হিংসে-রাগ-অভিমান-ঘৃণা করা, তারপর মরে যাওয়া। তাছাড়া প্রকৃতি আমাদের যেসব শক্তি দিয়েছে, মানে অনুভব শক্তি, দৃষ্টি শক্তি, ঘ্রাণ শক্তি, শ্রবণ শক্তি, চিন্তা শক্তি- সবই তো সীমিত। তা দিয়ে আমি যা-কিছুই সৃষ্টি করি না কেন তা কোনোভাবেই সম্পূর্ণ হতে পারে না। এক চলমান নদীর পাড়ে বসে আছি, নদীর যতটুকু অংশ আমি দেখতে পাচ্ছি, নদী আমার কাছে ততটুকুই। আর বাকিটা শুধুই কল্পনা। আবার আমাদের কল্পনাশক্তিও সীমিত।
নতুন অনেকেই ভালো লিখছে। তাঁদের নাম বা লেখালেখি সম্পর্কে যদি কিছু বল।
আমার লেখাপড়া বেশ কমই। এসময় এত এত ছেলে-মেয়েরা লিখছে, সবার লেখার আমি পড়ে উঠতে পারিনি… তবু যাদের লেখা পড়েছি এবং ভালোলাগে তাদের মধ্যে অন্যতম হল শৌভ চট্টোপাধ্যায়। খুবই আভিজাত্যপূর্ণ লেখা। ওর ‘মায়াকানন’ বইটা পড়ে খুব হিংসে হচ্ছিল, কেন এমন লিখতে পারি না ভেবে। এছাড়া রাকা দাশগুপ্ত- ক্লাসিক; সঙ্ঘমিত্রা হালদার- সাংকেতিক; কৃষ্ণ মণ্ডল- আবেগি; সায়ন পাল- ভাবুক। আর এই দশকের, আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়, সেলিম মণ্ডল, পৃথ্বী বসু, তন্ময় ভট্টাচার্য, সেখ সাদ্দাম হোসেনকে বেশ সম্ভাবনাময় মনে হয়।
তুমি নিজে খুব সিরিয়াস একটি পত্রিকা ‘দাহপত্র’র সহ-সম্পাদক। দাহপত্র সম্পর্কে কিছু বলো।
১৯৯৫ সাল থেকে প্রায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে দাহপত্র। সম্পাদক, কমলকুমার দত্ত। আমি যোগ দিই ২০১০ থেকে। দাহপত্র নিয়ে আলাদা করে কিছু বলতে চাইছি না, দাহপত্রের যেকোনো একটা সংখ্যা হাতে নিলেই পাঠক বুঝতে পারবেন দাহপত্র কী এবং কেন। তাছাড়া এই এতক্ষণ ধরে আমি যা-কিছু বললাম, তা শুধু আমার কথা, আমার ভাবনা নয়, এসব দাহপত্রেরই কথা, দাহপত্রেরই ভাবনা। শুধু এটুকু বলি, আমার লেখায় যা-কিছু ভালো (যদি কিছু থেকে থাকে) সব দাহপত্র ও কমলদার হাত ধরেই গড়ে উঠেছে।
এখন যে-সমস্ত পত্র-পত্রিকা প্রকাশ হচ্ছে, অধিকাংশই দেখা যায় ফাঁকিবাজি কাজ বা সম্পাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার লোভ। এখনকার পত্র-পত্রিকা সম্পর্কে যদি কিছু বলো।
মণীন্দ্র গুপ্ত বলেছেন, কমার্শিয়াল পত্রিকার কোনো চরিত্র নেই, আর লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্র না-থাকলে কিছুই থাকে না। বেশিরভাগ পত্রিকা সারাজীবনে এই চরিত্রটাই তৈরি করতে পারে না। নইলে, একটি ২০-২৫ বছরের পুরোনো পত্রিকার সম্পাদক কীভাবে ফেসবুকের মতো একটি সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট দিতে পারেন, ‘আগামী সংখ্যা কাকে নিয়ে করা যায় বলুন’ কিংবা ‘পত্রিকার তরফ থেকে কোন কবি/পত্রিকাকে পুরস্কার দেওয়া যেতে পারে জানান’! তার ওপর আজকাল ‘বিশেষ সংখ্যা’ নামে একধরনের ‘মানে বই’ চালু হয়েছে বাংলাবাজারে। প্রিয় কবি, বা সাহিত্যিকের মৃত্যুর পর একটি লিটল ম্যাগাজিনের প্রথম ও প্রধান কাজ হওয়া উচিত তাঁর অপ্রকাশিত, অগ্রন্থিত লেখাপত্র পাঠকের সামনে হাজির করা। তার জন্য যে পরিমাণ পরিশ্রম, সততা ও নিষ্ঠার দরকার বেশিরভাগ পত্রিকারই তা নেই। ফলে এইসব বিশেষ সংখ্যাগুলো ভরে ওঠে সেই সদ্য প্রয়াত কবি বা সাহিত্যিককে নিয়ে বড়ো বড়ো কবি, সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের লেখায়। থাকে তাঁকে নিয়ে, এমনকী তাঁর বাড়ির নাম, ফ্ল্যাটের নাম, পাড়ার নামে কবিতার মতো দেখতে কিছু হাস্যকর লেখা। (প্রয়াত কবির পোষা কুকুর-বিড়ালকে নিয়ে লেখাও পাব নিশ্চয় খুব তাড়াতাড়ি এইসব বিশেষ সংখ্যায়)। কারা কেনেন সেইসব সংখ্যা? কেনেন, সেইসব বড়ো বড়ো কবি, সাহিত্যিকদের তাঁবেদাররা। কারা পড়ে সেই সংখ্যা? পড়ে সেইসব অধ্যাপকদের ছাত্র-ছাত্রীরা। এটা খুবই কষ্ট দেয় আমাকে।
সবসময়েই ছিল, তবে কম আর বেশি। বর্তমান কবিতায় রাজনীতিটা যেন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। দলাদলি বাড়ছে। গোষ্ঠী বাড়ছে। তোমার কী মনে হয়; আমাদের নতুন প্রজন্মের কবিতা এতে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে?
আমি আগেই বলেছি, কবিতা একটি একক চর্চার বিষয়। দলাদলি, গোষ্ঠী এসব আগেও ছিল এখনো আছে। যাঁরা এসব করেন, তাঁরা আর যা-ই হোক কবি নন। তাঁরা নিজেরাও সেকথা জানেন, জানেন বলেই দল বাঁধেন, ক্ষমতা বাড়ান। কিন্তু কবিতা তো ক্ষমতা প্রদর্শনের জায়গা নয়। এর পাশাপাশি জীবনানন্দ দাশ, মণীন্দ্র গুপ্ত, ভূমেন্দ্র গুহ, উৎপলকুমার বসু, শম্ভু রক্ষিত এঁদের মতো কবিরাও তো আছেন, যাঁরা কোনো দল-গোষ্ঠীর মধ্য না-গিয়ে নির্জনে নিভৃতে নিজের কবিতাটি লিখে গেছেন। আমরা কবিতার মধ্যে দিয়ে নিজেকেই লিখি, নিজের ভেতরের অন্ধকার রহস্যময় জগতকে ছুঁতে চেষ্টা করি। আবার লেখবার পরে স্বাদ পাই আরেক রহস্যের- কে, কীভাবে লিখে দিয়ে গেল, এ-লাইন, এ-কবিতা! এই অলৌকিক ও অশরীরী অনুভূতির মুখোমুখি হওয়ার জন্যই হাজার হাজার বছর ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষ কবিতা লিখে চলেছে, এবং যতদিন মানবসভ্যতা থাকবে, ততদিন চলবে। হে তরুণ কবি তুমি নিজেই ঠিক করে নাও, কেন লিখতে এসেছ তুমি, কী পাওয়ার লোভে। এই অলৌকিক স্বাদ? না কি…

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close