Home অনুবাদ সমকালীন মার্কিন গদ্যকবিতা [পর্ব ২] > জেমস টেট-্এর ১২টি নির্বাচিত গদ্যকবিতা / ভূমিকা ও ভাষান্তর রনক জামান

সমকালীন মার্কিন গদ্যকবিতা [পর্ব ২] > জেমস টেট-্এর ১২টি নির্বাচিত গদ্যকবিতা / ভূমিকা ও ভাষান্তর রনক জামান

প্রকাশঃ May 3, 2017

সমকালীন মার্কিন গদ্যকবিতা [পর্ব ২] > জেমস টেট-্এর ১২টি নির্বাচিত গদ্যকবিতা / ভূমিকা ও ভাষান্তর রনক জামান
0
1

ভূমিকা

জেমস টেট। পুরো নাম জেমস ভিনসেন্ট টেট। মার্কিন কবি। জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ সালে কানসাস সিটিতে। স্থানীয় কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন এবং Iowa Writers’ Workshop থেকে MFA ডিগ্রি। আমেরিকান সমকালীন গদ্যকবিতার অন্যতম পথিকৃৎ জেমস টেট। বিশটির বেশি কবিতাগ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে আছে The Ghost Soldiers (2008); Worshipful Company of Fletchers (1994)। শেষ বইটির জন্য ন্যাশনাল বুক এওয়ার্ড পেয়েছেন। Selected Poems (1991) তাকে কবিতায় পুলিৎজার পুরষ্কার এনে দেয়। তার অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে Distance from Loved Ones (1990); Constant Defender (1983); Viper Jazz (1976); এবং The Oblivion Ha-Ha (1970)। এছাড়াও আরো কিছু পুরষ্কার জয়ের পাশাপাশি তাকে Academy of American Poets-এর চ্যান্সেলরশিপে ভূষিত করা হয়। ২০১৫ সালে এই কবি মৃত্যুবরণ করেন।

তার প্রথম কবিতা গ্রন্থ ছিল The Lost Pilot (1967), গ্রন্থ শিরোনামের কবিতাটি উৎসর্গ করেছিলেন তার বাবাকে। বাবা পাইলট ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিমানে বোমার আঘাতে তিনি নিহত হন। টেটের বয়স তখন মাত্র পাঁচ মাস।

জেমস টেট সমকালীন মার্কিন গদ্যকবিতায় ভিন্নমাত্রা যোগ করে গেছেন। তার কবিতার চরিত্রায়ন, হিউমার সেন্স নিজস্ব ভঙ্গিমায় উপস্থাপনের পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে আরো অনেকগুলো দিক উঠে আসে; যেমন- বিরহ, কৌতুক, অ্যাবসার্ডিটি, কারুণ্য, আশাবাদ, একাকীত্ব আর স্যুররিয়ালিজম। টেটের কবিতায় বিশেষ দিক হচ্ছে, তিনি কবিতায় একইসাথে এগুলি অবলীলাক্রমে মিশিয়ে দিয়ে তাকে কবিতা করে তুলতে পেরেছেন।

প্যারি রিভিউতে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই বলেছিলেন, “পাঠককে লেখার গভীরে প্রবেশ করাতে পারার চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে। আমি আমার মজার কবিতাগুলোও ভালোবাসি, কিন্তু একইসাথে পাঠকের হৃদয়ে ব্যথাও জাগাতে চাই। আর একাজটা যদি একসাথে করা যায়, তবে সেটাই উৎকৃষ্টতম। কোনো কবিতা পড়তে পড়তে আপনি হাসবেন, কিন্তু শেষে গিয়ে আপনার দুঃখ জাগবে, কান্না জাগবে। একইভাবে কোনো কবিতার করুণ দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে একটা দুর্দশার মুখোমুখি হতে হবে। সে অবস্থায় হঠাৎ ব্যাঙ্গাত্মক রসবোধ আপনাকে হাসাবে, আনন্দ দেবে, একইসাথে আফসোস জাগাবে, অর্থাৎ আপনার হৃদয়ে গিয়ে বাজবে। এই ব্যাপারটিই সেরা।”

তার কবিতার চরিত্রগুলো বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও নিজের খেয়াল চাপানোর ব্যাপারটি লক্ষ্য করা যায়। চরিত্রগুলোর বর্ণনায় গিয়ে তিনি ক্লিশে করে ফেলেননি। অথচ চরিত্রগুলোকে পাঠকের খুব পরিচিত কেউ বলেই মনে হয়ে উঠবে শেষমেশ। চরিত্র স্পষ্ট হতে থাকে তাদের কথায়, যাপনে বা ঘটনার প্রবাহে, চরিত্রের স্বাভাবিক প্রয়োজনে। ফলে চরিত্রকে আলাদা করে সাজানোর প্রয়োজন হয়নি।

‘এরকমই হয়’ শিরোনামের কবিতা লক্ষ্য করলে ব্যাপারটি স্পষ্ট হবে আরো। কবিতাটিতে আমরা একটা ছাগল দেখতে পাই, যার সাথে অন্য কোনো ছাগলের বিশেষ তফাৎ নেই, সাদামাটা এক ছাগল। কিন্তু সে কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ, তার এই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা প্রকাশ পায় শহরজুড়ে তার অস্তিত্বের প্রভাবে। এই প্রভাব স্বাভাবিক, অতিরঞ্জিত নয়। জেমস টেট সেই স্বাভাবিক প্রভাবকেই কৌতুকদীপ্ত করে উপস্থাপন করেছেন। ‘নিখুঁত লক্ষ্যভেদ’ নামক কবিতাতেও অদ্ভুত খেয়াল দেখতে পাই। যেখানে বাড়ির উপর এসে বোমা পড়ে, বাড়ির মালিক ভ্যাবাকান্ত হয়ে বলে, “এই সরকারকেই আমি ভোট  দিয়েছিলাম। তাদের তো আমার বাড়িটাকে উড়াবার কথা না।” পরিস্থিতি অনুযায়ী কথাটি উদ্ভট, কিন্তু অযৌক্তিক নয়। এখানেই টেটের হিউমার সেন্সের দক্ষতা, যে-দক্ষতা তাকে মার্কিন কবিদের মধ্যে আলাদা অবস্থান তৈরি করে দেয়।

মিথ্যের পাঠ্যপুস্তক

 

একটা কথা বলার ছিল, তোমাকে। একটু কি একা হতে পারি? একটা মিনিট?

এতদিন তোমাকে যা বলেছি আমি- সব মিথ্যে। বিশ্বাস হয়?

যে আমিও আমাকে ঠিক বিশ্বাস করি? কিংবা তুমি, তোমাকে কি বিশ্বাস করো

যখন বিশ্বাস করো তুমি এই আমাকে?

মিথ্যে তো খুব প্রাকৃতিক। ক্ষমা করে দাও।

সামান্য একা হতে পারি, আমরা? চিরদিনের জন্য? সবকিছু ক্ষমা করে দাও।

এই যে শব্দগুলো

এরাই মূলত ঘোর শত্রু আমার। আমি কোনদিন একা থাকিনি; ঘুষ ও

বিশ্বাসঘাতকতা- এসবের সাথেই ছিলাম। এমনকি এই যে এখনো দ্যাখো…

মিথ্যে বলছি।

বিশ্বাস হয়? কসম করেই বলছি।

 

বাবা দিবস

আমার মেয়ে, কয়েক বছর ধরে সমুদ্রের ওপারে এক দূরদেশে থাকে। খানদানি পরিবারে বিয়ে করেছে, যারা তাকে যোগাযোগ করতে দেয় না পরিবার ও বন্ধুর সাথে। বেঁচে আছে সামান্য দানা-পানি খেয়ে। আমাকে সে প্রতিরাতে স্বপ্ন দেখে। ওর স্বামী, মানে রাজপুত্র, স্বপ্ন দেখার কালে পাকড়ে ফেলে, ওকে বকাঝকা দেয়। পাহারায় কুকুর বসানো, চোখের আড়াল হতে দেয় না ওকে। আমি এক গোয়েন্দা ভাড়া করেছিলাম, অথচ আমার মেয়েকে মুক্ত করতে গিয়ে, নিজেই সে খুন হয়ে যায়। আইনের কাছে আমি কতশত চিঠি লিখলাম। ফিরতি জবাবে এলো, এ বিষয়ে উনারা সতর্ক আছেন। আমি ওকে কোনদিন নাচতে দেখিনি। প্রায়ই নানাবিধ সম্মেলনে কাটাতাম। আমি ওকে কোনদিন গাইতে দেখিনি। কাজ শেষে রাত করে ঘরে ফিরতাম। রাজকুমারী বলে ডাকতাম ওকে। কিন্তু, রাত করে ফেরার কারণে সে কোনদিনই ক্ষমা করেনি। ওর ডাকনাম ছিল ‘সূর্যমুখী’।

 

যিশুর সুন্দর সময়

একদিন সকালবেলা- যিশুর ঘুম ভাঙে অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু দেরিতে।

স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। এত গভীর যে, তার মাথায় আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

কী দেখছিলেন যেন? দুঃস্বপ্ন, সব মৃত লোকজন কিলবিল করছিল চারপাশে

তার। উলটানো চোখ, খসে পড়া চামড়া… অথচ তিনি একদমই ভয় পাননি।

দিনটা সুন্দর ছিল। “এক কাপ কফি হলে কেমন হয়? কিছু মনে করবেন না।

ঘুরে আসুন না আমার গাধার পিঠে চেপে; আমি, গাধাটাকে খুব ভালোবাসি।

 

…ধ্যাত্তেরি, আমি তো সব্বাইকেই ভালোবাসি!”

 

দরজায় টোকা

ওরা জিজ্ঞেস করল পৃথিবীর ধ্বংস হওয়া নিয়ে মাথাব্যথা কেমন আমার।

বললাম, “ভেতরে আসেন, বসেন, খোদার ওয়াস্তে আজ দুপুরের খানা

পিনা আমার ঘরেই সেরে নেন।”- খায় আর কথা তোলে পরকাল নিয়ে।

“আরেহ,” বললাম, “শাকের মধ্যে দেখি মাছি এসে বসে, দেখে খান”।

তখন মুক্তির কথা তুলল, তার পাশে বেছে বেছে আনা সব ভক্ত মুরিদ

“কেম্‌নে?” মুরিদগুলোকে দেখিয়ে বলি, “এইভাবে বসে বসে মুক্তি?”

কথা মাটিতে পড়ার আগেই আহত জোম্বির মতো ঘিরে ধরল আমাকে

“আহা! আসেন, আমরা লেবুর শিফন পাই খাই, গতকাল কিনেছিলাম

 

থ্রি ডগ বেকারি থেকে”। কিন্তু, তারা কথা বলবে অন্য বিষয়ে, আমারই

আত্মা নিয়ে। ঝিমুনি পাচ্ছিল খুব, চোখে মুখে প্রজাপতি উড়তে দেখি।

বললাম, “আপনারা ঘুমিয়ে নেবেন হালকা? আমার তো ঘুম পাচ্ছে…”

এই শুনে উঠে দাঁড়ায় তারা, বেরিয়ে যায় দরজা দিয়ে। তারপর হেঁটে

হেঁটে চলে যায় প্রতিবেশি দরজার দিকে। তখন… একটা কালো মেঘ,

ওদের মাথার উপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল, অথচ কিছুই দেখল না ওরা

…ওদের চোখে-মুখে-দৃষ্টিতে স্রেফ ‘কেয়ামত’ এর দৃশ্য ও দুশ্চিন্তা।

 

ছায়ামানব

পেছনের উঠোনে দেখি এক লোকের ছায়া, লোকটিকে দেখা যায় না। ছায়াটার দিকে হাঁটি, আর সে পেছনে হটে। আমার চেয়েও লম্বা, আমাকে ভেংচি কাটে। আমি হাত নাড়লে, সেও হাত নাড়ে। আমি দৌড় দিলে সেও পেছনে ছোটে। আমি থামি, থেমে যায় সেও। সারাটা সময় সে চুপ মেরে থাকে। গাইতে পারে না গান, আমি তো পারি। তাই যত জোরে সম্ভব গেয়ে উঠলাম। পাখিরা, উড়ে গেল মেঘের আড়ালে। প্রতিবেশী, উঁকি দিল জানালা থেকে। শেষমেশ সে ছায়ামানব, উল্টোদিকে ঘুরে ঢুকে পড়ে তার গর্তে।

 

জুতোর শোক এবং পা-বিহীন সুখী ব্যক্তি

ভেবেছিলাম, একাকীত্ব সম্পর্কে বেশ ভালো জানি আমি, কিন্তু, তুমি চলে গেলে মাংস ডিপোতে

শূয়োরের কান কিনে এনে- জুড়ে দিলে তোমার ওই বিছানার পাশে। বললে, “এ আমার প্রিয় বন্ধু,

যার সাথে বাতচিত করি খুব মজার বিষয়ে।” আর তখন থেকেই ভাবছি : কারো খাঁ খাঁ শূন্য হৃদয়,

(তুমিই প্রথম চাষি-) দারুণ সব ফুল ফোটানোর জন্য- শ্রেষ্ঠ জমিন।

 

না ফেরার ক্যাম্পে 

একটা নড়বড়ে গাছের ডালে বসে দোলনা ছাড়াই আমি দুলতেছিলাম। দুলতে দুলতে পায়ের জুতো খসে পড়ে, সেটা মাটিতে ফেলেই আমি চলে আসলাম। তখন বোন আমার, বাড়ির ভেতর থেকে দৌড়ে আসে, বলে, “আগামীকাল আমি ক্যাম্পে যাবো।”

বলি, “মিথ্যা কথা।”

বলে, “সত্যিই, মা বলছে!”

তারপর সারাদিন আমাদের কথা হয় না। আমি ওকে আদর দিতাম, তাই কী করব ভাবতেছিলাম। রাতে খাবার টেবিলে মা’কে জিজ্ঞেস করি, “মা, কী ক্যাম্প এটা?”

মা বলে, “বাকিসব ক্যাম্পের মতই।”

কী যে বোঝাইলো, বুঝলাম না!

পরদিন প্রতিবেশিদের কাছে আমাকে জমা রেখে, সাজিয়ে গুছিয়ে তারা বোনটিকে ক্যাম্পে নিলো। তারপর ফিরলো যখন তারা, সব স্বাভাবিক। শুধু মেইজিকে আমার মনে পড়তেছিল। দিন যত যায় তত মনে পড়ে আরো। আগে কি জানতাম সে আমার কত আদরের! বাবা মা’র কাছে তাই বারবার প্রশ্ন করি, “আর কতদিন দেরি?”

একটাই জবাব তাদের, “অতি জলদিই।”

স্কুলে সহপাঠীদেরকেও বলি, আমার বোনটি আজ কতদিন নেই! একজন ফট করে বলে, “ঐটা মরার ক্যাম্প। আর ফিরবে না।”

ছেলেটার কথা এসে বাবাকে বলি। বাবা ধমকে বলেন, “সব ফালতু কথা। সে জানে না কিছু।”

অথচ এইভাবে এক সপ্তাহ যায় দুই সপ্তাহ যায়, আমার তো ধীরে ধীরে অবাক লাগে। তারপর, তারা একদিন, মেইজি’র ঘর সাফ করতেছিল। আমি জিজ্ঞেস করি, “একি, করতেছো কী? মেইজি তো ফিরে আসবে। তুমি বলছিলা যে?”

মা বলল, “মেইজি আর ফিরবে না। এখানকার চেয়ে সে ওখানেই বেশি খুশি আছে।”

“মিথ্যা বলতেছো, ভূগোল বোঝাও আমাকে?”

তখন আমার দিকে এমন চোখে বাবা তাকালেন, যেন আমি কথা না শুনলেই এরপর আমার পালা। তারপর,

আমি আর কোনদিনও মেইজির কথা তুলি নাই।

 

আমার প্র প্র… প্যাট্রিক হেনরি পিতা

এইদেশে, সবকিছুর আগে তৈরি করে নিতে হয় নিজেদের ভাগ্যটাকে।

দেখা যায়, যা কিছু সমস্তই কারো না কারো পিতা বা প্রপিতা

বা প্র প্র পিতার আবিষ্কৃত। যেমন- বাচ্চাদের খাবার, ট্রাক্টর বা ইঁদুরের বিষ।

আমার পরিবার এক্ষেত্রে কিছুই করেনি আজতক, সৃষ্টির আদিকাল থেকে

তারা কর্তার দয়া দাক্ষিণ্যে

নিজেদের মাপমত দারিদ্র ও বাজে রুচি উদ্ভাবন করে গেছে কেবল।

 

মা হেঁটে বেড়ায়, দাঁত দিয়ে নখ কাটে, থুক করে বোতলে জমায়, আর বলে :

“তোমার তো লজ্জা পাবারও কিছু নেই। নিজের খানদান লক্ষ্য করো।”

“আমার খানদান?” বললাম আমি। “ক্ষীণবুদ্ধিগুলো স্রেফ এঁকে গেছে

অভাবের দৃশ্য। ছোটলোকি দিয়ে গেছে শুধু। কী করেছে আমার পিতা?

তার পিতা? প্রপিতা সকলে?”

“বাবা, তোমার ঐ প্র প্র… প্যাট্রিক হেনরি পিতার কথা একবার ভাবো!”

(প্যাট্রিক হেনরি (১৭৩৬-১৭৯৯) : “স্বাধীনতা দাও নয়ত মৃত্যু”- স্লোগানের স্বপ্নদ্রষ্টা। আমেরিকান রাজনীতিবিদ, বিপ্লবী নেতা, যাকে ‘Founding Father’ বলে ডাকা হয়। ভার্জিনিয়ার স্বাধীনতার জনক, ব্রিটিশ আধিপাত্যের বিরুদ্ধে তিনিই প্রথম আন্দোলনের ডাক দেন। আমেরিকার পুনঃঅভ্যুত্থানে তার অবদান চিরস্মরণীয়।)

 

এরকমই হয়

বিড়ি ফুঁকতেছিলাম, সেন্ট সিসিলিয়া গির্জার বাইরে খাঁড়িয়ে। আচম্বিত এক বকরি এসে পাশে খাঁড়ালো। বকরিটা সাদাকালো, বাদামি ছোপ ছোপ গা’য়।

আমি হাঁটা দিলে সেও পেছনে আসে। বিষয়টা ভালো ঠেকল, যদিও ভাবছিতেলাম আমি, বকরির মূলনীতি কী? কুত্তা নাহয় হলে বুঝতাম প্রভুভক্তি; কিন্তু এ বকরি বেলায়?

পথের লোকজন মুচকি হাসে আর বকরির তারিফ করে। আমি বলি, “আমার না তো! শহরের বকরি এটা, খেয়াল রাখার পালা চলতেছে আমার।”

“আমাগো বকরি আছে? জানতামই না,” বলে একজন, “তাইলে আমার পালা কবে আইবো?”

“অতি জলদি! ধৈর্য রাখো মিয়া, একদিন তোমাগোর সবার পালাই আইবো।”

বকরিটা পাশে পাশে থাকে, ভাইয়ের মতো। যদি থামি সেও থেমে যায়। আমার মুখের পানে মুখ তুলে চায়, আমি তার চোখে চোখ রাখি। যেন আমার ব্যাপারে সে যা জানার জেনে ফেলছে।

আমরা হাঁটতে থাকি। এক পুলিশ দেখে বলে, “আপনার বকরিটা বেশ।”

“শহরেরই বকরি,” বললাম তাকে। “গত তিনশ বছর ধরে খানদানসমেত পাশে হাঁটতেছে। একদম সূচনা থেকে।”

অফিসার বকরিটা ছুঁ’তে চাইলো, “ছুঁইলে কি মাইন্ড করবেন?”

“ছোঁয়ামাত্রই আপনার জীবন বদলে যাবে,” বললাম তাকে, “ভেবে নেন আগে।”

অফিসার মিনিটখানেক ধরে জোরসে ভাবে, তারপর বলে, “নাম কী উনার?”

“শান্তির দূত।”

“ইয়াল্লা, কী অদ্ভুত শহর! আমি তো বাচ্চাশিশু, শ’হাজার রহস্য ফাঁদে শুধু চোর আর পুলিশ খেলি। যদি কেঁদে বসি, মাফ করবেন।”

“আমরা আপনাকে মাফ করলাম, অফিসার। হলপ করেই বুঝলাম, এই মহিমান্বিত দূতটিকে ছোঁয়া আপনার কেন অনুচিত!” বলে, আমি ও আমার বকরি হাঁটা দিই সেখান থেকে।

চারদিকে সন্ধ্যা নামতেছিল। আমরা দুইজন ভাবতে থাকি, এই রাতটা যে কই কাটাবো?

 

নিখুঁত লক্ষ্যভেদ

হঠাৎ বোমা ফাটার শব্দ শুনলাম বাইরে কোথাও। কোনমতে পোশাকটা চাপিয়েই রাস্তায় এলাম। দেখলাম, হোয়ালেনদের বাড়িটা ভেঙে চুরমার চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। হল আর রেবেকা রাস্তায় দাঁড়ানো, অক্ষত। প্রতিবেশীরা ঘরদোর উজার করে ঝাঁকে ঝাঁকে পথে ছুটে এলো।

“হলোটা কী?” হলকে প্রশ্ন করি।

“ভাগ্যিস, প্লেনটা উড়ে যাবার সময় বাগানে ছিলাম আমরা, খোদা, লাখ লাখ শোকর তোমার! তারপর যা হলো তা দেখতেই পাচ্ছো। বাড়িটাই উড়িয়ে দিয়েছে,” সে বলল।

“নির্ঘাত ভুল বোঝাবুঝি, সম্ভবত দুর্ঘটনা,” বললাম আমি।

“তা ঠিক আছে, এই সরকারকেই আমি ভোট দিয়েছিলাম। তাদের তো আমার বাড়িটাকে উড়াবার কথা না,” সে বলল।

“ভাতৃত্বসুলভ হামলা বোধহয়,” বললাম।

“সেটা আবার কী জিনিস?” সে বলল।

“অন্য কাউকে উড়াতে গিয়ে ভুল করে তোমাকে মেরেছে,” বললাম।

“তাই বলে বসতিপূর্ণ জায়গায়? আমাকে যা খুশি ভাবুক নাহয়, কিন্তু, এখানে তো আরো লোক থাকে! বাচ্চা, বুড়ো, কুত্তাগুলোও,” সে বলল।

“দেখো, কর্তৃপক্ষ তোমাকে ক্ষমা চেয়ে পত্র পাঠাবে। হয়ত আরেকটা বাড়িও পাবে,” বললাম।

“ভাগ্যিস, আঁতকে গিয়ে হার্ট এটাক হয়নি আমার,” রেবেকা হোয়ালেন বলল।

জো মিজেল এগিয়ে আসে। “একদম নিখুঁত লক্ষ্যভেদ, ওরা জেনে বুঝেই করেছে একাজ। দ্যাখো, আশেপাশে আর কারো কিছু হয়নি,” সে বলল।

“তুমি কিভাবে জানো ওরা তোমার ঘর ওড়াতে গিয়ে ভুল করে আমার ঘরে বোমা ফেলেনি?” হল বলল।

“ও জিসাস, ওভাবে তো ভেবে দেখিনি। কিন্তু আমি কোনো দোষ করিনি। এই সরকারকেই ভোট দিয়েছিলাম আমি। যদিও মনে করি, সে একটা বেজন্মা শুয়োর,” জো বলল।

“আমাদের সবকিছু শেষ,” রেবেকা কাঁদতে কাঁদতে বলে, হাতে তার অশ্রুসিক্ত টিস্যু। হল তাকে স্বান্তনা জানায়, “সব ঠাণ্ডা হলে, স্তূপের ভেতর থেকে জিনিসপত্র কিছু বের করে আনতে পারি।”

“আমি একাজে সাহায্য করতে পারি,” বললাম।

“তোমার রূপার দস্তানাটা বেঁচে গেছে সম্ভবত, ওটা গলবার কথা না,” জো বলল।

বাকি প্রতিবেশীরা চারপাশে জড়ো হয়ে নিজেদের মাঝে ফিসফিস করে কথা বলতে থাকে।

“আমাদের নিরাপত্তার দাম এভাবে চুকাতে হচ্ছে?”

“খোদার অশেষ কৃপা, গণতান্ত্রিক দেশে বসবাস করি আমরা।”

“নিশ্চিত, ওরা জেনে বুঝেই কাজটি করেছে।”

“আমার কনগ্রেসের লোকদের চিঠি লিখব আমি।”

হল আমার দিকে ঘুরে বলল, “আমারই দোষ হয়ত। হয়ত এমনকিছু করেছিলাম, এটা তার উচিত পরিণাম। সব তো মনে পড়ে না, তবু প্রতিদিন একটু একটু করেও যদি জমে, ভেবে দ্যাখো, কত অন্যায় করে ফেলেছি! আমারই কর্মফল নিশ্চয়ই, কেউ হয়ত নালিশ করেছিল আমার নামে। ও খোদা, এসব নিয়ে আমি আর ভাবতে পারছি না, কী জঘন্য ব্যাপার!”

“শোনো হল, আমার এখনো মনে হচ্ছে ব্যাপারটা দুর্ঘটনা। এরকম প্রায়ই হয়ে থাকে। নালিশপত্রগুলো কত হাত ঘুরেফিরে প্রসাশনে যায়, হতে পারে তখন ঠিকানাটা ভুল হয়ে গেছে,” বললাম।

“আমার বাচ্চাদের ছবি, কত স্মৃতি, আর কি ফিরে পাওয়া সম্ভব!” রেবেকা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে।

“তোমার এক আত্মীয় আছে না, সরকারি চাকরি করে?” জো বলল।

“ওয়াশিংটনে এক সামান্য কেরানী সে,” হল বলল।

“যাই হোক, সন্দেহের বাইরে রাখা ঠিক না তাকে,” জো বলল।

“তুমি কিন্তু খোঁচা মেরে কথা বলছো, জো,” হল বলল।

প্রতিবেশীরা সব ঘরে ফিরে গেল, কৌতূহল মিটে গেছে কানায় কানায়। জো-ও চলে যাচ্ছিল, যাবার আগে বলল, “সামান্য কৌতুক ঢোকাতে চাইছিলাম প্রসঙ্গটিতে। কিছু মনে করে থাকো যদি, দুঃখিত।”

এর উপযুক্ত কোনো প্রত্যুত্তর হল দিতে পারল না। তারপর, আমরা তিনজন ধূলিসাৎ ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম ভ্যবলার মতো।

“উম বেশ, তোমরা চাইলে আমার বাড়িটাতে উঠতে পারো,” আমি বললাম শেষমেশ।

হল তাকায় আমার দিকে, কথার সততা যাচাই করে নিলো। তারপর বলল, “এটা আমাদের আসল বাড়ি না। আমাদের একটা গোপন বাড়ি আছে, যেখানে সব মূল্যবান জিনিস রেখেছি। বাড়িটা কোথায় তা কেউ জানে না, এমনকি আমাদের বাচ্চাগুলোও না। এখানে তো পুরনো ভাঙ্গারিতে ভরে রেখেছিলাম। জানতাম, আজ বা কাল হোক, এমনটা করবেই ওরা। আর দ্যাখো, গাড়িটার ক্ষতি হয়নি, তো আমাদের সমস্যা হবে না কোনো। রেবেকা এতক্ষণ প্রতিবেশীদের দেখে ভণিতা করছিল। জানো তো, অধিকাংশ প্রতিবেশী বিশ্বাস অযোগ্য?”

আমরা করমর্দন করলাম, কোলাকুলি করলাম। তারপর, ওরা গাড়িতে চড়ে চিরদিনের জন্য চলে গেল এখান থেকে। শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আমি, ওদের গাড়ির লাইসেন্স প্লেট নাম্বার- ৩৫৭০১৯- মুখস্ত করে রাখলাম।
একটা উল্লুককে যেভাবে কবিতা লিখতে শেখাবেন

উল্লুকটাকে কবিতা লিখতে শেখানো

তেমন কঠিন ছিল না কিছু।

একটা চেয়ারে তাকে বেঁধে ফেলা হলো প্রথমত,

তারপর পেন্সিল বেঁধে দিলো হাতের সাথে

(সম্মুখে আগেই প্রস্তুত রীম রীম খাতা!)

অতঃপর ডক্টর ব্লুসপায়ার তার কাঁধের কাছে ঝুঁকে

কানে কানে বললেন, “স্যার!

দেখে মনে হয়,

আপনি নয়, বসে আছে স্বয়ং ঈশ্বর!

কোনো ঐশী গ্রন্থ কেন ল্যাখেন না, স্যার?”

 

একই স্তনযুগল

আরো অনেক দিনের মতো একটি দিন। হেঁটে যাচ্ছিলাম আমি রাস্তা দিয়ে। থিয়েটারের বাইরে ঝোলানো বিলবোর্ড; তার পোস্টারে ঝুলছিল সুদর্শন স্তনযুগল। চোখ আটকে গেল তাতে। তখন দুপুরবেলা, জাহান্নামের মতো তীব্র গরম বাইরে। বললাম, “হোয়াট দ্যা হেল!” তারপর ২.৫০ ডলার খরচ করে ভেতরে ঢুকলাম আমি। মাঝখানের সারিতে একা একাই গিয়ে বসে পড়লাম। একা একাই পর্দা উঠল। মঞ্চের মাঝখানে একই পোস্টার। আমি বসে বসে ঘামতে থাকি। শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম, এই জাহান্নাম থেকে আমি বেরিয়ে যাবো। বাইরে তখনো দুপুর, জাহান্নামের মতো তীব্র গরম।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. চমৎকার সব গদ্যকবিতা! এর আগে জেমস টেট-এঁর কোনো কবিতাই আমার পড়া ছিল না। আজ একসঙ্গে এক ডজন কবিতা পড়ে ফেললাম। কবিতা তো নয়, যেন একগুচ্ছ ফুল! আর আমাদেরকে এই ফুলগুলোর এমন সুঘ্রাণ উপহার দেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি–অনুবাদক: রনক জামানকে। তীরন্দাজের জন্য অশেষ শুভ কামনা!

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close