Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ সাইফ বরকতুল্লাহ / বিশ্বকবিতা দিবস এবং সমকালের পশ্চিমী পাঁচ কবির কথা

সাইফ বরকতুল্লাহ / বিশ্বকবিতা দিবস এবং সমকালের পশ্চিমী পাঁচ কবির কথা

প্রকাশঃ March 20, 2017

সাইফ বরকতুল্লাহ /  বিশ্বকবিতা দিবস এবং  সমকালের পশ্চিমী পাঁচ কবির কথা
0
0

[সম্পাদকীয় নোট :  আজ ২১ মার্চ। বিশ্বকবিতা দিবস। কবিদের দিন। সারা পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন দেশে কবিতার জন্য উৎসর্গীকৃত এই দিনটিকে কোথাও ঘরোয়াভাবে, কোথাও অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালন করে থাকে। বিশ্বের অন্য কবিদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ইউনেস্কো ঘোষিত এই দিনটিকে স্মরণ করে আমরা এই লেখাটি প্রকাশ করা করছি। আমাদের বাঙালি কবিদের সঙ্গে আমরা কমবেশি পরিচিত, কিন্তু এই লেখার মধ্য দিয়ে আমরা চেয়েছি ইংরেজি পরিমণ্ডলে কে কী ধরনের কবিতাচর্চা করছেন, তার সঙ্গে পরিচিত হতে। কবিতার জয় হোক। কবিদের জয় হোক।]

বিশ্বকবিতা দিবস এবং সমকালের পশ্চিমী পাঁচ কবির কথা

 

আজ ২১ মার্চ। বিশ্বকবিতা দিবস। ১৯৯৯ সালের এইদিনে ইউনেস্কো দিনটিকে বিশ্বকবিতা দিবস ঘোষণা করে। এরপর থেকেই কবিতাপাঠ, রচনা, প্রকাশনা ও শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে দিনটি পালন করে আসছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। ইউনেস্কোর অধিবেশনে ঘোষণা করতে গিয়ে বলা হয়েছিল, দিবসটি বিভিন্ন জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কবিতা আন্দোলনকে নতুন করে স্বীকৃতি আর তাতে ও গতির সঞ্চার করবে। বাংলাদেশেও দিনটি বিশ্ব কবিতা দিবস হিসেবে পালিত হয়।

দিবসটি ঘোষণার পর থেকে বিশ্বব্যাপী কবিদের মধ্যে একধরনের উচ্ছ্বাস তৈরি হয়। কবি ও কবিদের বিভিন্ন সংগঠন নতুন করে পাঠকদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। আধুনিক কবিতা, কবিতার কথা, কবিতার ভাব অধিকাংশ মানুষের ভালো না লাগতে পারে। কিন্তু একটি ভালো কবিতা মানুষের জীবনকে আলোকিত করার ক্ষমতা রাখে। মানুষের মানবিক অনুভূতিকে জাগিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে ভালো কবিতা, শক্তিশালী কবিতা, সূক্ষ্ম চিন্তা ও মনন গঠনে সহায়তা করে। পাঠকদের জীবন তাতে অন্যরকম হয়ে উঠতে পারে।

পাঠক, আপনি ভালো কবিতায় মনোযোগ দিন, কবিতার উপস্থাপনের ভেতরে প্রবেশ করেন, কিছুটা সময়ের জন্য; শান্ত এবং গভীর কিছু খুঁজে পাবেন কবিতায়। আপনার তখন মনে হবে আপনি একা নন। মার্কিন কবি ফিলিপ লারকিন বলেছেন, কবিতা পঠনপাঠনে ধরনটা হচ্ছে, কবিতায় আপনাকে লক্ষ করতে হবে ছন্দের সূত্র, সহজ আবেগ আর সহজ শব্দবিন্যাসের দিকগুলি। কবিতা এভাবেই অনেক সহজবোধ্য হয়ে ওঠে।

আসুন, বিশ্ব কবিতা দিবসে, এই মুহূর্তে পশ্চিমী দুনিয়ায় সমকালের যে পাঁচজন কবি উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছেন, তাদের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।

 

ডন প্যাটারসন : ডন প্যাটারসন কবি, সমালোচক, সম্পাদক। ১৯৬৩ সালে স্কটল্যান্ডের ডনডিতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮৪ সালে চলে আসেন লন্ডনে। জ্যাজ গায়ক হিসেবে আবির্ভুত হন আর কবিতা লেখা শুরু করেন। ১৯৯২  সালে ফেবার প্রকাশনা সংস্থা Nil Nil নামে তার কবিতার বই প্রকাশ করে। তিনি অর্জন করেন ‘ফরোয়ার্ড’ পুরস্কার। এরপর তাঁর আরও চারটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়। কবিতার বইয়ের জন্য তিনি দুবার টিএস এলিয়ট পুরস্কার পেয়েছেন। পেয়েছেন উইথব্রেড পুরস্কারও। তীব্র সৌন্দর্যবোধ, ভাবের গভীরতা, চিন্তার স্বল্পজটিল পরিপূর্ণ কাঠামোয় বোনা তার কবিতা। প্যাটারসন সেন্ট অ্যাণ্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সৃষ্টিশীল লেখার’ শিক্ষক। তিনি রয়েল সোসাইটি অব লিটারেচারের ফেলো। তার বিশেষ আগ্রহ সনেট রচনায়। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ Nil Nil, God’s Gift to Women, The Eyes, White Lie, Landing Light, Orpheus, Rain, Selected Poems, 40 Sonnets। সম্পাদিত গ্রন্থ 101 Sonnets: From Shakespeare to Heaney , Last Words: New Poetry for the New Century (1999)  এবং New British Poetry (2004) । অনুবাদ করেছেন আন্তোনিও মাচাদো আর রাইনার মারিয়া রিলকের কবিতা। ২০০৮ সালে কবিতায় বিশেষ অবদান রাখার জন্য Order of the British Empire  সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

পড়ুন ২০০৯ সালে প্রকাশিত তার কবিতা ‘বৃষ্টি’ কবিতার অংশবিশেষ ;

…ভুলবেন না কালি, দুধ, রক্ত

বন্যার পানিতে সব পরিস্কার হয়ে গিয়েছিল

আমরা পতনশীল পানি থেকে বেড়ে উঠেছি

পতিত বৃষ্টির নিজস্ব পুত্র ও কন্যারা

এবং এসব কিছুই নয়, কোনো কিছুতেই কিছু

আসে যায় না।

পাঠক, আপনারা যারা প্যাটারসনের কণ্ঠে তার কবিতা শুনতে চান তারা ইউটিউবের এই ভিডিওটা দেখতে পারেন

https://www.youtube.com/watch?v=EHnlDSinXKo

জে এইচ প্রাইন : এই সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য জীবিত ব্রিটিশ কবি। প্রথম পাঠে তার কবিতা পাঠকের কাছে অবন্ধুসুলভ, কিছুটা বিমূর্ত, অস্পষ্ট মনে হতে পারে। এই শৈলীটা নিজেই ইচ্ছাকৃতভাবে অনুসরণ করেন প্রাইন। কবিতা প্রচলিত গঠনরীতিকে অস্বীকার করে নিজের একটা শৈলী উদ্ভাবন করে নিয়েছেন তিনি। তার কবিতায় আছে ভাষার বহুমাত্রিক ব্যবহার ও সংগীতের সুরমুর্ছনা।

প্রাইন ১৯৩৬ সালের ২৪ জুন জন্মগ্রহণ করেন। এ পর্যন্ত তার ৩০ টিরও অধিক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আশি বছর বয়সে এখনও নিয়মিত কবিতা লিখছেন। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ- Force of Circumstance and Other (1962), Poems (1962), Kitchen Poems (1968), Aristeas (1968), Day Light Songs (1968), The White Stones (1969), Fire Lizard (1970), The Oval Window (1983), Bands Around the Throat, Not-You (1993), Each to Each (2017)

পড়ুন ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত তার কবিতা Smaller than the Radius of the Planet-এর কিয়দংশ :

আমাদের মধ্যে আছে ভালোবাসার

অশরীরী ভাষা উজ্জ্বল উৎকণ্ঠা, আর আছে

দ্বিধাগ্রস্ত চাপ। তবুও ভালোবাসা আমার খুব প্রয়োজন

একটা হাত আমার পকেটে রাখ আর অন্যটি তোমার পকেটে,

বছরের প্রথম তুষারপাতের জন্য আমি অপেক্ষা করছি।

 

এলিস অসওয়াল্ড : এলিস অসওয়াল্ডের জন্ম ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে। তাঁর প্রতিটি কবিতাই প্রকৃতির কবিতা, রোমান্টিক কবিতা। তার কবিতায় জীবনের নানা অনুসঙ্গ চিত্রায়িত হয়েছে। ইতিহাসের নানান বিষয় সহজ সরল সাবলিলভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। ল্যান্ডস্কেপ বা ভূদৃশ্যেরও চমৎকার ব্যবহার ঘটেছে তাঁর কবিতায়। আলো, আঁধার, শীতার্ত আবহাওয়ার নানান অনুষঙ্গ খুঁজে পাওয়া যাবে অসওয়াল্ডের কবিতায়। ২০০২ সালে ডার্ট নদীকে নিয়ে লেখা পূর্ণাঙ্গ একটা কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয় তার। এটি একটা দীর্ঘ কবিতা। গ্রন্থটির জন্য তিনি টিএস এলিয়ট পুরস্কার লাভ করেন। কাদা, পানি, প্রকৃতি আর বিশ্বের সঙ্গে ব্রিটিশ জনগণের সম্পর্ক অনুসন্ধান করেছেন এই কবিতায়।

তার আরেকটা অসাধারণ কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে ‘মেমোরিয়াল’। ইলিয়াডের কাহিনিকে নতুনভাবে এতে সমকালের প্রেক্ষাপটে নতুন করে তিনি ইলিয়াডের গল্প বলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ, মৃত্যুর কথা ব্যক্ত করেছেন এই কাব্যগ্রন্থে। প্রাচীন ঐহিত্যের প্রতি তার অনুরাগের কথাও পাওয়া যাবে এই কবিতায়। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলি হচ্ছে The Thing in the Gap-Stone Stile, Dart, Woods etc., Weeds and Wild Flowers, A sleepwalk on the Severn, Memorial এবং Falling Awake।

পড়ুন ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত তার কবিতা- ‘বিবাহ’ :

এবং এই আমার ভালোবাসা, হাজার হাজার মানুষ আসে আর যায়

আমাদের প্রয়োজন ছাড়িয়ে বহুদূরে, ধড়িবাজের মতো;

আর এই ধান্দাবাজি যখন শুরু হয়, মনে হয় যেন

শূন্যে টানানো দড়ির উপর দিয়ে পা ফেলে চলছি,

এই আমাদের ভাগ্য; আর ভাগ্য যখন শুরু হয়,

তাই হলো বিবাহ, প্রেমের মতো, সবকিছুর মতো।

 

কেই মিলার : তিনি জ্যামাইকান কবি। ২০১৪ সালের ফরওয়ার্ড পোয়েট্রি প্রাইজ জিতেছেন কেই মিলার। The Cartography Tries to Map a Way to Zion কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি এই পুরস্কার পান। এই গ্রন্থের কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো অচেনা এক ভূমির সঠিক মানচিত্র তৈরির কাজে নিয়োজিত এক মানচিত্র প্রস্তুতকারক এবং একজন রাসতাফারাই পুরুষের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে রাজনীতির ভাষা এবং ইতিহাসকে তুলে ধরেছেন মিলার। বিচারকেরা বইটিকে কবিতার ‘স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত কণ্ঠস্বর’ হিসেবে অভিহিত করে পুরস্কৃত করেছেন।

মিলার জ্যামাইকার কিংস্টনে ১৯৭৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ৩৮ বছর বয়সী মিলার পড়াশোনা করছেন ব্রিটেনের ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটান ইউনিভার্সিটিতে। পাশাপাশি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের রয়্যাল হলওয়ে কলেজে সৃজনশীল সাহিত্যের ক্লাস নেন। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ হলো Kingdom of Empty Bellies, There Is an Anger That Moves, A Light Song of Light, The Cartographer Tries to Map a Way to Zion, Augustown। ক্যারিবীয় কবিতার একটা সংকলনও সম্পাদনা করেছেন তিনি।

পড়ুন ২০০৭ প্রকাশিত তার কবিতা Speaking in the Tongue-এর কিছুটা :

… অনেক বছর পরে এক বন্ধু আমাকে বললো

জিহ্বা আসলে ‍কিছুই নয়, অবোধ্য অর্থহীন কথা- বিভ্রান্তিকর

শব্দগুলি ধূলি থেকে উঠে আসে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করতে চেয়েছিলাম

ভাষা কী, কিন্তু কিছু্ই জিজ্ঞেস করা হয়নি, আমাদের

কথায় শুধু ধ্বনিত হলো খ্রিস্টের নাম।

 

ব্রেন্ডা শওনেসি : শওনেসি জাপানি বংশোদ্ভুত মার্কিন কবি। ১৯৭০ সালের ২১ মার্চ, অর্থাৎ বিশ্বকবিতা দিবসে তিনি জাপানের ওকিনাওয়াতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি টিন হাউস ম্যাগাজিনের কবিতা সম্পাদক। বর্তমানে বসবাস করছেন নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিন শহরে। কবিতা চর্চার পাশাপাশি নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন শওনেসি। তার কবিতায় ফুটে উঠেছে মার্কিন সংস্কৃতির চিরায়ত রূপ। শিল্প, প্রেম, দ্রোহের ব্যঞ্জনায় তার কবিতা বেশ সমৃদ্ধ। তার কবিতার শব্দগুলি যেন নাচে, এরকমই অনুভূতি হয় পাঠকদের। অর্থাৎ সংগীতময়তা তার কবিতার প্রধান গুন। তার কবিতার বিষয়আশয় একইসঙ্গে যৌন-অনুষঙ্গে উজ্জ্বল ও করুণ, কৌতুককর ও রাগী, হাস্যরসাত্ম ও গীতিময়। ইতিমধ্যে কবিতার জন্যে তিনি বেশকিছু পুরস্কার পেয়েছেন। এই প্রজন্মের একজন উল্লেখযোগ্য কবি মনে করা হয় তাকে।

শওনেসির প্রকাশিত কবিতার বই চারটি- So Much Synth, Our Andromeda, Human Dark with Sugar এবং Interior with Sudden Joy।

পড়ুন ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত তার কবিতা Project for a Fainting-এর কিছুটা :

…তুমি আমার অপরিচিত এবং দেখ কীভাবে কতটা

কাছাকাছি চলে এসেছি। দুদিক থেকেই।

রাত আমাকে সারা রাত ভিজিয়ে দেয়, অন্ধ, ভিজিয়েই চলে।

এবং লেগে থাকে জলরেখা। রুক্ষতার ভেতর দিয়ে সুমসৃণ লাঙল চলেছে,

ভালোবাসার ঝোঁক থাকে জ্বরাক্রান্ত হওয়ার। তারপর বিরতি। মাটিতে প্রোথিত।

আমি কী তোমার সঙ্গে নাচবো? দুজনেই চিরকাল একসঙ্গে থাকবো আর মরে যাব।

এ তো মরে যাওয়াই, হ্যাঁ, আমি মরেই যাব।

উৎস : UNESCO, The Telegraph এবং Wikipedia

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close