Home আফ্রিকা অমনিবাস সাইফ বরকতু্ল্লাহ > আফ্রিকার সমকালীন শীর্ষ পাঁচ লেখক >> প্রবন্ধ

সাইফ বরকতু্ল্লাহ > আফ্রিকার সমকালীন শীর্ষ পাঁচ লেখক >> প্রবন্ধ

প্রকাশঃ September 1, 2017

সাইফ বরকতু্ল্লাহ > আফ্রিকার সমকালীন শীর্ষ পাঁচ লেখক >> প্রবন্ধ
0
0

সাইফ বরকতু্ল্লাহ > আফ্রিকার সমকালীন শীর্ষ পাঁচ লেখক 

সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের এক অনন্য মহাদেশ আফ্রিকা। এর রয়েছে জাতিগত এবং সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়। রয়েছে শিল্পসাহিত্যে বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং বহুমুখী সত্তার ধারা। আফ্রিকার সমসাময়িক লেখকদের লেখায় উঠে এসেছে নানান বিষয়- নারী অধিকার ও নারীবাদ থেকে যুদ্ধ এবং ঔপনিবেশিক পরিচয়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গ। এই লেখাটিতে এই মহাদেশের সমকালীন কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক সম্পর্কে আলোচনা করা হল। সেই সঙ্গে থাকছে তাদের সাহিত্যচর্চার সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

চিমামণ্ডা নাগোগি আদিচী

এই সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন লেখক। একাধারে তিনি ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার এবং নন-ফিকশন লেখক। জন্ম ১৯৭৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর নাইজেরিয়ায়। বেগুনি হিবিসকাস (Purple Hibiscus) উপন্যাস লিখে বিশ্বে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। ২০০৩ সালের অক্টোবরে এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটিতে তিনি তুলে ধরেছেন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যেও কীভাবে একটি পরিবার টিকে থাকে। এর গল্পে পাওয়া যায়, একটি পরিবারের মধ্যে কীভাবে সহিংসতা বৃদ্ধি পায় তার বিবরণ। মূলত পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং সংগ্রামের এক অনন্য উপাখ্যান এটি। বলা হয়, এই উপন্যাসে তিনি তার নিজের পরিবারের জীবনাভিজ্ঞতাকে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে আমেরিকা এবং পশ্চিমা বিশ্বে নাইজেরীয় অভিবাসীদের জীবন এবং জাতিগত সংগ্রামের একটি অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ চিত্রনাট্য এটি। চিমামণ্ডা নাগোগি আদিচীর উল্লেখযোগ্য অন্যান্য গ্রন্থ :  হাফ অব এ ইয়োলো সান (২০০৬, উপন্যাস), আমেরিকানাহ (২০১৩, উপন্যাস)। দ্য থিং অ্যারাউন্ড ইউর নিক (২০০৯, ছোটগল্পের সংকলন)।

নিজের লেখক হওয়া সম্পর্কে এক সাক্ষাৎকারে চিমামণ্ডা নাগোগি আদিচী বলেন, ‘আমি কখনও সচেতনভাবে লেখা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেইনি। আমি লিখতাম, লেখার সময় মনে হতো আমার লেখার অনেক জায়গা ছিল। শুধু বসা এবং লেখা আমাকে অবিশ্বাস্যভাবে পূর্ণ করে তুলেছে।’

একুশ বছর বয়সেই আদিচীর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সেটি ছিল কবিতা সংকলন। নাম সিদ্ধান্ত (Decisions, 1997), এবং বায়ফ্রার জন্য প্রেমের নাটক (and a play, For Love of Biafra, 1998)। তার অধিকাংশ লেখায় রাজনীতি, ধর্ম, এবং প্রেম চিত্রায়িত থাকে। এই কারণে সমকালীন লেখকদের মধ্যে জনপ্রিয় তিনি।

অ্যালেন মাবানকোর

তিনি উপন্যাসিক, সাংবাদিক, কবি ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। ১৯৬৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কঙ্গোতে জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর উপন্যাসগুলি মূলত চিত্তাকর্ষক বিভিন্ন চরিত্রভিত্তিক। আফ্রিকার অভিবাসীদের অভিজ্ঞতা চিত্রায়িত হয়েছে তার লেখায়। সমাজ-বাস্তবতার এক অনন্য উপাদান খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর রচনায়। তিনি তুলে এনেছেন সমকালীন জীবনের অতল রহস্যের নানান দিক।

অ্যালেন মাবানকো মূলত ফরাসি ভাষায় লেখেন। আফ্রিকার লেখকদের মধ্যে অন্যতম সেরা এবং বিখ্যাত লেখক তিনি। তাঁর প্রথম উপন্যাস ব্লু-ব্লাঙ্ক-রুজ (ব্লু-হোয়াইট-রেড)। এটি ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত হয়। এরপর থেকেই লেখাতেই ক্রমশ নিজেকে সমর্পন করেন। এই উপন্যাসের জন্য ১৯৯৯ সালে গ্র্যাঁ প্রি লিটারেচার নইরে জিতে নেন। এরপর থেকে নিয়মিত কবিতা ও গদ্য লিখতে থাকেন। এসব লেখা নিয়মিত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

২০০৩ সালে তার উপন্যাস আফ্রিকান মনস্তত্ত্ব (African Psycho) প্রকাশিত হয়। একটি কাল্পনিক আফ্রিকীয় সিরিয়াল কিলারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই উপন্যাসটি রচিত।

নানান বিষয় নিয়ে লিখলেও অ্যালেন মাবানকো মূলত কথাসাহিত্যে খ্যাতি অর্জন করেছেন। বিশেষ করে ভাঙা কাচ (Broken Glass) উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেন। এটি একটি কমিক উপন্যাস। এই উপন্যাসে তিনি চিত্রায়িত করেছেন কঙ্গোর একজন প্রাক্তন শিক্ষকের জীবনচরিত। উপন্যাসটি প্রথমে ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত হয়। পরে ২০০৯ সালে ব্রোকেন গ্লাস হিসেবে ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়।

২০০৬ সালে প্রকাশিত হয় তার মেমরিজ অফ আ পোরকুপিন (Memoirs of a Porcupine) উপন্যাসটি। এই গ্রন্থটি যাদুবাস্তবতাবাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত একটি লোককাহিনি। মানুষের মানসিক প্রতিকৃতির চিত্র তুলে ধরেছেন এই গ্রন্থে।

২০০৯ সালে প্রকাশিত হয় উপন্যাস ব্ল্যাক বাজার। এটি মূলত এক অন্ধকার জীবনের গল্প। পারির আফ্রো-কিউবান বারে প্রভাবিত এক যুবকের আখ্যান এটি।

অ্যালেন মাবানকোর রচনাসমূহ বিশ্বের ১৫টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ফরাসি ভাষায় লিখলেও তাঁর কয়েকটি উপন্যাস ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে।

আমিনাত্তা ফর্না

আমিনতাতো ফার্না স্কটল্যান্ডে জন্মগ্রহণ (১৯৬৪ সাল) করলেও বড় হয়েছেন সিয়েরা লিওনে এবং লন্ডনে। শৈশব কেটেছে ইরান, থাইল্যান্ড ও জাম্বিয়াতে। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, গল্পকার এবং গদ্য লেখক। তার উপন্যাস দ্য হায়ার ম্যান, দ্য মেমরি অফ লাভ অ্যান্ড অ্যাসেস্টর স্টোনস এবং দ্য ডেভিল দ্যাট ডেন্স অন দ্য ওয়াটার বিশ্বব্যাপী ব্যাপক খ্যাতি এনে দিয়েছে তাকে।

দ্য হায়ার ম্যান, দ্য মেমরি অফ লাভ অ্যান্ড অ্যাসেস্টর স্টোনস উপন্যাসটি ক্রোয়েশীয় গ্রামের একটি গল্পকে নিয়ে লেখা। একটি ইংরেজ পরিবারের বাড়ি কেনা, যুদ্ধ, বিশ্বাসঘাতকতা এবং একটি প্রেমের আবর্তে এর কাহিনি। ২০১৩ সালে এই উপন্যাসটি আফ্রিকার সেরা একটি উপন্যাস হিসেবে সমাদৃত হয়।

বন্ধুত্ব, যুদ্ধ এবং নিগূঢ় প্রেমের কাহিনি নিয়ে রচিত উপন্যাস দ্য মেমরি অফ লাভ ২০১০ সালে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি ২০১১ সালে কমনওয়েলথ রাইটার্স বেস্ট বুক অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। এই গ্রন্থটি দ্য টেলিগ্রাফ, ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস এবং টাইমস পত্রিকার সেরা বেস্ট বুকস অফ ইয়ারের একটি নির্বাচিত গ্রন্থ। এটি নিউ ইয়র্ক টাইমস সম্পাদকের ‘পছন্দ’ বা চয়েস বই হিসেবেও মনোনীত হয়। দ্য ডেভিল দ্যাট ড্যান্স অন দ্য ওয়াটার-এর গল্প রচিত হয়েছে সিয়েরা লিওনের স্মৃতিকথা নিয়ে।

আমিনাত্তা ফর্নার বইগুলো এ পর্যন্ত বিশ্বের ১৬টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তার প্রবন্ধ দ্য গার্ডিয়ান, দ্য অবজারভার এবং ভোগ ম্যাগাজিনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জার্নালে স্থান করে নিয়েছে। তিনি বিবিসি রেডিও জন্য গল্প লিখেছেন।

নুরুদ্দিন ফারাহ

সোমালিয়ার ঔপন্যাসিক নুরুদ্দিন ফারাহ। ২০১৬ সালে নোবেল পুরস্কারের অন্যতম দাবিদার ছিলেন। নাদিন গর্ডিমার তাকে বলেছেন আফ্রিকার সর্বশ্রেষ্ঠ কণ্ঠস্বর, সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাতা। নুরুদ্দিন ফারাহ (জন্ম ২৪ নভেম্বর, ১৯৪৫) ভারতের চন্ডিগড় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়ই সোমালি ও ইংরেজি- এই দুই ভাষায় লিখতে শুরু করেন। তার উপন্যাসগুলি হচ্ছে : ফ্রম এ ক্রুকড রিব (১৯৭০), এ নেকেড নিডল (১৯৭৬), সুইট অ্যান্ড সাওয়ার মিল্ক (১৯৭৯) সারডিন (১৯৮১), ক্লোজ সিসেম (১৯৮৩) ম্যাপস (১৯৮৬) সিক্রেটস (১৯৯৮), লিংকস (২০০৪) নটস (২০০৭) ক্রসবোনস (২০১১) এবং হাইডিং ইন প্লেইন সাইট (২০১৪)।

আফ্রিকার এই সময়ের লেখকদের শীর্ষে তাঁর অবস্থান। তার কথাসাহিত্যে সৃষ্ট নারী চরিত্রগুলো কালজয়ী হয়ে আছে। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ফ্রম এ ক্রুক রিব। এই উপন্যাসের গল্পে দেখা যায়, নোমাদ বালিকার সঙ্গে এক বুড়োর বিয়ে ঠিক হবার পর ওই বালিকা পালিয়ে গেল। এরপর বুড়োর শুরু হয় নতুন করে জীবনসংগ্রাম। এই হচ্ছে উপন্যাসটির মূল গল্প।

১৯৭৬ সালে ইউরোপ সফরের সময় প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় উপন্যাস এ ন্যাকেড নিডল। এই উপন্যাস প্রকাশের পর সোমালীয় সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তারপর টানা ২২ বছর তিনি স্বেচ্ছানির্বাসিত জীবন কাটান।

এনগুগি ওয়া থিয়োং’ও

তিনি বহুপ্রজ বহুমাত্রিক লেখক। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রবন্ধকার, সম্পাদক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী।

তাঁর জন্ম কেনিয়ায় ৫ জানুয়ারি, ১৯৩৮ সালে। আফ্রিকার সাহিত্যের প্রথম দিকের লেখকদের সঙ্গে উত্তর ঔপনিবেশিক যুগের লেখকদের সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন তিনি। তাকে আফ্রিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখক হিসেবে গণ্য করা হয়। এনগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ইংরেজি সাহিত্যের একজন জনপ্রিয় অধ্যাপক। কেনিয়ার সমাজের অসাম্য নিয়ে লিখিত যখন চাইবো তখন আমি বিয়ে করবো নাটকটি কেনিয়াতে মঞ্চস্থ হওয়ার পর তাকে আটক করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। এরপর কারাগারে বসে টয়লেট পেপারে লিখেছিলেন উপন্যাস ডেভিল অন দ্য ক্রস উপন্যাসটি।

থিয়োং’ওকে মনে করা হয় এই সময়ের সবচেয়ে খ্যাতিমান আফ্রিকান লেখক। গত কয়েক বছর ধরে নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য যে শর্ট লিস্ট তৈরি করা হচ্ছে, তার শীর্ষে থাকছে তার নান। আফ্রিকীয় উত্তর ঔপনিবেশিক সমাজ ও রাষ্ট্রের চমকপ্রদ বর্ণনা পাওয়া যায় তার রচনায়।

সবমিলিয়ে বলা যায়, সমকালীন আফ্রিকীয় সাহিত্য সমৃদ্ধ সাহিত্য। পশ্চিমী দুনিয়ার লেখকদের তুলনায় লাতিন আমেরিকা আর আফ্রিকার লেখকদের লেখার প্রতি বিশ্বের সাহিত্য পাঠকেরা অনেক বেশি আগ্রহ দেখিয়ে থাকেন।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close