Home অনুবাদ সাদেক হেদায়েত > তিন ফোঁটা রক্ত >> মূল ফারসি থেকে অনুবাদ শাকির সবুর

সাদেক হেদায়েত > তিন ফোঁটা রক্ত >> মূল ফারসি থেকে অনুবাদ শাকির সবুর

প্রকাশঃ December 23, 2017

সাদেক হেদায়েত > তিন ফোঁটা রক্ত >> মূল ফারসি থেকে অনুবাদ শাকির সবুর
0
0

সাদেক হেদায়েত > তিন ফোটা রক্ত >> মূল ফারসি থেকে অনুবাদ শাকির সবুর

 

[অনুবাদকের কথা : ফারসি সাহিত্যে সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদের প্রবর্তক সাদেক হেদায়াত ইরানের আধুনিক ফারসি ছোটগল্পলকারদের মধ্যে উজ্জ্বলতর নাম। ফারসি ছোটগল্পের তারুণ্যকে মোহনীয় করে তুলেছে তাঁর শক্তিমান সব ছোটগল্প। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি ইরানের রাজধানী তেহরানের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে হেদায়াতের জন্ম। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে তেহরানের ‘দারুল ফুনুন’ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে তেহরানে অবস্থিত ফরাসি স্কুল ‘সানলুয়ি’ থেকেও প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন এবং এখান থেকেই ফরাসি ভাষা আয়ত্ব করেন। পরের বছরই ইরানের সরকারি বৃত্তিপ্রাপ্ত দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে উচ্চশিক্ষার্থে ইউরোপের পথে রওনা হন। কিন্তু ইউরোপে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধরাবাধা লেখাপড়ায় মন বসাতে পারেননি তিনি বরং লেখালেখির প্রতিই অধিকতর ঝুকে পড়েন। জার্মান থেকে প্রকাশিত ইরান শহর সাময়িকীর ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ১১ তম সংখ্যায় হেদায়াতের ‘মার্গ’ (মৃত্যু) শীর্ষক গল্প প্রকাশিত হয় এবং এর মাধ্যমেই তাঁর লেখালেখির জগতে প্রবেশ ঘটে।
হেদায়াত চার বছর ইউরোপে অবস্থানের পর ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ইরানে ফিরে আসেন। ইউরোপে অবস্থানকালে তিনি ‘মাদেলান’, ‘বুফে কুর’, ‘যেন্দে বেগোর’ শীর্ষক গল্প এবং ‘পারভিন দোখতারে সাসান’ শীর্ষক নাটক রচনা করেন। তেহরানে প্রত্যাবর্তনের পর ‘যেন্দে বেগোর’সহ আরও ৭টি গল্পের সমন্বয়ে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম ছোটগল্প সংকলন যেন্দে বেগোর (জীবন্ত কবর)।
হেদায়াত তাঁর গল্পে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনধারা এবং জীবনবোধকে চিত্রিত করেছেন অত্যন্ত মমতা দিয়ে। গল্পের উপস্থাপনা, লেখার ধরন এবং শিল্পনৈপুণ্যের ক্ষেত্রে ফারসি সাহিত্যের চলমান ধারায় বড়রকমের এক পরিবর্তন সূচিত করেছেন তিনি। এদিক থেকে তাঁর সমপর্যায়ের লেখক সমসাময়িককালে ইরানে আর কেউ নেই। গল্পজগতে বৈচিত্র্য ও ঐক্য, কোন উদ্যেশ্যের অভাব সত্ত্বেও হেদায়াত তাঁর গল্পের এমন এক ভূবন গড়ে তুলেছেন যাতে মৃত্যু-চিন্তায় ভীত, দুর্দশাগ্রস্ত এক মানুষ তাঁর ওপর আধিপত্য লাভ করেছে। এ কারণেই তাঁর জীবদ্দশায় সমসাময়িক গল্পকারদের মধ্যে হেদায়াতের নামই সব চেয়ে উজ্জ্বলতর।
এই পৃথিবীতে বসবাসকারী মানুষ বেশিরভাগই নানা রকম ফিৎনা- ফ্যাসাদ, হিংসা-ক্রোধ, ভয় ও আতঙ্ক সর্বদাই বয়ে বেড়ায় এবং যখন এর প্রভাবে নিজেকে একাকী নিরাশ্রয় অনুভূত হয় তখন হয় সে নিজেকে একটা খোলসের ভেতর গুটিয়ে ফেলে অথবা এর বিপরীতে নিজেকে দ্রুত মৃত্যুর দিকে টেনে নেয়। এটাই হচ্ছে হেদায়াতের গল্পের মূল সুর। বাস্তব জীবনেও হেদায়াত জীবন সম্পর্কে ছিলেন বিতৃষ্ণ, অনেকটা নিরাশ। সম্ভবত জীবন সম্পর্কে বিতৃষ্ণা এবং অনীহার কারণেই ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ৭ এপ্রিল প্যারিসের স্বীয় এ্যাপার্টমেন্টের গ্যাস লাইনে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যা করে জীবন-যন্ত্রণা মুক্ত হন তিনি।
তাঁর অধিকাংশ গল্পই উত্তম পুরুষে লেখা। মাত্র চার বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে তাঁর জীবনের সর্বোৎকৃষ্ট তিনটি গল্প সংকলন রচনা করেন। যেন্দে বেগোর (জীবন্ত কবর, ১৯৩০), সে কাতরে খুন (তিন ফোটা রক্ত, ১৯৩২) সায়ে ভা রওশান (আবছায়া, ১৯৩২)। তাঁর চতুর্থ গল্পগ্রন্থ ছাগে ভেলগার্দ (ভবঘুরে কুকুর) প্রকাশিত হয় অনেক পরে, ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে। এই গল্পটি তাঁর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ সে কাতরে খুন -এর নামগল্পের অনুবাদ।]

গতকালই তারা আমার রুম পৃথক করেছে, আচ্ছা সচিব যেমনটি কথা দিয়েছিল আমি কি সত্যি সত্যি সম্পূর্ণ সুস্থ উঠেছি এবং আগামী সপ্তাহেই ছাড়া পাবো? আমি কি আর অসুস্থ নই? এক বছর হয়, এর পুরোটা জুরে যতই কাকুতি মিনতি করতাম, কাগজ-কলম চাইতাম তারা আমাকে দিত না। সব সময় নিজে নিজে ভাবতাম আমার হাতে কাগজ-কলম পেলে তখন কী কী লিখবো…। কিন্তু গতকাল না চাইতেই আমার জন্য কাগজ-কলম এনেছে। এগুলোর কতইনা আকাঙ্ক্ষা করতাম, এগুলোর জন্য কী প্রতকীক্ষায়ই না ছিলাম…! কিন্তু কী লাভ! কাল থেকে আজ পর্যন্ত যতই ভাবছি লেখার জন্য কিছুই পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে যেন কেউ আমার হাতটা ধরে রেখেছে অথবা আমার বাহু অবশ হয়ে আসছে। এখন কাগজের উপর যে সব এলোমেলো রেখা টেনেছি সেগুলোর প্রতি লক্ষ করে যেগুলো পড়া যাচ্ছে তা হচ্ছে : ‘তিন ফোটা রক্ত।’
‘আকাশ গাঢ় নীল, সবুজ বাগান আর পাহাড়ের উপর ফুল ফুটে আছে, হালকা শীতল বাতাসে ফুলের গন্ধ এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। কিন্তু তাতে কী লাভ? আমি আর কোন কিছুতেই আনন্দ অনুভব করতে পারছি না, এগুলো সবই কবিদের জন্য আর শিশুদের জন্য। জীবনের শেষ পর্যন্ত যারা শিশু থাকে তারাই তো ভাল। এক বছর হয় এখানে আছি, রাতগুলোতে ভোর পর্যন্ত কান্নার শব্দে জেগে থাকি, এই ভীতিকর কান্না, এই মন্দ্রিত স্বর আমার প্রাণটাকে উষ্ঠাগত করে তুলেছে। ভোরে চোখ খুলতে না খুলতেই অকার্যকর ইনজেকশন…! কী লম্বা লম্বা রাত আর ভয়ঙ্কর মুহূর্তগুলোই না এখানে কাটিয়েছি। গরমের দিনগুলোতে হলুদ শার্ট আর পাজামা পরে মাটির নিচের কক্ষে সবাই একত্র হই আর শীতের দিনগুলোতে বাগানের পাশে সূর্যের সামনে বসে থাকি। এক বছর হয় এইসব বিস্ময়কর আজব লোকদের মাঝে বাস করছি। আমাদের কারো মধ্যেই কোন সাধারণ বৈশিষ্ট্য নেই। তাদের সাথে আমার আসমান-জমিন ফারাক। কিন্তু এই লোকদের বিলাপ, নীরবতা, গালিগালাজ, কান্না, হাসি সব সময় আমার ঘুমকে দুঃস্বপ্নে ভরে তোলে।
এখনো আমাদের রাতের খাবার খেতে একঘণ্টা বাকি। সেই রুটিন খাবার : পাতলা টকদই, পায়েশ, ভাত, রুটি-পনির, তাও আবার এতই অল্প যে যাতে খেয়ে মৃত্যু না হয়। এর মধ্যে হাসানই হচ্ছে সব আশা-ভরসা, করাণ সে থাকলে অন্তত একডেগ ডিমের ঘন সুপ চারটা রুটি দিয়ে খাওয়া যায়। তার ছুটির সময় হলে অবশ্যই তার জন্য কাগজ-কলমের বদলে নিশ্চয়ই ডিমের ঘন সুপের ডেকচি নিয়ে আসবে। এখানে সেই একমাত্র ভাগ্যবান মানুষ। বেঁটেখাটো শরীর, বোকামিপূর্ণ হাসি, মোটা ঘাড়, নেড়া মাথা আর কয়রা পড়া হাত। যেন ইট-সুরকি টানার জন্যই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তার শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গই এর সাক্ষ্য দিচ্ছে। তার অই বোকামিপূর্ণ দৃষ্টিও যেন ঘোষণা করছে, সে আসলে ইট-সুরকি টানার জন্যই সৃষ্টি হয়েছে। যদি দুপুর এবং রাতের খাবারের সময় মোহাম্মদ সেখানে দাঁড়িয়ে না থাকতো তাহলে হাসান আমাদের সবাইকে খোদার কাছে পাঠিয়ে দিতো। কিন্তু মোহাম্মদ আলী আসলে এই পৃথিবীর মানুষদের মতো নয়। কারণ এখানে যা কিছু ইচ্ছা বলে দেয় তবে তা যেন অন্য এক পৃথিবীর, সাধারণ মানুষদের পৃথিবী। একজন ডাক্তার আছে খোদার কৃপার কোন কিছুই তার মাথায় নেই। যদি তার স্থলে আমি থাকতাম তাহলে এক রাতে সবার খাবারে বিষ ঢেলে খেতে দিতাম। তারপর সকালে কোমরে হাত দিয়ে বাগানে দাঁড়িয়ে থাকতাম আর লাশগুলো নিয়ে যাওয়ার তামাশা দেখতাম। আমাকে যখন প্রথম এখানে নিয়ে আসে তখন মনে মনে ভাবতাম, আমাকে বিষ খাইয়ে দেবে নাতো! দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবার ছুঁতাম না, যতক্ষণ পর্যন্ত মোহাম্মদ আলী তা থেকে কিছু না চাখতো। সে খেলে তারপর খেতাম। রাতের বেলায় ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ঘুম ভেঙে যেতো। মনে হতো কেউ যেন আমাকে মেরে ফেলছে। এগুলো সবই কেমন দূরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে…! সব সময় একই ধরনের লোকজন, একই রকমের খাবার, সেই একই নীল রঙের ঘর, যার কোমর পর্যন্ত গাঢ় নীল।
দুমাস আগে এক উন্মাদকে সেই জেলখানায় উঠানের নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ভাঙা মারবেলে তার পেট ফেড়ে গিয়ে পেট থেকে নাড়িভুড়িগুলো বেরিয়ে গিয়েছিল। সেগুলো দিয়ে সে খেলছিল। লোকেরা বলে সে ছিল কসাই, তাই তার পেট ফাড়ার অভ্যাস ছিল। কিন্তু ওই আরেকজন, যে হাতের নখে চোখ উপড়ে ফেলেছিল, তার হাতগুলো ছিল পিছমোড়া দিয়ে বাঁধা। আমি জানি এদের সবাই কেয়ারটেকারের নজরদারিতে ছিল।
এখানকার লোকদের সবাই অবশ্য এরকম নয়। তাদের বেশিরভাগই চিকিৎসা শেষে ছাড়া পেলে হতভাগা হয়ে পড়বে। যেমন মেয়েদের মধ্যে থাকা অই ছোট সুলতানা। যে দু-তিনবার পালাতে চেয়েছিল, তাকে ধরে ফেলা হয়েছে। বৃদ্ধ মহিলা কিন্তু মুখে দেওয়ালের চক মাখতো আর মোমদানির মাটি হচ্ছে তার রূজ পাউডার। নিজেকে মনে করতো চৌদ্দ বছরে বলিকা। যদি সুস্থ হবার পর আয়নায় নিজেকে দেখে তাহলে হার্টফেল করবে। সবচে খারাপ হচ্ছে তাকি খোদমান, তার বিশ্বাস ছিল – নারীরাই হচ্ছে পুরুষদের দুর্ভাগ্যের কারণ এবং পৃথিবীকে শুদ্ধ করার জন্য যত নারী আছে সবাইকে হত্যা করা উচিত- তার সাহায্যে পৃথিবীকে ওলট পালট করে দিতে চাইতো, সে সেই ছোট সুলতানার প্রেমিক হয়ে গিয়েছিল।
এরা সবাই ছিল আমাদের তত্ত্বাবধায়কের অধীনে। ও সব উন্মাদদের হাত পিছমোড়া দিয়ে বেঁধে, সব সময় মাতালদের মতো সেই বড় মাথা আর ক্ষুদ্র চোখে বাগানের ভেতর পাইন গাছের নিচে পায়চারি করতো। কখনো উবু হয়ে গাছের নিচে দেখতো। যে-ই তাকে দেখতো বলতো, নিরুপদ্রপ একজন অসহায় মানুষ একদল উন্মাদের কবলে পড়েছে। কিন্তু আমি তাকে চিনি। আমি জানি সেখানে গাছের নিচে তিন ফোটা রক্ত নিষিক্ত হয়ে আছে। জানালার সামনে একটা খাঁচা ঝোলানো, খাচাটা শূন্য, যদিও বিড়াল ক্যানাড়ি ধরে অথচ সে খাঁচাটা রেখেছে যাতে বিড়াল তার আশপাশে এলে সেগুলোকে মারতে পারে।
গতকালই একটা লাল-সাদা চকড়া রঙের বিড়ালের পিছু ধাওয়া করেছে; প্রাণিটা পাইন গাছটা থেকে তার জানালার সামনে দিয়ে উপরে উঠে যেতেই গেটের প্রহরীকে প্রাণিটাকে গুলি করতে বলে। এই তিন ফোটা রক্ত সেই বিড়ালের; কিন্তু নিজেকে জিজ্ঞেস করতেই সে বলে এগুলো হুতোম পেঁচার।
এগুলো সবকিছুর চেয়ে বিস্ময়কর হচ্ছে আমার বন্ধু এবং প্রতিবেশী আব্বাস। তাকে আনা হয়েছে দু সপ্তাহও হয়নি। আমার সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছে। নিজেকে নবি এবং কবি মনে করে। বলে সব কাজই, বিশেষ করে নবুওত, ভাগ্য এবং রাশিচক্রের উপর নির্ভরশীল। যার ভাগ্য সুপ্রশস্ত হয়, যদি তার ভাগ্যে কিছু নাও জোটে, তাহলেও তার কাজ হয়ে যায়। যদি যুগের শ্রেষ্ঠ আলেমও হয় আর ভাগ্য না থাকে তবে তার দিন গেছে। আব্বাস নিজেকে অভিজ্ঞ বাদক বলে ধারণা করে। একটা তক্তার উপর তার টেনে নিজের খুশি মতন একা গীটার বানিয়েছে সে। একটা কবিতাও লিখেছে, যা দিনে আমাকে গেয়ে শোনায়। বলে এই কবিতাটার জন্যই তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। কবিতাটা অপরিচিত এক সাহিত্য ঢঙে লেখা :
আফসোস আবারও সন্ধ্যা হলো
আপাদমস্তক ধরণীর রঙ হলো কালো
সমস্ত সৃষ্টির বিশ্রামের সময় এলো
কিন্তু আমার, যন্ত্রণা-বেদনা আরো বাড়লো।
জগতের মহানন্দ হবে না বুঝি আর
মৃত্যু বিনা দুঃখ আমার হবে না প্রতিকার
কিন্তু অই কোণে পাইন তলায়
নিষিক্ত হয়ে আছে তিন ফোটা রক্ত তার।

গতকাল বাগানে পায়চারি করছিলাম। আব্বাস সেই কবিতাটা পড়ছিল, একজন মহিলা, একজন পুরুষ এবং একজন তরুণী তাকে দেখতে এসেছিল। তারা এপর্যন্ত পাঁচবার এসেছে। আমি তাদের দেখেছিলাম এবং চিনতাম, তরুণী মেয়েটা একতোড়া ফুল নিয়ে এসেছিল। মেয়েটি আমাকে লক্ষ করে হাসছিল, বোঝা যাচ্ছিল আমাকে সে পছন্দ করে। মূলত আমার আগ্রহেই সে এসেছিল, বসন্তের দাগওয়ালা আব্বাসের চেয়াহা তো সুন্দর না। কিন্তু মহিলাটা যখন ডাক্তারের সাথে কথা বলছিল তখন আমি দেখেছি আব্বাস তরুণী মেয়েটাকে একপাশে টেনে নিয়ে গিয়ে চুমু খেল।
এক বছর হয় এ পর্যন্ত আমাকে কেউ দেখতেও আসেনি এবং আমার জন্য কেউ ফুল নিয়েও আসেনি। শেষবার সিয়াউশ আমাকে দেখতে এসেছিল। সিয়াউশ ছিল আমার সবচে ভাল বন্ধু। আমরা ছিলাম প্রতিবেশী। প্রতিদিন দুজন একসাথে দারুল ফুনুনে যেতাম এবং একসাথে ফিরে আসতাম। দুজনে একসাথে পাঠ পর্যালোচনা করতাম এবং অবসর সময়ে আমি সিয়াউশের কাছে গিটার শিখতাম। সিয়াউশের চাচাতো বোন রোখসারে, যে ছিল আমার বাগদত্তা, প্রায়ই আমাদের আড্ডায় এসে যোগ দিত সে। সিয়াউশ মনে মনে রোখসারের বোনকে কামনা করতো, ঘটনাক্রমে একমাস আগে তার বিয়ে হয়ে গেলে সিয়াউশ মনে কষ্ট পায়। আমি দু তিনবার তার খোঁজখবর নিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু বলা হয় হাকিম তার সাথে কথাবার্তা বলতে নিসিদ্ধ করেছেন। যতই পীড়াপীড়ি করেছি অই একই উত্তর দেয়া হয়েছে। আমিও তাই আর পীড়াপীড়ি করিনি।
আমার বেশ মনে আছে, সামনেই পরীক্ষা ছিল। একদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেই স্কুলের নোটপত্রসহ বইগুলো টেবিলের উপর ছুঁড়ে ফেলে যেই কাপড় বদলাতে এসেছি অমনি একটা গুলি ছোঁড়ার শব্দ শোনা গেল। শব্দটা এতই কাছে ছিল যে, আমাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলে। কারণ আমাদের বাড়িটা ছিল একটা খাদে এবং শুনেছিলাম কাছেই নাকি চোররা থাকে। টেবিলের ড্রয়ার থেকে রিভলবারটা বের করে উঠানে চলে এসে শব্দটা শোনার জন্য কান খাড়া করে দাঁড়ালাম। তারপর সিঁড়ি বেয়ে ছাদে গেলাম। কিন্তু কিছুই চোখে পড়লো না। ফিরে আসার সময় সেই উপর থেকে সিয়াউশদের বাড়ির দিকে তাকাতেই দেখি সিয়াউশ শার্ট আর পাজামা পরে উঠানে দাঁড়িয়ে আছে। বিস্মিত হয়ে বললাম :
‘সিয়াউশ তুই?’
সে আমাকে চিনতে পেরে বললো :
‘ভেতরে আয়, বাড়িতে কেউ নেই।’
‘গুলির শব্দ শুনছস?’
ঠোটে আঙুল দিয়ে মাথা র ইশারায় ভেতরে যেতে ইশারা করে। আমি দ্রুত নিচে নেমে এসে ওদের বাড়ির দরজার কড়া নাড়ি। নিজে এসে আমার সামনে দরজা খোলে। যেভাবে মাথা নিচু করে মাটির দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে ছিল অই অবস্থায়ই বলল :
‘তুই আমাকে দেখতে আসস না কেন?’
‘আমি দু তিনবার তোর খোঁজখবর নিতে এসেছি কিন্তু সবাই বলে, ডাক্তারের অনুমতি নেই।
‘তারা মনে করে আমি অসুস্থ। কিন্তু তারা ভুল করছে।’
আবারও জিজ্ঞেস করলাম :
‘অই গুলির শব্দটা শুনছস?’
সে কোন জবাব না দিয়ে আমার হাত ধরে পাইন গাছটার নিচে নিয়ে গিয়ে কিছু একটা দেখাল। আমি খুব কাছ থেকে দেখলাম, মাটির উপর তিন ফোঁটা টাটকা রক্ত নিষিক্ত হয়ে আছে।
তারপর আমাকে ওর রুমে নিয়ে গিয়ে সবগুলো দরজা বন্ধ করে দেয়। একটা চেয়ারে বসলাম। ও বাতিটা জ্বেলে দিয়ে আমার সামনের চেয়ারে এসে বসল। তার রুমটা সাদাসিধা। নীল রঙ এবং দেয়ালের কোমর পর্যন্ত ছিল গাঢ় নীল। রুমের এক কোণায় একটা গিটার রাখা ছিল। টেবিলের ওপর ছড়ানো ছিল কয়েকটা বই এবং স্কুলের নোটপত্র। সিয়াউশ টেবিলের ড্রয়ারে হাত দিয়ে একটা রিভলবার বের করে আমাকে দেখাল। সেই ঝিনুকের হাতলওয়ালা পুরনো রিভলবার। সেটা প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে বলল :
আমার একটা মাদি বিড়াল ছিল, নাম ছিল নাজি। হয়তো অইটাকেই দেখেছিস। মামুলি বিড়াল, সুরমা দেওয়া চোখের মতো বড় বড় চোখওয়ালা। পিঠের ওপর ছিল এমন চক্করওয়ালা, চুসকাগজে কোন কলি চুষে নিলে যেমন নানা রকম রঙের বিচ্ছুরণ দেখা যায় ঠিক সেরকম গায়ের রঙ। দিনে যখন স্কুল থেকে ফিরতাম নাজি আমার সামনে দিয়ে দৌঁড়ে যেতো আর মিউঁ মিউঁ করতো, নিজেকে আমার সাথে ঘষতো, যখন বসতাম তখন আমার মাথা ও কাঁধের উপর উঠে আমার মুখের সাথে চোয়াল চেপে ধরতো। খসখসে জিহ্বায় আমার কপাল চাটতো আর তাকেও চুমু দিতে পীড়াপীড়ি করতো। বলা হয় মাদি বিড়াল নাকি পুরুষ বিড়ালের চেয়ে অধিকতর ধুর্ত, দয়ালু এবং সংবেদনশীল হয়ে থাকে। আমাকে ছাড়া নাজির বাড়ির বাবুর্চির সাথেই শুধু সম্পর্ক ছিল। কারণ সেই তার সামনে খাবার দিতো, তবে সে ছিল লম্বা সাদা চুলওয়ালা এবং অহংকারী আর নামাজ পড়তো, তাই বিড়ালের লোম থেকে বেঁচে থাকতে দূরে দূরে থাকতো। নাজি মনে মনে ধারণা করতো অবশ্যই মানুষরা বিড়ালদের চেয়ে বুদ্ধিমান তাই তারা সব রকমের ভালা ভাল খাবার এবং উষ্ণ নরম জায়গাগুলো নিজেদের জন্য দখল করে রাখে। বিড়ালদের এটাই তোষামোদী হতে হয় এবং চাটুকারী করতে হয় যাতে তাদের সাথে এসবে ভাগ বসাতে পারে।
শুধু তখনই কেবল নাজির ভেতর প্রাকৃতিক সংবেদনশীলতা জেগে উঠতো যখন রক্তমাখা মোরগের মাথা তার থাবায় পড়তো এবং তাকে একটা হিংস্র প্রাণীতে পরিবর্তিত করে ফেলতো সে। তার চোখগুলো আরও পুষ্ট হয়ে উঠতো এবং জ্বল জ্বল করতো। নখগুলো লোমের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতো। আর যে কেউ তার কাছাকাছি হতো তাকেই হিংস্র গোঙানিতে ভয় দেখাতো। তারপর, যেন বস্তুটা তাকে ধোকা দিয়েছে এমন ভঙ্গিতে খেলা শুরু করে দিতো। যখন নিজের সব শক্তি দিয়ে মোরগের মাথাটাকে জীবন্ত প্রাণী মনে করতো, তার নিচে পা ঢুকিয়ে দিতো, আরও উত্তেজিত হয়ে উঠতো, নিজেকে লুকাতো, আড়ালে ঘাপটি মেরে বসতো, তারপর আবারো হামলা করতো আর স্বজাতির তামাম শক্তিমত্তা আর চাতুরিকে একের পর এক লম্ফঝম্প, যুদ্ধ আর পলায়নের মাধ্যমে সুস্পষ্ট করে তুলতো। তারপর যখন এসব দেখাতে দেখাতে ক্লান্ত হয়ে পড়তো তখন রক্তমাখা মাথাটা যত দ্রুত সম্ভব খেয়ে ফেলতো এবং তারপর কয়েক মিনিট পর্যন্ত তার বাকি অংশ অনুসন্ধান করতো এবং তারপর প্রায় এক দুই ঘণ্টা তার কৃত্রিম সংস্কৃতি ভুলে যেতো, না কারো কাছাকাছি আসতো, না অভিমান করতো আর না তোষামোদ করতো।
নাজি যেভাবে বন্ধুত্ব প্রকাশ করতো সেই রকম সে ছিল হিংস্র এবং অন্তর্মুখী। নিজের জীবনের কোন রহস্যই ফাঁস করতো না। আমাদের বাড়িটাকে নিজের মনে করতো। যদি কোনো আগন্তুক বিড়ালের কান্নার আভাস পেতো, বিশেষ করে যদি সেটা হতো মাদি বিড়াল, তাহলে অনেকক্ষণ ধরে ম্যাঁও ম্যাঁও, পরিবর্তন এবং দীর্ঘ কান্না শোনা যেত।
দুপুরের খাবারের সংবাদ জানাতে নাজি যে শব্দ করতো সোহাগ চেয়ে শব্দ করার সময় করা শব্দ থেকে তা ছিল ভিন্ন। ক্ষুধার্তের কারণে যে শব্দ করতো ঝগড়া করার সময়ে করা ওয়াও ওয়াও শব্দ থেকে তা ছিল ভিন্ন। স্বর পরিবর্তন করে ফেলতো: প্রথমে কলজে কাঁপানো চিৎকার দিতো তারপর ঘৃণা এবং ক্রোধের চিৎকার করতো। তৃতীয় দফায় ছিল যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ, যা ছিল তার স্বভাবগত, যাতে নিজের জোড়ার দিকে যেতে পারে। তবে সব কিছুর চেয়ে অর্থপূর্ণ ছিল নাজির দৃষ্টি, যা কখনো কখনো মানবীয় অনুভূতি প্রকাশ করতো। যেন ইচ্ছাহীনভাবেই কেউ নিজেকে জিজ্ঞেস করছে : এই লোমশ মাথার পেছনে, এই রহস্যময় সবুজ চোখগুলোর আড়ালে কী ভাবনা এবং কী অনুভূতি ঢেউ খেলছে!
গতবছর বসন্তে সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাটা ঘটল। জানেন তো এই সময়ে সব প্রাণিই উতলা হয়ে ওঠে এবং জোড় বাঁধতে ছুটে যায়। মনে হয় যেন সব স্পন্দনশীল প্রাণীর মধ্যে বসন্তের বাতাসের মতো এক উন্মাদীয় উত্তেজনা বয়ে যায়। আমাদের নাজিও প্রথমবার প্রেমের উন্মাদনায় মাথা ঠুকতে লাগলো আর সমস্ত শরীর কাঁপানো উত্তেজনায় আর্ত চিৎকার করতে লাগল। নর কান্নাগুলো তার আর্তনাদ শুনতে পেয়ে পাশ থেকে তাকে স্বাগত জানাল। যুদ্ধ এবং সংঘাতের পর নাজি তাদের মধ্য থেকে যে সবচে শক্তিশালী এবং উচ্চকণ্ঠ তাকেই নিজের সঙ্গী নির্বাচন করল। প্রাণীদের প্রেম নিবেদনের সময় তাদের বিশেষ গন্ধ খুবই গুরুত্ব বহন করে। একারণেই মাদি বিড়ালদের কাছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাটুকার পোষা বিড়ালরদের কোন আকর্ষণ থাকে না। অপর দিকে দেওয়ালের উপরে শীর্ণ দেহের ক্ষুধার্ত ভবঘুরে চোড়া বিড়ালগুলো, যেগুলোর চামড়া তাদের স্বজাতির আসল গন্ধ দেয়, তারাই হচ্ছে মাদি বিড়ালদের কাছে আকর্ষণীয়। দিনের বেলায় এবং বিশেষ করে রাত জুড়ে নাজি এবং তার সঙ্গী দীর্ঘ স্বরে তাদের ভালবাসা প্রকাশ করতো। নাজির নরম কোমল শরীর দ্বন্দ্ব-সংঘাত করতো, যদিও তার সঙ্গীর শরীরটা ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে যেতো তবুও সে আনন্দ-চিৎকার করে উঠতো। ভোরের আলো ফোটা পর্যন্ত এই কাজ অব্যাহত থাকতো। তখন নাজি এলোমেলো লোমে, ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হয়ে কিন্তু আনন্দিত ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকতো।
রাতগুলোতে নাজির প্রেমের জ্বালায় ঘুম আসতো না। বাধ্য হয়ে জায়গা ছেড়ে উঠে যেতাম। এক রাতে সেই জানালার সামনে কাজ করছিলাম। প্রেমিক আর প্রেমাস্পদকে দেখলাম বাগানে খুব ভাব নিচ্ছে। আমি, অইযে রিভলবারটা দেখেছেন, ওটা দিয়ে তিন কদম দূর থেকে নিশানা করলাম। রিভলবারটা খালি হয়ে গেল, নাজির সঙ্গী গুলি খেল। মনে হলো যেন তার কোমর ভেঙে গেছে। লম্বা একটা লাফ দিল। কোন রকম শব্দ বা চিৎকার না করেই করিডোর দিয়ে পালিয়ে গিয়ে বাগানের মাটির দেয়ালের সামনে পড়ে মরে গেল সে।
তার যাবার পথের পুরোটা জুরে চাকা চাকা রক্ত নিষিক্ত হয়ে ছিল। নাজি খানিক সময় তার পেছন পেছন গেল, যতক্ষণ তার পায়ের চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল, রক্ত শুঁকে শুঁকে ঠিক তার নিহত হওয়ার স্থানে পৌঁছে গেল সে। দুরাত দুদিন তার মৃত লাশটা পাহারা দিল সে। কখনো কখনো সামনে পা দিয়ে তাকে স্পর্শ করে, যেন তাকে বলছিল : ওঠ বসন্তের শুরু! প্রেমের সময় কেন ঘুমাচ্ছ? কেন নড়ছ না? ওঠ, ওঠ! কারণ নাজি তার মৃত্যু বুঝতে পারেনি এবং জানতোও না যে তার প্রেমিক মরে গেছে।
পরদিন সকালে নাজি তার জোড়ার লাশ নিয়ে নিখোঁজ হয়ে গেল। সব জায়গায় খোঁজলাম। সবার কাছে তার কথা জিজ্ঞেস করলাম, সবই চিল নিষ্ফল। নাজি কি আমার সাথে আড়ি নিয়েছে, নাকি মরে গেছে, নাকি তার ভালবাসার খোঁজে গেছে, তাহলে তার মৃত্যুর কী হয়েছে?
এক রাতে সেই নর বিড়ালের ওয়াও ওয়াও কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। ভোর পর্যন্ত ওয়াও ওয়াও করল। পরের রাতেও সেরকম। কিন্তু ভোরে তার কোন সাড়াশব্দ নেই। তৃতীয় রাতে আবারও রিভলবারটা নিয়ে আমার জানালার সামনের সেই পাইন গাছটার দিকে গুলি করলাম। যেহেতু তার জ্বলজ্বলে চোখগুলো অন্ধকারেও দেখা যাচ্ছিল, দীর্ঘ একটা আর্তচিৎকার দিলে তারপর শব্দ থেমে গেল। সকালে গাছের নিচে তিন ফোটা রক্ত নিষিক্ত হয়ে ছিল। সেই রাত থেকে এপর্যন্ত প্রতি রাতেই সে এসে সেই স্বরে আর্ত চিৎকার করতে থাকে। অন্যদের ঘুম গাঢ় বলে শুনতে পায় না। যতই তাদের বলি আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। কিন্তু আমি তো জানি, আমি নিশ্চিত, এটা সেই বিড়ালেরই শব্দ যাকে আমি হত্যা করেছি। সেই রাত থেকে আজ পর্যন্ত আমার চোখে ঘুম আসে না। যেখানেই যাই, যে ঘরেই ঘুমাই, সমস্ত রাত এই বেচারি বিড়ালটা তার সেই ভীতিকর স্বরে আর্তচিৎকার করতে থাকে আর নিজের জোড়াটাকে ডাকে।
আজ যখন বাড়িটা খালি ছিল সেখানটাতে এসে বন্দুক তাক করলাম, যেখানে বিড়ালটা প্রতি রাতে বসে বসে চিৎকার করে। অন্ধকারে তার জ্বলজ্বলে চোখ দেখেই জানতাম যে, সে কোথায় বসে। গুলি ফুটতেই বিড়ালের আর্তচিৎকার শুনতে পেলাম এবং উপর থেকে তিন ফোঁটা রক্ত চুঁইয়ে পড়ল। তুমি তো নিজের চোখেই দেখেছ, তুমিই তো আমার সাক্ষী?
এই সময় ঘরের দরজা খুলে গেলে রোখসারে এবং তার মা ঢোকেন।
রোখসারের হাতে একটা ফুলের তোড়া ছিল। আমি দাঁড়িয়ে সালাম করলাম। কিন্তু সিয়াউস সহাস্যে বলল :
অবশ্যই জনাব মীর্জা আহমদ খানকে তুমি আমারচে ভাল চেন, পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। এরা সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, তিন ফোঁটা রক্ত পাইন গাছের নিচে তারা নিজের চোখে দেখেছে।
হ্যাঁ, আমি দেখেছি।
কিন্তু সিয়াউস উচ্চহাস্যে সামনে এসে আমার প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে রিভলবারটা বের করে এনে টেবিলের ওপর রেখে বলল :
জানেন মীর্জা সাহেব, ও শুধু ভাল গিটারই বাজায় না, ভাল কবিতাও লেখে। এবং যোগ্য শিকারীও। খুব ভাল নিশানা করতে পারে।
তারপর আমার দিকে ইশারা করল, আমিও উঠে দাঁড়িয়ে বললাম :
হ্যাঁ, আজ বিকেলে যখন সিয়াউসের কাছ থেকে স্কুলের নোট নিতে এসেছিলাম, মজা করার জন্য কিছুক্ষণ পাইন গাছটা নিশানা করেছিলাম। কিন্তু অই তিন ফোঁটা রক্ত বিড়ালটার নয়, হুতোম পেচার। জানেন তো হুতোম পেঁচা সগিরের কাছ থেকে তিনটা গম খেয়েছে তাই প্রতি রাতে এই পরিমান আর্তনাদ করে যাতে তার গলা বেয়ে তিন ফোটা রক্ত পড়ে। অথবা বিড়ালটা তার প্রতিবেশীর ক্যানারিটা ধরেছিল তাই তাকে গুলি করে মারা হয়েছে, এখান দিয়েই সে চলে গেছে। এখন একটু অপেক্ষা করুণ নতুন যে গানটা লিখেছি নিয়ে আসছি। গিটারটা হাতে নিয়ে সুর ঠিক করে এই কবিতাটা গাইতে শুরু করলাম :
আফসোস আবারও সন্ধ্যা হলো
আপাদমস্তক ধরণীর রঙ হলো কালো
সমস্ত সৃষ্টির বিশ্রামের সময় এলো
কিন্তু আমার, যন্ত্রণা-বেদনা আরো বাড়লো।
জগতের মহানন্দ হবে না বুঝি আর
মৃত্যু বিনা দুঃখ আমার হবে না প্রতিকার
কিন্তু অই কোণে পাইন তলায়
নিষিক্ত হয়ে আছে তিন ফোটা রক্ত তার।
এখানে পৌঁছতেই রোখসারের মা বিরক্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রোখসারে তার ভ্রুগুলো উপরে তুলে বলল : এতো উন্মাদ। তারপর সিয়াউশের হাত ধরে দুজনেই উচ্চস্বরে হাসতে হাসতে দরজা দিয়ে বের হয়ে গিয়ে আমার সামনে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
উঠানে পৌঁছতেই আমার লণ্ঠনের আলোতে জানালার কাচের ভেতর দিয়ে তাদের দেখতে পেলাম, একে অপরকে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close