Home অনুবাদ সারশিনা গ্রামদর্শন ও কবিতা > মাতসুও বাশো >> অনুবাদ : জাকির জাফরান

সারশিনা গ্রামদর্শন ও কবিতা > মাতসুও বাশো >> অনুবাদ : জাকির জাফরান

প্রকাশঃ June 25, 2017

সারশিনা গ্রামদর্শন ও কবিতা > মাতসুও বাশো >> অনুবাদ : জাকির জাফরান
0
0

সারশিনা গ্রামদর্শন কবিতা

ভূমিকা

মাতসুও বাশো, জাপানের এডো যুগের সবচেয়ে বিখ্যাত কবি, যাঁর দক্ষ হাতে হাইকু চরম উৎকর্ষ লাভ করে। ১৬৪৪ সালে কিওতো প্রিফেকচারে জন্মগ্রহণ করেন বাশো। স্থানীয় এক নৃপতির পুত্রের সঙ্গী হিশেবে তাঁর তারুণ্য কাটে। তার কাছেই সতেরো সিলেবলের কবিতা লেখা শেখেন তিনি। বাশো ১৬৬৭ সালে এডো (বর্তমান টোকিও) চলে যান এবং কাব্যসাধনা বজায় রাখেন। দ্রুত খাপ খাইয়ে নেন সেখানকার বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে আর ধীরে ধীরে তাঁর কবিখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র জাপানে। শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিলেও এই কাজে বেশিদিন মন বসাতে পারেননি।

যৌবনের শুরু থেকেই আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তিনি ক্রমশ বাইরের জগত থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকেন, দেখতে থাকেন অন্তর্লোকের সৌন্দর্যকে। বাশো তাঁর সারাটা জীবনই এক বিপন্ন বেদানা বোধের মধ্য দিয়ে পার করে দেন। একসময় ঝুঁকে পড়েন ধ্যানের জগতে। আত্মানুসন্ধান ও আত্মোপলব্ধির মধ্য দিয়ে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ সত্যে পৌঁছুতে চান আর এর উপায় হিসেবে বেছে নেন পৃথিবী ভ্রমণকে।

১৬৮৪ এর গ্রীষ্মে তিনি তাঁর দুনিয়া-দর্শন শুরু করেন। তাঁর এই পর্যটন শুরুর আগের দিনগুলো আত্মানুসন্ধানের এক চূড়ান্ত মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। একে একে পার্থিব সকল কিছুর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর নিজের সত্ত্বাটুকু ছাড়া আর কিছুই পরিত্যাগের বাকি ছিল না। অবশেষে এটাকেও তিনি ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাঁর মতে, যা-ছাড়া তিনি তাঁর প্রকৃত পরিচয়, যাকে তিনি “চিরন্তন কাব্যসত্ত্বা” বলে অভিহিত করতেন, পুনরুদ্ধার করা সম্ভব ছিল না।

অনেক ছোট বড় ভ্রমণের সমন্বয়ে সংঘটিত এই মহাভ্রমণযজ্ঞ তাঁর লেখা ‘The Narrow Road to the Deep North and Other Travel Sketches’ বইতে লিপিবদ্ধ আছে। বইটি কয়েকটি ভ্রমণ কাহিনির সমষ্টি, যেখান থেকে একটি অধ্যায় তীরন্দাজের পাঠকদের জন্য এখানে ভাষান্তরিত করে উপস্থাপন করা হলো।

সারশিনা গ্রাম দর্শন

শরতের হাওয়া আমার হৃদয়ে একটি আকাঙ্ক্ষা পুরে দিলো। অবাসুত পর্বতের মাথা ছুঁয়ে-ওঠা পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে  ব্যাকুল হয়ে উঠল মনটা। এটা সারশিনা গ্রামের সেই বন্ধুর পাহাড়, যেখানে, সুদূর অতীতে, গ্রামবাসীরা তাদের বয়োঃবৃদ্ধা মা-দেরকে পাথরের মধ্যে ফেলে আসত। একই বাসনাচ্ছন্ন আরেকজন মানুষ ছিল, আমার ভক্ত, এতসুজিন, যে এই ভ্রমণে আমার সঙ্গী হয়েছিল, আর ছিল আমার বন্ধু কাকেই কর্তৃক পাঠানো এক ভৃত্য যার কাজ ছিল যাত্রাপথে আমাকে সাহায্য করা। কারণ, কিসো রোড একদম খাড়া ও বিপজ্জনক, চলে গিয়েছিল গ্রামের দিকে এবং এই রাস্তাটি কয়েকটি উঁচু পাহাড় অতিক্রম করে সুদূরের দিকে ধাবমান ছিল। আমরা সকলেই একে-অন্যকে সাহায্য করতে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করলাম, কিন্তু যেহেতু আমাদের কেউই অভিজ্ঞ পর্যটক ছিলাম না, ভুল সময়ে ভুল কাজটি করে করে আমারা অস্বস্তি বোধ করতে থাকলাম এবং ভুল করতেই থাকলাম। এই ভুলগুলো অবশ্য বেশ হাস্যরসের উদ্রেক করল আর সামনে এগিয়ে যেতে আমাদেরকে সাহস দিল।

রাস্তার একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এক পুরোহিতের সঙ্গে দেখা হল আমাদের—সম্ভবত ষাট বছরেরও বেশি বয়স তার—বাঁকা পিঠে প্রচণ্ড ভারী বোঝা নিয়ে ছোট্ট আর নিঃশ্বাস-না-ফেলা কদমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিলেন তিনি, মুখে বিষণ্ণ ও গুরুগম্ভীর ভাব ফুটিয়ে তুলে। আমার সফরসঙ্গীরা তাকে সমবেদনা জানালো। তারা তাঁর কাঁধ থেকে বোঝাটি নামিয়ে আমার ঘোড়ার পিঠে অন্যান্য জিনিষপত্রের সঙ্গে রেখে দিলো। ফলে আমাকে বসতে হলো বড় এক স্তূপের ওপর। আমার মাথার ওপর পাহাড়, পাহাড়ের ওপরেও পাহাড়। আমার বাম পাশে এক শিলাখণ্ডের প্রকাণ্ড খাড়া পিঠ হাজার ফুট নিচে ফুটন্ত নদীতে গিয়ে মিলেছে, এর মধ্যবর্তী কোথাও একটুও সমতল ভূমি না রেখেই, যাতে আমি উঁচু জিনে বসে ঘোড়ার প্রতিটি ঝাঁকুনিতে প্রপীড়িত বোধ করি।

আমরা অনেক বিপজ্জনক স্থানের মধ্য দিয়ে এগুতে থাকলাম, যেমন কাকেহাসি, নেজামে, সারু-গা-বাবা, তাছিতগে— প্যাঁচানো ও উঁচু-নিচু রাস্তা ধরে এগোতে থাকলাম, আর এমন অনুভূতি হল যে আমরা যেন মেঘের মধ্যে আমাদের পথ হাতড়ে বেড়াচ্ছি। আমি আমার ঘোড়াকে পরিত্যাগ করে টলমল পায়ে হাঁটতে থাকলাম, কারণ এই উচ্চতায় আমার মাথা ঝিমঝিম করছিলো আর ভয়ে মানসিক ভারসাম্যও ঠিক রাখতে পারছিলাম না আমি। এদিকে ভৃত্যটি এমনভাবে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসলো যে মনে হচ্ছিল যেন বিপদের কথা সে চিন্তাই করছে না। প্রায়ই সে ঘুমে ঢুলু ঢুলু করছিলো এবং এমন অবস্থা হচ্ছিল যেন মাথা নিচের দিকে দিয়ে পাহাড়ের খাড়া ধরে নিচে পড়ে যাবে। যতবারই আমি তাকে মাথা ফেলতে দেখেছি, ততবারই হতবুদ্ধি হয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়েছি। অবশ্য অন্যভাবে ভাবতে  গেলে, আমার মনে হল যে আমরা প্রত্যেকেই ছিলাম ঐ ভৃত্যের মতো, যে কিনা লুকানো বিপদের প্রতি পুরোপুরি অন্ধ থেকে ঝড়ো আবহাওয়ায় পৃথিবীর সদা-পরিবর্তনশীল শৈলশ্রেণির মধ্য দিয়ে অতি কষ্টে পার হচ্ছে তার পথ। আর বুদ্ধ যে উপর থেকে আমাদেরকে পর্যবেক্ষণ করছেন, তিনিও আমাদের ভাগ্য সম্পর্কে একই সন্দেহ পোষণ করছেন, যা আমরা করেছিলাম ভৃত্যটির নিয়তি সম্পর্কে।

যখন রাত নামলো, আমরা একটি ছোট্ট ঘরে থাকার ব্যাবস্থা করে নিলাম। বাতি জ্বালিয়ে হাতে তুলে নিলাম কালি ও কলম, আর বন্ধ করলাম আমার চোখ, চেষ্টা করলাম দিনে দেখা দৃশ্য ও কবিতাগুলো স্মরণ করতে। পুরোহিত যখন দেখলেন আমি ছোট একটুকরো কাগজের ওপর নুয়ে পড়ে মাথা চাপড়াচ্ছি, তিনি নিশ্চয়ই ভেবে নিলেন যে আমি ভ্রমণজনিত দুশ্চিন্তায় ভুগছি। ফলে তিনি আমাকে তাঁর তরুণ বয়সের তীর্থযাত্রার বিবরণ দিতে শুরু করলেন, শুনাতে লাগলেন পবিত্র সূত্র থেকে নীতিগর্ভ রূপককাহিনী, আর তিনি যেসব অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন সেসব গল্প। কিন্তু হায়! এতে আমার কবিতা লেখায় ব্যাঘাত ঘটল—একটা কবিতাও লিখে উঠতে পারলাম না আমি। এদিকে, ঠিক এই মুহূর্তে, ঝুলন্ত পাতা বেয়ে বেয়ে, দেয়ালের ফাটলের মধ্য দিয়ে জ্যোৎস্না আমার কক্ষের একপ্রান্ত স্পর্শ করল। কাঠের দোলকের শব্দ এবং বন্য হরিণকে ধাওয়াকারী গ্রামবাসীদের হৈ হুল্লোড়ের প্রতি কান পাততেই আমি আমার হৃদয়ে অনুভব করলাম যে শরতের নিঃসঙ্গতা এতদিনে দৃশ্যপটে পরিপূর্ণতা পেয়েছে। আমি আমার সফর সঙ্গীদেরকে বললাম, ‘চলো আমরা চাঁদের উজ্জ্বল আলোকচ্ছটার নিচে বসে পান করি।’ কথা বলতে না বলতেই বাড়ির মালিক কয়েকটি পেয়ালা নিয়ে আসলেন। পেয়ালাগুলো এতই বড় ছিল যে সেগুলোকে আর পরিমার্জিত দেখাচ্ছিল না, আর ওগুলো ছিল একধরনের অমসৃণ স্বর্ণের বার্নিশ দিয়ে সাজানো, অতি মার্জিত শহুরেরা এসব স্পর্শ করতে হয়তো দ্বিধা বোধ করেন। তবে এক দুর্গম গ্রামাঞ্চলে এ-ধরনে জিনিসপত্র দেখতে পেয়ে আমি যারপরনাই খুশি হলাম, আর ভাবলাম পেয়ালাগুলো মুক্তাখচিত দুষ্প্রাপ্য নীল পেয়ালাদের চাইতেও বেশি মূল্যবান।

 

এক দূর গ্রামের আকাশে

প্রকাণ্ড এক চাঁদ দেখে,

ভাবলাম সাজিয়ে দিই তাকে

স্বর্ণ-বার্নিশের কাজ দিয়ে।

 

পাহাড়ের খাড়া পিঠ বেয়ে

শিলায়িত সেতুর ওপর

ঝুলে আছে সবুজ দ্রাক্ষালতা,

দেহ আর মনের মিলন।

 

রাজকীয় প্রাচীন ঘোড়ারা

নিশ্চয়ই অতিক্রম করে গেছে

এই ঝুলন্ত সেতুটি

কিয়োতো যাওয়ার পথে।

 

সেতুটির মাঝখানে,

চোখ পিটপিট করাও

অসম্ভব মনে হল

যখন কুয়াশা উঠে গেল।

(এতসুজিন কর্তৃক লিখিত)

 

মাউন্ট অবাসুত এ লেখা কবিতা

কল্পনায়, আমি

আর এক বৃদ্ধা নারী

অশ্রু নিয়ে বসেছিলাম পাশাপাশি

মাতাল চাঁদের প্রশংসা করব বলে।

 

দিনে দিনে ষোল দিন

হয়ে গেল চাঁদের বয়স,

তথাপিও পড়ে আছি আমি

সারশিনা গ্রামের প্রান্তরে।

 

তিন দিন কেটে গেল,

আর তিনবার দেখা হল

উজ্জ্বল চাঁদের মুখ

মেঘমুক্ত আকাশে।

(এতসুজিন কর্তৃক লিখিত)

 

একটি হলুদ ভেলেরিয়ান

সরু পত্রবৃন্তসহ

দাঁড়িয়ে রয়েছে

শিশিরে সজ্জিত হয়ে।

 

মুলার উষ্ণতায়

আমার জিহ্বা পুড়ে গেল,

আর হৃদয় বিদীর্ণ হল

হেমন্ত বাতাসে।

 

কিসো পর্বতমালা থেকে

বাদামি ঘোড়ার রঙই হবে

আমার উপহার

শহুরে মানুষদের প্রতি।

 

বিদায় দিয়ে দিয়ে

বিদায় বলে বলে,

কিসো পাহাড়ের হেমন্তে

আমি হেঁটেছিলাম।

 

জেনকজি মন্দিরে লিখিত একটি কবিতা

 

চারটি তোরণ

আর চারটি পৃথক উপদল

এক হয়ে ঘুমায়

উজ্জ্বল চাঁদের নিচে।

 

আচমকা ঝড় নামে

আসামা পর্বতে,

পাথর উড়িয়ে মারে

আমারই পুরোটা শরীরে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close