Home কবিতা সারাজাত সৌম / ১০টি নতুন কবিতা ও কবিতাভাবনা > পাঠ-প্রতিক্রিয়া / খালেদ হামিদী
0

সারাজাত সৌম / ১০টি নতুন কবিতা ও কবিতাভাবনা > পাঠ-প্রতিক্রিয়া / খালেদ হামিদী

প্রকাশঃ February 15, 2017

সারাজাত সৌম / ১০টি নতুন কবিতা ও কবিতাভাবনা > পাঠ-প্রতিক্রিয়া / খালেদ হামিদী
0
0

সারাজাত সৌম-র ১০টি নতুন কবিতা ও কবিতাভাবনা এবং

খালেদ হামিদীর পাঠ-প্রতিক্রিয়া

 

কালো ষাঁড়

আষাঢ় এলেই আমি কালো ষাড়ের গোমড়া মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। আর তুমি উচ্ছন্ন হাওয়া ডুমুরের কাছে- জলের সংগীত। শরীরে শম্পা বাজে। বীণা-বর্শাতে গেঁথে চলে গেছে যে শিকারী, সেও কি কদম চেনে? গাছেদের নাচ- পোকাদের কথন- মেঘের ভাঁজ!

অথচ ঠোঁটের উপর ঝগড়া করে পরিচিত মেয়েটি- পাখিদের মতো। উড়ে যায়- যায় কালো তিলের কাছে অনবরত। যেন এই অপরাহ্ণ মেঘ- কালো পাখির সংকলন।

 

হলুদ পাখির জামা

 

চোখটাই চতুর চামেলি- ফুটে ওঠা নিনাদ, যে কোনো দ্রুতযানের মতো তোমাকে উড়িয়ে নিয়ে যায় নিরাভরণ কাচের কাছে- টুকরো টুকরো হাওয়া। আর উল্কি আঁকা পথ পড়ে থাকে কার্পাস ফলের পাশে!

একদিন হলুদ পাখির জামা থেকে যে কথা ভেসে গেছে সোনালু দীঘির কাছে, তারই জল-মাছের দঙ্গল উড়ে যায় আজ পশ্চিম আকাশে।

অথচ সব আঙুল আঁকড়ে ধরেই হতে পারে অর্ণব সেঁতু- ঋতুর গহনা তোমার ডুমুরের কাছে।

 

ভায়োলিন

বেদনা পেঁচার চোখের মতো স্থির। যদিও তোমার উপর আমার কোনো অভিজ্ঞতা নেই! তবুও যখন শরীরে ফুটে ওঠে পিংপং বল আর চাঁদের মায়া দূরবর্তী ছবির মতো- তখন আমি মাতাল সেই সব রাত্রির পেছনে, যারা তোমাকে পাখির মতো ভাবে- ভাবে ভায়োলিন।

 

স্মৃতি

দেয়ালে ঝুলে থাকা স্থির গাভী থেকে ছুটে আসে হাম্বা রব- বালকের বাঁশি! পুরনো পুতুল, পিতলের বক ফেলে গেছে যে সকাল দূরের আকাশে- তারই ছায়া বাবার সমান।

আঙুলে বেঁধে আছি ধ্বনি ও ধবল ঘোড়া! পথে ফেলে বসন্ত- কোকিলের কালো রাশি। অথচ যে কোনো কদমের পাশে মা আমার এখনো হলুদাভ ছবি।

আর বনের বাঁকে বাতাস- বাতাবি লেবু ঘুমিয়ে পড়ে রোজ কুয়াশায়। যেন শীতের আঙুল- রোদের রুবাই টোকা মারে আকাশে- মস্তিষ্কে!

 

শিস দাও শৈলী

দু-আঙুলে শিস দাও শৈলী, দেখো শৈবাল ঘেরা ট্রফিকের শরীর থেকে সংকেত উঠে এসে থামিয়ে দিয়েছে তোমার ইশারা আর যতো কৌশল- জেগে থাকা পিতলের ফোয়ারা।

দেখো জলের ঝগড়া থেকে উড়ে যাচ্ছে মুখ- মৌমাছি, মাতালের সুনসান গান আছড়ে পরছে দেয়ালে- ক্যানভাসে! তবে আয়নায় জেগে থাকা এ কোন চাঁদ- কানাড়া!

মাথা ফুঁড়ে জেগে উঠেছে গাছ- ফুল ও ফলে। অথচ আমি জানি আঙুল ছেড়ে তুমি ধরে আছো লাল ট্রেন, ঈগল- ইশানে-নৈঋতে ছড়িয়ে দিয়েছো দোতারা।

আজ দেহ সংকেত পাঠালেও দেখি মূঢ় সবুজ পাখনা ভেঙে পরে আছে একজোড়া কালো করুণ পায়রা!

 

মন মুয়াজ্জিন

আমি তোমার ভেতর এমন ভাবে আছি

যেন একটা শয়তান-

অথচ এইমাত্র সে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে

মসজিদের দিকে…

 

দুলে উঠছিলো মৃদু আয়না

কোথাও বের হলে আমি হারিয়ে যাবো, এই ভয়ে থাকি। অথচ আম্মা সারাদিন ঘরে- মেশিনে কতো কি করেন! এই যেমন তিনি আমার মুখের উপর ফুল-পাখিদের ছবি এঁকে দেন কখনো বা আব্বার সুদূর প্রেমের হাসি।

যেদিন তোমার ওড়না থেকে উড়ে এসেছিলো মৌমাছি, আমি সেদিন অংক করছিলাম বাতাসের চুল নিয়ে- চোখ নিয়ে তামাশা আর দিনারের দিনপঞ্জিগুলো দুলে উঠছিলো মৃদু আয়নায়।

জানি খেজুর বনেও খচ্চর থাকে, থাকে  প্রেমের কৌশল- আর আঙুলের রেখা  থেকে ছিটকে যায় দেহ ও দেহাতি গান…

 

পরীবাগ

মাথার ভেতর আমার-ই যমজ তাকে ফেলে এসেছি পরীবাগ ব্রিজে;

রাত দুটো- মায়ার প্যাকেটগুলো সিঁড়ি ভাঙছে।

 

চারপাশে রমণীর মতো দাঁড়িয়ে দালান- হাওয়ায় ভেসে যায় সাকুরা

অজস্র মৃদু আলো রাত্রির বাতাস মাথায় নিয়ে।

 

সুরভি

আমার নোখের নিচে যে রহস্য নদী, তার গভীরে এক করুণ মাছ সাঁতরে বলে- মৃত্যু বড় নীল! নীলাদের উঠোনে তখনো জলদি শরীর- পাতা বাহারের রং নিয়ে দেখো পৃথিবী কেমন লাট্টুর মতো ঘোরে!

আর বেবিদের ইস্কুলে এখন ঘণ্টা বাজলেই টিয়া রঙের টিপগুলো ট্রলার হয়ে যায়! অথচ শাড়ি থেকে জল শুকায়নি এখনো ভোরের, যেন নারীরা এক একটি পারফিউম।

মসজিদের পাশে দাঁড়ানো বৃদ্ধ লোকটির মতো আমাকেই ভাবি, যেন সব সোনালি বোতল- সুরভি আমার কানের কাছে এসে বলে দেয় হুরদের বায়না।

 

দুঃখবোধ

যে কোনো দুঃখবোধ থেকে উড়ে গিয়ে একটি আলো তোমার মুখের উপর পরলো- দুধ সাদা দিন! যেন গাভীর ওলান থেকে মেঘ- শিশু সাঁতরে পার হয়ে যাচ্ছে আকাশ।

দেখো তুলো ভরা ইস্টিশন- পাখিরাও ভূ-জাহাজ! ছায়ার স্রোতে ভেসে গিয়ে কেমন খেলা করছে শাপলা- সিঁকি ও আধুলিতে! আয়না কেটে যাচ্ছে জল- মুখের আভা।

কেবল মোহমাছটি জানে, যে কোনো ফাল্গুন হলুদ দিনের মতোই- খোঁপা থেকে ফুল সরিয়ে নিলেই তুমি উড়ন্ত প্রেম, মাৎসর্যের চতুরতা।

 

সারাজাত সৌম-র কবিতাভাবনা

বোধ করি আশ্চর্য চুপ থাকা মানেই ভাব আর তা থেকেই হয় ভাবনার উদয়, সে নানা দিক থেকে নানা ভাবে আসে এবং আসবেই নানা কিছুর উপর। কবিতার ব্যাপারটাও ঠিক তেমনি। আলো আসে- আলো যায় গোছের! তাকে ধরতে যা যা প্রয়োজন তার সবকিছুই কিন্তু আমাদের চোখের উপর নাই। তার মানে ধার করতে হবে যে কোনো কিছুর উপর। সেটা কল্পনা হোক, ভাষা হোক, কোনো চিহ্ন হোক বা তারও অধিক কোনো কিছু। আসলে কবিতা এমনই এক বিভ্রম, যাকে আঙুল দিয়ে টোক দিলেও যেমন সরে না ঠিক তেমনি ফেলে দিলেও ফেলা যায় না। বস্তুত সে মাথার ভেতরই থাকে ভাবনা বা কল্পনার বিষয় হিসেবে। ধরুন আমি এক-পাঅলা একটা মানুষ দেখে এসেছি রাস্তায় কিন্তু এটা আমি কিভাবে লিখবো, তখনই আমি ভাবি এক-পাঅলা শালিখের কথা। মানে এই যে কল্পনা বা ছবি যেটা আমার মাথায় আছে কিংবা এটা আরো নানাভাবেই হতে পারে। ‘এক পায়ে ভর করা পঙ্কিল জীবন।’ এরকম আরো বহু কিছু, বহু বিষয়। তো, আমি জানি এটা সব মানুষের ভেতরই থাকে কিন্তু দেখার বা বলার ভাষা কারো কারো থাকে আবার থাকে না। আর পৃথিবীতে প্রতিটি সৃষ্টিই সর্বজনীন এবং সব ভাষার, সব মানুষের। কিন্তু এটাও সবার হাতের কাছে থাকে না বা বুঝে উঠতে পারে না। আর বিশেষ করে কবিতা! যে যাই বলুক আর যেভাবেই বলুক, ভাবুক যে মতাদর্শ নিয়েই তার পেছনে যে কারণ থাকে সেটা প্রথম ভাবনা থেকেই আসে। আসলে আমি মারা যাবো কিন্তু মরে তো যাই না ঠিক সময় না হওয়া পর্যন্ত। তেমনি কবিতা ততক্ষণই মাথার ভেতর থাকে যতক্ষণ না আপনি তাকে লিখতে পারছেন আপনার ভাষায় বা আপনার কল্পনায়। এটা এমন এক বাস্তবতা যা কবিকে তাড়িত করে আবার অলসও করে দেয়। আর সেইসব দুর্লভ সময় যা আপনি এবং আপনারা ফেলে এসেছেন হাজার বছর আগে কিংবা পৃথিবীরও আগে, ঠিক যেন একজন কবি স্রষ্টার পাশে বসে এই পৃথিবীটাকে শাসন করছে এখনো।

 

পাঠ-প্রতিক্রিয়া / খালেদ হামিদী

এই সময়ের কবিতাকে বিচিত্র চারিত্র্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন গুচ্ছে ভাগ করা যায়। তবে লক্ষণীয়, শূন্য ও চলমান দ্বিতীয় দশকের কবিদের সকলেই ছন্দ ও রাজনীতিচেতন বা দর্শন সচেতন নন। সারাজাত সৌমের এই দশটি কবিতাকেও ব্যাকরণিক শৃঙ্খলা ও বিশেষ চেতনানিরপেক্ষ ধরন বলে ধরে নেয়া যায়। তাহলে এই দুটি অভাবযুক্ত রচনায় কবিতা কোথায়? সারাজাতের কাব্যিকতা তাঁর সৌন্দর্য সৃজনেই বিধৃত হয়ে আছে, যেমন :

(১)    আষাঢ় এলেই আমি কালো ষাঁড়ের গোমড়া মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। আর তুমি উচ্ছন্ন হাওয়া ডুমুরের কাছে-জলের সংগীত। শরীরে শম্পা বাজে। বীণা-বর্শিতে গেঁথে চলে গেছে যে শিকারী, সেও কি কদম চেনে?  (কালো ষাঁড়)

(২)    একদিন হলুদ পাখির জামা থেকে যে কথা ভেসে গেছে সোনালু দীঘির কাছে, তারই জল-মাছের দঙ্গল উড়ে যায় আজ পশ্চিম আকাশে। (হলুদ পাখির জামা)

(৩)   বেদনা পেঁচার চোখের মতো স্থির। (ভায়োলিন)

(৪)    দু-আঙুলে শিস দাও শৈলী, দেখো শৈবাল ঘেরা ট্রাফিকের শরীর থেকে সংকেত উঠে এসে থামিয়ে দিয়েছে তোমার ইশারা আর যতো কৌশল, জেগে থাকা পিতলের ফোয়ারা। […] আজ দেহ সংকেত পাঠালেও দেখি মূঢ় সবুজ পাখনা ভেঙে পড়ে আছে একজোড়া কালো করুণ পায়রা! (শিস দাও শৈলী)

(৫)   কোথাও বের হলে আমি হারিয়ে যাবো, এই ভয়ে থাকি। অথচ আম্মা সারাদিন ঘরে, মেশিনে কতো কি করেন! এই যেমন তিনি আমার মুখের উপর ফুল-পাখিদের ছবি এঁকে দেন কখনো বা আব্বার সুদূর প্রেমের হাসি। (দুলে উঠেছিলো মৃদু আয়না)

(৬)   আমার নোখের নিচে যে রহস্য নদী, তার গভীরে এক করুণ মাছ সাঁতরে বলে, মৃত্যু বড় নীল! নীলাদের উঠোনে তখনো জলদি শরীর, পাতা বাহারের রং নিয়ে দেখো পৃথিবী কেমন লাট্টুর মতো ঘোরে!

আর বেবিদের ইস্কুলে এখন ঘণ্টা বাজলেই টিয়া রঙের টিপগুলো ট্রলার হয়ে যায়! অথচ শাড়ি থেকে জল

শুকায়নি এখনো ভোরের, যেন নারীরা এক একটি পারফিউম। (সুরভি)

(৭)    যে কোনো দুঃখবোধ থেকে উড়ে গিয়ে একটি আলো তোমার মুখের উপর পড়লো, দুধ সাদা দিন! যেন গাভির ওলান থেকে মেঘ-শিশু সাঁতরে পার হয়ে যাচ্ছে আকাশ। […] কেবল মোহমাছটি জানে, যে কোনো ফাল্গুন হলুদ দিনের মতোই, খোঁপা থেকে ফুল সরিয়ে নিলেই তুমি উড়ন্ত প্রেম, মাৎসর্যের চাতুরতা। (দুঃখবোধ)

নান্দনিক চিত্রকল্প-দৃশ্যকল্প গদ্য-কবিতার আঙ্গিকে বিস্তৃতকরণের মাধ্যমে সারাজাত পাঠকের অনুভবে ও দৃষ্টির অভিজ্ঞতায় শৈল্পিকতাই শুধু সঞ্চারিত করেন না, চলমান সভ্যতার সঙ্গে জড়িয়ে দেন পাঠককে। ‘শৈবাল ঘেরা ট্রাফিকের শরীর থেকে সংকেত উঠে এসে থামিয়ে’ (ওপরের ৪-সংখ্যক উদ্ধৃতি) দেয় তাঁর প্রেয়সীর ইশারা। সভ্যতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এখানে দ্বান্দ্বিক। তাছাড়া চলাচলের স্বাধীনতাও খর্বিত কিংবা টলায়মান দেখতে পাওয়া যায় উপর্যুক্ত ৫ম কবিতাংশে। ঘরের বের হয়ে তিনি মায়ের কথা ভাবেন একেবারে মর্ম ছুঁয়ে যাওয়া ভাষায় : ‘এই যেমন তিনি আমার মুখের উপর ফুল-পাখিদের ছবি এঁকে দেন কখনো বা আব্বার সুদূর প্রেমের হাসি।’ এভাবে স্মৃতিকাতরতা, অশ্রুত হাহাকার,  হারানো স্নেহ, দুঃখবোধ, প্রেম, বিরহ, সমাজ-সভ্যতার সঙ্গে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক এবং খানিকটা অস্তিত্বের সংকটও সারাজাতের এই দশটি কবিতায় ভাষারূপ পেয়েছে নৈসর্গিক অনুষঙ্গের সঙ্গে উপমিত করে কিংবা মানবজীবন ও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত মেটাফরের আশ্রয়ে।

সারাজাত সৌমের সৃজনশীলতা আরো ত্বরান্বিত হোক, অব্যাহত থাকুক, এই প্রত্যাশা পাঠকের।

 

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close