Home অনুবাদ সালমান রুশদি > দ্য গোল্ডেন বাও >> ছোটগল্প >>> রনক জামান অনূদিত

সালমান রুশদি > দ্য গোল্ডেন বাও >> ছোটগল্প >>> রনক জামান অনূদিত

প্রকাশঃ April 22, 2018

সালমান রুশদি > দ্য গোল্ডেন বাও >> ছোটগল্প >>> রনক জামান অনূদিত
0
0

সালমান রুশদি > দ্য গোল্ডেন বাও >> ছোটগল্প >>> রনক জামান অনূদিত

 

সাক্ষাৎকার যেভাবে এগুচ্ছিল তাতে মেনেই নিয়েছিলাম যে চাকরিটা আমার হচ্ছে না। এরকম অভিজ্ঞতা আমার সঙ্গে এতবার ঘটেছে যে এখন এ নিয়ে আমার মধ্যে একধরনের অতিপ্রাকৃত সংবেদনশীলতা কাজ করে। যেভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে একজন স্নাইপার অবস্থান নিয়ে থাকে, ঠিক তেমনি সাবধানী, ফরমাল চেহারা তাদের, যেখানে স্পষ্ট লেখা থাকে আমার পরবর্তী ব্যর্থতার ইঙ্গিতটুকু।

প্রথম প্রথম এই ব্যর্থতার জন্য নিজেকেই দোষারোপ করতাম- হয়ত আমার জ্যাকেট ঠিক নেই, টাইতে ময়লা দাগ ছিল, দুবার তাদের প্রশ্নের মাঝে ব্যাঘাত ঘটিয়েছি, এ কারণেই আমাকে বাদ দিয়েছে ওরা। এরপর আমার ত্রুটিগুলো সংশোধনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। আমার পোশাকের অসাবধানতা, অতি কৌতূহল, যা বলা হয় তাতেই হ্যাঁ বলে অতি ভদ্রতা দেখানোর আদিখ্যেতা সব শুধরে নিয়েছি। পরে প্রয়োজন মাফিক সংযত, পরিপাটি ও ভদ্র হয়ে নিজেকে উপস্থাপন করতাম। অথচ ফলাফলের কোনো পরিবর্তন হতো না।

তাই উদ্ধত আচরণ দেখিয়ে নিজেকে উপস্থাপনের চেষ্টা চালালাম এরপর। ইন্টারভিউ রুমে ঢুকলাম এলোমেলো চুল নিয়ে, জুতোর ফিতে না বেঁধে, প্যান্টের জিপার অর্ধেক নামিয়ে। ঢুকেই অবজ্ঞাসূচক হাসি দিতাম ডেস্কের অন্যপাশে বসে থাকা কেতাদুরস্ত, ভাবলেশহীন, শত্রুভাবাপন্ন লোকটির দিকে। জিজ্ঞাসা করতাম তার কোম্পানির সমস্যা কোথায়, কিভাবে তাদেরকে উদ্ধার করতে পারি। মাঝে মাঝে কথাচ্ছলে তার নাকের নিচ দিয়ে তুড়ি বাজিয়ে চলতাম। কিন্তু ভাগ্য তাতেও সহায় হলো না।

পরের ইন্টারভিউতে আমি হিপোক্র্যাসিকে পুঁজি করে কথা বলার চেষ্টা করলাম। প্রশ্নকর্তাদের কাছে বাক্যবাগীশ, মুখস্থ, বিবৃতিসূচক বয়ান উপস্থাপন করতে লাগলাম। এই মহান কাজগুলোর প্রতি আমার শাশ্বত অঙ্গীকার পেশ করলাম, কতটা নিষ্ঠার সাথে ফটোকপির কাগজগুলো চালান করব, হাড্ডি-সদৃশ কুকুরের বিস্কুট প্যাকেটজাত করব, ফার্মের জিনিসপত্র বিক্রয় করব, কমলার সিন্থেটিক জুস বোতলজাত করব, ইত্যাদি। আমার চোখ দুটো নিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিসূচক দীপ্তিতে জ্বলজ্বল করে উঠতো। এক-একটা মহান কাজের জন্য আমি কতটা উৎসর্গীকৃত-প্রাণ, তা প্রমাণ করবার সুযোগ চেয়ে স্বপক্ষে করজোরে দাঁড়িয়ে থাকতাম।

কিন্তু সেই চাকরিটাও আমাকে দেয়া হলো না।

আবার হতাশ হলাম। তবু আমি যে এখনো বেঁচে আছি তা প্রমাণ করতে সবখানে ইন্টারভিউ দেয়াটা অব্যাহত রাখলাম কোনোকিছু প্রত্যাশা না করেই। এরপর আমার নতুন প্রশ্নকর্তার নরম মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। সেই একই মুখ, যাকে এরকম শ’খানেক ডেস্কের ওপাশে দেখে এসেছি, এরকম শ’খানেক সাদা শার্টের উপরে স্থাপিত মুখ। আমি যে ইন্টারভিউতে আবার ব্যর্থ হতে চলেছি, তার নিশ্চয়তাস্বরূপ বরাবরের মতোই তিনিও আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আর আমার মাথার ভেতর নিজের ত্রুটিগুলো উঁকি দিতে থাকল। তখনি নিজের উপর রাগ হলো প্রচণ্ড, ব্যাপারটি আগে কেন খেয়াল করিনি!

সেই একই মুখ! আমার প্রতিটি ইন্টারভিউ এই একই মুখ গ্রহণ করে আসছে। এরকমটা তো হবার নয়, কিন্তু হচ্ছে। আমি নিশ্চিত। শেষমেশ, আমি বিজয়ীর ভঙ্গিতে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আরে আপনিই তো, তাই না?’

‘মাফ করবেন?’ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল মুখটি।

আমি তাকে প্রসঙ্গ থেকে সরতে দিলাম না। ‘আপনিই প্রত্যেকবার আমার ইন্টারভিউ নিয়েছেন,’ আমি বললাম, ‘আমার ধারণা নির্ভুল, আমি জানি।’

তার মুখভঙ্গি পালটে গেল, ধূর্ত আর ব্যাঙ্গাত্মক এক চাহনি দিল। ‘হ্যাঁ,’ স্বীকার করল, ‘তোমরা অধিকাংশ গর্দভরা কখনোই টের পাও না।’

‘কিন্তু কেন?’

সে আমার প্রশ্ন এড়িয়ে গেল প্রথমে। ‘তোমাকে বলছি তাহলে,’ তারপর বলল লোকটি। ‘তোমরা আমাকে খুব ব্যস্ত একটা জীবন দিয়েছ। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কাজটি আমার জন্য বেশিই সহজ; তবে আমি চ্যালেঞ্জ পছন্দ করি। আমার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করো। তোমরা পরবর্তীতে কোথায় কোথায় ইন্টারভিউ দিতে যাবে, তার প্রতিটি পদক্ষেপ আমাকে আগে-ভাগে জেনে রাখতে হয়। সব সময়ই একধাপ এগিয়ে থাকতে হয় তোমাদের চাইতে। নিখুঁত ব্যবস্থা করতে হয়, যাতে আমি সব সময়ই তোমাদের ইন্টারভিউ নিতে এই ডেস্কগুলোর এপাশে হাজির থাকতে পারি। এমনও রাত যায় যখন তোমাদের জন্য প্রস্তুত হতে আমাকে নির্ঘুম কাটাতে হয়। এই প্রশংসাটুকু আমাকে নিতেই হচ্ছে।’

আমার জানতে ইচ্ছে হলো, কিভাবে সে এই প্রস্তুতিটা সে নিয়ে থাকে বা অন্য ব্যাপারগুলো ম্যানেজ করে থাকে। কিন্তু আমি নিশ্চিত, লোকটি এই প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যাবে। তাই শুধু বললাম, ‘এখন আপনার মুখোশ আমি খুলে ফেলেছি, আমার ধারণা আপনি এবার বিরতি দেবেন, আর…’

‘বাজে বোকো না,’ তুড়ি মেরে বলল প্রশ্নকর্তা। ‘আমার কাজের কোনো তারতম্যই ঘটবে না।’

‘আপনি ব্যর্থ,’ শাসিয়ে বললাম। ‘এবার আপনি আপনার চাকরি হারাবেন। প্রতিবার যেভাবে আমাকে খালি হাতে ফিরতে হয়, আপনার বেলায় এবার তেমনই হবে, সম্ভবত এরপর আপনাকেই ইন্টারভিউ দিয়ে যেতে হবে নতুন চাকরির জন্য!’

‘ঠিক আছে, এই ইন্টারভিউটা এখানেই শেষ হোক,’ সে বলল আমাকে। তার মুখ আবার মসৃণ আর নির্বিকার হয়ে উঠল। ‘এবার আসুন আপনি, আমার ধারণা, আপনার আর এখানে ভালো লাগবে না, মিস্টার…মিস্টার…’

‘বিদায়,’ উল্লাসিত গলায় বললাম, তার পরাজয় ঘটেছে এই নিশ্চয়তা নিয়ে ভেতরে ভেতরে অমানুষিক আনন্দ পেলাম।

পরবর্তী ইন্টারভিউয়ের দিন, আমি তখনো উল্লসিত, পরিপাটি পোশাক পরলাম (সিদ্ধান্ত নিয়েছি আগের ভদ্রোজনচিত কৌশলে ফিরে যাব, যেহেতু রহস্যের মীমাংসা হয়ে গেছে), একটা চাকরির জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ইন্টারভিউ দিতে গেলাম আরেক কোম্পানিতে। আমাকে যখন ডাকা হলো, ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে যেন নাকে একটা ঘুষি লাগার মতো অবস্থা হলো।

‘নেক্সট,’ একটা কণ্ঠ আমাকে ডাকল, আর আমি অর্ধেক দরজা খুলে প্রবেশ করামাত্রই বুঝতে পারলাম, আমি শেষ। সেই লোকটিই বসে আছে ডেস্কের ওপাশে, এবার আরো ভাবলেশহীন মূর্তিমান চেহারা। এমনকি কোনো হাসি পর্যন্ত নেই, আপাদমস্তক প্রফেশনাল ভঙ্গি, আমার কাগজপত্র দেখতে দেখতে নিজের খেয়ালমতো মন্তব্য করতে লাগল। আমার ধারণা, ঠিক তখনই আমি উপলব্ধি করলাম যে এই লোকটিকে আমার খুন করতে হবে।

সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে আমি খুনের পরিকল্পনা সাজালাম। এর ভেতরে আরো চারটি ইন্টারভিউ দিয়ে ফেলেছি। আমি আবার সেই একই নির্মম প্রশ্নকর্তার সামনে। তাকে খুন করবার কথা এক মুহূর্তের জন্যও মাথা থেকে সরাতে পারলাম না। সামনে ডেস্ক, ডায়রি, নথিপত্র- সবারই আমার কথা জানা আছে্। ওই কক্ষটির আশেপাশে আরো লোকজন থাকবে। আমি যদি তাকে খুন করে পালিয়ে যেতেও সক্ষম হই, তবু সবাই আমাকে চিনে রাখবে। কখনো কখনো খুনের কুমতলবটি মন থেকে সরিয়ে রেখেছি। কিন্তু আবার তা ফিরে ফিরে আসে। আমি জানতাম, একে খুন না করলে আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই আমার। কিন্তু আমি যে বেঁচে থাকতে পছন্দ করি।

তাই একদিন ভাবলাম, ‘জাহান্নামে যাক সব,’ এবং পকেটে একটা মাখন কাটার ছুরি ঢুকিয়ে ইন্টারভিউ দিতে গেলাম।

‘নেক্সট,’ যথারীতি কণ্ঠটি আমাকে ডাকল। আমি ভেতরে ঢুকে পকেট থেকে ছুরি বের করে তার গলা চিরে দিলাম। সবখানে রক্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। রিসেপশনিস্ট মেয়েটি মৃতপ্রায় লোকটির আর্তনাদ শুনে দরজায় এসে, আমার পালাবার পথ আটকে দাঁড়াল। সিদ্ধান্ত নিতে চাইলাম, এই মেয়েটিকেও খুন করে বসব কিনা।

তখনই ডেস্কের ওপাশের সাদা দেয়ালের দিকটাতে একটা দরজা খুলে গেল। আমি এরকম একটা রুমের ওপাশের সাদা দেয়ালে এরকম একটা দরজা আছে, খেয়াল করিনি আগে। একটা সাদা দরজা, সাদা দেয়ালের মাঝখানে। হয়ত দরজাটি চিরকালই ছিল, কেননা কে জানত আমি এরকম কাণ্ড করবার জন্য এই কক্ষটিকেই বেছে নেব, তাও আবার আজকের দিনে? হ্যাঁ, হয়ত আমারই নির্বোধ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার বাইরে থেকে গেছে ওই দরজাটা।

মাখন কাটার ছুরিবিদ্ধ অবস্থায় প্রশ্নকর্তা বসে আছে, মুখ ফেনায়িত, রক্তাক্ত। সাদা দরজা খুলে যে নতুন লোকটি প্রবেশ করল, সে লাশটি পার হয়ে এগিয়ে এসে আমার দিকে তার ডানহাত বাড়িয়ে দিল। আমি হতচকিত হয়ে করমর্দন করলাম। আমার শরীরে রক্তের ছোপ খুব মনোরম কোনো দৃশ্য হযে ওঠেনি, নিশ্চিত করে বলতে পারি।

‘এখন আমরা একটা অবস্থায় এসে পৌঁছুলাম,’ লোকটি বলল। ‘আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, আপনার যদি আগ্রহ থাকে তাহলে আপনাকে একটা চাকরি অফার করতে চাই।’

কাজের লোকগুলো এসে লাশটি সরিয়ে নিল। দুজন মহিলা এসে দেয়াল, মেঝের কার্পেট থেকে রক্তের লাল দাগ সাফ করতে থাকল, তারা অভিব্যক্তিহীন নিস্পৃহ। আমার নতুন বন্ধুটি ডেস্কের ড্রয়ার খুলে নতুন পরিস্কার কিছু পোশাক আমার দিকে বাড়িয়ে দিল।

‘কিসের চাকরি?’ আমি থতমত ভাব সামলে নিয়ে শেষমেশ বলতে পারলাম।

নতুন লোকটি হেঁটে প্রশ্নকর্তার চেয়ারের কাছে গিয়ে তার পেছনে দাঁড়াল। ‘এইমাত্র আমাদের কোম্পানিতে একটি পদ খালি হলো,’ সে বলল, কিছুটা আফসোস এবং নতুন আশার আলো চোখে নিয়ে। ‘এ কাজের জন্য যে বেতন দেওয়া হবে, তাও খুবই ভালো।’

আমি চেয়ারে গিয়ে বসে চাকরিতে জয়েন করলাম। আমার মুখটা নরম, মসৃণ, ভাবলেশহীন হয়ে পড়লো। ভেবে বিস্মিত হচ্ছিলাম, এরপর আবার কবে নাগাদ কেউ একজন আমার সামনে ইন্টারভিউ দিতে আসবে, আর তার পকেটে থাকবে মাখন কাটার ছুরি!

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

[সালমান রুশদি : জন্ম-১৯ জুন, ১৯৪৭। একজন ব্রিটিশ ভারতীয় ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক। ঐতিহাসিক পটভুমিতে জাদু বাস্তবতার মিশেল এবং ভারতীয় উপমহাদেশ, পূর্ব ও পশ্চিমের অসংখ্য সংযোগ, বিচ্ছিন্নতা ও অভিপ্রয়াণের পটভূমি তার লেখনীর স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও অন্যতম বিষয়বস্তু।

তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস মিডনাইটস চিলড্রেন ১৯৮১ সালে তাঁকে এনে দেয় বুকার পুরষ্কার। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত বহুল বিতর্কিত চতুর্থ উপন্যাস দ্য স্যাটানিক ভার্সেস বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তৈরি করে। বইটি প্রকাশের পর ইরানের প্রধান ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ১৯৮৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদ-ের ফতোয়া জারি করেছিল।

২০০৭ সালে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তাকে নাইট ব্যাচেলর উপাধিতে ভূষিত করেন। ২০০৮ সালে দ্য টাইমস ১৯৪৫ সালের পর থেকে যুক্তরাজ্যের সেরা ৫০ জন সাহিত্যিকের তালিকায় তাঁকে ১৩তম স্থান প্রদান করে। ২০০০ সালের পর থেকে লেখক নিউ ইয়র্ক সিটিতে বসবাস করে আসছেন। ২০১০ সালে প্রকাশিত হয় তার রুকা অ্যান্ড দ্য ফায়ার অফ লাইফ উপন্যাসটি।  সে বছরেরই শুরুর দিকে তিনি আত্মজীবনী রচনা শুরু করেছেন বলে ঘোষণা দেন।]

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close