Home অনুবাদ সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [পর্ব ১০] > আলম খোরশেদ অনূদিত

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [পর্ব ১০] > আলম খোরশেদ অনূদিত

প্রকাশঃ February 24, 2017

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [পর্ব ১০] > আলম খোরশেদ অনূদিত
0
1

পর্ব ১০

আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ পুরোহিত, মারিনল-এর পাদ্রী, নিকারাগুয়ার বর্তমান প্রাজ্ঞ ও সূক্ষ্মদর্শী পররাষ্ট্র মন্ত্রী মিগেল দেসকোতোর বাড়িতে অতিক্রমণীয় সমস্যার বিপুলতা সম্পর্কে আমাকে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া হয়। দেসকোতোকে দেখে আমার স্থূলাকৃতি, মজাদার অথচ শক্তপোক্ত ফ্রিয়ার টাক-এর কথা মনে পড়ে। শিরদাঁড়ার স্খলিত হাড়ের ব্যথায় তিনি কাতর ছিলেন, কিন্তু সারা সন্ধ্যা তিনি সেটা উপেক্ষা করেন, যদিও তাঁর বসতে পর্যন্ত রীতিমত কষ্ট হচ্ছিল। আমি দেখতে পাচ্ছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হবার দিন ঘনিয়ে আসছে দ্রুত। তিনি বলেন। এমনটাও হওয়া সম্ভব যে যুক্তরাষ্ট্র হন্ডুরাস, কোস্তারিকা ও এল সালবাদরকেও আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য প্ররোচিত করতে পারে। তারা আগ্রাসনের জন্য এই অঞ্চলের সবগুলো রাষ্ট্রের সমর্থন পাবে না ঠিকই, কিন্তু সেজন্যই হয়ত তারা একটি উপগোষ্ঠী গঠন করতে চাইছে, যারা তাদের আমাদেরকে আক্রমণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে পারে।  তবে নিকারাগুয়া কখনোই আগ বাড়িয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করবে না সংলাপ অপরিহার্য, এটাই আমাদের অবস্থান। আমরা তাঁর নিকারাগুয়ান চিত্রকলার সংগ্রহের মাঝখানে বসে ঠাণ্ডা পানি পান করি, যে-চিত্রকলাসমূহের একটি স্থায়ী নিবাস, অর্থাৎ একটি সংগ্রহশালা নির্মাণের জন্য তিনি বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকের সন্ধানে ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রকেই সব দিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দানিয়েল ওর্তেগা জানান রাষ্ট্রের মালিকানায় এর মধ্যেই প্রচুর জিনিষ রয়েছে, চিত্রকর্মগুলো বরং সরকারের বাইরেই থাকুক।

তাঁর অপর প্রণয়, একটি সুসজ্জিত বিষুবীয় উদ্যানের দিকে অতঃপর দৃষ্টি দিই আমরা। আমি এইকথা আগে বলিনি কখনও, তিনি বলেন, কিন্তু, এখন আমার মনে হচ্ছে আমেরিকানরা আসবেই। আগ্রাসনের ঘটনা ঘটবেই।

চাষাদের উপাসনার স্মৃতি আমার চেতনায় তখনও সজীব থাকায় আমি গির্জা ও বিপ্লব, এবং শব্দর দখল নিয়ে গির্জায় যে লড়াই চলছে তা নিয়ে কথা বলতে শুরু করি। পাদ্রীদের নিয়ে কোনও সমস্যা নেই, তিনি বলেন। তাঁদের অধিকাংশই আমাদের সঙ্গে আছে। কিন্তু নিকারাগুয়ার গির্জার নেতৃস্থানীয়রা, দুঃখজনকভাবে বরাবরই খুব প্রতিক্রিয়াশীল এবং গোষ্ঠীতন্ত্রের ঘনিষ্ঠ। জেসুইটদের নিয়েও কোনও সমস্যা নেই। সরকারের অকৃপণ আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় মানাগুয়ার জেসুইট বিশ্ববিদ্যালয়ের বাড়বাড়ন্ত অবস্থা তখন। আমি জিজ্ঞাসা করি গির্জা নেতৃত্বের ওপর মুক্তির ধর্মতত্ত্বের অভিঘাত এমন কিঞ্চিৎকর কেন।নিকারাগুয়ার গির্জায় সুšদর মনের অধিকারী অনেক মানুষ রয়েছেন, দেসকোতো বলেন,  অনেক মৌলিক চিন্তকও আছেন। কিন্তু তাঁদের কারোরই ওবান্দো ই ব্রাভোর কাছে প্রবেশাধিকার নেই। কার্ডিনাল মননশীল মানুষদের ভয় পান। তিনি সেইসব মানুষদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকেন যারা পদের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম যোগ্যতাটুকুই কেবল অর্জন করেছেন তারপর একটু বিরতি দিয়ে বলেন, ওবাšেদার সমস্যা হচ্ছে তিনি বিপ্লবের পর আর কোনও বই পড়েননি; এবং তিনি বিপ্লবের আগেও কোনও বই পড়েননি।

সুসান মেইসেলাস আসেন বার্ট শ্নাইডারকে সঙ্গে নিয়ে। মহল্লায় গোলাগুলির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল, হয়তবা কিছু মদ্যপ মিলিশিয়া তখনও বিপ্লবের সপ্তম বার্ষিকী উদযাপনে মত্ত ছিল। সুসান তার তদন্ত করতে চেয়েও করেননি। এটি দেসকোতোকে বিস্মিত করে। এটা কী? সুসান মেইসেলাস কি বলতে চাচ্ছেন যে তিনি দূরে রয়েছেন? বিপ্লবের সময় তো তিনি একেবারে যুদ্ধের ময়দানেই ছিলেন।

হ্যাঁ, আপনি জানেন আমাকে বার্টকে রক্ষা করতে হতো। তিনি শাদা পোশাক পরে আছেন, আমি যোগ করতে পারি। বার্টকে খানিকটা, তবে খুব বেশি নয়, লজ্জিত দেখায়।

সুসান সদ্য ফিলিপিন্স তেকে ফিরেছে, তাই অভিসারস্থল হিসাবে বিখ্যাত স্থানীয় একটি পার্কের সূত্রে সে-দেশের নতুন প্রেসিডেন্টের নামটিকে একটি রসালো রসিকতায় পরিণত হতে দেখে খুব মজা পান তিনি: কোরাসন, আকি, নো? মানে, প্রিয়ে, চলো  এখানেই করি, হ্যাঁ? অথবা, শব্দের ওপর ভিন্নভাবে জোর দিলে, প্রিয়ে, এখানে?- না! নিকারাগুয়ায় থাকতে তিনি স্পষ্টতই খুব ভালোবাসতেন। এ-জায়গাটি আমাকে দেওলিয়া করে দিচ্ছে, তিনি বলেন। ন্যুয়র্কে আমার একটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে যার জন্য আমাকে ভাড়া গুণতে হচ্ছে, অথচ পুরোটা সময় আমি এখানেই কাটাচ্ছি। তিনি সম্প্রতি বিত্তশালী বাররিয়ো পরিবারকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র বানিয়েছেন, যে-পরিবারটি, সাংবাদিক পরিবার চামোররোদের মতই, বিপ্লবের কারণে বিভক্ত হয়ে গেছে: একজন বিপ্লববিরোধী গোত্রপিতা যার সব ছেলেই বিপ্লবী বাহিনীতে নাম লিখিয়েছে। (এই দুই পরিবার আবার বিবাহসূত্রে সংযুক্ত: লা প্রেন্সা পত্রিকার বিয়োলেতা চামোররো জন্মগতভাবে বাররিয়ো ছিলেন। নিকারাগুয়াকে প্রায়শই একটি গ্রাম বলে মনে হতো, কেননা আপনাকে হামেশাই এরকম জ্ঞাতিসম্পর্কের গায়ে গুঁতো খেতে হতো। লুইস কাররিয়নের চাচা, আরেকটি উদাহরণ, ব্যাংকার আর্তুরো ক্রুস ছিলেন বিরোধী দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী।) নিকারাগুয়ায় ছবিটি প্রদর্শনের ব্যাপারে তিনি তেমন উৎসাহী ছিলেন না। এটি এখানকার জন্য নয়, তিনি বলেন। দেসকোতো তাঁর নিজের বানানো একটি তথ্যচিত্রের বর্ণনা দেন, যেখানে তিনি বিত্তশালী নিকারাগুয়ান নারীদের সাক্ষাৎকারে গরীবদের আলস্য ও রঙিন টেলিভিশন দেখার বিষয়টি নিয়ে কথা বলার বিপরীতে সত্যিকার গরীব মানুষের ঘরবাড়ি, জীবনযাপন পদ্ধতি ইত্যাদি বাস্তব দৃশ্য দেখান। সুসান মাথা নাড়েন। তাঁর ছবিটি এর চেয়ে আরও অনেক বেশি দ্ব্যর্থবোধক এবং অনেক কম বক্তব্যধর্মী। গোত্রপিতারা তাঁকে চমৎকৃত করেন। আমি বুঝতে চাইতাম তাঁরা যা ভাবেন তা কীভাবে ভাবেন এবং যা জানেন তা কীভাবে জানেন। এই দ্ব্যর্থকতা, তাঁর ধারণা, নিকারাগুয়ার দর্শকদের অনেককেই হয়তো অস্বস্তিতে ফেলে দিত। কিন্তু আমরা লোকেদের দ্বিধাহীনভাবে কথা বলতে শোনায় অভ্যস্ত নই। এখানকার মানুষদের কাছে সবকিছুই খুব সাদা-কালো ও সোজাসাপ্টা। কিন্তু আমরা এতে অভ্যস্ত নই।

দেসকোতো হোয়াইট হাউসের এক দূতের মানাগুয়া সফরের বর্ণনা দেন- যাকে আমি রকি বলে সম্বোধন করব। তাঁদের আলোচনায়, তিনি বলেন, তিনি নিজেই বারবার করে এ-কথার ওপর জোর দেন যে উভয়পক্ষের সদিচ্ছার ভিত্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও নিকারাগুয়ার সমস্যার সমাধান যে খুব সহযেই সম্ভব এ-ব্যাপারে তিনি নিজে অন্তত আশ্বস্ত। আমরা বুঝি, আমি বলি, যে, এ-অঞ্চলের নিরাপত্তা বিষয়ে আপনাদের কিছু দাবি রয়েছে। সেটা ঠিকই আছে। আমরা এ-ব্যাপারে আলোচনা করতে পারি। আমরা বাস্তববাদী মানুষ এবং আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটা কার্যকর চুক্তি চাই।

শেষ পর্যন্ত (দেসকোতো বলে চলেন) রকি এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। তাঁরা যদি তাত্ত্বিকভাবেও বিশ্বাস করেন যে এই তাত্ত্বিক সদিচ্ছা তাত্ত্বিকভাবেই অস্তিত্বশীল, তাহলে ঠিক কীসের ভিত্তিতে এই আলোচনা শুরু হতে পারে বলে মনে করেন পাদ্রিসাহেব?

হুঁ, দেসকোতো বলেন (এটা হেগ-এর সেই রায়ের পূর্বের ঘটনা), ধরুন আমরা দুজনেই যদি আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার ব্যাপারে সম্মত হই? সেটা একটা যথেষ্ট বাস্তবসম্মত ভিত্তি হতে পারে।

সেটা আপনার সমস্যা, পাদ্রি, রকি তাঁকে বলেন। আপনি একজন দার্শনিক। আপনি তথ্যের ওপর মনোনিবেশ করবেন না।

সেই তথ্যগুলো কী? দেসকোতো, একজন অতুলনীয় কথক, রকির উত্তরটুকু অভিনয় করে দেখান। আপনাদের সীমান্তে এই কন্ট্রারা, পাদ্রি। তারা আপনাদের খুব জ্বালাতন করে, তাই না? হ্যাঁ, দেসকোতো জবাব দেন, তবে আপনারা তাদের অর্থায়ন বন্ধ করে দিলে সেটা আর পারবে না। এই তো আবার শুরু করলেন আপনি, রকি বলেন। আরও দার্শনিকতা। আপনি সত্যিই সংশোধনের অতীত পাদ্রি। বাস্তবতা হলো এদেরকে আমরা আর্থিকভাবে সাহায্য করেছি, এখনও করছি এবং ভবিষ্যতেও করে যাব। আর তারা আপনাদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করে। এগুলো হচ্ছে বাস্তব তথ্য। তারপর তিনি বলেন যে, তিনি ভেবেছিলেন পাদ্রি দেসকোতো যথেষ্ট বুদ্ধিমান। আর বুদ্ধিমান মানুষেরা সমস্যা চায় না। অথচ আপনি সমস্যায় জর্জরিত।

তাহলে তিনি কী পরামর্শ দিচ্ছেন, দেসকোতো জিজ্ঞাসা করেন। খুব সহজ, উত্তর আসে। আমরা যা বলি ঠিক তাইই করুন। একেবারে আমরা যা বলি তাইই করুন, দেখবেন আপনার যে-সমস্যা, তা কীভাবে উবে যায়। রাতারাতি। যেনবা জাদুমন্ত্রবলে। এর আর কোনও অস্তিত্বই থাকবে না। আপনি বিস্মিত হবেন। শুধু আমরা যা বলি, ঠিক তাইই করুন।

[চলবে]

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close