Home অনুবাদ সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [পর্ব ১১] > আলম খোরশেদ অনূদিত

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [পর্ব ১১] > আলম খোরশেদ অনূদিত

প্রকাশঃ March 14, 2017

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [পর্ব ১১] > আলম খোরশেদ অনূদিত
0
0

পর্ব ১১

এটা একটি সুপরিবেশিত, কৃষ্ণ-কৌতুকী গল্প, আর যেহেতু এর সত্যতা বিষয়ে নিশ্চিত হবার উপায় নেই, সেহেতু এটিকে গ্রহণ করা না করা, সম্পূর্ণ আপনার ব্যাপার। ‘সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে’, পাদ্রি মিগেল বলেন, ‘পদ্ধতিটি কী বর্বরই না ছিল।’ ধর্মীয় ও কূটনৈতিক, উভয় শাস্ত্রেই সুপণ্ডিত, দেসকোতোর কাছে এই মার্কিনির বর্বরতা ও নগ্ন মাস্তানিটুকু ছিল আলোচনার বিষয়বস্তুর চেয়েও বেশি অপমানকর। ‘আপনার কোন আশা নেই’, হাসতে হাসতে ফেটে পড়ে দেসকোতো পুনরাবৃত্তি করেন। ‘আরও দর্শন।’

আমার মনে হলো গির্জা নেতৃত্ব ও পাদ্রিদের এই লড়াইকে যদি ‘শব্দ’র দখল নিয়ে লড়াই বলা চলে, তাহলে এই গল্পটি শ্রেষ্ঠত্বর জন্য দুই ভিন্নধর্মী বয়ানের সমান্তরাল আরেক পার্থিব যুদ্ধের প্রতিনিধিত্ব করে। সন্ধ্যা নামার আগেই আমরা নিজেদের এরকমই আরেক তৃতীয় লড়াইয়ের মুখোমুখি দেখতে পাবো : আবারও প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতা, আরেক অপ্রতিরোধ্য শব্দ-দ্বৈরথ।

মানাগুয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আসল রাষ্ট্রদূত, হ্যারি বের্ঘল্ড, অতটা খারাপ নন, বলছিলেন দেসকোতো। তাঁকে এখানে পাঠানো হয়েছিল কেননা তাঁকে মার্ক্সিজম-লেনিনিজমের একজন বিশেষজ্ঞ মনে করা হতো (তাঁর পূর্বের কর্মস্থল ছিলো হাঙ্গেরি।) ‘সমস্যা হচ্ছে তিনি এখন বলছেন যে এখানে তিনি কোনও মার্ক্সিজম-লেনিনিজমের দেখা পাচ্ছেন না। বেচারা বের্ঘোল্ড, তাঁর প্রতিবেদনগুলো ওয়াশিংটনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার টেবিলে গড়াগড়ি খাচ্ছে, নীতিনির্ধারকেরা তা খুলেও দেখছেন না। তাঁকে মাঝে-মধ্যে ওয়াশিংটনে ডেকে পাঠানো হতো মার্ক্সিজম-লেনিনিজম বিষয়ে তাঁদের জ্ঞানদান করার জন্য। ‘কিন্তু এইসব সাক্ষাৎকারে কখনোই নিকারাগুয়ার বিষয়ে তাঁকে কিছু বলতে বলা হতো না, যা খুব দুঃখজনক।’

এমন সময়ে, বার্ট শ্নাইডার, আর চেপে না রাখতে পেরে, লা প্রেন্সা বন্ধ করার বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় ক্ষোভ ঝাড়লেন। ‘এটা একটি মাথামোটা ভুল সিদ্ধান্ত।’ তিনি বলেন, ‘এটা হেগ-এর রায়কে নাকচ করে দেয়, আমার তর্ক করার সক্ষমতাকে কেড়ে নেয়। এখন যখন আমেরিকার লোকেরা বলবে যে সান্দিনিস্তারা অগণতান্ত্রিক, তখন আমার আর বলার কিছুই থাকবে না।’

দেসকোতো আমাদের কাছে দলীয় অবস্থানেরই প্রতিধ্বনি করলেন; যুদ্ধের সময়ে যে-কোনো দেশেরই প্রচারমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকে;  লা প্রেন্সাকে সিআইএ টাকা দিচ্ছিল; এটা ছিল একটি আভ্যন্তরীণ যুদ্ধক্ষেত্র খোলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলী পদক্ষেপ; যেমনটি তারা চিলের আয়েন্দে সরকারকে অস্থিতিশীল করে তোলার সময় এল মেরকুরিও পত্রিকার সঙ্গে করেছিল। কিন্তু দুটো মুহূর্তে তাঁকে মনে হচ্ছিল তিনি এই সিদ্ধান্ত থেকে নিজেকে একটু দূরে সরিয়ে নিচ্ছিলেন। প্রথম যখন তিনি উল্লেখ করলেন যে মন্ত্রীসভার যে-সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তিনি দেশের বাইরে থাকার কারণে সে-সভায় উপস্থিত ছিলেন না। দ্বিতীয়, যখন দীর্ঘক্ষণ ধরে এই তর্ক চলছিল (বা বলা চলে বার্ট এই তর্ক করছিলেন) তখন তাঁর একটি উক্তি: ‘এই তর্কাতর্কি’, পাদ্রি মিগেল বলেন, ‘আমাদের মন্ত্রীসভার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। আমরা ঠিক এইভাবেই বাদানুবাদ করি সেখানে।’

কিন্তু, তিনি বলেন, সরকার বিদেশে সুপ্রচারণা পেতে ও তার উদারপন্থী সমর্থকদের সাহায্য করতে উদ্বিগ্ন থাকলেও এই সিদ্ধান্তগুলো তাকে জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে নিতেই হতো, এটাই শেষ কথা। ‘আপনারা যদি আপনাদের জনগণের প্রশ্নের উত্তর দিতে চান তাহলে হেগ-এর রায়ের কথা বলুন। সেটাই তো প্রমাণ করে কারা বৈধভাবে কাজ করছে, আর কারা নয়। সেই মামলা জিতে আমরা আপনাদেরকে একটা শক্তিশালী অস্ত্র দিয়েছি। সেটা ব্যবহার করুন।’

সুজান মেইসেলাস ও আমি মোটের ওপর বার্টের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করি। আমরা বলি, আমাদের বোধ হচ্ছিল যে একটা নিম্নগামী ঘূর্ণন শুরু হয়েছে: প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র কন্ট্রাদের জন্য সাহায্যের অনুমোদন দেয়, ফলত এফএসএলএন লা প্রেন্সা বন্ধ করে দেয়, তার জেরে নিউইয়র্ক টাইমস তাদের স্তালিনিস্তা বলে গাল দেয়, তখন আবার তারা দু’জন পাদ্রিকে বহিষ্কার করে দেয়…এটা একটা ঘূর্ণিপাকের মত ঘটে চলেছিল এবং অবধারিতভাবে মুখ থুবড়ে পড়ার, অর্থাৎ মার্কিন আগ্রাসনের নিকটবর্তী হচ্ছিল ক্রমেই। ‘আপনার উচিত নয় এমন একটি চক্রের মধ্যে যাওয়া’, সুজান বলেন, ‘আপনার অতটা অনুমানযোগ্য হয়ে পড়া উচিত নয়।’

আমি একটা ভিন্নধর্মী ভয়ের কথা উচ্চারণ করি। ‘আমি একটা দেশে বাস করেছি, যেখানে প্রচারমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় ডানপন্থীদের, আর্থাৎ সামরিক বাহিনীর দ্বারা. এবং সত্যি বলতে কী, সেখানকার পত্রিকাগুলো এখান থেকে ভালো। কিন্তু যেটা আমাকে বেশি ভাবায় সেটা হচ্ছে যে, এই নিয়ন্ত্রণের একটা নেশা আছে। এটি তার অন্য বিকল্প থেকে অনেক বেশি সহজ। ফলে আপনি এখন লা প্রেন্সা বন্ধ করে দেওয়ার পেছনে যে কারণই দেখান না কেন, আমি সেটাকে পছন্দ করতে পারি না। সেটা আপনারা কী সে-জন্য নয়, বরং যদি এটা চলতে থাকে তাহলে আপনারা কী হয়ে ঊঠতে পারেন সে-জন্য।’

পাদ্রি মিগেল তাঁর দেওয়াল তুলে দেন পুনরায়। ‘এগুলো শুধুমাত্র যুদ্ধকালীন ব্যবস্থা। শান্তির সময় তা এরকম থাকবে না।’

শেষ পর্যন্ত, যখন আমি মিগেল দেসকোতোর বাড়ি ছেড়ে আসি, এটা এরকম রূপ নেয়: সামরিক পোশাক ও পদবীর নিচে এই মানুষগুলোকে আমি কী মনে করি? পাদ্রি মিগেল, সের্হিও রামিরেস, দানিয়েল ওর্তেগা: তাঁরা কি সম্ভাব্য স্বৈরাচারী সব?

আমি নিজেকে জবাব দিই : না। বেশ জোরের সঙ্গে বলি, না। আমার কাছে তাঁদেরকে মনে হচ্ছে অত্যন্ত সৎ ও দেশপ্রেমী মানুষ বলে, তাঁদের অতীত ও বর্তমান বিরোধীদের প্রতি অবিশ্বাস্যরকম তিক্ততাবিহীন। তাঁরা জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী, এমন একটি প্রজাতি যেটি যুক্তরাষ্ট্রে সবসময় ঘৃণিত নয়, যে-দেশটি খুব বেশিদিন আগে নয়, বিপ্লবের মাধ্যমেই জন্মগ্রহণ করেছিল।

জীবনে প্রথমবারের মত আমি উপলব্ধি করি, বিস্ময়ের সঙ্গে, যে আমি এমন একটি সরকারের সান্নিধ্যে এসেছি যাকে আমি সমর্থন করতে পারি, মন্দের ভালো হিসাবে নয়, বরং আমি  চাই তাদের প্রচেষ্টাগুলো (টিকে থাকার জন্য, জাতিগঠন এবং তার রূপান্তরের জন্য) সফল হোক। এটা একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি ছিল। আমি সারাজীবন বিরোধী শিবিরের লেখক ছিলাম, এবং লেখকের ভূমিকার মধ্যে অন্যান্য কাজের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণ করাটাও অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করতাম। খুব লক্ষণীরকম অদ্ভুত অনুভুতি হচ্ছিল আমার, নিজেকে শাসনকর্তাদের সঙ্গে একই দলে দেখতে পেয়ে, কিন্তু আমি সত্যকেও এড়াতে পারছিলাম না: আমি যদি একজন নিকারাগুয়ান লেখক হতাম তাহলে হয়তো সান্দিনিস্তা ফ্রন্টের পেছনে দাঁড়িয়ে কাজ করে যাওয়াটাকে আমি দায়িত্ব মনে করতাম।

আমি আশ্বস্ত ছিলাম যে এফএসএলএন-এর প্রচারমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার নীতিটি ভুল ও বিপদজন্ক ছিল। যখন নিকারাগুয়া সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান রাজনৈতিক কাণ্ডারি, ডাকাবুকো চেহারার ওমর কাবেসাস, নিউইয়র্কের পেন কংগ্রেসে পার্টি লাইন তুলে ধরে বলেন যে, আগ্রাসন বন্ধ হলেই নিয়ন্ত্রণও উঠে যাবে, তখন আমি একজন সাংবাদিককে বিড়বিড় করতে শুনি যে, ‘বিশ্বাস করবেন না যেন কেউ।’  এবং তার বক্তৃতার শেষে, হলের একজন লেখক, পূর্ব ইউরোপের, মার্কিনী নন, চীৎকার করে বলেন: ‘ওটা একটা পুলিশী বক্তৃতা।’ এফএসএলএন এই সব বিরোধিতাকে গণনার মধ্যে নিলে ভালো করবে।

তবে, একটি সরকারের নীতির বিরোধিতা করা মানে সরকারের বিরোধিতা নয়। আমার জন্য নয় অবশ্যই, এবং এই সরকারের ক্ষেত্রে তো নয়ই, অন্তত এখন অব্দি।

[চলবে]

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close