Home বিশ্বসাহিত্য সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [পর্ব ১২] > আলম খোরশেদ অনূদিত

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [পর্ব ১২] > আলম খোরশেদ অনূদিত

প্রকাশঃ April 20, 2017

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [পর্ব ১২] > আলম খোরশেদ অনূদিত
0
0

পর্ব ১২

“রাস্তার ধারে উঁচু ক্যাকটাসের ঝোপ। যুদ্ধের পোশাক পরা নারীরা কাঁধে রাইফেল বহন করছিল, ব্যারেলে হাত রেখে। গাছ, এমনকি টেলিফোনের তার থেকেও তাল তাল শ্যাওলারা ঝুলছিল। লাকড়ি বোঝাই ঠেলা টেনে নিয়ে যাচ্ছিল শিশুরা। তারপর , মাতাগালপার কাছাকাছি এলে, একটি ছোট্ট কফিন বহন করা  বিষণ্ন শবমিছিল চোখে পড়ে আমাদের : শিশুর শেষকৃত্য। পরবর্তী দুদিনে আমি এরকম তিনটি শবমিছিল প্রত্যক্ষ করেছি।”

ভালোবাসার ডিম খাওয়া

ওমার কাবেসাস-এর বই পর্বতের আগুন বইটি আমি প্রথম পড়ি লন্ডন থেকে মানাগুয়া যাওয়ার পথে বিমানে। ইংরেজি শিরোনামটি ছোট হলেও স্প্যানিশ নামটির চেয়ে কম অর্থোদ্দীপক ছিল, যার আক্ষরিক অর্থ, ‘পর্বত, সুবিশাল সবুজ প্রান্তরের চেয়েও ভিন্নতর কিছু।’ এখন, মাতাগালপা যাওয়ার পথে, তাঁর বর্ণিত সেই পর্বত অভিমুখে যাবার কালে, আমি পুনরায় সেই বইয়ে ডুব মারি। এমনকী ইংরেজিতেও, সেইসব নিকারাগুয়ান গালিবর্জিত সংস্করণটি, যা মূল বইটিকে নতুন নিকারাগুয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় বই হয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল (প্রায় সত্তর হাজার কপি বই বিক্রি হয়েছিল), ছিল যথেষ্ট উপভোগ্য ও স্মৃতিজাগানিয়া একটি আত্মকথা,  সেই  ‘রোগাপাতলা কাবেসাস’-এর; আর তাঁর এফএসএলএন-এ নাম লেখানো, ফ্রন্টের হয়ে প্রথমদিকে লিয়নে কাজ করা এবং এক পর্যায়ে পথিকৃৎ গেরিলা হয়ে ওঠার লক্ষ্যে পর্বতের দিকে যাত্রার গল্প। কাবেসাস তাঁদের পর্বতজীবনের ভয়ঙ্কর কষ্টের কথা প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন, যা ছিল দুঃসহ কাদা, জঙ্গল ও রোগের নরকবিশেষ। (যদিও তাঁর একজন ভক্ত, নিকারাগুয়ান তরুণ সৈনিক, ভেবেছিল তিনি তাকে যথেষ্ট কদর্যভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন, কেননা তিনি তাকে অতিরিক্ত কৌতুককর করে তুলেছিলেন।) কিন্তু কাবেসাসের কাছে, পর্বত একতাল অসুন্দরের চেয়েও বেশি কিছু ছিল। তিনি তাকে একটি পৌরাণিক, প্রত্নপ্রতিম শক্তিতে রূপান্তরিত করেন যার নাম পর্বত, কেননা সোমোসার আমলে সেখানেই ছিল আশার অবস্থান। পর্বত ছিল গেরিলাদের আবাসভূমি, যেখান থেকে একদিন বিপ্লবের আগমন ঘটবে এবং ঠিক ঠিক তাই-ই ঘটেছিল।

এখন যখন কন্ট্রারা পর্বত থেকে নেমে আসে, কৃষকদের আতঙ্কিত করার জন্য, তখন নিশ্চয়ই এটিকে একধরনের সীমা-লঙ্ঘন বলে মনে হতো, মনে হতো কোনও এক পবিত্রভূমির অবমাননা।

রাস্তার দুপাশে ছিল অরণ্যঘেরা উঁচু সমতল ভূমি; সামনে বিচিত্রাকৃতির পর্বতমালা, কৌণিক, বাঁকানো, ঢেউ খেলানো, দিগন্তবিস্তৃত। গরুবাছুর ও কুকুরেরা গাড়ির সঙ্গে রাস্তাকে ভাগ করে নিয়েছিল, যন্ত্রচালিত শকটের শ্রেষ্ঠত্ব মানতে অস্বীকৃত হয়ে। অবশ্য ট্রাক এলে সবাই রাস্তা ছেড়ে সরে দাঁড়াতো।

রাস্তার ধারে উঁচু ক্যাকটাসের ঝোপ। যুদ্ধের পোশাক পরা নারীরা কাঁধে রাইফেল বহন করছিল, ব্যারেলে হাত রেখে। গাছ, এমনকি টেলিফোনের তার থেকেও তাল তাল শ্যাওলারা ঝুলছিল। লাকড়ি বোঝাই ঠেলা টেনে নিয়ে যাচ্ছিল শিশুরা। তারপর , মাতাগালপার কাছাকাছি এলে, একটি ছোট্ট কফিন বহন করা  বিষণ্ন শবমিছিল চোখে পড়ে আমাদের : শিশুর শেষকৃত্য। পরবর্তী দুদিনে আমি এরকম তিনটি শবমিছিল প্রত্যক্ষ করেছি।

বৃষ্টি পড়তে শুরু করে।

মানাগুয়া থেকে আবার বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে আমার ভালোই লাগছিল। গির্জা অধ্যুষিত চত্বর আর শহরকেন্দ্রের উপস্থিতির কারণে মাতাগালপাকে প্রকৃত শহর বলে মনে হচ্ছিল। এটা অনেকটা স্বাভাবিকতায় ফেরার মতো ছিল, যদিও স্বাভাবিক হয়ে ওঠার ব্যাপারটি এখানে ছিল অনেকটা ব্যতিক্রমী, প্রায় সন্ত্রস্ত অবস্থার মতো। দালানগুলোতে সশস্ত্র উত্থানের দিনগুলোর স্মৃতিচিহ্ন বুলেটের দাগে ভরা, আর শহরটির ওপর প্রভুত্ব করছিল একটি উঁচু, কুৎসিত মিনার, যেটি ছিল ঘৃণিত ন্যাশনাল গার্ডের সদর দপ্তরের একমাত্র অবশেষ। বিপ্লবের পর জনগণ ন্যাশনাল গার্ডের এই দুর্গটি ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছিল।

উপকরণ স্বল্পতার জন্য আইসক্রিমের দোকানে কোনও আইসক্রিম ছিল না। খেলনার দোকানে দারিদ্র্যের ছাপ ছিল সর্বত্র, সেরা খেলনাগুলো ছিল বস্তুত দুই টুকরো কাঠ জোড়া লাগিয়ে, রং করে দেওয়া আর কোকাকোলার বোতলের ছিপি দিয়ে বানানো চাকাঅলা আদিম গাড়ির মতো একটা কিছু। মজার ব্যাপার, সেখানে কয়েকটি পাঁচমিশালী জিনিসের দোকান ছিল, মিশরীয় দোকান বলে পরিচিত, আরমান্তো মুস্তাফা কিংবা মানোলো সালেহ নামধারী, যারা বিছানাপত্র, কিছু পোশাকআশাক, প্রসাধনী এবং বিচিত্র গার্হস্থ্যপণ্য- যেমন শ্যাম্পু, বালতি, আয়না, সেফটিপিন, বল ইত্যাদি বিক্রি করত। আমার শতবর্ষের নির্জনতা গ্রন্থের সেই তুর্কি সরণীর কথা মনে পড়ছিল। মাতাগালপায়, মাকোন্দোকে খুব একটা দূরবর্তী কিছু বলে মনে হচ্ছিল না আমার।

মিশরীয় দোকানগুলোকে ঠিক মিশরীয় বলে মনে হতো না, যেমনটি প্রাচ্যধর্মী নামের অধিকারী মানাগুয়ার মেয়র, মোয়াসেস হাসানকেও প্রাচ্যের কেউ বলে মনে হতো না। ক্যাফেগুলোতে আরও কিছু পরিচিত মুখের দেখা মিলল। পোপ ও কার্ডিনাল ওবান্দো ই ব্রাবোর পোস্টার ছড়ানো ছিল সর্বত্র, কার্ডিনালের রক্তলাল গাউনসমূহ সময়ের প্রলেপে গোলাপী বর্ণ ধারণ করেছিল যদিও। সান্দানিস্তরা তাদের এই চিত্রসঙ্গীদের উপস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে বীভৎস ভঙ্গিতে সুমিষ্ট ফলের শরবত, উজ্জ্বল বেগুনি রঙের পিতাহায়া সমেত পান করে যাচ্ছিল, আঠালো কিউই-সদৃশ ফল মামন চিবুতে চিবুতে; ওপর থেকে নজরদারি করা কার্ডিনালের ছবির নিচে বসে। আমি কার্লোস পালাদিনোর সঙ্গে, যিনি মাতাগালপা প্রদেশের গভর্নরের অফিসে কাজ করতেন, আঞ্চলিক পুনর্বাসন বিষয়ে আলাপ করি।

জিনোতেগা প্রদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুবিশাল পার্বত্য ও আরণ্যক এলাকার জনগোষ্ঠীকে দক্ষিণ জিনোতেগা, এমনকী মাতাগালপা প্রদেশেও সরিয়ে আনতে হয়েছিল। এটি একটি সামরিক সিদ্ধান্ত ছিল, ফলত অবশ্যপালনীয় ছিল। কন্ট্রাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে সমস্যা হচ্ছিল নিকারাগুয়ান সেনাবাহিনীর, কেননা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সাধারণ জনগণ প্রায়শই যুদ্ধের মাঝখানে আটকা পড়ত। জনগণের আরেক বিপদ ছিল এই কন্ট্রারা, যারা নিয়মিত কৃষকদের অপহরণ করতো, তাদেরকে দিয়ে ওদের জন্য ফসল ফলাতে বাধ্য করতো, এমনকী মেরেও ফেলত। কিন্তু আমি জিজ্ঞাসা করি, এটা কী সত্য যে এইসব অঞ্চলের অনেকেই কন্ট্রাদের সহানুভূতির চোখে দেখত? হ্যাঁ, পালাদিনো জবাব দিলেন, কেউ কেউ তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল, স্ত্রী-সন্তানদের পেছনে ফেলে। বেশ বড় একটি সংখ্যার এই ধরনের একাভিভাবক পরিবারগুলো আমাদের জন্য একটা বড় সমস্যা হয়ে উঠেছিল। যদিও বহু ক্ষেত্রেই কিছুদিনের মধ্যে মোহভঙ্গ হয়ে এদের অনেকেই ফিরে আসতো। সরকার এরকম ফিরে আসা কৃষকদের জন্য সম্পূর্ণ সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিল।  ‘আমরা তাদের দোষী মনে করি না’, পালাদিনো বলেন। ‘আমরা জানি কন্ট্রারা কী প্রচণ্ড রকম চাপ প্রয়োগ করতে পারে।’

এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়া নানা সমস্যার জন্ম দেয়। একক অভিভাবকের বিষয়টি ছাড়াও এই নারীদের কীভাবে উৎপাদনশীল কাজে লাগানো যায়, যখন তাদেরকে সন্তানের দেখভাল করতে হতো- এই পুনর্বাসিত উত্তরাঞ্চলের মানুষেরা সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিলেমিশে বাস করার অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। তারা মূলত অরণ্যের ফাঁকা জায়গাগুলোতে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করত। এখন তাদেরকে গা ঘেঁষে তৈরি হওয়া গুচ্ছবাড়ির মধ্যে বাস করতে হচ্ছে। তাদের পশুরা প্রতিবেশীর উঠানে ঢুকে যাচ্ছিল প্রায়শই, তাদের বাচ্চারা অন্য শিশুদের সঙ্গে মারামারি করছিল। তারা এগুলোকে মেনে নিতে পারছিল না। অনেকেই আবার জাতিগতভাবেও স্থানীয় মেস্তিসোসদের চেয়ে আলাদা ছিল : তারা ছিল আমেরিন্দিয়ান, মিসকিতো, অথবা সুমো আর তাদের ভাষা আলাদা ছিল, সংস্কৃতি আলাদা ছিল, ফলত তারা একপ্রকার উপনিবেশিত বোধ করত।  ‘আমরা অনেক ভুল করেছিলাম’, কার্লোস পালাদিনো স্বীকার করেন।

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close