Home ভ্রমণগাথা সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [পর্ব ১৪] > আলম খোরশেদ অনূদিত

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [পর্ব ১৪] > আলম খোরশেদ অনূদিত

প্রকাশঃ June 8, 2017

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [পর্ব ১৪] > আলম খোরশেদ অনূদিত
0
0

বিপ্লব-পরবর্তী কালে নিকারাগুয়া ভ্রমণ নিয়ে সালমান রুশদির ভ্রমণগাথা

পর্ব ১৪

পরদিন আমি উত্তরের দিকে গাড়ি নিয়ে যাই। আমি জানতাম আমরা যে-রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, যেটা হিনোতেগা পেরিয়ে বোসায়-এর দিকে যায়, সেই রাস্তাটাতেই কন্ট্রাদের পেতে রাখা মাইনে বত্রিশ জনের মৃত্যু হয়েছিল, এবং যদিও সেটা আমরা যেদিকে যাচ্ছিলাম তার আরও উত্তরের দিকে ঘটেছিল, তবু আমি উঁচু ঢিবিগুলোর ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় খুবই নির্ভীক বোধ করছিলাম। ’আপনারা কীভাবে রাস্তাগুলো রক্ষা করেন?’ আমি আমার সঙ্গে থাকা সেনাকর্তাকে প্রশ্ন করি। ‘পরিপূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা সম্ভব নয়।’ তিনি জবাব দেন।

‘আচ্ছা’, আমি বলি। ’ও হ্যাঁ, আপনারা কীভাবে বুঝতে পারেন রাস্তায় মাইন পাতা আছে কি না?’

‘একটা বিশাল শব্দ হয়’, তার চাছাঁছোলা জবাব আসে।

ভাত আর সীমের প্রাতঃরাশ, রাঙানো মোরগ, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলে গায়ো পিন্তো– আমার পেটের ভেতর তারস্বরে ডেকে ওঠে।

রাস্তার ধারে শকুনদের বসে থাকতে দেখো যায়। পর্বতের মাথার ওপরে নিচু মেঘ। সড়কচিহ্নগুলো সব বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। গাড়ির চালক দানিলোর কাছে একটা রেডিও আছে, যাকে বলা যেতে পারে, রিয়েলিস্টিক নামের ষোলো ব্যাটারির স্ক্যানার, যেটাতে সে কন্ট্রাদের বার্তা ধরতে পারে। আমরা জোরালোরকম আশাবাদী নামের কিছু সমবায় খামার অতিক্রম করি : প্রতীক্ষা। শান্তি। পর্বতেরা ঘনবদ্ধ হয়ে আসে: মেঘ ও গাছেদের দেয়াল। সেখানে ঝলকের মত বৈদ্যুতিক নীলরঙা পাখা দেখা যায়,  তারপর হঠাৎ করে একটি কৃষকের বাড়ি: গাছ আর কৌণিক, গোলাকার, আয়তাকার, স্তম্ভাকৃতি ইত্যাদি জ্যামিতিক আকারে কাটা ঝোপে আবৃত। এরকম বনের মাঝখানে বৃক্ষসজ্জাবিদ হওয়াটা রীতিমত একজন গোঁয়ার মানুষের পক্ষেই সম্ভব।

তারপর একটি গাছকে দেখি রাস্তা লম্বালম্বিভাবে পড়ে আছে আমাদের পথ আটকে দিয়ে। এই কি সেই তাহলে? এখানেই কন্ট্রাদের ভূত দাঁতের ফাঁকে দা আটকে, ঝোপ থেকে লাফিয়ে পড়ে বলবে : বিদায় হিন্দু লেখক?

বাস্তবে এটা রাস্তা জুড়ে পড়ে থাকা স্রেফে একটা গাছই ছিল।

এনরিকে আকুনিয়া সমবায় খামারটি একজন শহিদের নামে করা, যিনি সমোসার পতনের পর একজন স্থানীয় বিত্তশালী জমিদারের হাতে খুন হয়েছিলেন। (খুনী ধরা পড়ার আগেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়।) এগুলোকে বলা হয় CAS বা ‘কোঅপারেটিভ আগ্রিকোলা সান্দিনিস্তা’, অর্থাৎ একটি প্রকৃত সমবায়, যেখানে সব জমির সংরক্ষণ এবং চাষাবাদ সামবায়িকভাবেই করা হয়। অন্যত্র, যেখানে এই সমবায় পদ্ধতির প্রতি বিরুদ্ধতা রয়েছে, সেখানে সরকার, এটাকেই আরেকটু পাল্টে নিয়ে সিসিএস বা কোঅপারেটিভ অভ ক্রেডিটস অ্যান্ড সার্ভিসেস নামে আরেকটি পদ্ধতি চালু করেছে। এই সিসিএস পদ্ধতিতে জমির মালিকানা ব্যক্তির হাতেই থাকে এবং তিনি নিজেই চাষাবাদের কাজটা করেন, সরকারের ভূমিকা সীমাবদ্ধ থাকে বিদ্যুৎ, পানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিতরণসুবিধা প্রদানে। কোন সন্দেহ নেই যে কৃষকদেরকে ’কাস’ পদ্ধতি গ্রহণ করতেই উৎসাহিত করা হতো বেশি, তবে বিকল্প পদ্ধতির উপস্থিতি কর্তৃপক্ষের নমনীয়তারই ইঙ্গিত দেয়, যেটা কোনভাবেই একটি কট্টর কম্যুনিস্ট শাসকদলের কর্মপদ্ধতি হতে পারে না।

বাড়িগুলো  তৈরি করা হয়েছিল ’মিনিস্কার্ট’ নীতিতে: তিন ফুট উচ্চতার কংক্রিট দেয়ালের ওপর অংশে কাঠের কাঠামো আর তার ওপর ধাতব ছাদ। এটাই কৃষকদের প্রিয় নির্মাণরীতি হয়ে দাঁড়ায়। কন্ট্রারা ছাদে আগুন লাগাতে কিংবা ঘুমন্ত বাসিন্দাদের ওপর কংক্রিটের দেয়াল ভেদ করে গুলি করতে পারতো না। বাড়িগুলোকে চওড়া রাস্তার ধারে, মাঝখানে যথেষ্ট জায়গা ফাঁকা রেখে, বিন্যস্ত করা। শূকরেরা ছায়ার মধ্যে ঘুমাচ্ছিল। সেখানে পানির কল, এমনকি একটি গোসলখানাও ছিল। একটা ভাঙাচোরা ছাউনির নিচে বাচ্চাদের ক্লাস হচ্ছিল: হাততালির খেলা ও গান। পাশের ঘরে ছিল একটি শিশুসেবাকেন্দ্র, যার দেয়ালগুলোতে ডায়রিয়া রোগের লক্ষণ ও নিরাময়পদ্ধতি বিষয়ে নির্দেশাবলি উৎকীর্ণ ছিল খোদ বাচ্চাদের হাতের লেখায় ও আঁকা ছবিতে। গ্রামাঞ্চলে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় শিশুহন্তারক রোগ।

এই সামবায়িক আবাসস্থলের চারপাশে একটি পরিখার ব্যুহ রয়েছে। আবাসিকরা সেটা নিজেরাই পালা করে পাহারা দেন, যাঁদের মধ্যে অনেকেই স্বয়ংক্রিয় একে-৪৭ রাইফেল চালাতে জানেন। তাঁরা রামদার ব্যবহারেও রীতিমত প্রতিভাবান। আমাদের পথ আটকে-রাখা গাছটিকে যে-কৃষকটি কেটে কুটিকুটি করে ফেলেছিল, সে আপনার চামড়া না কেটেই আপনাকে আস্ত ছিলে ফেলতে পারে। অথবা, আপনাকে সে পাউরুটির মত টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলতে পারে।

গত নভেম্বরে কন্ট্রারা আকুনিয়া সমবায় আক্রমণ করে, প্রকাশ্য দিবালোকে এবং সমস্ত শক্তি নিয়ে; মাত্র বত্রিশজন সশস্ত্র প্রতিরোধকারীর বিপরীতে প্রায় চারশতজন সৈন্য মিলে। আর্তুরো নামের যে বড়সড় তরুণটি প্রতিরক্ষা কমিটির নেতা ছিল, সে গর্ব নিয়ে বলে যে, পার্শ্ববর্তী সমবায় থেকে সহায়তা না আসা পর্যন্ত তারা প্রায় তিন ঘন্টা ঠেকিয়ে রেখেছিল আক্রমণকারীদের। শেষ পর্যন্ত কন্ট্রারা পরাজিত হয়, তেরটি মৃত্যু ও প্রায় চল্লিশজন আহতসহ। ‘আমরা কাউকে হারাইনি।’, আর্তুরো বুক উঁচিয়ে বলে। এরপর কন্ট্রাদের মাত্র আর বার দুয়েক দেখা গেছে এই এলাকায়, যদিও তারা অক্রমণ করার সাহস করেনি আর।

আমার মাথায় একটা চিন্তা আসে: যদি বিরোধী দলের দাবি সত্য হয় এবং সরকার এতটাই অজনপ্রিয় হয়ে থাকে, তাহলে তারা জনগণের হাতে সব অস্ত্র তুলে দিয়ে কী করে এতটা নিশ্চিত থাকতে পারে যে, এই অস্ত্রসমূহ তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হবে না? সেন্ট্রাল আমেরিকায় আর একটিও শাসকদল ছিল না যারা এই কাজ করতে সাহস করবে: এল সালবাদর নয়, গুয়াতেমালা নয়, নয় কোস্তারিকাও। অথচ স্বৈরাচারী, ’স্তালিনিস্ট’ নিকারাগুয়ায় সরকার চাষীদের সশস্ত্র করে তোলে, এবং তারা বিনিময়ে বন্দুকগুলোর প্রতিটি উঁচিয়ে ধরে প্রতিবিপ্লবী শত্রুদের বিরুদ্ধে।

এর কি কোনও তাৎপর্য থাকতে পারে?

দুপুরের খাবারের বিরতির সময় আমি পাঁচজনের একটি কৃষকদলের সঙ্গে আলাপ শুরু করি। তারা রামদাগুলো গাছের গুড়িতে গেঁথে রেখে একে৪৭গুলো সঙ্গে আনে। তারা কি এমন কাউকে চেনে যে কন্ট্রাদের দলে যোগ দিয়েছে? তারা অপহরণের ঘটনাগুলো জানে বলে জানায়। কিন্তু স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছে এমন কাউকে? না, তারা চেনে না। জনগণ কন্ট্রাদের ভয়ে খুব ভীত।

কৃষকদের একজন, উমবের্তো, ছোটখাটো চেহারার, দাঁতউঁচু হাসিওয়ালা, ছিল আদিবাসী, তবে সে ঠিক নিশ্চিত নয় কোন গোষ্ঠীর। সে এটুকু জানত যে সে মিসকিতো বা সুমো নয়।

‘আমি জানার চেষ্টা করছি, আমি আসলে কী?’ সে উত্তরাঞ্চলে বাস করতো, যে-জায়গা থেকে এখন লোকজন সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সে জানায়, কন্ট্রারা তাকে ধরে নিয়ে যায়, তাকে মেরে ফেলার ভয় দেখায়, কিন্তু সে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। পরে সে জানতে পারে যে, তারা তখনো তার পেছনে লেগে আছে, এবং সুযোগ পেলেই তাকে ধরে নিয়ে যাবে আবার। ‘এবার নিশ্চয়ই তারা আমাকে মেরে ফেলতো।’ তাই সে সানন্দচিত্তে স্থানান্তরিত হতে সায় দেয়।’ প্রথমদিকে এটা একটু কঠিন ছিল আমার জন্য। তবে এখন এটাকে আশীর্বাদ বলে মনে হয়।’ সে বসে ছিল ম্যাচকাঠির মত শীর্ণ একজন মানুষের পাশে, যার চুড়োটুপির পাশ দিয়ে তারের মত চুলের গোছা বেরিয়ে ছিল। ‘একই ঘটনা ঘটে আমার বেলাতেও।’, সেই লোকটি, রিগোবের্তো, বলে, ‘একই গল্প।’

পাঁচজনের আরেকজনের বড়ি ছিল উপকূলের জেলেদের গ্রামে, যেখানে জমি পাওয়ার কোন সম্ভাবনা ছিল না। বাকি দু’জন স্থানীয়। ‘তো, আপনারা কি এটাকে নিজেদের বাড়ি বলে মনে করেন?’, আমি জিজ্ঞাসা করি। ‘নাকি একে স্রেফ একটি সাময়িক আশ্রয় বলে বোধ হয়?’

আর্তুরো, পাহারাদলের নেতা, জবাব দেয়। ‘আপনি কী বলতে চান? এই মাটিতে আমাদের ঘাম মিশে আছে। এখানে আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েছি। আমরা এখানেই আমাদের জীবন গড়ছি। আপনি এসব কী বলছেন? এটাই আমাদের বাড়ি।’

‘এটা আমাদের প্রথম বাড়ি।’, পাঁচজনের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক জেলে, বয়স আনুমানিক পঞ্চাশ, বলে ওঠেন। তাঁর নাম ওরাসিয়ো, এবং তাঁর কথা শুনতে শুনতেই আমার বোধোদয় হয়। তিনি যা বললেন, এবং আদিবাসী উমবের্তো যা বলেছিল আমাকে- ‘আমি খুঁজছি আসলে আমি কে?’- দুটোই রিগেরোতে দেওয়া ফাদার মলিনার প্রার্থনাবক্তৃতার সেই মর্মবস্তুর সঙ্গে সংযুক্ত যে, নির্বাসনও কারও স্বদেশ হতে পারে, কিংবা মিশর কী ব্যাবিলনও। এটা সত্যি, বাস্তবে সোমোসার নিকারাগুয়া এদের স্বদেশ ছিল না, এবং এই বিপ্লব কার্যত এক ধরনের অভিবাসন, স্থানীয় এবং স্থানান্তরিত, উভয়ের জন্যই। তারা তাদের নিজেদের দেশকে, এবং তারও চেয়ে বেশি, নিজেদেরকেই আবিষ্কার করছিল। উমবের্তো আসলে এখানে বাস করতে করতেই একদিন আবিষ্কার করবে, সে আসলে কে।

আমি বলি, ‘আপনি ভাগ্যবান।’ ঘরের ধারণাটি আমার কাছে সমস্যা হয়েই থেকেছে বরাবর। তারা সেটা বোঝেনি যদিও, আর তাদেরকে তা বুঝতেইবা হবে কেন? আমাকে তো কেউ গুলি করতে আসেনি।

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close