Home অনুবাদ সালমান রুশদি > দ্য জাগুয়ার স্মাইল >> আলম খোরশেদ অনূদিত ধারাবাহিক [পর্ব ১৬]

সালমান রুশদি > দ্য জাগুয়ার স্মাইল >> আলম খোরশেদ অনূদিত ধারাবাহিক [পর্ব ১৬]

প্রকাশঃ September 21, 2017

সালমান রুশদি > দ্য জাগুয়ার স্মাইল >> আলম খোরশেদ অনূদিত ধারাবাহিক [পর্ব ১৬]
0
0

পর্ব ১৬

গণশুনানিগুলোতে যতগুলো প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশিবার উঠেছে চাহিদামাফিক গর্ভপাতের দাবি। সারা নিকারাগুয়ার নারীরা দাবি করেছেন যেন এই অধিকারটি, অধিকাংশের বিবেচনায় পুরুষতান্ত্রিক এই সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু নিকারাগুয়ার মত ক্যাথলিকতন্ত্রে নিমজ্জিত একটি দেশে গর্ভপাত বিষয়টি বিস্ফোরক হতে বাধ্য।

“এই অধিকারটি সংবিধানে প্রোথিত হলে,” আমি বলি, “সেটি হবে একটি সত্যিকারের বৈপ্লবিক বিষয়।” আমার মুখোমুখি পুরুষদের সবাইকে একটু অস্থির মনে হলো। “আমাদের মনে হয় না এটি সংবিধানের মত এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিলের উপযুক্ত বিষয়।” সোরিয়া বলেন। “আমরা যেটি প্রস্তাব করছি সেটি হলো, সংবিধান অনুমোদিত হয়ে যাবার পরপরই আমরা গর্ভপাতকে বৈধ করে একটি বিল তুলব।”

“অবশ্যই,” আমি বলি, “নারীর শরীরের ওপর তার আইনি অধিকারের বিষয়টি সংবিধানের জন্য উপযোগী কি না সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে? আগের কোন সংবিধানে এটা রাখা হয়নি, কিন্তু তাতে কী?”

“আমি যেমনটা বলেছি,” ইউর্গারিয়স বলেন, আসল কারণটাকে আত্মস্থ করে, “সর্বসম্মতির বিষয়টা খুব জরুরি।” এটা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে গর্ভপাতের প্রসঙ্গটা চূড়ান্ত সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে না।”

প্রাপ্তবয়স্কতার বিষয়টাও এমনই গোলমেলে ছিল। “আপনাদের মনে রাখতে হবে,” সোরিয়া বলেন, “নিকারাগুয়ায় ষোলো বছর বয়সেই পুরুষেরা সেনাবাহিনীতে, এবং তার আগে সান্দিনিস্তা বাহিনীতে, যোগ দিয়ে বিপুল সংখ্যায় প্রাণদান করেছে।” আমাকে এটা মনে করিয়ে দেওয়ার কিছু ছিল না। পোমারেস হাসপাতালের বালকেরা আমার মাথার ভেতর সোরগোল করে ওঠে : “আমি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য আর অপেক্ষা করতে পারছি না।”- “আমি আগামী সপ্তাহেই যাচ্ছি।”…“তাহলে তর্কটা হচ্ছে”, সোরিয়া বলতে থাকেন, “এদেরকে কি সংবিধান মোতাবেক প্রাপ্তবয়স্ক বলা যাবে?”

ইউর্গারিয়স, চারজনের মধ্যে সর্বজ্যেষ্ঠ, এটা নিয়ে তেমন সন্তুষ্ট ছিলেন না। “আমার নিজস্ব মত হচ্ছে, তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার থাকা উচিৎ,” তিনি বলেন, “তাই বলে ষোলো বছর বয়সে পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্কতা? টাকা তোলার এবং ইত্যাকার অধিকারসহ? অনেকেই বলেন এটা তার জন্য খুব কম বয়স এবং আমাকেও বলতেই হচ্ছে যে আমিও তাদের একজন।”

“যদিও আরও অনেকে,” রোচা বলেন, “বিশ্বাস করেন যে, বালকদেরকে এই যুক্তিতে অর্ধপ্রাপ্তবয়স্ক আখ্যা দেওয়াটাও ঠিক নয়। আমরা এটা নিয়ে আরও আলাপ আলোচনা করছি।”

তারপর ঈশ্বর। বেশ কয়েকটা গণসভায়, লেখকদেরটাসহ, এই দাবি ওঠে যে সংবিধানে “সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের নামে” কথাটার উল্লেখ থাকা উচিৎ। দেশজুড়ে এটা নিয়ে আবেগময় তর্কবিতর্ক চলছিল। এ-বিষয়ে পরিষদের অবস্থান কী ছিল?

এফএসএলএন-এর প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান, তারা আমায় বলে, ছিল ঈশ্বরের নাম উল্লেখের বিরুদ্ধে, তবে এটা চূড়ান্ত কোন অবস্থান ছিল না। কয়েকজন সান্দিনিস্তার অভিমত ছিল, থাকা না থাকা কোনটাই তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, তাই এতে যদি কিছু লোককে খুশি করা যায়, তাহলে তাদের দাবি মেনে নাও না কেন? অন্যদিকে সভার কিছু খ্রিস্টান সদস্য বলেন যে, শুধু উল্লেখ করাটা তো আসলে এখানেও না, সেখানেও না, গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সংবিধানে যেন খ্রিস্টধর্মের ’প্রতিবেশীকে ভালোবাসার’ নীতির প্রতিফলন ঘটে।

“যারা এটা নিয়ে বেশি জবরদস্তি করছে তারা সব রক্ষণশীল,” আলেহান্দ্রো  ব্্রাবো বলেন। তাহলে এর সম্ভাব্য ফলাফল কী? “এটা এখনও অনিশ্চিত। হয়ত ঈশ্বর থাকবেন, হয়ত না।” ঈশ্বর, ষোল বছরের প্রাপ্তবয়স্কজন এবং গর্ভপাতসহ অথবা ব্যতিরেকেই ১৯৮৬ সাল শেষ হওয়ার আগেই সংবিধানকে অনুমোদন করতে হবে। (পরবর্তী রাজনীতির কূটকৌশল এটাকে অনিশ্চিত করে তুলেছিল।) আমার কাছে এটাকে মনে হয়েছিল, এবং আমি তা বলিও, একটা গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তবে যতদিন জরুরি অবস্থা থাকবে, ততদিন এই সংবিধান একটুকরো কাগজের চেয়ে বেশি কিছু নয়; প্রেসিডেন্টের হাতেই রয়ে যাবে অধিকাংশ ক্ষমতা এবং বেশ কিছু নাগরিক অধিকার স্থগিত থাকবে। নিকারাগুয়ার সমালোচকেরা বলবেন যে, জরুরি অবস্থার অবসান হবে না কোনদিন, এবং এটা বরং স্বৈরতন্ত্রের প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। (জরুরি অবস্থার সঙ্গে আমার নিজের সম্পর্ক, যেটা স্থাপিত হয়েছিল মধ্য সত্তরে, ভারতে ইন্দিরা গান্ধির জরুরি অবস্থাকালীন স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলে, ছিল খুবই অস্বস্তিকর।)

তবে যে-উদ্দীপনা ও কঠোরতা নিয়ে নিকারাগুয়া এই সংবিধান রচনার প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছিল সেটাকে কিছুতেই লোকদেখানো জানালাসজ্জা বলা যাবে না। নিকারাগুয়ার জরুরি অবস্থা কোন অবস্থাতেই রাজনীতিবিদদের ক্ষমতা আঁকড়ে থার আকাঙ্ক্ষার ফসল ছিল না, যেমনটা ছিল ইন্দিরা গান্ধির ভারতে, বরং তা ছিল বর্হিশক্তির আগ্রাসনের অনিবার্য প্রতিউত্তর। সের্হিও রামিরেস আসলে এই কথাটাই বলতে চেয়েছিলেন, যখন তিনি উচ্চারণ করেছিলেন যে, শান্তিকালে বরং আরও বেশি গণতন্ত্র থাকবে, কম নয়।

আমি সংসদ ভবন ত্যাগ করি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ মনোভাব নিয়ে। এনরিকে আকুনিয়া সমবায়ে এবং আজকে এখানে আমি দেখেছি জনগণ কঠোর পরিশ্রম করছে তাদের এক নিজন্ব আত্মপরিচয়, এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে, যা সম্পূর্ণ হবার আগেই হয়তো বাইরের চাপে ভেঙে পড়বে।

নিকারাগুয়ার সংবিধান ছিল এমন এক অধিকারদলিল যাকে আমি ব্রিটেনের নীতিগ্রন্থর ওপরে স্থান দিতে কিছু মনে করব না। তবে গোল্লায় যাক সব,  চুলোয় যাক সেইসব ষোলো বছরের বালকদের মৃতদেহ। কুকুরকে একখানা বাজে নাম দাও, তারপর ঝুলিয়ে দাও দড়িতে। ব্যস।

ক্যাথারসিস বিষয়ে

আমি এএসটিসি ক্যাফেটেরিয়ার বারান্দায় দুইজন তরুল নিকারাগুয়া লেখক, মার্তিন মার্তিনেস ও দোনাল্ডো আলতামিরানো এবং পূর্ব ইউরোপ থেকে আগত দুই লেখক : বুলগেরিয়ার ধীরস্থির, মোটাসোটা ও মিতবাক কবি কালিন দনকভি আর সোভিয়েত লেখক সমিতির অন্যতম সম্পাদক, একজন পুরোপুরি নাগরিক মানুষ, ভ্লাদিমির আমলিস্কির সঙ্গে বসে ছিলাম। তবে আমাদের কথোপকথন খুব একটা সহজ ছিল না। একজন অনুবাদক আমলিস্কি ও দনকভি-কে স্প্যানিশে অনুবাদ করছিলেন, এবং সেটা আমার বোধগম্যতার জন্য দ্বিতীয় আরেকজন অনুবাদককে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে হচ্ছিল। তা সত্ত্বেও আমি ভাবলাম, চেষ্টা করেই দেখা যাক না। আমি জানতে চাই, “আমাদের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের কথিত সেন্সরপ্রথার উদারীকরণ বিষয়ে কী খবর নিয়ে এসেছেন, কমরেড আমলিস্কি?” তিনি কয়েকবার মাথা নাড়েন। “অবস্থা আগের চেয়ে ভালো,” তিনি বলেন। “এখন অনেক লেখক, এবং, এটা আরও গুরুত্বপূর্ণ, অনেক প্রকাশকই আস্থার সঙ্গে সামাজিক বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলছেন। আমি নিজে কিশোর অপরাধ নিয়ে লিখেছি।” তিনি একই সঙ্গে তাঁর পাওয়া পুরস্কারগুলো সম্পর্কেও বলেন। আমার মনে হলো, তিনি যা বলছেন সেগুলো সম্ভবত সত্য। আমি তবু চাপ অব্যাহত রাখি, “ড. জিভাগোর কী খবর? আমরা কি দ্রুত এর প্রকাশনা আশা করতে পারি?”

“আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে,” আমলিস্কি জবাব দেন, “বরিস পাস্তারনাকের এই উপন্যাসটি, ড. জিভাগো, একটি দুর্বল উপন্যাস। তাঁকে নোবেল পুরস্কারটি ঠিক সাহিত্যিক কারণে দেওয়া হয়নি।”

“সত্যি বলতে কী, আমারও এই উপন্যাসটি অত পছন্দের নয়,” আমি বলি।

“এবং এটা থেকে যে ছবিটি হয়েছে সেটা আরও জঘন্য,” তিনি যোগ করেন।

“হ্যাঁ,” আমি বলি, “জিভাগো সম্পর্কে আপনারা যাইই মনে করুন না কেন, এটা কিন্তু সোভিয়েত সেন্সরশিপের একটি প্রতীকরূপে দাঁড়িয়ে গেছে, এবং, যাই হোক, আপনি নিশ্চয়ই এটা মনেপ্রাণে বিশ্বস করেন না যে, পাস্তারনাক সত্যি সত্যি নোবেল পুরস্কারের যোগ্য লেখক নন।”

আমলিস্কি আবার মাথা নাড়েন, বহুবার। “হ্যাঁ, আমার মনে হয় উপন্যাসটি সম্ভবত দ্রুতই প্রকাশিত হবে,” তিনি বলেন, যেনবা এটি খুবই তুচ্ছ বিষয়। “আর তাঁর কবিতার জন্য,” তিনি যোগ করেন, যুক্তিসঙ্গতভাবেই, “আমি জগতের সকল পুরস্কারই তাঁকে দিতাম।”

”অন্য লেখকদের কী অবস্থা?” “কিছু ভুল করা হয়েছিল,” তিনি বলেন, “আমাদের বেশ কয়েকজন বড় লেখকের বেলায়: আখমাতোভা, বুলগাকভ, পাস্তারনাক। এগুলোকে এখন শোধরানো হচ্ছে। যেমন ধরুন, গুমিলিয়ভ, আখমাতোভার স্বামী। তাঁর কবিতার একটি খণ্ড এখন প্রকাশিত হচ্ছে।”

মান্ডেলস্টাম-এর নামোল্লেখ করা হয় না, আমি লক্ষ করি; এবং শত হলেও, গুমিলিয়ভের ক্ষেত্রে যে ‘ভুলটি’ করা হয়েছিল, সেটা হলো, তাঁকে মৃত্যদ- দেওয়া হয়েছিল। এই শব্দটিকে ভাবপ্রকাশের জন্য অপ্রতুল মনে হয়।

“হ্যাঁ,” আমলিস্কি বলেন, “কিছু নিশ্চিত ভুল।” দৃশ্যতই আমার কিছু বক্তব্য অনুবাদ প্রক্রিয়ায় হারিয়ে গিয়েছিল।

“আজকাল রুশ সাহিত্যে এক ধরনের অদ্ভুত দ্বৈতব্যক্তিত্বের প্রকাশ দেখা যায়,” আমি ইঙ্গিতে বলি। “রাশিয়ার বাইরে পরিচিত অধিকাংশ লেখকই রাশিয়ার অভ্যন্তরে অপঠিত, আবার অন্যদিকে তার উল্টোটাও সত্য। রাশিয়ার ভেতরে বাস-করা লেখকদের কাছে এর অনুভূতিটা কীরকম?”

তিনি বিরোধী মতের লেখকদের আক্রমণ করে এর উত্তর দেন। তারা সাহিত্য রচনা বন্ধ করে দিয়ে এখর প্রচারপত্র লিখছেন। তারা খুবই মধ্যমানের লেখক। “সেটা যদি সত্যিও হয়,”, আমি বলি “এবং বাস্তব সত্য হিসাবেই আমি জানি এটা ঠিক নয়, অন্তত ব্রদস্কি, সলঝেনিৎসিন, সিনিয়াভস্কি, ভয়নোভিচদের বেলায় তো নয়ই- কিন্তু যদি হয়েও থাকে, মধ্যমানটুকু নিশ্চয়ই একজন লেখককে নিষিদ্ধ করার কারণ হতে পারে না। তৃতীয় শ্রেণির লেখকরাও তো দুনিয়া জুড়েই প্রকাশিত হয়ে চলেছেন।”

“আপনাকে সলঝেনিৎসিন সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অভিমতটা বলি,” তিনি বলেন। “আমি তাঁর লেখা নিয়ে মাথা ঘামাই না আজকাল। এর মান দিনদিন খারাপ হচ্ছে, এবং তিনি একজন চরম ডানপন্থী ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন, খুবই রেগনধর্মী, খুবই অনুদারপন্থী।”

আমি নিজেও আমেরিকায় আসার পর সলঝেনিৎসিনের বেশ কিছু উক্তির ব্যাপারে খুবই সমালোচনামুখর ছিলাম, আমি বলি; তবে নিশ্চয়ই, সবকিছুর ওপরে গুলাগ আর্কিপেলাগো বইয়ের লেখক হিসাবে তাঁর যে অবস্থান সেটা থেকে সেগুলোকে আলাদা করে দেখা উচিত আমাদের? “আমি এই বই, গুলাগ আর্কিপেলাগো সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অভিমতটা বলি,” আমলিস্কি প্রস্তাব করেন। “আপনাকে বুঝতে হবে যে, আমাদের বিখ্যাত ধ্রুপদী লেখাগুলোতে একটা উচ্চ ট্রাজেডির ঐতিহ্য রয়েছে, সেখানে সাংঘাতিক সব ঘটনা ঘটানো এবং দেখানো হয়, কিন্তু সবসময়ই শেষে একটা ক্যাথারসিস থাকে, যাকে বলে আত্মার শোধন। কিন্তু সলঝেনিৎসিনে আমরা কোনও ক্যাথারসিস পাই না। সেজন্যই আমি তাঁর কাজ নিয়ে বিশেষ ভাবি না।”

আমি এটা বলতে যাচ্ছিলাম যে সলঝেনিৎসিনের লেখায় ক্যাথারসিসের অনুপস্থিতির সঙ্গে বরং সাহিত্যিক সীমাবদ্ধতার চেয়ে রাশিয়ার ইতিহাসের সম্পর্ক বেশি, কিন্তু সেই মুহূর্তে আমি অনুভব করি যে আমাদের নিকারাগুয়ার লেখক বন্ধুরা ধন্দে পড়ে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। “সোভিয়েত ইউনিয়নের মত দেশে আরও অনেক বড় সমস্যা রয়েছে।” মারিও মার্তিনেস বলেন। “এই দেশটা কীভাবে তার অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করছে সেটা শুনতে খুব ভালো লাগছে।”

পরে একজন ভাষান্তরকারী আমাকে একটি শ্বাসরুদ্ধকর প্রশ্ন করে: “শ্রমশিবির কী জিনিষ?”

“শ্রমশিবির কী জিনিষ?” আমি প্রতিধ্বনি করি, অবিশ্বাসের সঙ্গে।

“হ্যাঁ, আমি বুঝতে পারছি আপনারা কী বলতে চাচ্ছেন,” এক ধরনের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। কিন্তু আপনারা কি সত্যি বলছেন যে রাশিয়ায় এরকম বস্তু রয়েছে?”

“হু”, আমি থতমত খেয়ে বলি, “হ্যাঁ, মানে।”

“কিন্তু এটা কী করে সম্ভব?” সে স্পষ্ট বেদনার সঙ্গে বলে। “সোভিয়েত ইউনিয়ন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে কী সাহায্যই না করে। তারা এরকম কাজ কী করে করতে পারে?”

নিকারাগুয়ায় এক ধরনের নিষ্পাপতার আবহ রয়েছে। ’বিপ্লব’ শব্দটির মধ্যে যে রোমাঞ্চ তার অন্যতম একটি সমস্যা হচ্ছে, সবরকম স্বঘোষিত বৈপ্লবিক আন্দোলনের ব্যাপারে ঢালাও অনুমোদন তার সহজাত। দোনান্ডো আলতামিরানো আমাকে বলেন, আইরিশ বিপ্লবী বাহিনীর প্রতি কী গভীর সংহতি তিনি অনুভব করেন।

এখন, সারা সন্ধ্যা যিনি চিন্তামগ্নভাবে নিরব ছিলেন, সেই কালিন দনকভি কথা বলতে শুরু করেন, স্টিমরোলারের মত অপ্রতিরোধ্য গতিতে, বুলগেরিয়ার কবিতা বিষয়ে। “আমাদের ঐতিহ্য হচ্ছে শহিদ কবিদের,” তিনি ঘোষণা করেন। “আপনি জানেন আমাদের লেখক সমিতির প্রতীক হচ্ছে বুকে বুলেটের ছিদ্রযুক্ত পাখাঅলা ঘোড়া, প্যাগাসাস?” বুলগেরিয়ার সবচেয়ে সফল আধুনিক কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে মৃত কবিদের একটি কবিতা সংকলন। এবং এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কেননা কবিরা জনগণের কষ্টের ভাগীদার হলে তাদের সাহিত্যমানের উন্নতি ঘটে।”

মার্তিনেস ও আলতামিরানো গভীর উষ্ণতার সঙ্গে তাঁর এই উচ্চারণে সাড়া দেন। নিকারাগুয়ার সঙ্গে এর সমান্তরালটুকু স্পষ্টতই দৃশ্যমান। স্থানীয় শহিদ কবিদের প্রেতাত্মারা এএসটিসির ক্যাফেতে এসে আমাদের সাথে যোগ দেন, দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, লেওনেল রুগামার ভূত, যিনি পুরনো দিনগুলোতে ইন্ডিয়া ক্যাফেতে বসে তাঁর পাগল চাচার কথা বলতেন, যিনি থাকতেন মাকোন্দোতে, যার পেছনেই ছিল মমোতোম্বো আগ্নেয়গিরি; যিনি মাত্র কুড়ি বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন; এবং যিনি বিশ্বাস করতেন বিপ্লব হচ্ছে, “প্রজাতির সঙ্গে মিলন।”

আমি রুগামার ভূতকে বলি এটি একটি সুন্দর রোমান্টিক অনুভূতি। তবে জাতিগঠনের জন্য আরেকটু গদ্যধর্মী কিছুর দরকার, উদাহরণস্বরূপ, পিএলও এবং আইআরএ মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা।

আমি ভাবি নিকারাগুয়ার ভূতেরা সেখানকার জীবিতদেরকে এই পার্থক্যটুকু করতে দেবে কি না। একদিকে মৃতদের রোমাঞ্চ; অন্যদিকে আমেরিকার বিশাল মুষ্টি। এটি একটি দারুণ ফাঁদে পরিণত হতে পারে।

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close