Home অনুবাদ সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল পর্ব ২ / আলম খোরশেদ অনূদিত

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল পর্ব ২ / আলম খোরশেদ অনূদিত

প্রকাশঃ November 20, 2016

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল পর্ব ২ / আলম খোরশেদ অনূদিত
0
0

দ্য জাগুয়ার স্মাইল / পর্ব ২

সান্দিনোর টুপি

“ক্রিস্তোফোরো কোলোন স্পেনের পালোস দে মোগের থেকে যাত্রা শুরু করেন, মহান খানদের দেশ আবিষ্কারের আশায়, যেখানে রয়েছে সোনার দুর্গ, যেখানকার প্রাণীগোষ্ঠী বেড়ে উঠছে বন্যস্বভাবে, এবং সেখানে হাঁটার পথে মহামূল্যবান রতেœর সন্ধান মেলে। তবে সেই পৃথিবীর পরিবর্তে, আরো একটি, সেটিও মূল্যবান, সুন্দর এবং রূপকথার মতো, দেশ আবিষ্কৃত হলো, যার নাম আমেরিকা।”

আমি হাবানা বিমানবন্দরে কুবার একটি ‘তামাক মানচিত্রে’ উপর্যুক্ত স্তবকটি পাঠ করি, জীবনে প্রথমবারের মতো মধ্য-আমেরিকায় ভ্রমণকারী একজনের জন্য এটিকে একটি অনুকূল আখ্যান বলেই মনে হয়েছিল। পরে অবশ্য বিমানটি যখন আপোয়েক আগ্নেয়গিরির খন্দে তৈরি হওয়া সবুজ জলাধার অতিক্রম করছিল এবং দৃষ্টিতে ভেসে উঠছিল মানাগুয়া শহরের ছবি, তখন আমার আরেকটি অন্ধকার আখ্যান, নেরুদার কবিতা সেন্ত্রো আমেরিকা থেকে উৎকলিত, মনে পড়ছিল :

বেতের মত দীঘল দেশ

অত্যাচারের মত উষ্ণ

তোমার পা হন্ডুরাসে, তোমার শোণিত

সান্তো দোমিঙ্গোতে

রাতের বেলা তোমার চোখ নিকারাগুয়ায়

আমাকে স্পর্শ করো, আমাকে আহ্বান করো, আমাকে আলিঙ্গন করো

আর সারা আমেরিকা জুড়ে আমি দরজায় করাঘাত করি

কথা বলার জন্য

আমি বোবা জিহ্বায় টোকা দিই

আমি পর্দা তুলি, আমি রক্তে হাত ডোবাই :

হে আমার মাটির বেদনা, হে আমূল প্রোথিত নৈঃশব্দ্যের

মৃত্যু-নূপুর

হে দীর্ঘ যন্ত্রণার মানুষ

হে অশ্রুর চিকন কোমর!

নিকারাগুয়ার জীবিতদের বোঝার জন্য আমার মনে হয়েছিল মৃতদের দিয়ে শুরু করা উচিত। দেশটি প্রেতে পরিপূর্ণ ছিল। আমার আগমনের মুহূর্তেই সান্দিনো বেঁচে আছে বলে একটি দেয়াল চীৎকার করেছিল আমার দিকে, এবং সঙ্গে সঙ্গে একটি বিশাল গোলাপি প্রস্তরখণ্ড জবাব দিয়েছিল এই বলে ক্রিস্তো বেঁচে আছে, এবং সঙ্গে আরো কিছু যোগ করে, শিগগিরই ফিরবে। এর কিছু পরেই আমি সেই শূন্য পাটাতনটি অতিক্রম করি, যেখানে সাত বছর আগে ঘোড়ায় চড়া দানবটির একটি মূর্তি ছিল, অবশ্য সেটি তার আসল ছবি নয়, ইতালি থেকে দেওয়া একটা পুরনো মূর্তির ওপর তার মুখ বসানো। আগের মুখটি ছিল মুসোলিনির। স্বৈরাচারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে মূর্তিও উল্টে যায়, কিন্তু শূন্য ভিতটি টিকে ছিল একধরনের প্রতারণার মতো। সেখানে লেখা সোমোসা বেঁচে আছে; শীতল, কালো এক শব্দবন্ধ, যা তখন সচরাচর শোনা যেত না নিকারাগুয়ায়, কিন্তু দানবটি ঠিকই বেঁচেবর্তে ছিল। তাচো ১৯৮০ সালে পারাগুয়াইতে আর্হেন্তিনীয় মন্তোনেরো বাহিনীর আততায়ীর হাতে নিহত হন, কিন্তু হন্ডুরাস সীমান্তে কাউবয় টুপি-পরা তাঁর প্রেতচ্ছায়া ঘুরে বেড়াতো সদাই।

মানাগুয়া তার নিজেরই লাশের চারপাশে গড়ে ওঠে। ১৯৭২ এর ভয়াল ভূমিকম্পে এই শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ গুড়িয়ে যায়, এবং আগে যেটা ছিল শহরের প্রাণকেন্দ্র তার সিংহভাগই বর্তমানে খালি জায়গা। সোমোসার আমলে  ধংসযজ্ঞের স্তূপ হিসেবেই এটি পড়েছিল, তাঁর পতনের পরই কেবল জায়গাটিকে পরিষ্কার করা হয়, এবং পুরনো মানাগুয়া শহরকেন্দ্রে ফের ঘাস লাগানো হয়।

শহরের ফাঁকা কেন্দ্রটি তাকে একধরনের সাময়িকতা, সিনেমার সেট-সদৃশ অবাস্তবতা দান করে। তখনও ঘরবাড়ির দারুণ স্বল্পতা ছিল এবং মানাগুয়াবাসী যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তাই দিয়েই কোনমতে বাস্তুসংস্থান করেছে। একটি পরিত্যক্ত বিপণীবিতানে বসেছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিস। খোদ জাতীয় সংসদই বসতো একটি রূপান্তরিত ব্যাংকে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালটি, একটি ছোটখাটো কংক্রিটের পিরামিড বিশেষ, দুর্ভাগ্যজনকভাবে অক্ষত রয়ে গিয়েছিল। এটি পুরনো মানাগুয়ার প্রেতাত্মার মাঝখানে একটি অশুভচিহ্নের মতো দাঁড়িয়ে ছিল: কুৎসিত আমেরিকান, কিন্তু জীবন্ত তো বটে! (আমি আবিষ্কার করি যে এমন একটি শহরকে প্রতীকী ভাষা ছাড়া বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব ছিল।)

লোকের সংখ্যাও কম ছিল। নিকারাগুয়ার জনসংখ্যা ছিল ত্রিশ লক্ষেরও কম, এবং যুদ্ধ সেটা আরো কমিয়ে দিচ্ছিল। শহরের রাস্তায় আমার প্রথম কয়েক ঘণ্টায় আমি এমন কিছু দৃশ্য দেখি যা আমার ভারত, পাকিস্তানের অভিজ্ঞতায় অভ্যস্ত চোখে খুবই পরিচিত ঠেকেছিল; রাজধানীর অল্পসংখ্যক বাস, যেগুলো খুব সম্প্রতি আলফোনসিনের নতুন আর্হেন্তিনার উপহার ছিল, উপমহাদেশীয় কায়দায় প্রায় শূন্যে-ভাসা মানুষে ঠাসাঠাসি হয়ে ফেটে যাবার উপক্রম করছিল। রাস্তার দু’ধারে মানাগুয়া শহরে অনেক স্বপ্ন নিয়ে আসা গ্রামের চাষাদের খাটানো পলকা ঘরগুলো দেখে কোলকাতা ও মুম্বাইয়ের বস্তিগুলোর কথা মনে পড়ছিল। পরে আমি উপলব্ধি করেছিলাম যে সেইসব বহুমাত্রিক শহরগুলোর এমন প্রতিচ্ছবি আসলে সেই স্বৈরাচারের মূর্তিবিহীন ভিতটির মতই প্রতারক ছিল। নিকারাগুয়া, যার আকার ছিল ওকলাহোমা রাজ্যের সমান (আপনি যদি ইংল্যান্ড ও ওয়েলসকে উল্টিয়ে দেখেন তাহলে এর অনুপাত সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেতে পারেন), সেটি মধ্য-আমেরিকার সবচেয়ে জনবিরল দেশ। সারা নিকারাগুয়ায় যত মানুষ ছিল তার প্রায় ছয় গুণ লোক থাকে ন্যুয়র্ক শহরে। মানাগুয়া শহরকেন্দ্রের এই শূন্যতা একটি জনাকীর্ণ বাসের চেয়েও বেশি কিছু উন্মোচন করে।

এই শূন্যতা, আর ফাঁকা রাস্তাঘাট পূরণ করছিল ভূতেরা, মৃত শহীদেরা। আর্হেন্তিনার ঔপন্যাসিক এর্নেস্তো সাবাতো বুয়েনোস আইরেসের বর্ণনা দিতে গিয়ে একদা বলেছিলেন যে এর রাস্তাগুলোর নাম তার নায়কদের স্মৃতিগুলোকে সমাধিস্থ করার কাজ করেছে, নিকারাগুয়াতেও আমার এমন ধারণা হয়েছিল। এখানকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বরা প্রায় সবাই মারা গেছেন আর তাঁদেরকে অমর করে রেখেছে হাসপাতাল, স্কুল, থিয়েটার এমনকি (মহান কবি রুবেন দারিয়োর ক্ষেত্রে) একটি আস্ত শহর। ধ্রুপদী গ্রীসে তার নায়কেরা ঈশ্বর হওয়ার আশা করতেন, নিদেনপক্ষে নক্ষত্রম-লীরূপে নবজন্ম নিতে চাইতেন, কিন্তু বিশশতকের একটি গরীব শহরের নায়কদের এই পার্ক কিংবা স্টেডিয়াম জাতীয় গাদ্যিক অমরত্বেই খুশি থাকতে হয়েছে।

সান্দিনিস্তা জাতীয় স্বাধীনতা মোর্চার প্রথম দিককার দশ জন নেতার মধ্যে নয় জনেরই মৃত্যু হয়েছিল সোমোসার পতনের আগেই। সান্দিনিস্তার রং – কালো আর লালে রঙিন তাঁদের বিশাল মুখগুলো বিপ্লবী চত্বরের ওপর ঝুঁকে থাকে সারাক্ষণ। কার্লোস ফনসেকা (যিনি ১৯৫৬ সালে এই মোর্চা গঠন করেন এবং সান্দিনিস্তা বিজয়ের মাত্র আড়াই বছর আগে ১৯৭৬ এর নভেম্বরে নিহত হন), সিলভিয়ো মায়োরগা, হেরমান পমারেস : তাঁদের নামগুলো ছিল মন্ত্রের মতো। একমাত্র জীবিত সদস্য তোমাস বোর্হে, বর্তমানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিনিও ছিলেন ঐ দলে, অমরদের মাঝখানে একমাত্র জীবিত। বোর্হের ওপরও অমানুষিক নির্যাতন হয়েছিল, এবং গল্প প্রচলিত আছে যে তিনি বিপ্লবের পর তার ‘প্রতিশোধ নিয়েছিলেন’ নির্যাতনকারীকে ক্ষমা করে দিয়ে।

একটি দেশে, যার ইতিহাস হচ্ছে ছেচল্লিশ বছরের এক ধারাবাহিক রক্তযজ্ঞ, যাতে এক সোমোসারাই পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী ও নিষ্ঠুরতম স্বৈরাচারের সভাপতিত্ব করেছিল, এরকম শহিদী সংস্কৃতির উত্থান খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেখানে বারে বারে আমি মৃতদের কিংবদন্তি শুনেছি। কবি লিয়নেল রুগামার কথা, যিনি একটি বাড়িতে আটকাপড়া অবস্থায় সোমোসার ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা তাঁকে আত্মসমর্পণ করতে বললে তিনি চীৎকার করে বলেন, তোর মা আত্মসমর্পণ করুক, এই বলে শেষ পর্যন্ত লড়াই করে বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেন। শুনেছি মানাগুয়ার একটি তথাকথিত নিরাপদ বাড়িতে গ্লোরিয়া কাম্পোস ও দোরিস তিহেরিনোর সঙ্গে আটকা পড়া হুলিয়ো বুইত্রাগোর কথা। এক পর্যায়ে সবাই মারা গেলে তিনি একাই সোমোসার মহাপরাক্রমশালী ট্যাংক ও ভারী কামানের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লড়াই চালিয়ে যান, যা সারা দেশের মানুষ টেলিভিশনে সরাসরি প্রত্যক্ষ করে; সোমোসা ভেবেছিলেন তিনি সান্দিনিস্তাদের পুরো একটা দলকে বন্দী করেছেন এবং তিনি তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার মাধ্যমে একটি শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন, যা ছিল বিরাট এক ভুল হিসাব, কেননা জনগণ যখন দেখলো বুইত্রাগো একাই এত বড় একটা বাহিনীকে এতক্ষণ এককভাবে প্রতিরোধ করে এক পর্যায়ে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে বেরিয়ে এসে মৃত্যুবরণ করলেন, তখন তারা বরং উল্টো বার্তা পেলো যে প্রতিরোধ সম্ভব।

নিকারাগুয়ায় ‘সাত বছর পর’ও তার দেয়ালগুলো মৃতদের সঙ্গে কথা বলতো; কার্লোস আমরা সেখানে পৌঁছুচ্ছি, কিংবা, হুলিয়ো আমরা ভুলিনি।

আদিমতাবাদী চিত্রকর গ্লোরিয়া গেভারার গেরিলা যীশু নামের একটি শিল্পকর্মে দেখা যায় নিকারাগুয়ার একটি পাথুরে প্রান্তরে তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করা হচ্ছে। তিনজন কৃষক রমণী, দুজন নতজানু, একজন দণ্ডায়মান, ক্রুশকাঠের নিচে ক্রন্দনরত, যাতে কাঁটার মুকুট আর সংক্ষিপ্ত কোমরবন্ধনীর পরিবর্তে যীশুকে দেখা যায় জিন্স আর ডেনিমের শার্ট পরিহিত অবস্থায়। এই ছবিটি অনেককিছুই ব্যাখ্যা করে। মধ্য-আমেরিকার আগ্নেয়গিরির নিচে বসবাসরত মানুষদের ধর্মের সঙ্গে মৃত ও শহিদদের অনেক বড় সম্পর্ক রয়েছে এবং নিকারাগুয়ায় বহুলোক ধর্মের ভেতর দিয়েই বিপ্লবের কাছে পৌঁছেছে। গীর্জার যাযক ও ভক্তের যৌথ প্রার্থনারীতির আকারে এখন অনেক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিভূমি তৈরি হয়েছে। সান্দিনোর পুরনো শ্লোগান স্বাধীন দেশ কিংবা মৃত্যু এখন জাতীয় শ্লোগানে পরিণত হয়েছে, কোনো জনসভার শেষে এখন মঞ্চ থেকে কেউ একজন চীৎকার করে স্বাধীন দেশ ধ্বনিটি উচ্চারণ করলে তার উত্তরে জনতাকে, (আপনি যদি তাদের ইতিহাসের অংশীদার না হন, কিংবা যদি আরেক দূরবর্তী শহিদী-সংস্কৃতি, খোমেনির ইরানকে ভীতিকর সতর্ক সংকেত বলে মনে করেন আপনি) আপনার কাছে মনে হবে ভৌতিকভাবে পাল্টা গর্জন করে বলছে কিংবা মৃত্যু

[চলবে…]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close