Home অনুবাদ সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল পর্ব ৩ / আলম খোরশেদ অনূদিত

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল পর্ব ৩ / আলম খোরশেদ অনূদিত

প্রকাশঃ November 30, 2016

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল পর্ব ৩ / আলম খোরশেদ অনূদিত
0
0

দ্য জাগুয়ার স্মাইল / পর্ব ৩

নিকারাগুয়ার বিপ্লব ছিল এবং এখনো আছে, একটা প্রচণ্ড আবেগের বিষয় হয়ে। এর রয়েছে পার্থিব ও খ্রিস্টীয় – এই দু’রকম প্রতিধ্বনি। এ-দুটোর সমন্বয় সাধনই রয়েছে সান্দিনোবাদের মর্মে। গ্লোরিয়া গেভারার চিত্রকলা এটাই উন্মোচন করে দেখায়।

তারপর

আমরা আমাদের মৃতদের জাগাতে যাবো

তাদেরই কাছ থেকে পাওয়া জীবন দিয়ে

এবং আমরা একসঙ্গে গান করবো

যখন পাখিদের ঐকতান

আমেরিকার দৈর্ঘ্যপ্রস্থ জুড়ে

আমাদের বার্তাকেই ছড়িয়ে দেবে

এই মৃতদের প্রজন্মই ‘সাত বছরের স্বাধীন’ নিকারাগুয়ার পরিপ্রেক্ষিত নির্মাণ করে, আর পরিপ্রেক্ষিত ছাড়া  সেখানে কোন অর্থই থাকতে পারে না। সোমোসা-শক্তির ভিত্তিভূমি বলে পরিচিত ভয়ঙ্কর সুড়ঙ্গঘর লা লোমার সামনে দাঁড়িয়ে আপনার মনে পড়তে থাকবে যে প্রথম সোমোসা, আনাস্তাসিয়ো গার্সিয়া সোমোসা কুড়ি হাজার নিকারাগুয়াবাসীর মৃত্যুর পৌরোহিত্য করেছিলেন, রিয়নের এক নৃত্যানুষ্ঠানে কবি রিগোবের্তো লোপেসের হাতে খুন হওয়ার আগ পর্যন্ত (যিনি তার কিছুক্ষণ পরেই ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যদের হাতে নিহত হন); যে, প্রথম তাচো-র কোন এক পুত্র লুইসের সংক্ষিপ্ত ও সামান্য উদারীকরণ পর্বের পর, তার অপর পুত্র স্বাভাবিক সোমোসা কর্মকাণ্ড শুরু করেন পুনরায় ১৯৬৭ সালে। সে ছিল তাচো দুই বংশের সর্বশেষ ও সবচেয়ে লোভাতুর সদস্য। সময়টা ছিল এই ভয়ঙ্করের অবসানের মাত্র সাত বছর পরের কথা, যখন স্বৈরাচারের ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানায় বাঘের মুখে মানুষদের ঠেলে দিয়ে হত্যা করা হতো; নির্যাতন, খোজাকরণ, ধর্ষণোৎসবের স্রেফ সাত বছর পর। দানব-পতনের মাত্র সাত বছর পরের সময়। লা লোমার সামনে, নিকারাগুয়া আরো একবার একনায়কের দেশ হয়ে গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন দাবিকে অশ্লীল শোনায়। এই সুড়ঙ্গঘরটা ছিল স্বৈরাচারের প্রতীকী বাস্তবতা, তার ঘৃণিত স্মারক ও অবশেষ। কবন্ধ, দলিত, মথিত নিকারাগুয়ার ভূতেরা প্রতিদিন এখানে যা ঘটতো এবং যা আর কোনদিন ঘটা উচিৎ নয়, তারই সাক্ষ্য দিয়ে চলেছে আজও।

সবচেয়ে বিখ্যাত প্রেত, আউগুস্তো সেসার সান্দিনো, এতদিনে প্রায় পুরোপুরি কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন, অনেকটা গান্ধীরই মতো। বিশাল টুপিপরা ছোটখাটো একজন ভুরু কোঁচকানো মানুষ, যিনি একগুচ্ছ গল্পের সমাহারে পরিণত হয়েছেন আজ। ১৯২৭ সালে তিনি মেহিকোর উয়াস্তেকা পেট্রোল কোম্পানির বিপণন বিভাগের প্রধান ছিলেন, যখন নিকারাগুয়ার উদারপন্থী সাকাসা, সামরিক বাহিনীর প্রধান মনকাদর সমর্থনে, যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত রক্ষণশীল শাসক আদোলফো দিয়াসের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক দেন। সান্দিনো তখন নিকারাগুয়ায় ফিরে উদারপন্থীদের সঙ্গে লড়াইয়ে যোগ দেন। কিন্তু মনকাদা যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করে অস্ত্র সংবরণ করেন, তখন সান্দিনো তাতে অস্বীকৃত হন, এবং মনকাদাকে মার্কিনীদের বলতে হয়, “আমার সবাই আত্মসমর্পণ করেছেন একজন ছাড়া”, এবং তাঁর ‘ক্ষ্যাপাটে ছোট্ট সেনাদল’ পর্বতাভ্যন্তরে আশ্রয় নিয়েছে। হ্যাঁ সেই গল্প, তার সঙ্গে প্রতারণার গল্প, শান্তিচুক্তি শেষে উদযাপন-ভোজনের পর বাড়ি ফেরার পথে সোমোসার গুণ্ডাদের দ্বারা তাঁর নিহত হবার গল্প। আমি এটা দেখে খুব বিস্মিত হয়েছিলাম যে নিকারাগুয়ায় সান্দিনোর মুখ নয়, তাঁর টুপিখানিই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে। টুপিছাড়া সান্দিনোকে সহজে চেনা যেত না, কিন্তু সেই টুপির নিচে তাঁর উপস্থিতি এতটা জরুরি ছিল না তাঁর স্মৃতিকে উস্কে দেবার জন্য। অনেক ক্ষেত্রে, এফএসএলএন-এর দেয়ালচিত্রগুলোতে সেই বিখ্যাত টুপিটির নকশা দেখা যেত, যাকে দেখতে একটি ওল্টানো অসীম চিহ্নের মতো মনে হতো, যার ভেতর থেকে একটি কৌণিক আকৃতির আগ্নেয়গিরি উদ্গিরিত হচ্ছে। অসীমতা এবং উদগীরণ: নিকিনোহোমোর সেই জারজ ছেলেটি এখন একগাদা প্রতীকের সমাবেশ হয়ে গেছে। কিংবা অন্যভাবে বলতে গেলে, সান্দিনো এখন তাঁর টুপি হয়ে গেছেন।

নগরের পশ্চিমে একটি অনুচ্চ পাহাড় ছিল, যার ওপর এফএসএলএন-এর আদ্যাক্ষরগুলো গাঁথা ছিল, প্রায় একশ ফুট লম্বা একেকটি শাদা অক্ষর, অনেকটা হেলানো হলিউড শব্দটির আদলে গড়া। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম অক্ষরগুলো বুঝি ইংলিশ শ্বেত ঘোড়ার মতো পাহাড় কেটে বার করা হয়েছে, কিংবা কংক্রিট, এমনকি মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো আদতে ছিল পাহাড়ের পাদদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা কাঠের তৈরি, ক্ষেত্রবিশেষে সাধারণ ঠেকানো দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা। আমি যখন তার কাছাকাছি যাই তখন দেখতে পাই, এরই মধ্যে তার মধ্যে ক্ষয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। বিপ্লবের পূর্বে সেই পাহাড়ে অন্য এক চিহ্ন ছিল। রোল্টার, স্থানীয় একটি পাদুকা নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের নাম। এই আবিষ্কার, বিপ্লবোত্তর মানাগুয়ার জীবনের অস্থায়ী প্রকৃতি বিষয়ে আমার উপলব্ধিকে আরো তীব্রতর করে। একটি কাঠের তৈরি বিজ্ঞাপন খুব সহজেই আরেকটির স্থান দখল করতে পারে। বুট হিলের ওপর সান্দিনিস্তা মোর্চার স্মারকচিহ্ন বসানোর পরিণামকে আমি সহজে প্রতিরোধ করতে পারিনি।

মানাগুয়ায় তখন বর্ষাকাল ছিল; আকাশ মেঘে ঢাকা। উত্তর দিক থেকে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছিল।

কামোয়াপার পথ 

নিকারাগুয়ার উপরাষ্ট্রপতি ঔপন্যাসিক সের্হিও রামিরেসের বাড়ির দেয়ালগুলোতে সব মুখোশ ঝোলান ছিল। চারপাশে প্রশস্ত বারান্দাঘেরা বাড়ির প্রাচীন বৃক্ষশোভিত উঠোনে আমাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে নিরাপত্তা প্রহরী বললা, ‘আহ্, হিন্দু লেখক’। হিস্পানিরা ‘ভারতীয়’ বোঝাতে ‘হিন্দু’ ব্যবহার করে; অর্থাৎ ‘ভারত হইতে’ যা আমার কাছে মানানসই মনে হলেও নিকারাগুয়ানদের কানে কৃত্রিম শোনায়। ফলত, আমার সেই দিনগুলোতে আমি ‘হিন্দু লেখক’ কিংবা প্রায়শই স্রেফ ‘কবি’ পরিচিতি লাভ করি। সেটা নিঃসন্দেহে ছিল একটি শ্লাঘনীয় ছদ্মবেশ।

নিকারাগুয়ায়, লোকনৃত্য এবং অনেক জনপ্রিয় উৎসবের একটি অনিবার্য অনুষঙ্গ হচ্ছে মুখোশ। প্রাণীদের মুখোশ, শয়তানের মুখোশ, এমন কী আমি আবিষ্কার করি, কপালে রক্তাক্ত বুলেটের গর্তসমেত মানুষের মুখোশ। বিদ্রোহের দিনগুলোতে সান্দিনিস্তা গেরিলারা প্রায়শই গোলাপি মণ্ডের ওপর সাদামাটা মানুষের মুখ আঁকা মুখোশ পরে অভিযানে যেত। এই মুখোশগুলোর উৎপত্তিও লোকনৃত্য থেকে। একরাতে আমি দেশের জনপ্রিয় নাচের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি নৃত্যনাট্য দেখতে যাই এবং লক্ষ করি একজন নারী-নৃত্যশিল্পী একটি গোলাপি মুখোশ ধারণ করে আছে। বিপ্লবের সঙ্গে মুখোশের সম্পর্কটা এতটা জোরালো হয়ে উঠেছিল যে এটি সেই নৃত্যশিল্পীকে, অন্তত আমার চোখে, রূপান্তরিত করেছিল এক অদ্ভুত আশ্চর্যজনক ব্যক্তিত্বে, মুখোশপরা কোন শিল্পীমাত্র নয়, যেন বর্ণাঢ্য ঘাগরা পরিহিতা কোনও গেরিলা যোদ্ধা।

যে-কোন অভিনেতাই আপনাকে বলবেন, মুখোশ ধারণের সত্যিকার উদ্দেশ্য গোপন করা নয় বরং রূপান্তর সাধন। মুখোশের সংস্কৃতি সেটাই যা এই রূপান্তর প্রক্রিয়াকে খুব ভালোভাবে বুঝতে পারে।

আমি সের্হিও রামিরেস এবং নয় সদস্যবিশিষ্ট এফএসএলএন-এর (FSLN) জাতীয় পরিষদের অন্যতম সভ্য লুইস র্কারিয়নের সঙ্গে বোয়াকো প্রদেশের কামোয়াপা শহরের উদ্দেশে যাত্রা করি নতুন নিকারাগুয়ায় ঘটমান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর প্রক্রিয়ার অংশবিশেষ প্রত্যক্ষ করব বলে। এটা ছিল জাতীয় কৃষিস ংস্কার দিবস এবং কামোয়াপায় কমপক্ষে সত্তর হাজার একর জমির দলিল সেদিন চাষীদের হাতে তুলে দেওয়ার কথা।

সের্হিও রামিরেস নিকারাগুয় হিসাবে বেশ বড়সড় ও শক্তপোক্ত ছিলেন (ছয় ফুটেরও বেশি লম্বা) এবং মাঝে-মধ্যে তাকে নিশ্চিতভাবেই কোন চৈনিক সম্রাটের মতো মনে হতো; লুইস র্কারিয়ন সেই তুলনায় অনেক বেশি নিকারাগুয় সুলভ চেহারার অধিকারী, হালকাপাতলা, ছোটখাট, গোঁফবিশিষ্ট – যাকে তখন পারির সেই ঘটনাবহুল ১৯৬৮-র সময়টাতে বলা হতো, ‘গ্রুচোঘরানার মার্ক্সবাদী’। তাঁরা দুজনেই বিস্ময়করভাবে আত্মগরিমা ও বাগাড়ম্বরপনা থেকে মুক্ত ছিলেন যা ছিল রাজনীতিবিদদের একটি সাধারণ লক্ষণ বিশেষ। “বিপ্লবের পর থেকে এ পর্যন্ত কত একর জমি বিতরণ করা হয়েছে?” আমি জানতে চাইলে, তাঁরা প্রথমে এক হেক্টরে কত নিকারাগুয় মানসানা (জমির একক) হয় সে বিষয়ে একমত হওয়ার, এবং আমরা সবাই মিলে এক হেক্টরে কত একর হয় তা নিয়ে আরও কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তি করার পর, এই সংখ্যায় উপনীত হই যে, আনুমানিক বিশ লক্ষ একর জমি এক লাখ পরিবারকে দেওয়া হয়েছে এর মধ্যে। আমি এটা জেনে চমৎকৃত হই এবং রামিরেসকে তা জানালে তিনি মাথা নেড়ে বলেন, “এটাই জনগণের কাছে প্রমাণ করে যে প্রতিশ্রুতি রক্ষার সদিচ্ছা আমাদের রয়েছে।”

দন আনাস্তাসিয়ো সমোসা দেশ ছেড়ে পালানোর সময় যা কিছু পেরেছেন সঙ্গে নিয়ে গেছেন, এমনকি জাতীয় খাজাঞ্চিখানার তাবৎ অর্থও।  তিনি তাচো প্রথম ও লুইস সমোসার লাশও কবর খুঁড়ে বার করেন এবং নির্বাসনে যাওয়ার সময় সঙ্গে করে নিয়ে যান। সন্দেহ নেই, যদি উপায় জানা থাকতো তাহলে তিনি দেশের সব জমিজমাও নিয়ে যেতেন। কিন্তু তিনি তা পারেননি, তার সাঙ্গোপাঙ্গোরাও না, ফলে নিকারাগুয়া সরকার দেশের আবাদি জমির প্রায় অর্ধেকের সমান সেইসব পরিত্যক্ত জমির মালিক বনে যায়। কাররিয়ন ও রামিরেস দৃশ্যতই এই কথাটি উল্লেখ করার দায় বোধ করছিলেন যে, তাঁরা কেবল সেইসব পরিত্যক্ত জমিদারির জমিগুলোই দখল করেছেন, অন্য কারও কাছ থেকে নয়। “নিকারাগুয়ায় রয়ে যাওয়া কারও কাছ থেকেই কোনো জমি নেওয়া হয়নি, যারা সেগুলোতে চাষাবাদ করতে চায়।” রামিরেস জানান, তিনি চমৎকার ইংরেজি বলতেন, কিন্তু খানিক বাদেই ক্লান্ত হয়ে স্প্যানিশে ঢলে পড়তেন। “আমাদের অগ্রাধিকার যেহেতু উৎপাদন ও প্রতিরক্ষা, আমরা কেন তবে যারা উৎপাদন করছে তাদেরকে ঘাঁটাতে যাব? উল্টো আমরা অনেক বড় ব্যক্তিগত উৎপাদকদের নানাভাবে সাহায্য করে থাকি।” কামোয়াপা যাওয়ার পথে যে বড় দুটি হ্রদ, মানাগুয়া ও নিকারাগুয়া (সত্যি বললে সেগুলো আসলে ভূমধ্য সমুদ্র, পৃথিবীর একমাত্র জলাধার যেখানে আপনি মিঠাপানির হাঙরের খাদ্যে পরিণত হতে পারেন।) তাঁরা খুব কষ্ট করে বেসরকারি মালিকানাধীন খামার ও কলকারখানাগুলো দেখাচ্ছিলেন। নিকারাগুয়ার নেতাদের কথাবার্তায় প্রায়শই আত্মরক্ষামূলক একটা ভঙ্গি ভর করে যেন।” আমাদের মতো করে আর কোনও দেশকে এমন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে রাখা হয়নি”, পররাষ্ট্র মন্ত্রী দেসকোতো বলেন। পান থেকে চুন খসার মতো ভুলের জন্যও সারাক্ষণ নজরদারিতে থাকার বোধটুকু তাদেরকে কিছুটা স্পর্শকাতর করে তুলেছিল মনে হয়।

[চলবে … ]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close