Home অনুবাদ সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [৫] / আলম খোরশেদ অনূদিত

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [৫] / আলম খোরশেদ অনূদিত

প্রকাশঃ December 17, 2016

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [৫] / আলম খোরশেদ অনূদিত
0
1

পর্ব ৫

আমরা কামোয়াপা পৌঁছাই, সেখানে তখন ছুটির আমেজ। পাঁচ হাজার কৃষক শহরের প্রধান চত্বরে সমবেত হয়েছেন, যার চারপাশে ছোট ছোট নীল শাদা জাতীয় পতাকা আর ফাঁকে ফাঁকে সান্দিনিস্তা ফ্রন্টন্টের লাল কালো ব্যানার পতপত করে উড়ছিল। সান্দিনোদের শোলার টুপি, সেরা পোশাকে সাফসুতরো হওয়া ছেলেমেয়ের দল, প্রহরারত মিলিশিয়ারা। ‘নায়ক ও শহিদের ১৯৮৬র পয়লা মে সমবায়’ নামের একটি সংগঠনের  উঁচিয়ে ধরা প্ল্যাকার্ড-এ লেখা , “জনাব রিগ্যান, আপনি আমাদের জমির এক টুকরাও পাবেন না।’ এবং সমাবেশের অন্যত্র আরেকটি ব্যানারে লেখা, “কাজ ও রাইফেল।” বার্গাস য়োসা কথিত কল্পিত সান্দিনিস্তাবিরোধী সংখ্যাগরিষ্ঠর অস্তিত্বকে এখানে আর বিশ্বাস করা যাচ্ছিল না। তাদের ক্ষমতার ভিত্তি এই কৃষক সমাজ, এই কথাটা টের পেয়েই সরকার শহরাঞ্চলের চেয়ে এরকম গ্রামগুলোকে জমি বিতরণের বেলায় প্রাধান্য দিচ্ছিল। মানাগুয়া, গ্রেনাদা, লিয়নের মতো খাদ্য ঘাটতি এখানে অতটা প্রকট নয়, এবং ভূমি সংস্কারের পাশাপাশি এই জাতীয় পক্ষপাতমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে এটা নিশ্চিত করা যাচ্ছিল যে কামোয়াপার মত অঞ্চলগুলো এফএনএলএন-এর প্রতি অনুগত শক্ত ঘাঁটি হয়ে থাকবে। হাইমে হুইলকক, এফএসএলএন-এর নয়জন অধিনায়কের আরেকজন, এখন যিনি কৃষিমন্ত্রী, এবং যাকে দেখতে লুইস র্কারিয়নের চেয়েও ছোট বলে মনে হচ্ছিল, জনতার উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছিলেন। তার সঙ্গে জনতার আবেগিক দূরত্বটা কত কম এটা লক্ষ্ না করাটা অসম্ভব ছিল। আমি কোনও পশ্চিমা নেতার কথা ভাবতে পারছিলাম না যিনি এত অন্তরঙ্গভাবে এমন এক সমাবেশে বক্তৃতা করতে পারেন। কামোয়াপা গীর্জার পুরোহিত ফাদার আলফোনসো আলভারাদো লুগোও বক্তৃতা করেছিলেন। তিনি কৃষকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “আমি খুব খুশি, তোমরা যারা রাস্তায় থাকতে তারা এখন জমি চাষ করতে পারবে।” কৃষকেরা উঠে এসে খুব স্বাভাবিকভাবে তাদের জমির দলিল গ্রহণ করে। আলোড়িত হওয়াটাই তখন স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছিল।
তারপর শুরু হয় শ্লোগানের চাপান-উতোর। এর নেতৃত্বে ছিল এক তরুণী সান্দিনিস্তা। সে মাইকে চীৎকার করে বলে, “জনতা একত্রিত“, সবাই উত্তরে বলে, “হয়না পরাজিত”। ”আমরা লড়ছি”, “শান্তির জন্য”। ”আমরা জিতবই”, “তারা পার পাবেনা”।
আর হ্যাঁ, অনুষ্ঠান শেষে গ্রামের ব্যান্ডদল, অন্যান্য জনপ্রিয় সুরের সঙ্গে, ’ইন্টারন্যাশনাল’ও বাজিয়েছিল।

আনন্দের দিনে কবিরা

 

কফিন ও কোষাগারসহ সোমোসার প্রস্থানের সপ্তম বার্ষিকীতে আমি নিজেকে একজন বিখ্যাত কবির সঙ্গে আবিষ্কার করি যিনি একটি জরুরি ফোন করার জন্য কোথাও যাচ্ছিলেন। কবির নাম দানিয়েল ওর্তেগা, যাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থের নাম মিনিস্কার্টের মানাগুয়ার অভাব বোধ করি আমি। মানাগুয়ায় স্কার্টের হেমলাইন যখন হাঁটুর ওপরে উঠে আসে ওর্তেগা তখন কারাগারে।
প্রেসিডেন্ট ওর্তেগা- অথবা কমান্দান্তে দানিয়েল, যে-নামে তিনি বিশ্বময় পরিচিত ছিলেন- তাঁর কারাগারের অভিজ্ঞতা নিয়ে তেমন কথা বলতে চাইতেন না। তাঁর কবিতা ‘কারাগারে’ই এর কারণ নিহিত ছিল :
‘তাকে এভাবে লাথি মারো, ঠিক এই ভাবে
তার অণ্ডকোষে, মুখে ও পাঁজরে।
আমাকে গরম ইস্ত্রিটা দাও, আর অই মোটাসোটা লাঠিটা।
কথা বল্! কুকুরের বাচ্চা কথা বল
লবন-গোলা পানি আনো,
কথা বল্! আমরা তোকে ভর্তা করে ফেলতে চাই না।’
আমি লেখালেখি বিষয়ে কথা বলতে শুরু করি তাঁর সঙ্গে, কিন্তু তাঁকে আমার প্রশ্নে বিব্রত মনে হচ্ছিল। ‘নিকারাগুয়ায়’, তিনি বলেন, ‘প্রত্যেককেই কবি বলে বিবেচনা করা হয়, উল্টোটি প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত।’ ইদানিং তাঁর প্রধান সাহিত্যিক প্রয়াস হচ্ছে মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদেরকে জনগণের সঙ্গে সহজ ভাষায় কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করা। ‘প্রায়শই আমরা এমন ভাষায় কথা বলি যে তারা দূরে সরে যায় এবং একটা ব্যবধান তৈরি হয়।’ তাঁকে দেখে শরীরগঠনের তালিম-নেওয়া এক গ্রন্থকীটের মত লাগে; তাঁর আচরণেও চশমাপরা চোখের পলকফেলা আর মৃদু-কণ্ঠ লাজুকতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সম্পূর্ণ স্ববিরোধী এক আত্মপ্রত্যয়ের ভাব। না, আপনি তাঁকে ঘাঁটানোর কথা চিন্তা করবেন না।
মানুষের সঙ্গে কথা বলাটা তাঁর প্রশাসনের একটা অগ্রাধিকার ছিল। তিনি নিয়মিত তাঁর মন্ত্রীসভাকে জনগণের মঞ্চে নিয়ে যেতেন মানুষের সঙ্গে মেশার জন্য এবং মানুষের জবাবদিহিতার কাছে এমনভাবে নিজেকে মেলে ধরতেন যা তাঁর পশ্চিমা সমালোচকেরা কল্পনাও করতে পারবে না। রোনাল্ড রিগান এবং মার্গারেট থ্যাচার একটা মাসিক সভায় জনগণের দ্বারা প্রশ্নবাণে জর্জরিত হচ্ছেন, আমি এই দৃশ্যৗটা কল্পনা করতে চাই এবং ব্যর্থ হই।
আজকে অবশ্য একটা ভিন্নধর্মী যোগাযোগের ব্যাপার ছিল। ওর্তেগা যে ফোনটি করতে যাচ্ছিলেন সেটি ছিল নিকারাগুয়ার সঙ্গে সোভিয়েতপন্থী দেশগুলোর ’আন্তর-স্পুতনিক’ যোগাযোগ ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন সম্পর্কিত। আমরা মানাগুয়া পাহাড়ে কাঠের কাঠামোয় লেখা FSLN চিহ্নের অনতিদূরে অবস্থিত বার্তাকেন্দ্রে পৌঁছে রুশ কর্মকর্তাদের বক্তৃতা শুনি। এই যোগাযোগযন্ত্রের যাবতীয় খরচ বহন করেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই সেটাকে গুপ্তচরবৃত্তির ভিত্তি বলে ডাকা শুরু করেছে। আমার কাছে যদিও একে স্রেফ একটি টেলিফোন স্থাপনা ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি।
দানিয়েল ওর্তেগা যখন প্রথমে হাবানায় তাঁর রাষ্ট্রদূত ও পরে মস্কোতে তাঁর প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলছিলেন তখন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিমালার অন্তঃসারশূন্যতা খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। নিকারাগুয়ার টেলিভিশনে তখন জ্যাক নিকলসনের পুরনো ছবিগুলো দেখা যায়, কোকাকোলা দারুণ ব্যবসা করছে, লোকেরা রেডিয়োতে ম্যাডোনা শুনতো, ’লিভিং ইন এ মেটেরিয়াল ওয়ার্ল্ড/ অ্যান্ড আই এম এ মেটেরিয়াল গার্ল’ গানটি গাইতো যখন তখন, বেসবল ছিল জাতীয় উন্মাদনা, এবং যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগে ক’জন নিকারাগুয় স্থান পেয়েছেন এসব কথা লোকে খুব গর্ব নিয়ে আলাপ করতো। বিগত সোমোসার আমলে যখন খবরের কাগজ সেন্সর করা হতো তখন বাদ পড়া খবরগুলোর জায়গায় তারা মেরিলিন মনরো ও হলিউডের অন্য নায়িকাদের ছবিই ছাপতো, এবং এইভাবে হলিউডের সঙ্গে বিপ্লবী প্রতিবাদের একটা অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হতো। নিকারাগুয়ার সাহিত্যেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ছিল সাংঘাতিক। সে-দেশের কবিতা ওয়াল্ট হুইটম্যান কিংবা এজরা পাউন্ডের রচনা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল।
এখন অবশ্য অর্থনৈতিক অবরোধ চলছে। ওলন্দাজ আখ ভর্তি নিকারাগুয়ামুখী একটি জাহাজ ক্যানাল অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বাজেয়াপ্ত করা হয়। আইবিএম নিকারাগুয়া থেকে তার সকল সেবা প্রত্যাহার করে নেয়, দারিদ্রপীড়িত একটি দেশকে বিশাল খরচের বিনিময়ে আইবিএম থেকে অন্য কোন স্বল্প আদর্শায়িত মার্কাতে পরিবর্তিত হতে বাধ্য করে। (আমি ভাবি, সের্হিও রামিরেস যে একজন নব্য প্রযুক্তি-পাগলের অহংকার ও উদ্দীপনা নিয়ে আমাকে তাঁর আইবিএম লেখনযন্ত্রটি দেখিয়েছিলেন সেটির কী হবে?) খুব সম্প্রতি রিগ্যান প্রশাসন কর্তৃক অক্সফ্যামকে নিকারাগুয়ায় ৪১,০০০ ডলার মূল্যের বীজ, কাস্তে ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ পাঠানো থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করা হয়।
দেশটির উত্তর সীমান্তে অবস্থিত দানব কর্তৃক তার ওপর বিরামহীন চাপ প্রয়োগের বিষয়ে সচেতন না হয়ে নিকারাগুয়ায় একটি দিন কাটানোও ছিল অসম্ভব। প্রতিটি দিনের প্রতিটি মুহূর্তে এই চাপ অনুভব করা যেত।
সকালের কাগজে নিকারাগুয়ার অগ্রগণ্য ব্যঙ্গচিত্র আঁকিয়ে রজার একটা বিশালাকার আঙ্কল স্যামের ছবি আঁকেন, যে-কিনা উবু হয়ে স্নুপির কুকুরগৃহের সমান ছোট্ট নিকারাগুয়ার ঘরটিকে দেখছিল বাইনোকুলার চোখে। সংলাপ বেলুনে লেখা ছিল, “হ্যাঁ, আমি এটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। তারা নির্ঘাৎ আগ্রাসনের পরিকল্পনা আঁটছে।”
কাকতালভাবে পীনাট কমিকসও একই বিষয়ে একটি আমেরিকান সংস্করণ প্রকাশ করে। লিনাস, স্নুপি, এবং ভুল না হয়ে থাকলে, লুসি যুদ্ধের পোশাক পরে টিভি দেখছিল। মেয়েটি জিজ্ঞেস করে, ”ও কী বলছে এখন?” লিনাস জবাব দেয়, “কাল যা বলছিল সেই একই জিনিস। সে বলেছে, বাইরের পৃথিবীতে এমন লোকজন আছে যারা আমাদের জীবনধারা ধ্বংস করে দিতে চায়। “আমি তাকে বিশ্বাস করি না”, লুসি, প্যাটি কিংবা আর কেউ বলে, “সত্যি? কিন্তু কেন? আমি কাউকে বিশ্বাস করি না।”
দানিয়েল ওর্তেগা যখন মস্কোতে কথা বলছিলেন তখন সোভিয়েত মন্ত্রীরা তার পাশে দাঁড়ানো ছিল। ন্যুয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন সদ্যই সান্দিনিস্তাদের স্তালিনিস্ট বলে আখ্যা দিয়েছে। স্টিফেন কিনজার, মানাগুয়ায় তাদের প্রতিনিধি (অকুস্থলে না গিয়েই) বোকার কাছাকাছি উত্তর হিনেতেগা প্রদেশের রাস্তার ওপর মাইন পুঁতে রাখার কন্ট্রা বর্বরতার ওপর একটা প্রতিবেদন পাঠায়। মাইন বিস্ফোরণে একটি বাস ধ্বংস হয়ে ৩২ জন বেসামরিক নাগরিক, যার মধ্যে কয়েকজন স্কুল শিক্ষার্থীও ছিল, নিহত হয়। কিনজার প্রতিবেদনে এমন ইঙ্গিত করেন যে আন্তর্জাতিক সহানুভূতি আদায়ের উদ্দেশ্যে এফএসএলএন নিজেরাই এটা পুঁতে রাখতে পারে।
চাপ, এবং মস্কোতে ফোন কর। আমার শত্রুর শত্রু এক পর্যায়ে আমার বন্ধু হয়ে যায়।

[চলবে…]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close