Home অনুবাদ সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [৬] আলম খোরশেদ অনূদিত

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [৬] আলম খোরশেদ অনূদিত

প্রকাশঃ December 24, 2016

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [৬] আলম খোরশেদ অনূদিত
0
0

দ্য জাগুয়ার স্মাইল / পর্ব ৬

মানাগুয়ায় এখন সীমের খুব অভাব। (ভাবুন ইতালিতে পাস্তা ফুরিয়ে গেছে।) কোন কোন দিন তর্তিয়া বানানোর জন্য ভুট্টা পাওয়া যেত না। মূল্যস্ফীতি প্রায় ৫০০% এর কাছাকাছি। জিনিসপত্রের দাম লাগামছাড়া। আপনার ট্রাক সাফাইয়ের জন্য চারটা গরুর মাথার দাম দিতে হতো।

অর্থনীতি প্রচণ্ডরকম আমদানিনির্ভর ছিল। নিকারাগুয়ায় কাচ, কাগজ, ধাতু কিছুই উৎপাদিত হতো না। আক্রান্ত হবার মত নাজুক অবস্থাও ছিল। অর্থনীতিবিদ পল ওকিস্ট আমাকে বলেন, “এই দেশ হচ্ছে একটার অর্থনীতি। একটা সমুদ্র বন্দর, একটা তৈল শোধনাগার, একটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। যুক্তরাষ্ট্রের শৈল্যসূক্ষ্ম আক্রমণে দেশটিকে অচল করে দিতে কোন অসুবিধা হবে না। “হয়তো তারা তৈল শোধনাগারটিকে ছাড় দিত”, ওকিস্ট, নিজে একজন উত্তর আমেরিকান বলেন, “কারণ ওটার মালিক এক্সন।”

যুদ্ধের পাঁচ বছরে নিকারাগুয়ার অর্থনীতির আনুমানিক দুই বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়। ১৯৮৫ সালে নিকারাগুয়ার মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩০০ মিলিয়ন ডলার, আমদানি ৯০০ মিলিয়ন ডলার। এক বছরের মোট উৎপাদন ছিল ২ বিলিয়ন ডলার। ফলে নিকারাগুয়া তার পুরো এক বছরের উৎপাদন হারায় যুদ্ধের প্রথম পাঁচ বছরে, যার সিংহভাগ সংঘটিত হয় দ্বিতীয়ার্ধে।

হেগের আন্তর্জাতিক আদালত যখন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রায় দেয় তখন তা নিকারাগুয়ার এই দাবিকেও সমুন্নত রাখে যে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণও দিতে হবে। আদালত যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে এই বলে যে নিকারাগুয়া একটি আঞ্চলিক আগ্রাসী শক্তি, এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো আত্মরক্ষার অধিকার রাখে। (সংখ্যাগুরু রায়ের বিচারপতিরা এসেছিলেন আলজেরিয়া, আর্হেন্তিনা, ব্রাসিল, চীন, ফ্রান্স (দুই জন), ভারত, ইতালি, নাইজেরিয়া, নরওয়ে ও পোল্যান্ড থেকে। যে তিনজন এর বিরোধিতা করেছিলেন তাঁরা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাপানের।)

রিগান প্রশাসন আন্তর্জাতিক আইনে আগ্রহী ছিল না, অন্তত যতক্ষণ এর রক্ষকেরা তার বিরোধী ছিল। অবস্থাটা ছিল পরাবাস্তব, যে দেশটি অবৈধভাবে কাজ করছিল অর্থাৎ আইন ভঙ্গকারী, তারা স্বৈরতন্ত্রী, স্বৈরাচার, স্তালিনিস্ট অভিধা নিক্ষেপ করছিল একটি দেশের নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে যারা কোন আইন ভাঙেনি; ডাকাতই বিচারকের ভূমিকা পালন করছিল।

দানিয়েল ওর্তেগা মস্কোর সঙ্গে কথা বলে ফোন নামিয়ে রাখেন। রুশ, নিকারাগুয়, হিন্দু লেখক সবাই হাসিতে ফেটে পড়েন, শত হলেও দিনটা ছিল আনন্দের দিন।

দিনের পরে রাত। কুবার দেওয়া একটা বিশাল সবুজ সার্কাস তাঁবুতে গোটা মধ্য আমেরিকার শিল্পীরা সমকালীন সঙ্গীত উৎসবে বাজাতে এসেছিল, যাকে বলে নতুন গান, সালসা-রিদম আর প্রতিবাদের গান পালা করে হচ্ছিল। উদারপন্থী আমেরিকান শিল্পীদের একটা মিলনকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল মানাগুয়া। সার্কাস তাঁবুতে জাতীয় গান ছাড়াও সাম্প্রতিক কনসার্টে গীত গান গেয়েছিলেন পিটার, পল ও ম্যারি। জ্যাকসন ব্রাউনও এসেছিলেন।

নগরীর অন্যদিকে গ্র্যান্ড হোটেলের ধ্বংসাবশেষে শহরের সত নারী কবি তাদের কবিতা পড়ে শোনাচ্ছিলেন। ভূমিকম্পে হোটেলটির অধিকাংশই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যেটুকু বাকি ছিল- চারদিকে ব্যালকনিঘেরা খোলা আকাশের নিচে একটি মধ্যবর্তী চাতাল- সেটি হয়ে উঠেছিল শহরের সংস্কৃতিকেন্দ্র। এই ধ্বংসাবশেষটি ভরে উঠেছিল কবিতাপ্রেমিকে। আমি এমনকি পাকিস্তান ও ভারতেও, যেখানে কবিদেরকে খুব ভক্তিশ্রদ্ধা করা হয়, নিকারাগুয়ার মত এমন মানুষ কোথাও দেখিনি যারা কবিতাকে এতখানি ভালোবাসে। খোলা মঞ্চের পেছনে সাত নারী জড়ো হয়ে পায়চারি করছিল তাদের শ্রেষ্ঠতম পোশাকটি পরে, নার্ভাসভাবে। তারা এক এক করে সামনে আসে, সমালোচক ইয়েরা রদ্রিগেস তাদের পরিচয় করিয়ে দেন, প্রত্যেকে তাদের কবিতা পাঠ করে ধ্বংসাবশেষের এক প্রান্তে গিয়ে বসে আর অন্যেরা তাকে ঘিরে ধরে, আলিঙ্গনে ও আশ্বাসে।

সাতজনের মধ্যে দু’জন কবি বিশেষ করে আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন : বিদালুস মেনেসেস- শীর্ণ, গম্ভীরমুখের এক নারী, যাঁর পাঠ ছিল শান্ত ও ধীর, কিন্তু খুবই মনোগ্রাহী; অন্যজন জ্যোকোন্দো বেল্লি, সম্মানজনক কাসা দে লাস আমেরিকাস পুরস্কারপ্রাপ্ত। তাঁর কবিতা ছিল একদিকে খুবই ইন্দ্রিয়ঘন এবং অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে সরাসরি।

বিদালুস মেনেসেস-এর বাবা সোমোসার জাতীয় বাহিনীর জেনারেল ছিলেন, যাঁকে ১৯৭৮ সালে গুয়াতেমালায় ‘গরীবের গেরিলা’র হাতে নিহত হতে হয় (তিনি সেখানে সোমোসার প্রতিনিধি ছিলেন)। তাঁর কাঁপিয়ে দেওয়া কবিতা লাস্ট পোস্টকার্ড ফ্রম মাই ফাদার, জেনারেল মেনেসেস, যা তাঁকে এমন একজন কবি হিসেবে তুলে ধরে যাঁর কবিতা পারিবারিক প্রেক্ষাপটের কারণে একাধারে সমৃদ্ধ ও বেদনার্ত হয়ে ওঠে। (তাঁর বাবার মৃত্যুর সময় এবং তারও আগে থেকেই তিনি গোপনে এফএসএলএন-এর সঙ্গে কাজ করছিলেন। যখন তাঁর বাবা সেটা জেনে ফেলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের সম্পর্ক কঠিন হয়ে পড়ে।) মার্গারেট র‌্যান্ডালের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার সেই দ্বৈততার কথা বলেন, “আমি কখনোই শত্রুকে ঘৃণা করতে সক্ষম হইনি, কিন্তু তীব্র এক বেদনা অনুভব করি আমি। কারণ যাকে আমি এত ভালবাসি, তিনি আমার আদর্শ বহন করেন না এবং সেটাই আমি মনে করি আমার লেখার কেন্দ্রীয় সূত্র- এবং আমি জানি আমার সেই কবিতার দ্বারা আমার বন্ধুদের হতাশ করেছি আমি, হয়ত কবিতাটা তাদের কাছে দুর্বলও লাগতে পারে। আমি যদিও মনে করি যে কবিতাকে খাঁটি হতে হবে।”

তিনি এক আত্মবলিদানকারী প্রজন্মের সাথে একাত্ম হওয়ার কথা বলেন যার কাছে ব্যক্তিগত প্রয়োজনের চাইতেও দেশগঠনের অগ্রাধিকার বেশি। এটা এমন এক উক্তি যা আপনি একজন বৈপ্লবিক প্রণোদনাবিশিষ্ট নারীর কাছ থেকে আশা করেন যিনি চেতনায় ধর্মীয়, মেনেসেস আদতে যা ছিলেন। কিন্তু জ্যোকোন্দো বেল্লি অনেক বেশি ধর্মনিরপেক্ষ কবি হয়েও একই ধরনের উক্তি করেন মার্গারেটের কাছে। তিনি মনস্থির করেছেন যে বিপ্লবের জন্য তাঁর কাজ হবে শ্রেষ্ঠ কবিতাখানি রচনা করা। তাঁর কবিতা দিয়েই সেই সন্ধ্যার পরিসমাপ্তি ঘটে। তিনি একধরনের জনতার প্রেমের কবিতা তৈরি করেছেন যা আমার মতে নিকারাগুয়ার আবেগকে এমনভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম যার তুল্য আর কোন কিছুই আমি এর আগে শুনিনি।

“নদীরা আমাকে ভেদ করে প্রবাহিত হয়

পর্বতবিদ্ধ আমার দেহ

আর আমার সর্বাঙ্গ জুড়ে

মূর্ত হতে থাকে দেশের ভূগোল

হ্রদ, ভূ-ফাটল, গিরিখাত,

ভালবাসা বপনের লাঙলচেরা মাটিতে

আমাকে আমূল বদলে দিয়ে

ভরে তোলে বাঁচার আতীব্র আকুতিতে

যেন আমি তাকে দেখে যেতে পারি

মুক্ত ও সুন্দর, হাসিতে উচ্ছ্বল।

ভালবাসার বিস্ফোরণে ফেটে পড়তে চাই আমি…”

 

মাদাম সোমোসার স্নানঘর

তরুণ লেখকেরা মানাগুয়ার ক্যাফেতে জমায়েত হলে এর্নেস্তো কার্দেনালকে পচানোটা একটা রেওয়াজে দাঁড়িয়ে গেছে। ফাদার কার্দেনাল যেহেতু আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে খ্যাতিসম্পন্ন কবিই শুধু ছিলেন না, ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রীও, সেহেতু এই আক্রমণগুলোকে আমি সেদেশের সাহিত্যের সুস্বাস্থ্য ও আত্মমর্যাদাবোধের পরিচায়ক বলে ধরে নিয়েছিলাম। কফির দোকানের এইসব গুপ্ত আক্রমণসমূহ কার্দেনালকেও খুব একটা ভাবাতো বলে মনে হয় না। তিনি দিব্যি ছিলেন তার রুপালি চুল দাড়ি আর বিপ্লবী টুপির সঙ্গে নীল জিনস এর ওপরে চাষাদের ঢিলেঢালা জোব্বা কোতোনা-পরিহিত হাস্যোজ্জ্বল চেহারাখানি নিয়ে, যেনবা নিজেরই এক গ্যারি ট্রুডোকৃত কার্টুন : ডুনসবারি কথিত বিপ্লবী লাতিনো পাদ্রি।

তবে যে আক্রমণে তিনি এবং নিকারাগুয়ার আরও অনেকেই আহত হতেন সেটা ছিল পোপের কাছ থেকে আসা। পোপ ওয়টিলার মানাগুয়া আগমন এখন কিংবদন্তি বিশেষ : কার্দেনাল হাঁটু গেড়ে তাঁর আংটি চুম্বন করতে চাইলে জন পল দ্বিতীয় তাঁর দিকে রাগত মুষ্টি উঁচিয়ে তাঁকে গির্জার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটাকে শুধরে নিতে বলেন। কবি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

আমার সফরের সময়, এর্নেস্তো কার্দেনাল, কী সরকারের অপর বড় পাদ্রি, পররাষ্ট্র মন্ত্রী মিগেল দেসকোতোর গির্জায় প্রার্থনা পরিচালনা করার অনুমতি ছিল না। তাঁদেরকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল। কার্দেনালের কবিতা সলেন্তিনামের অর্থ, পাঠের সময় গির্জার এই কোন্দলের কারণগুলো আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

“বারো বছর আগে/ আমার দুই খ্রিষ্টভ্রাতাকে নিয়ে/ আমি সলেন্তিনামে যাই/ একটি ছোট্ট ধ্যানী সম্প্রদায় গড়ে তুলব বলে…/ ধ্যান/ আমাদেরকে বিপ্লবের কাছে নিয়ে গিয়েছিল;/ আর এটাই স্বাভাবিক ছিল/ কেননা লাতিন আমেরিকায়/ একজন ধ্যানী মানুষ/ রাজনীতির লড়াইকে পিঠ দেখাতে পারে না…/ আমাদেরকে যা রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে শানিয়ে তোলে/ সেটা হলো সুসমাচারসমূহ।/ প্রার্থনার সময় আমরা কৃষকদের সঙ্গে/ এই সুসমাচার নিয়ে কথা বলি/ সংলাপের মত করে,/ এবং তারা বুঝতে শুরু করে/ স্বর্গীয় বার্তার/ সারাৎসার:/ ঈশ্বর-রাজ্যের আগমনধ্বনি,/ অর্থাৎ পৃথিবীতে সাম্যের সমাজ/ প্রতিষ্ঠা…/ আমরা প্রথমে অহিংস বিপ্লবের/ চেষ্টা করেছিলাম।/ পরে বুঝতে পারি/ এই মুহূর্তে নিকারাগুয়ায়/ অহিংস লড়াই সম্ভব নয়…/ এখন আমাদের সম্প্রদায়ে/ সবকিছুই শেষ।/ সলেন্তিনামে/ ছিল এক টুকরো স্বর্গের মতন/ কিন্তু নিকারাগুয়ায়/ স্বর্গ এখনও অসম্ভব।”

[চলবে…]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close