Home গদ্যসমগ্র ভ্রমণ সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [৭] আলম খোরশেদ অনূদিত
0

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [৭] আলম খোরশেদ অনূদিত

প্রকাশঃ January 10, 2017

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [৭] আলম খোরশেদ অনূদিত
0
0

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [৭]

আমার সঙ্গে কার্দেনালের দেখা হয় হোপ সোমোসার স্নানঘরে। স্বৈরশাসকের বাসভবনটাই পরে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দখলে এসেছিল, এবং তিনি আমাকে খুশী মনে জানান যে মন্ত্রীর দপ্তরের একবার সুযোগ হয়েছিল মাদাম সোমোসার দৈনন্দিন প্রসাধনীসমূহ দেখবার। সেই কুখ্যাত দিনগুলোতে কি তিনি এখানে এসেছিলেন, আমি জিজ্ঞেস করি। না, না, তিনি হাতগুলো উঁচিয়ে একসময়ের সত্যিকার বৈধ ভীতির ভঙ্গি নকল করে চীৎকার করে ওঠেন। ‘সেইসব দিনে এই জায়গাটা বন্দুক, ট্যাংক, হেলিকপ্টারে পরিবেষ্টিত থাকত। এর ধারে কাছে আসাটাও ছিল রীতিমত আতঙ্কের।’ আমি তাঁকে, আরেক সোমোসার পাড়ায় থাকার আমার নিজ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলে তিনি মজা পান। ‘তাহলে তো আপনি সবই জানেন।’

সোমোসার স্নানঘরে আমরা তাঁর কবি হিসাবে গড়ে ওঠার গল্প করি। প্রাথমিক প্রভাব ছিল নেরুদার- তাঁর গীতলতা, রাজনীতি নয়- আর পরে উত্তর আমেরিকার গভীরতর অভিঘাত : পাউন্ড, হুইটম্যান, মারিয়ান মুর। আমরা সমান্তরালে তাঁর রাজনৈতিক বিপ্লবপন্থার বিকাশ নিয়েও কথা বলি। ‘শুরুতে আমি খানিকটা ক্রিশ্চান ডেমোক্র্যাট ছিলাম। আমি কার্লোস ফনসেকা ও অন্যদের সঙ্গে প্রচুর তর্ক করেছি। সেই সময়ে আমি বিপ্লবী ঘরানার বিরোধী ছিলাম। তাঁরা আমার সঙ্গে সবসময়ই খুব ভদ্র ও সহিষ্ণু ছিলেন।’ শত হলেও ইনি ছিলেন এমন এক ব্যক্তি যিনি একত্রিশ বছর বয়সে ট্র্যাপীয় আশ্রমে ঢুকেছিলেন। এই অন্তর্মুখী, ধ্যানী মানুষটির কাছে বিপ্লব ঠিক স্বভাবের নিয়মে আসেনি।

মোড় ফেরার মুহূর্তটি ছিল বিপ্লবের ঠিক পরপরই তাঁর কুবা সফর। ‘এটা ছিল ধর্মান্তর।’ তিনি বলেন, ‘আমি ফিরে এসে ঘোষণা করি আমার ধর্মান্তর ঘটেছে। এটা সাংঘাতিক এক কেলেঙ্কারির জন্ম দেয়।’ এই ঘটনার স্মৃতিতে তাঁর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

আমি বলি আমি তাঁর এই ধর্মান্তর ব্যাপারটা খুব সহজেই বুঝতে পারি; গোটা লাতিন আমেরিকার জন্যই কুবার বিপ্লব ছিল একটি মহান সংঘটনা, সম্ভাবনাসমূহের বাস্তবায়ন এবং শোষকেরও যে পতন সম্ভব তার দৃষ্টান্তস্থাপন। তবে এখন, আমি যোগ করি, কুবা বিষয়ে আমার ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে। তিনিও কি এসবের অংশীদার? দৃষ্টান্তত, তিনি কি অনুভব করেন যে কুবার বিপ্লব কিছু ভুল পদক্ষেপ নিয়েছে, যা নিকারাগুয়ার জন্য সতর্কবার্তা ও অনুপ্রেরণা, উভয়েরই কাজ করতে পারে?

‘না’, তিনি উদ্ভাসিত হাসিতে বলেন। ‘কেন? কী ভুল পদক্ষেপ?’

ঠিক আছে, আমি ভাবি, তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রী, তিনি কাল বাদে পরশু দুনিয়াজোড়া সংবাদপত্র ‘কার্দেনালের কুবা আক্রমণ’ শিরোনামে ভেসে যাক, সেটা নিশ্চয়ই চাইবেন না। কিন্তু তিনি তো একজন লেখকও… আমি লম্বা শ্বাস নিয়ে বলি, এই যেমন ধরুন মানবাধিকার লঙ্ঘন? রাজনৈতিক বন্দী, নির্যাতন, সমকামী, আর লেখকদের ওপর আক্রমণ?

‘কী আক্রমণ?’

তাঁর শান্ত, সমাহিত ভাব আমাকে চক্করে ফেলে দেয়। বিভ্রান্ত আমি বোকার মত বলে ফেলি, ‘যেমন ধরুন, নিকোলাস গিয়েন’, যিনি ছিলেন কুবার লেখক সমিতির সভাপতি, যখন আমি আসলে বলতে চেয়েছিলাম, ‘পাদিয়্যা।’ তিনি আমার দিকে রাগতভাবে তাকান। ‘গোড়ার দিকে কিছু অপব্যবহার হয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘কিন্তু এখন না।’ আমি আরও ক’টা প্রশ্ন করি- আরমান্দো ভালাদারেস-এর সকল আশার বিপরীতে বইটা তাহলে কী, যেখানে কুবার কারাগারে দুই দশক ধরে ছাইপাঁশ ভক্ষণ আর কাচের টুকরো ভর্তি স্যুপ পান করতে বাধ্য করানোর বর্ণনা দেওয়া আছে? কিন্তু এসবই দেয়ালে গিয়ে আঘাত করছিল।

আমি যখন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ত্যাগ করি তখন, নিকারাগুয়দের তাদের নিজ মন্ত্রণালয়সমূহকে সংক্ষিপ্ত নামে ডাকার আদুরে অভ্যাসের মধ্যে এক ধরনের দুর্ভাগ্যজনক অরওয়েলিয় প্রতিধ্বনি লক্ষ্য করি। ‘কার্দেনাল,’ ‘মিনিকাল্ট প্রধান।’ আমি খুব বিষণœ চিত্তে ফিরে আসি।

আমি এফএসএলএন-এর মুখপত্র বারিকাদার একজন সাংবাদিকের সঙ্গে দুপুরের খাবার খাই। তিনি সম্পাদকীয় পাতার দায়িত্বে ছিলেন, আমি তাঁর নাম ভুলে গিয়েছি, সেটা সম্ভবত ভালোই হয়েছে, কেননা তিনি নিকারাগুয়ায় আমার শোনা সবচেয়ে রক্তশীতল-করা মন্তব্যটি করেছিলেন। আমি তাঁর সঙ্গে সেন্সরশিপ নিয়ে সাধারণভাবে এবং বিশেষভাবে সম্প্রতি লা প্রেন্সা পত্রিকাটিকে বন্ধ করে দেওয়া নিয়ে আলাপ করছিলাম। তাঁকে প্রাথমিকভাবে সত্যিকারভাবেই সেন্সরশিপের বিরোধী বলে মনে হয়েছিল- ‘নিশ্চয়ই একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসাবে আমি এটাকে ঘেন্না করি।’ কিন্তু তারপরই তিনি মন্তব্য করেন : ক’দিন আগে আমার সঙ্গে দেখা হওয়া একজন মা ব্যাপারটি খুব ভালোভাবে উপস্থাপন করেন। একজন মায়ের যদি একটি অসুস্থ সন্তান থাকে, খুবই অসুস্থ, তাহলে তিনি তাকে সবার আগে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান, কোন প্রকার প্রসাধন না করেই।’

আমার বিষণœতা আরও প্রগাঢ় হয়। ‘তার মানে,’ আমি অসন্তুষ্ট চিত্তে জানতে চাই,‘প্রচামাধ্যমের স্বাধীনতার ব্যাপারগুলো স্রেফ প্রসাধনতুল্য?’

তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, এবং তিনি উৎসাহভরে মাথা নাড়েন, ‘হ্যাঁ, প্রসাধন, এটাই সবচেয়ে লাগসই শব্দ।’

‘যুদ্ধের সময়ে সবাইই প্রচারমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে।’ এ-বিষয়ে এটাই ছিল সরকারি অবস্থান, এবং আমি এটা আমার সেই নাম-না-জানা বারিকাদার বন্ধু থেকে শুরু করে দানিয়েল ওর্তেগা, সব মহল থেকেই শুনেছি। এতে অবশ্য কাজ হয় না। আমার মনে পড়ে, ১৯৬৫ সালে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের সময় আমি পাকিস্তানে ছিলাম, তখন আমার কেমন লাগতো যখন আমাদেরকে এমনসব তথ্য প্রদান করা হতো যার মধ্যে একটা ব্যাপারই নিশ্চিত ছিল যে সেগুলো হতো সচেতনভাবে এবং শোচনীয়ভাবে বিভ্রান্তিকর। আমার মনে আছে, কীভাবে পাকিস্তান কর্তৃক ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করার খবরকে আমরা দশ দিয়ে ভাগ এবং স্বীকৃত ক্ষতির পরিমাণকে সমসংখ্যা দিয়ে গুণ করার নিয়মটা শিখে ফেলেছিলাম। তখনই কেবল দুটো সংখ্যার মধ্যে একটা ভারসাম্য তৈরি হয় এবং আপনি সত্যের একটা আদল পান। ফকল্যান্ড/মালভিনার যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারের প্রচারমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণেও আমার ক্ষোভের কথা মনে আসে আমার। সেখানে আমার কাছে যেটা অগ্রহণযোগ্য ছিল, এখানেও তাইই।

প্রচারমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে আমি সান্দিনিস্তাদের সঙ্গে নেই কোনভাবেই। এটি আমাকে খুব পীড়িত করত যে লেখকদের সরকার কিনা পরিণত হলো একটি নিয়ন্ত্রকদের সরকারে। প্রধানত এই কারণেই সেদেশে আমার অবস্থানের সময়টাতে একধরনের নিরব তর্ক সারাক্ষণ আমার মাথার মধ্যে খেলা করত। আমি আমাকে বলতাম, একটা অসাধারণ কিছু বিনির্মাণের চেষ্টা হচ্ছে এখানে, যৎকিঞ্চিৎ রসদ নিয়ে এবং প্রচণ্ড চাপের মধ্যে। মার্কিন আগ্রাসনের প্রারম্ভে ১৯৮০/৮১ সালের ভূমি সংস্কার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যনীতি দেখিয়েছিল কীই না অর্জন করা যেতে পরে! সাক্ষরতা অভিযান, উদাহরণস্বরূপ, নিকারাগুয়ার নিরক্ষরের সংখ্যা পঞ্চাশ শতাংশ থেকে কুড়ি শতাংশেরও কমে নামিয়ে এনেছিল মাত্র দুই বছরে। এখন অবশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে লোকের জোগান দেওয়ার কারণে, প্রাথমিক অভিযানটির ধারাবাহিকতা তেমন রক্ষা করা যাচ্ছে না বলে নিরক্ষরতার সংখ্যা আবারও বেড়ে যাচ্ছে, জঙ্গল যেমন অযতেœ পড়ে থাকা একদা পরিষ্কৃত ভূমিকেও ক্রমে গ্রাস করে নেয় ফের। তারপর আমি তর্ক করতাম যে, সেইসব অভিযানগুলো সবই খুব ভালো, কিন্তু তারা মনে করে যে ভিন্নমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন স্রেফ প্রসাধনতুল্য। এবং বারিকাদার মত বাজে পত্রিকা আমি দীর্ঘদিন দেখিনি।

তর্কটা সবসময় একই জায়গায় শেষ হতো। নিকারাগুয়া একটি অবিশুদ্ধ রাষ্ট্র। তবে সেটি যে তার সমাজের কাঠামো পাল্টে দিয়ে এর অধিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নের চেষ্টায় একটি সত্যিকারের বিপ্লবের মধ্যে রয়েছে। এই সীমাবদ্ধতা, এমনকি সেন্সরশিপের মত গভীর ত্রুটিও, একটি সামরিক ও অর্থনেতিক পরাশক্তির দ্বারা তার পিষ্ট হওয়াটাকে বৈধতা দেয় না।

নিকারাগুয়ায় ছিলেন না মারিয়ো বার্গাস য়োসা, কিন্তু আমার কক্ষের নির্জনতায় আমি তাঁর সঙ্গেও তর্ক করতাম। লাতিন আমেরিকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন করার গুরুত্ব বিষয়ে তিনি এমন দক্ষতার সঙ্গে, এত প্রচুর লিখেছেন এবং বলেছেন; তিনি জোর দিয়েছেন এই বলে যে এটাই একমাত্র উপায়, বিপ্লব ও স্বৈরশাসনের বৃত্ত ভাঙার। তিনি তাঁর স্বদেশ পেরুর দক্ষিণপন্থী সরকার ও দলগুলোকে সমর্থন করেছেন এই বলে যে তিনি বুলেটের চাইতে ব্যালট পছন্দ করেন বেশি, যে একটি ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রও গনতন্ত্রহীনতার চেয়ে হাজার গুণে ভালো।

পেরু ছিল দক্ষিণপন্থীদের খুঁতি গণতন্ত্র। নিকারাগুয়া বামপন্থীদের খুঁতি গণতন্ত্র। যদি গণতন্ত্রই বার্গাস য়োসার লক্ষ্য হয়ে থাকতো, তাহলে তাঁর ঘোষিত নীতির আলোকেই নিকারাগুয়া ছিল সেইরকম একটি রাষ্ট্র যাকে তাঁর সমর্থন ও যার উন্নয়নে তাঁর লড়াই করা উচিত ছিল।

আমি, নীরবতার মধ্যেই, বিস্মিত হয়ে ভাবি, কেন তিনি সেটা করেননি।

[চলবে]

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close