Home অনুবাদ সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [পর্ব ৯] > আলম খোরশেদ অনূদিত

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [পর্ব ৯] > আলম খোরশেদ অনূদিত

প্রকাশঃ February 12, 2017

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল [পর্ব ৯] > আলম খোরশেদ অনূদিত
0
1

শব্দ

 

মানাগুয়ার রিগেরো বস্তির সান্তা মারিয়া দে লস আনহেলেস নামক অষ্টভুজা গির্জায়, পূর্ণ ধর্মীয় পোশাকে সজ্জিত পাদ্রি উরিয়েল মলিনা, পেছনে একটি পপ সঙ্গীত দলকে নিয়ে ঘরভরা উপাসকদের মুখোমুখি দাঁড়ানো। আধুনিক এই গির্জাটিকে মনে হচ্ছিল লোহার কাঠামোয় নির্মিত একটি টেপী-র মত। এর দেয়াল জুড়ে ছিল উত্তেজক রংয়ে আঁকা ম্যুরালের সমাবেশ। গির্জায় হলেও হ্যাটপরা সান্দিনো আর কার্লোস ফনসেকা, যথারীতি তার ছাগদাড়ি ও চশমাসমেত ঊর্ধ্বমুখী এবং ভবিষ্যতের দিকে মূর্তিবৎ দৃষ্টিনিবদ্ধ, যেমনটি সবসময় দেখায় তাঁকে; দুজনেই হাজির ছিলেন, যদিও সাদামাটা পার্শ¦দেয়ালে, এমন পরিস্থিতিতে, যীশু ও তাঁর দেবদূতদের সঙ্গে পার্শ্বচরিত্রের ভূমিকায় অভিনয়রত।

(স্বভাবসিদ্ধ ফনসেকা-ভঙ্গিটি স্পষ্টতই সামনে, আরও সামনে উঁচিয়ে ধরা দাড়িঅলা লেনিনের পুরনো ছবির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। মার্ক্সিজম-লেনিনিজম এই অনুমিত উর্বরভূমিতে এটাই ছিল আমার দেখা লেনিনের ছবির নিকটতম সংস্করণ, যা আমাকে বিস্মিত করে। অবশ্য, শেষাবধি আমি ভ্লাদিমির ইলিচ ও সেই বুড়ো জারজ, খোদ মার্ক্সের ছবিও দেখতে পাই: সবচেয়ে বড় শ্রমিক ইউনিয়নের অফিসে আমোদিত চেহারার সান্দিনোর দুইপাশে দাঁড়ানো অবস্থায়। তুলনায়, ধরা যাক, কেরালার চাইতে, যেখানে প্রতি দ্বিতীয় দেয়ালে মালায়লামভাষী লেনিনের দেখা পাওয়া যায়, কিংবা যেখানে বাস-এর নাম রাখা হয় হোসে স্তালিন, নিকারাগুয়ার লালেরা বেশ একটু রয়েসয়েই চলত। )

আমি এই গরিব মহল্লায়, যার বাসিন্দারা বিপ্লবে বেশ বড় ভূমিকা রেখেছিল, এসেছিলাম এর্নেস্তো কার্দেনাল ও কার্লোস মেহিয়া গদয়-এর সৃষ্ট ‘চাষাদের উপাসনা’ শুনতে, যাদের গুনগুনিয়ে সুর ভাজার প্রতিভা পল ম্যাককার্টনিরও ঈর্ষার কারণ হতো। এই মিসা কাম্পেসিনা ছিল ‘মুক্তির ধর্মতত্ত্বে’র সবচেয়ে নজরকাড়া বহিঃপ্রকাশ, যা নিকারাগুয়ার গির্জা-উপাসনায় এমত প্রার্থনা-পদাবলির জন্ম দিয়েছিল : ‘গির্জা ও বিপ্লবের মধ্যে নেই শোনো/ ন্যূনতম স্ববিরোধ কোনো।’ আমি আরও চেয়েছিলাম লিবারেশন থিওলজি তথা ‘মুক্তির ধর্মতত্ত্বে’ বিশ্বাসী সবচেয়ে দৃশ্যমান পাদ্রি এবং বালদিবিয়েসো কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ফাদার মলিনাকেও দেখতে, যেখানে তিনি এই জনগনের গির্জার ধারণাটিকে পাকাপোক্তভাবে বিনির্মাণ করেন, এবং লুইস কাররিয়নের ওপর যাঁর প্রভাব পড়েছিল তার প্রথম জীবনেই। বহিষ্কৃত বিশপ বেগা অবশ্য বালদিবিয়েসো কেন্দ্রের সদস্যদের একপাল মিথ্যুক বলে তীব্র আক্রমণ করেন। ‘সমস্যা হলো তারা মার্ক্সিস্ট পদ্ধতি প্রয়োগ করে। মার্ক্সিস্ট-দের কাছে মিথ্যা বলা বৈধ কেননা এর মাধ্যমে তাদের আদর্শকে আরও জোরালোভাবে গেঁথে দেওয়া যায়। আর মার্কিন সাংবাদিক শার্লি ক্রিস্টিয়ান তাঁর ‘নিকারাগুয়া: বংশে বিপ্লব’ বইয়ে, যে-বই সোমোসা-উত্তর নিকারাগুয়ার প্রায় প্রতিটি বিষয় নিয়েই ছিল বিরক্তিকররকম শত্রুভাবাপন্ন, (এবং যেখানে তিনি অন্যান্য অনেক বিষয়ের সঙ্গে ন্যাশনাল গার্ডের পলাতক সোমোসাপন্থী নেতা লিও সালাসার-এর প্রতি সহানুভূতিশীল বর্ণনা দেন, যিনি কিনা সোমোসাকে বলেছিলেন, ‘একজন চমৎকার লোক।’) ফাদার মলিনাকে একজন ‘একজন টেলিভিশন টক শো ব্যক্তিত্ত্ব’ বলে বর্ণনা দেন।

তিনি অবশ্যই খুব কেতাদুরস্ত, একজন দেখনদার মানুষ ছিলেন যিনি আবার হাতে বহন করা মাইক্রোফোন ব্যবহারের সঙ্গেও পরিচিত ছিলেন। তিনি গির্জার প্রার্থনাসভা এমন নাটকীয় ও মজাদার ভঙ্গিতে পরিচালনা করতেন যা নিশ্চিতভাবে মিজ ক্রিস্টিয়ানকে আহত করে থাকবে। আমি, অবিশ্বাসী, অবশ্য সেটা বেশ উপভোগই করেছি।

গিটারে ও ড্রামে সুর বেজে ওঠে এবং মূল গায়েন গান শুরু করেন :

‘তোমরা গরীবের ঈশ্বর,

সাদামাটা, মানবিক ঈশ্বর,

যে-ঈশ্বরের মুখ মেহনতে মজবুত,

আর সে-জন্যই তো আমি তোমার সঙ্গে কথা বলি …

আমার মানুষেরা যেমনটি করে,

কারণ তুমি কর্মী ঈশ্বর,

তুমি শ্রমিক-যীশু।’

 

চাষাদের উপাসনা গীত গানের সুরগুলো ছিল সত্যিকারের তাল-জাগানো, আর তার কথাগুলো ছিল এরকমই আটপৌরে। ‘প্রভু, আমাদের সাথে একাত্ম হও’, এক পর্যায়ে তারা উল্টোস্বরে এরকম বলে ওঠে, কেননা এরকমই তো রেওয়াজ যে বিশ্বাসীরাই বরং ঈশ^রের সঙ্গে একাত্ম হবে, তারা আরও বলে, ‘আমাদের সাথে তুমি সংহতি প্রকাশ করো।’ গরীবের ঈশ^রকে, তাদের একজন হয়েই কেবল আস্থা অর্জন করতে হবে।

সেদিনের প্রার্থনাবক্তৃতার বক্তব্যটুকু চয়ন করা হয়েছিল বাইবেলের ‘এক্সোডাস’ অধ্যায় থেকে, যার বিষয়বস্তুকে ফাদার মলিনা একটি প্রসারিত রূপকের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন, যেখানে নিকারাগুয়ার জনগণকে মিশরীয়দের অধীনে বন্দী ইহুদিদের সঙ্গে তুলনা করেন। সোমোসা-কে উপস্থাপন করা হয় ফারাও রূপে আর এফএসএলএন-কে মোজেস রূপে, যিনি দ্বিভাজিত রেড সী-এর ওপর দিয়ে তাঁর অনুসারীদের পুরাকথার সেই প্রমিজড ল্যান্ড-এ নিয়ে যাচ্ছেন, আর তাঁর পেছনে গরীবের ঈশ্বর, রামেসেসরূপী তাচো ও ন্যাশনাল গার্ডের মাথার ওপর দিয়ে সমুদ্রের জলধারাকে রুদ্ধ করে দিচ্ছেন।

জনগণ তাদের নিজদেশেই নির্বাসিত হতে পারে এবং নিকারাগুয়া হতে পারে মিশরের মত দুধ ও মধুতে ভরা একটি দেশের মত, এই ধারণাটিই ছিল খুব বৈপ্লবিক এবং ফলপ্রসূ। কিন্তু আমি লক্ষ করি যে, ফাদার মলিনা তাদের দীর্ঘ অরণ্যবাস এবং এমনকী ‘সোনালি বাছুর’ বিষয়েও তেমন কিছু বলেন না।

উপাসনা জমায়েতে আমেরিকার মধ্যপশ্চিমাঞ্চলের ক’জন কৃষকও উপস্থিত ছিলেন। রিগানপ্রেমিক নন, তারা এসেছিলেন নিকারাগুয়ার কৃষিপদ্ধতি বিষয়ে ধারণা নিতে এবং তাদের সাধ্যমত কিছুটা বুদ্ধি, পরামর্শ দিতে। নিকারাগুয়াতে তখন মার্কিন নাগরিকদের কমতি ছিল না, এর আগের বছর, উদাহরণস্বরূপ, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে অবসরভোগী ক’জন বৃদ্ধ এসেছিলেন, কফির ফসল তুলতে সাহায্য করার জন্য। কেননা তাঁরা শুনেছিলেন যে, হন্ডুরাস সীমান্তে ৫০০০০ সান্দিনিস্তা সৈন্য সরবরাহের কারণে কৃষিশ্রমিকের সংকট দেখা   দিয়েছিল। (নিকারাগুয়ানরা তাঁদের ডাকনাম দিয়েছিল, ‘রূপালি চুলের অংশীদার’।)

মার্কিন কৃষক ও অন্যান্য ব্রিগাদিস্তা তথা বিদেশি স্বেছাসেবীদের সুবিধার্থে ফাদার মলিনা, আমাদেরকে নিয়ে ইংরেজিতে একটি সমবেত সংগীত, ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ গাওয়ান। অন্যান্য অনেকের মত যাঁরা একবারেই গাইতে জানেন না, আমিও পুরনো সুরের বিষয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি; গলায় জমাটবাধা আবেগের দলাটি আমার কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত কষ্টকর, ভাঙাচোরা শব্দের সপক্ষে অজুহাত হিসাবে কাজ করে। ‘আমার হৃদয়ের গভীরর’, গির্জার কাচভাঙার ঝুঁকি নিয়েও চিৎকার করে বলি, ‘আমিও বিশ্বাস করি যে একদিন অবশ্যই জিতব আমরা।’

আমরা জিতি আর নাইই জিতি, রক্ত ও লাশের আলোচনায় অংশগ্রহণে অক্ষম আমি প্রার্থনাসভা ছেড়ে যেতে যেতে ভাবি, এই নতুন খ্রিস্টতত্ত্বের শক্তি ও জনপ্রিয়তায় বিশ্বাস না করে তাদের কোনও উপায় নেই। এর মাধ্যমে আমাকে ইতোপূর্বে সুইডেনের মিশনারি, বিদেশি সাংবাদিক ও নিকারাগুয়ার বন্ধুরা, এবং লন্ডন টাইমস্-এর এক রচনায় ড. কনর ক্রুজ ও’ব্রায়ান যা বলেছিলেন, সেটাই যেন প্রমাণিত হলো: লাতিন আমেরিকার গির্জার বিভক্তি এমন গভীরে ছড়িয়ে পড়েছে যে ভ্যাটিকানের নিশ্চয়ই এতে স্নায়ুদুর্বলতা দেখা দিয়েছে। রোমের সঙ্গে সম্পর্কছেদের এবং এক দ্বিতীয় ‘রিফর্মেশন’-এর সত্যিকারের সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে এখন।

[চলবে]

 

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. আলম খোরশেদ এর অনুবাদ। আমরা জানি যে তুলনা চলে না, তাঁর অনুবাদের ভাষা যা আমাদেরকে আকৃষ্ট করে থাকে…. ধন্যবাদ আলম খোরশেদ, ধন্যবাদ তীরন্দাজ।

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close