Home অনুবাদ সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল পর্ব ১ / আলম খোরশেদ অনূদিত

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল পর্ব ১ / আলম খোরশেদ অনূদিত

প্রকাশঃ November 10, 2016

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল পর্ব ১ / আলম খোরশেদ অনূদিত
0
0

দ্য জাগুয়ার স্মাইল পর্ব ১

অনুবাদকের ভূমিকা

১৯৮৮ সালে ন্যুয়র্ক শহরে পদার্পণ করার পরপরই যে ক’টি বই পাঠের সুযোগ হয় তার মধ্যে সালমান রুশদির প্রথম মননধর্মী গ্রন্থ  The Jaguar Smile অন্যতমবইটি তখন সদ্যই প্রকাশিত হয়েছে বলে পত্রপত্রিকায় বেশ আলোচনা হচ্ছিলতাছাড়া নিকারাগুয়ার সান্দিনিস্তা বিপ্লবের আমেজ তখনও একেবারে মুছে যায়নি আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের স্বপ্নচারী তরুণদের মন থেকেবইটি পাঠের পর রুশদিকে নতুন করে চিনতে শিখি তাঁর অগ্রসর চিন্তা গভীর মানবিকতাবোধের আলোকেঅত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত সুলিখিত এই গ্রন্থটি অনুবাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল তখন থেকেইকিন্তু নানা অনিবার্য প্রতিবন্ধকতার কারণে তা আর হয়ে ওঠেনিগেল বছর চট্টগ্রামস্থ এশীয় নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃজনশীল লেখালেখি বিভাগের এক শিক্ষিকার বাড়িতে আয়োজিত একটি সাহিত্যসভায় আমন্ত্রিত হয়ে গিয়ে হঠাৎ করেই বইটি নজরে পড়েআমার পুরনো অনুবাদেচ্ছাটুকু তখন পুনরায় জেগে ওঠেকথাটি গৃহকর্ত্রীর কাছে প্রকাশ করতেই তিনি সাগ্রহে বইটি আমাকে সম্প্রদান কারকে দান করে বসেন, সঙ্গে শুধু এই বিনম্র শর্তটুকু জুড়ে দিয়ে, যেন অচিরেই আমি তা আমার পূর্বতন ইচ্ছামাফিক বাংলাভাষী পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নিই অনুবাদের মাধ্যমেআমার সেই দুই যুগেরও বেশি পুরনো ইচ্ছার সঙ্গে সেই বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত মার্কিন সাহিত্যানুরাগীকে দেওয়া সাম্প্রতিক প্রতিশ্রুতিরই বিলম্বিত বাস্তবায়ন গ্রন্থটির এই অনুবাদ-প্রয়াসসেটি তীরন্দাজ পত্রিকার পাঠকদের  ভালো লাগলে এই পরিশ্রম সফল বলে মনে করবো

 

সালমান রুশদি / দ্য জাগুয়ার স্মাইল

 

আশা : একটি মুখবন্ধ

দশ বছর আগে আমি যখন দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডন এলাকায় মদের দোকানের ওপরের একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটে বাস করতাম তখন একদিন জানতে পারি যে আমার পাশের পেল্লায় বাড়িখানি নিকারাগুয়ার স্বৈরাচারী শাসক আনাস্তাসিয়ো সোমোসা দেবায়লের পত্নী কিনে নিয়েছেন। ৪৪ নম্বর বাড়ির ভদ্রলোক লর্ড লুকানের হাতে আয়া সান্ড্রা রিভেট খুন হবার পর পাড়াটি তখন গোল্লায় যাচ্ছিল, আমি তার কয়মাস পরেই অন্যত্র সরে যাই। হোপ সোমোসার সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি, কিন্তু তাঁর বাড়িটা খুব ঘনঘন চোরাঘন্টি বেজে ওঠার জন্য, আর রোলস্ রয়েস, মার্সিডিজ বেঞ্জ ও জাগুয়ার, লিমুজিনে রাস্তা-আটকানো পার্টির কারণে কুখ্যাতি অর্জন করে। দেশে, মানাগুয়ায়, তাঁর স্বামী ’তাচো’ তখন দিনোরা নাম্নী এক নারীকে রক্ষিতা হিসাবে গ্রহণ করে; সন্দেহ নেই ‘হোপ’ তাঁর মনমেজাজ চাঙা রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন এই পদ্ধতিতে।

তাচো ও দিনোরা নিকারাগুয়া ছেড়ে পালিয়ে যান ১৭ জুলাই ১৯৭৯ সালে, তার মানে ‘মুক্ত নিকারাগুয়া’র জন্ম হয় আমার ছেলের জন্মের ঠিক একমাস পরে। (১৯ জুলাই আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা দিবস, কেননা সেইদিনই সান্দিনিস্তারা মানাগুয়ায় ঢোকে, কিন্তু ১৭ই হচ্ছে সত্যিকারের আকাশে-টুপি ছোড়া দিন, দিয়া দে আলেগ্রিয়া, আনন্দের দিন।) আপতিকতার প্রতি সবসময় আমার একধরনের দুর্বলতা ছিল, তাই জন্মদিন দুটোর এই নৈকট্যটুকু আমার মধ্যে একটা সংহতিবোধ তৈরি করে দেয়।

রিগান প্রশাসন যখন নিকারাগুয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তখন সেই ছোট্ট মহাদেশটির (মধ্য-আমেরিকা) সঙ্গে, যার মাটিতে আমি কখনোই পা রাখিনি, গভীর একাত্মতা অনুভব করি। যত দিন যায় আমি এর ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠি, কেননা শত হলেও আমিও পরাশক্তির বিরুদ্ধে এক সফল বিদ্রোহের সন্তান; ভারতীয় বিপ্লবের ফসল যার চেতনাবিশ্ব। এটাও হয়তো সত্য যে আমাদের যাদের শেকড় পশ্চিম কিংবা উত্তরের শক্তিধর দেশগুলিতে প্রোথিত নয় তাদের মধ্যে একটি সাধারণ সাদৃশ্য রয়েছে, সেটি অবশ্যই তথাকথিত অবিভাজ্য ‘তৃতীয় বিশ্বীয়’ কোন সরলীকৃত দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং শক্তিহীনতা কী জিনিস সে বিষয়ে কিছুটা ধারণা, কিংবা নিচ থেকে দেখা দৃশ্যের অভিজ্ঞতা, আপনার মুখের ওপর নেমে আসা বুটের দৃশ্য তার তলা থেকে দেখতে কেমন লাগে সে-বিষয়ে সচেতনতা। আমি নিকারাগুয়া সংহতি আন্দোলনের একজন পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠি লন্ডনে। আমি এটা উল্লেখ করছি আমার আগ্রহের বিষয়টা বোঝানোর জন্য; অবশেষে যখন আমি ১৯৮৬-র জুলাইয়ে সেখানে যাই তখন একজন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক মাত্র ছিলাম না। শূন্য স্লেটমাত্র ছিলাম না।

আমি নিকারাগুয়া গিয়েছিলাম সান্দিনিস্তা সংস্কৃতি-কর্মী সমিতি নামে একটি ছাত্র-সংগঠনের অতিথি হিসাবে, যার কাজ ছিল লেখক, শিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, কারুশিল্পী প্রমুখকে এক ছাদের নিচে এনে জড়ো করা। উপলক্ষটি ছিল সান্দিনিস্তা ফ্রন্ট-এর বিজয়ের সপ্তম বার্ষিকী উদযাপন। আমি খুব সাগ্রহেই গিয়েছিলাম, তবে যথেষ্ট পরিমাণ স্নায়ুদৌর্বল্য নিয়ে। বিপ্লবসমূহের ভুল পথে পরিচালিত হবার, তার নিজের সন্তানদেরই গিলে ফেলার এবং যাকে ধ্বংস করার জন্য তার জন্ম, ক্রমে তার নিজেরই তা হয়ে ওঠার প্রবণতার সঙ্গে আমি পরিচিত ছিলাম। আমি আদর্শবাদ আর রোমান্টিকতা দিয়ে শুরু করে প্রতারিত প্রত্যাশা আর আশাভঙ্গের বেদনা দিয়ে শেষ করার কথাও জানতাম। সান্দিনিস্তাদের কি খারাপ লাগবে আমার? যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা পদদলিত না হবার অধিকারে বিশ্বাস করার জন্য সেইসব মানুষকে পছন্দ করতেই হবে এমন কোন কথা নেই, তবে এটা হলে ভালো, খুবই ভালো কথা।

এটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। ২৭ জুন হেগের আন্তর্জাতিক আদালত রায় দেয় যে সিআইএ কন্ট্রা নামে নিকারাগুয়ায় যে প্রতিবিপ্লবী বাহিনীকে তৈরি, সংগঠিত ও অস্ত্রায়ন করছে, তা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিসভা প্রতিবিপ্লবীদের সহায়তার জন্য প্রেসিডেন্ট রিগানের অনুরুদ্ধ ১০০ মিলিয়ন ডলার অনুমোদন করে। এর প্রত্যুত্তরে দানিয়েল ওর্তেগা বিরোধী দলের সংবাদপত্র লা প্রেন্সাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং বিশপ বেগা ও মসিনর-বিসমার্ক কারবায়ো নামের দুজন উত্তাল পাদ্রীকে বহিষ্কার করেন। বাতাসে তখন ঝড়ের পূর্বাভাস।

আমি জুলাইয়ের তিন সপ্তাহ নিকারাগুয়া ছিলাম। অতএব, এখানে যা লিখিত হচ্ছে সেটি সেই সুন্দর, আগ্নেয়গিরিময় দেশটির ইতিহাসের একটি মুহূর্তের, তার বেশি কিছু নয়, দৃশ্যচিত্র মাত্র। আমি বই লেখা, কিংবা কোনরকম কিছু লেখার উদ্দেশ্য নিয়ে নিকারাগুয়া যাইনি, কিন্তু দেশটির সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ আমাকে এতটাই নাড়া দেয় যে, শেষমেষ আর না লিখে কোন উপায় ছিল না। সেইজন্যই একটি মুহূর্তমাত্র : খুবই একটি গুরুত্বপূর্ণ ও উন্মোচক মুহূর্ত, কেননা এটি কোন আরম্ভ কিংবা সমাপ্তির মুহূর্ত নয়, বরং মধ্যবর্তী একটি সময়, যেটি ইতিহাস-পাল্লার মধ্যবিন্দুর খুব কাছাকাছি একটি সময়, যখন সবকিছু, ভবিষ্যতের সব সম্ভাবনা, সাম্যাবস্থায় ছিল।

এতসব স্বত্ত্বেও, আমি যেমনটা ভয় করেছিলাম, সেই সময়টিকে কোন অবস্থাতেই আমার আশাবিহীন কোন সময় বলে মনে হয়নি।

 

সান্দিনোর টুপি

“ক্রিস্তোফোরো কোলোন স্পেনের পালোস দে মোগের থেকে যাত্রা শুরু করেন, মহান খানদের দেশ আবিষ্কারের আশায়, যেখানে রয়েছে সোনার দুর্গ, যেখানকার প্রাণীগোষ্ঠী বেড়ে উঠছে বন্যস্বভাবে, এবং সেখানে হাঁটার পথে মহামূল্যবান রত্নের সন্ধান মেলে। তবে সেই পৃথিবীর পরিবর্তে, আরো একটি, সেটিও মূল্যবান, সুন্দর এবং রূপকথার মতো, দেশ আবিষ্কৃত হলো, যার নাম আমেরিকা।”

আমি হাবানা বিমানবন্দরে কুবার একটি ‘তামাক মানচিত্রে’ উপর্যুক্ত স্তবকটি পাঠ করি, জীবনে প্রথমবারের মতো মধ্য-আমেরিকায় ভ্রমণকারী একজনের জন্য এটিকে একটি অনুকূল আখ্যান বলেই মনে হয়েছিল। পরে অবশ্য বিমানটি যখন আপোয়েক আগ্নেয়গিরির খন্দে তৈরি হওয়া সবুজ জলাধার অতিক্রম করছিল এবং দৃষ্টিতে ভেসে উঠছিল মানাগুয়া শহরের ছবি, তখন আমার আরেকটি অন্ধকার আখ্যান, নেরুদার কবিতা সেন্ত্রো আমেরিকা থেকে উৎকলিত, মনে পড়ছিল :

বেতের মত দীঘল দেশ

অত্যাচারের মত উষ্ণ

তোমার পা হন্ডুরাসে, তোমার শোণিত

সান্তো দোমিঙ্গোতে

রাতের বেলা তোমার চোখ নিকারাগুয়ায়

আমাকে স্পর্শ করো, আমাকে আহ্বান করো, আমাকে আলিঙ্গন করো

আর সারা আমেরিকা জুড়ে আমি দরজায় করাঘাত করি

কথা বলার জন্য

আমি বোবা জিহ্বায় টোকা দিই

আমি পর্দা তুলি, আমি রক্তে হাত ডোবাই :

হে আমার মাটির বেদনা, হে আমূল প্রোথিত নৈঃশব্দ্যের

মৃত্যু-নূপুর

হে দীর্ঘ যন্ত্রণার মানুষ

হে অশ্রুর চিকন কোমর!

নিকারাগুয়ার জীবিতদের বোঝার জন্য আমার মনে হয়েছিল মৃতদের দিয়ে শুরু করা উচিত। দেশটি প্রেতে পরিপূর্ণ ছিল। আমার আগমনের মুহূর্তেই সান্দিনো বেঁচে আছে বলে একটি দেয়াল চীৎকার করেছিল আমার দিকে, এবং সঙ্গে সঙ্গে একটি বিশাল গোলাপি প্রস্তরখণ্ড জবাব দিয়েছিল এই বলে যে ক্রিস্তো বেঁচে আছে, এবং সঙ্গে আরো কিছু যোগ করে, শিগগিরই ফিরবে। এর কিছু পরেই আমি সেই শূন্য পাটাতনটি অতিক্রম করি, যেখানে সাত বছর আগে ঘোড়ায়-চড়া দানবটির একটি মূর্তি ছিল, অবশ্য সেটি তার আসল ছবি নয়, ইতালি থেকে দেওয়া একটা পুরনো মূর্তির ওপর তার মুখ বসানো। আগের মুখটি ছিল মুসোলিনির। স্বৈরাচারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে মূর্তিও উল্টে যায়, কিন্তু শূন্য ভিতটি টিকে ছিল একধরনের প্রতারণার মতো। সেখানে লেখা সোমোসা বেঁচে আছে; শীতল, কালো এক শব্দবন্ধ, যা তখন সচরাচর শোনা যেত না নিকারাগুয়ায়, কিন্তু দানবটি ঠিকই বেঁচেবর্তে ছিল। তাচো ১৯৮০ সালে পারাগুয়াইতে আর্হেন্তিনীয় মন্তোনেরো বাহিনীর আততায়ীর হাতে নিহত হন, কিন্তু হন্ডুরাস সীমান্তে কাউবয় টুপি-পরা তাঁর প্রেতচ্ছায়া ঘুরে বেড়াতো সদাই।

[চলবে…]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close