Home অনুবাদ সিলভিয়া প্লাথ > তিনটি দীর্ঘকবিতা >> মাসুদুজ্জামান অনূদিত

সিলভিয়া প্লাথ > তিনটি দীর্ঘকবিতা >> মাসুদুজ্জামান অনূদিত

প্রকাশঃ March 9, 2018

সিলভিয়া প্লাথ > তিনটি দীর্ঘকবিতা >> মাসুদুজ্জামান অনূদিত
0
0

সিলভিয়া প্লাথ > তিনটি দীর্ঘকবিতা >> মাসুদুজ্জামান অনূদিত

 

[মাত্র বত্রিশ বছর বয়সে আত্মহনন করে মৃত্যুবরণ করেন সিলভিয়া প্লাথ (১৯৩২-৬৩)। কিন্তু তাঁর আগেই অতলান্তিকের দুই পারে এবং বাইরের বিশ্বেও তাঁর কবিখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। অসামান্য এমন কিছু কবিতা তিনি রচনা করেছেন, যা আজও আগের মতোই সমানভাবে পাঠকদের আপ্লুত করে রাখছে। এখানে তাঁর এরকমই তিনটি কবিতার অনুবাদ প্রকাশিত হলো।]

 

বাবা

 

তুমি আর না, আর না।
আর না তুমি, কালো জুতো
তাতেই আমি পায়ের মতো করে বাস করেছি
তিরিশ বছর, গরিব, সাদা,
ভয় পেয়েছি শ্বাস ফেলতে, হাঁচি দিতে।

বাবা, তোমাকে আমার মেরে ফেলার কথা ছিল।
কিন্তু যতদিনে আমার সময় হলো তার আগেই তুমি মারা গেলে—
মার্বেলের মতো ভারী, এক ব্যাগভর্তি ঈশ্বর,
বীভৎস মূর্তি একটা ধূসর পায়ের আঙুল দিয়ে
একটা ফ্রিস্কো সিল মাছের মতো বিশাল

আর উদ্ভট অতলান্তিকে জেগে থাকা একটা মাথা
যেখানে সে নীলের উপর শিম-সবুজ রং ঢালে
সুন্দর নসের ঠিক বাইরের পানিতে।
তোমাকে ফিরে পাওয়ার জন্য আমি প্রার্থনা করতাম
ওয়ান, টু।

জার্মান ভাষায়, পোল্যান্ডের সেই শহরে
যেটা রোলার দিয়ে গুঁড়িয়ে সমান করে দেয়া হয়েছিল
যুদ্ধ, যুদ্ধ, যুদ্ধ।
কিন্তু শহরের নামটা বিশেষ কিছু নয়
আমার পোলিশ বন্ধু

বলে একডজন কী দুডজন আছে।
আমি কোনোদিন তাই জানতে পারিনি কোথায় তুমি
তোমার পা রাখা ছিল, তোমার শিকড়,
আমি কোনোদিন তোমার সঙ্গে কথা বলতে পারিনি।
আমার জিভ চোয়ালের সঙ্গে সেঁটে যেত।

আটকে গেল একটা কাঁটাতারের ফাঁদে।
হিশ হিশ হিশ
আমি প্রায় কথাই বলতে পারিনি।
আমার মনে হতো যে সব জার্মানই তুমি।
আর এর ভাষাটাই যেন অশ্লীল।

একটা ইঞ্জিন, একটা ইঞ্জিন,
ইহুদির মতো আমাকেও ঠেলে নিয়ে যায়
একটা ইহুদির মতো দাহাউ, আউশভিচ, বেলসেনে।
আমি ইহুদির মতো কথা বলা শুরু করলাম।
আমার মনে হতে থাকে আমি বোধহয় সত্যিই একজন ইহুদি।

টাইরলের তুষারপাত, ভিয়েনার স্বচ্ছ বিয়ার
ঠিক তেমন বিশুদ্ধ বা সত্য নয়।
আমার বেদেনির পূর্ব নারীজীবন আর আমার অদ্ভুত ভাগ্য নিয়ে
আর আমার তরপানো তাস আর আমার তরপানো তাস
আমি কিছুটা ইহুদি হলেও হতেও পারি।

আমি চিরদিন তোমাকে ভয় পেয়েছি
তোমার বায়ুসেনা, তোমার আউলাঝাউলা
তোমার পরিচ্ছন্ন গোঁফ
তোমার উজ্জ্বল নীল আর্য চোখ
ট্যাংক চালক, ট্যাংক চালক, আঃ, তুমি-
ঈশ্বর নয়, বরং একটা স্বস্তিকা
এত কালো যে কোনো আকাশ উঁকি দিতে পারত না।
সব নারী এক-একজন ফ্যাসিস্টের আরাধনা করে,
মুখে জুতো মারা, বর্বর

বর্বর হৃদয় তোমার মতো বর্বর মানুষের।
তুমি ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছো, বাবা,
তোমার যে ছবিটা আমার কাছে আছে-
পায়ের বদলে তোমার থুতনি কাটা,
কিন্তু তাতে কি, তুমি কম শয়তান নও, না,
সেই কালো মানুষটার চেয়ে কিছু কম না, যে

আমার সুন্দর হৃদয় কামড়ে দ্বিখণ্ডিত করেছিল।
আমার বয়স তখন দশ যখন ওরা তোমাকে কবর দেয়।
বিশবছরে আমি চেষ্টা করেছিলাম মরতে
আর তোমার কাছে ফিরে-ফিরে যেতে।
আমি ভেবেছিলাম যে শুধু হাত কখানাতেই চলবে ।

কিন্তু ওরা আমাকে ঝুলি থেকে বের করে আনলো।
ওরা আমাকে আঠা দিয়ে জোড়া দিল।
আর তখনই আমার বোঝা হয়ে গেল আমি কী করবো।
আমি তোমার একটা প্রতিমূর্তি বানালাম,
কালো পোশাকের একটা মানুষ, যার মেইনক্যাম্ফের মতো চেহারা

আর যে ভালবাসে যন্ত্রণা দেবার পাটাতন আর স্ক্রু।
আমি বললাম বিয়ে করবো, করবো।
ফলে বাপজান, অবশেষে আমার উত্তরণ ঘটলো।
কালো টেলিফোনটা শিকড় থেকে ছিঁড়ে গেছে,
কণ্ঠস্বরগুলো গুঁড়ি মেরে পেরিয়ে আসতে পারে না।

আমি যদি একজনকে খুন করে থাকি তবে আমি দুজনকে মেরেছি—
ভ্যাম্পায়ারটা বলছিল যে সে তুমি
একবছর ধরে আমার রক্ত শুষে খেয়েছিল,
আসলে সাতটা বছর, যদি তুমি জানতে চাও, বলি।
বাপজান এখন তুমি শুয়ে পড়তে পারো।

তোমার স্ফিত কালো হৃদয়ে একটা কাঠের গজাল
আর গ্রামের লোক তোমাকে কোনোদিনই পছন্দ করতো না।
ওরা নাচছে আর তোমার উপর পদাঘাত করছে
ওরা সবসময় জানতো যে তুমিই দোষী
বাপজান, বাপজান, বেজম্মা তুই, আমি তো পেরিয়ে এসেছি।

১৯৬২

 
লেডি ল্যাজারাস

 

কাজটা আমি আবার করেছি।
প্রতি দশবছরে একবার
আমি ঠিক ঠিক করি—

চলিষ্ণু অলৌকিকের মতো, আমার চামড়া
নাৎসি ল্যাম্পশেডের মতো উজ্জ্বল,
আমার ডান পা

একটা কাগজচাপা,
আমার মুখ অবয়বহীন, মসৃণ
ইহুদি কাপড়।

ন্যাপকিনটা ছাড়িয়ে দাও
হে আমার শত্রু।
আমি কি ভীতিপ্রদ কিছু?–

নাক, চক্ষুকোটর, পুরা দাঁতের পাটি?
টকটক শ্বাস-প্রশ্বাস
একদিনেই চলে যাবে।

খুব দ্রুত, দ্রুতই, যে মাংস
কবরের গুহা খেয়ে নিয়েছিল
সেই বাসা নেবে আমাকে

আর আমি হবো এক স্মিতহাস্যমুখর নারী।
আমার বয়স সবে ত্রিশ।
বেড়ালের মতো আমার ন’বার মৃত্যু লেখা আছে।
এবার নিয়ে হলো তিনবার।
কী জঞ্জাল
প্রতিটি দশক নিশ্চিহ্ন করতে।

কত নিজুত অংশ।
চিনেবাদাম-চিবুতে থাকা জনতা
ধাক্কাধাক্কি করে দেখতে আসে

ওরা আমার হাত-পায়ের আবরণ খুলছে—
এক বিপুল নগ্নীকরণের মজা।
ভদ্রমহোদয়গণ, মহিলারা।

এই যে আমার দুটি হাত,
আমার দুই হাঁটু।
আমি নেহাৎ হাড়-চামড়া হতে পারি,

তবুও আমি সেই একই অভিন্ন নারী।
প্রথম যখন এটা হলো তখন আমার বয়স দশ।
সেটা ছিল দুর্ঘটনা।

দ্বিতীয়বার আমি চেয়েছিলাম
ব্যাপারটাকে শেষপর্যন্ত টেনে নিতে আর না ফিরতে।
আমি দুলে দুলে বন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম

একটা ঝিনুকের মতো।
ওদের ডাকতে হয়েছিল, ডাকতেই।
আর আমার গা থেকে চটচটে মুক্তোর মতো পোকাগুলোকে খুঁটে তুলতে হয়েছিল।

মৃত
একটা শিল্প, অন্য সবকিছুর মতোই।
আমি সেটা অসাধারণ ভালো করি।

আমি ওটা এমনভাবে করি যাতে দুর্দান্ত লাগে।
আমি ওটা করি যাতে বাস্তব মনে হয়।
মনে হয় বলতে পারো যে এতে আমার বিশেষ পারদর্শিতা আছে।

ছোট্ট ঘরে কাজটা করা বেশ সহজ।
ব্যাপারটা করে তেমনি থাকাও বেশ সহজ।
এই যে নাটকীয়

প্রত্যাবর্তন প্রকাশ্য দিবালোকে
সেই একই জায়গায়, একই মুখ, একই পাশবিক
আমাদের চিৎকার :

‘অলৌকিক!’
যেটা আমাকে অভিভূত করে।
বিশেষ মূল্য ধরা আছে

আমার কাটা দাগগুলো দেখার মূল্য ধার্য আছে।
আমার হৃদয়ের স্পন্দন শোনার জন্য, আছে-
সে সত্যি সত্যিই চলে।

বেশ চড়া দাম ধরা আছে,
একটা কথা অথবা একটুখানি স্পর্শ
অথবা এতটুকু রক্তের জন্য

অথবা আমার চুলের বা আমার জামার একটা টুকরোর জন্য।
সুতরাং, সুতরাং, ওহে ডাক্তার
শত্রুসাহেব।

আমি তোমার সবিশেষ সৃষ্টি,
আমি তোমার মূল্যবান,
খাঁটি সোনার শিশু

যা গলে যায় একটা চিকারে।
আমি পাশ ফিরি আর পুড়ে যাই।
মনে করো না যে আমি তোমার তীব্র উদ্বেগকে কম মূল্য দিই।

ছাই, ছাই-
তুমি খোঁচাও আর নাড়ো।
মাংস, হাড়, কিছুই নেই ওখানে—

একটা সাবান,
একটা বিয়ের আংটি,
একটা সোনার তৈরি ভরানো দাঁত।

ঈশ্বরপ্রবর, শয়তানের হাড্ডি,
সাবধান
সাবধান।

ছাই থেকে
আমি লাল চুল নিয়ে উঠে আসি।
আর আমি বাতাসের মতো পুরুষ ভক্ষণ করি।

১৯৬২

 

অস্থিরমত্ত প্রেরণার দেবীরা

 

মা, মা, কোনো অশিষ্ট খালা-ফুপু
বা কোনো বিকৃতমুখ আর কুৎসিত
জাতবোনকে তুমি বড্ড ভুল করে
আমার নামকরণের অনুষ্ঠান থেকে দূরে রেখেছিলে
সে যে তার বদলে এই মহিলাদের পাঠিয়ে দিল
যাদের মাথা রিফু করা ডিমের মতো আর যারা
আমার শিশুশয্যার পায়ের দিকে, মাথার দিকে
আর বাঁদিকে দাঁড়িয়ে শুধু মাথা নাড়ে আর মাথা নাড়ে?

মা, যারা মাপ দিয়ে মিক্সি ব্ল্যাকসর্ট নামে
বীর ভালুকের গল্প বানিয়েছিল,
মা, সবসময় যাদের ডাইনিরা, সবসময়
রান্না হয়ে আদা-কেক হয়ে যেত, আমি অবাক হয়ে ভাবি
তুমি কি তাদের দেখেছিলে, তুমি কি কোনো শব্দ উচ্চারণ করেছিলে
ওই তিন নারীর কাছে আমাকে মুক্ত করতে,
যারা রাতে মুখহীন, চক্ষুহীন, সেলাই করা টাকমাথা নিয়ে
আমার বিছানার চারদিকে মাথা নাড়ত,

ঝড়ের সময়, যখন বাবার বারোটা
পড়বার ঘরের জানালা ঘরে ঢুকে পড়লো
এমন বুদ্বুদ যা ফেটে পড়ার মতো অবস্থা, তুমি
ভাই আর আমাকে মিষ্টি বিস্কুট আর ওভালটিন খাওয়ালে
সাহায্য করলে আমাদের গান গাইতে
থর রেগে গেছেন, বুম, বুম, বুম !
থর রেগে গেছেন, আমরা তোয়াক্কা করি না !
কিন্তু সেই মহিলারা জানলার শার্সি ভেঙে ফেললেন!

জোনাকির মতো ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে
আর জোনাকির গান গেয়ে
পায়ের আঙুলের ডগায় স্কুলের মেয়েরা যখন নাচতো
আমি, আমার ঝলমলে পোশাকে এক পা-ও উঁচুতে তুলতে পারিনি।
বরং ভারী পায়ে দাঁড়িয়ে থেকেছি
ওই বিচ্ছিরি মাথার ধর্মমায়েদের ছায়ায়
তুমি কেঁদেছো আর কেঁদেছো :
ছায়া লম্বা হয়েছে, আলো গেছে নিভে।

মা, তুমি আমাকে পিয়ানো শিখতে পাঠিয়েছিলে
আমার সুরের নকশা আর কম্পমান সুরের প্রশংসা করেছিলে।
যদিও শিক্ষকরা মনে করেছেন আমার
স্পর্শ অদ্ভুত রকমের কাঠ কাঠ, স্কেল থাকা সত্ত্বেও
ঘণ্টার পর ঘণ্টা অভ্যাস থাকা সত্ত্বেও,
আমি সংগীতবধির, আর হ্যাঁ, আমাকে শেখানো অসম্ভব।
আমি জেনেছি, জেনেছি, জেনেছি অন্য কোথাও থেকে,
তোমার ভাড়া করা নয় এমন দেবীদের কাছ থেকে, মা।

একদিন জেগে উঠে আমি তোমাকে দেখলাম, মা
আমার উপরে সুনীলতম বাতাসে ভাসতে ভাসতে

যেই তুমি ডাকলে : এখানে এসো,
একটা সবুজ বেলুনে, ঝলমলে লক্ষ ফুলে
আর একটা নীলপাখি যা কখনও ছিল না,
কখনও, কখনও কোথাও ছিল না,
কিন্তু সেই ছোট্ট গ্রহ মাথা নেড়ে সাবানের বুদ্বুদের মতো
চলে গেল!
আর আমি আমার ভ্রমণসঙ্গীদের মুখোমুখি হলাম।

দিনে, রাতে এখন শিয়রে, ধারে, পায়ের কাছে,
তারা তাদের পাথরের পোশাকে পাহারা দেয়
মুখগুলো ঠিক তেমনি শূন্য যেমন সেই যেদিন আমি জন্মেছিলাম,
তাদের ছায়াগুলো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর সেই অস্তমান সূর্যে
যা কখনও উজ্জ্বল হয় না বা অস্ত যায় না।
আর এই সেই রাজ্যপাট যেখানে তুমি আমার জন্ম দিয়েছো,
মা, মা। কিন্তু আমার কোনও ভ্রুভঙ্গিও জানাবে না কারা থাকে আমার সঙ্গে।
১৯৫৭

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close