Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ অনূদিত কবিতা সি. পি. কাভাফির একগুচ্ছ কবিতা > অনুবাদ : আয়শা ঝর্না

সি. পি. কাভাফির একগুচ্ছ কবিতা > অনুবাদ : আয়শা ঝর্না

প্রকাশঃ June 23, 2017

সি. পি. কাভাফির একগুচ্ছ কবিতা > অনুবাদ : আয়শা ঝর্না
0
0

সি. পি. কাভাফির একগুচ্ছ কবিতা > অনুবাদ : আয়শা ঝর্না

ভুমিকা

সি. পি. কাভাফি কিংবা কনস্টানটাইন পেট্রো কাভাফির জন্ম ১৭ এপ্রিল ১৮৬৩ সালে, মৃত্যু ২৯ এপ্রিল ১৯৩৩। কাভাফির কবিতার আঙ্গিক, পরিপ্রেক্ষিত এবং ফর্মের ভিন্নতা তাঁর কবিতাকে দিয়েছে নতুন এক মাত্রা। সে কারণে কাভাফি শুধু গ্রিসে নয় পশ্চিমা সাহিত্যেও সমান আদৃত। কাভাফির জন্ম আলেক্সন্দ্রিয়ায়, এক ধনী ব্যবসায়ী পিটার জন কাভাফি এবং মাতা চারিক্লিয়া ফটিয়াদির ঘরে, দুই পরিবারই ছিল কনস্টান্টিপোলের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী।

কিন্তু ভাগ্য তার প্রতি ছিল খুবই অপ্রসন্ন। তাই সাত বছর বয়সেই ধনাঢ্য বাবা তাদের ছয় ভাইয়ের জন্য কিছু না রেখেই মারা যান। ফলে দেশে থেকে দেশে তাদের সৌভাগ্যকে ফিরিয়ে আনার জন্য ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। দেশ থেকে দেশান্তরী হতে হয়েছে। তাকে মৃত্যুাবধি যাপন করতে হয়েছে খুব সাধারণ একটি জীবন।

কাভাফি সেই দুর্ভাগা কবি যিনি গ্রীক হয়েও থাকতেন আলেক্সান্দ্রিয়ায়, যদিও তার নিজ দেশের প্রতি ছিল সুতীব্র টান। তাই তিনি ইউরোপে না যেয়ে দেশের কাছাকাছি থেকে কবিতার মৌলিক সুর খুঁজতে শুরু করেন এবং মিশরের অতীত ঐতিহ্যের সাথে একাত্মতা বোধ করেন। এজন্য কাভাফির কবিতাতে হেলেনিস্টিক যুগের অনেক এলিমেন্ট, ক্যারেক্টার চলে আসে। কাভাফি কবিতার ক্ষেত্রে ছিলেন পারফেকশনিস্ট। তার কবিতা ফর্ম ও আঙ্গিকের দিকে থেকে ছিল সে সময়ের কবিদের থেকে একেবারেই আলাদা। ফলে কাভাফির  কবিতাতে ছিল আধুনিকতার ছোঁয়া। কেননা তিনি ছিলেন জীবনবাদী। জীবন থেকেই উঠে আসে তার কবিতার এলিমেন্ট স্বতঃস্ফুর্তভাবে। কাভাফি কবিতা এবং নিজ জীবন নিয়ে ছিলেন রক্তাক্ত। একজন শিল্পী হিসেবে চাইতেন একজন তরুণের ছবি আঁকতে যার মৃত্যু হয়েছে ১৫ বছর পূর্বে অথচ একজন প্রাজ্ঞ শিল্পী হিসেবে তিনি সেই তরুণের অনুভুতির প্রতি ছিলেন অনুরক্ত। আর সেই তরুণটি ছিল কবি নিজেই। কাভাফি পাস্তারনাক, টি.এস. এলিয়টদের মতই নিজের কবিতার স্বর খুঁজে বেড়িয়েছেন। ১৯১১ সালে হোমারের ওডিসি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লিখেন ’ইথাকা। ‘ইথাকা’কবিতাটি হলো জীবনের ভ্রমণ। আমাদের জীবনও এক ভ্রমণ ছাড়া অন্য কিছু নয় যেখানে প্রত্যেকেই ‘ওডেসিয়াস’দের মতো অভিজ্ঞতা লাভ করে যখন সে ট্রয় থেকে ফিরে আসে। ‘যখন তুমি ইথাকা পৌছাবে হয়তো তুমি তোমার উদ্দেশ্যে সফল নও, ইথাকা হয়তো তোমাকে ধনী করেনি কিন্তু সে তোমাকে দিয়েছে এক সুন্দর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা।’ এখানে পাঠকদের জন্য সি. পি. কাভাফির ছয়টি কবিতার অনুবাদ সংযুক্ত করা হোল।

ইথাকা

যখন তুমি তোমার ভ্রমণ শুরু করবে ইথাকার উদ্দেশ্যে

তখন প্রার্থনা করো, রাস্তা দীর্ঘ

রোমাঞ্চপূর্ণ, জ্ঞানপূর্ণ,

লেস্টিজোনিয়ানদের ভয় পেও না

সাইক্লোপ, পোসিডনদের ক্রোধকেও না।

তুমি কখনো তোমার পথে তাদের দেখা পাবে না

যদি তোমার চিন্তা হয় শুদ্ধ আর যদি তোমার সুন্দর

অনুভব তোমার দেহ ও আত্মাকে ছুঁয়ে থাকে।

তুমি কখনো লেস্টিজোনিয়ান

সাইক্লোপ আর পোসিডনের ক্রোধাগ্নির পাবে না দেখা,

যদি তুমি তাদেরকে তোমার আত্মায় ধারণ না করো,

যদি তোমার আত্মা তাদের তোমার সন্মুখে উত্থাপন না করে।

 

তাহলে প্রার্থনা করো, রাস্তা দীর্ঘ,

গ্রীষ্মকালীন অনেকগুলো সকাল পাবে,

যখন তুমি প্রথম বন্দরগুলোতে ঢুকবে,

তোমার হৃদয় ভরে উঠবে আনন্দে!

ফোনেশিয়ান বাজারে থেমো,

কিনে নিও সুন্দর পরিধেয়, ঝিনুকের ভেতর মুক্তো, কোরাল, অম্বর, আবলুশ কাঠ,

আর কিনে নিও সব আনন্দদাযক সুগন্ধী।

মিশর শহরের অতিথিশালায় যেও,

শিখে নিও যা পারো ওখানকার জ্ঞানীদের কাছ থেকে।

সবসময় স্মরণে রেখো ইথাকাকে

সেখানে পৌছে স্মরণে রেখো তোমার উদ্দে্শ্যকে

কিন্তু ভ্রমণে তাড়াহুড়ো কোর না,

ভাল হয় যদি তা হয় দীর্ঘ বছরের

আর যদি তুমি সেখানে যেতে যেতে বৃদ্ধ হয়ে যাও,

তুমি ধনী হও সেসব নিয়ে যা তুমি পথে অর্জন করেছো,

আশা কোর না যে ইথাকা তোমাকে ধনী করবে।

 

ইথাকা তোমাকে দিয়েছে একটি সুন্দর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা,

তাকে ছাড়া কখনো তুমি এ পথে আসতে না

কিন্তু তোমাকে দেবার জন্য তার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

 

আর যদি তুমি তাকে গরীব দেখো, ভেবো না যে সে তোমাকে প্রতারণা করেছে,

তুমি মহৎ জ্ঞান অর্জন করেছো, অনেক অভিজ্ঞতাও।

তুমি ততক্ষণে বুঝে গেছো নিশ্চয়ই ইথাকা তোমাকে কি বোঝাতে চায়।

 

শব্দ এবং নিরবতা

(যদি শব্দের কোন অর্থ না থাকে তবে নিরবতা মূল্যবান—আরবি প্রবাদ)

নীরবতা  হলো সোনা আর শব্দ হলো রুপা।

কে  এমন বাইবেল বর্হির্ভুত শব্দ উচ্চারণ করে?

কি অলস এশিয়ান অন্ধত্ব এবং এর ভেতর নিমজ্জিত

অন্ধত্বের দিকে যাত্রা? কি ভাঙাচোরা মানুষ

মানবিকতার জন্য সে আগন্তুক, নীতিকে অপমান করেছে

সম্বোধন করেছিল আত্মাকে সিনেমা বলে আর শব্দকে রুপা?

একমাত্র আমাদের ঈশ্বর উপযোগী, উপহারস্বরূপ, সবকিছুকে ধারণ করে-

গভীর আগ্রহ, দুঃখ, আনন্দ, ভালবাসা

আমাদের পশুসূলভ আচরণে একমাত্র মানবিক চিহ্ন!

তোমরা যারা এটিকে সিলভার বলো, তাদের বিশ্বাস নেই

ভবিষ্যতে সকল নিরবতা ভেঙে রহস্যময় শব্দ।

তোমরা জ্ঞানকে উপভোগ করতে পারো না, উন্নতি তোমাদের উল্লসিত করেনা,

তোমাদের অজ্ঞতা সোনালি নীরবতা- তুমি সন্তুষ্ট।

তুমি অসুস্থ। অসহনীয় নীরবতা কবরের অসুখ,

সেখানে উষ্ণ সমবেদনাময় শব্দ হলো স্বাস্থ্য।

নীরবতা হলো ছায়া আর রাত্রি, শব্দ হলো দিনের আলো।

শব্দ হলো সত্য, জীবন অমৃত।

চলো কথা বলি, কথা বলি-নীরবতা মানায় না আমাদের।

যখন থেকে আমরা শব্দের ভার দ্বারা নির্মিত হয়েছি।

চলো কথা বলি, কথা বলি-আমাদের কথা চলুক।

স্বর্গীয় চিন্তাভাবনা নিয়ে, আত্মাকে মুক্ত করে দেয়া কথামালা।

 

শরীর, স্মরণ..

শরীর, শুধু মনে রেখো না যে তুমি কতটা ভালবাসা পেয়েছিলে,

শুধুমাত্র সে বিছানার কথা মনে রেখো না যেখানে তুমি শোও,

এ ছাড়াও মনে রেখো সেসব আশা আকাঙ্খার কথা তোমার জন্য

যা সহজভাবে জ্ব¦লে উঠেছিল তোমার চোখে,

আর কম্পিত স্বরে এবং কিছু সুযোগ

নষ্ট হয়েছিল কিছু বাধার কারণে।

সেসব কিছু আজ অতীত

এটি মনে পারে যে তুমি কতটা চিৎকার করেছিলে

সেইসব আকাঙ্ক্ষা জন্য- সেগুলো কতটা উত্তেজক ছিল!

স্মরণে রেখো, তোমার দৃষ্টিতে তারা সৃষ্টি হয়েছিল

কিভাবে তোমার জন্য স্বর কেঁপে উঠেছিল, স্মরণে রেখো শরীর।

 

আয়াসিসের  কবর

আমি, আয়াসিস, শুয়ে আছি এখানে।

সৌন্দর্যের  জন্য এই শহরে বিখ্যাত,

সবচেয়ে বেশী জ্ঞানী ব্যক্তি থেকে শুরু করে খুব সাধারণ লোক প্রশংসা

করতো আমার সৌন্দর্যের, তাতে আমি একই ধরনের আনন্দ পেতাম।

 

কিন্তু নিয়তির কারণে পৃথিবীতে অভিশপ্ত, নার্সিসাস এবং হার্মিসের ফ্যাশন

ধ্বংশ করেছে আমাকে, হত্যা করেছে আমায়।  হে পর্যটক

যদি আপনি একজন আলেক্সান্দ্রিয়ান হয়ে থাকেন তবে দোষারোপ করবেন না,

আপনারা জানেন, জীবনের প্রবাহ, কি উত্তাপ এর, আর কি আনন্দের!

 

নিরোর সময়ে

নিরো তখনো সজাগ ছিল না যখন সে শুনেছিল

দেলফির দৈব বাণী।

“তাকে ভয় পেতে দাও সত্তর বছরকে।”

তখনো বিস্তর সময় ছিল নিজেকে উপভোগ করার।

সে মাত্র তিরিশ বছরের।  সেই সময়টা

তার জন্য ঈশ্বর যে সময়টা বরাদ্দ করেন তা ছিল যথেষ্ট

নিজেকে বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য।

 

এখন সে রোমে ফিরে যাবে কিছুটা অবসন্ন হয়ে,

তবে আনন্দময় অবসন্নতা আসে এই ভ্রমণ থেকে

যা ধারণ করে আছে পুরো দিনের উপভোগকে

থিয়েটারে, বাগানে, অ্যাথলেটিকের মাঠে…

বিকেলটা কেটেছে গ্রীসের শহরে..

আহ সেইসব ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নগ্ন শরীরগুলো, সবকিছুর  ওপরে

 

নিরো এসমস্ত কিছু ভাবছিল। আর স্পেনের গালবাতে

গোপনে সব সৈন্য-সামন্ত তৈরি রাখছিল এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়ার জন্য

সত্তর বছরের সেই বৃদ্ধ।

 

সমাধিক্ষেত্র

যখন স্মৃতি তোমার পদচিহ্ন নিয়ে যায়

সমাধিক্ষেত্রের দিকে, শ্রদ্ধাভরে

আমাদের প্রার্থনা পবিত্র রহস্যময়

অন্ধকার  ভবিঝ্যতের দিকে

তোমার মনকে জাগাও ঈশ্বরের প্রতি।

তোমার সন্মুখে সরু বিছানা অনন্তকালের ঘুম

যা জেসাসের করুণার নীচে নিহিত।

 

আমাদের  প্রিয় ধর্ম তার ক্ষমতা দেখায়

আমাদের  কবরে আর আমাদের মৃত্যুতে।

এটি পছন্দ করে না কোন উপহার, প্যাগানদের

জৌলুস ক্ষতিগ্রস্ত।

অসংবেদনশীল কোন সোনার গয়না ছাড়া

সেই সরু বিছানায় অনন্তকালের ঘুম

যা জেসাসের করুণার নীচে নিহিত।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close