Home শ্রদ্ধাঞ্জলি সুচিত্রা মিত্র > ‘ঢাকা আমাকে মুগ্ধ করেছে…’ >> জন্মদিন

সুচিত্রা মিত্র > ‘ঢাকা আমাকে মুগ্ধ করেছে…’ >> জন্মদিন

প্রকাশঃ September 19, 2018

সুচিত্রা মিত্র > ‘ঢাকা আমাকে মুগ্ধ করেছে…’ >> জন্মদিন
0
0

সুচিত্রা মিত্র > ‘ঢাকা আমাকে মুগ্ধ করেছে…’ >> জন্মদিন

 

[সম্পাদকীয় নোট : আজ প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্রের জন্মদিন। এ উপলক্ষে প্রকাশিত হলো সাক্ষাৎকারভিত্তিক এই প্রতিবেদনটি। লিখেছিলেন সাংবাদিক সুনীল ব্যানার্জি। প্রকাশিত হয়েছিল সচিত্র সন্ধানীতে, ১৯৮৪ সালের ১৭ জুন সংখ্যায়। উল্লেখ্য, সুচিত্রা ঠিক তাঁর আগের মাসে, মে ১৯৮৪-তে ঢাকা এসেছিলেন বাংলাদেশের একজন সংগীত অনুরাগীর নিমন্ত্রণে। প্রতিবেদনটি থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কতটা গভীর ছিল। কিন্তু ১৯৮৪ সালের পরে তিনি আর কখনও বাংলাদেশে এসেছিলেন কিনা, জানা নেই। কোনো পাঠকের জানা থাকলে আমাদের অনুগ্রহ করে সেই ভ্রমণের কথা জানাবেন।]

 

উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্র কদিন আগে ঢাকা ঘুরে গেলেন। তাঁর ঢাকায় আসার আগে সরকারিভাবে প্রচার করা হয়েছিল যে, তিনি এখানে অনুষ্ঠিতব্য প্রথম আন্তর্জাতিক সঙ্গীত সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন। সরকারের এই প্রচারে স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়েছিল সুচিত্রা মিত্র সরকারের আমন্ত্রণে ঢাকায় এসেছেন। কিন্তু না, এ ধারণা ঠিক নয়। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের প্রধান এই প্রখ্যাত শিল্পী ঢাকায় এসেছিলেন নিজের প্রচেষ্টায়, একজন ব্যাংকারের স্পনসরশীপে। উঠেছিলেনও ব্যাংকার জনাব আবদুল মতিন খানের ধানমন্ডিস্থ বাসভবনে। সেখান থেকে তিনি ঢাকা ক্লাব, সঙ্গীত ভবন, ছায়ানট ও কয়েকটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। বেড়িয়েছেন ভক্তদের বাসায়। এক সপ্তাহ ধরে ঢাকার বন্ধু-বান্ধব ও ভক্তদের সঙ্গে দেখা করে তিনি গত ১লা জুন বাংলাদেশ বিমানে কলকাতার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছেন।

৩১শে মে সকালে সুচিত্রা মিত্রের সঙ্গে দেখা হয়েছিল ধানমন্ডির উক্ত বাসভবনে। কুশল বিনিময়ের পর ঢাকা কেমন লাগছে জিজ্ঞাসা করাতে একগাল মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন, ১১ বছর পর এসে দেখছি ঢাকার পরিবর্তন হয়েছে আকাশ-পাতাল। নতুন বিমানবন্দর, প্রশস্ত রাস্তাঘাট, সংসদ ভবন, স্টেডিয়ামের আলোর রোশনাই প্রভৃতি তাকে মুগ্ধ করেছে।

এরই মাঝে রয়েছে ধানমন্ডি, বনানী, গুলশান, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর প্রভৃতি আবাসিক এলাকায় সবুজের সমারোহ। এ প্রসঙ্গে তিনি বললেন, ‘কলকাতার দশতলা বাড়িতে থাকি। এতো সবুজ দেখার সৌভাগ্য হয় না সেখানে। এখানে মুক্ত আকাশ দেখতে পাচ্ছি, এটাই বড় কথা।’

রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিল্পী হয়েও সুচিত্রা মিত্র তবলা, বিভিন্ন ধরনের নৃত্য ও উচ্চাঙ্গ সংগীতেও পারদর্শী। শান্তিনিকেতন থেকে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের সাথে উচ্চাঙ্গ সংগীতেও ডিপ্লোমা নিয়েছেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতে তাঁর সুখ্যাতি বিশ্বজুড়ে। ভারত সরকার এই মহান শিল্পীকে স্বীকৃতি দিয়ে পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত করেছেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতের ওপর এ যাবত তার তিন শতাধিক রেকর্ড ও ডজনখানেক ক্যাসেট বের হয়েছে। তার প্রথম গানের রেকর্ড বের হয় মাত্র একুশ বছর বয়সে।

বাংলাদেশের শিল্পীদের সম্বন্ধে সুচিত্রা মিত্রের ধারণা খুব ভালো। তিনি বললেন, ‘এখানে অনেক জাতশিল্পী রয়েছেন। যতই অনুশীলন করবে ততই তাদের প্রকাশ ঘটবে। শুধু তাই নয়, এখানকার মানুষ গান-পাগল। গানকে এরা শুধু ভালবাসে না, শ্রদ্ধাও করে। এর প্রমাণ, আমার অসংখ্য ভক্ত।’

সুচিত্রা মিত্রের বাবা সৌরেন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন একজন নামকরা সাহিত্যিক। তাঁর লেখা বহু উপন্যাস, গল্প, প্রভৃতি বই একসময় যথেষ্ট সুখ্যাতি কুড়িয়েছিল। সাহিত্যিকের মেয়ে হয়ে সাহিত্য থেকে কেন সরে গেলেন জিজ্ঞাসা করা হলে সুচিত্রা মিত্র স্মিত হেসে বললেন, ‘সঙ্গীতচর্চার ফাঁকে ফাঁকে আমিও কিছু কিছু সাহিত্যচর্চা করে থাকি। আর তারই ফসল আমার লেখা প্রকাশিত তিনটি বই। এখনো সময় পেলে মাঝে মাঝে লিখি।’

রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিল্পী হিসেবে ইদানিং যাঁদের নাম সর্বাগ্রে শোনা যায় তাঁদের মধ্যে সুচিত্রা মিত্র ও কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখযোগ্য। বলাবাহুল্য, এঁরা দুজনেই শান্তিনিকেতনের ছাত্রী। সুচিত্রা মিত্রকে শান্তিনিকেতনের সেই স্মৃতিমুখর দিনগুলোর কথা বলতে বলা হলে তিনি বললেন, ‘কণিকা ও অরুন্ধতী মুখার্জি (প্রখ্যাত চলচ্চিত্র প্রযোজিকা) ছিল আমার সমসাময়িক। আমরা তিনজন ছিলাম বন্ধুর মতো। শৈলজারঞ্জন, অনাদি সেন, শান্তিদেব ঘোষ প্রমুখ শিক্ষকের কাছে আমরা শিক্ষা নিয়েছি। এঁদের শিক্ষা দেয়ার আর্ট ভুলবার নয়। বিশেষ করে শান্তিদেব ঘোষ আমাকে প্রভাবিত করেছেন সবচেয়ে বেশি।’

চল্লিশের দুর্ভিক্ষের সময় সুচিত্রা মিত্রের প্রশংসনীয় ভূমিকার কথা আজ আর কারো অজানা নয়। সেই সময়ে গণনাট্য আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতে। সেই আন্দোলন তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারকেও কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সুচিত্রা মিত্র ছাড়া দেবব্রত বিশ্বাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কলিম শরাফী, আবদুল আহাদ প্রমুখ নামকরা শিল্পী ঐতিহাসিক এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সেই অগ্নিঝরা দিনগুলির কথা সুচিত্রা মিত্রকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, ‘সবসময় সব কথা বলা যায় না। তবে এইটুকু বলতে পারি, সেদিনের দুর্ভিক্ষে প্রগতিশীল আন্দোলনে জীবনটাকে গড়ে তুলতে শিক্ষা পেয়েছি। পেয়েছি চরিত্রগঠনে সহায়তা।’

সুচিত্রা মিত্রের জন্ম ১৯২৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের এক প্রখ্যাত ব্রাহ্মণ পরিবারে। এক ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ছোট। তাঁর দাদা সৌমেন্দ্র মুখার্জি একজন নামকরা চিত্র প্রযোজক। প্রমথেশ বড়ুয়ার অধীনে তিনি বেশ কিছুদিন ছিলেন। সুচিত্রার সাথে তাঁর দাদার একমাত্র মেয়ে চিকুও (সুদেষ্ণা মুখার্জী) বাংলাদেশে এসেছিল। অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী চিকুর বয়স যখন মাত্র ১১ দিন, মাতৃহারা হয়েছিল সে। সেই থেকে চিকু তার পিসিমা সুচিত্রা মিত্রের কাছে থাকে। চিকুও একজন প্রতিভাময়ী শিল্পী। এরই মাঝে সে গানের জগতে বেশ নাম কিনেছে। সুচিত্রা মিত্রের একমাত্র ছেলে কুনাল মিত্র এখন সপরিবারে আমেরিকায়। কুনাল সেখানে চাকরি করছেন।

প্রখ্যাত এই সঙ্গীতশিল্পী সুচিত্রা মিত্র দেশ-বিদেশের বহু জায়গায় ঘুরেছেন। এরই মধ্যে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন, পশ্চিম জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া, পোল্যান্ড, আমেরিকা প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেছেন। বাংলাদেশে তিনি এর আগে তিনবার এসেছেন। প্রতিবারই তিনি বহু অনুষ্ঠানে গান গেয়ে কুড়িয়েছেন প্রশংসা। আগামী ডিসেম্বর অথবা জানুয়ারিতে তিনি আবার আসবেন। তাঁর বড় আশা কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ নিজের চোখে একটু দেখা। এই আশা আজও যেমন পূরণ হয়নি, তেমনি কক্সবাজার, মহাস্থানগড়, চট্টগ্রাম, ময়নামতিসহ বাংলাদেশের প্রধান প্রধান স্থান দেখা হয়নি তাঁর। এসব স্থান দেখার জন্য তিনি আবার আসবেন বাংলাদেশে। তাই জীবনানন্দের ভাষায় সুর মিলিয়ে বলতে হয় : আমার আসিব ফিরে – ধানসিড়িটির তীরে – এই বাংলায়।

সুনীল ব্যানার্জি

ছবি : ঢাকায় তোলা

সচিত্র সন্ধানী ১৭ জুন ১৯৮৪

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close