Home ছোটগল্প সুবন্ত যায়েদ >> শিকার ও শিকারির স্বর [ছোটগল্প]

সুবন্ত যায়েদ >> শিকার ও শিকারির স্বর [ছোটগল্প]

প্রকাশঃ May 20, 2017

সুবন্ত যায়েদ >> শিকার ও শিকারির স্বর [ছোটগল্প]
0
1

সেখান থেকে শহর দেখা যায় যখন আন্ধার নামে, যখন ঝিলিমিলি বাত্তিগুলো শহরময় ঝলমলাইয়া জ্বলে ওঠে, তখন ছেলে বুড়োরা চাটের বেড়া ফাঁক করে ভূত দেখার মতোন শহর দেখে। বাড়ির কিশোর ছোকড়াটা পিদিমের আলোয় দুলতে দুলতে ধর্ম বইয়ে স্বর্গের বিবরণ পড়তে থাকলে বাড়ির কর্তা আর কর্তীর চোখদুটো লোভে চকচক করে। ওপাশে আব্দুল মতিনের ঘরে আজন্ম রোগা বাচ্চাটি সারা বিকেল বিলাপের মতো কেঁদে কেঁদে সন্ধ্যা বেলায় থির হয়ে দু’চোখ ড্যাব ড্যাব করে জানালার ফাঁক দিয়ে শহরের ঝিলিমিলি আলো দেখে। পোদ্দার চাচা ছেঁড়া চাদরে লোমহীন বুক ঢাকতে ঢাকতে জানালার কবাট ফেলে দেয়। যদিও শহরের থেকে এখানকার তফাত দৃষ্টির সীমায়, তবু এখানে শীত হানা দেয় আগে ভাগে। তখন কারো কারো কান সজাগ হয়। আরে ঐ শোন ওরা মনে হয় আসতে লেগেছে, ডানার শব্দ শুনতে পাস কায়েম? ওরা এবার আগে ভাগেই আসতে লেগেছে। টিভিতে নাকি কইছে সে দেশেও নাকি এবার শীতের শুরুতেই পাত্থরের লাহান বরফ পড়তে শুরু করেছে, এই বার দেখিস, লম্বা ঠোঁটওয়ালা পাখি বেশুমার নামতে শুরু করবে চরে, নতুন একটা ফাঁদ এবার শিখে নিয়েছি রে কায়েম, এই বার দেখিস।

শহর আর সেই ছোট্ট জনপদকে বিভক্ত করে রেখেছে বিস্তৃত সে সোনাপাতিল বিল। এখন শুকনোর সময় তবু জনপদ টু শহর, বিলের এখানে অগাধ জল, এদিকটায় জল শুকোয় না। আর জনপদের এই উঁচু ভূমির উত্তরে আধ মাইলের বেশি একটু নাও বয়ে গেলে সদ্য শুকিয়ে ওঠা বিস্তৃত স্থলভাগ শুরু হয়, নাম পড়েছে যার বোলতলা চর। সে জলাভূমি এখন স্থলভাগ হয় বটে, বছর ত্রিশ কি চল্লিশ আগে ওদিকটাও জলডোবা হয়ে থাকতো। বাপ দাদারা কয়ে গেছে, অগাধ জল নয়, ওদিকটায় হাঁটু সমান জল নামতো, তখন মাছ ধরার উৎসব পড়ে যেতো গাঁয়ে গাঁয়ে। তখন মাছও ছিলো বটে, এখনকার হাটে যে সব মাছ দামের তাপে ছোঁয়া যায় না পর্যন্ত, সেসব মাছ তারা ভাগাড়ে ফেলে ছাই ঢাকা দিতো। শালার দেখো কান্ড, আজকালকার দিনে মাছের কেমন মঙ্গা লেগে গেছে, ভবিষ্যৎ আন্ধার। আর এখনকার মাছ ধরার পদ্ধতিতে কোনো উৎসব নাই। ডিজিটাল সব জাল ত’য়ের হয়েছে, তা ধরার সুযোগই বা কতোটুকু। এখন দলের বড়ো বড়ো মাথা কিংবা প্রভাবশালী যারা শহরে বাস করে আর যাদের চৌদ্দ গোষ্ঠি বিলের জল ছুঁয়ে দেখে নাই তাদের নামেই বিলের মালিকানা। এখন এই জনপদের অধিবাসিগণ তাদেরই হুকুমের গোলাম, অথচ এই দ্বীপবাসী রক্তে মাংসে জেলে আর এই পরিত্যক্ত উঁচু ভূমি সেকালে ছিলো ভয়ঙ্কর এমন জঙ্গলা যে ব্রিটিশরা নাকি এখান থেকে বাঘ শিকার করেছিলো এমন গল্পের চল আছে। কিংবা আস্ত ছাগল গিলে ফেলার মতো অজগরের কথাও শোনা যায়। কিছু জেলেরা সে জঙ্গলা সাফ করে বসতি গড়ে স্বচ্ছলতার আশায় আর তখন তারা স্বচ্ছলতা পেয়েছিলোও বটে। রূপকথার গল্পের মতো মাছে ভাতে খেয়ে পরে সুখে শান্তিতে বসবাস করে থাকতো। তারপর তারা দেখলো বিলের ওপারের সপ্তায় তিন দিন বসা ছোটো হাট দিনে দিনে বিস্তৃত হয়। হাটবার ছাড়াও নিত্যনৈমিত্তিক সব কিছু পাওয়া যায়। দোকান ঘর তো বাড়েই কিন্তু চাটাই আর কাঠের বদলে টিন, আর টিনের বদলে ইট সিমেন্টের যোগ হয়। লিকলিকে তালপাতার সেপাই বাতাসে যেনো ডাইনে বায়ে টাল খায়, এমন কারো কারো গায়ে ফিরতি হাওয়ায় চর্বি জমে। ক্রমশ বাড়ন্ত ভুঁড়িটা হাঁটতে বসতে লেফট রাইট খায়। অন্যান্য আদমিগুলো যাদের পড়তি বাতাসে টাক মাথায় আকাশমুখো তিন কুড়ি সাত কুড়ি রুক্ষ চুল দোল খায়, এক সময় তারা ঘোরের ভেতরেই লক্ষ করে সে ভুঁড়িওয়ালা মানুষগুলো তাদের মাথায় চড়ে বসে আছে। এ হলো দুনিয়ার আজিব দিক তবু সত্যিকারের। সুুতরাং নাচতে লাগো কি আর করা, ভুঁড়িওয়ালা লোকগুলোর ভার মাথায় লয়ে নাচতে থাকো। পেটের খরায় পুটকির চামড়া শুকোক আর হাড়ের ভেতরে মরণের জীবাণু বাসা বাঁধুক, তাতে কি, মাথায় লয়ে নাচলে আদতে লাভ আছে বৈকি। নাচবে না তো গর্তে সেঁধোও, এখানে জায়গা কই। কিন্তু সে নাচের মুদ্রা ক’জন আর রপ্ত করতে জানে। জেলেরা শিকার করা মাছের লেজের উত্তাল নৃত্যই দেখেছে বটে জনমভর, সে নৃত্যের মুদ্রার নাম যে মৃত্যু, সে খোঁজ তারা রাখে নাই। সেবার শরীরের অর্ধেক জলে ডুবে আর অর্ধেক ডাঙায় ভেসে মরে থাকলো একজন, মাথা ছিলো তার জলে ডোবা। দুজন পুলিশ সে লাশ ডাঙায় তুলতেই হা করা মুখের ভেতর থেকে জলে লাফালো পোনা মাছের বাচ্চা। তাই দেখে উপরে দাঁড়িয়ে থাকা সৈয়দ সাহেব গোঁফের তলায় লুকিয়ে হাসে আর জেলে পাড়ায় হায় হোসেন হায় হোসেন রব ওঠে। সে ছিলো বিপ্লবী হোসেন যার লাল দলে তার নাম হয়েছিলো বেশ। সৈয়দ সাহেবের বিলের মালিকানায় জেলে পাড়ার সে একাই তুমুল বাধ সেঁধেছিলো। তারপর পরিস্কার প্রজ্ঞাপন, এই মাছ অমুকের তমুকের, ধরলে তার এই সেই দণ্ড। সে এক সময় বটে জেলেপাড়ার মানুষদের। গফফরের কন্যা শিশু হামাগুড়ি দিয়ে জলে পড়ে মরে আর গফফর তার বউয়ের সাথে লাঠালাঠি করে রক্তে ফেনা ওঠা মুখে বিকার শুয়ে থাকে। ক্ষুধা। কারো কোনো নতুন পেশার আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা কোনোটাই নাই। তবু কেউ কেউ শহরমুখো হয় আর বাকিরা এই সেই করে হতাশায় মাস কয়টা কাটিয়ে দেয়।

সেবার জেলে পাড়ায় অন্যরকম শীত নামে, যেনো শতবর্ষী মৃতদেহ নড়তে চড়তে লাগে। বোলতলা চরে তখন অতিথি পাখির ঢল নেমেছে। অবশ্য শীতের শুরুতে কম হলেও মাঝামাঝি সময়ে পুরো চরজুড়ে সাদা নীল আর ধূসর কালারের অসমতল ঢেউ। কখনো কখনো সেখানে সৌখিন পর্যটকের আগমন ঘটে কিন্তু সেবার দলে দলে জেলে পাড়ার শিশু কিশোর থেকে বুড়োরা পর্যন্ত বোলতলা চরে নামে। তখন খুব ভোর যখন কিনা পাখিরা ঠিক মতো জেগে ওঠেনি, তখন প্রথমে কয়েকজন এসে সম্ভাব্য কয়েক জায়গায় ফাঁদ পেতে দুপুর নাগাদ শ’খানেক শীতের পাখি শিকার করে শহরে এনে চড়া দাম হাঁকে। মানুষজনও রসিক বটে, বিদেশী পাখি, কোন দেশ থেকে ডানার কসরতে এদেশে এতোদূর এসেও দেহটা তার থলথলে মাংসে ভারি, রূপে গুণে খাসা, পালকের নীচ দিয়ে লাল মাংস মানুষের চোখ ঝলসায়। সুতরাং ব্যবসা হলো মন্দ কি, আপাতত একটা হিল্লে হলো বৈকি। জনপদবাসী দারুণ লালায়িত, বোলতলা চর সেতো সোনা নয় যেনো হিরে মানিক। শীতের সন্ধ্যায় জনপদবাসীদের চোখে মূর্খ অবজ্ঞা ঝিলমিল করে। শহরের লাল নীল আলো জলের ভেতর দিয়ে তাদের কাছে আর আসে কই। যদিও তাদের টাকার থলেটার পেট মোটা রোগ নাই, তবু হলো তো কিছু নতুন করে। আর জিহ্বার ডগায় নতুন জৌলুস। আবছা কুয়াশামাখা সন্ধ্যার আন্ধারে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে মানুষের মাথার উপরে ওড়ে, তাতে মসলা ও মাংসের আগুনে ঝাঁঝ। মাস খানেকের ভেতরেই পেটমোটা অপুষ্ট বালক-বালিকা কচি লাউয়ের ডগার মতো লকলক করে। পড়তি বয়সী নারী পুরুষেরা যাদের ক্ষুধায় আর পারস্পারিক হেলায় অনিহা জন্মেছিলো যৌনাচারে, তারাও বিছানায় তরুণ হয়ে ওঠে। এতো সব সরল প্রক্রিয়া নিয়ে আর কে ভাববে, কিন্তু ভাবলো মোনজেল কোবরেজ। কোবরেজ মশাই সত্তরের বুড়ো তার আবার বউ মরেছে পঞ্চাশের কোঠায়। ত্রিশটা বছর একলা জীবন, রাঁধে বাড়ে খায় দায় আর লতাপাতা আম জাম করলার বিচি পাটায় পিষে কোবরেজি পথ্য বানায়। পুরো জনপদবাসীর ভেতরে এই একটা জীবনই তুলনা মূলক আয়েশী, স্বচ্ছলও বটে। দ্বীপের বাইরে থেকেও নিয়মিত তার কাছে বিচিত্র সব রোগীরা এসে ভিজিট করে। সেই একাকী কোবরেজ বুড়ো আবিষ্কার করে যৌন রোগের মহৌষধ। বোলতলা চরে তখন বিচিত্র সব পাখি, কালো আর সাদা রঙের লম্বা ঠ্যাংওয়ালা পাখিগুলো বেশি হলেও ছোটো ঠ্যাং কিন্তু লম্বা ঠোঁটওয়ালা নীল আর ছাইরঙা পাখিগুলোও চোখে পড়ে মন্দ না। তার ভেতরে সেই নীলরঙা পাখিগুলোর লাল মাংস কলজে আর মাথা সমেত ভূনা করে বার কয়েক খেলে যৌবনে নতুন পানির জোয়ার আসে, কোবরেজ বুড়ো পোকা খাওয়া দাঁত ক্যালায়। তখন জনপদজুড়ে ঘোষণা প্রচারিত হয় নীল পাখি আর শহরে আমদানি না করার, উপযুক্ত মূল্য দিয়েই নীল পাখি কিনবে মোনজেল বুড়ো কোবরেজি কারবারের জন্য। সেদিন থেকে নীলরঙা লম্বা ঠোঁটওয়ালা পাখি আর শহরমুখো হয় না। বুড়ো কোবরেজের বাড়িতে দিন সাতেকের ভেতরে নীল পাখির খামার হয়ে হয়ে যায় আর শহরময় বিভিন্ন প্রচারণা চালাতে থাকলে তার কাছে ভিজিটরও বাড়তে থাকে গুড়-অভিমুখি পিঁপড়ের লাহান। এ এক আজিব রোগ বটে, এতোদিনে আসল রাস্তা জেনে কোবরেজ বুড়ো উঠোনময় রাজার হালে পায়চারি করে আর তার কাছেই বন্দি নীল পাখিগুলো খাঁচায় ঘুরে ঘুরে কিসের নাম যে জপ করে, কোবরেজ বুড়োর কেন, তা কারো ভাবনার বিষয় না।

ঘ  

সেই জনপদের তরুণ দুজন কায়েম আর শরাফ যারা কিনা রোজ সন্ধ্যায় শহরের ঝলমলানো আলো দেখে শহর আর তাদের সাথে যোগ বিয়োগের অংক কষে। কিন্তু ফল হয় তার পাঁচ দশটা ইংরেজি নাম্বারের মাইনাস পয়েন্টের জিরো। তখন মাথার ভেতরে লাভার মতোন বলক ওঠে কিন্তু বলক উঠে বিলের শীতল জলেই গড়াগড়ি খায়। এদিকে সপ্তা গড়াতে গড়াতে মাস গড়ায় তবু এখনো পাখি শিকারে সুবিধে করে ওঠা যায় কই, মানুষজন কেমন পাগলা হয়ে উঠে শিকারে নামে তাতে ফেলা ছাড়া যায় বেশি বাচ্চাদের খাবারের মতোন। দরকার আসলে পারফেক্ট শিকারের জায়গা নির্বাচন আর যেদিকটা নিরিবিলি একটু আর পাখিও চড়ে মন্দ না এমন গভীরে একটু।  এসব প্ল্যান-প্রোগ্রাম করেই তখন মধ্য শীতের পরিষ্কার সে সকালে কায়েম আর শরাফ জলে ডিঙ্গি ভাসায় আর হঠাৎ কুয়াশার ঝাঁপি খুলে গেলে তারা বড়ো একা হয়ে যায় আর অসহায়ও কিছুটা কিন্তু সে গায়ে বাঁধে না। আজ যদি একবার আগে গিয়ে উত্তরের দিকে গোটা চল্লিশেক ফাঁদ পাতা যায় তবে কাম। ওদিকে নীল পাখিরা বেশি চরে। কিন্তু কায়েম, কুয়াশায় শুধু আমাদের ডিঙ্গিখানা ছাড়া জগতে আর যে কিছু দেখা যায় না, কোন দিক থেকে কোন দিকে না চলে যাই। কিন্তু এদিক পানেই তো বোলতলা চর, ঘণ্টাখানেক বৈঠা মারার আগেই ডিঙ্গিখানা চরের মাটিতে গিয়ে ঠোকর খাচ্ছে দেখা যাবে। কিন্তু এ যে কেমন কুয়াশা পড়তে লেগেছে এতোদিন বাদে আজ, যেনো বরফের সমুদ্রে নাও চলে। শীতও পড়ছে জব্বর আজ, পাখিরা কোন মরার দেশে যে আসে। ধরা যাক চরজুড়ে পাখি আর পাখি, সাদা পাখি নীল পাখি, কইলজায় হিমের ছ্যাকা খেয়ে হলুদ আর কালো ঠ্যাং আকাশে তুলে মরে আছে, বোলতলা চর তখন মরার চর। কিন্তু ও শালারা কি শীতে মরার জাত, ঠুকরে ঠুকরে বরফ খায় পারলে আবার বোলতলায় আসে সাহেবদের মতোন ছুটি কাটাতে, ভালোই হয়েছে বটে, ভালোই। কিন্তু কুয়াশা কাটে না। তখন ঘন ঘন কায়েম আর শরাফ আকাশের দিকে তাকায় আর গাঢ় কুয়াশার সাথে দৃষ্টি হোঁচট খায়। আজ বুঝি আর সূর্যের মুখ দেখার ভাগ্যি নাই। তবে আজ খালি হাতেই ফিরতে হয় কিনা, ফাঁদ পেতে দূর থেকে নজর রাখার কোনো উপায় নাই আর তাছাড়া কোনো পাখির দেখা মেলে কিনা, যা আন্ধার। তখন সময় সম্পর্কে তারা সজাগ হয়ে ওঠে আর শরাফ বৈঠা থামিয়ে কতোক্ষণ থির হয়ে থাকে। কয় ঘণ্টা ধরে যে ডিঙ্গি বাওয়া চলে, মনে কয় সারা দিনমান। আমরা মনে হয় পশ্চিমে বয়ে যাচ্ছি, ভূতোবিবি আর বাউলাওঠা বিলের দিকে মন কয়, যেখানে রোদের দিনে যেতেও সাহস হয় নাই। কায়েম হা হা করে হাসে যেনো ভূতোবিবির ভূত চেপে বসে ঘাড়ে। পুরো বিলজুড়ে এমনই নীরবতা, চমকে শরাফের ছলাত ছল বৈঠার শব্দ থামে আর কায়েম হাসি শেষে সম্ভাব্য বোলতলার দিকে তাকায় আর শংকার ভেতরেই মনে সাহস উস্কানি দেয়, আরেকটু বৈঠা মারলেই দেখা যাবে যে বোলতলা চরের মাটিতে নাওখানা ভীড়ে গেছে।

অবশেষে চরের মাটিতে নাওখানা হোঁচট খাবার মতো করে থেমে যায়। কায়েম গলা ফাটিয়ে চেঁচায় আর শরাফ লাফাতে লাফাতে চরের মাটিতে বৈঠাখানা ছুঁড়ে দেয়, শালার কুত্তার হাল হয়ে গিয়েছিলো একেবারে। কিন্তু শরাফ তুই বড্ড ধীরে বৈঠা মেরেছিস, ঘণ্টাখানেকের পথে কেটে গিয়েছে তিনগুণ একসময়। কিন্তু শালার তাতে ক্ষতি বলে কিছু হয় নাই, এখনো বড্ড আন্ধার বোলতলায়। আর কাণ্ডখানা দেখোদিনি, সবি কপাল রে গোপালের মা সবি কপাল। তবে আর কি, তাবুখানা টাঙায়ে ভেতরে বসে আল্লার নাম জপ করি নয়তো যে হাওয়া উঠলো নতুন করে শালার, নাড়িভুঁড়িতে খিল ধরে না পড়ে থাকি বোলতলা চরে। কিন্তু তখনো তাদের কানে কোনো শব্দ আসে না বলে তারা মনে মনে তড়পায়। বেলা উঠে কোন আসমানের গিয়ে ঠেকেছে সে হিশেব নাই, পাখিগুলোর নিদ কি এখনো ভাঙে নাই না শীতে কাঁপুনি ধরে মরে চিত হয়ে আছে আসমানে ঠ্যাং তুলে। সেটাই বা মন্দ কি, ধরা যাক, সে সাদা চামড়ার বিদেশি সাহেবটা আবার না হয় এলো, এবার অবশ্য অন্য কথা, একেকটা নীল পালক এক টাকার অর্ধেক। আর এই বোলতলার চরজুড়ে নীল পাখি আর নীল পাখির আসমান বরাবর ঠ্যাং। তখন নৌকায় তাবুর ভেতরে বসে কল্পনার চাপে তারা উত্তরের হাওয়ার কাঁপতে কাঁপতেও ঝিমায়। কিন্তু সে আর কতোক্ষণ, বেলা গড়ায় বুঝি দুপুর হয়, কিন্তু সূর্য কই। যদিও কুয়াশা একটু পাতলা হয় আর অল্পদূরের ছবি দেখা যায়। তখন তারা একটু নির্ভার হয়ে কাগজে মোড়ানো রুটি বের করে চিবোতে চিবোতে অধৈর্য্য হয়ে আবোল তাবোল খিস্তি ছাড়ে, যেনো রুটি নয় রোদে পোড়া গরুর চামড়া চিবোয়। তারপর তারা নদীর পাড় ঘেঁসে বোলতলা চরে পাখির অবস্থান দেখতে বের হয়। কিন্তু এ কি আজিব কাণ্ড দেখোদিনি, চরটা যে শুধু ডানে এবং ডান দিকেই মোড় নেয়। চরের কোন দিকে যে এসেছি কায়েম, খেলনা পুতুলের মতোন কেমন চক্কর খেতে লেগেছি, দাঁতগুলো বড্ড শিরশিরায় মনে কয় ভাগ্যের বাড়াটায় দাঁত খিঁচিয়ে কামড় বসাই। আরে দেখো কালো কালো, একটা নাও ভাসে মনে কয়। কিন্তু এ তো আমাদেরই নাও, বাতাসে তাবু নড়ে আর মাটিতে গাবের কষের খসখসা কালো বৈঠা, হায়রে কায়েম হায়।

তবে এখন কিসের পানে ডিঙ্গি ভাসাই, পথ তো জানা যায় না। কুয়াশা বুঝি আবারো ঘন হয়ে আসে আর হাওয়ার জোর বাড়ে। এই ছোটো চর কোত্থেকে জেগে উঠলো জনাব বুড়োর চোয়ালের উপরকার ফুস্করির মতোন, কেউ কোনো দিন গল্পও করে নাই নাকি! ডিঙ্গিখানা কোথায় এসে ঠেকেছে বলদিনি শরাফ, এ মনে কয় ভূতোবিবি বিল, দিন দুপুরেও মানুষ এখানে ভয়ে চমকায়। বিলু চাচার বাপ নাকি এই ভূতোবিবির চরেই মেছো কাদায় মুখগুঁজে মরে ছিলো দিনভর। আর সে গেদু মোল্লার গল্প, ফকফকে জোছনায় নাও বেয়ে বেয়ে জাল ফেলায় আর ঝকঝকে রূপালি মাছ খালয় ভরে কিন্তু মাছ কোথায়, খালয় ভরা শুধু মাছের মাথা সমেত কঙ্কাল তবু তার আবার চোখ নাই, তার জায়গায় গভীর খোদল যেনো চেয়ে থাকে ভয়ঙ্কর। সে রাতে বাড়ি ফিরে গেদু মোল্লা কাঁপতে কাঁপতে সে মাছের খালয় দেখায় আর মানুষজন ড্যাবড্যাবে চোখে দেখতে গিয়ে ভয়ে সিঁটকে যায়। তখন মহিলারা অনেক মেছো কঙ্কালের কথা ভেবে স্বচ্ছন্দে মাছ খেতে পারে না বহুদিন। সেসব পুরনো কথা বটে কিন্তু এখন এই আন্ধার দ্বীপচরে সেসব কথাই বট-পাকুড়ের পাতার মতোন বাতাসে নড়ে চড়ে। কে জানে নতুন কোনো গল্প ত’য়ের হয় কিনা তাদের নিয়ে এই দ্বীপচরে, আগের চেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে। কিন্তু সেটাও না হয় বাদ দেয়া গেলো, ভূতোবিবির চরে আদতে কোনো ভূতটুত চরলো না, ঘাড় মটকালো না রক্ত টক্ত খেলো না কিন্তু তুমি বাঁচবে কেমনে, এদিকে তো খাবারের কোনো জোগাড় নাই। তারপর তারা আবারো ডিঙ্গি ভাসায় তখন বেলা গড়িয়ে গেছে ঢের। কিন্তু এ যাত্রার নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য নাই। আবছা কুয়াশার আন্ধারে আর হিমের হাওয়ায় চলতে চলতে কোথাও গিয়ে ঠেকবে বটে নাওখানা, হয়তো দূরের কোনো গ্রামে তবু এখানে পড়ে থেকে মরণের তেল চিটচিটে বাড়ায় আবার তেল মাখানো কেনো। নৌকা চলে, পাল নাই তবু যেনো পালে হাওয়া লেগে তরতরাইয়া চলে, তখন আর দুশ্চিন্তা মনের ভেতরে জাল ছড়ায় না। এই বুঝি কোথাও গিয়ে ঠেকলো বটে ডিঙ্গিখানা, বৈঠা চলে ইচ্ছের সাথে তাল মিলিয়ে সারাৎসাৎ। তারপর ঘণ্টাখানেকের আগেই মন কয় সাদা মাটির এক চর দেখা যায়। এবার আর সন্দেহ কি এই হলো গিয়ে বোলতলা চর। কিন্তু এখন কি আর হবে, বেলা যতোটুকুও বা আছে কুয়াশার পারদ হালকাই হয়েছে যা পনেরো কুড়ি হাতের ওপারে কি আছে ঠাহর করা দুষ্কর। তখন ঘরে ফেরার দুশ্চিন্তা নিয়েই তারা পাখির সমৃদ্ধ আবাসের খোঁজে বের হয় অন্তত দেখে যাওয়া গেলেও পরের বারের জন্যে সুবিধে হয়। কিন্তু এখানেই যে পাখির সমৃদ্ধ বসবাস তার আভাস পাওয়া যায় জলের ওপর থেকেই পাখির বিষ্ঠা, নীল সাদা ঝরাপালক শিশির মেখে হিম হয়ে আছে বলে। তারা সোজা পথেই যায় আর দেখে নীল সাদা ঝরা পালকের সমৃদ্ধ অঞ্চল, এতো পালক খসে পড়েছে কেনো যে তাদের মনে চঞ্চলতা উঁকি দেয়। কিন্তু পাখি কোথায় কায়েম এ যেনো মরার চর। মনে হয় ওদিকটায় চলে গেছে এদিকটা থেকে, আরেকটু হাঁটা গেলেই দেখা যাবে মন কয় জ্যান্ত সব নীল সাদা পাখি লম্বা ঠোঁট দিয়ে পালকের ভেতরে ঠোঁট ডুবিয়ে খেলা করে। কিন্তু শরাফ ঘটনাটা দেখেছিস একবার, এই শান্ত চরজুড়ে কোথাও কোনো পাখির ডাক শোনা যায় না, ডানা ঝাপটানোর শব্দ সেসবও না। সবকিছু কেমন ভোজবাজির মতো ভেনিস হয়ে গেলো বল দেখিনি রে। তখন তারা আর আগাবে কি আগাবে না করতে করতে দু’পা আগায় আর হোঁচট খেয়ে থেমে গেলে নীল পাখির দেখা পায়। আসমান বরাবর কালো ঠ্যাং উঁচিয়ে কাদাপানিতে ঘাড় গুঁজে পাত্থরের মতো পড়ে আছে শিশির মেখে। তখন তারা মুহূর্ত কয়েক শুধু উদ্ভ্রান্তের মতোন নীল পাখিটির দিকে চেয়ে থাকে আর তারপর তারা ফিরতি পথ ধরে সংলাপহীন, মরার চরে পা ঘসে ঘসে।

তাদের নাওখানা যখন গায়ে কবরেজ বুড়োর ঘাটে এসে থামে তখন সন্ধ্যা আর তারা পথ হারালো না বলে অবাক হয়, কিন্তু খুশি যেনো হয় না। তারা যে আবার পথ হারিয়ে কোন পথের দিকে দিশে খোঁজার কামনা করতে লেগেছিলো, সে বুঝি আর হয় না। তবু তারা নাওখানা বেঁধে ঘাটের উপরে এসে দেখে মোনজেল কোবরেজের দাওয়ায় আলো জ্বলে আর তার হাত কয়েক দূরে বুড়ো কোবরেজ পাখির খাঁচাটার সামনে দাঁড়িয়ে বিষণ্ন হয়ে। তখন কোবরেজ বুড়ো শরাফ আর কায়েমকে দেখে সবুজ আগাছার মতো লকলক করে। নীল পাখি কই শরাফ, নীল পাখি? গোটা দশেক কি পেলি?

শরাফের চোখ যেনো জ্বলে শীতের সন্ধ্যার অন্ধকারে। আমাদের বিপ্লবী হোসেন ভাইয়ের মতো মুখের অর্ধেক তার জলে ডুবিয়ে নীল পাখি একটা পড়ে আছে বোলতলা চরে। তারা শহরের দিকে চোখ তোলে যখন, ঘন কুয়াশার চাপে শহরের ঝলমলানো আলো এধারে পৌঁছায় না।

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. এক সাক্ষাৎকারে শক্তিমান কথাসাহিত্যিক: হাসান আজিজুল হক স্যার বলেছিলেন–“ছোটগল্প মনোযোগ দাবি করে।” সে-কথার সূত্র ধরেই বলতে হয়, শ্রদ্ধেয় সুবন্ত যায়েদ-এঁর “শিকার ও শিকারির স্বর”-ও বেশ মনোযোগ দাবি করে। বেশ ভালো গল্প! তবে গল্পটি আরও কয়েকবার পড়তে হবে।
    গল্পকারকে অশেষ শুভেচ্ছা; আর অফুরন্ত শুভ কামনা তীরন্দাজের জন্য!

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close