Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ সুব্রত কুমার দাস >> ভেন বেগামুদ্রের রচনা : গল্প ও পুরাণের বিমিশ্রণ

সুব্রত কুমার দাস >> ভেন বেগামুদ্রের রচনা : গল্প ও পুরাণের বিমিশ্রণ

প্রকাশঃ September 12, 2018

সুব্রত কুমার দাস >> ভেন বেগামুদ্রের রচনা : গল্প ও পুরাণের বিমিশ্রণ
0
0

সুব্রত কুমার দাস >> ভেন বেগামুদ্রের রচনা : গল্প ও পুরাণের বিমিশ্রণ

 

 

এটি আসলে নিজের পরিচয় অনুসন্ধানের কাহিনি নয়, বরং নিজেকে পুনরাবিষ্কারের কাহিনি। কানাডীয় সাহিত্যসম্ভারে জীবনকথার যে সমৃদ্ধ একটি ধারা রয়েছে সেখানে ‘এক্সটেনডেড ফ্যামিলিজ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

ভেন বেগামুদ্রের নামটি জানতে আমার দেরি হয়েছে। কীভাবে নামটি প্রথম জেনেছি সেটিও খুব স্পষ্ট নয়। কানাডীয় সাহিত্য নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করার বেশ কিছুদিন পর হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করি একটি বই। নাম ‘বিষ্ণু ড্রিমস’। ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনির সূত্রকে ব্যবহার করে যে কানাডার একটি ইংরেজি উপন্যাসের নাম হতে পারে সেটি বোধ করি সে পর্যন্ত আমার কল্পনাতেও ছিল না। গুগলের ভেতর আরও খানিকক্ষণ নড়াচড়া করে বুঝলাম, ‘বিষ্ণু ড্রিমস’ উপন্যাসের প্রধান দুই চরিত্র একজোড়া ভাই-বোন। বোনটির নাম দুর্গা। সাথে সাথেই আমার মনে পড়ে যায় এই দুর্গা কি শাশ্বত সেই ভগিনী যাকে আমরা বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালি’তে পড়ি? দুর্গাকে পড়তে পড়তেই ভেন বেগামুদ্রের বইগুলো পড়া শুরু আমার। দুর্গার ভাইয়ের নাম সুভাষ। শৈশবেই ভাই-বোনের ছাড়াছাড়ি। দুইজনের জন্মই ভারতে – কিন্তু বেড়ে ওঠা ভিন্ন ভিন্ন দেশে। দুর্গা কানাডাতে আর সুভাষ আমেরিকায়। দুর্গা-সুভাসকে নিয়ে একজন ভারতীয় অভিবাসীর চিরন্তন যে প্রশ্ন ‘সে ভারতীয় নাকি কানাডীয়’-কে কেন্দ্র করে ভেন রচনা করেছেন অনন্য সুখপাঠ্য এক উপন্যাস।
ভেন বেগমুদ্রের জন্ম ১৯৫৬ সালে। দক্ষিণ ভারতে – ব্যাঙ্গালোরে। মাত্র ছয় বছর বয়সে পরিবারের সাথে ভেনকে চলে আসতে হয় কানাডাতে। বিভিন্ন সময়ে কিংস্টন, অটোয়া এবং ভ্যাঙ্কুভারে থেকেছেন ভেন। কাজ করেছেন কানাডার গভর্নর জেনারেলের ফুট গার্ড সেক্টরে। বর্তমানে তাঁর আবাস সাস্কাচুয়ানের রাজধানী রেজাইনাতে। রেজাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট প্রদত্ত বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় ভেনের আসল নাম ডেঙ্কটেশ।
ক্রিয়েটিভ রাইটিং-এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ভেন একই সাথে একজন কথাসাহিত্যিক ও সম্পাদক। ছোটোগল্প ও উপন্যাস ছাড়াও তাঁর কৃতিত্বে রয়েছে প্রবন্ধ, নিবন্ধ, স্মৃতিকথা এবং সাহিত্য সমালোচনা। লিখেছেন কবিতাও। যদিও ভেন একই সাথে আলোকচিত্রী হিসেবেও পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। কানাডা ও কানাডার বাইরেও ‘রাইটার-ইন-রেসিডেন্স’ হিসেবেও ভেন কাজ করেছেন। রেজাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়েটিভ রাইটিংও পড়িয়েছেন তিনি। ১৯৯৬ সালে ‘কানাডা-স্কটল্যান্ড এক্সচেঞ্জ রাইটার-ইন-রেসিডেন্স’-এও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন তিনি।
ছোটোদের জন্যে লেখা জীবনীমূলক ‘আইজাক ব্রক : লারজার দ্যান লাইফ’ (২০০০) এবং ফ্যান্টাসীধর্মী ‘দ্য ফ্যান্টম কুইন’ (২০০২) ছাড়াও ভেনের ছোটোগল্পের বই হলো ‘অ্যা প্লানেট অব এক্সসেন্ট্রিস’ (১৯৯০) এবং ‘ল্যাটারনা ম্যাজিকা’ (১৯৯৭)। কবিতার বই ‘দ্য লাইটনেস হুইচ ইজ আওয়ার ওয়ার্ল্ড : সিন ফর্ম অ্যাফার’ ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়। পুর্বোল্লেখিত ‘বিষ্ণু ড্রিমস’ প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮-এ। আর স্মৃতিকথা ‘এক্সটেনডেড ফ্যামিলিজ : অ্যা মেময়র অব ইন্ডিয়া’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল ‘ভ্যান ডি গ্রাফ ডেইজ’ নামের আরেকটি উপন্যাস।
‘এক্সটেনডেড ফ্যামিলি’ বইয়ে একটা ছোটো ভূমিকা আছে। ঠিক ভূমিকা নয়, অন্যকিছু। ইংরেজিতে লেখক বলেছেন ‘প্রোলোগ’ বা প্রাককথন। এতে ভেন দুটি ছোট কথোপকথনকে উদ্ধার করেছেন। প্রথমটির সময় হলো যখন তাঁর বয়স একুশ বছর। আর দ্বিতীয়টি হলো যখন তাঁর বয়স হয় পয়ত্রিশ। বলে রাখা যেতে পারে ‘এক্সটেনডেড ফ্যামিলি’তে লেখক দুটি সময়কে বেশি করে ধরার চেষ্টা করেছেন। প্রথমটি ১৯৯১ সালের – যখন লেখক এই গ্রন্থ রচনায় হাত দেন। আর দ্বিতীয়টির সময়কাল হলো ১৯৭৭ সাল – যখন একুশ বছর বয়সে লেখক প্রথমবারের মতো জন্মভূমি ভারতে যান।
একুশ বছর বয়সের যে কথোপকথনটি ভেন বেগামুদ্রে উদ্ধার করেছেন সেটি এমন :
বাবা : পড়ালেখা শেষ করে তুমি কী করবে বলে ভাবছো?
আমি : আমি লেখক হবো।
বাবা : তুমি যদি সত্যি সত্যি এ নিয়ে সিরিয়াস হও, তবে এগিয়ে যাও।
মা : তুমি বলেছিলে তুমি সরকারি চাকুরে হবে। তোমার কলেজে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে তোমার বাবা তোমাকে সাধ্যমতো সাহায্য করলেন। আর এখন তুমি কি না বলছো তুমি লেখক হতে চাও? কী এমন বিষয় তোমার আছে যা নিয়ে তুমি লিখতে চাও?
বাবা : তলস্তয় তাঁর পরিবারের কথা লিখেছিলেন।
পয়ত্রিশ বছর বয়স যখন লেখক এই স্মৃতিকথা রচনা শুরু করেন তখনকার কথোপকথনটি এমন :
কবি : তোমার নতুন বইয়ের বিষয়বস্তু কী?
আমি : শুরুতে আমি প্রতিহিংসার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু এখন আর আমি সেটিকে গ্রাহ্য করি না। এখন ওদেরকে ক্ষমা করে দেওয়াটাই একমাত্র প্রয়োজন। অথবা এমনও হতে পারে আমি আসলে দেখতে চাই একটি সত্য কত বিভিন্নভাবে লেখা সম্ভব।
কবি : তাহলে সেটা লিখে ফেল। আর তোমার প্রতিশ্রুতির কথাটা মনে রেখ।
ভেনের সেই লেখাটাই পরিণত হলো পৌনে তিনশ পৃষ্ঠার বই ‘একান্নবর্তী পরিবার’। এবং কানাডীয় সাহিত্যে স্মৃতিকথার সম্পদশালী ভাণ্ডারকে যেন আরও সমৃদ্ধ করলো। ভেনের এই স্মৃতিকথাটি যখন প্রকাশিত হয় তখন তার বয়স বায়ান্ন বছর। বইয়ের শুরুতে বি.এস. জনসনের (১৯৩৩-১৯৭৩) লেখা ‘Aren’t you too young to be writing your memories’ (১৯৭৩) বইয়ের ভূমিকা থেকে উদ্ধার করেছেন ভেন। উদ্ধারকৃত অংশটি থেকে সামান্য একটু বাংলায় উপস্থাপন করলে পাঠকের বুঝতে সুবিধে হবে ভেন কেন একটি স্মৃতিকথা প্রকাশের কথা ভাবলেন। ব্রায়ান স্টানলি জনসন চল্লিশ বছর বয়সকালে লেখা তার সে স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন ‘আমি আসলে চেয়েছি, আমার মনের ভেতর থেকে ওই বিশেষ কথাগুলো বের করে ফেলতে। ওগুলোর যন্ত্রণা মন থেকে কমিয়ে ফেলতে। কিছু অভিজ্ঞতার কথাকে প্রকাশ করে ফেলতে নিবারণ করতে। যাতে ওই কথাগুলো বইয়ের মধ্যে থাকে। আমার মনের ভেতরে থেকে আর কষ্ট না দেয়।’ বোঝা যায় ভেন নিজেও নিজের মনের ভেতরকার অমন অনেক দুঃখকে লিখে ফেলে নিজেকে মুক্ত করতে চাইছিলেন।
স্মৃতিকথাটি তিনটি ভাগে মূলত বিভক্ত। তিনটি পর্বের যে তিনটি আলাদা আলাদা নাম দেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো : ‘How my Great Grandfather lost his land, and Other Familiar Twists of Fate’, ‘What Am I Doing Here’ এবং ‘Amma, My Mother’ প্রতিটি পর্বের অধীনে আবার আলাদা আলাদা শিরোনামে অনেকগুলো অধ্যায় রাখা আছে। শুরুর পর্বের শিরোনাম দেখে স্পষ্ট হয় ভেন নিজে অভিবাসী হয়েও তার পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছাড়ার যে যন্ত্রণায় বর্তমানে পীড়িত, সেই পীড়নের প্রতিচ্ছবি দেখেছেন তার প্রপিতামহের মধ্যে। ইতিহাসের সূত্র থেকে, স্মৃতির ধূলো থেকে সেই প্রপিতামহকে ঝেড়ে-মুছে ভেন উপস্থাপন করেন পাঠকের সামনে। আর সেভাবেই ‘Extended Families’ যেন স্মৃতিকথার চেয়ে বেশি কিছু একটা হয়ে যায়।
আবার ফিরে আসি উপন্যাস ‘বিষ্ণুর স্বপ্ন’তে। প্রচলিত বই সাইজ থেকে আকারে ছোটো এই বই প্রকাশনাগত কারণেও আমার প্রিয় হয়ে উঠেছিল। অপ্রচলিত কাগজ, কাগজের অপ্রচলিত রঙ, অপ্রচলিত শেষ প্রচ্ছদ (কানাডাতে শেষ প্রচ্ছদে বই নিয়ে, লেখক নিয়ে অনেক কথা লেখা থাকে, কিন্তু ‘বিষ্ণুর স্বপ্ন’তে কিছুই নাই) আমাকে পাঠের সুখ যুগিয়েছে আলাদাভাবে। বেশি ভালো লেগেছে পুরাণকে ব্যবহারের ভেনের কৌশলটি। মূল কাহিনির সাথে পুরাণ-কাহিনিকে একাকার করে দিয়েছেন ভেন। শুরুতে আছে ‘অ্যা সঙ অব বিষ্ণু’ নামের ছোটো এক অধ্যায়। পুরাণে বিবৃত বহুকাল আগের সেই যে কথা মহাসমুদ্রে বিষ্ণু শয়ান, পাশে লক্ষ্মী। বহুপড়া সেই কথাই ভেন বলছেন, কিন্তু ভেনের বর্ণনায় সেটি নতুন পাঠ হয়ে ওঠে। এরপর প্রথম অধ্যায়ের শুরু। সাল ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮। এর আশি পৃষ্ঠা পর গিয়ে আমরা পাই ‘ম্যান অ্যান্ড দ্য ফিশ’- সেখানে মৎস্য অবতারের গল্প বলেন ভেন। পড়তে পড়তে আমরা বুঝতে পারি এটি আসলে পুরাণের মৎস-অবতার নয়। এ এক ভিন্ন কথা। এরপর শুরু হলো দ্বিতীয় অধ্যায়। সময় ১৯৭০ থেকে ১৯৭৪। বই শেষে আমরা পেলাম ‘চার্নিং দ্য ওশান অব মিল্ক’ নামে কুর্ম অবতারের গল্পটি।
এই মিথ, ভগবান বিষ্ণুর মৎস ও কুর্ম অবতার রূপ ধারণ, সেটি একটি পারিবারিক ইতিহাসের সাথে মিলিয়েছেন ভেন। মেলানোর ধরন দেখে কারো কারো মনে হতে পারে ভেন আসলে জাদুবাস্তবতার কথাকার। আর সেসবের ভেতর দিয়ে একটি পরিবারের কথা সারা বিশ্বের প্রেক্ষিতে উপস্থাপিত হয় ভেনের এই উপন্যাসে। বুঝতে পারি, ভারতীয় ঐতিহ্যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ভগবান বিষ্ণুর একটি স্বপ্নমাত্র হিসেবে যে কল্পনা সেটিকে ভেন সুকৌশলে ব্যবহার করেছেন তার এই উপন্যাসে।
এই লেখাটি যখন চূড়ান্ত করছি তখন সিবিসি রেডিও (৯ এপ্রিল ২০১৮) থেকে জানতে পারি ‘এক্সটেনডেড ফ্যামিলিজ’ সাস্কাচুয়ান প্রদেশের বুক আ্যওয়ার্ডের জন্যে শর্টলিস্টেড হয়েছে। শক্তিমান গণমাধ্যম সিবিসি তাদের ওয়েবসাইটে লিখেছে : এই বই যেমন একটি পরিবারের গল্প, তেমনি এতে রয়েছে কবিতা, কাহিনি এবং পুরাণের মিশ্রণ। ভেন আপাতভাবে কম পরিচিত বলে মনে হলেও ওই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় ভেনের শক্তিমত্তার উৎস। আর সে কারণেই হয়তো ২০১৭ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তারিখে প্রকাশিত ‘গ্লোব অ্যান্ড মেইল’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক আলোচনায় বলা হয়েছিল, এটি আসলে নিজের পরিচয় অনুসন্ধানের কাহিনি নয়, বরং নিজেকে পুনরাবিষ্কারের কাহিনি। কানাডীয় সাহিত্যসম্ভারে জীবনকথার যে সমৃদ্ধ একটি ধারা রয়েছে সেখানে ‘এক্সটেনডেড ফ্যামিলিজ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। বিভিন্ন দেশ থেকে আগত অভিবাসী জীবনকথা দিয়ে পরিপুষ্ট হয়েছে সে ধারাটি। আর তাই, বহুবিচিত্র অভিজ্ঞতাপুষ্ট কানাডীয় সাহিত্যের সেই ধারায় ভেন বেগামুদ্রে হচ্ছেন বর্তমান সময়ের একটি মর্যাদাবান উল্লেখ।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close