Home ছোটগল্প সুমী সিকানদার / জিঙ্গেল বেল

সুমী সিকানদার / জিঙ্গেল বেল

প্রকাশঃ March 3, 2017

সুমী সিকানদার / জিঙ্গেল বেল
0
1

দারুণ দেখতে ‘দ্যা নর্থ ফেইস’-এর ব্লু জ্যাকেট আর যিনি পরেছেন তিনিও। দারুণ লম্বা পেটানো বডি শিশুসুলভ বড় বড় চোখ। যেতে যেতে হুডি টেনে নিয়ে ঢেকে নিলো কান। ভালো ঠাণ্ডা পড়ে গেছে। তারপর সে ঢুকে গেলো একটা প্রকাণ্ড ক্রিসমাস ট্রিসহ জমকালো সাজানো ম’লে। শহরে এখন বড়দিনের থৈ থৈ উত্তাপ। বাচ্চা বুড়ো সকলের মুখভর্তি খুশি ইয়াহুউউউ। সান্টাক্লজ সেজেগুজে এসে আরো কিছু খুশি মাঝরাতে লুকিয়ে ভর্তি করে দিয়ে যাবে মোজায়। দারুণ জিঙ্গেল বেল আমেজ।

ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন দোকানে ঢুকে ঢুকে জিনিস কিনতে থাকলো প্রিয়। ছোট ছোট গিফট ক্যণ্ডি, উইন্ড চাইম, ওয়াটার প্রুফ বেলুন, মিউজিক্যাল কার্ড এসব একগাদা গিফট নিয়ে সে সুপারমল থেকে বের হলো। এবার ঠিকঠাক বাসায় যাবার উদ্দেশ্য আবার হুডিটা টেনে কান চোখ মুখ সব ঢেকে সে হনহন হাঁটতে হাঁটতে মিলিয়ে গেলো ঝুরো কুয়াশার ভেতর দিয়ে। এই মানুষটার আজ অনেক আনন্দ।

হাসপাতালে মিমিকে ব্যয়াম করাচ্ছেন সিস্টার। গালের মাংসপেশীসহ পুরো বাম সাইড অবশ তার। প্রতিদিন একঘণ্টা ব্যয়াম এবং আধাঘণ্টা মাসাজ এবং রে দিতে হয় তাকে মুখের জন্য। এ ছাড়াও আরো কিছু আনুষঙ্গিক চিকিৎসা তাকে এই হাসপাতালে নিতে হয়।

প্রতিদিন হাত পায়ের ব্যায়াম করতে তার ততো খারাপ লাগে না মুখের ব্যয়াম করতে মিমির কান্না পায়। তাকে মুখ গোল করে ফুলাতে হয়, স্ট্র দিয়ে পানি টেনে গালে নেবার প্রাক্টিস করতে হয়, দুই গালে পানি নিয়ে কুলি করার মত করতে হয়। এক বছরের বেশী হয়ে গেছে মিমি এখানে। তাকে দেখাশুনার কেউ না থাকাতে বড় চাচা মিশনারি এই হাসপাতালে দয়া করে তাকে ভর্তি করে দিয়ে গেছেন। বিভিন্ন লবিং ধরে তিনি এই অসাধ্য সাধন করেছেন। প্রায় বিনামূল্যে চিকিৎসা।

এই মিশনারিতে নানা রকম প্রজেক্ট অ্যাক্টিভ আছে। বিদেশী ফান্ড দিয়েই অনেকটা চলে। এখানে স্কুল আছে, অভিভাবকহীন বাচ্চাদের। ছোট ছোট বাচ্চারা রোজ সকালে পি-টি করে প্যারেড করে। গান গায় ‘উই শ্যাল ওভার কাম সামডে’। টকটকে লাল চেকের স্কার্ট আর সাদা শার্টে বাচ্চাদের দেবশিশুদের মত দেখায়। মিমি হুইল চেয়ারে বসেই হাত তুলে তাদের সাথে সুর মেলায়। ‘আমরা করবো জয় একদিন।’

এসব শিশুর হাত-পা-মুখ সব সচল এবং তারা সুস্থ। কেউ তার মত হুইল চেয়ারে বসে নেই। সেটাই ভালো হয়েছে।পৃথিবীর সব ক’টা বাচ্চা সুস্থ থাকুক।  বড়রা গুচ্ছের হানাহানি নিয়ে মরুক।

মিমিদের পাশের ফ্লাটেই দুই ভাইবোনের একজন স্পেশাল চাইল্ড ছিলো ১২/১৩ বছরের। পায়ের স্টেপিং সমস্যা ঠিক মত হাঁটতে পারতো না, কথা অস্পষ্ট, মানসিক ভাবেও সে সুস্থ নয়। দুই পাশ থেকে মা এবং কোন আত্মীয় তাকে ধরে নিয়ে হাঁটাতো। বাগানে বা খোলা জায়গায় সে তেমন সমস্যা করেনি। কিন্তু লিফটে উঠতে প্রচণ্ড ভয়। একদিন ভয়ে হাত পা ছুঁড়ে চিৎকার করে লিফটেই ফিট হয়ে দাঁত লেগে জিভ কেটে গেছে। তখন থেকে তাকে আর লিফটে নেয়া হয়নি। ১০ তলা ভবনের ৯ তলা থেকে তাকে হাঁটিয়ে নামানো হতো। মা বেচারীর কষ্ট হতো। তার চোখ সব সময় ভেজা দেখেছে মিমি। আজ কেন জানি ছেলেটির কথা ভেবে চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল। এত বড় ছেলেকে মা প্রায়ই কোমরে তুলে নিতেন।
মিমির প্যারালাইসিসটা হয়েছে বিয়ের ঠিক আগের সপ্তাহে। সে দিব্যি ফেসিয়াল শেষ করে বের হয়ে ‘কুক টাইম’-এ অপেক্ষা করছিলো প্রিয়র জন্য। দু’জন মিলে সন্ধ্যায় লাস্ট ডিনার সেদিন। আর তো বিয়ের আগে বের হতে দেবেনা। তো স্প্যনিশ কিছু প্রন ডিশ, সালাদ, চিকেন আইটেম, বাটার নান নেয়া হলো খুব ক্ষিদে পেয়েছে। কিন্তু খাবার সার্ভ করার পর দেখা গেলো তারা আলাপে ব্যস্ত।
মিমির হানিমুন নিয়ে একগাদা কথা আছে, সে বলতে চায়, কিন্তু প্রিয় কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। সে একনাগাড়ে একাই বকবক করে চলেছে। মিমি চুপ করে শোনে আর মৃদু হাসে, আজ শান্ত মানুষটা কত যে খুশী। হানিমুনের প্ল্যান করছে। তাকে বিয়ে করার জন্য পাগলের মত করেছে এত দিন। মিমির বাবা-মা কেউ ছিলো না দেখে, তার সাথে বিয়েতে প্রিয়র পরিবার মত দিচ্ছিলো না। এসব ভেবে চোখে আনন্দের ঢেউ উপচিয়ে আলতো পাপড়িতে খেলা করে। কাছে ঘেঁষে বসে মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে প্রিয় অনেক কথা একসাথে বলছে। মাঝে মাঝে চট করে গালে আদর করে দিচ্ছে যেন কেউ দেখতে পাচ্ছে না। নেটে হোটেলগুলো দেখাচ্ছে বিচ লাগোয়া, প্যকেজ ট্রিপ কি কি নেবে সব দেখাচ্ছে। মিমি তার আনন্দ দেখে বাকি জীবনের সমস্ত উত্তাপ পাচ্ছিলো। যা কিছু হাহাকার ছিলো জীবনে তার সব ফুরিয়ে আসছিলো প্রিয়র জাপ্টে থাকা ছায়ার স্পর্শে। মিমি আজ বড় খুশী।

সেদিন ফিরতে একটু দেরী হলেও বাসার বকার ভয় নেই। লাস্ট চিল্ড স্ট্রবেরি জুসে টান দিলো দু’জন। তারপর মিমিকে নামিয়ে প্রিয় বাসার দিকে। অফিস থেকে ছুটি নেয়া ছিলো তাই ভেবেছিলো দেরিতে উঠবে। কিন্তু সকালে আটটাতেই মিমিদের বাসা থেকে ফোন।

দৌড়ে হাসপাতালে ছুটলো সবাই। মিমি ঘুম থেকে উঠে বাথ্রুমের দিকে যেতে পারেনি তার গতকালের দুই পা নিয়ে। মেঝেতেই মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে। তার এতকালের  কবিতার আল্পনা আঁকা পা কোনভাবেই দাঁড়াচ্ছে না মেঝেতে। মুখের অর্ধেক অংশ বেঁকে গেছে। চোখটা স্থির, বাম পাশটায় জোর নেই। খারাপ ধরণের ‘বেলস পলসির এটাক’-এ তার জীবনের সবকিছু শুরু হতে গিয়ে সব শেষ।

ক’দিন পরেই বড়দিন। উৎসবের দিন। চারিদিকে ছুটোছুটি। মিশনারির উঠোন বাচ্চাদের নাচের আর গানের মহড়া ও কলকাকলিতে মুখর। হঠাৎ গান বাজনা রেখে প্রায় জনা কুড়ি বাচ্চা হইহই করে  দৌড়ে ছুটে গেছে তাদের প্রিয় বন্ধুকে দেখে। ব্লু জ্যাকেট পরা এই বন্ধুটা আদের খুব ভালোবাসে। সবার হাতে ক্যন্ডি, বেলু্‌ কার্ড এসব বিলি করে তবে প্রিয় ছাড়া পেলো মিমির কাছে আসার জন্য।

মিমি টলটলে চন্দ্রমল্লিকার মত হাসছে। কত কষ্ট নিয়েও এই মেয়ে যে কী সুন্দর হাসতে পারে। প্রিয়, মিমির একদম কাছে এসে বসে। হুইল চেয়ারটা নিজের দিকে টেনে নেয়। একজীবনের সমস্ত  প্রেমে তার চোখে ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়। প্রতিবার প্রিয় চোখে আদর দেয় আর মিমির চোখ ভিজে যায়। সে বলে ‘আমার জন্য সবকিছু শেষ হয়ে গেলো প্রিয়।’

আজ প্রিয় কথা বলতে দেয় না। একাকার জড়িয়ে থাকে। চারিদিকের অফুরন্ত কোলাহল আর আনন্দ ধ্বনি তাদের গাঢ নিমগ্নতাকে স্পর্শ করতে পারে না। নির্জনতাটুকু গহন হয়ে দুজনকে ভরিয়ে রাখে, না পাওয়া থেকে পাওয়ার ইশারায় যেতে যেতে। যেন সান্টাক্লজ তাদের জন্য কোন অচেনা আনন্দ লুকিয়ে মাঝে রাতে মোজায় ভরে ক্রিস্টমাস ট্রিতে রেখে যাবে। যেন তারা আর কখনো দুঃখ পাবে না। একটু দূরের কোনো লাগোয়া জানালার পাশে বেমক্কা বাতাসে উইন্ড চাইমটা একা-একাই দুলবে কিছু স্ফূর্তি মনে করে, উৎসব বাড়ির জিঙ্গেলবেল পিয়ানো সুরে।

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. ভালোবাসা ফুরোয় না, বিষণ্ণতা ও ভালোবাসার একটা
    অংশ। খুব ভালো লেগেছে, সুমী।

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close