Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ সুলতানা আজীম >> হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু কী সত্যি রহস্যময়? >> মৃত্যুদিন

সুলতানা আজীম >> হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু কী সত্যি রহস্যময়? >> মৃত্যুদিন

প্রকাশঃ August 12, 2018

সুলতানা আজীম >> হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু কী সত্যি রহস্যময়? >> মৃত্যুদিন
0
0

সুলতানা আজীম >> হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু কী সত্যি রহস্যময়?

 

 

বিদায় নিয়েছেন হুমায়ুন আজাদ তাঁর জীবন থেকে, চৌদ্দ বছর হবে, ১২ই আগস্ট ২০১৮-এ। যা রেখে গেছেন, ছাপান্ন বছরের ছোট্ট একটি জীবনে, খুব কম নয় তা বাঙালির জন্যে। বলেছেন যেভাবে তিনি, লিখেছেন যেভাবে, এভাবে লেখেননি কেউ বাংলাদেশে। এ-ধরণের আলোচনা-সমালোচনা কেউ করেননি এখানে আগে।

খুব প্রয়োজন ছিলো এটা, স্বাধীন একটি জাতির চিন্তা-চেতনা, মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি, ভাষা, শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতির শুদ্ধতার জন্যে। বেছে নিয়েছিলেন সংস্কারের পথটি তিনি, জাতির প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে। পালন করেছেন এই দায়িত্ব, শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর সময়। যে-কোন সেমিনারের বক্তৃতায়। সাক্ষাৎকারগুলোতে। আড্ডায়। ব্যক্তিগত আলাপে, আলোচনায়। আর সবধরণের লেখায়।

কী করেছি আমরা তাঁর জন্যে বিগত কয়েক বছরে? এই প্রশ্নের উত্তর একটি, ‘কিছুই না’। এটা কী আমাদের অক্ষমতা, না মানসিক দারিদ্র্য? চলে যান যিনি একেবারে, কিছু করা যায় না তাঁর জন্যে। তবুও যে তুললাম প্রশ্নটি, তা কী ব্যক্তি হুমায়ুন আজাদের জন্যে? নাকি, আমাদের জন্যে? যে-কোনো সৃষ্টিশীল মানুষের কর্মকাণ্ডকে বাঁচিয়ে রাখা এবং ছড়িয়ে দেয়ার যে দায়িত্ব, তা সমকালীন সব মানুষদের জন্যে। ভবিষ্যৎ মানুষদের জন্যেও।

হুমায়ুন আজাদের নির্মোহ সমালোচনা থেকে, পায়নি অব্যাহতি, এ দেশের কোনো সরকার। কোনো রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, আমলা এবং বিখ্যাত-কুখ্যাত কোনো ব্যক্তি। হয়েছিলেন তিনি সেজন্যেই, তাদের প্রতিপক্ষ অথবা শত্রু। সমালোচনা মানে, নিন্দা নয়। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রচালকেরা, নিন্দা মনে করেন সমালোচনাকে। নিন্দুক এবং শত্রু মনে করেন, সমালোচকদের। সমালোচনাকে নিজেদের স্বার্থে জরুরি মনে করেন, তা গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি হলে, এরকম হবার কথা ছিলো না। গ্রহণ করলেও সমালোচনা অর্থবহ হয় না, ধারাবাহিকভাবে প্রয়োজনীয় সংশোধনগুলো না করলে।

যোগ্য সমালোচকের অভাবে এগুতে পারেনি, আমাদের ভাষা সাহিত্য সমাজ রাষ্ট্র বেশিদূর। অর্জন করেনি, তেমন কোনো গৌরব।

যথার্থ সমালোচনা করা খুব কঠিন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সৃষ্টিশীল একটি কাজ। এরকম উন্নত সমালোচনার সংস্কৃতি, যে সমাজ রাষ্ট্রে যতো বেশি চালু থাকে, সে সমাজ রাষ্ট্রে তৈরি হয়, ততো বেশি সৃষ্টিশীল মানুষ। বাধ্য থাকে তাদের সৃষ্টিশীলতার মান উৎকৃষ্ট এবং মূল্যবান হতে। ভুল ধারণা, স্তূতি এবং স্থুল রুচি দিয়ে, রাজনীতি শিল্প-সাহিত্য বা যে কোনো কিছুর, নিরর্থক মূল্যায়ন করার সুযোগ এবং অবস্থা থাকে না সেখানে।

সৃষ্টিশীল সমালোচককে, সমালোচনা করতে হয়, তাত্ত্বিকভাবে। আলোচনা করতে হয় বিস্তৃতভাবে, সবরকম দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা, অজ্ঞানতা এবং ভুলত্রুটি সম্পর্কে। সমালোচনা করতে হয় অযৌক্তিক অশৈল্পিক আর নিম্নমানের গতানুগতিকতাকে। যে গতানুগতিকতা মেনে নিলে, নতুন উন্নত এবং সৃষ্টিশীল কাজ অসম্ভব হয়ে ওঠে। যৌক্তিক যথার্থ সমালোচনা, শুদ্ধ উন্নত সুশৃঙ্খল সমাজ সভ্যতা রাজনীতি শিল্প-সাহিত্য নির্মান করার জরুরি র্শত।

হুমায়ুন আজাদ বিপুল পড়াশোনা, সঠিক উপলদ্ধি এবং তা ব্যাখ্যা করার প্রতিভায়, অর্জন করেছেন এরকম কর্তৃত্ব। বাংলাদেশের সমাজ রাষ্ট্র রাজনীতি ভাষা সাহিত্যের, সবরকম স্থূলতা কৃত্রিমতা অন্ধত্ব অনাধুনিকতা অজ্ঞানতা অযৌক্তিকতা বাতিল করেছেন তিনি। অস্বীকার করেছেন, এদেশে চলমান অশৈল্পিক অযৌক্তিক অসুস্থ দৃষ্টিভঙ্গী। নির্দেশ করেছেন, উন্নয়নের সব রকম পথ। সৃষ্টি করেছেন, যোগ্য পাঠক। গড়ে উঠলে এরকম পাঠক, বাড়ে লেখকের সততা সচেতনতা দায়বদ্ধতা। বাধ্য হন লেখক, ভাংতে এবং গড়তে। নতুন গুরুত্বর্পূণ এবং মহৎ শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টি করতে। শুদ্ধ সমালোচনা জানিয়ে দেয় সমস্যা ও ত্রুটি সম্পর্কে। তৈরি করে দেয়, উৎকর্ষে প্রবেশের চেতনা। নির্দেশ করে, তার সব পথ আর পদ্ধতি।

যা কিছু করেছেন হুমায়ুন আজাদ, আমার ধারণা, মহৎ কাজটি ছিল তার মধ্যে- সমালোচনা। নাড়িয়ে দিয়েছে যা, বাঙালির চিন্তা-চেতনার প্রচলিত ভিত্তি। অসহ্য হয়ে উঠেছে অনেকের কাছে। ‘প্রথাবিরোধী’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে হুমায়ুন আজাদের নামের শুরুতে। কোনো মানুষই প্রথাবিরোধী হতে পারেন না, সম্পূর্ণভাবে। তাহলে, তাকে থাকতে হবে বনে। যেসব নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে বড়ো হয়ে, সমাজে বেঁচে থাকি আমরা এবং বড়ো করি আমাদের সন্তানদের, তার প্রায় সবগুলোই প্রথা। মেনেছেন হুমায়ুন আজাদ এইসব প্রথা তাঁর জীবনে। করেছেন বিরোধিতা সেসব প্রথার, যা চাপিয়ে দেয়া হয় মানুষের ওপর, অন্যায় অযৌক্তিক ভাবে। যা ক্ষতিকর, যা মানুষের অগ্রগতির প্রবল প্রতিবন্ধক। উদ্দীপ্ত অনুপ্রাণিত করেছেন পাঠককে, ভাঙতে, যে-কোন অন্যায় প্রথা। বিরোধিতা করতে, সবধরণের অসত্য কপটতা ভণ্ডামো অযৌক্তিকতা আর অন্যায়ের। তাঁর জীবন এবং কর্মকাণ্ড প্রমাণ করেছে, যে-কোনো অন্যায়ের বিরোধী ছিলেন তিনি। সম্পূর্ণভাবে ‘প্রথাবিরোধী’ নন। মনে করি আমি।

হিসেব করে কথা বলার স্বভাব তাঁর ছিল না। যা ভাবতেন, তা বলে ফেলতেন। অপ্রচলিত, উপযুক্ত, উপভোগ্য শব্দ সাজিয়ে লেখা এবং কথা বলার এমন নিপুণ ডেকোরেটর, আর কেউ জন্মেছেন কি-না বাঙলাদেশে, জানা নেই আমার। জানা নেই, পেরেছেন কে তৈরি করতে অভিনব শব্দের সংযোজনে, এমন আকর্ষণীয় বাঙলা গদ্য, বুদ্ধদেব বসুর পরে? শিল্পিত শব্দের গ্রন্থনায়, নির্মাণ করতেন যেসব বাক্য নিমেষে, কথায় এবং লেখায়, বিমুগ্ধ বিস্ময়কর তা, বাঙলা ভাষা-সাহিত্য-শিল্প এবং রাজনীতির এলাকায়। আর বিশ্লেষণ করার যে সামর্থ তাঁর ছিল, তাও কী নয় অভিনব এক মুগ্ধতা, বাঙালি পাঠকের কাছে?

সঠিক ভাবে বুঝে, একটিও প্রবন্ধের বই পড়েছেন যিনি হুমায়ুন আজাদের, হয়েছেন অনেকটা আলোকিত, শুদ্ধ চেতনার রোদ্দুরে তাঁর। দেওয়া যেতো ছড়িয়ে, মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তিবাদী চেতনার উজ্জ্বল আলো, থাকতো যদি সবগুলো সরকার প্রগতির পক্ষে। কী হতো চেহারা এই দেশটির তাহলে, সাঁইত্রিশ বছরে?

 

[২]

 

চৌদ্দ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু স্পষ্ট হয়নি অনেকের কাছে, হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর ব্যাপারটি। লিখেছি দুটি বই আমি তাঁকে নিয়ে, পর পর দু-বছরে। ‘তিনি এখন মুক্ত’ এবং ‘স্মৃতির মনিমালা হীরের চেয়েও দামী’ শিরোনামে। লিখেছি তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিয়েও, এ দুটো বইতে।

বাংলাদেশের বেশিরভাগ প্রকাশক লেখকের সাথে কোনো চুক্তি করেন না, পাণ্ডুলিপি নেবার আগে। দেন না অধিকাংশ লেখককে, সম্মানী। জানান না ছাপা হওয়া বইয়ের পরিমান। জানান না, কীভাবে এবং কোথায় বিক্রি করছেন বই। ছাপা হয়ে গেলে, মালিক হয়ে যান তারা বইয়ের। দায়িত্ব মনে করেন না কোনো কিছুই জানাতে লেখককে। বইয়ের প্রচারের জন্যেও নেন না তারা জরুরি উদ্যোগ। পঁচিশটি বই দেন লেখককে, প্রাপ্য হিসেবে। এর চেয়ে বেশি বই চাইলে, কিনে নিতে হবে। যথেষ্ট নীতিবান তারা, এই একটি বিষয়ে।

লেখককে সন্মানী দেননি যে প্রকাশক, বই-ব্যবসা সর্ম্পকে প্রশ্ন করলে তাকে, বলবেন, প্রচলিত এই বাক্যটি : “এদেশে মানুষ বই কেনে না, ভর্তুকি দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি।’ অথবা ‘কোনমতে চলে যাচ্ছে। আজকাল কেউ বই পড়ে না।”

প্রকাশনা ব্যবসা টিকে আছে কেন, বাড়ছে কেন প্রকাশক বাংলাদেশে, বই যদি কেউ না-ই কেনে? কদিন, কমাস, কবছর চলতে পারে কোনো ব্যবসা ভর্তুকি দিয়ে? কোনো জবাব কী আছে, এরকম প্রশ্নের?

আছে কী নেই প্রকাশনা ব্যবসায়ের কোনো আইন বাংলাদেশে, জানা নেই আমার। যদি থেকে থাকে আইন, তাকে সমীহ না করার যে স্পর্ধা দেখান প্রকাশকরা, কিছুই কী করার নেই এর বিরুদ্ধে কারো? বই, জ্ঞান এবং জানার বিষয়কে ছড়িয়ে দেয়ার গুরত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। এরকম একটি মাধ্যমে জড়িত থেকে, আইন বা নীতিমালাকে উপেক্ষা করা কী বড়ো ধরনের দুর্নীতি নয়? যদি না থেকে থাকে কোনো আইন, কী প্রমাণ করে তা, একটি দেশের প্রকাশনা ব্যবসা সর্ম্পকে? শ্রমিকদের কেবল নয়, দরিদ্র লেখকদের শোষণ করে ব্যবসা করছেন প্রকাশকরা এই দেশে। ধনীও হচ্ছেন।

যেখানে অভিযোগ বা নালিশ নেই, সেখানে বিচার এবং বিচারকও থাকে না। ঘটেছে এটি, আমার এই দুটি বইয়ের বেলাতেও। অনেকটা অপ্রচারিত অলক্ষ্যে থেকে গেছে এজন্যে, হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু সর্ম্পকিত সত্য।

ভাবেন, কেউ কেউ লেখেনও- ‘হোটেল কক্ষে হুমায়ুন আজাদের রহস্যময় মৃত্যু’- ধরণের বাক্য।

আবেগায়িত করেছিল, প্রগতিশীল চেতনায় অনুরক্ত বাঙালিদের, দুটো মর্মস্পর্শী ঘটনা। ঘটেছিল যা, ২০০৪ সালে। সময়ের দূরত্ব ছিল সাড়ে পাঁচ মাস, এই ঘটনা দুটোর মাঝে। উত্তাল হয়েছিল বাঙালি, সবধরণের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদে, প্রথম ঘটনাটিতে।

জানেন সবাই, হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা দুটির কথা। জানতেন না অনেকে, কিভাবে হয়েছিল তাঁর মৃত্যু। ‘রহস্যময় মৃত্যু’ বলেছিলেন কেউ কেউ, অজ্ঞানতা মিশ্রিত ধারণায়। দায়িত্ব নেননি তারা, এই রহস্য উন্মোচন করার। রেখেছিলেন অস্পষ্ট করে, অন্য অনেক কিছুর মতো, এই ব্যাপারটিকেও।

সবধরণের আধুনিক প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ আজকের পৃথিবীতে, অসম্ভব কী ছিলো, তথাকথিত এই রহস্যের উন্মোচন করা?

হুমায়ুন আজাদের শরীরটি ঢাকায় পৌঁছানোর পরে, বাঙালি ডাক্তার দিয়ে পোস্টমর্টেম অটোপ্সি করানোর মতো একটি কাজ কী ছিলো অসাধ্য? খুব ব্যয়বহুল? কতক্ষণ লাগতো এটি করাতে? আর লাগতো, কতো টাকা? না হয় লাগতো কিছু টাকা, কী হতো তাতে? বেরিয়ে আসতো সত্য, অবিকৃত ভাবে।

এতো এতো কথা যারা বলতে পারলেন এ ব্যাপারে। লিখতে পারলেন প্রমাণহীন অনেক লেখা, উদ্দেশ্যমূলক ভাবে। পারলেন না কেন করাতে তারা এই কাজটি? এলো না কেন একবারও তাদের মনে, খুব জরুরি এই দায়িত্বটির কথা? (না কী এসেছিলো। নেননি দায়িত্বটি তবুও, অভ্যন্তরীণ কোনো কারণে) তখন না-হয় আসেনি। এখনও তো আসতে পারে। স্পষ্ট করা যেতে পারে এই রহস্য, এখনও।

মৃত্যুর দুশো পাঁচ বছর পেরিয়ে যাবার পরেও, (জন্ম ১৭৫৯ – মৃত্যু ১৮০৪) জার্মান কবি-দার্শনিক ফ্রিডরিশ শীলারের কঙ্কালের ওপর চলছে সবধরণের নিরীক্ষা, এখনও। বের করা হয়েছে পঞ্চাশ বছর আগে, কী কী অসুস্থতা ছিলো তাঁর, ছোটবেলা থেকে। করা হয়েছে নিশ্চিত, কী কারণে মারা গেছেন তিনি, মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে।

১৭৫০ সালে মারা যাওয়া, বিশ্বশ্রেষ্ঠ (এখন পর্যন্ত) জার্মান কম্পোজার সেবাস্তিয়ান বাখের মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা হয়েছে, শুধু তাঁর চুলের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। প্রমাণ করা হয়েছে সুস্পষ্ট ভাবে, বিভিন্ন অসুস্থতা তাঁর।

হাজার হাজার বছর আগে মারা গেছেন যারা, পাওয়া গেলে তাদের শরীরের অংশবিশেষ, বের করছেন অজস্র তথ্য তাদের সর্ম্পকে, গবেষক বিজ্ঞানীরা, প্রয়োজন মতো। কোনকিছুই আর রাখতে চান না তাঁরা, আজকের দিনে, অস্পষ্ট অজানায়।

হুমায়ুন আজাদের শরীরের ওপর করা, জার্মান ডাক্তারদের পোস্টমর্টেম অটোপ্সি রির্পোট, মানতে পারেননি যারা, পারছেন না যারা, জরুরি দায়িত্ব তাদের, নিজেদের অজ্ঞানতা নিয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ের আলাপ আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে, তাঁর শরীর পরীক্ষা করিয়ে জার্মানির ‘পেন’ শাখার প্রেসিডেন্ট, পোস্টমর্টেম অটোপ্সি রিপোর্ট দেওয়া জার্মান ডাক্তার এবং বাংলাদেশের জার্মান দূতাবাস কর্তৃপক্ষের বিচারের ব্যবস্থা করা। এই কাজটি করতে পারলে, খুব লাভ হবে তাদের, যারা ‘বিশ্বাস’ করেন, মেরে ফেলা হয়েছে হুমায়ুন আজাদকে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র করে। আর এই ষড়যন্ত্র, সম্মিলিতভাবে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক।

বাংলাদেশে অবস্থিত জার্মান দূতাবাসের বিরুদ্ধে মামলা করলেই তো বেরিয়ে যেতো, অপ্রকাশিত অনেক প্রমাণিত সত্য। বেরিয়ে যাবে এখনো। হারিয়ে যায়নি কোনকিছুই। রয়েছে সব প্রমাণ, নির্দিষ্ট জায়গাগুলোতে।

‘বিশ্বাস’ শব্দটির একটি অর্থ আমার মতে ‘না জানা’। যে-কোনকিছু, যখন মানুষ সঠিক ভাবে জানতে পারে, তখন তা বিশ্বাস করার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় না, অবিশ্বাস করারও। যখন জানতে পারে না অথবা জানতে চায় না, তখন বিশ্বাস করে। অবিশ্বাসও করতে পারে। কোনো অভিযোগের বিচারের রায়, বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে তৈরি হয় না। নির্ভর করে, তথ্যপ্রমাণ আর সাক্ষীর সততার ওপর।

কোনোই ফলাফল আসবে না, সমাবেশে গলা, আর পত্রিকার পাতায় কলম ভেঙে ফেললেও। এসেছে কী কোনো ফলাফল, এতো এতো লিখেও? বলেও? জরুরি যে কাজটা তা না করে, কেবল কথা বললে কী লাভ হয় কিছু? অকারণ কথা তো কেবল তারাই বলে, করতে চায় না যারা কাজটা। করতে পারে না যারা কাজটা।

হুমায়ুন আজাদ প্রধান একজন লেখক বাংলাদেশের। তাঁর জীবন, তাঁর মৃত্যু, তাঁর কর্মকাণ্ড দাবি করবে অবশ্যই, সঠিক মূল্যায়ন। হওয়া উচিত এই মূল্যায়ন, সততায়। কপটতা আর অসততায় মূল্যায়ন করা হলে, গৌরব হারাবে তাঁর অবদান। খুবই জরুরি তাঁর মৃত্যুর কারণ বের করা, তাঁকে মূল্যায়ন করার জন্যে। নেবেন কী তারা সামান্য এই দায়িত্বটি, বিশ্বাস করছেন যারা এই মৃত্যুর রহস্যময়তাকে? নাকি আবদ্ধ থাকবেন এ বিষয়ে, অন্তঃসারশূন্য বিশ্বাস আর নিরর্থক আলোচনার সীমিত বৃত্তে?

বিদ্রোহী ছিলেন হুমায়ুন আজাদ, যে কপটতা আর ভণ্ডামোর বিরুদ্ধে, সেই কপটতা আর ভণ্ডামোই কী নির্ধারিত থাকবে, তাঁকে মূল্যায়ন করার পদ্ধতি হিসেবে? প্রথাগতভাবে তাঁর জন্ম অথবা মৃত্যুবার্ষিকী পালন করাই কী হবে, তাঁকে মূল্যায়নের একমাত্র উপায়? নেয়া কী হবে না ব্যতিক্রমী একজন ব্যক্তির জন্যে, ব্যতিক্রমী কোনো উদ্যোগ? যদি না নেওয়া হয়, কী তিনি দিয়ে গেলেন দেশজুড়ে তাঁর পাঠক, ছাত্রছাত্রী, অনুরাগী অনুসারীদের তাহলে?

উদ্দীপ্ত অনুপ্রাণিত হওয়া, অর্থহীন হয়ে যায়, যদি তা, কাজে না লাগানো হয় বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে। যদি তা, শুদ্ধ না করে, মানুষের চিন্তাচেতনা কর্মকাণ্ডকে।

তিরিশেরও বেশি বছর ধরে লিখলেন হুমায়ুন আজাদ। অনবরত। অক্লান্ত। অজস্র। নির্ধারিত স্থানে স্থির হয়ে থাকা বর্বর মধ্যযুগীয় মানসিকতার, প্রায় সবকিছুকে করলেন অস্বীকার। ভাঙলেন অনেক অনেক অনেক কিছু। জরুরি ছিলো যা ভাঙার। গড়লেন অনেক অনেক অনেক কিছু। দরকার ছিল যা গড়ার। বাঙলাদেশের অধিকাংশ মানুষ পড়ে থাকবে, দৃষ্টিভঙ্গি মানসিকতা চেতনা আর আচরণে মধ্যযুগে, তা হয় না।

দেয়নি চাপিয়ে কেউ এই দায়িত্ব, তাঁর ওপর। দায়বদ্ধতার পীড়ন থেকেই, নিলেন দায়িত্বটি নিজে। করলেন সংগঠিত, শুদ্ধ আর প্রগতিশীল চেতনার আন্দোলন, ক্লান্তিহীন তাঁর কলমে। করলেন নিবেদিত নিজেকে কঠিন পরিশ্রমে। সততায়, আন্তরিকতায় আর বিপুল প্রত্যাশায়। পড়লেন অনেক। পড়ালেন অনেক। বললেন অনেক। লিখলেনও অনেক। হলো না মূল্যায়ন তাঁর, নিজের দেশে, চেয়েছিলেন যেভাবে। হবে না যে, বুঝতেন সেটা। করেছেন নিজেই নিজের মূল্যায়ন তাই, বিভিন্নভাবে। সন্তুষ্ট হতে পারেননি তবুও। না-করুক নিজের দেশ, মূল্যায়ন করবে তাঁকে আন্তর্জাতিক মঞ্চ, কোনো একসময়। লালন করেছেন নিবিড় এই স্বপ্নটি নিজের ভেতরে, সবসময়।

প্রবেশ করতে চাইলেন তাই, আন্তর্জাতিক সাহিত্য-অঙ্গনে। চাইলেন পেতে, সঠিক অভিজ্ঞতা। নতুন অভিজ্ঞতা। চাইলেন পড়তে অন্যকিছু। নতুন কিছু। চাইলেন লিখতে অন্যকিছু, নতুনতম অভিজ্ঞতায় আর উপলদ্ধিতে, যা গুরত্ব পাবে, আন্তর্জাতিক সাহিত্যমঞ্চে।

খুললো প্রবেশ পথ, ভিন্ন সে এলাকার। করলেন প্রবেশ এবং বেরিয়ে গেলেন, মাত্র তিন দিন পরে। পেলেন না সময় জানার এবং বোঝার, এসেছিলেন কোন জগতে। কী কী এবং কী আছে সেখানে।

মানুষ যা-ই মনে করুক নিজেকে, সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন এক প্রজাতি সে, প্রকৃতির সিদ্ধান্তের কাছে। কী ভীষণ তুচ্ছ সে, প্রকৃতির শক্তির কাছে। প্রকৃতির প্রয়োজনে সৃষ্ট যে-কোনো প্রাণীই কী, প্রকৃতির চুড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্রীড়নক নয়? যে-কোনো সময়। যে-কোনো অবস্থায়। যে-কোনো স্থানে।

পরিকল্পিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন হুমায়ুন আজাদ, কয়েক সেকেন্ডের জন্যে। সেটা ছিল তাঁর জয়। সে দিনের সাড়ে পাঁচ মাস পরে, চলে যাবার মতো ভয়ঙ্কর যাতনা অনুভব করতে না দিয়ে, যে বিদায় দিয়েছিল তাঁকে প্রকৃতি, সেটা কী ছিল না আরও এক বিজয় তাঁর জন্যে?

চলে গেছেন জীবন থেকে তিনি, প্রকৃতি নির্ধারিত সিদ্ধান্তে। ঘুমের ভেতরে। এই মৃত্যুকে, ছোট করেছেন যারা এতো, কি বলবো তাদের? ওভাবে মারা যাবার জন্যে জন্ম হয়নি বলেই, ওভাবে মারা যাননি তিনি। সফল হয়নি তারা। রহস্যাবৃত বলছেন যারা তাঁর মৃত্যুকে, মেরে ফেলা হয়েছে বলছেন, তারা কি উল্লসিত হবার সুযোগ পাননি? না, জার্মানিতে মেরে ফেলা সম্ভব ছিল না হুমায়ুন আজাদকে। থাকতেন যদি তিনি বাংলাদেশে আরো কিছুদিন, বলতেন এবং লিখতেন সবসময়ের মতো স্বতন্ত্র্য ভাষায়, তাহলে হয়তো দ্বিতীয় আক্রমণই নিশ্চিত করতো তাঁর অপমৃত্যু। আর সেটা হতো পরাজয়, হুমায়ুন আজাদের জন্যে। তাঁর ভক্ত, অনুসারী, অনুরাগীদের জন্যে।

 

 

[৩]

 

জার্মানিতে পৌঁছেছিলেন হুমায়ুন আজাদ, ২০০৪ সালের আগস্ট মাসের ৮ তারিখ, সন্ধ্যায়। বিদায় নিলেন জীবন থেকে, এগারোই আগস্ট রাত বারোটার পরে। রাত দুটা থেকে ভোর পাঁচটার মধ্যে। আর তাই তারিখটা ছিল ১২ই আগস্ট। ছিলেন তিনটি দিন, জার্মানিতে। উপভোগ করেছিলেন, ১১ই আগস্ট বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত সামারের গ্রিল ফেস্ট। আয়োজিত হয়েছিলো এটা, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষকদের উদ্যোগে। ঘুমোতে গিয়েছিলেন, মধ্যরাতেরও পরে।

অতিরিক্ত মদ্যপান করাকে, তাঁর মৃত্যুর কারণ বলে নিশ্চিত করতে চেষ্টা করেছে, ঢাকার কোনো কোনো পত্রিকা তখন। অতিরিক্ত মদ, নিয়মিত পান করেও, মারা যায় না কেউ। মারা যেতে পারে, যদি এ কারণে, ভয়ানক কোনো অসুস্থতা তৈরি হয় শরীরে। ড্রিঙ্কসের মধ্যে গ্রীল ফেস্টে থাকে প্রধানত বিয়ার এবং বিভিন্ন ধরণের ফলের জুস। আর থাকে, মিনারেল ওয়াটারসহ নানান ধরণের সফট ড্রিঙ্ক। এক বিকেলে, যতো ইচ্ছে বিয়ার পান করলেও, মারা যায় না কোন মানুষ।

অ্যালকোহলের পরিমান বিয়ারে কতোটা, তা জানেন সবাই, যারা বিয়ার পান করেন। কী ঘটেছিল সেদিন, সংক্ষেপে বলছি।

হুমায়ুন আজাদ জার্মানির মিউনিখে এসে পৌঁছান ৮ আগস্ট সন্ধ্যায়। তাঁকে মিউনিখে স্বাগত জানান পেন জার্মানির সভাপতি ইয়োহানেস স্ট্রাসা। অ্যাকাডেমিক স্ট্রিটের নির্দিষ্ট ফ্লাটে তাঁকে পৌঁছে দেন।

এরপর ৯ই আগস্ট থেকে তাঁর সঙ্গে আমার ফোনে যে কথা হয়েছিল এখানে তার কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি।

তিনি : “হুমায়ুন আজাদ, গুটেন টাগ।”

আমি : “চমৎকার, এই যে এসেই জার্মান শব্দ প্রাকটিস করা।… প্রাতরাশ এবং দুপুরের খাবার খেয়েছেন?”

তিনি : “হ্যাঁ, সকালে ইউনির্ভাসিটির একটা ক্যাফেটেরিয়াতে, আর দুপুরে একটা জার্মান রেস্তোরাঁয় খেয়েছি।”

দেড় ঘণ্টা পর আরেকটা ফোন এলো তাঁর। তখন জানালেন : “…ফোন করবার জন্যে বের হবার সময়, পাশের ফ্লাটের প্রতিবেশীর সাথে পরিচয় হয়েছে। ভদ্রলোক আমাকে একটা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, এগারোই আগস্ট বুধবারে।”

এটি ছিল সামারের ‘গ্রিল ফেস্ট’। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও তাদের পরিবার ছিল এর আয়োজক। আমি বলেছিলাম এই ফেস্টে যাওয়া উচিত। এই অনুষ্ঠানে অন্যান্য খাবারের সঙ্গে থাকে বিয়ার, শ্যাম্পেন, ফলের জুস, আর নানা ধরনের সফ্‌ট ড্রিংকস্।

তিনি : “কী সুন্দর আবহাওয়া এখানে। অল্প উষ্ণ রোদ, চমৎকার বাতাস। চারদিকে এত সবুজ। এত সুন্দর দেশ। এত সাজানো-গোছানো। আমার বাইরে থাকতে ইচ্ছা করছে এখন।”

আমি : “একটু পরেই তো বাইরে থাকবেন। এটাকেই বলে গ্রিল ফেস্ট ওয়েদার। মাংস যখন গ্রিলড্‌ হতে থাকে তার ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। ড্রিঙ্ক হাতে গ্রিলড্‌ মাংস খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করবেন অনেকেই। সঙ্গে অন্য খাবার তো থাকেই। ইচ্ছা করলে শুতে পারেন ঘাসের ওপর। অথবা খেলতে পারেন পছন্দের যে কোনো খেলা। আবার এসে একটু খাবার খাওয়া। খানিকটা পান করা। কিছুক্ষণ পার্কের ভেতরে হেঁটে বেড়ানো। ফিরে এসে আবার খাওয়া। এভাবে কখন যে কয়েকটা ঘণ্টা কেটে যাবে, বুঝতেই পারবেন না।”

গ্রিলড্‌ ফেস্ট থেকে ফিরে তিনি ফোন করলেন আবার। কথা বললেন দীর্ঘক্ষণ। কথার মাঝেই কয়েকবার বললেন, আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। আজ আমি ঘুমাবো। মনে হলো, মনের প্রশান্তি শরীরকে ছুঁয়েছে তাঁর। বেশ কদিন ঘুমাতে না পারায় তাঁর ঘুম পাচ্ছিল। ঘুমালে তার সব ঠিক হয়ে যাবে, নিজের মধ্যে এরকম একটা নিশ্চয়তা নিয়ে ঘুমাতে গেলাম আমি এবং তিনিও।

পরদিন তাঁর মৃত্যুর খবর জানার পরে ফোন করলাম মিস্টার স্ট্রাসাকে। জবাবে তিনি যা বললেন তার একটি অংশ এরকম :

“হ্যাঁ, আমরা মিস্টার আজাদকে ওভাবেই পেয়েছি। ১২ই আগস্ট বৃহস্পতিবার সকালে সময় মতো আমার ছেলে আনতে গিয়েছিল তাঁকে। কল বেল বাজানোর পরে দরোজা না খোলায়, সে ভেবেছিল বাইরে কোথাও হাঁটতে গেছেন হয়তো। এভাবে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরেও যখন তাঁর দেখা পাওয়া গেল না, তখন আমার ছেলে আমাকে ফোন করে। আমি ডাক্তার এবং পুলিশকে ফোন করি।

দরোজা খুলে ভেতরে ঢোকার পরে পরীক্ষা করে ডাক্তার বললেন, “হি ইজ ডেড।” তিনি বিছানায় শুয়ে ছিলেন এবং তাঁর চোখ বন্ধ ছিল। ডাক্তার ধারণা করে বললেন, ঘুমের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। কিছুই টের পাননি তিনি। এটা ঘটেছে রাত দুটো থেকে সকাল ছটার মধ্যে। ডাক্তার বললেন, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়ার পরে সবকিছু সঠিকভাবে জানা যাবে। তাঁর হার্টের সমস্যা ছিল এবং তাঁর হার্ট ফেল করে।

“পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লেখকেরা আসেন আমাদের দেশে। এই প্রথম ঘটলো এরকম একটা ঘটনা। কী বলে সহানুভূতি জানাবো আপনাকে, আমি মর্মাহত। ফোন করতে চেয়েও ফোন করা হয়নি আপনাকে। খুবই দুঃখিত।”

এরকমই জানালেন মিস্টার স্ট্রাসা। তিনি দেড় ঘণ্টার মতো কথা বলেন আমার সঙ্গে। যত রকম প্রশ্ন করি, জবাব দেন সবকিছুর। একই প্রশ্ন করি, দু-তিনবার। জবাব দেন তবুও। আমার বেদনাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করেন তিনি। তবু তা বয়ে আনেনি এতটুকু সান্ত্বনা। পোস্টমর্টেম অটোপ্সি রিপোর্ট নিশ্চিত করেছে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন তিনি। অন্য কোনো কারণে নয়।

সেটা যারা মানতে পারেননি, অনিবার্য দায়িত্ব তাদের, তাঁর কঙ্কালটি তুলে, সবধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে, নিশ্চিত হওয়া কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। শুধু ‘রহস্যময় মৃত্যু’ বলে আর লিখে, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নয়। ‘রহস্যময় মৃত্যু’ বলছেন যারা, রহস্যটি উন্মোচন করার দায়িত্বও যে তাদের ওপরেই পড়ে, তা কী বুঝতে পেরেছেন তারা?

শেষ করবার আগে লেখাটি, বেছে নিচ্ছি স্মৃতি থেকে, তিনটি ছোট্ট ঘটনা। তা জানাচ্ছি আপনাদের।

এক। “একটু পরে ক্লাশ নিতে যাবো বিশ্ববিদ্যালয়ে, কিন্তু বই খুঁজে পাচ্ছি না। বই ছাড়া কীভাবে পড়াবো বলতো?” বললেন ফোনে হুমায়ুন আজাদ আমাকে, ঢাকা থেকে একদিন।

“নাম কী বইটির, যেটা পড়াবেন আজ?” জানতে চেয়েছিলাম।

“বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা।” বললেন।

“অধ্যাপক, আপনি কী বই হারাইয়াছেন?” দুষ্টুমি করেছিলাম।

“না, আমি কপালকুণ্ডলা হারাইয়াছি।” বলেছিলেন।

“এতো দূর থেকে তো আপনাকে আমি কোনটাই খুঁজে দিতে পারবো না। না বই, না কপালকুণ্ডলা। দুঃখিত।” বলেছিলাম।

“কপালকুণ্ডলা না হলে চলবে, কিন্তু বইটি নাহলে কি করবো?” কণ্ঠে ছিল কৌতুকপ্রিয় বালকের অসহায়ত্ব।

“ক্লাশের কোনো ছাত্রের কাছ থেকে বইটি নিয়ে, পড়িয়ে, ফেরত দিয়ে দিতে পারেন। প্রতিবার একইরকম করতে পারেন এই ক্লাশে। তাহলে বইটি খুঁজে সময় নষ্ট করা, বা মেজাজ খারাপ করার দরকার হবে না।” বললাম।

“বইটি দ্বিতীয়বার কিনবার টাকাও বাঁচবে, তাই না?”

“ভালো বুদ্ধি দিয়েছিস।” বলেছিলেন।

যথার্থ কৌতুকে প্রতিজবাব দেবার প্রতিভা ছিলো তাঁর। প্রমাণ করেছেন তিনি তা, প্রায় সবসময়। সবার সাথে।

দুই। তাঁর উপন্যাস ‘সব কিছু ভেঙে পড়ে’ বেরিয়ে যাবার পরে বলেছিলাম একদিন, “অনেক কিছু অনেক সময় ভেঙে পড়ে। পড়তে পারে। কিন্তু সব কিছু ভেঙে পড়ে না। সব কিছু বদলায়। জীবন বদলায় অনিবার্য নিয়মে, বার বার। মানুষের সাথে মানুষের সর্ম্পক বদলায়, সব চেয়ে দ্রুত। বইটির নাম তাই, ‘সব কিছু বদলায়’ হলে ঠিক হতো।”

“বই বেরিয়ে যাবার পরে এরকম কথা বলে অস্বস্তিতে ফেললি তুই। আগে বলিসনি কেনো? নামটা এখন বদলাবো কী করে? এখন তো আমার ভেতরেই সব কিছু ভেঙে পড়ছে। আমিই বদলে যাচ্ছি।” বলেছিলেন।

তিন। কথা হচ্ছিল একদিন বুদ্ধদেব বসুকে নিয়ে, ফোনে। জানতে চেয়েছিলাম ‘শেষ পাণ্ডুলিপি’ পড়েছেন কি-না বুদ্ধদেবের।

জানালেন, পড়েন নি। বলেছিলাম পড়তে। কোনো লাইব্রেরিতেই পাননি বইটি।

আজিজ মার্কেট এবং নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানগুলোতেও নয়। পড়তেই হবে। মাথায় ঢুকে গেলে কোনকিছু, করতেই হতো সেটা তাঁকে।

বাঙলা বিভাগের একজন অধ্যাপক, গবেষণা করছিলেন তখন বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসের ওপর। মনে পড়তেই সেকথা, গেলেন তার কাছে। পেলেন সেই অধ্যাপকের কাছে বইটি। জানালেন বইটি পড়তে পড়তে, নিজের মতামত।

জানালেন ধন্যবাদ আমাকে, ‘শেষ পাণ্ডুলিপি’ পড়তে বলার জন্যে।

“শেষ পাণ্ডুলিপি আমি কখন লিখবো, বলতো?” বললেন বইটি শেষ করার পরে একদিন।

“অশেষ পাণ্ডুলিপির শেষে।” বলেছিলাম।

লিখেছিলেন তার দুবছর পরে, ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’।

শেষ পাণ্ডুলিপি এটা। যা হলো মর্মান্তিক, তাঁর জন্যে।

আমাদের জন্যে। হয়ে রইল যা, বীভৎস আর দুঃসহ এক স্মৃতি। হয়ে আছে রঙিন, এই স্মৃতি, রক্তস্নানে তাঁর।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close