Home চলচ্চিত্র সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় / বিভূতিভূষণ ও তারকোভস্কি : সৃজনের আভ্যন্তর ঐক্য ও অভিজ্ঞান

সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় / বিভূতিভূষণ ও তারকোভস্কি : সৃজনের আভ্যন্তর ঐক্য ও অভিজ্ঞান

প্রকাশঃ April 4, 2017

সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় / বিভূতিভূষণ ও তারকোভস্কি : সৃজনের আভ্যন্তর ঐক্য ও অভিজ্ঞান
0
0

১৯৩২ সালের প্রারম্ভে যখন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মেঘমল্লার’ গ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে, ঐ সময়ে সোভিয়েত রাশিয়ার একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তাঁরই সৃজন-চৈতন্যের এক অনুজ সহোদর আন্দ্রেই তারকোভস্কি; বিভূতিভূষণের জন্মের ৩৮ বছর পরে। আপাতদৃষ্টিতে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আন্দ্রেই তারকোভস্কির সৃজনী-সংরাগের কোন সাদৃশ্য নেই। বিভূতিভূষণের কোন রচনা তিনি পড়েন নি, পড়বার কথাও নয়; এমনকি সত্যজিৎ রায় কৃত অপু ট্রিলজি তিনি দেখেছেন কিনা তাও আমাদের জানা নেই। প্রবীণ চলচ্চিত্রকার মৃনাল সেনের আত্মকথা ‘তৃতীয় ভুবন’-এর এক জায়গায় তাঁর উল্লেখ পাই। ১৯৮২ কান চলচ্চিত্র উৎসবের একটি বিবরণী দিতে গিয়ে মৃনাল সেন লিখছেন : ‘আন্দ্রেই তারকোভস্কি সেখানে উপস্থিত ছিলেন নিজের ছবি Nostalgia-র জন্য, প্রথমে ছবিটির নাম ছিল The Italian Journey। নিজেকে গুটিয়ে রাখা মানুষ ইনি, মঞ্চের পিছনে প্রথম সাক্ষাৎ হল আমার। তাঁর প্রথম ছবি The Childhood of Ivan ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বড় পুরস্কার এনে দেয় ১৯৬২ সালে। কিন্ত প্রাথমিক অবস্থাতে সোভিয়েত রাশিয়ার চলচ্চিত্র জগতের উঁচু স্তরের আমলাদের কু নজরে পড়লেন তিনি। অবশেষে দেশ ছাড়লেন এবং দেশে আর ফিরলেন না।’ ১৯৮৬ সালে ৫৪ বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। ‘ইভান্স চাইল্ডহুড’, আন্দ্রে রুবলিয়েভ’, ‘সোলারিস’, ‘মিরর’, ‘স্টকার’, ‘নস্টালজিয়া’, ‘দ্য স্যাক্রিফাইস’ এই কটি বিরল চলচ্চিত্রের নির্মাতা হিসেবে তিনি আধুনিক চলচ্চিত্রকারদের পুরোভাগে স্থান করে নিতে পেরেছিলেন। কিন্তু বিভূতিভূষণ বন্দ্যাপাধ্যায়ের সাহিত্য সৃজনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কোথায়? ভাবতে অবাক লাগে ১৯২৯ সালে প্রকাশিত ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘অপু’র সমান্তরালে আমরা পেয়ে যাই তারকোভস্কির ‘ইভান্স চাইল্ডহুড’ চলচ্চিত্রের ‘ইভান’কে। হয়তো এই সমান্তরাল ভাবনার কথা আরো বেশি করে মনে হয়-১৯৫৫ সালে সত্যজিৎ রায় কৃত ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রটির জন্য। মনে রাখা প্রয়োজন যে, আন্দ্রেই তারকোভস্কি ‘ইভান্স চাইল্ডহুড’ নির্মাণ করেন ১৯৬২-তে। অন্যদিকে, ১৯৯১ সালে কলকাতার ‘সিগাল বুকস’ থেকে প্রকাশিত হয় আন্দ্রেই তারকোভস্কির ১৯৭০-১৯৮৬ এই দীর্ঘ সময় পর্বের দিনলিপি ‘Time Within Time’; এর পাশপাশি আমাদের স্মৃতিতে এসে ধরা দেয় পঞ্চাশ বছর আগে প্রকাশিত বিভূতিভূষণের দিনলিপি ‘স্মৃতির রেখা’ (১৯৪১) ও ‘তৃণাঙ্কুর’ (১৯৪৩)। আমাদের এই পর্যবেক্ষণ অবশ্যই সৃজনের দুই শাখার অগ্রজ আর অনুজ শিল্পীর তুলনা-প্রতিতুলনা নয়; বরঞ্চ পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুই সৃজনশিল্পীর দ্বিতীয় ভুবনের অন্তর্লীন সংরাগকে খুঁজে ফেরা, যার আকাশ জুড়ে আছে এক এবং অনন্য শ্রেয়োবোধের প্রতিন্যাস, সৃজনের এক আভ্যন্তর অভিজ্ঞান।

 

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অপুর’ নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে চলে যাবার কথা জানা যায় ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের ঊনবিংশ পরিচ্ছদের প্রথম লাইনে; ‘বৈশাখ মাসের প্রথমে হরিহর নিশ্চিন্দিপুর হইতে বাস উঠাইবার সব ঠিক করিয়া ফেলিল।’ সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’র কাহিনীও এইখানে শেষ হয়। আমাদের মনে আছে নিশ্চিন্দিপুরের পরিত্যক্ত সেই ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে একটি সাপ ধীরে ধীরে ঢুকে যায়। আন্দ্রেই তারকোভস্কির ইভান আর বিভূতিভূষণের অপুর মধ্যে সাদৃশ্য একটাই : তাদের শৈশব-কৈশোর। অপুর পিতৃমাতৃ পরিচয় জানতে পারা যায়। হরিহর-সর্বজয়ার স্নেহের আঙিনায় তার শৈশব-কৈশোর। কিন্তু ইভান পিতৃমাতৃহীন। বারো বছর বয়সী কিশোরটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে রাশিয়ার সৈন্যদলের ইষ্টার্ন ফ্রন্টের গুপ্তচর হিসেবে কাজ করে। তাহলে বিভূতিভূষণের অপুর সঙ্গে তার সাদৃশ্যের তুলনায় বৈপরীত্যই তো বেশি! কিন্তু তারকোভস্কির ইভান যুদ্ধের এই পরিবেশের ভিতরেও স্বপ্ন দেখে-স্বপ্ন দেখে তার মা বালতি করে জল নিয়ে আসছেন আর মাঝপথে বালতির মধ্যে মুখ ডুবিয়ে সে তৃষ্ণা নিবারণ করে, পর্দা জুড়ে তার মায়ের হাসি মুখ। অথবা স্বপ্নের ভিতরে ইভান আর তার বোন বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ট্রাকে করে যাচ্ছে। বৃষ্টি ভেজা দুটি শিশুর হাসিমুখ এক অমল সৌন্দর্যের ভুবন সৃষ্টি করেছে পর্দা জুড়ে, এইরকম স্বপ্নের কথা বারবার ফিরে আসে তারকোভস্কির ছবিতে। আকাশ-জল-মাটি-বনানী মিলে মিশে যায় তার ছবিতে। অপু আর ইভানের অমল মুখচ্ছবি কখনও কখনও চকিতে মিলে যায়। যদিও বিভূতিভূষণ-সত্যজিৎ যে পূর্ণ জীবনের কথা বলেন, তারকোভস্কির ছবিতে সেই পূর্ণ জীবনের ছবি নেই; কিন্তু ছবিটির একেবারে শেষে স্বপ্নের ভিতরে নদীর পাড় ধরে দিগন্তরেখা ছুঁয়ে জল, জল আর জল পেরিয়ে ইভান আর তার বোনের যে লম্বা দৌড়-জল ছপ্‌ ছপ্‌ শব্দ ক্রমশ যেন বুকের ভিতর ছড়িয়ে যায়। বিভূতিভূষণ-সত্যজিৎ-তারকোভস্কির শ্রেয়োবোধ তখন মনে হয় একই সূত্রে বাঁধা।

 

তারকোভস্কির ‘ইভান্স চাইল্ডহুড’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘গোল্ডেন লায়ন’ পুরস্কার লাভ করার পর আলিকাটা সম্পাদিত এল’ ইউনিটা পত্রিকায় একটি বিরূপ সমালোচনা প্রকাশিত হয়। বিবেকী বুদ্ধিজীবী, ভাবুক দার্শনিক জাঁ পল সার্ত্র ঐ পত্রিকায় একটি চিঠি লেখেন। এই সূত্রে তার কিছু অংশের উল্লেখ জরুরি :

‘ইভান্স চাইল্ডহুড’ হল এক গভীর রুশীয় ছবি, একটি বৈপ্লবিক ছবি যা সোভিয়েত রাশিয়ার নবীন প্রজন্মের সংবেদনশীলতাকে তার বিশিষ্টতা সহ প্রকাশ করেছে। মস্কোতে এই ছবিটি আমি প্রথমে দেখি এক ঘরোয়া প্রদর্শনীতে, তারপর দেখি গণ প্রদর্শনীতে-তরুণদের সঙ্গে। আমি বুঝতে পেরেছিলাম ছবিটি ওই কুড়ি বছর বয়সের বিপ্লবের  উত্তরাধীকারীদের কী বলতে চাইছে।

তবু সে একটি শিশু। এই নিসঙ্গ সত্তাটি শৈশবের কোমলতাকে বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু তাকে অনুভব করতে পারে না, তাকে এমনকী প্রকাশও করতে পারে না। যদি সে তার স্বপ্নের ভেতর তার শৈশবকে ফিরে যেতে চায়, রোজকার বাঁধা ধরা জীবনযাপনের বাইরে যদি সে নরম কোন স্বপ্ন দেখতে চায়, তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় সেই স্বপ্ন অচিরেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে। জীবনের খুব সাধারণ সব খুঁটিনাটি  ঘটনার ছবিও আমাদের ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে : শেষটা আমরা জেনে যাই। আর এই ভঙ্গুর ও অবদমিত কোমলতা কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তে বেঁচে থাকে। তারকোভস্কি ইভানকে এই কোমলতা দিয়ে ঘিরে রাখতে সতত যত্নবান : এ এক জগৎ, যুদ্ধ সত্ত্বেও এবং কখনো, যুদ্ধের কারণেও এই জগৎ (আগুনের গোলার পাশে পাশে থাকা অবাক-করা আকাশের কথা আমার মনে পড়ে) বাস্তবিক, এই চলচ্চিত্রটির গীতিময়তা, এর কষ্টকল্পিত আকাশ, এর শান্ত জল, অসংখ্য বনবাদাড়-এ সবই ইভানের আসল জীবন- এরা হল সেই ভালোবাসা ও শিকড় যা থেকে সে বঞ্চিত; এসবই সে একদা অভ্যস্ত ছিল, সে এখনও এসবই, কিন্তু নিজে সে আর এসব মনে করতে পারে না; অন্যেরা এসব তার মধ্যে দেখে।’ (অনুবাদ তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়)

দীর্ঘ পত্রের একেবারে শেষ পর্বে সার্ত্র লিখছেন : গোল্ডেন লায়ন তারকোভস্কির প্রকৃত পুরস্কার নয়, বরং তা হল সেই সব তর্কবিতর্ক যা তাঁর চলচ্চিত্রটি মানুষকে যুদ্ধের থেকে মুক্ত করার জন্য যাঁরা সংগ্রাম করে চলেছেন তাঁদের মধ্যে জাগিয়ে তুলেছে।’

কিন্তু ‘পথের পাঁচালী-অপরাজিত’ উপন্যাসে বিভূতিভূষণ কি অপুর জীবনের মধ্যে দিয়ে কোন সংগ্রামের ছবি এঁকেছেন? সৈয়দ আকরম হোসেন ‘পথের পাঁচালী-অপরাজিত : শৈলিবিচার’ প্রবন্ধে ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের ‘ত্রিংশ পরিচ্ছেদ’-এ অক্রুর সংবাদ শিরোনামের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ‘অক্রুর সংবাদ’ মিথ কাহিনীর উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন :

বৃন্দাবনে আনন্দলোক পরিত্যাগ করে, অক্রুর সংবাদে কৃষ্ণকে যেতে হলো মথুরায়, দৈব-দায়িত্ব পালনে। হারিয়ে গেল বৃন্দাবনের নিসর্গ, ব্রজের ভালোবাসা, গোপ-পল্লীর প্রেমসিক্ত পিছুটান। ‘অক্রুর সংবাদ’ অংশে অপুকেও পরিত্যাগ করতে  হলো নিশ্চিন্দিপুর-সেখানকার প্রকৃতি লোক, লীলা-রাজু-নীরু-সতু-পটু সবাইকে। অপুকে হতে হলো পরিবর্তিত জীবনের রূঢ়  বাস্তবতার মুখোমুখি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ শাসিত, যুদ্ধকালীন বিপন্ন-মূল্যবোধ-আচ্ছন্ন, বিকৃত-লাঞ্ছিত কলোনি-শহরের সেই  ক্রুর বাস্তবতার আর-এক নাম কংস। যে সামন্তশক্তিকে করেছিল অধিকার। সেই কংস-রূপ অপশক্তির আঘাত, …ষড়যন্ত্র,  লোভ প্রলোভনের এবং আতঙ্কের বিরুদ্ধেই সংগ্রাম অপুর।’

এইখানে পৌঁছে অনুভব করা যায় বিভূতিভূষণের ‘অপু’ আর তারকোভস্কির ‘ইভান’ আভ্যন্তর অভিজ্ঞানের প্রসারিত নন্দনভাবনার অনেক বেশি সহৃদয়-সংবেদী।

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ‘বাংলা কবিতা, আধুনিকতা’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন কীভাবে ‘প্রসঙ্গ ও মুডের সাদৃশ্য’ অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাস আর জীবনানন্দের ‘ধানকাটা হয়ে গেছে’ কবিতার মধ্যে এক অমোঘ অনির্দিষ্টতাকে প্রতিষ্ঠা করে :

[১] ধানকাটা হইয়া গেছে। চরে আর একটিও ধানগাছ নাই। সেখানে এখন বর্ষার সাঁতার জল। চাহিলে কারো মনেই                 হইবে না যে এখানে একটা চর ছিল…শূন্য ভিটাগুলিতে গাছ-গাছড়া হইয়াছে। তাতে বাতাস লাগিয়া সোঁ সোঁ শব্দ হয়। সেখানে পড়িয়া যারা মরিয়াছে, সেই শব্দে তারাই বুঝি নিশ্বাস ফেলে। (অদ্বৈত মল্লবর্মণ, তিতাস একটি নদীর নাম)

[২] ধানকাটা হয়ে গেছে কবে যেন-খেতে মাঠে প’ড়ে আছে খড় পাতা কুটো

ভাঙা ডিম-সাপের খোলস নীড় শীত।

এই সব উৎরায়ে ওইখান মাঠের ভিতর

ঘুমাতেছে কয়েকটি পরিচিত লোক আজ-কেমন নিবিড়।

ওইখানে একজন শুয়ে আছে-দিনরাত দেখা হ’তো কতো

কতো দিন,

হৃদয়ের খেলা নিয়ে তার কাজ করেছি যে কতো অপরাধ;

শান্ত তবু; গভীর সবুজ ঘাস ঘাসের ফড়িং

আজ ঢেকে আছে তার চিন্তা আর জিজ্ঞাসার অন্ধকার স্বাদ

(জীবনানন্দ দাশ, ‘ধানকাটা হয়ে গেছে’)

অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাস আর জীবনানন্দ দাশের কবিতার এই আভ্যন্তর অভিজ্ঞান যেভাবে আমাদের প্রাণিত করে, ঠিক সেইভাবেই বিভূতিভূষণ আর তারকোভস্কির মধ্যে আমরা সেই একরূপতা আবিষ্কার করি। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, তারকোভস্কির পিতা আর্সেনি আনেস্কানদ্রোভিচ তারকোভস্কি ছিলেন একজন অসাধরণ প্রতিভাবান কবি। পিতার কবিতাকে তারকোভস্কি তাঁর চলচ্চিত্রেও ব্যবহার করেছেন। ‘মিরর’ চলচ্চিত্র ব্যবহৃত পিতা আর্সেনি তারকোভস্কির একটি কবিতার অংশ বিশেষ :

নিশুতি ঘনালে আমি পেয়েছি যা অনুগ্রহ,

বেদির সমুখে সব দ্বার ক্রমে খুলে যায়,

আর সেই তমসাতে অতি শ্লথ ঊর্ধ্বারোহ

হলে ধীরে বিকিরণও হয়েছিল নগ্নতায়।

অতন্ত্র আমি যে বলি : ‘নাও তবে বরাভয়’,

জেনো সে অভয়বাণী নয় ততো মূল্যবান;

তুমি সুপ্ত, লাইলাক টেবিলে প্রশস্ত হয়

নীলিমার চরাচর নিয়ে তার স্পর্শ দান

করতে ওই আঁখিপাতে-চোখের পল্লবে তাকে

গ্রহণ করেছ, আর তাই ওরা অচঞ্চল,

এবং তোমার হাত-সেও ঠিক উষ্ণ থাকে

(অনুবাদ : রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়)

এই সময়ের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত একটি রচনায় লিখেছেন ‘বাবার সঙ্গেও তাঁর গভীর আধ্যাত্মিক সংযোগ ছিল, দেশ ছেড়ে চলে আসার পর তাঁর সাথেও আর দেখা হয়নি। বাবা ছিলেন বিখ্যাত কবি, আর বাবার কবিতা তাঁর কাছে ছিল নিত্য অনুপ্রেরণার মতো। ডায়েরিতে এইসব কবিতার বারবার উল্লেখ আছে, এক ভয়ঙ্কর সময়ে ও জগতে এইসব কবিতা তাঁকে যুগিয়েছে প্রেরণা ও সাহস, ফিরিয়ে দিয়েছে বিশ্বাস। বাবার বহু বাক্‌ প্রতিমা তাঁর ছবিতে চিত্রপ্রতিমার রূপ পেয়েছে’। তারকোভস্কির মানসভুবনের সঙ্গে বিভূতিভূষণের সাদৃশ্য এইখানে।

 

‘রাশিয়ার এক বিখ্যাত কবির সন্তান হিসেবে অঁর্দ্রে দেশের শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবার কথা কখনো  কল্পনাও করেননি, তাঁর শিল্পকর্মের লক্ষ্য ছিল ব্যক্তিমানুষ হিসেবে রুশদের নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও অধিবিদ্যক  দায়িত্ববোধ ফিরিয়ে দেওয়া। গভীর বেদনা ও বিষাদের মধ্যে দিয়ে তাঁর শিল্পসৃষ্টি। ডায়েরির পাতায় পাতায় তার  উদাহরণ রয়েছে।’ (বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত)

১৯৭০-১৯৮৬ এই দীর্ঘ সময় জুড়ে লেখা তাঁর ডায়েরির আভ্যন্তরে অভিজ্ঞানের ভিতর জড়িয়ে আছে তাঁর ব্যক্তিগত যন্ত্রণাদীর্ণ সময়ের পাশাপাশি এক শ্রেয়োবোধের অভিক্ষেপ-সৃজনভুবনের কথা। আমরা আশ্চর্যের সঙ্গে লক্ষ্য করি ১৯৭৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর তারকোভস্কি লিখছেন ভারতীয় ঋষি পতঞ্জলির কথা : ‘মানুষের সমস্ত ক্ষমতাকে যদি একটা বিন্দুতে সংহত করা যায় তা বর্শামুখের মতো হয়ে ওঠে; কোনো ভোঁতা জিনিস দিয়ে বাধাকে ভেদ করা যায় না, তাকে ধারালো হতে হয়, আর তখন সহজেই তা দিয়ে যে-কোন কিছুর ভিতর পথ করে নেওয়া যায়’ (ভারতীয় ঋষি পতঞ্জলির উক্তি)।

বিশ্বের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির শ্রদ্ধেয় নানা ব্যক্তিত্বের উদ্ধৃতি তাঁর দিনলিপিতে স্থান করে নিয়েছে। ‘বিরূপ বিশ্বে’র ভিতরে তার প্রত্যয়ী সংরাগকে জাগরুক রাখার মানসে তিনি এইসব মনীষীদের ভাবনা থেকে উদ্দীপিত হয়েছেন। কিন্তু পতঞ্জলি? খ্রীষ্টজন্মের ২৫০ বছর পূর্বে তাঁর সময়কাল। পাতঞ্জল দর্শন ও পনিনি ব্যকরণের মহাভাষ্যের প্রণেতা ছিলেন তিনি। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘একমাত্র ঈশ্বরের উপাসনা করে সমাধিলাভ করা যায়। ঈশ্বর নিত্য নিরশয়, অনাদি ও অনন্ত। অল্পতার চূড়ান্ত যেমন পরমাণু, বৃহতের শেষ সীমা যেমন আকাশ-পরমাণু অপেক্ষা ক্ষুদ্রতর এবং আকাশের অপেক্ষা বৃহত্তর কোনো জিনিস যেমন কল্পনা করা যায় না, সেইরূপ জ্ঞানশক্তির অল্পতার সীমা ক্ষুদ্র জীব এবং ঐ জ্ঞানশক্তির অতিশয় পরাকাষ্ঠা ঈশ্বর।’ প্রাচ্য দর্শনের প্রতি তাঁর এই বিশেষ প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ১৯৮২ সালে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানাচ্ছেন : ‘ক্রমশই আমি প্রাচ্যের দর্শনে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছি, যেখানে গভীর মনন আর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে একাত্মভাবেই জীবনের অর্থ নিহিত। পাশ্চাত্য খুবই বেশিরকম যুক্তিবাদী এবং জীবন সম্পর্কে পাশ্চাত্যের যে ধারণা ফুটে ওঠে তার মূলে খুবই প্রায়োগিক একটা নীতি রয়েছে। সেটা হল, খুঁটিনাটি সবকিছুতেই নিখুঁত ভারসাম্য রাখা…যত দিন সম্ভব শরীরটাকে বাঁচিয়ে রাখা এবং নিছক টিকে থাকা সম্ভব হয়।’ (অনুবাদ সোমেশ ভট্টাচার্য)

তারকোভস্কির এই স্বগত কথনের প্রেক্ষিতে তাঁর দিনলিপির প্রকির্ণ উচ্চারণের পাশাপাশি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিনলিপি ‘স্মৃতির রেখা’ (১৯২৪-১৯২৮), আর ‘তৃণাঙ্কুর’ (১৯২৯-১৯৩৯) এর আভ্যন্তর অভিজ্ঞানের চিহ্নগুলি মিলিয়ে পড়া যেতে পারে :

[ক]

বিভূতিভূষণ :

হয়ত পাঁচশত বছর পড়ে যদি আমার লেখা বেঁচে তাকে তবে-আমি-এই আমি-এই অত্যন্ত জীবন্ত প্রত্যক্ষ আমি, অনেক প্রাচীনকালে এক লেখক হয়ে যাবো। আমার বই-পত্তর বড় বিশেষ কেউ ছোঁবে না। তখনকার দিনের নতুন নতুন উদীয়মান লেখকদের বই সব খুব চলবে। অনাগত ভবিষ্যতের যে-সব বংশধরগণের জন্য আমি আলো জ্বেলে, তেল খরচ করে, আমার যথাসাধ্য বুদ্ধির অর্ঘ্য, যতই সামান্য হোক, যতই অকিঞ্চিৎকর হোক, তবুও দেবো, দিতেই হবে।(বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, দিনলিপি’ ২০ নভেম্বর, ১৯২৫)

তারকোভস্কি :

এটা বোঝার সময় এসেছে যে , কারুর তোমাকে প্রয়োজন নেই। আর সেইমতই তোমাকে চলতে হবে। এই            সবকিছুর ওপরে তোমাকে উঠতেই হবে। যতই হোক, আমি তারকোভস্কি। (আন্দ্রেই তারকোভস্কি দিনলিপি, ২৯ জানুয়ারি, ১৯৭৩)

 

[খ]

বিভূতিভূষণ :

একটা কথা মনে ওঠে-মানুষের অমরত্ব ব্যষ্টি হিসেবে সত্য বা সমষ্টি হিসাবে সত্য? হাজার বছর পরে মনুষ্য জাতি কিরকম উন্নততর ধরনের সভ্য হবে, সে প্রশ্ন আমার কাছে যতই কৌতূহলজনক হোক, আমি-এই  আমার অত্যন্ত পরিচিত আমিত্বটুকু নিয়ে হাজার বছর পরে কি রকম দাঁড়ানো-এই প্রশ্নটা আরও বেশী কৌতূহলপ্রদ। কে এর উত্তর দেবে?

আজকার এই পরিপূর্ণ শান্তির মধ্যে হঠাৎ মনে যেন ভাসা ভাসা রকমের এই কথা এল যে, মানুষের এই যে সৌন্দর্যানুভূতি, এই গভীর ভাবজীবন-ভগবান কি জানেন না এসব পূর্ণতা প্রাপ্ত হতে কত সময় নেয়? যিনি সুদীর্ঘ যুগ ধরে এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তিনি সময়ের এই উপযোগিতাটুকু নিশ্চয়ই জানেন। তা হোলেই কি এই দাঁড়ায় না যে মৃত্যুর পরেও ব্যষ্টি-জীবন চলতে থাকবে-থেমে যাবে না (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘দিনলিপি’ ৯ আগস্ট, ১৯২৭)

তারকোভস্কি :

সংস্কৃতি মানুষের মহত্তম অর্জন। কিন্তু এটা কি ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়েও বেশি জরুরি (যেদিকে সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিগত অর্জনকে এক এবং অভিন্ন বা ভাবে) সংস্কৃতির সৃজনে যিনি অংশ গ্রহণ করছেন, তিনি যদি শিল্পী হন, তবে তাঁর গর্বিত হবার কোন কারণ নেই। তাঁর প্রতিভা ঈশ্বর দত্ত, যাঁর প্রতি তার অবশ্যই কৃতজ্ঞ থাকা । (আন্দ্রেই তারকোভস্কি, ‘দিনলিপি’ ১৪ আগস্ট, ১৯৭১)

 

[গ]

বিভূতিভূষণ :

এই নির্জন রাত্রিতে মনে হয় সুখে আছে এক জিনিসে। কি সে? মনকে প্রসারিত ক’রে এই অনন্তের অসীমতার সঙ্গে এক করে দেবার চেষ্টা করো। মন ভাবো অনন্ত-আকাশের এই ছোট্ট একরত্তি পৃথিবীটার মত শত শত লক্ষ লক্ষ অজানা জগৎ-তার মধ্যে অজানা প্রাণীদের সেসব কত অজানা অদৃষ্ট ধরনের জীবনযাত্রা, কত সুখদুঃখ, কত আনন্দ। সে সব কি অজানা উচ্ছ্বাস তোমার মন অসীমতার রহস্যে ভরে উঠবে। ক্ষুদ্রত্ব ভেসে যাবে অনন্তের অমৃতের জোয়ারে। (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘দিনলিপি’, ১৮ আগস্ট, ১৯২৭)

তারকোভস্কি :

সব চেয়ে জরুরী হল শিল্পীর একাকীত্বের ট্র্যাজেডি, এবং সত্যকে আত্মস্থ করার জন্য সে যে মূল্য দেয়। (আন্দ্রেই তারকোভস্কি, ‘দিনলিপি’, ২ ডিসেম্বর, ১৯৭৩)

 

[ঘ]

বিভূতিভূষণ :

আমি এই যাওয়া-আসা স্বপ্নে ভোর হয়ে বড় আনন্দ পাই। আবার যে আসতে হবে তারপর, তাও আমি জানি। হয়ত একবার এসেছিলাম দূর কোন ঐতিহাসিক যুগে-হয়ত রোমার দ্রাক্ষালতার কুঞ্জের আড়ালে ভূমধ্যসাগরের নীল জলে তীরের কোন সম্ভ্রান্ত ধনীর প্রাসাদে। হয়ত হয়ত প্রাচীন গ্রীসের গৌরবের দিকে গ্রীকবীর হয়ে জন্ম নিয়েছিলাম, আলেকাজান্ডারের সৈন্যদলে ঢাল, তলোয়ার, ধনুক নিয়ে যুদ্ধ করেছি-নয়তো কোন পাহাড়ের ছায়ায় বসে এইরকম স্বপ্ন দেখতাম। (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘দিনলিপি’, ১৮ নভেম্বর, ১৯২৭)

তারকোভস্কি :  

মানুষ এবং মহাবিশ্বের মধ্যে ধারণযোগ্য কোন সূত্র নেই। সত্যের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আপন সীমাবদ্ধতার মধ্যে মহত্বকে অর্জন করতে চাওয়ার অভীক্ষা-আসলে ইউক্লিডীয় এবং অনন্তের পক্ষে তুচ্ছ-        আসলে স্বীকার করে নেওয়া যে আমরা নেহতই মানুষ। আত্মার মহত্বকে স্পর্শ করার অভীক্ষা যা নেই, সে অকিঞ্চিৎকর; একটা মেঠো ইঁদুর বা শেয়ালের মতোই তুচ্ছ। (আন্দ্রেই তারকোভস্কি, ‘দিনলিপি’, ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭০, অনুবাদ সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়)

শেষকথা

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আন্দ্রেই তারকোভস্কির দিনলিপি থেকে নির্বাচিত কয়েকটি অংশের সমান্তরাল উপস্থাপনার মাধ্যমে এই দুই শিল্পীর সৃজনের আভ্যন্তর অভিজ্ঞানের কয়েকটি সূত্র লক্ষণকে উদ্ভাসিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিভূতিভূষণের সময় ও সামাজিক অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও দূরবর্তী প্রজন্মের শিল্পী হয়েও তারকোভস্কির মানসভুবনের সঙ্গে তাঁর এই সাদৃশ্য সংবেদনশীল স্রষ্টার ভাবনা ও সৃষ্টিশীলতাকে অভিন্ন অভিজ্ঞানকেই নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

[কৃতজ্ঞতা : ইন্দ্রলীল সেনগুপ্ত, সুমন বন্দ্যোপাধ্যায়]

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close