Home শ্রদ্ধাঞ্জলি সৈকত হাবিব > তাঁর সজীব ও সক্রিয় শতায়ু চেয়েছিলাম >> শ্রদ্ধাঞ্জলি

সৈকত হাবিব > তাঁর সজীব ও সক্রিয় শতায়ু চেয়েছিলাম >> শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রকাশঃ September 19, 2017

সৈকত হাবিব > তাঁর সজীব ও সক্রিয় শতায়ু চেয়েছিলাম >> শ্রদ্ধাঞ্জলি
0
0

সৈকত হাবিব > তাঁর সজীব ও সক্রিয় শতায়ু চেয়েছিলাম >> শ্রদ্ধাঞ্জলি

[সম্পাদকীয় নোট : সৈকত হাবিব > প্রাজ্ঞ সমালোচক, কবি। তারই উদ্যোগে প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হয় দ্বিজেন শর্মার উপর আমাদের বিভিন্ন লেখকের লেখা সংকলিত গ্রন্থ – ‘প্রকৃতিপুরুষ দ্বিজেন শর্মা’ (২০১৫)। সৈকতের সঙ্গে সম্পাদনায় সহযোগী ছিলেন মোকারম হোসেন। দ্বিজেন শর্মার জীবদ্দশায়, সেটাই ছিল তাঁর উপর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। পরে এই বইটির একটা রিভিউ তীরন্দাজে প্রকাশ করবার ইচ্ছা আমাদের আছে। আজ প্রকাশিত হলো দ্বিজেন শর্মাকে নিয়ে সৈকতের লেখা।]

আমরা এখন কী দৈশিক, কী বৈশ্বিক যে কোনো ভালো উদ্যোগে অসংখ্য ‘না’-এর মধ্যে বসবাস করছি। পরিণামে সকল মন্দ বিষয়ে ক্রমাগত ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়ে চলেছে। এভাবে আমরা ক্রমাগত জীবনের বিরুদ্ধে, প্রকৃতি ও পৃথিবীর বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছি। যখন মানুষ নিজেকে সবচেয়ে ‘সভ্য’ বলে দাবি করছে, তখনই তার অসভ্য চেহারা সবচেয়ে বেশি প্রকট। বরং এই একুশ শতকে যখন আমরা ভাবছিলাম এবার মানুষ আরো মানবিক হবে, প্রকৃতিবান্ধব ও বৈশ্বিক হবে, তখন কী দেখছি? দিকে দিকে কেবল যুদ্ধ, ধ্বংস, মৃত্যু আর বিনাশের উৎসব চলছে; মানুষের ভোগপিপাসা, লোভ ও হিংসা আরো দানবীয় হয়ে উঠেছে; প্রযুক্তি আর মুনাফাবাসনা মানুষকে আরো পাশব করে চলেছে; সে অবলীলায় ধ্বংস করে চলেছে মাটি-আকাশ-পাহাড়-নদী-সমুদ্র; চিরকালের মতো লুপ্ত করে দিচ্ছে বহু বন-বৃক্ষ-প্রাণ-প্রজাতি। এই বিশ্বে মানবশিশু হচ্ছে সবচেয়ে অসহায় ও পরনির্ভরশীল প্রাণী এবং মানুষকেই সবচেয়ে বেশি প্রকৃতি ধ্বংস করে বেঁচে থাকতে হয়। অথচ সে তার হাত, মস্তিষ্ক, ভাষা, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনযন্ত্রের শক্তিতে সবকিছুকেই নিজের করায়ত্ত করেছে; পৃথিবীর তাবৎ কিছুকে করে তুলেছে মানবকেন্দ্রিক এবং প্রকৃতির ওপর প্রভুত্বের নামে প্রতিদিন এর বিনাশ করে চলেছে এবং মানবপ্রজাতিকেই নিয়ে চলেছে ধ্বংসের কিনারায়।

কিন্তু মানবজাতির সৌভাগ্য যে, এই প্রজাতির মধ্যেই সংখ্যায় অতি অল্প কিছু মানুষ আছেন যারা মানুষের এই হঠকারিতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে দিকে-দিগন্তরে মানুষকে সচেতন ও সাবধান করছেন; পৃথিবীকে রক্ষার জন্য জীবনপণ করছেন।

আমাদের ভূগোলে বর্তমান যুগে এ ধরনের যে কজন বরেণ্য মানুষ ছিলেন, তাঁদের মধ্যে দ্বিজেন শর্মা ছিলেন মহত্তম। প্রাণ, প্রকৃতি ও উদ্ভিদবিজ্ঞানের এই সাধক ও শিক্ষক তাঁর সাতাশি বছরের জীবনের প্রায় সত্তর বছর  এককভাবে আমাদের চেতনায় বিন্দু-বিন্দু জল ঢেলে আমাদের আত্মাকে সজীব করে তুলতে চেয়েছেন, আমাদের বিবেককে জাগাতে চেয়েছেন।

আজকের দিনে যখন বিশ্বজুড়ে পরিবেশ-চিন্তা কেবল আন্দোলন নয়, একটি বৃহৎ ব্যবসা ও তহবিলবাণিজ্য, যার সুফলভোগী রাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন এনজিও আর বিশেষভাবে গজিয়ে-ওঠা একদল পেশাদার ‘বিশেষজ্ঞ’, যাদের অনেকেই একে নিজের প্রচার আর উচ্চ রোজগারের উপায়মাত্র হিসেবে দেখেন, তাঁদের কাছে দ্বিজেন শর্মার এই নিঃস্বার্থ একক আন্দোলনের গুরুত্ব কতটুকু, বোঝা মুশকিল। কিন্তু আমরা যদি পঞ্চাশ-ষাটের পরশাসিত বাংলাদেশে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে লুটেরা ও দখলবাজ বণিক-শাসকদের বাংলাদেশে তাঁর এই অহিংস সংগ্রামের অবদান বিচার করি, তাহলে এর গুরুত্ব অনুভব করা যাবে।

বরং বলা ভালো, প্রকৃতির অপার মমতায় গড়ে-ওঠা দ্বিজেন শর্মা ছিলেন এক মহান শিশু, যিনি তাঁর সব আবেগ-অনুভূতি-শিক্ষা-অভিজ্ঞতা দিয়ে সবুজ বাংলাকে রক্ষা এবং আমাদের অন্তরকে একটি সবুজ উদ্যানে পরিণত করতে চেয়েছেন। এইভাবে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমাদের অঘোষিত জাতীয় প্রকৃতি-শিক্ষক। যদি বাংলাদেশ নামক শাসকগোষ্ঠী ও নীতিনির্ধারকরা তাঁর যোগ্য ছাত্র হতে পারতেন, তাহলে আমরা হয়তো আজ আরো সবুজ, আরো সুন্দর একটি বাংলাদেশ পেতাম; আমাদের সন্তানেরা হয়ে উঠতে পারত প্রকৃতির সন্তান। আমাদের এই সজ্ঞান-ব্যর্থতাকে হয়তো তিনি কখনো ক্ষমা করবেন না আর ক্ষমা চাওয়ার কোনো অধিকারও আমাদের নেই।

এই মহান শিক্ষকের যে যৎসামান্য স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েছি, এজন্য নিজেকে পরম সৌভাগ্যবান বলে মনে করি। আজ যখন তিনি প্রকৃতির মাঝে লীন হয়ে গেছেন, তখন তাঁর প্রতি যে সামান্য গুরুদক্ষিণা নিবেদন করতে পেরেছিলাম, সেটি অনেক পুণ্যের কাজ বলে মনে করি।

আমার মতো মূর্খের পক্ষে তাঁর মতো মহান বৃক্ষের মূল্যায়ন চরম ধৃষ্টতা। তাই সেদিকে না গিয়ে বরং তাঁর জন্য যে ‘পুণ্যকাজ’টুকু করতে পেরেছিলাম, সেই স্মৃতিতর্পণ করে এ রচনা শেষ করা যাক।

২০১৫ সাল। তাঁর মানসপুত্র নিসর্গ-লেখক মোকারম হোসেন বললেন, দ্বিজেনদার ৮৫তম জন্মদিনকে সামনে রেখে কিছু করা দরকার। আর সেটির প্রধান আয়োজক হবে তাঁরই স্বপ্নের সংগঠন ‘তরুপল্লব’। তখন আমাদের মনে হলো, যে-দেশে সাধু-অসাধু উপায়ে অর্থবিত্ত বা ক্ষমতার মালিকরা সংবর্ধনা ও পুরস্কার বাগাতে যে-কোনো পন্থা অবলম্বন করেন, সে দেশে সত্যিকারের মানুষকে সংবর্ধিত করে ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন ও জাতীয় পাপমোচন করা দরকার। আমরা সেই কাজটি করতে পেরেছিলাম, উৎসব মুখরতার মধ্য দিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে পেরেছিলাম। তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন, আমরা গর্বিত হয়েছিলাম। সেই জন্ম-উৎসবে তাঁকে ঘিরে ‘প্রকৃতিপুত্র দ্বিজেন শর্মা’ নামে একটি চমৎকার বইও আমরা গ্রন্থিত করতে পেরেছিলাম, যাঁর সম্পাদক ছিলাম আমি ও মোকারম হোসেন। বহু গুণীজনের কথা-লেখায় বইটি সমৃদ্ধ এবং তাঁর জীবনযজ্ঞের অনেক অধ্যায় তাতে উন্মোচিত হয়েছে।

কেন এই কাজটি করেছিলাম, তা স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি সম্পাদকের ভূমিকায়। এর কিছু অংশ তুলে ধরা যাক :

“এই নিবেদন এমন একজন মানুষের জন্য, যিনি ৮৫ বছর ধরে পৃথিবীতে আছেন; অন্তত ৬০ বছর ধরে খুব সক্রিয় মানবিক-সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক-দার্শনিক কর্মযজ্ঞে। আর তিনি বিশেষভাবে মহিমান্বিত বাংলাদেশে প্রকৃতিরক্ষা, উদ্ভিদ ও উদ্যানচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে। প্রকৃতির সঙ্গে জীবনের, পৃথিবীর সম্পর্কের নিবিড়তা তাঁর কথা ও কলমে এমন এক গহন ভাষায় প্রকাশিত হয়, এর কোনো বিকল্প হয় না। এ যেন তাঁর নিয়তির মতো যে, তাঁর প্রকৃতিলগ্ন শৈশব, আরণ্যক পাহাড়ি নিসর্গ, পিতৃদেবের কবিরাজি ও বৃক্ষসন্ধান- সব মিলিয়ে তিনি এমনটাই হবেন। এজন্য তাঁকে নিজেকে নির্মাণ করতে হয়নি। বরং এ তাঁর সহজাত। ফলে এটি অকৃত্রিম, সহজ ও অন্তর্গত, যার দ্যুতি তাঁর জীবন-চিন্তা-কর্মে ছড়িয়ে রয়েছে।

তিনি কেবল একজন বৃক্ষবন্ধু আর উদ্যানবিদ নন, বরং স্বয়ং এক মহাবৃক্ষ আর গভীর উদ্যান, যেখানে আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তাঁর স্নেহছায়া ও সৌরভ পেয়ে আসছে। তিনি কেবল গাছ আর বাগানেই নয়, বরং মানুষের হৃদয়েও রোপণ করেন চেতনাগাছ আর প্রকৃতির প্রতি মমতা। মানুষ হিসেবেও তিনি অতি সজ্জন, পরোপকারী ও উদার। তাঁর সান্নিধ্যে গেলে টের পাওয়া যায় তিনি তাঁর লেখার মতোই সুন্দর, সরল ও গভীর। সচরাচর আমরা আমাদের অনেক লেখক-অধ্যাপক-বুদ্ধিজীবীকে যেভাবে দেখি, যথেষ্ট রাশভারি, আত্মগর্বী ও কৃত্রিম, তিনি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। শিশুর মতো উচ্ছল, তুমুল আড্ডাবাজ ও রসিক এবং তাঁর সঙ্গে বন্ধুতা বা বন্ধনে বয়সের কোনো বিচার নেই। অন্যদিকে তিনি কেবল লেখা, বক্তৃতা বা টেলিভিশনে কথা বলেই কর্তব্য পালন করেন না, বরং নিজে দূরদূরান্ত হেঁটে সংগ্রহ করেন দুর্লভ গাছপালা। আর এই বয়সেও নতুন প্রজন্মের চেতনাসঞ্চারে নিজে বিভিন্ন উদ্যানে-বাগানে সশরীরে উপস্থিত থাকেন। আজকে আমাদের হৃদয়ে যে প্রকৃতিপ্রেম তা সঞ্চারে তাঁর রয়েছে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ বহু অবদান।

আমরা এই মানববৃক্ষের কাছে অশেষভাবে ঋণী ও চিরকৃতজ্ঞ।

দ্বিজেন শর্মা এক জীবনে বহু জীবন যাপন করেছেন। কোনো মানুষের আত্মপরিচয়ের জন্য যেখানে একটি পরিচয়ই যথেষ্ট, সেখানে তাঁর ক্ষেত্রে পাঁচটি পরিচয় না দিলেই নয়। তিনি নিসর্গী ও উদ্যানবিদ, সুলেখক-সম্পাদক, বিখ্যাত অনুবাদক, অধ্যাপক ও উদ্ভিদবিদ।

তাঁর বন্ধুভাগ্য, ছাত্রভাগ্য, ভক্তভাগ্য ঈর্ষণীয়। তাঁদের অনেকেই দেশে ও বিশ্বে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সম্মানিত। তাঁদের বয়সও বিচিত্র- আশি থেকে বিশের কোঠায়। যেহেতু  তিনি আত্মপ্রচারবিমুখ ও উদ্যানসম হৃদয়ের অধিকারী, তাই সকলের জন্যই তিনি অবারিত। ফলে তাঁকে ঘিরে কথা-স্মৃতি-অনুভূতি-ভক্তি-মূল্যায়নও বহু ও বিচিত্রধর্মী।

এই সব বিবেচনা করে বইটিকে আমরা মোট সাতটি প্রধান অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছি, যাতে পর্বে পর্বে তাঁর সামগ্রিকতা অনুভব করা যায়। কিন্তু এতে কোনো কঠোর বিধি মান্য করা হয়নি, কারণ একই লেখক তাঁর বিভিন্ন দিক নিয়েই মূল্যায়ন করেছেন। তাতে ব্যক্তিগত লেখাতেও রয়েছে নৈর্ব্যক্তিক বিচার। এক্ষেত্রে আমরা লেখাটির প্রধান প্রবণতা অনুযায়ী অধ্যায়ভুক্ত করেছি। আশা করি এসবের মধ্য দিয়ে পাঠক একটি সহজ অথচ দীর্ঘ দ্বিজেন-ভ্রমণ সম্পন্ন করতে পারবেন।

দ্বিজেন শর্মার প্রকৃতিজগতে দুজন মহা-মানুষ প্রবলভাবে উপস্থিত। বিজ্ঞানের দিক থেকে চার্লস ডারউইন, আর দর্শন ও চেতনার দিক থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বইয়ে এ দুজনকে নিয়ে তাঁর একটি সুস্বাদু রচনা; বাগান-উদ্যান বিষয়ে একটি অনুসন্ধানী লেখা এবং বর্তমান পৃথিবীর প্রকৃতিহননে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীদের ভোগ-মুনাফাবাদী চেহারার স্বরূপ নিয়ে একটি ছোট লেখা গ্রন্থিত হলো তাঁর চর্চার নানা ক্ষেত্রকে তুলে ধরার জন্য।

প্রকৃতির জয় হোক, প্রণম্য দ্বিজেন শর্মা অন্তত শতায়ু হোন আর এই বিপন্ন পৃথিবীতে প্রকৃতির পুত্র হিসেবে তাঁর বারবার জন্ম হোক।”

নিশ্চয়ই তিনি বারবার আমাদের মাঝে নানা রূপে ফিরে আসবেন। কেননা, আমাদের বিপণ্নপ্রায় পৃথিবীজননী ও স্বদেশমাতার জন্য এমন সন্তান যে অনেক বেশি দরকার…।

ঢাকা, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close