Home অনুবাদ সৈয়দ তারিক অনূদিত > আর্হেন্তিনার কবিতাগুচ্ছ

সৈয়দ তারিক অনূদিত > আর্হেন্তিনার কবিতাগুচ্ছ

প্রকাশঃ August 10, 2018

সৈয়দ তারিক অনূদিত > আর্হেন্তিনার কবিতাগুচ্ছ
0
0

সৈয়দ তারিক অনূদিত > আর্হেন্তিনার কবিতাগুচ্ছ

লাতিন আমেরিকার যে সকল কবিতার অনুবাদের সঙ্গে আমরা পরিচিত, তার প্রায় সবই অপরিহার্য ভাবে রাজনৈতিক। অবশ্য, নেরুদার প্রেমের কবিতারও যে অনুবাদ হয় না, তা নয়; কিন্তু তুলনায় মনে হয় যেন রাজনীতি ছাড়া লাতিন আমেরিকার কবিতায় অন্য তেমন কোনো বিষয়বস্তু নেই। উইলিয়াম শাঁদ কর্তৃক ইংরেজিতে “সাম্প্রতিক আজেন্টিনীয় কবিতা” (১৯৬৯) পড়ে বিষয়বৈচিত্র্যে ও রচনা শৌকর্যে মুগ্ধ হতে হলো। অনুবাদের পক্ষে আমার ক্ষমতা ও সুযোগ সীমিত। এই অনুবাদগুচ্ছ থেকে আগ্রহী পাঠকমাত্রেই, তবু, অনুমান করতে পারবেন যে সে-দেশের কবিতা বাস্তবিকই কতটা অগ্রসর, এবং আমাদের সংবেদনের কতো নিকটবর্তী। অনুবাদিত কবিতার কবিদের মধ্যে নালে রক্সলো-র জন্ম ১৮৯৮ সালে, অন্য সবার জন্ম-বৎসর (১৯৩১) থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে।

 

 

কনরাডাে নালে রক্সলো (Conrado Nale Roxlo)
জন্ম ১৮৯৮

 

 

পৃথক আকাশ

এ আমার গ্লাশ, আমি ভেঙে ফেলি একে।
এ আমার ঘোড়া, আমি মুক্তি দিই একে।

বন্ধুদের বলে দাও মরে গেছি আমি।

আমার গ্লাশের মদ ছলকে উঠুক,
আমার শত্রুরা খাক ওটা, খাক আমার কুকুর,
এবং নাচুক তারা, মাতাল মাতাল হয়ে
আমার ঘরের ছাই মেখে।
বন্ধুদের বলে দাও মরে গেছি আমি।
চলে যাক ঘোড়াটি আমার
গোলাপ ও লরেলের তোরণের নিচ দিয়ে
পৃথক আরােহী নিয়ে।
বন্ধুদের বলে দাও মরে গেছি আমি,
মরে গেছি, মরে গিয়ে সুখী
পৃথক আনন্দে মেতে, যে-আনন্দ আসে
পৃথক আকাশ থেকে নেমে।

 

হুয়ান হোসে হারানান্দেজ (Juan Jose Hernandez)
জন্ম ১৯৩১

 

কবিতা
চাইনা, বলুক তারা
কমলা শব্দটি।
সূর্যালোকে পৌঁছে যায় নিকটে আমার,
এবং আমার গৃহে,
এবং আমার সেই হারানাে শৈশবে।
একদা সুগন্ধ ছিলো এক,
অলসতা ছিলো কিছু; অপরাহ্ণের,
আর ছিলো জল।
ছিলো আলো লাবণ্যের,
গভীরতা ছিলো আত্মার।
চমৎকার পাখি ছিলো এক
গাইতো যে গান
প্রতিবেশীর উঠোনে ব’সে ব’সে।
ছিলো বৃহৎ ডালিয়ারাজি,
আর, একটি বিড়াল-
ওদের ছায়ায় বসে তুলতো যে হাই!

এবং গ্রীষ্মের দিনে হতো ভোজসভা,
সেখানে আহার হতো ঋতুর প্রথম-ফলা বিশেষ রকম
স্বাদালো ডুমর।
চাইনা, বলুক তারা
কমলা শব্দটি।
(কমলাও নয়, নয় দুপরের ঘুম)
যা-কিছু বেসেছি ভালো, বেদনা জাগায়।

 

অলেহান্দ্রা পিজার্নিক (Alejandva Pizarnik)

জন্ম ১৯৩৭

 

যে নেই

 
১.

রক্ত চায় স্থিত হ’তে।
প্রেমের কারণে ওরা এর যুক্তি নিয়েছে কেড়ে।
নগ্ন সে অনুপস্থিতি।
একা একা কথা বলি আমি, নিজেকে উৎপাটিত করি।

পৃথিবীর কী বলার আছে, যদি ঈশ্বর
পৃথিবীকে ত্যাগ করে যান এইভাবে?

 
২.

যদি তুমি নেই–-
সূর্যের ঘটে ত্যক্ত মৃত মানুষের মতো।

যদি তুমি নেই–

নিজেকে দুহাতে তুলে আমি
নিয়ে যাই জীবনের কাছে নিজেকেই,
চেয়ে নিতে গাঢ় অনুভব।

 

ফ্লর শাপিরা ফ্রিডমান (Flor Schapira Fridman)
জন্ম ১৯৩৫

 

কেবল তুমিই জানো
কেবল তুমিই জানো কীভাবে রয়েছে টিকে অস্তিত্ব আমার,
এবং সুদূর থেকে বারবার উচ্চারণ করাে তুমি আমার এ নাম,
এবং তোমার কণ্ঠে একত্রে উচ্চারণ করো
অসংখ্য বিচিত্র সব অস্তিত্বের নাম-
যা তােমাকে ভালােবাসে, যা রয়েছে ভিতরে আমার।

কম্পন জানিয়ে দ্যায় আত্মার উপস্থিতি,
যেন সে নিশ্চিত জানা-কিছু।

জীবনের অতিক্রম ধীর, খুবই ধীর,
অতএব, আমরা হারিয়ে যাই
নিজেরাই নিজেদের খুঁজে,
নিজেরাই নিজেদের খুঁজে।

 

হর্হে ভােকেসি লেসকানো

 

সময় একটি সড়কের নাম
১.

বেশি নয়
কম নয়।

কারণ সময় হলো একটি সড়ক
যা তােমাকে নিয়ে যায় সেই পথে, যেই পথে যাও
যদি যাও কোনো এক গন্তব্যের দিকে;
যে-কোনো দিবসই শুভ।
যেহেতু, এগােলে পথ পৌঁছে যাবে ঠিক।

বেশি নয়
কম নয়।

 
২.

অর্থহীন মনে হতে পারে এই কথা
কারণ পারি না আমি করতে পৃথক
– অন্যদের মতো- দুঃখ থেকে প্রেম।
যেহেতু, সকল কিছু যুক্ত হয়ে রয় তার সাথে
অভিন্ন রকম আর রয়েছে যা-কিছু, সেই সব
পূর্ণ হয়ে রয় এক অলৌকিকতায়, যা রয়েছে বেঁচে।

 
৩.

বিষণ্ন অথবা সুখী,
সুখী বা বিষণ্ন,
যে-ভাবেই থাক
থাকছে, যেহেতু; থাকাটাই সতত সুন্দর।
৪.

এবং আনন্দ
কিছু কি পৃথক
ভবিষ্যতের জন্যে
বিষাদ বপন করা ছাড়া?
এবং হঠাৎ
করে না কি যাত্রা শুরু আত্মা ঠিক ঠিক
পৌঁছোতে অশান্ত লােকে
বিষাদেরই অভ্যন্তর দিয়ে?
৫.

প্রকৃত প্রস্তাবে সবই, সকলই সুন্দর।
কিন্তু যদি লক্ষ করাে অসঙ্গতি কোনো
দেখাে না তাকিয়ে একে,
বরং তাকিয়ে দ্যাখো নিজের স্বভাব
এবং সংবেদন সতর্কতার।

৬.

এ সেই কারণ যাতে যে-কিছুর সাথে।
সন্নিধির আছে প্রতিকার।
সেটাই যথেষ্ট, যদি যুক্ত হওয়া যায়
যথাযথ অবস্থার সাথে।

 

৭.

কিন্তু যদি না ঘটে তেমন
যেমন বলেছি আমি,
মনে করো, মনে করে রেখো
বসন্তের কথা;
মনে রেখো, সে এত বাস্তব
যেহেতু; সে ভ্রাম্যমান,
যেহেতু, সে অনিশ্চিত;
নিজেকে ছড়িয়ে দিতে
আলো-ও-সৌরভে
গ্রহণ করে সে সব কিছু;
আর নেয় সে-সমূহ
আবশ্যক- এ-কথা জেনেই।

৮.

তুমি হলে, তুমি হ’লে…
– আমি ঠিক বুঝতে পারি না।
আরও বেশি কী কী তুমি চাও।

৯.

অবশ্য ঠিকই করো যখন যাচনা করে।
যদি হয় প্রয়োজন।
কিন্তু ভুলাে না যেন, যেহেতু কেউ একজন
দিতে পারে যা-কিছু, চেয়েছে,
তখন বরং ভালাে সংযত হওয়া।
তখন অর্ধেকটুকু চেয়ো।

১০.

অন্যদিকে
ভ্রমণকারীরা বলে-

যারা জানে ভালো
চলে যাওয়া এবং আসার রীতিনীতি-
যে ভ্রমণ করে ধীর পায়ে
সে কেবল প্রথমে পৌঁছোয় তাই নয়,
সে যে নিশ্চিত পৌঁছোয়।

১১.

যদি তুমি চাও, যা তোমার আছে
তার থাকা নিশ্চিত হোক,
তবে রেখো তা হৃদয়ে,
শুধু বন্ধ করো না দরোজাটা।

১২.

মাঝে মাঝে যদি
হারাও তোমার পথ
অথবা সন্দেহ করো নিজেকেই,
তবে তা তোমার চিহ্ন বেড়ে উঠবার
অথাৎ নিশ্চিত ভাগ্যে
নিজেকে পাচ্ছাে তুমি খুঁজে।

১৩.

কিন্তু যদি একদা হঠাৎ
মনে করাে পৌঁছে যাচ্ছো তুমি,
অবিশ্বাস করাে তুমি তোমার বিচার
যেহেতু সতত কিছু, ফেলছো হারিয়ে।

১৪.

এখন যেহেতু যাই আমরা সবাই
বুকে নিয়ে উন্মুক্ত হৃদয়,
এসো, মেলাই কণ্ঠস্বর
ভােজঘরে সম্মিলিত সঙ্গীতের সাথে।

– আমি আছি :
চলো, এ-দিনকে ধন্যবাদ দিই।
– তুমি আছাে :
চলাে, বেঁচে থাকি আমাদের নিয়ে।
– সে-ও আছে :
এবং অতঃপর হোক এটা সে-রকম যেমন ঈশ্বর চান।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close