Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ সৈয়দ আলী আহসান > কবি আহসান হাবীব >> অগ্রন্থিত দুষ্প্রাপ্য রচনা

সৈয়দ আলী আহসান > কবি আহসান হাবীব >> অগ্রন্থিত দুষ্প্রাপ্য রচনা

প্রকাশঃ January 2, 2018

সৈয়দ আলী আহসান > কবি আহসান হাবীব >> অগ্রন্থিত দুষ্প্রাপ্য রচনা
0
0

সৈয়দ আলী আহসান > কবি আহসান হাবীব >> অগ্রন্থিত দুষ্প্রাপ্য রচনা

একজন কবির যাপনের মধ্যে সংসার থাকে, সমাজ থাকে, রাজনীতি থাকে, বিক্ষোভ থাকে, অহমিকার প্রচণ্ডতা থাকে আবার অসহায়তার অনুত্তেজনা থাকে। কিন্তু এসব নিয়েও কবি কবিতার সর্বস্বতার মধ্যে বসবাস করেন। কবিতার শব্দের মধ্যে তিনি তার বিশ্বাসকে সমর্পণ করেন, আগ্রহকে সমর্পণ করেন এবং অভীপ্সার আনন্দকে উদ্বেলিত করেন। সকলেই এটা করেন তা নয়, কিন্তু কেউ কেউ করেন। যারা করেন তারা হয়তো কখনো সংসারের কর্মবৃত্তে উন্মুখর নন, হয়তোবা সমাজে প্রতাপী পুরুষ নন। কিন্তু কবিতার মধ্যে সমর্পিত হয়ে তারা একপ্রকার নিশ্চিন্ততা নির্মাণ করেন।
আহসান হাবীব এই শেষোক্ত শ্রেণীর কবি ছিলেন। তার কাব্য জীবনের শুরু থেকে আমি তাকে দেখে এসেছি। কোথাও তার আগমন আবির্ভাবের মতো ছিল না, তিনি প্রচণ্ড কোনো সাড়া কোথাও তুলতেন না। কিন্তু একটি সুনিশ্চল প্রশান্তিতে সকলের মধ্যে আগ্রহ বিতরণ করতেন। যুবক বয়সে তার স্নিগ্ধ মনোরম কান্তি এবং নিরীহ লজ্জিত পদক্ষেপ এখনো আমার দৃষ্টিতে ভাসছে। তিনি তখন নিজেকে না জানিয়েও এক বিশেষরূপে জানিয়েছেন। এ যেন ঘোষণা করা নয় কিন্তু একটি সহজ স্বাভাবিকতার মধ্য দিয়ে স্ফুরিত হওয়া।
আমরা কোলকাতায় একই এলাকায় থাকতাম। ওয়েলেসলির ট্রাম লাইন থেকে যে রাস্তাটি পূর্বদিকে ইসলামিয়া হাউজে গিয়েছে সে পথ দিয়ে একটু এগুলে গার্ডনার লেন পড়ে। আমি এই লেনের প্রায় শেষে খানকা শরীফের কাছে একটি মেসে থাকতাম। আহসান হাবীব নিকটেই থাকতো। নাসির আলী তার সঙ্গে থাকতেন। তার কক্ষটি এমন কোনো উল্লেখযোগ্য ছিলো না, অন্ধকারে হারিয়ে যাবার মতো ছোট একটি ঘর। রাতের বসবাসের ঘর। দিনের বেলা তো তিনি বাইরেই থাকতেন। আমিও তাই। কখনো কখনো একসঙ্গে পথ চলেছি। বাসের শব্দ, মানুষের ব্যস্ত কোলাহল, কখনো ফেরীওয়ালার ডাক, কখনো উপরে ইলেকট্রিক তারে কাকের জটলা এ সমস্তের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের দৈনন্দিন কর্মে পথ হেঁটেছি। তখন আমরা একজন আরেকজনকে আগ্রহভরে গ্রহণ করেছিলাম কি-না জানি না কিন্তু একটি সময়ের পদপাতে জীবনের কিছুটা সঞ্চয় সংগ্রহ করেছিলাম।
মানুষকে চেনা যায় তার প্রত্যাশার মধ্যে। বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন প্রত্যাশায় হস্ত প্রসারণ করে আছে। আহসান হাবীব কিন্তু কখনো কোনো প্রত্যাশার হস্ত প্রসারণ করেননি। চাকুরি জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, কর্মক্ষেত্রে ঐশ্বর্যবান হওয়া অথবা জীবনে সম্মানিত হওয়া এগুলোর কোনোটাই তিনি প্রত্যাশা করেননি। একপ্রকার নির্বিকার প্রশান্তিতে তিনি জীবনের পথ চলেছেন। যদি কোনো একটি ক্ষেত্রে ঐকান্তিকতা নিয়ে আপনাকে উন্মোচন করার চেষ্টা আহসান হাবীবের ছিল তবে সে চেষ্টা ছিল কাব্যক্ষেত্রে। তিনি তার একটি কবিতায় লিখেছেন যে ঝরে পড়া পালক যেখানে ভস্মীভূত হয়েছে সেখানেই তিনি নীড় বেঁধেছেন, কিন্তু ভস্মস্তূপে নীড় বাঁধলেও সবুজ পাতার স্বপ্নেরা সেখানে ভীড় করেছে। এভাবে সহজ শান্তি নির্মেদ রোমান্টিক রসানুভূতিতে তার কবিতাকে সুনিশ্চয় করেছেন। যে কবিতাটি আহসান হাবীবকে সর্বপ্রথম খ্যাতির কাতারে নিয়ে আসে তার নাম ‘এই মন এই মৃত্তিকা’। কবিতাটির শান্ত বিনয়নম্র প্রতিধ্বনি এখনো আমার কানে বাজে :

ঝরাপালকের ভস্মস্তূপে তবু বাঁধলাম নীড়
তবু বারবার সবুজ পাতার স্বপ্নেরা করে ভীড়।
তবু প্রত্যহ পীত অরণ্যে শেষ সূর্যের কনা
মনের গহনে আনে বারবার রঙের প্রবঞ্চনা।

এখনকার কয়েকটি নামবাচক শব্দ যেমন পালক, নীড়, পাতা, স্বপ্ন, অরণ্য, সূর্য এবং রঙ একটি যুক্তিতে অর্থবহতায় পারস্পরিক সম্পর্কে মিলিত হয়েছে। সবগুলোই প্রাকৃতিক বস্তু বা স্বভাব বা অলঙ্কার এবং এর ফলে একটি আরণ্যক পরিমণ্ডলের অবস্থানকে কেন্দ্র করে কবি তার অসহায় জীবনের বঞ্চনার নিকট শেষ-নির্ভরতা নির্মাণ করতে চেয়েছেন। অশেষ আশা তার নেই একেবারে হতে পারে না। ক্লান্ত নয়নে স্বপ্ন তার স্মৃতির ছায়া নির্মাণ করে। একসময় আকাশ মেঘহীন ছিল, বৃষ্টির নির্ণয়ে প্রেমের পরিচয় ছিল, শ্রুতিগত ছিল গানের সুর কিন্তু সব যখন হারিয়ে গেল তখন আবার প্রকৃতির চিরায়ত সম্পন্নতার মধ্যে কবি আত্মসংবরণের সন্ধান করলেন। আলোর প্রসন্নতা বর্তমান মুহূর্তে যদি নাও থাকে তবুও স্মৃতিচৈতন্যে বাঞ্চিত অতীতের গুঞ্জরণ কানে আসে, দীঘির পানিতে চাঁদের ছবি চোখে ভাসে দিনের বেলায় আকাশে সূর্য পরিক্রমাও অতীতের মতো।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ছে কারণ আহসান হাবীব ও আমি যখন দেশবিভাগের পূর্বে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে চাকুরি করি তখন প্রায়শই প্রেমেন্দ্র মিত্র সেখানে আসতেন। নানা আলাপ আলোচনা ছাড়াও কবিতা নিয়ে আলোচনা হতো। তিনি আহসান হাবীবের কবিতার প্রশংসা করতেন। বলতেন, ‘সর্বত্র যখন বিক্ষোভ তখন আহসান হাবীবের কবিতার মৃদু ও লঘু স্পন্দন আমাকে আনন্দ দেয়।’ তিনি কবিতার যে নিভৃতলোক নির্মাণ করেছেন সেখানে বিশ্রামের শান্তি আছে। তিনি সে সময় ‘প্রেম যুগে যুগে’ নামে একটি প্রেমাঙ্কিত কাব্য-সংকলন তৈরি করেছিলেন, সেখানে আহসান হাবীবের একটি কবিতা গ্রহণ করেন।
সেই সময় অর্থাৎ ১৯৪৫ এর শেষে গারস্টিন প্লেসে অল ইন্ডিয়া রেডিও প্রোগ্রামের জন্য আসতেন অনেকে, কিন্তু প্রোগ্রাম শেষে গল্পগুজবে বসতেন সরোজ কুমার রায় চৌধুরী, বিমলচন্দ্র ঘোষ, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য। প্রেমেন্দ্র মিত্রের কথা তো আগেই বলেছি। আমি এবং রণেন আচার্য- যিনি নিজেকে আচারিয়া বলে পরিচয় দিতেন, আমরা দুজন প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট এক ঘরে বসতাম। আমরা দুজন মিলে দেখতাম কথিকা, বিদ্যার্থীদের আসর ও সাহিত্য বাসর। আহসান হাবীব বিদ্যার্থীদের আসরের পরিচালক ছিলেন। গল্পগুজবে সরোজকুমার প্রায়ই রাজনীতি নিয়ে আসতেন। একদিন হঠাৎ বললেন, ‘আলী আহসান জানেন, জিন্নাহ হচ্ছেন একজন ব্রিটিশ এজেন্ট।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি জানেন কি করে? তিনি বিজ্ঞের মতো দু’নাকে নস্যি ঢুকিয়ে বললেন, আমি তো সাংবাদিক, আমার কাছে খবর আছে। আমি বললাম, এজেন্ট অর্থ দালাল? তাহলে আপনি কাদের দালাল? তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, আমি দালাল হব কেন? আমি বললাম, এ কারণে হবেন যে, দালাল ছাড়া দালালকে কেউ চিনতে পারে না। তিনি প্রবল প্রতিবাদে কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন এমন সময় বিমলচন্দ্র ঘোষ তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, জিন্নাহ, গান্ধী, নেহেরু সকলেই দালাল। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে এরা কেউ জনগণের প্রতিনিধি নন। এমন সময় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র বলে উঠলেন (বীরেনদা কখন যে ঘরে ঢুকেছেন খেয়াল করিনি), এদেশের একমাত্র অবলম্বন হচ্ছে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস। তিনি একদিন আসবেন এবং দেশকে মুক্ত করবেন। এত সব তীব্র সমালোচনার মধ্যে আহসান হাবীব নির্বিকার বসে নিজের কাজ করতেন, অংশগ্রহণ করতেন না। রাজনীতির প্রতি তিনি ছিলেন নিরাসক্ত, উদাসীন। তার নিশ্চিত নির্লিপ্ততার ফলে তাকে প্রায় চেনা যেত না। অনেক বছর পর সম্প্রতি মনে হয় তিনি অনুভব করেছেন যে বিনয় তাকে নিঃসঙ্গ করেছে, বিনয় তার জীবনে এসেছিল ব্যাধিস্বরূপ- ‘শিল্পী এবার কাঁপা কাঁপা কণ্ঠস্বরে অনেক কষ্টে উচ্চারণ করলেন, আজ এই মুহূর্তে আমি এক মারাত্মক ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত, ‘বিনয়’ সেই বাধির নাম।
শিল্পীর দেহ সামনের দিকে ঝুঁকে এলো, ক্লান্ত অবসন্ন দেহে তিনি আসন গ্রহণ করলেন। (দুই হাতে দুই আদিম পাথর) তার প্রতিবাদের ইচ্ছে ছিল কিন্তু বিক্ষোভকে তিনি প্রশমিত করেছেন। ভেবেছেন শব্দে আন্দোলিত করবেন সমস্ত ভুবনকে কিন্তু শুভ ও সৌন্দর্যের অমায়িকতায় শান্ত শ্রীকে গ্রহণ করেছেন, রৌদ্রলোকের তাপ থেকে সরে এসেছেন বৃক্ষছায়ায় এবং ভালোবাসার দৃষ্টিতে পৃথিবীর দিকে তাকিয়েছেন।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close