Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ সৈয়দ শামসুল হকের অগ্রন্থিত গদ্য > আমার উদ্বেগ ও বিশ্বাস এবং পিয়াস মজিদের প্রবন্ধ > জীবনের জ্যোৎস্নাধবল অনুবাদে সৈয়দ শামসুল হক

সৈয়দ শামসুল হকের অগ্রন্থিত গদ্য > আমার উদ্বেগ ও বিশ্বাস এবং পিয়াস মজিদের প্রবন্ধ > জীবনের জ্যোৎস্নাধবল অনুবাদে সৈয়দ শামসুল হক

প্রকাশঃ September 26, 2017

সৈয়দ শামসুল হকের অগ্রন্থিত গদ্য > আমার উদ্বেগ ও বিশ্বাস  এবং পিয়াস মজিদের প্রবন্ধ > জীবনের জ্যোৎস্নাধবল অনুবাদে সৈয়দ শামসুল হক
0
0

[সম্পাদকীয় নোট : আজ কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও অনুবাদক সৈয়দ শামসুল হকের (১৯৩৫-২০১৬) প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর স্মরণে প্রকাশিত হলো তাঁরই লেখা একটি দুষ্প্রাপ্য অগ্রন্থিত রচনা। আমাদের নাট্যচর্চা আর থিয়েটারের  প্রতি সৈয়দ হকের যে তীব্র গভীর ভালোবাসা ছিল, আমাদের নাট্যচর্চাকে যে তিনি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে নিরন্তর কাজ করছিলেন, ১৯৮২ সালে সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীর জন্য রচিত লেখাটি পড়লেই সেটা বোঝা যাবে। আর তাঁর এই লেখাটির পরেই এখানে তীরন্দাজে প্রকাশিত হলো সৈয়দ হকের আত্মজীবনী-গ্রন্থগুলির ওপর পিয়াস মজিদের লেখা একটি প্রবন্ধ।]

সৈয়দ শামসুল হক > আমার উদ্বেগ ও বিশ্বাস >> অগ্রন্থিত গদ্য

জানতে পেলাম থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠির মঞ্চে চারশ’ রজনী পুরা হতে চলেছে ১১ই সেপ্টেম্বর ১৯৮২ তারিখে মুনীর ও কবির চৌধুরী অনূদিত শেক্সপীয়রের ‘ওথেলো’ নাটকের আরো একটি অভিনয়ের মাধ্যমে। ব্যক্তিগতভাবে আমি স্মরণ না করে ও খুশি না হয়ে পারি না, যে, আমার ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ এই গোষ্ঠী প্রযোজনা করেছিলেন এবং ঐ প্রদর্শনী সংখ্যার চারভাগের প্রায় একভাগ জুড়ে আমার নাটকটি ছিল। আমি গর্বিত না হয়ে পারি না যে, দেশে উপযুক্ত মঞ্চ নেই নাটকের জন্যে, নাট্যচৰ্চাকে এখনো পেশা হিসেবে আমরা নিতে পারছি না, তবু, এই ঢাকাতেই কেবল তিরিশ-পয়ত্রিশটি নাট্যদল রয়েছে, তারা নিয়মিত নাটক করছে এবং কোনো কোনো দল চারশ’র মতো একটি গুরুসংখ্যায় পৌঁছাতে পারছে অভিনয়-রজনীর হিসেবে। শুধু থিয়েটার গোল্ঠী কেন?— আমি জানি, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ও এই সপ্তাহে একই তারিখে মঞ্চে তাদের চারশ’ রজনীতে পৌঁছাচ্ছে। এবং এটাও বড় আনন্দের কথা যে, বিভিন্ন নাট্যগোষ্ঠীর একাধিক নাটক শতাধিকবার মঞ্চ স্পর্শ করতে পেরেছে। আমার বড় আশা হয় যখন নাগরিকের আলী যাকের আমাকে বলেন যে, ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’ এখনো মঞ্চে আনলেই প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ হয়ে যায়; আমার বড় বিস্ময় হয় থিয়েটারের রামেন্দু মজুমদার যখনি এই পাঁচ বছর পরেও দর্শকের একই মাত্রায় আকর্ষণ করে থাকে।

আমি নিজে বিশেষ কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত নই সদস্য হিসেবে; যুক্ত আছি সবার সঙ্গে নাট্যকার হিসেবে, যুক্ত আছি এ দেশের সামগ্রিক নাট্যচর্চার সঙ্গে। থিয়েটার আমার নাটক করেছে, এবং আগামী মাসে আমার নতুন নাটক ‘এখানে এখন’ তারা করছে। নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় আগামী মাসেই আমার আর একটি নাটক, ‘নূরল দিনের সারাজীবন’ মঞ্চে আনছে। ঢাকা থিয়েটারের জন্যে এখন আমি নাটক লিখছি এবং আশা করছি আগামী ইংরেজি বছরের প্রথমভাগে তাদের প্রযোজনায় নাটকটি দেখতে পাবো। লেখাই আমার একমাত্র কাজ; এবং আমি বড় ছোট বিভিন্ন দলের নাট্যকর্মীদের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্বে আবদ্ধ; সব মিলিয়ে আমার যেন মনে হয় আমি একটি বিশাল ও উদ্যমী পরিবারের একজন সুখী সদস্য। নাট্যচর্চায় নিয়োজিত এই পরিবারের একজন হিসেবেই আমি এখন বড় উদ্বিগ্ন বোধ করছি একটি ঘটনায়, যা থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠীকে ঘিরে।

থিয়েটারের চলতি নাটক ‘ওথেলো’র একটি প্রদর্শনী, ওদের গোষ্ঠীর তিনশ’ নিরানব্বই সংখ্যক অভিনয় রজনী ছিল গত ৪ঠা সেপ্টেম্বর; পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম প্রদর্শনীর একদিন আগে যে মহিলা সমিতি মঞ্চে অভিনয় হবে; তারপর ৪ঠা সেপ্টেম্বর তারিখে পত্রিকাতেই আরেক বিজ্ঞাপন দেখলাম যে- ঐদিন নাটক হচ্ছে না এবং যারা অগ্রিম টিকেট কিনেছিলেন তারা যেন টাকা ফেরত নিয়ে যান। এর আগেও গত মাসে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন মারফত জেনেছি যে, থিয়েটার গোষ্ঠী ‘অনিবার্য়’ কারণবশতঃ নির্ধারিত তারিখে নাটক মঞ্চে আনতে পারছে না এবং তখন রামেন্দু মজুমদারের কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি যে, দলের কিছু সদস্যের কোনো কোনো আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখবার জন্যে তারা দলকে নতুন করে গঠন করবার দরকার বোধ করেছেন এবং তাই আপাততঃ নাটক হচ্ছে না। রামেন্দুর কাছে আরো প্রশ্ন করে জানতে পারি যে, নাটকের কোনো কোনো শিল্পী নির্ধারিত অভিনয় রজনীতে উপস্হিত থাকতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন একেবারে শেষ মুহূর্তে, তাই প্রদর্শনী বাতিল করা ভিন্ন কোনো পথ ছিল না। তারপর আবার প্রদর্শনী হবার ঘোষণা পত্রিকায় দিয়েও যখন প্রদর্শনীর দিন বিজ্ঞাপন দেখলাম যে, নাটক হচ্ছে না, তখন বড় বিভান্ত ও বিচলিত বোধ করি। বিস্ময় আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল মহিলা সমিতির বারান্দায়। সেখানে গিয়ে দেখি, ৪ঠা সেপ্টেম্বর তারিখের সন্ধ্যায়, শিল্পীরা মেকআপ নিচ্ছেন, টিকেট বিক্রি হচ্ছে, অর্থাৎ নাটক হচ্ছে। আবদুল্লাহ আল মামুন আমাকে বললেন যে, আজ নাটক হচ্ছে না বলে পত্রিকায় যে বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে তা থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠীর কেউ পত্রিকায় দেয়নি, কে বা কারা দিয়েছে তা কেবল অনুমানেরই বিষয়। আমি হতবাক হয়ে যাই। মনের সেই বিমূঢ় অবস্থা এই এক সপ্তাহ পরেও আমার কাটেনি। আমি ভাবতেই পারি না, এবং ভাবতে আমি চাই না যে, গ্রুপ থিয়েটারের মতো চেতনার অন্তর্ভুক্ত হয়ে এবং এই অনুপ্রাণিত নাট্যচর্চার সময়ের মধ্য বাস করে, কেউ এ ধরনের জাল বিজ্ঞাপন ছেপ একটি নাটকের অভিনয় এভাবে বানচাল করবার কথা কল্পনাও করতে পারেন। আমরা কি তবে সত্যি সত্যি জাতি হিসেবে অধঃপতিত? বিকারগ্রস্ত? আশাহীনভাবে চিকিৎসার অতীত? নইলে, বাংলাদেশের মতো দেশে নাটক যেখানে আমাদের অন্ন দিতে পারে না তবু আমরা নাটক করি, নাটক যেখানে মঞ্চস্থ হবার মতো মঞ্চ পায় না তবু আমরা মঞ্চে আসি, স্বাধীনতার পর এই দশটি বছর ধরে কেবল ঢাকা শহরেই যেখানে কমবেশি পাঁচশ মানুষ আমরা জাগতিক অর্থে লাভহীন একটি কর্মকাণ্ডে জড়িত আছি এবং আশার সঙ্গে আছি, আনন্দের সঙ্গে আছি, প্রেরণার সঙ্গে আছি, সেখানে এ ধরণের একটি ঘটনা কি করে ঘটতে পারে?

থিয়েটার নাট্যগোষ্ঠীর ভেতরে কি ঘটেছে না ঘটেছে আমি জানতে চাই না, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখবার জন্যে তারা কি করছেন না করছেন সেটাও তাদেরই ব্যাপার, কিন্তু এই যে জাল বিজ্ঞাপন ছাপা হলো, এটাকে আমি আর একটি বিশেষ দলের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে ভাবতে পারছি না; আমি মনে করি দেশের প্রতিটি নাট্যকর্মীর শংকিত হবার মতো একটি দুর্ঘটনা এটি, এবং সাবধান হবার মতো!

আমি নাটক ভালোবাসি, নাটকের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি ব্যক্তি আমার ভাই অথবা বোন; আমি আগেই বলেছি, এই বিশাল একটি পরিবারের ভেতরে আমি বাস করি; এবং পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের একজন হিসেবে আমি অপর সবার কাছ থেকে অশেষ শ্রদ্ধা ও প্রীতি পেয়ে আসছি; আজ আমি সেই ভালোবাসার জোরেই অজ্ঞাত-পরিচয় সেই ব্যক্তিদের কাছে অনুরোধ করছি- এ দেশ বড় হতভাগ্য, আর তাকে বিড়ম্বিত কোরো না; নাট্যচর্চার মতো গণমানুষের অন্তরস্পর্শী কর্মকাণ্ডকে তোমরা উপদংশ জর্জরিত কোরো না। আমরা তো রাজনীতিকে বহ আগেই পঁচা পাঁকের ভেতর নামিয়ে এনেছি; আমরা কি শিল্পচর্চাকেও সেই স্তরে নামিয়ে আনব? আমরা কি তবে সত্যি সত্যি অবনত বলেই আমাদের সমস্ত কিছুকেই আমরা এভাবে অবনত করে চলি? কিন্ত এ কথা যে আমি বিশ্বাস করি না এবং আমি জানি এ কথা আমাদের এই বিশাল পরিবারের কেউ বিশ্বাস করে না, এবং বিশ্বাস আমরা করি না বলেই আমরা এখনো সক্রিয়, এখনো তাই লিখি ও লিখব, গান করি ও করব, নাটক করি ও করে যাব।

[সচিত্র সন্ধানী, ১৫ শ্রাবণ ১৩৮৯, ১ আগস্ট ১৯৮২]

পিয়াস মজিদ > জীবনের জ্যোৎস্নাধবল অনুবাদে সৈয়দ শামসুল হক >> প্রবন্ধ

ধারাবাহিক স্মৃতিকথা লেখেননি সৈয়দ শামসুল হক। তবে আমার স্কুল শীর্ষক অনুপম স্মৃতিগদ্য থেকে পঞ্চাশ দশকের সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের স্মৃতিভাষ্য তিন পয়সার জ্যোছনা-তে আত্মস্মৃতিসূত্রে সমাজসমষ্টি যে অপরূপ-অনন্যতায় প্রকাশিত তা সত্যি বিস্ময়াবহ। তাঁর দার্শনিক আভাময় স্মৃতিলেখ প্রণীত জীবন – এর সমান্তরালে পাঠ করতে হবে হে বৃদ্ধ সময় নামের অসমাপ্ত আত্মকথাকেও ।

আমার স্কুল (২০০৪) তাঁর আত্মজীবনীর এক মুক্ত পর্যায়। স্কুলের প্রস্তাবনায় লেখকের শৈশব-কৈশোর ধরা আছে এখানে। জন্মশহর কুড়িগ্রামের মনোহর পরিচয় তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন আবার সেই শহরের সমান্তরালে নিজের বেড়ে উঠা, শিক্ষা লাভ ও আগামীর হাতছানিও টুকে রেখেছেন –

কুড়িগ্রামে আমার জন্ম । মানচিত্রে বাংলাদেশের ছবিটিকে দেখায় যেন ল্যাজ ঝোলা এক পাখি। উত্তরে রংপুর, দিনাজপুরে তার ঝুঁটি, দক্ষিণে টেকনাফ পর্যন্ত ল্যাজ ঝুলিয়ে, নীল সাগরের দাঁড়ে পা রেখে সে বসে আছে সবুজটি হয়ে। তার ঝুঁটির পেছন পালকের কোথাও আছে কুড়িগ্রাম।

কলকাতার কাগজে স্বপনবুড়ো স্বাক্ষর করা নামটি যে বিরাট বিশ্বের স্বপ্ন এঁকে দিয়ে যায় সৈয়দ শামসুল হক ওরফে বালক বাদশার বুকে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় এখান থেকে। কুড়িগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার আনন্দ-উপচারে যেমন বর্ণিল এই বই তেমনি রঙ্গরসিকতা, লোকছড়া, প্রবাদ ইত্যাদির উল্লেখেও বিশিষ্ট। বাক্য ও ভাষা শেখার অভিনব পাঠদানে প্রদ্যোৎ বাবু যেমন স্মরণীয় হয়ে থাকেন তেমনি কয়েক মাস ক্লাস করানো ভোলা দা’র বর্ণনায় জ্যোৎস্নারাতে রংপুরের কারমাইকেল কলেজের গল্প পাঠকের মন হরণ না করে পারে না-

একদিন জ্যোৎস্নার ভেতরে সারারাত তারা হস্টেলের ছাত্ররা মাঠের ওপরে বসে গল্প করেছেন। বললেন, জানিস জোছনারও জল হয়! সেই জল চোখে না দেখা যায়। কিন্তু সেই জলে শরীর ভিজিয়া যায়। নদীর জলে ভিজিলে কাপড়ে-চোপড়ে শরীর ভারি হয়া যায়, জোছনার জলে শরীর হালকা হতে হতে এমন হয় যে মনে হয় আকাশে উড়িয়া যাঁও।

আবার স্বাস্থ্যশিক্ষার ক্লাসে অধরবাবু ‘মানুষ অভ্যাসের দাস’ এই বাক্যবন্ধে ‘দাস’ শব্দের অর্থ জিগ্যেস করায় যখন বলেন, ‘দাস মানেই গোলাম, চাকর। গলায় দড়ি বাধা গরু। যেমন, ভারতবাসী। ব্রিটিশের গোলাম, ব্রিটিশের দাস। এই ভারতে ভারতবাসীর চেয়ে আর কেউ নয় এত দূর পর্যন্ত দাস!’ তখন স্বাস্থ্যের ক্লাস যেন হয়ে উঠে যেন পরাধীন ভারতের ছাত্রদের কাছে পৃথিবীর স্বাধীন পাঠশালা।

ক্লাস সিক্সে যখন ওঠেন সৈয়দ শামসুল হক তখন ‘ঝপ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হয়ে গেল’। যুদ্ধ থামা-শহরে দুঃখের বান ডাকে। কাপড় বাড়ন্ত, তেল দুষ্প্রাপ্য, চাল দুর্লভ, কাগজের অভাবে পাঠ্যবই ছাপা হয় ঘুড়ির কাগজে। ক্ষুধা-পেটে বালক শামসুল হক সামনে পেয়েছেন শুধু আলুসিদ্ধ। তবু পড়া চালিয়ে যান কারণ তিনি জানতেন ‘রাজা নিজের দেশে সম্মান পান, বিদ্বানের সম্মান পৃথিবীর সর্বত্র’।

সৈয়দ শামসুল হক প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা সম্পন্ন করেননি কিন্তু নিজের স্কুল নিয়ে এ আন্তরিক গদ্যে নিজেই বলেছেন-

জীবনে কোন পরীক্ষায় কোনো স্থান অধিকার করতে পারি নি আমি। কোনো দুঃখ নেই তাতে। ভালো লাগে ভাবতে যে, বিদ্যালাভের অধিকারে আছি এখনো। স্কুল ছেড়েছি সেই কবে। স্কুল এখনো বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি। স্কুলের পড়া শেষ করেছি, নিজের পড়া এখনো শেষ করতে পারি নি। এক জীবন কেন, শত জীবনেও পড়া কখনোই শেষ হবার নয়।

সম্প্রতি তোমাকে লক্ষ করিয়া আমি বিস্ময়াপন্ন হইলাম। তোমাকে ঠিক চিনিয়া উঠিতে পারিলাম না। সন্দেহ হয় আমিই তোমার জন্মদাতা কি-না। বোধ করি জগৎও তোমাকে জন্ম দিয়াছে। জগতের ভাগই অধিক বলিয়া দেখিতে পাই। পিতা হিসাবে আমি নিমিত্তমাত্র।

আত্মজৈবনিক গ্রন্থ প্রণীত জীবন (২০১০)-এর প্রারম্ভাংশে সৈয়দ শামসুল হক নভেম্বর, ১৯৫৩ তারিখে তার কাছে পিতার লিখিত পত্র স্মৃতি থেকে উদ্ধৃত করেন।

আমরা বলি, সন্তানের মধ্যে পিতার চেয়ে জগতের ভাগ বেশি হয়ে উঠলেই একজন মানুষের আত্মজীবনী লিখতে হয়। কারণ পিতা-মাতা যেমন সন্তানকে জন্ম দেয় তেমনি এই পিতৃমাতৃদত্ত জন্মের পর অজস্র মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একজন শিল্পীর নতুন জন্ম ঘটে। তখন প্রয়োজন ঘটে তার জীবনের আলো অন্ধকার জন-ঔৎসুক্যের কাছে মেলে ধরার।

না, প্রথাসিদ্ধ আত্মজীবনী সৈয়দ হক রচনা করেননি। তাই দেখব ‘শূন্য ক্যানভাসে প্রথম লেখন’ এবং ‘যাত্রাপুস্তক’-এর ন্যায় স্মৃতিসংশ্লেষি রচনার পাশাপাশি বালক, তুমি একদিন, বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালা এবং আমার শহর কাব্যের নির্বাচিত অংশ মিলেমিশে তৈরি হয়েছে প্রণীত জীবন-এর অবয়ব। শিল্পীর জীবন আর সৃষ্টি যে একই জিনিসের দুই রকম উৎসারণ- সৈয়দ হক তা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।

আমার যাবৎ লেখাই হচ্ছে জীবনের ভোক্তা ও দর্শক এই দুজনের যুগলবন্দী রচনা। অন্যভাবে, আমার সকল লেখাই হচ্ছে জীবনপূজা নিবেদন ও সেই পূজাগ্রহণের বিবরণ। শিল্পও আসলে তা-ই। শিল্প! শিল্পের ভেতর দিয়েই জীবনকে আমি অনুভব করেছি; যা কিছু দেখেছি ও জেনেছি সবই আমি শিল্পে অনুবাদ করে নিয়েছি; সেখানেই শেষ না, আমার পূর্ববর্তী ও সমসাময়িকদের কারো কারো অনুবাদেও আমি জীবনের স্বাদ উল্লসিত জিহ্বায় গ্রহণ করেছি।

হ্যাঁ, জীবনকে কোনোভাবেই সৈয়দ হক শিল্প-বিযুক্ত করে দেখেন না। নিজ জীবনের কথা বলতে গিয়ে তাই বারংবার আশ্রয় নেন সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র, রাজনীতি, দার্শনিক- এমন নানান ক্ষেত্রের শিল্পঋদ্ধ মানুষের জীবন ও সৃষ্টির। যেমন- যিশুখ্রিস্ট, গৌতম বুদ্ধ, রবীন্দ্রনাথ, জর্জ বার্নার্ড শ, আর্থার কনান ডয়েল, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, আইজাক বাশেভিস সিঙ্গার, শরৎচন্দ্র, ইউজিন ও’নিল, এলিয়ট, বিভূতিভূষণ, গীতগোবিন্দ, ইয়াসার কামাল, আলবেয়ার কামু, নজরুল, ওমর খৈয়াম, টেনেসি উইলিয়ামস, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাজ্ঞী নূরজাহান, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু কিংবা চিত্রপরিচালক কামাল আমরোহী প্রমুখ অনেকেরই জীবন ও সৃষ্টির প্রসঙ্গে-অনুষঙ্গে প্রণীত জীবন-এর পৃষ্ঠাগুলো ভাস্বর।

এভাবে ব্যক্তির জীবন স্পর্শ করতে চায় বৃহত্তর জীবনকে। আবার ব্যক্তি বলতে শুধু লেখকের নিজের জীবনই নয় বরং তার অভিশপ্ত পূর্বপুরুষ গোমর, পিতামহ রইসউদ্দিন, পিতা ডা. সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন, মাতা সৈয়দা হালিমা খাতুন এমনকি শৈশবে দেখা পতিতা শান্তিবালারও জীবন। কারণ উপন্যাসের চরিত্রের মতোই সৈয়দ হক নিজ জীবনের সমান্তরালে ছায়াচিত্রের মতো অঙ্কন করে চলেন এদের সবারই মুখচ্ছদ এবং তার জীবন থেকে এদের কাউকেই পৃথক করে দেখার সুযোগ নেই।

‘এখানে আমি কী করছি?’ শীর্ষক এক গুপ্তদর্শন তার পিতা সিদ্দিককে যেমন কলকাতার নাখোদা মসজিদে সর্বস্ব হারানোর পর তাড়িয়ে বেড়িয়েছে সারাজীবন তেমনি তার সন্তান সৈয়দ শামসুল হকও যেন এ দর্শনেরই নিষ্ঠ উত্তরবাহক। শিল্পী হিসেবে তিনি জানেন এ জীবন দোয়েলের, ফড়িঙের। এ জীবন অচরিতার্থতার। এখানে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি মানুষের করার কিছু নেই; পঞ্চভূতে নিজের বিলীনদশা দেখে যাওয়া ছাড়া। তবু এক অজ্ঞাত কারুবাসনা নিরবধি কাল আর বিপুলা পৃথিবীর সব শিল্পীকেই ধাবিত করে এই জীবনের দিকে।

সৈয়দ হক তেমনই শিল্পীমানুষ যিনি জীবনকে মনে করে দেহের, হৃদয়ের, অনুভবের, ইতিহাসের, সৃষ্টি ও অস্তিত্ব বিষয়ে দার্শনিক সান্নিধ্য রচনা। আর এ জীবন কোনোভাবেই মৃত্যুবিরহিত নয়। কারণ মৃত্যুর পরম্পরা পেরিয়েই তো শিল্পীর কাঙ্ক্ষিত জন্মান্তর-

আমার প্রথম জন্মক্ষণটি তো তারিখের ব্যাপার। মৃত্যু যখন হবে মৃত্যুর তারিখটিও বিশুদ্ধ তারিখেরই ব্যাপার হয়ে থাকবে। এই দুই তারিখ নিয়ে কোনো বিতর্ক বা কল্পনার অবকাশ থাকবে না। কিন্তু মধ্যভাগে আমি যে অবিরাম মরেছি ও জন্ম নিয়েছি- এখনো যে মৃত্যু আরো হবে না কে বলতে পারে?

এ আত্মজৈবনিক রচনার পটে আমাদের মৃত্তিকার ইতিহাসের নানা বরণ সম্পাতও ঘটে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মিলিটারি কনভয়, গোরা সৈন্যের চলাফেরা, দুর্ভিক্ষের ছায়া মিলিয়ে যেতেই আসে সাতচল্লিশ, দেশভাগ; সাধারণ মুচি-বৌ থেকে শুরু করে বাল্যবন্ধু শ্যামল-পরিমলদের দলে-দলে দেশত্যাগের মিছিল-

ঝাপসা চোখে তাকিয়ে দেখি শূন্য ঘরবাড়ি।

মস্ত তালা-ঝুলছে তালা-পরিমলদের বাড়ি।

‘প্রণীত জীবন ॥ পূর্বাপরকথা’ শিরোনামে তার তিনটি কাব্যগ্রন্থ এ বইয়ে ব্যাখ্যাহীনভাবেই গ্রথিত হয়েছে। ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন। কারণ উল্লিখিত কাব্যত্রয়ে সৈয়দ শামসুল হক এবং তার সময়-সমাজ-দেশ-বিশ্ব ও মানুষ-প্রকৃতি বৃহদার্থে সংস্কৃতি ইত্যাদি নানান কিছুর কেলাসন লক্ষযোগ্য। দেখব, এক কৃষ্ণকালের চিত্র এঁকে চলেছেন কবি সৈয়দ শামসুল হক তার কবিতার তুলিতে। যে কালের অনিবার চক্রে বাঁধা ব্যক্তি কবি থেকে শুরু করে গোটা পরিপার্শ্ব। এমনই কাল যখন পূর্ণিমাকে যথাযথ ঠাহর করা যায় না। কিন্তু আবার তারই কবিতাভাষ্যে দেখি সময় থেমে থাকে না। সময় অগ্রসরমান। পথে পথে পাথর উজিয়ে সে সামনে চলার রসদ সঞ্চয় করে। কিন্তু পথে তো পাথরের মতো পলি বিছানো নেই। তবে ভয় কী! কৃষ্ণকালভেদী মানবচৈতন্য জাগ্রত। তাই বাংলায় বছরে বছরে বিদ্রোহ ফিরে আসে। যুথবদ্ধ মানুষের মুষ্টি সময়কে এগিয়ে নেয়। চারদিকে মুহুর্মুহু ভাঙন। ব্যক্তির ভেতরে অনবরত ভাঙচুর। সমস্ত মানবিক সুকৃতি ভাঙনের শব্দ শুনি। সবকিছু ভেঙে পড়ার ভেতর আবার উঠে দাঁড়াবার বেগ আসে। মানুষের বিদ্রোহী সত্তা সে বেগ সঞ্চার করে। প্রণীত জীবনভুক্ত কাব্য তিনটির মধ্য দিয়ে সৈয়দ হক আত্মতা-যৌথতার বিশ্বস্ত রেখাচিত্র প্রণয়ন করেছেন। সব কথা ও কোলাহল ছাপিয়ে কবির অভীষ্ট উচ্চারণ-

জন্মে জন্মে বারবার

কবি হয়ে ফিরে আসবো আমি বাংলায়।

এ চরম অপ্রথাগত আত্মকথনে আমরা দেখছি মহাযুদ্ধ, দেশভাগ ইত্যাদির করালঘূর্ণিতে বেড়ে ওঠা এক বালকের সংগ্রাম। নিজের মায়ের দুঃখ যেমন তাকে ব্যাকুল করে তেমনি সে তার দুঃখিনী দেশমাতা বাংলাকে অনায়াসে বুকের ভেতর প্রতিস্থাপনক্ষম। আপনজনের দৈহিক মৃত্যু থেকে শুরু করে চতুর্পার্শ্বের অজস্র ক্ষয় আর মালিন্যের রেখা মাড়িয়ে এ বালক শুধু কবি হতে চায়। কবি বলেই তার জন্ম থেকে জন্মান্তর হয়। আর এক জন্মে সম্ভব না হলে নতুন নতুন জন্মে তার দুঃখিনী মা আর দুঃখিনী স্বদেশের মুখ শব্দে-ছন্দে ভাস্বর করার দায় বার্তায় তার ওপর। কবির করোটিতে চলে এক অদ্ভুত রসায়ন। সে রসায়নে ব্যক্তি আর সমষ্টির মধ্যে সমস্ত বিভাজনকারী রেখা বিলুপ্ত। এভাবে প্রণীত জীবন আত্মজীবনীর  প্রথাগত ছক ভেঙে দেয়। সৈয়দ হক যেমন মনে করেন রবীন্দ্রনাথের আত্মজীবন হচ্ছে তাঁর রচনাসকল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আত্মজীবন তাঁর প্রবর্তনায় উত্থিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ঠিক তেমনি সৈয়দ শামসুল হকের সমস্ত শিল্পসৃষ্টির মাঝেই তাঁর জীবনকথা সুব্যক্ত; প্রণীত জীবন এক সূত্রধর মাত্র।

সৈয়দ শামসুল হক তাঁর তিন পয়সার জ্যোছনার (২০১৪) যতি টেনেছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এমত দার্শনিক অভিজ্ঞানে যে- জীবন শুরু আর শেষের শাদা পর্দাময় এক চলচ্চিত্র মাত্র। মধ্যিখানের ছবিটা থেকে যায়, বয়ে যায় স্মৃতিসমুদ্দুরে। জীবনের শাদা পর্দা তাঁর কাছে ঠেকে জ্যোছনার ধবলসম যা মানুষজীবনের ‘অবিরাম ঝরে পড়া ধবল দুধ আসলে।’

ঠিক এমন প্রেক্ষা থেকেই ফিরে তাকাতে চাই এই মহার্ঘ্য গ্রন্থের পানে যেখানে ব্যক্তিলেখকের সূত্রসারে ধরা দেয় আমাদের সাহিত্যশিল্পের সমষ্টিসময়। না, সৈয়দ হকে সময় মানে সন-তথ্যের শুষ্ক সারণি তো নয়; বরং এক নিপুণ চলচ্ছবি যেন। স্মৃতি-বয়ানের এক একটি রেখায় কী নিরুপম আঁকা হয়ে যায় এক সম্পন্ন ক্যানভাস। অতঃপর আমরা পাঠকসকল অক্ষরে বোনা এই চিত্রমঞ্জরির সমুখে অনুধাবন করি বিশ শতকের সেই পঞ্চাশের দশক। সাহিত্য-সংগীত-চিত্রকলা-রাজনীতি আর মূলাধারে ফেলে আসা সমগ্র স্বদেশেরই এক বিশ্বাস্য প্রতিমা যেন দর্শন করতে থাকি। না, ইতিহাস-লিপিকারের গতানুগামী দায়িত্বে নিতান্তই অনীহ সৈয়দ হক; আমরা বলি-ইতিহাস এসে বরঞ্চ কাকলি শুরু করে এই স্মৃতিরেখমালার কলমনেপথ্যে।

তবে ইতিহাস আর স্মৃতিনিচয়ের বিপ্রতীপে এ তো পঁচিশ অধ্যায়ী এক উপন্যাসেরও নাম, কথক-চরিত্র সৈয়দ শামসুল হককে বাবা সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন যেখানে সতর্ক করেন এই বলে যে, ‘লেখক হলে তুমি না খেয়ে মরবে, তোমার পাজামা থাকবে ময়লা, তোমার যক্ষ্মা হবে, সুরায় মাতাল তুমি নর্দমায় গড়াবে।’ সেই পিতাই আবার পুত্রের লেখা-ছাপা পত্রিকা হারানোর শোকতীব্রে বলে ওঠেন- ‘আমার বাদশার নামটাই শুধু ছাপা দেখেছিলাম, পড়া আর হলো না!’

এই যেমন বইয়ের একটা দিক আবার একজন একচ্ছত্র ফজলে লোহানীকে ফিল্মি চরিত্রের চেয়েও অধিক চাঞ্চল্যে সুভাস্বর দেখি সৈয়দ হকের কলমের ব্যঞ্জনায়। বিখ্যাত কথাকার শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে তাঁর এক জীবনীকার যেমন ‘আওয়ারা মসীহ’ বলে অভিষিক্ত করেছেন ঠিক তারই বাংলা অনুবাদে ‘ছন্নছাড়া মহাপ্রাণ’ অভিধায় যেন এই বই পাঠ-পাঠান্তে আমরা সম্বোধন করে উঠি ফজলে লোহানী নামের আমাদের বিস্মৃত এক পুরোধা-আধুনিককে।

সাহিত্যগৃহের কথা বলেছেন লেখক। এই ঘরের দিকে যাওয়ার পথে কত বিচিত্র বাহির যে মূর্ত এখানে! নেহায়েত কৌতুহলে হানা দিলেও কেউ দেখবে কাসবা-গুলসিতান-মিরান্ডা-মধুদার কেন্টিন-রেক্স-বিউটি-মেজদার বিশ্রামালয়-মতিভাই রেস্টুরেন্ট-শাহবাগ হোটেল-রিভারভিউ ক্যাফে-গ্রীন হোটেল-গোবিন্দধাম খোশমহল-ক্যাপিটাল-ইসলামিয়া রেস্টুরেন্ট কিংবা চু চিন চাও রেস্তোরাঁয় চা-কফির কাপে টুংটাং, বেশুমার আড্ডা, কবিতার নতুন কুঁড়ি কী গল্প-উপন্যাসের খসড়া থেকে শুরু করে প্রথম প্রেমের ফাল্গুনী উদ্গমে ভরা এক সুব্যাপ্ত সরাইখানার অংশ যেন এরা। আর ভিনদেশি পর্যটকের মতো বইয়ের পাতায় ভর দিয়ে লেখকের এই জীবন-সরাইখানায় কখনো হানা দেয়-হেমিংওয়ে, সমারসেট মম, এরিখ মারিয়া রেমার্ক, আর্থার কোয়েসলার, আর্থার কনাল ডয়েল, মুলকরাজ আনন্দ, অল্ডাস হাক্সলি, ম্যাক্সিম গোর্কি কিংবা কার্ল মার্ক্স পর্যন্ত। আর একটু ভিন্ন ধরনে সৈয়দ মোহাম্মদ পারভেজ থেকে কামাল আমরোহীর মতো নামজাদা চলচ্চিত্রকারও এসে হাজির হন সৈয়দ হকের স্মৃতিসরাইশালায়; কামাল আমরোহী যেন তাঁর মীনাকুমারী-মধুবালা আর অশোককুমার, আনারকলি, মহলসমেত গুঞ্জরণ করে উঠেন ‘আয়েগা আয়েগা আনে ওয়ালা’ সুররনণে।

আবার ব্যক্তি ও বন্ধবৃত্ত ছাপিয়ে বৃহত্তর বোধেরও ইঙ্গিতবাহী হয়ে উঠে সৈয়দ শামসুল হক বিরচিত তিন পয়সার জ্যোছনা। এই যেমন হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত একুশে ফেব্রুয়ারী কিংবা দাঙ্গার পাঁচটি গল্প প্রকাশ-নেপথ্যের গল্পগাথাও শোনা যায় এখানে। শুধুতো ঘটনা নয়, ঘটনায় নিহিত নন্দনও সৈয়দ হক টুকে রাখেন তাঁর কলমে- ‘…দাঙ্গার পাঁচটি গল্প, এক রঙা কালো মলাটে সে বই- হাসানের এমনই ছিল নন্দনবোধ যে বিষয় বুঝেই প্রচ্ছদের রঙ তাঁর ভাবনায় আসত-সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো ঘটনার রঙ তিনি ঘোর কৃষ্ণই বেছে নেন’। একটি মন্তব্যলেখনে তারপর হাসান হাফিজুর রহমানই মূর্ততা পান না শুধু; সঙ্গে সাকার হয় মনুষ্যত্বের হতমান কৃষ্ণ পরিস্থিতিতে বাংলার লেখকশিল্পীদের কৃষ্ণাতিক্রমী অঙ্গীকারের ছবিও।

তিন পয়সার জ্যোছনা প্রকৃতার্থে এক উন্মোচনরেখা। জ্যোছনার বিদ্যুত যেমন দিগন্ত-বিশালকে জানান দেয় খণ্ডে-বিখণ্ডে; এই বইও নানান হ্রস্বদীর্ঘে পূর্ণ করে লেখকের জীবন ও শিল্পাবয়ব। যেমন বন্ধু আবিদ হুসেন কর্তৃক ‘সৈয়দ হক’ নামকরণের ইতিবৃত্ত জানতে পারি যা বন্ধুর ব্যক্তিক সম্বোধন ছাপিয়ে এখন লেখকের পারিবারিক-সাহিত্যিক জীবনে পর্যন্ত বহমান আবার বুনোবৃষ্টির গান নামে কখনো না বেরুনো কাব্যগ্রন্থের আদিঅন্তের পাশাপাশি বন্ধু-চিত্রকর মুর্তজা বশীরের তিনদিনে লেখা আলট্রামেরিন উপন্যাস রচনার কাহিনিও জাজ্বল্য হয় তাঁর স্মৃতি-অনুপমে। কিংবা ফজলে লোহানীর ডোর অব দ্য সেভেন্থ ইয়েলো নামে অলেখা কিন্তু চিরস্বপ্নরচিত উপন্যাস-পরিকল্পনার বিন্দুতে কত সিন্ধুভ্রমণ হয় আমাদের-

…লোহানী হতাশ্বাস, বললেন,- না, সৈয়দ হক, বাংলায় আর আমার কিচ্ছু হবে না, ভাবছি ইংরেজিতে সাহিত্য করার কথা। ইংরেজিতে একটা উপন্যাস লিখব বলে ভাবছি, নাম দেব ‘ডোর অব দ্য সেভেন্থ ইয়েলো’। এর জন্যে ঢাকায় আমি আর নেই, এ দেশে আর কিচ্ছু হবে না, আমাকে বিলেতে যেতে হবে। শুনে আমি গুম হয়ে বসে থাকি।

‘ডোর অব দ্য সেভেন্থ ইয়েলো’- সপ্তম হলুদের দরোজা!- রঙটার কথা ভাবা বুঝি চিত্রকরদের নিবিড় সঙ্গের কারণেই, মনে হয় একজন চিত্রকরই হবে এ উপন্যাসের নায়ক, বড় ভালো লাগে শিরোনামটি, যদিও অর্থটা ঠিক ঠাহর করতে পারি না, ইংরেজিতে লেখার ব্যাপারটাও খুব বড় করে আমাকে টলায় না, আমি জানি আমি বাংলার আর বাংলাই আমার ভাষা।

স্বপ্ন আর বাস্তবের এমনামন বহুতর সংশ্লেষণের জলছাপ-তৈলছাপে মুহুর্মুহু চিত্রাভ এই বই। যেখানে বইয়ের প্রুফ কাটা থেকে শুর করে সাম্প্রদায়িক বিভাজনে দু টুকরো করে দেশ কাটা পর্যন্ত অতি স্বাভাবিকে প্রকাশমান।

তাঁর গল্পপাঠের পর যে বন্ধু খালেদ চৌধুরীর রূঢ় মন্তব্যের অভিঘাতে এক সন্ধ্যায় নিজ কলমের উপর ‘ঘেন্না’ চলে এসেছিল বলে জানান সেই খালেদ চৌধুরীকে খণ্ডিতভাবে নয় বরং তার চরিত্রের পুরো দিকটি আকার দেন এমনতর মূল্যায়নে-

নিজে এক অক্ষর লেখেন না খালেদ, এর জন্যে আমরা তাঁকে সক্রেটিসের সঙ্গে তুলনা করতাম, যিনি নিজে কিছুই লেখেননি, কিন্তু সক্রেটিসের মতো ভাগ্যবান তিনি নন, পাননি প্লেটোর মতো শিষ্য যিনি, গুরুর কথাগুলো লিখে রাখবেন, অথচ তখনকার সব তরুণ লেখকই ছিলেন তাঁর প্রাণের বন্ধু, শুধু তখনকার কেন- পরেরও তরুণেরা তাঁর সঙ্গে আড্ডায় হবে মিলিত, এরাই তাঁকে নামে আর নয়, ডাকবে প্রভু বলে।

বোঝা যায় মানুষকে তার রক্তমাংসের প্রকৃত সংবেদে প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী তিনি; বাহুল্য মহিমার কীর্তন বা নেতিমূলকতার কোন একদিকে টলে না গিয়ে বন্ধু-স্বজন-দূরবৃত্তের সকলকে নিরাসক্ত-নৈর্ব্যক্তিকে উপস্থাপন করেন পাঠকের পটে। প্রত্যক্ষকে প্রত্যক্ষাতীতে স্থাপনপূর্বক এমন বিচারবোধ বাংলা আত্মকথায় বিরলই বলতে হয়। নিজের শ্রেষ্ঠ কবিতার প্রকাশনা অনুষ্ঠানে শামসুর রাহমান যখন হাসান হাফিজুর রহমানের অকুণ্ঠ ঋণ স্বীকার করেন তখন বন্ধুর প্রীতির আসন থেকে সৈয়দ হক রাহমানকে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠান দেন ‘শামসুর রাহমানের এমন ঋণস্বীকার বাংলাদেশের সাহিত্য-সংসারে এখন পর্যন্ত একমাত্র বলেই আমি জানি।’

এই বাক্যের পর শামসুর রাহমান তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি বর্ণিলতাসহ যেন দেখা দেন আমাদের কাছে। ঠিক তেমনি ‘একজন সফল লেখকের পেছনে থাকে নিরানব্বইটি লাশ’- অগ্রজ লেখক শওকত ওসমানের এমন দর্শনচিন্তার বিস্তার তিনি বয়ে নিয়ে চলেন বইয়ের শেষ অব্ধি, অজানিতে যেন সতর্ক করে চলেন তাঁর উত্তরপ্রজন্মের লেখকসম্প্রদায়কে।

কলমকে হাতের ‘ষষ্ঠ আঙুল’ এর উপমাবদ্ধ করেছেন সৈয়দ শামসুল হক। হ্যাঁ, শরীরী আঙুলপঞ্চমী ভেদ করে ঐন্দ্রজালিক আঙুলষষ্ঠীর বলেই এমন জীবনবেদে উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভবপর হয় যে ‘ব্যর্থ হবার সফলতম পথ হচ্ছে নিজেরই পূর্ব সাফল্যের অনুকরণ।’ এভাবে বিনা-আয়াসে ব্যক্তিঅভিজ্ঞানকে সবার মান্য করে তুলেন তিনি। ক্রমাগত নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়াই যে লেখকশিল্পীর অগ্রসরমানতার অবিকল্প উপায় এই বোধ জেগে ওঠে তিন পয়সার জ্যোছনা পাঠে।

না, কোন খেদ নেই। প্রাপ্ত আর প্রাপ্যের মাঝে কোন সমীকরণ টানা নয়, বেঁচে থাকার অপরূপতায় ফেলে আসা রূপছবিসমুচ্চয় মিলিয়ে অনন্য এক ভাষ্য প্রণয়ন করে ওঠে এই বই। বিবরণমূলকতার পাহাড় নয়; এমন জীবনের অর্ন্তভাষ্য এই বই যে জীবনপাত্র ঝুঁকি-অনিশ্চয়তা-রোমান্টিকতা-সৃজনপ্রবাহ-মৃত্যু-দুঃখ-দেশভাগ-দাঙ্গা-ভাষাযুদ্ধ-মুক্তিযুদ্ধ-রক্ত-অশ্রু-স্বপ্ন-স্বপ্নচ্ছেদ-নৈঃসঙ্গ্য-লগ্নতা ইত্যাকার জীবনেরই নানা বিরোধী উপচারে প্রাণময়।

জীবন যাপন আর শিল্প যাপনকে সৈয়দ শামসুল হক আলাদা কোন তারে বাঁধেন নি- এ সাক্ষ্য পাই যখন লেখক তাঁর শিল্পী-অনুজ সৈয়দ রইসুল হকের দুর্বৃত্তের হাতে প্রাণ দিয়ে ক্যানভাসের কাছে ফিরে না আসার সঙ্গে বন্ধুপ্রিয় ফজলে লোহানীর ‘সাহিত্যে আর না-ফেরা’-কে একই শোকতুল্য করেন। শিল্পকে নীরক্ত-মূল্যহীন করে তো জীবনকেই রুঠা- ক্ষয়গ্রস্থ করে তুলছে আমরা। চরম শিল্পরিক্ত কালে বসে লেখা তিন পয়সার জ্যোছনা তাই সৈয়দ শামসুল হকের আত্মকথা-সাহিত্যকথা ছাপিয়ে হয়ে ওঠে এক অভাবিত শিল্পসন্দর্ভ। এর আলো আর ছায়ায় শিল্পসম্ভোগের আধারেই যেন আবিষ্কার করি জীবনসবুজকে।

এই বই পড়তে পড়তে উপলব্ধি হবে জীবন তো আর কিছু না তিন পয়সার মহার্ঘ্য জ্যোছনামাত্র। কেন? উত্তর দিচ্ছেন লেখক নিজেই ‘সৃজনের বড় একটা দিক হচ্ছে মাতৃগর্ভের অন্ধকারের মতো। জলমগ্ন পীত অন্ধকারে ভ্রুণের বেড়ে ওঠা, জননী ঠাহরে পান সবই, কিন্তু ব্যাখ্যা দিতে পারেন না।’

জসীমউদদীন থেকে সিকদার আমিনুল হক, কামরুল হাসান থেকে কাইয়ুম চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন থেকে গাজী শাহাবুদ্দিন পর্যন্ত কবি-লেখক-শিল্পীর সুদীর্ঘ পরম্পরার পরনকথায় ভরা মর্মছবিময় আলোচ্য বই তিন পয়সার জ্যোছনা। এভাবে সৈয়দ শামসুল হক সাহিত্যের গল্প বলতে বলতে হৃদয় থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত পরিসরের রেখা রেখে গেলেন। মহাসময় এসে অতঃপর নিশ্চিতভাবে অনুবাদ করে নিবে এই বিরল গ্রন্থের ভাবসার; প্রজন্মান্তরের পাঠক উদ্ধার করবে এর অন্তর্গত জীবনশিল্প আর শিল্পজীবনের যুগলবন্দি-বোধ। এক জীবনের গল্পে বহু জীবনের গল্পময় এই বই পড়তে পড়তে সৈয়দ শামসুল হকেরই কবিতার ভাষায় ব্যক্তিপাঠক আমরা; অতঃপর বলে উঠবো ‘আমাদের এক নয়, অনেক জীবন।’

প্রথম আলো ঈদসংখ্যা-২০১৫ তে প্রকাশিত হয় হে বৃদ্ধ সময় নামে সৈয়দ শামসুল হকের আত্মকথার শেষ পর্ব যা তাঁর ঘাসের নিচে চলে যাওয়ায় অসমাপ্তই রয়ে গেল বলা যায়, যদিও তাঁর প্রয়াণের পরপর এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। এ নিয়ে ব্যাখ্যাও তিনি দিয়ে গেছেন যার মধ্য দিয়ে অনুভবে আসে জীবন ও শিল্পের কোন আনুষ্ঠানিক পূরণরেখা সম্ভব নয় কখনই-

আমার আগেও পৃথিবী ছিল, পরেও থাকবে। আমার আগেও মানুষ ছিল, পরেও আসবে। তারা আসবে, তারা তাদের পায়ের ছাপ ফেলে যাবে । পা তুলে নেবার পরেও সব পায়ের ছাপ ধুলোয় পড়ে থাকে না, কারও কারও থাকে। আমি জানি, যখন আমি আমার পা দুখানি তুলে নেব, তুলে নেবার আগেই তার ছাপটি মুছে যাবে, কারণ আমি অসামান্য, অসাধারণ কেউ নই। এটি আমার পোশাকি বিনয় নয় যে সাধারণই ছিল আমার দিন ও সংসার। সাধারণ, কী সাধারণ আমি, এই অনুভবটির ভেতরেই আমার এ অসাধারণ বিস্ময় যে- আমিও ছিলাম।     

‘প্রতিটি শিশুর ভেতরে থাকে যিশুর সম্ভাবনা,মানুষ আসলে ময়লা জামার ফেরেশতা, জ্যোর্তিময় দেহে সংসারের ধুলো লেগে নূর ফিকে হয়ে আসে’;   লেখকের বড় বাবা সৈয়দ হায়দার আলীর এমত বচনকে তিনি মান্য করেছেন জীবনের শুরু থেকেই যেন। তাই পঞ্চাশের মন্বন্তরের মানবিক বিপর্যয় তাঁর ভেতরে পাপপুণ্য, ন্যায়-অন্যায়ের প্রথামান্য ধারণাসকল গুঁড়িয়ে দেয়। দুর্ভিক্ষ, গমের গরম রুটি, লঙ্গরখানার ভোজে ভাপ ওড়ানো হলুদ ঢলঢলে খিচুড়ি, পার্শ্ববর্তী দারোগার পরিবার, বসন্ত বিক্ষত রমণী, চার বছর বয়সে শুরু হতে দেখা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, আজাদ হিন্দ ফৌজ, রক্তের ভিতর আগুন ধরিয়ে যাওয়া সুভাষ বসু, পাট কোম্পানির সাহেবের কাছ থেকে পাওয়া রবার্ট লুই স্টিভেনসনের আ চাইল্ডস গার্ডেন অব ভার্স দেব সাহিত্য কুটিরের গোয়েন্দা গল্পবই, লাল মলাটের কালো বাইবেল, কায়কোবাদের অমিয়ধারা, নজিবর রহমানের আনোয়ারা কিংবা পিতার হোমিও মেটেরিয়া মেডিকা বইয়ের আখ্যাপত্রে লেখা বালক শামসুল হকের হ্যানিম্যান-প্রশস্তিমূলক পদ্যের বিচিত্র চালচিত্রে ভাস্বর এই স্মৃতিলেখ। উত্তরকালে তাঁর অনেক স্মরণীয় সৃষ্টির সূত্রসারেরও সন্ধান মেলে এখানে। যেমন-

বড়বাবা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রোপাগান্ডা অফিসার। তাড়া তাড়া হ্যান্ডবিল পোস্টার নিয়ে পিয়ন আসছে-যাচ্ছে। এ যুদ্ধ জনযুদ্ধ। জাপানিরা এলে ভারতবাসীকে দিয়ে গরুর বদলে মানুষ দিয়ে তারা লাঙ্গল টানাবে। পোস্টারের ছবিটিতে আঁকা-বাঙালি চাষি বলদের বদলে বলদ হয়ে লাঙল টানছে আর তার পিঠের ওপর চাবুক উঁচিয়ে আছে দাঁতমুখ খিঁচোনো এক জাপানি সৈন্য। ছবিটা মনের মধ্যে থেকে যাবে বালকের। অনেক পরে যখন সে নুরলদীনের সারা জীবন নাটকটি লিখবে, তখন এই ছবিটা তার সেই নাটকের কেন্দ্রীয় চিত্রকল্প হয়ে ফিরে আসবে।

ইদ্রিস চাচার এই স্মৃতিকথার এক উল্লেখযোগ্য চরিত্র। লেখকের বাবার একমাত্র ছোট ভাই সৈয়দ ইদ্রিস হুসাইনয়ের সূত্রে কুড়িগ্রামের কাছের স্টেশন, দূরের হিমালয় পাহাড়, ভুটানি মানুষের হাতছানির পাশাপাশি পাপপুণ্য ও জগতজীবনের অনেক গূঢ় বিষয় সর্ম্পকে তার ধারণা লাভের কথা বলেছেন এখানে, হয়তো সেই কারণেই মৃত্যুর কিছু আগে সৈয়দ শামসুল হক তার স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হককে বলেন ইদ্রিসপাপী নামে একটি নাটক লেখার পরিকল্পনা আছে তাঁর। প্রতি শীতকালে প্রফেসর বোসের সদলবলে কুড়িগ্রামে এসে ম্যাজিক দেখানোর যে স্মৃতি তিনি রোমন্থন করেন তাতে পরবর্তীকালে রক্তগোলাপ গল্পের ম্যাজিশিয়ান চরিত্রের কিছুটা ছাপ যেন পাওয়া যায়। ‘শান্তির ঘর’ কিংবা ‘বিপিনের মা’ কোন নিষিদ্ধ অঞ্চলের ইঙ্গিতরেখা অঙ্কনের বদলে জীবনের এক করুণ অধ্যায়ের অভিজ্ঞতায় বালক শামসুল হককে প্রথাগত পাপপুণ্য, ন্যায়-অন্যায়ের ধারণা মোকাবেলার শক্তি দেয় (ভাগ্যবিড়ম্বিত যে নারীরা লেখকের চাচা ইদ্রিসের ভাষায় ছিল ‘ভাতের দাসী’)। দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্য এমনি অনেক ধারণায় পুষ্ট করে ভবিষ্যতের ক্ষুধাবৃত্তান্ত উপন্যাসের লেখক সৈয়দ শামসুল হককে যিনি বাংলার ক্ষুধার্ত উত্তরাংশের নরনারীর অকথিত বুলিকে জলেশ্বরীর রূপকে ভাষা দিয়েছেন।

সৈয়দ শামসুল হক মিশ্র সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। তাই যিশু মোহাম্মদ বুদ্ধ কাউকে আমি ফেলে দিতে পারি না। সবাই আমার কাছে এক মানুষ হয়ে ওঠেন। অস্তগামী সূর্যের বিষণ্ন আকাশ ভেদ করে বারেবারেই আমার মীর নানার মুখখানা হোসেনের রক্তমাখা সন্ধ্যার মেঘের ভেতর থেকে জেগে ওঠে। তার স্বর কানে পশে কী কোমল! আমি মনে মনে বলি, একদিন আমি কুড়িগ্রাম থেকে যেখানেই যাই, যাবই তো!- সেই দেশে মাঠ নিশ্চয় পাব এই বাংলার মতো, সেখানে অমন একটা মাটির বেদি মীর নানার মতো আমিও গড়ে নেবো। নীল আকাশ, সবুজ মাঠ, পদ্মার মতো প্রমত্ত নদীর জল শব্দ, মাটির বেদি, বেদি ঘিরে বাখারির বেড়ার মাথায় লাল নীল কাগজের পতাকা-মালা, সূর্য উঠেছে, রাঙা তার আলো, নগ্ন পায়ে করজোড়ে আমার এই জীবন ঘিরে সাত প্রদক্ষিণ আমি করছি। আমি করেই যাবো।

সৈয়দ শামসুল হক চলে গেলেন ঘাসের নিচে। আমরা যারা এখনও ঘাসের উপরে, তাদের জন্য রইল মহাসময়ের কথকতায় ভাস্বর তাঁর কিছু মহার্ঘ্য স্মৃতিপুস্তক; যেসবের শব্দ ও ভাবনারাশি আমাদের জন্য করে যাবে অনাগত সব স্তব্ধতার বিশ্বস্ত অনুবাদ।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close