Home ছোটগল্প সোহাগ পারভেজ > সাফদারপুর জংশন >> ছোটগল্প

সোহাগ পারভেজ > সাফদারপুর জংশন >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ July 12, 2018

সোহাগ পারভেজ > সাফদারপুর জংশন >> ছোটগল্প
0
0

সোহাগ পারভেজ > সাফদারপুর জংশন >> ছোটগল্প

 

“শরীল কি খালি বিটা মানুষগেই থাকে। বিদেশে থাকলি বছর দুইবছরে লোকে বাড়ি আসে। তুমি কয়বার আয়িলে? আমার শরীল এই পনেরো বছর ধরে তুমার জন্যি পুষে থুয়ে শুকোয়ে গেল, তুমি কি আমার জন্যি শরীল পুষে থুয়িলে?”

যশোর এয়ারপোর্টের ডমেস্টিক ইমিগ্রেশন কমপ্লিট করে সালামতউল্লা বের হয়ে এল ক্যান্টনমেন্টের পথে। সালালাহ থেকে ১২ ঘণ্টার বাস জার্নির পর গাল্‌ফ এয়ারের সস্তার ফ্লাইটে মাস্কট থেকে দুবাই বাহরাইন ভায়া হয়ে ঢাকায় এসে অবতরণে ৪ ঘণ্টার আকাশপথে লোকাল ট্রেনের মতো ৮ ঘন্টা লেগে যায়। ৮ ঘণ্টার ক্লান্তি নিয়ে ঢাকা ইমিগ্রেশনে লেবার ক্লাস যাত্রীদের প্রতি অফিসারদের বিরুপ আচরণে স্বদেশে ফেরার আনন্দ ফিকে হতে শুরু করে। কানেক্টিং ফ্লাইটের জন্য ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পর ৩০ মিনিটের উড়ানে যশোর এসে নামার পর ক্লান্তিও ক্লান্ত হতে বাধ্য, যদি কিনা দেখা যায় তাঁর জন্য ইমিগ্রেশন লাউঞ্জের বাইরে কোনো স্বজন অপেক্ষায় নেই। কতিপয় স্বচ্ছল যাত্রীর পরিবারের লোকজন মাইক্রোবাস নিয়ে এয়ারপোর্টের পার্কিং লটে অপেক্ষা করে। সেখানে সালামতের জন্য কেউ অপেক্ষা করে নেই। বড়ভাই আকামত, ছোটভাই হেকমত এমনকি বাবা কুদরতুল্লা তো আসবেনা জানা কথা। বউ রাজিয়া অন্তত মেয়ে আকলিমাকে নিয়ে আসতে পারতো। তবে ওরাই বা আসবে কি করে? গত সাতমাস যে একটা রিয়ালও দেশে পাঠায়নি সালামত। মাইক্রো রিজার্ভ করে আসতে হলেও তো তিন হাজার টাকার দরকার।

শেষ মজুদ যা নিয়ে এসেছে তার প্রতিটা টাকা পাই-টু-পাই হিসেব করে চলতে হবে। সিএনজি চালকদের হাঁকডাক সে উপেক্ষা করে, যেহেতু যশোর শহর তাঁর গন্তব্য নয়। ৫৫ বেঙ্গল পদাতিকের সদরদপ্তর পাশে রেখে স্বাধীনতা সরণীর দুই কিলো লম্বা ৬০ ফিট প্রশস্ত পিচঢালা পথ মধ্যদুপুরের গনগণে উত্তাপ বুকে নিয়ে যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কে আড়াআড়ি যুক্ত হয়েছে। সালামত এই পথে হেঁটে মেইন রোডে গিয়ে ইজিবাইকে করে চুড়ামনকাটি বাজারে যাবে মনস্থ করেছে। সেখান থেকে লোকালরুটের মিনিবাসে চৌগাছা, চৌগাছা থেকে নসিমনে কোটচাঁদপুর, সেখান থেকে ভ্যানযোগে সাফদারপুরের বাড়িতে পৌঁছবে। এখন রমজান মাস চলছে। একমাত্র লাগেজের সাইড পকেটে পানির বোতল আছে কিন্তু প্রকাশ্যে গলা ভিজিয়ে নিতে সাহস পায়না সালামত। অদূরে পীচের ওপর রোদ্রালোকে সৃষ্ট পানি রুপের মরীচিকা, যেন তাঁর ক্লান্ত ব্যর্থ বিধ্বস্ত এবং তৃষ্ণার্ত দেহমনকে অন্যায্য বিদ্রুপে আক্রান্ত করছে। গত ১৫ বছর প্রবাসী শ্রমিক হয়ে অর্জন বা অপ্রাপ্তির খতিয়ান খতিয়ে দেখার মানসিক শক্তিও আপাতত নেই তাঁর। সাফদারপুরের বাড়িতে যেয়ে সবচেয়ে আগে একটা লম্বা ঘুম দরকার।

চুড়ামনকাটি বাজারে এসে জানা গেল মোটর মালিক সমিতির ধর্মঘটে দক্ষিণবঙ্গের সব রুটে যানবাহন চলাচল বন্ধ। অগত্যা কী আর করা, সালামত অদূরে মেহেরুলনগর স্টেশনে এসেছে, দর্শনাগামী লোকাল ট্রেন ধরতে পারলে দেড়ঘণ্টায সাফদারপুর স্টেশনে নেমে ৫ মিনিটেই বাড়ি পৌঁছে যাবে। ক্ষিধেও লেগেছে কিন্তু স্টেশনের চা-কলা পাউরুটির টং বন্ধ। ফ্লাইট ক্যাটারিংয়ের দেওয়া অল্প মশলার উপাদেয় ডিশ খেয়েছে তাও ৭ ঘণ্টা আগে। বাড়িতে পৌঁছে দু’মুঠো গরম ভাত শাকভাজা ডাল আর তাওয়ায় পোড়ানো দুটো শুকনো মরিচ পেলে মন ভরে খাবে। কী জোটে কে জানে। গত পনের দিন বাড়ির সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। যোগাযোগ থাকবেই বা কিভাবে। গত নয বছর ধরে অবৈধ অভিবাসী হয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে নানান ছুটা কাজ করে পেট চালানোর মতো আয়-রোজগার করে চলছিল সে। পনের দিন আগে ধরা খেয়ে যায় ওমান পুলিশের অভিযানে। জেল থেকেই প্লেনে তুলে তাকে পুশব্যাক করা হয়েছে বাংলাদেশে।

প্রথম ছয় বছর আকামা ঠিকভাবেই রিনিউ করতো সালামত। যে কফিলের স্পন্সরে ওয়ার্কিং ভিসা নিয়ে সে ওমান গিয়েছিল, লোকটা মোটের ওপর মন্দ ছিলো না। তিন বউ, নয় মেয়েসহ ষোল সন্তান নিয়ে বিশাল পরিবার তালাল বিন আসলামের। আসলাম আর সালামত, নামে মিল থাকায় তাকে মায়াও করতো। ইলেক্ট্রিশিয়ানের ভিসা নিয়ে সে গিয়েছিল বটে, বিদ্যুতের কাজ তো দূরে থাক, ড্রাইভিং বা সেলাইয়ের কাজও জানা ছিল না। কফিল তাকে সামাইলের এক খেজুর বাগানের মালির কাজে নিয়োগ দেয়। বেশ মেহনতের কাজ। সালামত তাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। হাজার তিনেক খেজুর গাছ দেখে দেখে শুকনো মরা ডাল ছেঁটে ফেলা, পাখির প্রকোপ থেকে আধাপাকা খেজুর বাঁচিয়ে রাখা, সময়মত গাছের গোড়ায় সেচ দেওয়া। বাগানেই ছোট্ট একটা মাটির ঘরে থাকতে হত। সেখানে প্রায় সব বাড়িতেই এসি থাকলেও মিসকিনের দেশ থেকে আসা সস্তার শ্রমিক সালামতদের ঘরে এসি ছিল না। তবে আস্তে আস্তে সেই গরমও সয়ে গেছিল। সাথে সাথে সালামতের চোখ খুলেছিল। লিগ্যাল ওয়েতে মেডিকেল টেস্ট, ভিসা প্রাপ্তি, বিমান ভাড়াসহ যেখানে একলাখ টাকার বেশি খরচ হয়না, সালামত সেখানে দালালকে তিনলাখ টাকা দিয়ে ওমানে এসেছিল। বাপ কুদরতউল্লা জমি বিক্রি করে আর ধার-দেনা করে সে টাকার যোগান দিয়েছিল। খেজুর বাগানে তিন বছরের পরিশ্রমে সেই পরিমান টাকা সে বাপকে দিতে পেরেছিল। তখন স্বপ্ন ছিল এবার যদি কিছু সহায় সম্বল জমানো যায়।

কফিলের বাগান দেখতে বার্‌কা থেকে আসে তাঁর এক বন্ধু। সালামত বাগানের এক কোণে পাথুরে মাটিতে প্রচুর সেচ আর দুই বছরের চেষ্টায় কিছু বেগুন ভেন্ডি মুলো চাষ করেছে। এসব দেখে তালালের কাছে তাঁর বন্ধু আবদার করে সালামতকে সে বার্‌কা নিয়ে যাবে। বার্‌কায় নতুন কফিল আল হাদীর ৩০০ একরের পতিত ভূমিতে দুই বছরের মাঝেই পাতাকপি, পেঁপে, করল্লা, লালশাক, লাউ, ফুলকপির বিচিত্র সবুজে অবারিত বঙ্গভূমি স্থাপিত হয়ে যায় সালামতের কুশলী হাতে। বৃহত্তর সিলেটের ছাতক, নবীগঞ্জ, জগন্নাথপুরের দেশী ভাইদের কঠোর শ্রমে সমৃদ্ধ হতে থাকে সবজীরাজ্য। সেসময় সালামত বাপকে আলাদা করে টাকা পাঠাতো, বউ রাজিয়াকে টাকা পাঠাতো, ছোটভাই হেকমতের ভার্সিটিতে পড়াশুনার খরচ দিত। তখন তাঁর নিজেরও কিছু সঞ্চয় থাকতো। এমনসময় রাজধানী মাস্কটে চালু হয় কৃষিবাজার ‘সুক মুয়ালা’। সালামতের মতো কয়েকজন উদ্যোক্তা সেখানে উঠতি ব্যবসায়ী হয়ে ওঠে। সারাদেশে বড় বড় লরিতে সবজি সাপ্লাই যেতে থাকে ভারতীয় মালিকানার ডিপার্টমেন্টাল শপগুলোতে। কি বাহারি সব নামে চালান লিখতো সালামত- খিমিজি এন্ড সন্স, দ্বারকাদাস চেইন শপ, রামদাস এন্ড সন্স।

বাংলাদেশ বিমানের মাস্কটে কর্মরত এক কর্মচারী রোকন প্রায়ই সবজি কিনতে আসতো সুক মুয়ালায়। সে একদিন সালামতের নিকট প্রস্তাব দেয় পেট্রোল পাম্পে বিনিয়োগ করতে। তাদের এক অফিসার মাস্কটে পেট্রোল পাম্প দিয়ে কোটিপতি হয়েছে। ট্যাক্সের ঝামেলা এড়াতে সাধারণ কাগজে স্বাক্ষর রেখে সালামত সেই টাউটকে বিশ্বাস করে সব জমানো টাকা দিয়ে দেয়। পরের দিন থেকে রোকন লাপাত্তা। বিমান অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল রোকন নামে অন্য একজন কর্মচারী আছে, তাঁর নাম ভাঙিয়ে প্রতারণা করেছে অপর এক অবৈধ অভিবাসী। মামলা তদন্তে তদবিরে বেশ ব্যয় করেও আর খোঁজ পাওয়া যায়নি নকল রোকনের। ওদিকে দেশ থেকে চিঠি আসে বাল্যবন্ধু রাশেদের। সালামতের বউ রাজিয়া সালামতের ছোটভাই হেকমতের সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত। মাথায় আগুন জ্বললেও সালামত তখন নিরুপায়। দেশে যাওয়ার টিকেট খরচতো নয়ই, থাকা খাওয়ার খরচও জোটানো মুশকিল হয়ে গেছে। কফিল আল হাদীকে বলে বাকীতে জমির বন্দবস্ত নেওয়া যেত, কিন্তু সেই উদ্যম আর নেই সালামতের। কোনো কাজেই মন বসেনা। সন্ধ্যায় মদ খায়, দু’ একদিন ফিলিপিনো থাই বা ইন্দোনেশিয়ার রমণকন্যাদের ছোট্ট কুঠুরিতে রাত কাটিয়ে আসে। ভিসা রিনিউয়ের সময় দেখা গেল সালামত কপর্দকশূন্য। দেশে মা মারা গেছে কিন্তু প্লেন ভাড়ার অভাবে তাঁর দেশে আসা হয়নি। ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটবিহীন সালামত এরপর এখানে ওখানে লুকিয়ে লুকিয়ে নানান ছুটা কাজ করে অনিয়মিত আয়ে পেটেভাতে টিকেছিল বাকি সাত বছর। দেশে চলে গেলে ওমানে আসার পথ বন্ধ হয়ে যাবে, দেশেও তাই যাওয়া হয়নি। তেমন রোজগার নেই এবং বউকে টাকা পাঠাতে ইচ্ছাও করেনা, শুধু মাত্র মেয়ের লেখাপড়ার কথা ভেবে অনিয়মিত কিছু টাকা পাঠাতো দেশে। মেয়ে আকলিমার এখন ১৫ বছর বয়স। সাফদারপুর হাই স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়ে। সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যায়। গ্রামে বাল্য বিবাহ যাতে না হয় সেজন্য ভার্সিটি পড়ুয়া রোকেয়ার নেতৃত্বে একটা সমিতির সদস্যও হয়েছে।

মেহেরুলনগর স্টেশনে লোকাল ট্রেনের অপেক্ষায় ক্লান্ত সালামতের আর তর সইছেনা। মেয়েটাকে সে ছবিতে দেখেছে। বাস্তবে এই প্রথম দেখবে তাঁর কলিজার টুকরাকে। যশোরের দিক থেকে একটা অয়েল ট্যাংকারবাহী মালগাড়ি আসছে। খুবই ধীরগতি থাকায় লাফ দিয়ে ইঞ্জিন-কারের জানালার পাদানিতে দাঁড়িয়ে সালামত যেন মেঘ না চাইতেই জল পেল। সাফদারপুরের প্রতিবেশী কাদের চাচা এই মালগাড়ীর চালক। দাঁড়ি পেকে সাদা হয়েছে, চাচার হাসিমুখে এখনও সেই সদা শান্তির আভা। কসরত কায়দায় তাকে ড্রাইভিং সিটের পাশে জায়গা করে বসিয়ে নিল কাদের চাচা। এখন সাফদারপুর যেতে একটু বেশি সময় লাগলেও টেনশন নেই। সালামতের ক্লান্তি কিছুটা হলেও প্রশমিত। প্রাথমিক কুশলাদি বিনিময়ের রেশ কেটে যাবার পর কাদের চাচার সাথে আলাপে স্মৃতির জলাধারে ডুবে গেল সালামত। সামনে সমান্তরাল দুই সারি রেইল জয়েন্ট, এক্সপানশন জয়েন্টের ক্ষীণ ফাঁকা রেখে-রেখে দূর-দূরান্তে বিস্তৃত। ১৫০ বছরের পুরোনো কাঠের স্লিপার আড়াআড়ি সংযুক্ত হয়ে জয়েন্টের সাথে মিলিত সংসারে হাজারো লোহার চাকার সাথে ক্রমাগত সঙ্গম করে যাচ্ছে। সেই সঙ্গমের ঘাত সয়ে যাচ্ছে ব্যালাস্ট পাথরের বিছানা। সেই বিছানায় ট্রেনের কমোডে বসে কত দু’পেয়ে প্রাণী মলমুত্র ত্যাগ করে। রোদ হাওয়া সেই পরিত্যাগের দুর্গন্ধ শুষে নেয়। রেললাইন শুয়ে থাকে অবিরাম।

কাদের চাচা বলে- অ বাজান সালামত। তোর মনে পড়ে আমার সাথে খাজুর গাছের রস বাইতি গিইলি। ভোর কুয়াশায় আলো ফুটার আগেই সাফদারপুর স্টেশনে ট্রেন থাম্‌লি আমরা প্যাসেঞ্জারগে রস বিক্রি করিলাম। সালমত উত্তর করে- মনে থাকপেনা ক্যান। তুমার সাথে খাজুর বাগানের কাম আমার বৈদেশে কাজে লেইগেছে চাচা। তুমার মনে আছে চাচা? খাজুরির সিজেন শ্যাষ হলি পারে আমরা লুকাল ট্রেনে দর্শনা জংশনে চইলে যাতাম। বডারেত্তে চুরাকারবারিগে কাইছ্‌তে এণ্ডিয়ার মুটা চেনি আইনে সাফদারপুরির মুদির দুকানে ব্যাচতাম।

মালগাড়ি এই মুহূর্তে মোবারকগঞ্জ চিনিকল এলাকা অতিক্রম করছে। জীর্ণ জংধরা কারখানার বড় চিমনির দিকে তাকিয়ে সালামত বুঝতে পারলো চিনিকলের সেই জৌলুস আর নেই। কাদের চাচার কণ্ঠেই শোনা গেল- এই দ্যাখ মোনি, সেই সুময় দর্শনা মিল আর মুবারকগঞ্জ মিলির শ্রমিকরা আন্দোলন করিলো, আমাগে ইস্মাগ্‌লিংইর জন্যি তাগারে চেনির কারবারে বোলে লচ্‌ হয়িলো। একুন তো আমাগে কারবার নেই। তাও তো ঠিকঠাক চলেনা। বসর বসর বোলে লচ্‌ই হয়। হবিইতো। ইস্টাপ্‌রা কুষোর কিনাত্তে শুরু কইরে প্রুডাকশোন পযন্ত মারিং কাটিং করে। সরকারও উগারে মাতায় হাত বুলায়া চলে। আর ইগারেও ধান্দা হচ্ছে যহন যে পাটি সরকারে ইরাও সেই পাটি।

-এ দ্যাশে কোন্তাই ঠিকঠাক চলে নাহি চাচা? বিদেশে কত বিপদে পইরে সব খুয়ায়ে থুয়ে দ্যাশে আলাম। দূতাবাস না কি ছাতার মাতা খুলে থুইছে, নিজিরা আরামে থাহে আমাগের কোনো সমস্যা হলি গ্রাজ্জিই করেনা। ম্যালা কথা পরে কবানি চাচা। আজান দেচ্চে ইপতার করবানা?

– কালিগঞ্জ স্টিশনে না যাইয়ে তো থামাতিও পারবোনা। সিগনাল নেই। তোর কাচে কিচু আচে? মুকি পানি দিতাম?

– আছে চাচা। আমিতো পুনারো দিন জেইল খাইটে আলাম। কিছুই আন্‌তি পারিনি। মিয়ার জন্যি দুডে জামা এট্টা সুনার কানেত্তা বানাইলাম, তাও ফেইলে আস্‌তি হয়িল। খাজুর বাগানের কাম কইরতো আমার সাতে ছাতকের মুকিত ভাই। ভালো মানুষ। একুনু বাগানের কামই করে। সেই খোঁজ নিয়ে ইয়ারপোর্টে আইলো আমাক ওদেশেত্তে বাইর করে দিওয়ার সুময়। দুইকেজি ভালো খাজুর আমার লাগেজে ভরে দিইলো। কয়ডা বাইর করে দিচ্চি। নেও মুকি দে পানি খাই। পানির বোতল আছে আমার কাছে।

সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ সালামত সাফদারপুর স্টেশনে নামে। কাদের চাচা যাবে রাজশাহী। দর্শনা জংশনে যেয়ে পয়েন্ট আর ক্রসিংয়ের হাতল বদলে গোয়ালন্দের পথ থেকে আলাদা হয়ে ঈশ্বরদী জংশনে যাবে। সেখানে ঢাকার পথ থেকে আলাদা হয়ে রাজশাহীর ব্রডগেজ লাইনে চলতে থাকবে কাদের চাচার মালগাড়ি। কিন্তু সালামতের পা আর চলতে চায়না। সাফদারপুর রেলস্টেশন। সাফদারপুরে শুধু কালীগঞ্জের দিক থেকে দর্শনার দিকে ট্রেন আসার আর যাবার পথ আছে। সাফদারপুর স্টেশন থেকে ট্রেনে আর কোনো গন্তব্যে যাওয়া বা আসা যায়না। তাই এটা স্টেশন। আর দর্শনা হচ্ছে জংশন। সেখান থেকে নানান গন্তব্যে ভিন্ন ভিন্ন রেইললাইনে ভিন্ন ভিন্ন গন্তব্যে যাবার উপায় আছে। এমনকি ভারতবর্ষে বৃটিশ কলোনির রেইল স্থাপনের সময় বাংলাদেশের প্রথম রেইললাইন দর্শনা দিয়ে স্থাপিত হয়ে হার্ডিঞ্জ ব্রীজ দিয়ে গোয়ালন্দের দিকে গেছিল ১৮৫৪ সালে। সালামতের জীবন তো আর দর্শনা জংশনে নয়। এই সাফদারপুরই তাঁর জীবনের জংশন। এই মাটিতেই তার দেহ ভূমিষ্ঠ হয়েছে। এখান থেকেই জীবনের নানান গন্তব্য খুঁজতে খুঁজতে ঠোকর খেয়ে খেয়ে দিশাহীন সালামত আজ দেখতে পাচ্ছে- এখনো সে সাফদারপুর জংশনেই দাঁড়িয়ে আছে। ছোটভাই হেকমত ভার্সিটি পাশ দিয়ে বড় চাকরি করে ঢাকায়। ঢাকায় বিয়ে করেছে। বাড়ির সাথে যোগাযোগ কম। বাপকে কিছু টাকা অবশ্য পাঠায়। বড় ভাই তাঁর নিজের গেরস্তিতে ব্যস্ত। ওমান থেকে শুরুর দিকে সবাইকেই সে যথেষ্ট অর্থ সাহায্য করেছিল। পরে নিজে যখন বিপদে পরেছে সকলেই তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। কয়েকবছর যাবত কিছু দিতে পারেনি বলে বাপ কুদরতও ঠিকমত কথা বলেনা সালামতের বউ মেয়ের সাথে। ফোনে জানিয়েছিল রাজিয়া। গত নয় বছর বউয়ের সাথেও মন খুলে সে কথা বলেনি। গত কয়েকবছরে হেকমতের সাথে পরকীয়ার অভিযোগও বলেনি বউকে, বাড়িতে অশান্তি হবে বলে। আর হেকমত নিজেই তো এখন বিয়ে করে শহুরে সায়েব হয়েছে। মনে খচখচানির কাঁটা থাকলেও সেই কাঁটা আধাহজম করেই দেশে ফিরেছে সে। মেয়েটার মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে সব ভুলে থাকতে পারে সে। ভারী হয়ে আসা পা দুটো এতক্ষণ অব্যক্ত দ্বিধায় বাড়ি যেতে অনিচ্ছুক হলেও মেয়ের মুখ মনে পড়তেই দ্রুত গতিতে বাড়ির উঠোনে এসে থামে। সালামতের ভেজা কণ্ঠে আর্তনাদের মতো শোনায়- কই? আমার মা কই? আকলিমা মা কই?

আগে থেকে না জানিয়ে এভাবে সালামতকে পনেরো বছর পরে বাড়ির উঠানে দেখে সবাই ক্যামন তব্দা খেয়ে গেছে। তিনদিকের ঘরের বারান্দা থেকে বাবা ভাই বউ মেয়ে ভাতিজা ভাতিজি সবাই যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে। আকলিমা দৌড়ে এসে মাঝ উঠানে দাঁড়ানো সালামতের কোলে চড়ে বসে। ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে- আব্বা, তুমি একুন আইস্‌লে? সগলি আব্বার সাথে স্কুলি ভর্তি হয়, ঈদি বেড়াতি যায়, আমি এত বছর কোনোজাগায় যাতি পারিনে আব্বা। তুমি আমাক্‌ ঝিনেদা নিয়ে যাবা জামা জুতো কিনতি? সালামতও কাঁদতে থাকে- হয় মা, নিয়ে যাবানে।

এ বাড়ির সোল্লাস হাঁকডাকে আশেপাশের বাড়ির অনেকের জমায়েতে উঠোনে একপশলা ভিড় লেগে গেছে। নানান আলাপ চলছে সালামতকে ঘিরে। প্রাথমিক স্বাগতবার্তা দিয়ে প্রতিবেশীরা যে যার বাড়ি চলে গেল। দু’তিন দিনেই সকলে অবগত হয়ে যাবে যে সে একেবারে ফিরে এসেছে। সে বিদেশ থেকে কি কি চটকদার সামগ্রী নিয়ে এসেছে, তার খতিয়ানে শূন্যতা দেখে অনেকেই আহা-উঁহু জানাবে। তাঁর বউ আর হেকমতকে নিয়ে ইঙ্গিতে আদিকথা শোনাবে। তা শোনাক, আজকে সে ভালো করে ঘুমিয়ে নিতে চায়। বাপ কুদরতউল্লা পুরোনো মাটির ঘরের দাওয়ায় বসেছিল। সালামত কদমবুছি করে বাপের কুশল জানতে চায়। আছি বাপ, ছহি সালামতেই আছি বলে জবাব দেয় কুদরত। সালামতের সার্বিক অবস্থা দেখে বাপ কিছু একটা আন্দাজ করেছে। তবু বলল – যাও, চাইরডে খায়ে দায়ে আরাম করোগে।

 

দিন তিনেক পরে রাতের খাওয়া শেষে বাপের ঘরের বারান্দায় বসে আছে সালামত। সবিস্তারে তাঁর পরিস্থিতি বাপকে জানায়। কুদরতও তাকে সাফ জানিয়ে দেয়- দ্যাখো বাপ, আমার ক্ষ্যাত কিষি যা আচে, সে তুমাগে ভাইগেরে। তুমার অংশ বেইচে তুমাক বিদেশ পাটাইলাম, তুমাক আমি নোতুন ভাগ দিলি তুমার ভাইরাতো মান্‌বিনে বাবা।

– ক্যান আব্বা, আমি তুমার টাকা শোদ করিনি? বড়ভাইর এপেন্ডিক্সির অপারেশনে খরচ দিইনি? হেকমতের পড়ার খরচ দিইনি?

– যে টাকা দেচো সে তো তুমার মার চিকিৎসাই লাগিলো। তুমার মা মরলি খানা করতি হয়িলো। তুমার ভিটেই ইটির ঘর তুলিলো তুমার বউ। শোনো বাপ, আমি কাক্‌ কি কবো? তুমরা সবাই আমার ছাওয়াল। তুমাগে ভাগ্যি যে তুমাগের দুই বুন আইসে এই ভিটের ভাগ চায়নিকো। তুমি যে হালতে আয়িছো, নিজির বউ মিয়ার প্যাট কেমন চলবি তার ঠিক নিকো। আমি পইড়ো অশক্ত মানুষ। যে কয়দিন আছি তুমাগে কামাই খায়ে আমাক থাক্‌তি হবি। আকামত হেকমত উগারে নাখোশ কইরে তুমার জন্যি কি করি কও? আরোতো তুমার এই অবস্থা জান্‌লি বেশি করে আপত্তি তুলবিনি যে তুমাক্‌ কিছু দিলি তাও খুয়ায়ে ফেল্‌বানে। তাগেরেতো সংসার ছাওয়ালপাল আছে। বুড়ো বয়সে বাপ মা হয়া যায় ছাওয়াল পাল। একুন যদি তারা ঠিকঠাক ছাওয়ালপালেক না দ্যাকে বুড়ো হলি পারে আমার মতন কষ্ট ভোগ করা লাগ্‌বি। তুমাগে এই কি আমার দ্যাকার কতা বাপ? আমি তো একুন ছাওয়ালপাল। আকলিমার মতন আমাকো তুমার পুষার কতা, তানা তুমি আমার কাছে হিল্লে চাচ্ছো।

–  একুন… আমি কি করবো আব্বা?

– আকলিমার বিয়ের জন্যি কয়ডা গয়না বানায়িল তুমার বউ। ওতা বেইচে স্টিশনের বাজারে একটা দুকানপাতি দেও। করে খাও। আকলিমার বিয়ের আগে নসিবে থাক্‌লি পারে আবার গয়না বানায়ে দিয়ে।

কথা না বাড়িয়ে নিজ ঘরে এসে বালিশে মাথা রাখে সালামত। আয়নায় চুল আচড়াতে থাকা রাজিয়াকে বলে- তুমার কিছু গয়না আছে দিয়ি দাও। বেইচে বাজারে এট্টা দুকান নিয়ে ব্যবসা খুলি।

– ও আমার মিয়ার বিয়ের গয়না, তুমার পিয়ারের দোস্ত রশেদেক টাকা দিছিলে সেই টাকাদে সে কোটচাঁদপুর বাজারে রড সিমেন্টের ডিলার হয়ছে। তাক্‌ কও টাকা দিতি।

– তকুন আমার ভালো সুময় ছিল তাক দিয়িছি। ধার দিইনি, বন্ধুক দিছি। একুন ফেরত চাতি পারবোনা।

আলো নিভিয়ে পাশের বালিশে মাথা রেখে রাজিয়া বলে- দিতি তো খুব পারিছিলে এখন চাতি পারবানা?

– না পারবোনা।

– বেশ না পারো তো না পারো। একুন ঘুমোও।

রাজিয়া তাঁর গায়ে হাত রাখলে সে হাত সরিয়ে নিয়ে বলে- বিরক্ত করিস্‌নে মাগী।

– একি মুকির বোইল হয়চে তুমার।

– তে তুই কি মনে করিলি? মুক্‌দে খাজুরির রস বায়ে পড়বে? রস সব শুকোয়ে আইছি মরুর দ্যাশে।

– তাতো কবাই। বিদেশে তুমি এল্লাই গিইলে। আর মান্‌ষি যিন্‌ স্যানে যায়না। তারা কত জিনিসপাতি নিয়ে বছর বছর দ্যাশে আসে। তুমি আইসলে ১৫ বছর পর। যহন আস্‌পা কত কি দামী দামী জিনিস নিয়ে আস্‌পা, পাড়ার লোক দেকে সুখ্যাত করবে, সেই হাউশ মোনে পুষিলাম। একুন কাউক মাথা তুলে মুক দেকায়া কতা বুলতি পারছিনে।

– কত যিনি দ্যাকানের মুক আচে রে তোর। হেকমতের সাতে নোঙ্গ তামাশা করিছিস, সে কি আমি শুনিনি মনে করিস?

– এতা তুমি কতি পাল্লে? এ কতা মুকি আটকালোনা? হেকমত তুমার ভাই। এই বিষ কিডা তুমার কানে ঢালিলো?

– রাশেদ দোস্ত কি আমাক মিছে বুলিলো?

– ও, তালি পারে তুমার সেই পিয়ারের লোক। সে লোকের কু’নজরে পাত্তা দিইনিকো। তাই বুলে যা তা অপবাদ দেবে?

– তুই তো কম ছিনাল্‌ নারে মাগী? আর কার কার সাথে নখরা করিছিস? কয়ডা নাঙ জুটাইলি?

– হুঁশ কইরে কতা কও আকলিমার বাপ। আকলিমা পাশের ঘরেত্তে শুনতি পাবি। নাঙ না জুটায়েও এত অপবাদ? যদি জুটাতাম তো বেশ করতাম। শরীল তো নদীর কূল না যে এক মানুষির শরীলি কয়েক মান্‌ষির শরীলির ছুঁয়া লাগালি শরীল ভাইঙ্গে যাবি? শরীল তো আপেল না কেউ খায়ে আইটে কর্‌লি পইচে যাবি। অসুকি বিসুকি ডাক্তারের কাচে গিইলাম, তারা শরীলি হাত দিয়িচে। নসিমনে যাতাযাতি কইরে কত বিটা মান্‌ষির শরীলি শরীল ঘেঁষে বসে ঈদির বাজার করতি কোটচাঁদপুর গিইলাম, তুমার বাপ ভাইগে জন্যি বাজার করিলাম, আমার শরীল কি তাতে পইচে গিইলো? আর শরীল কি খালি বিটা মানুষগেই থাকে। বিদেশে থাকলি বছর দুইবছরে লোকে বাড়ি আসে। তুমি কয়বার আয়িলে? আমার শরীল এই পনেরো বছর ধরে তুমার জন্যি পুষে থুয়ে শুকোয়ে গেল, তুমি কি আমার জন্যি শরীল পুষে থুয়িলে। তুমি কারুর কাছে যাউনি? আমি যদি বুলি তুমি গিয়িছো, শুনে তুমার ক্যামন লাগ্‌বি।

প্রতি-আক্রমণ যে এভাবে ফিরে আসবে প্রস্তুত ছিলো না সালামত। সত্যিই তো সে ফিলিপিনো ইন্দোনেশীয় বণিতাদের কাছে গিয়েছে মাঝে মাঝে। ক্ষিধে আছে বলেই তো বেনিয়াবৃত্তির অংশ হয়েই বণিতাবৃত্তি আছে। আরব শেখদের বোন-ঝি দেখে তাঁরও তো কামভাব জেগেছে বটে, তবে কল্লা কাটার ভয়ে স্বপ্নমেহনেই সে ক্ষুধার নিবৃত্তি করতে হয়েছে। রাজিয়ার শরীরও তো মানুষের শরীর। পুরুষ দেখে ক্ষুধা জাগা তো স্বাভাবিক। তের বছর যদি সত্যিই অনশন করতে করতে কামের পিত্তি শুকিয়ে যায় রাজিয়ার, তবে সে যে বেঁচে আছে সুস্থ মগজে এই তো অনেক। আর যদি কিছু করেও থাকে, রাজিয়াকে কি দোষী বলা ঠিক? সালামতও তো তাহলে দোষী। কিন্তু তাঁর পৌরুষের অহম তা সহজে মানবে কেন? তেলে তেজপাতার ফোঁড়নের মতো ছ্যাৎ করে ক্ষেপে গিয়ে যেন মরণ কামড় দেয়। পাল্টা আক্রমণে দিশাহীন সালামত চেঁচিয়ে বলে- সত্যি কতা বোল মাগী, আকলিমা কার মিয়া?

প্রবল ক্রোধে রাজিয়া কষে চড় মারে সালামতের গালে। রাগে গর্জে ওঠে- শ্যাষ-ম্যাষ তুমার মাথাও আরব দেশে কব্বরদে থুয়াইছো। তুমি কবে বিদেশ গিইলে সে হিসেবও গুলোয়ে খায়িছো। তুমি থাকো তুমার শাইয়ো ভরা রাগ নিয়ে। আমি কাইল আকলিমাক্‌ নিয়ে বাপের বাড়ি চইলে যাবো।

রাগ পড়ে যায় সালামতের- আমাক্‌ তালাক দে আবার বিয়ে পুষ্‌পি নাকি? রাজিয়াও বলে- হয় পোষ্‌পো।

সকালে রাজিয়ার আর্তনাদে ঘুম ভাঙে সালামতের। স্টেশন থেকে খবর এসেছে আকলিমার গলাকাটা লাশ রেললাইনে পড়ে আছে। পুলিশ এসে থানায় নিয়ে যাবে। মাথায় যেন বাজ পড়লো। মেয়ে কি তাহলে রাতের ঝগড়া সব শুনেছে? ভোরের আলো ফোঁটার আগেই খুলনা থেকে গোয়ালন্দগামী ট্রেন সাফদারপুরে পাঁচ মিনিট থামে। আঁধার সরে ভোর না হতেই রাত চারটায় দর্শনার অভিমুখে সাফদারপুর স্টেশনের দুই কিলো সামনের নির্জনে যেয়ে জয়েন্টে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে আকলিমা। তখন সেহরি শেষে সবাই ফজরের নামাজে ব্যস্ত। রাজিয়া রাতের পান্তা খেয়ে সেহরি করে নিয়েছিল। আকলিমা ঘুমিয়ে আছে ভেবে ডাকেনি, ডাকেনি সালামতকেও। কখন মেয়ে ঘর থেকে বের হয়েছে সে টের পায়নি। কান্নার রোলে ভারী হয়ে ওঠা বাড়ি ছেড়ে স্টেশনে গেল সালামত। তাঁর সাথে আরও কয়েকজন। রাজিয়া সাথে আসতে চেয়েছিল কিন্তু বাড়ির অন্য বউ-ঝিরা তাঁকে নিরস্ত করে সান্ত্বনা দিতে লাগলো। স্টেশনে যেয়ে দেখা গেল পুলিশভ্যানে খেজুরপাটিতে মোড়ানো আকলিমার লাশ। কোটচাঁদপুর থানার ওসি নিজেই এসেছে। পোস্টমর্টেমের জন্য নিয়ে যাবে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে।

ঝিনাইদহ থেকে পোস্টমর্টেম করিয়ে আকলিমার লাশ কোটচাঁদপুর থানায় এনে ওর বাবার কাছে হস্তান্তর করা হবে। সালামত থানার বারান্দার সামনে আমগাছতলায় বসে আছে। সাফদারপুরে এই সুইসাইড নিয়ে নানান খোশগল্প পল্লবিত হচ্ছে। তা হোক, সালামতের ওতে পরোয়া নেই। সে বরং ভাবছে অন্য কথা। রাজিয়ার সাথে ঝগড়ার সময় সালামত নিজেই মেয়ের বাপের পরিচয় নিয়ে যে সন্দেহ প্রকাশ করেছে, সেই গ্লানিতেই কি আকলিমা রেললাইনে মাথা তুলে দিল? বিয়ের দুইমাস পরেই তো সে ওমান যেয়ে ১৫ বছর পর ফিরে এলো। শুধু রাজিয়ার বেপারে রাশেদের চিঠি পেয়েই নয়, প্রবাসীদের অন্যান্য যেসব গসিপ কানে আসে সবকিছু মিলেই তাঁর মনে খচ্‌খচানি এসেই যায়। আকলিমার জন্ম পরিচয় নিয়ে নয়, সেই খচ্‌খচানি রাজিয়াকে নিয়ে। তবু কাল রাজিয়ার দেওয়া জবাবগুলো সালামতকে অন্যভাবে এখন অনুশোচনায় বিদ্ধ করছে। এতটা ক্রোধ প্রকাশ করা ঠিক হয়নি তাঁর। কি হয় একটু মানিয়ে নিলে? কতভাবেই কত কি ঘটে যায় জীবনে। সে নিজেও বণিতা সকাশে গমন করেছে ঠিকই, কোনোদিন জবরদস্তি কারোর সম্ভ্রমহানি করেনি। সে বা রাজিয়া প্রয়োজনে কোনকিছুতে যদি নিজেদের অন্যত্র সিক্ত করেই, কি এমন ক্ষতি হয়েছে? নিজেদের ক্রোধের বলি হল মেয়েটা।

ওসি আকরাম আলী তাঁর অফিস রুমের জানালা দিয়ে আমগাছতলায় সালামতের বসে থাকা দেখে কনেস্টবল মারফত ওকে ডেকে নিল। আকরাম আলী এতক্ষণ লোকাল পত্রিকায় চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল। কোটচাঁদপুরের দুই পৌর মেয়র প্রার্থী সালাউদ্দিন বুলবুল সিডল ও জাহিদুল ইসলাম জিরের কুটকচালি। মহেশপুরের এমপি ক্যান্ডিডেট শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাজ্জাতুস জুম্মা চৌধুরীর জনসভা, ওষুধ ব্যাবসায়ী শাহরিয়ার জাহেদী মহুলের সমাজসেবার খবরের ভীড়ে ভেতরের পাতার এক কোণায় আকলিমার রেলেকাটা লাশের খবরও আছে। সেখান থেকে চোখ পড়লো কালীগঞ্জের এমপি ক্যান্ডিডেট চার বারের সাবেক এমপি শহীদুজ্জামান বেল্টুর খবরে। আকরাম নিজেও কালীগঞ্জের ছেলে, কলেজে পড়ার সময় সে বেল্টু স্যারের লেকচার শুনতো। তখন বেল্টু কমিউনিস্ট রাজনীতি করতেন। আকরাম নিজেও একটু আক্রান্ত হয়েছিল স্যারের লেকচারে। পরে ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ার সময় সক্রিয় রাজনীতিতে না জড়ালেও, পিএসসি-তে নিয়োগ পরীক্ষার সময় কিছুটা তদবিরের সাহায্য নিয়েই সে এই চাকরিতে এসেছে। নিজের জেলায় পোস্টিং নিয়েছে। সালামতের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ পর বলল,

– আপনি সাফদারপুরের সালামতউল্লা। ষোল বছর বয়সে আবদুল হকের পুর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টিতে কাজ করতেন। এসএলআর বন্দুকসহ বলুহর বাওরে ধৃত হয়ে জেলে যান। গ্রেফতার হওয়ার সময় ছিল আষাঢ়ে বৃষ্টিতে রাত দু’টো। নাবা জমিতে কাঁদায় অস্ত্র লুকিয়ে নিজেও গায়ে কাঁদা মেখে শুয়ে থেকে ক্যামোফ্লেজ নিয়েছিলেন। দু’বছর কারাদণ্ড ভোগ করে বের হয়ে পুলিশ ও নেতাদের মাসোহারা দিয়ে দর্শনা বর্ডার থেকে চিনি স্মাগলিংয়ে জড়িত ছিলেন। ভাবছেন কিভাবে বলছি? এই থানায় আগেই আপনার নামে ফাইল আছে।

– সবই ঠিক বুলিছেন স্যার। এর পর আমি বিদেশে চইলে গিলাম লেবারের কাজে। কয়েকদিন হয় ফিরিছি।

– সে ঠিক আছে। আপনার মেয়ের লাশ এসে যাবে ৫ মিনিটের মধ্যে। আপনার কাছে আমার জানার কৌতূহল, আপনি কি দেখে হক সাহেবের পার্টিতে জড়িত হয়েছিলেন, তাদের লাইন তো বিতর্কিত।

– স্যার, আপ্নেগে মতন শিক্কিতো না। লাইন-বেলাইনের তক্ক আমি বুজিনে। মানুষ চাইর্‌ডে খায়ে বাঁচ্‌পে, কারুর কামের অভাব হবিনে, কেউ কারুত্যা লুটে খাবিনে, চুরি চামারি হবিনে সেইসব শুনে ভালো লাগতো। আমি কাউকি খুন করিনি স্যার। এখন বুজি তাগারে পথ ভুল ছিল। কিন্তু স্যার আপনি কতি পারবেন, কাগের পথ ঠিক? খাওয়ার কষ্টে মানুষ কত ফিকির করে, ভালোর তে বেশি ভালো থাকার লোভে বড় চিয়ারে বসেও চুরি চামারি করে। মান্‌ষির কাম কাজের অভাব, কাজের অভাব, কামেরও অভাব। লুটে খাওয়া খুঁটে খাওয়া খুবলে খাওয়া কিছুই তো আপ্নেগে সমাজে বন্দ হলো না। আমার আকলিমা মা কার উপর রাগ করে চলে গ্যালো? আমিই না হয় ইরি জন্যি দায়ী। কিন্তু আমি নিজির এই অবস্থার জন্যি কাগের দায়ী করবো কতি পারবেন? এটুক বুঝি স্যার, আপ্নেরাও ঠিক পথ দ্যাখাতি পারেননি। আপনেগে পথও ভুল। এট্টা কথা কি মানবেন স্যার? ঠিকঠাক কর্ম করতি পারলি, আমাগে ভাতের অভাব নেইকো, আছে শুধু ভাগের অভাব।

ওসি আকরাম চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে সালামতের কাঁধে হাত রাখলেন। আকলিমা মেয়েটার জন্য তারও একটু শোক হচ্ছে। ঝিনাইদহ কেসি কলেজে পড়ার সময় তিনি গল্প শুনেছিলেন মোটর ব্যাবসায়ী কেসি পাল ঝিনাইদহ শহরে বাস সার্ভিস চালু করেছিলেন। ঝিনাইদহ শহরে ব্রিটিশদের রেললাইন স্থাপনে তিনি বাঁধা দিয়েছিলেন। জনমত হাতে রাখতে তিনি যাত্রীদের তখন ফ্রি বাস-সার্ভিসের সাথে ফ্রি ধূমপানের সার্ভিস দিতেন। ঝিনাইদহে রেললাইন হলে সাফদারপুর কোটচাঁদপুর এত গুরুত্ব বোধহয় পেত না। কপোতাক্ষ নদের পাশ ঘেঁষে এই গঞ্জ এলাকা দিয়ে যশোর খুলনায় রেলপথ নেওয়ার সাথে সাথে ব্রিটিশরা এখানে ১৩৫ বছর আগেই পৌরসভা স্থাপন করেছিল। কলোনি চলে গেছে, পাকিস্তান গেছে, সমাজের পোশাকি উন্নতি হয়েছে, তবে আকলিমার সুইসাইডের মতো নানান উপসর্গ যে ঠিক পথে না চলারই বার্তা, মনে মনে একথা স্বীকার করেন ওসি আকরাম আলী।

আকলিমার লাশ পুলিশ ভ্যান থেকে নামিয়ে একটা তিন চাকার ভ্যানে তোলা হল। সালামত স্পিরিট আর তুলা কিনে আনে। খেজুর পাটির আড়ালে আকলিমার গায়ের ছোপ-ছোপ রক্তের দাগ মুছে দেয়। হঠাৎ তাঁর চোখ যায় আকলিমার তলপেটের ডানপাশে। সেখানে একটা কালো জড়ুল। এই জড়ুল সালামতের বাবা কুদরতের যেমন আছে, তেমনি সালামতসহ অন্য ভাই বোনদেরও আছে। তবুও সালামত নিশ্চিত হতে পারেনা, আকলিমা সালামতের নিজের সন্তান অথবা সালামতের নিজের সন্তান নয়। আকলিমা নিজে অবশ্য এসব বিতর্কের ঊর্ধ্বে চলে গেছে। ভ্যানে করে ওর লাশ সেই রেললাইনের পাশের পথ দিয়েই বাড়ি যাচ্ছে যেখানে সে মাথা রেখে স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করেছে। সালামত ভালো করে খেয়াল করতে থাকে জয়েন্টের কোথাও আকলিমার গলাকাটা রক্তের দাগ দেখতে পাবে কিনা। খেজুর পাটিতে মোড়ানো ওর লাশ সাফদারপুরের বাড়িতে বিলাপ প্রকাশের জাগতিক নিয়মের পর গোরস্থানে চলে যায়।

 

একবছর গত হয়েছে। কপোতাক্ষ নদের বালুর ইজারা নেয় লোকাল পাতি নেতারা। সালামত কোনো কাজেই থিতু হতে পারেনা। এখন ঝুড়ি মাথায় বালু তুলে ট্রাকে লোড করার লেবারি করে। এক-একদিন রাতের ট্রিপে বালু তোলার সময় দূরে গোরস্থানে হলুদাভ আলোর ফুল্‌কি দেখতে পায়। গোরে অবশিষ্ট হাড়ের খোড়লে জমাট ক্যালসিয়াম থেকে উৎপন্ন গ্যাসের কারসাজি। তবু বালুর ঝুড়ি মাথায় সালামতের চিত্তে ঘোর লাগে, এই বুঝি আকলিমা জীবন্ত হয়ে দৌড়ে এসে তাঁর কোলে চড়ে বসবে। চুমু খেয়ে বলবে, আব্বা তুমি আইস্‌লে? ওদিকে আকলিমার দেহ হাজার বছর ধরে মিশে যাবে মাটিতে। খনিজ উপাদানে রূপান্তরিত হয়ে আদম জাতের খনি খননে তেল গ্যাস হয়ে আবার উত্তোলিত হবে ভূপৃষ্ঠে। ততদিন সাফদারপুর জংশন টিকে থাকবে কিনা কে জানে।

যেমন সালামত বা অন্য কেউই জানেনা আকলিমা কেন নিজেকে হননের পথ বেছে নিয়েছিল। সেদিন রাতে বাপ-মায়ের ঝগড়া আকলিমা সবই শুনতে পায়। প্রকৃত ঘটনা সবই জানতো সে। আব্বার বন্ধু রাশেদ কাকু মাকে জ্বালাতন করলেও মা পাত্তা দেয়নি। মা একদিন রাশেদ কাকুকে কষে চড়ও মেরেছিল। এর শোধ নিতে মুনি কাকার সাথে মাকে জড়িয়ে আব্বাকে চিঠি দেয় রাশেদ কাকু। এতেও জিঘাংসা কমেনি রাশেদের। তখন আকলিমা ৫ বছরের শিশু। একদিন আদরের ছলে রাশেদ কাকু শিশু আকলিমাকে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। দরজা জানালা বন্ধ করে দেয়। রাশেদ আকলিমার মুখে গামছা ভরে হাত-পা বেঁধে ফেলে। অপরিপক্ক যোনীপথে অসম অনুপ্রবেশে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলে। আতংকে থমকে যাওয়া শিশু আকলিমাকে সে আরো ভয় দেখিয়ে দেয়- যদি কাউকে কিছু বলে আকলিমার মা রাজিয়াকে খুন করে ফেলবে।

শৈশবের সেই ট্রমা আকলিমাকে কখনোই ছাড়েনি। তবু আকলিমা হাল ছাড়েনি।

ভার্সিটিতে পড়া গ্রামের রোকেয়া আপুর কাছেই সে শুনেছিল আমেরিকার কে একজন নাকি শৈশবে গ্যাং-রেপ্‌ড হয়েও চুপ থাকেননি। অনেক লড়াই করে বড় নাম করেছিলেন। আকলিমাও তাই হতে চেয়েছিল। কিন্তু যে বাবাকে সে ১৫ বছরের জীবনে প্রথম দেখলো, সেই বাবা তাঁর জন্ম পরিচয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলো, এই অস্তিত্বের সংকট আকলিমা সইবে কী করে। পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ লেখা হযনি। লেখা আছে আত্মঘাতী শরীরে কোথায় কেমন আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, তার বিবরণ।

রিপোর্টে একলাইনে বলা হয়- মেয়েটির মৃত্যু হয়েছে অপঘাতে।

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close