Home কবিতা সৌম্য সালেক >> কবিতাগুচ্ছ ও কবিতা-ভাবনা

সৌম্য সালেক >> কবিতাগুচ্ছ ও কবিতা-ভাবনা

প্রকাশঃ May 22, 2018

সৌম্য সালেক >> কবিতাগুচ্ছ ও কবিতা-ভাবনা
0
0

সৌম্য সালেক >> কবিতাগুচ্ছ ও কবিতা-ভাবনা

 
সং অব ম্যাসাকার

 

 

উত্থানের পর মুহূর্তে এক তীব্র-তীর এসে ভূমিতে লাফিয়ে উঠলো লিঙ্গটি; প্রলয় নাচন কাকে বলে!
ঘিরে-ঘুরে হাত-পা ছোড়ে বিদ্ধ-ঘোটক, ঘোটকীর সেকি চক্রছুট!

এখন মাৎ হবে লীলা- রং মেখে, অনাবিল অট্টহেসে পশ্চিমের অস্ত্রঘাঁটিতে হবে জোশ
আহা মৈথুন, আহা মৈথুন আহা…
কানে কানে কোষে কোষে বিদ্ধঅমূল বিষাদের রোল শোনা গেলো
প্রাণে প্রাণে বোধে ও মননে তীক্ষ্ম করাল জখমের লাল দেখা দিলো
আহা মৈথুন, আহা মৈথুন আহা…!

 

 

প্রীতি ও ইচ্ছামৃত্যুর ঘোর থেকে

 
প্রীতি ও পরিণয় শেষে কালঘুমে পেয়ে যায় ইচ্ছামৃত্যুর অভিলাষ

সে দেখে নীলঘুঘু আর এক বর্ষীয়ান সাপ সঙ্গ পেতেছে পুরাতন ডালে
অষ্টপ্রহর জুড়ে ক্যাথেড্রাল থেকে ফোকরে ফোকরে উপচে পড়ছে বর্ণহারা ঘুম
দেখে সে মসজিদের মিনারটি উঁচু- অশ্রুফোয়ারা বয়ে গেছে তলদেশে
মিছিলের প্রান্তমূলে এসে মন্দিরের পাশে আবার সে ভূত পেয়ে গেছে
ভিক্ষুদের অবাক চলাচল দেখে পাহাড়ের পাদদেশে সে এবার স্তব্ধ হয়ে বসে;
তারপর কী এক রুষ্ট বোধনে, সে কিছু খুন করে বসে
একি, প্রিয়হারা রিক্ত-রোদনের স্বরে সে তো কারো শোনেনি হাহাকার!
পায়নি এতটুকু প্রতিঘাত
এতটুকু বিধির আক্রোশ-
সে কেবল ক্ষুব্ধ হতে লাগে

মমতা ভুলে গেছে লোকে-
যেখানে করুণার শোভা নেই, চিৎকার নেই
সেখানে বেঁচে থাকা পাপ; এমন লিপ্ত অভিশাপ দেখে
ভাবে সে, এখনি খুন হতে হবে!

মাত্র সে পরে নিবে একগাছি নরকের মালা-
সমুলে ঝাঁপিয়ে পড়ার একটু অপেক্ষা চাই রৌরব
এরিমাঝে এ আবার কোন শাপ
ঘটঘট শব্দ করে দরজায় কে যেনো ডাকছে বাহিরেÑ
বুঝিবা মৃত্যুর সাড়া এসে কড়া নাড়ে, বুঝিবা অবোধ হলকার ধ্বনি
‘মহিম মহিম, মহিম শোনও… কার যেন ত্রস্তনত হাঁক :
‘এমন কেউ নেই যে তোমাকে বাঁচায় এখন-
চারপাশে শত্রুর নগ্ন-ইশারা দেখো ওই
পালাও পালাও এখনি পালাও…

কী হবে, সে যদি খুন হয় আর কারো হাতে
সে তো এখনি খুন- হতেছিল!
তবু কেন অনিবার আত্মা-অবধি, মর্ম-শিরায় না না সাড়া পড়ে গেলো
জাগর আশ্বাসে বুক চাপে বাঁচার আহ্বান
অন্ধ-আতঙ্কের রাতে কখন যে পালিয়েছে- সে জানে না
রুক্ষ ধাবনের নিরন্ত পথে যেতে কোথায় যে ঠাঁই আছে- সে জানে না
কঙ্কর, ধূলি আর শত্রুশকুনের ভিড়ে আছে একটি পথের পরম হাতছানি- মহিম ছুটে আর ছুটে…

 
কোনো এক মধুময় মাসে

 

 

কোনো এক মধুময় মাসে তোমার পত্র এসে পৌঁছে যাবে
সামান্য আলো এসে স্থির হবে পটে
বারবার তাড়া দিবে গোপন ভাষণ
ভুলে যাওয়া তোমার আশ্বাসে শুভ
কীসব অঘ্রান লাগে, কীসব অর্ঘ-চেতনা
চকিতে হবো না লীন
আর চকিতে হবো না লীন
আঁধারের অধিরথে কুলাবো না ক্ষয় আর

আম্রসার বনে বনে পড়ে যাবে সাড়া
কাঁঠালের গন্ধে মাতাল সন্ধ্যায়
পানসির ভিড় জমে ওঠে- এক, দুই, তিন
হাটুরের অনেক পদাঘাত

পরের দিন পর্ণমোচী আসে
উপল অস্থিজুড়ে পাতা ঝরে পাংশু হলুদ
অগণ্য-অর্বুদ স্বপ্ন হেসে নিশিভর
পরেদিন বিন্দু শিশিরের পথে হেসে রবে
নিবিড় আশ্বাসে শুভ-
অনুকূল সৌরশিষ ছুঁয়ে যাবে তোমার কপাল
পরেদিন আনত পায়ে পায়ে তুমিও রৌদ্রবাসক হবে পার
মুখোমুখি মঞ্জুরিত নদী হাওয়ায় হাওয়ায় দোল খাবে
সুরে সুরে পালের দখিনা জাগে, মধুকর
ভাসানের গান কও মধুকর- ওষ্ঠ কোমল করি :
‘প্রিয়তম হে জাগো, জাগো, জাগো…

 

 

মাতৃত্ব

 

 

দুটো ছাগশিশু ঘাড়গুঁজে সজোরে সশব্দে ওদের মাকে পান করছে; এই দৃশ্য উন্মোচন করে আদিমাতার মাতৃত্বকে যেনো সদ্যোজাত কাবিল ও একলিমা আপ্রাণ চুষে যাচ্ছে হাওয়ার স্তন দুটি: আর এভাবেই জোড়ায় জোড়ায় ওরা তৃষ্ণা মেটায় এবং মানুষের উদ্বর্তনে ভরে ওঠে পৃথিবীর পীঠ।

 

 

অদিতি মহসিন

 
(একজন রবীন্দ্রশিল্পীর প্রতি)

দেখুন অদিতি, আপনার কণ্ঠে কেমন টানটান চৈত্রমাস
যেনো তেঁতে ওঠা ফলাটির দিকে ওর দৃষ্টি
বিক্ষেপে ঝরে যাবে রঙিন ফুলেরা
বাধ্য হয়ে যে যার সাধ্যমতো খুলে নেয় পোষাক-আষাক
মগ্ন হয় ত্রিমাতৃক রাতের সংযমে

অদিতি, কবিরা একটু করুণার লোভে
কত কষ্টেই না শব্দ-স্বরূপে তুলতে চায় সুকণ্ঠ পাখিসহ সবুজের সময় যাপন
তবু নারীর মমতা যেনো কাছ থেকে দূরে, আরও দূর দ্বিধার গোলকে

অদিতি, এমন জ¦র হলে বুঝি শুশ্রুষা নেই!
লাল-নীল-হলুদ-সবুজে ঘেমে ওঠে উদ্ভিন্ন-দেহ
পড়ুন, ক্ষয়ে যাচ্ছে সবটুকু জয়-জল
পড়ুন, এখনই তারা-শীর্ষ থেকে আপনার উষ্ণবাক্- শাণিত সংগীত।

 
পুরান বাজারের কড়চা

 
অগণ্য বায়ুপাক মিলে যায় ইথারের মগ্ন-কলহে
ভোর থেকে দিনান্তের অনুকূল রোদে বসে আছি অবিহিত

এই পুরাতন শহরের পথে, হাঁটে-হইচই বিকিকিনি ঢোল ও মুদ্রা-বিচল; মানুষের কোলাহলে একটু দমে নি ধূলিউড়ি খেল্ আজও, শুধু সময়ের অভিঘাত ফিরে যায় খালি হাতে, স্মৃতি বা পরিণতি-কালে ছিন্ন হলো না কিছু ! পৃথিবীর সুখ ভালোবাসা এভাবেই সমাসীন; তবু কিছু তো অবচয়, কিছু তো ক্ষয় দেখিÑ ভগ্নপ্রায় পুবের-খিলানে

আর বাতাসের বিপরীত পাশে জেগে থাকে মেছো ও মহাজন; শত শ্রম ক্লেদ-বুকে চিরদিন পণ্য-পশরা করে ওরা পুরাতন স্বরে ডেকে যায় : মাঝামাঝি পথে যেতে সেই দৃশ্য আমিও দেখেছি…

 

 

অপ্রেমের পাঠ

 

 

কেউ বাহুতে বেঁধে রাখে, গোপন সজ্জায় নিয়ে শোয়ে-সংশয়ে- মুগ্ধ মাতমের বশে
তবু কিছু সুখি হতে চায়- আহা প্রেম, তোমারি পরাজয় !

কেউ বাঁধে চুলে, সিক্ত খোঁপার সাজে পাখিটির কামনা কুড়ায়
বুক পেতে- স্পর্শ-কোমল ঢেলে, মেলে ধরে গুপ্ত-মদক
আহা প্রেম, তোমারি পরাজয়!

এই হৃত পুরাণের প্রতি প্রাণফেলে মিছে মিছে প্রহরে প্রহরে
প্রণয়ের অবেদন পড়ে যাওÑ হায় হলায়ুধ
মিছে কেনো ওরা প্রেমের নাম করে মোহের ব্যর্থ নাচে পৃথিবীতে রাস করে যায়-
সময়ের সাথে, দৃষ্টি আর জান্তব হৃদয়ের সাথে !

 

 

কবিতা ভাবনা

 

 

আমার বেড়ে ওঠা মামার বাড়িতে। মনে পড়ছে সেই পিচ্চিকালে, নানী সুরে সুরে গাইতেন কোনো এক অচিন পদ্যকারের ছড়া- ‘তাদের বাড়ি ব্যাঙের বাসা কোলা ব্যাঙের ছাও/ খায়-দায় গান গায় তাইরে নাইরে নাই…।’ কৈশোর জুড়ে মামার কণ্ঠে নজরুলের- বিদ্রোহী, কাণ্ডারি হুশিয়ার, খেয়া পারের তরণী’র উচ্চারণ কী এক দুর্বোধ্য যাতনায় রক্তকে জাগিয়ে তুলেছে। তারপর বহুবার মজলিসে-মেহফিলে সমূলে উত্তাল হয়েছি ফারসি কবিতার মত্ততায়; কবিতার সাথে সম্পর্কটা আমার সেখান থেকেই। রোমেন্টিক কবিতার অন্যতম সারথি কোলরিজের মতো হচ্ছে- ‘উৎকৃষ্ট শব্দের উৎকৃষ্ট পদবিন্যাস কবিতা।’ অ্যারিস্টটল মনে করতেন- ‘কবিতা দর্শনের চেয়ে বেশি, ইতিহাসের চেয়ে বড়ো।’ কবিতা কী, সে সম্পর্কে এমন ভিন্ন ভিন্ন বহু মত থাকলেও কোন মন্তব্যই আসলে চুড়ান্ত নয়। তবে বোধকরি অনুভূতি যখন হৃদয়কে স্পর্শ করে তার নিপুণ শব্দবিন্যাস কবিতা। প্রায় সবটুকু লাল এখনো অন্তরীণ গোলাপের শীর্ষবিন্দুর ওই সৌন্দর্যটুকু কবিতা। চিতল হরিণী তার দ্রুতগামী ক্লান্তির শেষযামে যখন প্রস্রবণে পিপাসায় মুখ নামায় সেই জলপান শব্দ কবিতা। হাজার বছর ধরে মানুষের নুড়ে-পড়া ইতিহাস, বুকফাটা মাতম, ধ্বসে পড়া সভ্যতার প্রত্ন-নির্যাস, বিরহীর আশাহত আননের অশ্রুব্যঞ্জন আর শ্রান্ত-স্বেদবিন্দুর কলরোল কবিতা। প্রকৃত প্রস্তাবে একজন কবির কাছে কবিতার চেয়ে অভীপ্সিত আর কিছু হতে পারে না। একটা কবিতার জন্য কত রাতজাগা। একটা কবিতার জন্য কতদূর পায়ে পায়ে ছুটে চলা। একটা কবিতার জন্য বিসর্জন ও ব্যর্থতার বৃত্তান্ত ভারি হতে থাকে। একটা কবিতার জন্য মমতার বুকে ছুরি বিঁধে- ভীতিকর পথচলা। প্রথম যেদিন কামনা ও বিসম্বাদ খুব সূক্ষ্মচালে একযোগে আঘাত করেছে হৃদয়কে- নিজের চিৎকার নিজেই শুনেছি, ভাষা খুঁজে পাইনি। আজো ভিতরে বাইরে সেই পাখা ঝাপটানি, হাহাকার, আজো ভাষাহীন আর্তলোনার সেই উচ্ছ্বাস- বাণী দাও, বাণী দাও…

 
সৌম্য সালেক

 
জন্ম : ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭; জন্মস্থান : গ্রাম: কাদলা, উপজেলা: কচুয়া, জেলা: চাঁদপুর।
প্রকাশিত কাব্য : আত্মখুনের স্কেচ (২০১৬) এবং ঊষা ও গামিনি (২০১৮)
সম্পাদক : চাষারু

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close